প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৯
insia isha chowdhury
দু’জন নর-নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা নাকি অনৈতিক কাজে লিপ্ত ছিল। এমনটাই দাবি শাহাদাতনগরের গ্রামবাসীদের। আর সেই অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছে মুরাদ ও তার সহধর্মিণী, যারা কুঁড়েঘরে বসবাস করে। বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। চারপাশের অন্ধকারও ধীরে ধীরে কেটে গিয়ে এখন সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগের সেই গুমোট, ভয়ংকর পরিবেশের আর কোনো চিহ্ন নেই। অথচ এই স্বস্তির আবহের মাঝেই এক বিশাল গাছের দুই পাশে রাফি ও ঋতুকে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে গ্রামবাসীরা।
গ্রামের মোড়ল তখনও এসে পৌঁছাননি। তাই বিচারও শুরু হয়নি। ঋতু শোকে পাথর হয়ে গেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়িয়ে গেল, কীভাবে এত বড় একটা বিপদের মধ্যে পড়ে গেল কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। সারাদিনে পেটে একটুকরো খাবারও পড়েনি। তার ওপর বৃষ্টিতে ভিজে শরীরের কাপড়চোপড় সব ভিজে জবজবে হয়ে আছে। ফলে দুর্বল শরীরটা আরও নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে রাফিও কিছুক্ষণ আগেই নিজের সমস্ত রাগ উজাড় করে গ্রামবাসীদের বোঝানোর চেষ্টা করেছে তার আর ঋতুর মধ্যে এমন কিছুই ঘটেনি। তারা কোনো অনৈতিক বা খারাপ কাজে লিপ্ত ছিল না। শুধুমাত্র বিপদের কারণে তারা কুঁড়েঘরের ভেতর আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু কেউই তার কথায় কর্ণপাত করেনি।
অবশেষে ক্ষোভে রাফিও চুপ করে গেছে।
কিছুক্ষণ পর গ্রামের মোড়ল এসে পঞ্চায়েতে উপস্থিত হলেন। তাকে দেখেই চারপাশের লোকজন হইচই করে পুরো ঘটনাটি খুলে বলতে শুরু করল। সবাই নিজেদের মতো করে অভিযোগ জানাতে লাগল। এর মাঝেই রাফি আর নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে বলে উঠল,
“দেখুন, আপনারা যেভাবে ভাবছেন, আসলে তেমন কিছুই হয়নি। আমরা দুজন একটা বিপদে পড়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। মেইন রোডের পথ আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেই কারণেই বাধ্য হয়ে এখানে এসেছিলাম।”
রাফির কথা শেষ হতেই ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বয়স্ক মুরুব্বি তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠলেন,
“তোমাগো মতো পোলাপানরে আমরা ভালো মতোই চিনি। আকাম করবা, আবার ধরা পড়ার পর মিছা কথা কইবা! আমাগো সামনে এইসব চালাকি কইরো না।”
ঋতু অসহায় কণ্ঠে বলল,
“দেখুন, আমরা কেউ মিথ্যা কথা বলছি না। আমরা সত্যিই বিপদে পড়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এর বাইরে আমাদের মধ্যে আর কিছুই হয়নি। দয়া করে আমাদের ছেড়ে দিন।”
ঋতুর কথা শেষ হওয়ার আগেই এক বৃদ্ধা মহিলা নাক সিটকে বললেন,
“এই যুগের মাইয়াগুলার আবার লজ্জা-শরম কই? হাতেনাতে ধরছি, আবার কতো ঢংয়ের কথা কইতেছে!”
সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন মুরুব্বি বলে উঠলেন,
“ঠিক কইছেন! মাইয়া মানুষ যদি আগাইয়া যায়, তাইলে পুরুষ মানুষরে দোষ দিয়া লাভ কী? দুইজনেরই লজ্জা-শরম নাই। আমার ঘরে এমন মাইয়া থাকলে গলা টিপা মাইরা ফেলতাম!”
লোকটি এবার ঋতুর দিকে আরও কয়েক পা এগিয়ে এসে কুরুচিপূর্ণ স্বরে বলল,
“মাইয়া মানুষের লজ্জা-শরমই তো সব। অথচ আকাম কইরা এখন আবার গলা ফাটাইয়া কথা কয়! লজ্জায় তো মাটির নিচে ঢুইকা যাওয়ার কথা। কও তো দেখি, এত উত্তেজনা কই থেইকা আইল?”
