প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২০
insia isha chowdhury
সূচনা বারবার প্রণয়কে বলছিল ওই পুরোনো প্যাড খাতাটি আবার আগের জায়গায় রেখে দিতে।সামান্য একটি জিনিসের জন্য সূচনার এমন অস্থিরতা দেখে প্রণয়ের মনে কৌতূহল জন্মাল। আসলে এই খাতার ভেতরে কী আছে? যার জন্য সূচনা বারবার সেটি সরিয়ে রাখতে বলছে! বিষয়টি প্রনয়ের কাছে একটু অন্যরকম লাগল।
সূচনার বারবার নিষেধে প্রণয় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে? সমস্যা কী?”
সূচনা এবার বিছানা থেকে পা নামিয়ে বলল,
“অনেক সমস্যা। ওটা ওখানেই রেখে দিন।”
কিন্তু প্রণয় সূচনার কথা পুরোপুরি উপেক্ষা করে খাতাটির দিকে ভালো করে তাকাল। এটি একটি বড় ডায়েরির মতো, খুব যত্ন করে বাঁধানো। সম্ভবত অনেক আগের কোনো জিনিস। এর ওপর ছোট ছোট স্টিকারও লাগানো আছে। প্রণয় খাতাটি খুলতে গেলে সূচনা দ্রুত বিছানা থেকে নেমে এসে প্রণয়ের হাত থেকে খাতাটা কেড়ে নিয়ে বলল,
“আশ্চর্য! আমি কিছু বলছি, আপনি আমার কথা শুনছেন না কেন?”
এত ছোট একটি জিনিস নিয়ে সূচনার এমন আচরণ দেখে প্রণয়ের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। ওর মনে আরও প্রশ্ন জাগল আসলে এই খাতার ভেতরে কী আছে? সে আবার সূচনার হাত থেকে মোটা নোটবুকটি নিয়ে নিল এবং পিছন ঘুরে খুলে ফেলল। সূচনা পেছন থেকে বলল,
“প্লিজ… ওটা দেখবেন না।”
কিন্তু প্রণয় ততক্ষণে খাতাটি খুলে ফেলেছে।
খাতাটি খুলে সে কিছুটা অবাক হয়ে গেল। সে ভেবেছিল হয়তো এর ভেতরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখা থাকবে, কিন্তু সেখানে ছিল শুধুই অসংখ্য সুন্দর ছবি। পেন্সিল স্কেচ ও রঙতুলির আঁকা নানান চিত্র। প্রতিটি ছবিই ছিল নিখুঁত ও হৃদয়ছোঁয়া। প্রণয় খাতাটি হাতে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই সূচনা রাগী গলায় বলল,
“এবার আপনার শান্তি হয়েছে?”
প্রণয় অবাক হয়ে বলল,
“এতে শান্তির কী আছে? আর তুমি আমাকে এটা
দেখতে মানা করছিলে কেন? এগুলো তো খুব সুন্দর ছবি। এতে সমস্যা কোথায়?”
সূচনা কিছুই বলল না। মুখ ভার করে চুপচাপ গিয়ে আবার বিছানায় বসে পড়লো। প্রণয় পুরো খাতাজুড়ে শুধু ছবিগুলোই দেখতে পেল। সব ছবি গুলোর নিচে বা অন্য কোথায় ছোট্ট করে সূচনার নাম লিখা। প্রতিটি আঁকাই অনেক সুন্দর।
প্রণয় নিজেও এসে সূচনার পাশে বসে বলল,
“আমি সত্যিই অবাক হয়েছি। তুমি এত সুন্দর ছবি আঁকতে পারো! তোমার আর্ট সত্যিই অসাধারণ।”
সূচনা কোনো উত্তর দিল না। প্রণয় এবার কিছুটা অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আমি তো শুধু দেখলাম, তবুও তুমি এত মন খারাপ করে আছ কেন? এখানে তো মন খারাপের কিছুই দেখছি না।”
এতক্ষণে সূচনার মুখে কথা ফুটল,
“এগুলো দেখে কী হবে?”
“মানে কী হবে?”
