Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৩
সুমাইয়া ইসলাম নূর

রাতের নরম আবরণে ঢেকে গেছে পুরো শহর। গুলশানের ব্যস্ত রাস্তাগুলো এখনও আলোয় ঝলমল করছে। রাস্তার দুই পাশের গাছগুলো হালকা বাতাসে দুলছে, আর দূরে দূরে গাড়ির হেডলাইটগুলো যেন আলোর মালা হয়ে ছুটে চলেছে।তুবার অভিমান ভাঙানোর জন্য কান ধরে উঠবস করতে থাকা রাজ্যের অবস্থা দেখে ইনায়া আর পিয়াসা আর নিজেদের সামলাতে পারল না।
হাসতে হাসতেই ইনায়া বললো
বাহ ভাইয়া! শেষ পর্যন্ত এইসবও দেখতে হলো!
পিয়াসা চোখের কোণ মুছতে মুছতে বললো সত্যি ভাইয়া,তোমার এমন অবস্থা কোনোদিন দেখব ভাবিনি!রাজ্য বেচারা মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বললো না মানে… ইয়ে… ওই…আর কি
এই পিচ্চি পোলাপানদের সাথে মিশে একটু উন্নতি হইছে আর কী!কথাটা শুনে তুবা চোখ বড় বড় করে তাকাতেই পিয়াসা আর ইনায়া আবারও হেসে উঠল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে বললো আচ্ছা, অনেক হয়েছে। কখন যাবি তোরা?
বাচ্চারা অপেক্ষা করছে আমি খাবার আর গিফট গুলো আগেই পাঠিয়ে দিয়েছি ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে সিরিয়াস হয়ে গেল।
— হ্যাঁ ভাইয়া, চলো।
এরপর চারজন গাড়িতে উঠে রওনা হলো “আদরের আশ্রয়”-এর উদ্দেশ্যে

বেশ কিছু সময় পর ইনায়া, পিয়াসা, তুবা আর রাজ্য এসে পৌঁছালো আদরের আশ্রয়ে।
আশ্রমের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেকটাই শান্ত। কয়েকদিন আগেও যেখানে অসুস্থ শিশুদের কান্না আর উদ্বেগের ছাপ ছিল, সেখানে এখন ধীরে ধীরে স্বস্তির ছায়া ফিরতে শুরু করেছে।বাচ্চাগুলো আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ।তবুও বিষয়টা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।একসাথে এতগুলো শিশু কীভাবে জ্বরে আক্রান্ত হলো, সেটার কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।রাজ্য আশ্রমের অফিস রুমে ঢুকেই কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মীর সাথে আলোচনা শুরু করল।
তার কণ্ঠে ছিল দায়িত্বের দৃঢ়তা।আমি চাই একটা স্থায়ী মেডিকেল টিম তৈরি করতে। কয়েকজন ভালো শিশু বিশেষজ্ঞ, একজন মেডিসিন কনসালট্যান্ট আর দুজন নার্স নিয়মিত এখানে আসবে।
বাচ্চাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হবে নির্দিষ্ট সময় পরপর।
যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।উপস্থিত সবাই রাজ্যের সিদ্ধান্তে সম্মতি জানাল।কারণ তারা জানে, রাজ্যে শুরু থেকে এই বাচ্চাগুলোকে কিভাবে আগলে রেখেছে।
বাচ্চাদের অবস্থা বেশি খারাপ হয়নি।
তাই কাউকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়নি।

আশ্রমেই চিকিৎসা চলবে।ঠিক তখনই আশ্রমের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল রিটা।রিটাকে দেখেই ইনায়া এগিয়ে গেল।হালকা বিরক্তির ভান করে বললো বলো তো রিটা, তোমাদের কতবার বলেছি?
সবসময় আমাকে ফলো করতে হবে না। আমি নিজেই নিজেকে সেভ করতে পারব। আর তুমিই তো নিজের হাতে আমাকে সবকিছু শিখিয়েছো।
তাহলে এত ভয় পাও কেন?রিটা সম্মান নিয়ে মাথা নিচু করল।তারপর শান্ত গলায় বলল—
ম্যাম, স্যার আমাদের সবসময় আপনার আশেপাশে থাকতে বলেছেন। আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো ঝুঁকি নিতে তিনি রাজি নন।
ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রিতা মৃদু হেসে আবার বললো ম্যাম, আমরা শুধু আপনার নিরাপত্তাকর্মী নই। একজন বডিগার্ডের কাছে তার দায়িত্ব শুধু চাকরি না, একটা অঙ্গীকারও। আমরা জানি আপনি নিজের খেয়াল রাখতে পারেন।কিন্তু বিপদ কখন, কোন দিক থেকে আসে সেটা তো আগে থেকে বলে আসে না।
সে আবার বললো একটা ছায়া যেমন নীরবে মানুষের পাশে থাকে, ঠিক তেমনই আমাদের কাজ আপনার পাশে থাকা। আপনি নিরাপদ থাকলে তবেই আমরা আমাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারি। আর সত্যি বলতে কি ম্যাম…
আপনার কিছু হলে স্যার আমাদের বাঁচিয়ে রাখবেন না। আর আপনা বড় চাচ্চু লিখন চৌধুরী ও
আমাদের কঠোর ভাবে সতর্ক থাকতে বলেছেন জানিনা কেন আজ ওনাদের অন্যরকম লাগলো