কথাগুলো শুনে ঋতুর শরীরটা অবশ হয়ে গেল।
সে কী উত্তর দেবে, কীভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করব? কিছুই বুঝতে পারল না। এত মানুষের সামনে এমন অপমানজনক কথা শুনে তার বুকটা ফেটে যেতে লাগল। চোখের কোণ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু রাফির ভেতরটি আগুনে জ্বালিয়ে দিল। সে ক্ষোভে চিৎকার করে উঠল,
“আপনাদের কোনো অধিকার নেই এইসব নোংরা কথা বলার! আর ভুলেও যদি কেউ আর একটা উল্টাপাল্টা কথা বলেন, তাহলে কিন্তু আমি কাউকে ছাড়ব না!”
রাফির গর্জনে মুহূর্তের জন্য চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। গ্রামের মোড়ল এতক্ষণ নীরবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন। মুরাদ ও তার স্ত্রী দুজনেই তাদের চোখে দেখা ঘটনা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছে। তার ওপর রাফি ও ঋতু দুজনই বাইরের মানুষ—এই বিষয়টিও গ্রামবাসীদের সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে মোড়ল অবশেষে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“আমি বহুত ভাবিয়া-চিন্তিয়া দেখিয়াছি। এই দুই নর-নারীর এই মুহূর্তে বিবাহ দিয়া দেওয়াই উত্তম।”
মোড়লের সিদ্ধান্ত শুনে চারপাশে গুঞ্জন উঠল।
কেউ কেউ এই বিচারে সন্তুষ্ট হলো। আবার কয়েকজন মনে করল, তাদের আরও কঠিন শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু মোড়ল যখন রায় দিয়ে দিয়েছেন, তখন আর কেউ প্রকাশ্যে আপত্তি করার সাহস পেল না। অন্যদিকে নিজেদের বিয়ের কথা শুনে রাফি আর ঋতু দুজনেরই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
রাফি দড়ির বাঁধন খুলতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে বলল,
“দেখুন, আপনারা সম্পূর্ণ ভুল করছেন! আমরা এমন কোনো কাজ করিনি যে আপনারা আমাদের জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবেন!”
কিছুক্ষণ আগেও দুর্বলতার কারণে যে ঋতু ঠিকমতো কথা বলতে পারছিল না, বিয়ের কথা শুনতেই যেন তার শরীরের সমস্ত দুর্বলতা মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। রাফি নামের এই জঙ্গলটার সঙ্গে তার বিয়ে হবে ভাবতেই তার গা শিউরে উঠল। রাগে তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। সে চিৎকার করে বলল,
“আপনারা কোন অধিকারে এমন বিচার দিচ্ছেন? আমরা কোনো খারাপ কাজ করছিলাম না। শুধুমাত্র একটা দৃশ্য দেখে আপনারা আমাদের সম্পর্কে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অনেক সময় চোখের দেখাও ভুল হতে পারে। আর আজ ঠিক সেটাই হয়েছে।”
ঋতু আবার ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আর আমি এই রাফি নামের জঙ্গলটাকে বিয়ে করতে চাই না! এর মতো একটা মানুষকে বিয়ে করার চেয়ে আমি সারা জীবন কুমারী থাকতেও রাজি। অন্তত শান্তিতে তো থাকতে পারব!”
ঋতুর কথা শুনে গাছের অপর প্রান্ত থেকে রাফিও
ক্ষিপ্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,
“আমিও এই ঝামেলার বস্তাকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে বসে নেই! পৃথিবীতে যদি এই মেয়েটাই শেষ নারী হয়, তবুও আমি ওকে বিয়ে করব না। প্রয়োজনে সারা জীবন অবিবাহিত থাকব, তবুও এই ঝামেলার রানীকে বিয়ে করব না!”
ঋতু সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা চিৎকার করে বলল,
“আমি কিছুতেই ওকে বিয়ে করতে চাই না! আমি মরতে চাই না! জীবনে কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি, আমাকে এই জঙ্গলটাকে বিয়ে করতে হবে!”
রাফিও আগুনে ঘি ঢালা অবস্থায় বলে উঠল,
“আর আমিও কোনোদিন এই মেয়েকে বিয়ে করা তো দূরের কথা, এক মিনিটও ওর সঙ্গে থাকতে চাই না!”