“মানে এগুলো অনেক আগের কথা। যখন আমি আর্ট করতাম।”
“তাহলে এখন আর করো না কেন? তুমি তো সত্যিই খুব সুন্দর আঁকতে পারো। তাহলে তো এতদিনে আরও ভালো একজন আর্টিস্ট হয়ে উঠতে পারতে।”
সূচনা এবার বিছানা থেকে উঠে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এগুলো করে তো কিছুই হয় না। এগুলো শুধু সময় নষ্ট করা।”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“এই কথাটা তোমাকে কে বলেছে?”
সূচনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে প্রনয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করল,
“ছোটবেলায় আমি এসব আঁকতাম। তখন আমি খুব খুশি থাকতাম। সত্যি বলতে, পড়াশোনার চেয়ে আঁকাতেই আমার বেশি ভালো লাগত। এটা ছিল আমার আনন্দের জায়গা।”
সে একটু থেমে আবার বলল,
“আমি সারাটা দিনই ছবি আঁকা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। তখন আমি ছোট ছিলাম, পড়াশোনাও তেমন খারাপ হতো না। পড়াশোনাতে ভালোই ছিলাম। মা–বাবাও কখনো আমাকে ভালো নম্বরের জন্য চাপ দিত না। বাবা তো বরং আমার সব চাওয়া পূরণ করতেন। রং, তুলি, কাগজ সবকিছুই এনে দিতেন। যেন আমি আরও ভালো করে আঁকতে পারি।”
প্রণয় সূচনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর সূচনা আবার বলল,
“কিন্তু যখন আমি হাই স্কুলে উঠলাম, তখন পড়াশোনার চাপ বাড়তে লাগল। ধীরে ধীরে আঁকার সময় কমে গেল। আমার শুধু আঁকতেই ভালো লাগত, কিন্তু মামি বলত এগুলো নাকি কোনো কাজের নয়।”
সূচনার গলা এবার ভার হয়ে আসলো,
“একদিন আমার মামি আরো আত্মীয়ও সবার সামনে বলল এসব করা মানে শুধু সময় নষ্ট করা, কোনো লাভ নেই। মামি বলেছিল এসব করে আমি আমার ভবিষ্যৎ নষ্ট করছি। আর তখন আমি পড়াশোনাতেও অনেক দুর্বল ছিলাম। তাই আমার পরিবারের মানুষজন এবং আমিও এটাই মেনে নিয়েছিলাম। এরপর থেকে ধীরে ধীরে সবাই একই কথা বলতে শুরু করল। আর তারপর থেকেই আমি আর আগের মতো আঁকি না।”
সূচনা খাতাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই খাতাটা আমি শুধু নিজের জন্যই রেখে দিয়েছিলাম। যখন খুব মন খারাপ হতো, তখন এগুলো দেখে থাকতাম। কিন্তু আমি চাই না কেউ এটা দেখুক! এই জন্যই আপনাকে বারবার মানা করছিলাম।”
প্রণয় হঠাৎই থমকে গেল। সূচনার কথাগুলো শুনতে শুনতে ওর ভেতরে অদ্ভুত এক ক্ষোভ জমে উঠছিল। মুখের রেখাগুলো কঠিন হয়ে এলো। প্রণয়ের কাছে বিষয়টা মোটেও সাধারণ মনে হলো না। সবাই যে শুধু পড়াশোনাতেই ভালো করবে, এমন তো কোনো কথা নেই। মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর প্রতিভারও তো আলাদা একটা জগৎ থাকে। সূচনার সেই জগৎ ছিল রঙ, তুলি আর ক্যানভাসে ভরা। অথচ সবাই মিলে ইচ্ছে করেই সেই স্বপ্নটাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলেছে।
গম্ভীর কণ্ঠে, চাপা রাগ লুকিয়ে রেখে প্রণয় বলল,
“আর এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তোমার মামীকে কে দিয়েছে?”
সূচনা এতক্ষণ মাথা নিচু করে ছিল। প্রশ্নটা শুনে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। আর বলল,“মানে?”
“মানে এটা তোমার জীবন, সূচনা। তুমি ছবি আঁকতে ভালোবাসো, তাই তুমি আঁকবে। তোমার সময় নষ্ট হচ্ছে কি হচ্ছে না, সেটা ঠিক করার অধিকার অন্য কারও নেই।”
সূচনা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“এভাবে কেন বলছেন?”
প্রণয়ের চোখে একরাশ দৃঢ়তা।
“তাহলে কীভাবে বলব? এটা তোমার পছন্দ, তোমার ভালোবাসা, তোমার স্বপ্ন। একটা মানুষ তার ভালো লাগার কাজ করলে সেখানে খারাপের কী আছে?”
কথাগুলো বলার পর প্রণয় খেয়াল করল, সূচনার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে বহু বছর ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো একে একে জেগে উঠছে। নরম হয়ে এলো প্রণয়ের দৃষ্টি। ধীরে ধীরে সূচনাকে নিজের বাহুর মাঝে টেনে নিল। সেই স্পর্শ পেতেই বহু পুরোনো স্মৃতিগুলো হঠাৎ করে ফিরে এলো সূচনার মনে। কতদিন আগে হারিয়ে ফেলা রঙ, তুলি আর অসমাপ্ত স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই চোখ দুটো ভিজে উঠল। টলমল জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। আদুরে বিড়ালছানার মতো সে মুখ লুকিয়ে নিল প্রণয়ের বুকে। নাক টেনে কাঁপা কাঁপা শ্বাস ফেলল।
কিছুক্ষণ পর ভাঙা গলায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে… আমার কি আবার আর্ট করা উচিত?”
প্রণয় এক মুহূর্তও সময় নিল না। স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,
“অবশ্যই করা উচিত।”
আলতো করে সূচনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“এটা তোমার ভালো লাগা, তোমার প্যাশন। যে কাজ তোমাকে আনন্দ দেয়, যে কাজ তোমার মনকে শান্তি দেয়, সেই কাজ কখনো ভুল হতে পারে না। তুমি আবার আঁকবে, নতুন করে শুরু করবে। আর তোমার যা যা প্রয়োজন হবে, সব আমি এনে দেব। এবার আর কোনো স্বপ্ন মাঝপথে থেমে থাকবে না।”
প্রণয়ের কথাগুলো শুনে সূচনা চোখ বন্ধ করে ফেলল।
নাজমুল সাহেব একরাশ হতাশা নিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মা আর ছেলের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়েছে, রাফি রাগ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। রাফি কেন রেগে আছে, তার কারণ নাজমুল সাহেব খুব ভালো করেই জানেন। কিন্তু এই সমস্ত ঘটনার ভিড়ে কেন তাকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে, সেটাই তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি কিছু বলার আগেই নিলুফা খাতুন ক্ষোভভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“সবকিছুর জন্য তুমি দায়ী! ছোটবেলায় যদি রাফিকে ওই বাড়িতে যেতে না দিতে, যদি শুধু আমাদের কাছেই রাখতে, তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতো না।”
নাজমুল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কোনো তাড়াহুড়ো না করে টেবিলের ওপর রাখা জগ থেকে গ্লাসে ঠান্ডা পানি ঢাললেন। ধীরে ধীরে পুরো গ্লাসের পানি শেষ করে তারপর স্ত্রীর দিকে তাকালেন। এত বছরের সংসার জীবনে তিনি নিলুফাকে খুব ভালোভাবেই চিনে ফেলেছেন। যখনই কোনো ভুলের মুখোমুখি হতে হয়, তখনই নিলুফা নিজের দোষগুলো আড়াল করে অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চান। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। দৃঢ় স্বরে তিনি বললেন,
“তুমি যা বলছ, তা করলে রাফি হয়তো সত্যিই ভেঙে পড়ত। তুমি আর আমি দুজনেই জানি, ছোটবেলায় ও কতটা অন্তর্মুখী ছিল। মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারত না, বন্ধু বানাতে পারত না, স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারত না। সেই সময় হৃদয় আর সূচনা ওর জীবনে এসেছিল বলেই ও ধীরে ধীরে বদলেছে। মানুষের সঙ্গে মিশতে শিখেছে, নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। এই বিষয়টা নিয়ে তোমার খুশি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তুমি সবসময় নিজের অহংকার আর জেদের বাইরে কিছুই দেখতে চাওনি।”
একটু থেমে তিনি গভীর দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। আর কিছুটা হতাশা নিয়ে বললেন,
“আর আজ যে রাফি বাড়িতে নেই, কোথায় আছে আমরা জানি না, ফোনও বন্ধ করে রেখেছে। এর জন্য আমাকে বা তোমাকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। কিছু ভুল আছে, যেগুলোর দায় আমাদের দুজনেরই স্বীকার করা উচিত।”