দুজনকে এমনভাবে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে যে গাছের দুই পাশে তারা ছিল। একজন আরেকজনকে দেখতে পাচ্ছিল না, শুধু একে অপরের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল। তাদের এমন তর্ক-বিতর্ক আর চিৎকারে শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে মোড়ল রাগী গলায় আদেশ দিলেন,
“চুপ কর!”
মুহূর্তেই একজন গ্রামবাসী হাতে থাকা লাঠি দিয়ে রাফির বাহুতে সজোরে আঘাত করল। মুহূর্তেই
মৃদু আর্তনাদ করে উঠল রাফি। রাফিকে আঘাত করা হয়েছে শুধু তার কণ্ঠস্বর শুনেই ঋতু মুহূর্তে নিশ্চুপ হয়ে গেল। এরপর মোড়লের নির্দেশে দুজনের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো। ঋতু মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে গিয়ে মোড়লের সামনে দাঁড়াল। চোখে তখন টলমল করছে অশ্রু। কাঁপা কণ্ঠে মিনতি করে বলল,
“প্লিজ, ওনাকে আর মারবেন না। দয়া করে ছেড়ে দিন। আমরা কোনো খারাপ কাজ করছিলাম না। আমাদের বিশ্বাস করুন। আমাদের মুক্ত করে দিন। আমরা এখান থেকে চলে যাব।”
মোড়ল ঋতুর দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে শুধু বললেন,
“বিয়াটা পড়াইয়া তোমাগো এই গ্রাম থেইকা বাইর কইরা দেওয়া হইব।”
কথাটা শুনে ঋতু আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। নীরবে অশ্রু ঝরতে লাগল তার চোখ বেয়ে।
ঋতু মাটির ওপর নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। চারপাশের মানুষের কটূক্তি আর অপমানজনক কথাগুলো তার কানে আসছে। ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে ভেসে এলো একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর—
“ঋতু আম্মু?”
পরিচিত কণ্ঠ শুনে ঋতু ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। চোখের পানিতে ঝাপসা দৃষ্টির মাঝেও পরিচিত মানুষটিকে চিনতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। ফখরুল ইসলাম। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। একই সঙ্গে ঋতুর বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও তাদের পরিবারের অত্যন্ত পরিচিত একজন মানুষ। একটি মামলার তদন্তের কাজে ফখরুল সাহেব এ এলাকায় এসেছিলেন। কিন্তু নিজের বাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে এসে এমন একটি সালিশে বন্ধুর মেয়েকে মাটিতে বসে থাকতে দেখবে এটা তিনি কল্পনাও করেননি।
ঋতুকে এভাবে দেখে মুহূর্তের জন্য তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। বিস্মিত চোখে তিনি একবার চারপাশের মানুষের দিকে তাকালেন। তারপর আর কারও দিকে না তাকিয়ে দ্রুত ঋতুর কাছে এগিয়ে গেলেন। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
“ঋতু আম্মু, তুমি এখানে কী করছ? আজ তো তোমার বিয়ে ছিল, তাই না?”
ফখরুল সাহেবের মুখে কথাটা শুনে আশপাশের কয়েকজন গ্রামবাসী একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। তাঁদের মধ্যে একজন বিদ্রূপের হাসি হেসে বলে উঠল,
“দেহছেন কাণ্ড! এই মাইয়া নিজের বিয়া থেইকা ভাইগা আইছে। নিজের নাগরের লগে আকাম-কুকাম করার লাইগা আইছে। এখন আবার বড় সাহেব আইসা জিগাইতেছে, কী করছে!”
কথাগুলো ঋতুর বুকের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন করে দিল। ফখরুল সাহেবের সঙ্গে ঋতুর পরিচয় আছে এটা বুঝতে পেরে গ্রামবাসীদের কেউ কেউ যেন আরও উৎসাহ পেয়ে গেল। চারদিক থেকে আবারও নানা ধরনের কটূক্তি ভেসে আসতে লাগল।
“বড়লোকের মাইয়া হইলে কী হইছে? কাজ তো করছে খারাপই!”
“এহন আবার পুলিশ সাহেব আইছে বাঁচাইতে!”
“মাইয়াডা কী কাণ্ডটাই না করছে!”
প্রতিটি কথা ঋতুর কানে তীরের মতো বিঁধছিল।
সে কাঁপতে কাঁপতে ফখরুল সাহেবের হাতটা আঁকড়ে ধরল। গলা দিয়ে কোনো কথা বের করতে গিয়েও কয়েকবার থেমে গেল। অবশেষে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“আঙ্কেল… প্লিজ, আমাদের বাঁচান।”
ফখরুল সাহেব কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে ঋতুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে থামল একটু দূরে বসে থাকা রাফির ওপর।
ছেলেটাকে দেখে তাঁর ভ্রু কুঁচকে গেল।
কেমন নিস্তেজ হয়ে আছে।
ফখরুল সাহেবের চোখেমুখে কঠোরতা নেমে এলো। তিনি প্রথমে রাফির দিকে, তারপর ঋতুর দিকে তাকালেন। এরপর ধীর পায়ে মোড়ল সাহেবের কাছে গিয়ে কিছু বোঝানোর চেষ্টায় কিছু বলবে তার আগেই মোড়ল সাহেব কঠোর গলায় জানিয়ে দিলেন,
“বিয়ে হইবই। এইডাই শেষ কথা।”
অবশেষে পরিস্থিতির কাছে শিকার হয়ে মেয়ের বাড়ির পক্ষ থেকে ফখরুল সাহেবকে সাক্ষী রাখা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজী সাহেব সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি মেয়ে ও ছেলের পরিবারের পরিচয়, নাম-ঠিকানা এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে নিলেন। রাফি আর ঋতুকে সেই বিচারের জায়গায় মাদুরী পেতে দুই পাশে দুইজনকে বসানো হয়েছে। অবশেষে কাজী সাহেব বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন। কাজী সাহেব খাতা খুলে বলতে শুরু করলেন,
“আমি সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি আপনি কি আপনার পিতা আরিফুল মির্জার
ছোট কন্যা সিদরাতুল ঋতু মির্জা, মোহর ধার্য ২০ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করে মোহাম্মদ নাজমুল খান এর একমাত্র পুত্র রাফি খানকে শরীয়তসম্মতভাবে বিবাহ করতে কবুল করছেন? যদি আপনি এই বিয়েতে রাজি থাকেন তবে বলুন আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”
কাজী সাহেবের কথা শেষ হওয়ার পরও ঋতু চুপ করে রইল। ঋতুর পাশে থাকা কিছু মহিলারা ফিসফিস করে বলতে শুরু করলো, “কবুল বল মাইয়া।”
ঋতু এবার ঝাপসা চোখে একটু তার আঙ্কেলের দিকে তাকালো। ওর মাথায় ওর লেহেঙ্গার ওড়না দেওয়া। ঋতু মনে মনে ভাবলো,
“শেষে কিনা আমাকে এই জঙ্গলে দাঁড়িয়ে রাফি নামক এই জঙ্গলকে বিয়ে করতে হলো!”
তারপর কাঁপা কাঁপা স্বরে উচ্চারণ করল,
“আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”
সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলল। তারপর কাজী সাহেব আবার বলতে শুরু করলেন,
“আমি সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি আপনি কি আপনার পিতা নাজমুল খান এর একমাত্র পুত্র, রাফি খান মোহর ধার্য ২০ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করে আরিফুল মির্জার ছোট কন্যা সিদরাতুল ঋতু মির্জা কে শরীয়তসম্মতভাবে বিবাহ করতে কবুল করছেন? যদি আপনি এই বিয়েতে রাজি থাকেন তবে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
রাফি ধীরে ধীরে নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। আজকে সারা দিনের ঘটনা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। অবশেষে অনেক কষ্টে রাফি উচ্চারণ করল,
“আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”
অন্যদিকে, মির্জা বাড়িতে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ বিষণ্ণতা। রাত প্রায় এগারোটা। এতটা সময় পেরিয়ে গেলেও ঋতু এখনো বাড়ি ফেরেনি। সময় যত গড়িয়ে যাচ্ছে, পরিবারের প্রত্যেকের বুকের ভেতর আশঙ্কার কালো মেঘ ততই ঘনীভূত হচ্ছে।
মেয়ের চিন্তায় কাঁদতে কাঁদতে শায়লা খাতুনের অবস্থা ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়ার মতো। কিছুক্ষণ আগেই রবিন ও প্রণয় থানায় গিয়ে ঋতুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে মামলা করে এসেছে। কিন্তু মামলা করেও দুশ্চিন্তার কোনো অবসান নেই।
প্রণয় একে একে ঋতুর সব বান্ধবীকে ফোন করেছে। প্রত্যেকের কাছেই একই প্রশ্ন করেছে, “ঋতু কি তাদের সঙ্গে আছে? কেউ কি জানে সে কোথায়?”