কথাগুলো বলে নাজমুল সাহেব আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। ধীর পায়ে ড্রয়িংরুম ছেড়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। নিলুফা খাতুন ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্থিরতা জমে উঠছে। তিনি ভেবেছিলেন, এত কিছু দেখার পর রাফি হয়তো কষ্ট পাবে, আবেগে নরম হয়ে যাবে, শেষ পর্যন্ত তার কথাই মেনে নেবে। কিন্তু সবকিছু যেন উল্টো পথে এগোচ্ছে। ছেলেটা ফোন বন্ধ করে রেখেছে। কোথায় আছে, কার সঙ্গে আছে? কী করছে?কোনো খবরই নেই।
অসহায় উদ্বেগ আর দমিয়ে রাখা ক্ষোভ একসঙ্গে মাথার ভেতর ঘূর্ণিঝড়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগল। নিলুফা খাতুন দুই হাত শক্ত করে মুঠো বাঁধলেন। মনে হলো, পরিস্থিতি যত তিনি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন, ততই সবকিছু হাতের মুঠো থেকে বালুর মতো ফসকে যাচ্ছে।
প্রণয় আর সূচনা কিছুক্ষণ আগেই মির্জা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। সবাই অনেক অনুরোধ করেছিল রাতটা থেকে যাওয়ার জন্য, কিন্তু সূচনার সামনে পরীক্ষা আর প্রণয়ের কাজের ব্যস্ততা। দুটো মিলিয়ে তাদের বিকেলেই বের হতে হয়েছে।
গাড়ির ভেতরে এক প্রশান্ত নীরবতা বিরাজ করছে। রাস্তার দু’পাশের দৃশ্য ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে, আর প্রণয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। পাশে বসে সূচনা আরাম করে চিপস খেতে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকাচ্ছে, আবার কখনো প্যাকেট থেকে চিপস তুলে মুখে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে প্যাকেটটা প্রণয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আপনি খাবেন?”
প্রণয় প্রথমে না বলতে গিয়েও হঠাৎ কী যেন ভেবে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“খেতে তো পারি যদি তুমি আমাকে খাইয়ে দাও।”
সূচনা বিষয়টাকে একদম স্বাভাবিকভাবেই নিল। প্যাকেট থেকে দুটো চিপস বের করে প্রণয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। প্রণয় চিপস মুখে নেওয়ার সময় ইচ্ছে করেই সূচনার আঙুলে হালকা কামড় বসিয়ে দিল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে সূচনা মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল। পরক্ষণেই কটমট করে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে তার বাহুতে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল।
প্রণয় বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“তুমি আমাকে মারলে?”
কথাটা শুনে সূচনাও যেন নিজের কাজটা তখনই উপলব্ধি করল। মুখে বিব্রত হাসি ফুটিয়ে দ্রুত প্রণয়ের বাহুতে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলল,
“ওই… আসলে বুঝতেই পারিনি। পুরনো অভ্যাস তো! ভাইয়াকে এভাবেই হুটহাট মেরে দিতাম। তাই ভুল করে।”
তারপর মিষ্টি হেসে বলল,
“সরি।”
প্রণয়ের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
“ইটস ওকে।”
আরও কিছুক্ষণ পথ পাড়ি দেওয়ার পর তারা মির্জা বাড়িতে পৌঁছে গেল। প্রণয় গাড়িটা সুন্দর করে পার্ক করতেই সূচনা দ্রুত নেমে পড়ল। তারপর গাড়ির পেছনের ব্যাক সিটে রাখা ব্যাগগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে একে একে বের করতে লাগল বড় একটা টেডি বিয়ার, কয়েক বক্স চকলেট আর আরও কিছু উপহারের জিনিস।
দৃশ্যটা দেখে প্রণয়ের মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেল। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“এগুলো এনেছ কেন?”
সূচনা অবাক হয়ে উপহারগুলোর দিকে তাকাল। তারপর হালকা হেসে বলল,
“আশ্চর্য! এগুলো তো ভাইয়া আমাকে উপহার দিয়েছে। আমার বিয়ে হয়েছে বলে দিয়েছে। আমার জিনিস আমি নিয়ে আসব না? এতে এত অবাক হওয়ার কী আছে?”