কিন্তু কারও কাছ থেকেই মেলেনি কোনো আশার খবর। শুধু কিয়ারা জানিয়েছিল, আজ ঋতুর তার বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঋতু সেখানে যায়নি। অজানা আশঙ্কায় প্রণয়ের বুকটা ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছিল। কিছুক্ষণ আগেও যে বাড়িটা বিয়ের আনন্দ ছিল সেই বাড়িটাই এখন শোকে পাথর হয়ে গেছে। রবিন ও প্রণয় বাড়িতে ঢুকতেই ড্রয়িংরুমে বসে থাকা শায়লা খাতুন ছুটে এসে ছেলের সামনে দাঁড়ালেন। উৎকণ্ঠায় কাঁপতে থাকা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“বাবা, কোনো খোঁজ পেয়েছিস? আমার মেয়েটা কোথায়?”
প্রণয় মায়ের দিকে তাকাল না। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি নেমে গেল মেঝের দিকে। ছেলের এই নীরবতাই যেন শায়লা খাতুনের বুকটা আরও ভেঙে দিল।
“আমার মেয়ে কোথায় গেল, প্রণয়?”
কথাটা শেষ করেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।
সূচনা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ছুটে গিয়ে শায়লা খাতুনকে জড়িয়ে ধরল। নিজের চোখের পানিও আর আটকে রাখতে পারল না সে।অন্যদিকে, সুপ্তি এতক্ষণ আতঙ্কে ছিল ঋতু বাড়ি ফিরলেই যদি সবাই জেনে যায় সে কী করেছে! এমনিতেই বাড়িতে এসব হওয়ার পর পরিবারের কেউ তার সঙ্গে ভালো করে কথা বলছে না। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের কথা না ভেবে সুপ্তি শুধু ঋতুর জন্য চিন্তা করছে। রিমা নিজের ছেলেকে নিয়ে বসে থেকে গুনগুন করে কাঁদছে। রিমা ঋতুকে নিজের ননদ কম বড় ছোট বোন হিসেবে অনেক ভালোবাসে। এই দম বন্ধকরা পরিস্থিতিতে কেউ ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।
প্রণয় আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। কোনো কথা না বলে অস্থির পায়ে সোজা উপরে উঠে গেল।
প্রণয়কে এভাবে অস্থির হয়ে চলে যেতে দেখে কিছুক্ষণ পর সূচনাও ধীরে ধীরে তার পিছু নিল। প্রণয় কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। কণ্ঠে তীব্র অস্থিরতা। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো আশার খবরই আসছিল না। একসময় বিরক্তি, অসহায়ত্ব আর রাগে প্রণয় ফোনটা ছুড়ে ফেলল। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করছিল সূচনা। ছিটকে আসা ফোনটা গিয়ে সজোরে তার পায়ে লাগল। মৃদু আর্তনাদ করে উঠল সূচনা। প্রণয় মুহূর্তেই চমকে গেল। ছুটে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ব্যথা পেয়েছ?”
সূচনার পায়ে ফোনের আঘাত লেগে বেশ ব্যথা পেয়েছে। চোখের কোণে পানিও জমে উঠেছে। তবুও সে কষ্ট লুকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “না।”
প্রণয় আর কিছু না শুনে তাকে কোলে তুলে নিল। তারপর খাটের ওপর আলতো করে বসিয়ে দিল।
সূচনার বুকের ভেতর এতক্ষণ ধরে জমে থাকা কষ্টটা এবার আর সামলাতে পারল না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
“সকালে সকালে ঋতু আমাকে বলেছিল…”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কী বলেছিল?”
“এই সবকিছুর কথা… বিয়ে নিয়ে যা কিছু হয়েছে, সবকিছু। কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। যদি তখনই ওর কথাগুলো বুঝতে পারতাম, তাহলে হয়তো ঋতুকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হতো না। আজ এত বড় একটা বিপদও হতো না।”
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় গলা ভারী হয়ে এলো তার। “সব দোষ আমার…”
প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে সূচনাকে নিজের বুকে টেনে নিল। এক হাত দিয়ে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল।
“না, জান। তোমার কোনো দোষ নেই। তুমি তো কিছুই জানতে না।”
ঠিক তখনই নিচ থেকে ভেসে এলো চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ। প্রণয় ও সূচনা দুজনেই চমকে উঠল। দ্রুত নিচে নেমে এলো তারা। নিচে এসে দেখা গেল, শায়লা খাতুন আর নিজেকে সামলাতে পারছেন না। এর আগেও তারা এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। আর এবার আবারও একইভাবে মেয়েকে হারানোর আতঙ্ক তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রাগ, ক্ষোভে শায়লা খাতুন ঘরের জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলতে শুরু করলেন।
“আমি আর পারছি না! আর পারছি না এইসব সহ্য করতে!”