কথা শেষ করেই সূচনা উপহারগুলো হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। প্রণয় কয়েক মুহূর্ত সূচনার চলে যাওয়া দেখল। তারপর প্রসারিত ভ্রু আরও খানিকটা কুঁচকে বিড়বিড় করে বলল,
“জি না, ওগুলো বিয়ের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়নি। রাফি সাহেব আপনাকে পটানোর মহান উদ্দেশ্য নিয়েই এসব এনেছিল।”
তারপর সূচনার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করল,
“আগে ঘরে যাই। তারপর এই উপহারগুলোর যথাযথ ব্যবস্থা করা হবে।”
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রণয়ের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সোহেলের নাম।
ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সোহেলের চেনা গর্জনমাখা কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
“শালা! বিয়ে করে আমাদের একদম ভুলে গেছিস, তাই না? শুধু নিজের বউকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস!”
প্রণয় শান্ত গলায় বলল,
“তাহলে কি লোকের বউ নিয়ে ঘুরে বেড়াব?”
ওপাশে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো। তারপর সোহেল বিরক্ত স্বরে বলে উঠল,
“দেখ, এত যুক্তি-তর্ক আমি বুঝি না। আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আজকে তোকে ট্রিট দিতেই হবে।”
প্রণয় মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে। বল, কোন রেস্টুরেন্টে যেতে চাস?”
“রেস্টুরেন্টে যাব কেন? আমরা তোর বাড়িতেই আসব। ভাবীর হাতের রান্না খাব।”
কথাটা শোনামাত্রই প্রণয় এমনভাবে কেশে উঠল যেন ভুল করে গলায় কিছু আটকে গেছে। ওপাশ থেকে সোহেল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“বাবা রে! কতবার গোসল করেছিস যে এখনই ঠান্ডা লেগে গেল? এই গরমের মধ্যে এমন কাশি! ছি প্রণয়, ছি!”
তারপর আরো নাটক করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোহেল যোগ করল,
“তোর লজ্জা হওয়া উচিত। একবারও আমাদের মতো হতভাগা সিঙ্গেল বন্ধুদের কথা ভাবলি না। আমরা এখানে একাকীত্বের আগুনে পুড়ে মরছি, আর তুই বউ নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছিস!”
প্রণয় বিরক্ত হয়ে কপাল টিপে বলল,
“ফালতু প্যাঁচাল বাদ দে। মূল কথায় আয়।”
“আরে, মূল কথাই তো বলছি! যাই হোক, আজ রাতে আমরা সবাই তোর বাড়িতে আসছি। ডিনারের আয়োজন থাকবে, আর ভাবি আমাদের জন্য রান্না করবে। ব্যস, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। খোদা হাফেজ!”
কথা শেষ করেই সোহেল আর কোনো সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিল। প্রণয় কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুকের ভেতর থেকে। নতুন এক বিপদ হঠাৎ করেই প্রণয়ের ঘাড়ে এসে চেপে বসেছে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, তার প্রিয়তমা স্ত্রী অনেক কাজেই পারদর্শী হতে পারে, কিন্তু রান্নাঘরের সঙ্গে সূচনার সম্পর্ক এখনো খুব একটা মধুর নয়। বরং রান্না করার চেয়ে রান্নাঘরে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার সম্ভাবনাই বেশি। আর এদিকে তার ওই অখাদ্য বন্ধুর দল রাতেই হাজির হবে, তাও আবার বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে আসবে সব কয়টা!
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৯
বন্ধুদের কথা মনে হতেই প্রণয়ের মাথা আরও ভারী হয়ে উঠল। তাদের খাওয়ার আগ্রহের চেয়ে তার বেশি চিন্তা হচ্ছিল তারা খাওয়ার পর বেঁচে ফিরবে তো? যে মেয়ে এখনো রান্নাঘরের অর্ধেক উপকরণের নামই ঠিকমতো জানে না, লবণ আর চিনির ডিব্বা আলাদা করতে দু’বার ভাবতে হয়, সে আবার এতগুলো মানুষের জন্য রান্না করবে কীভাবে? প্রণয়ের তো মনে হচ্ছিল, বন্ধুদের ডিনারের আয়োজন করার চেয়ে আগে অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর হাতের কাছে রাখা বেশি জরুরি!