আরিফুল মির্জা বারবার তাকে থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন। সোহেল পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী বলবে, কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
বরপক্ষের বাড়ি থেকে প্রায় সবাই চলে গেছে। শুধু সোহেল আছে। যখন প্রণয় বাড়িতে এসেছিল তখন ড্রয়িং রুমে সোহেল ছিল না কিন্তু এমন সময় সোহেলকে দেখতে পেয়ে প্রণয়ের ভেতরে জমে থাকা সমস্ত রাগ বিস্ফোরিত হলো। সে ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে সোহেলের কলার চেপে ধরল।
“তুই যদি ঋতুকে ওই ফালতু আইডিয়াটা না দিতিস, তাহলে আজ আমার বোন বাড়ির বাইরে থাকত না!”
সোহেল কিছু বলার আগেই হঠাৎ ভেসে এলো তামজিদের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর,
“আমার ফুপি! আমার ফুপি চলে এসেছে!”
ছোট্ট তামজিদ ছুটে গেল দরজার দিকে।
অনেকক্ষণ ধরে ফুপির জন্য কেঁদেছে সে। আর ঋতুকে চোখের সামনে দেখেই মুহূর্তের মধ্যে তামজিদ খুশি হয়ে গেল। ঋতু তামজিদকে দেখেই তাকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল।
ছোট্ট ছেলেটাকে বুকে আগলে দাঁড়াতেই ঘরের প্রত্যেকের দৃষ্টি একসঙ্গে দরজার দিকে গিয়ে আটকে গেল। শায়লা খাতুন নিজের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। তিনি ছুটে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। বারবার মেয়ের কপাল, গাল আর চোখে চুমু দিতে লাগলেন।
“আমার সোনা… তুই ঠিক আছিস?”
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই ঋতুকে ঘিরে দাঁড়াল।
এতক্ষণ যে বাড়িটা শোকে ডুবে ছিল, মুহূর্তের জন্য সেখানে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে এলো। সোহেলও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখ আটকে গেল ঋতুর গলায় ঝোলানো বড়সড় একটি মালার দিকে। সেটা দেখে সোহেলের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ঋতুকে দরজার সামনে থেকে একটু সরিয়ে আনতেই সবাই দেখতে পেল ঋতুর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরও দুজন।
একজন ফখরুল ইসলাম। আর তার পাশে রাফি।
তবে রাফিকে দেখে মনে হচ্ছিল, তাকে স্বেচ্ছায় এখানে আনা হয়নি। বরং জোর করে ধরে, প্রায় বেঁধেই নিয়ে আসা হয়েছে। তার হাতেও ছিল একটি মালা। রাফিকে এভাবে নিজের বাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সূচনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
সে অবাক হয়ে বলল,
“ভাইয়া! তুমি এখানে কী করছ? আজ না তোমার টিনার সঙ্গে এনগেজমেন্ট ছিল?”
প্রশ্নটা শুনে ঘরের প্রত্যেক সদস্যের দৃষ্টি এবার রাফির দিকে স্থির হলো। এক মুহূর্তের জন্য পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তখন ফখরুল ইসলাম গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“রাফি আর ঋতুর বিয়ে হয়েছে।”
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৮
কথাটা ঘরের ভেতর বিস্ফোরণের মতো আঘাত করল। প্রণয় চোখ বড় বড় করে হুংকার দিয়ে উঠল, “হোয়াট?!”
এক মুহূর্তেই যেন সবার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল। কেউ কথা বলার ভাষা খুঁজে পেল না।শায়লা খাতুন স্তব্ধ। আরিফুল মির্জা নির্বাক। সূচনা হতভম্ব। আর সোহেল তার মাথাটা সত্যিই হ্যাং হয়ে গেল। কিন্তু এমন এক সিরিয়াস মুহূর্তেও সোহেলের স্বভাবসুলভ অভ্যাস আর গেল না। সে ধীরে ধীরে রাফির দিকে এগিয়ে গিয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তো, মিস্টার রাফি… আপনি শেষমেশ সুজিকে ছেড়ে পায়েসে মুখ দিয়েই দিলেন?”