আশ্রমের বাগানে ঝুলে থাকা ছোট ছোট বাতিগুলো মিটমিট করে জ্বলছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আর আশ্রমের ভেতরে বহুদিন পর শিশুদের হাসির শব্দে প্রাণ ফিরে এসেছে পুরো পরিবেশে।ইনায়া, পিয়াসা আর তুবাকে ঘিরে বাচ্চাগুলো যেন একদম ছেড়েই দিতে চাইছে না।কেউ ইনায়ার হাত ধরে টানছে।
কেউ পিয়াসার কোলে উঠে বসেছে।
পিয়াসা এক বাচ্চাকে কোলে নিয়ে গল্প বলছে।
ইনায়া কয়েকজনকে নিয়ে ছবি আঁকছে।
আর তুবা?সে নিজেও বাচ্চাদের সাথে বাচ্চা হয়ে গেছে।একবার দৌড়ে পালাচ্ছে, আবার একদল বাচ্চা তাকে ধাওয়া করছে।সবার মুখে হাসি।
রাজ্য দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে তার পিচ্চি কে দেখছে।
মনে মনে বলল দেরিতে হলেও আল্লাহ তুমি আমাকে সবথেকে বেশ একজন পার্টনারকে আমার জীবনে দিয়েছো।
ঠিক সেই সময় রাজ্যের ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
হাসপাতাল থেকে জরুরি কল।ফোনে কয়েক সেকেন্ড কথা বলেই রাজ্য দ্রুত ইনায়াদের দিকে এগিয়ে এলো।পিয়াসা, আমাকে এখনই যেতে হবে।
একটা ইমারজেন্সি রোগী এসেছে।
তারপর তুবার দিকে তাকিয়ে বললোআমি তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যেতাম।কিন্তু তুবা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলল—

— না।
— আমি যাব না।
— আমরা তিনজন একসাথে আরেকটু বাচ্চাদের সাথে থাকব।ইনায়াও সঙ্গে সঙ্গে বললো হ্যাঁ ভাইয়া।
বেবি থাক।অনেকদিন পর পাখিগুলো আমাদের পেয়েছে।রাজ্য বেচারা চারপাশে তাকিয়ে বুঝল এখন তর্ক করে কোনো লাভ নেই।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো ঠিক আছে।আমি যাচ্ছি।
এরপর সে রিটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।গম্ভীর কণ্ঠে বললো তোমরা ওদের একা ছাড়বে না। সবসময় চোখে চোখে রাখবে।রিটা মাথা নেড়ে বললো জি স্যার।তারপর রাজ্য আবার ইনায়াদের দিকে ফিরে এলো।পিচ্চিকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাস। আমি আসছি।আর শোন সাবধানে যাবি কিন্তু। বাসায় পৌঁছে সবাই কল দিবি।
তুবা এখনও মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একটাও কথা বলল না।

ইনায়া কে বললো ওনাকে বলে দে, আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।উনি বরং উনার পিচ্চিদের নিয়ে ভাবুক।কথাটা বলে তুবা মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালেও ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
রাজ্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই আবার হাসপাতাল থেকে ফোন এলো।
ফোনের ওপাশে পরিস্থিতি সম্ভবত আরও জরুরি।
রাজ্য আর সময় নষ্ট করল না।দ্রুত গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে শুধু বললো রিটা ওদের সবাইকে সাবধানে পৌঁছে দিয়ো। আর কোনো ঝামেলা যেন না হয়।আমি পরে ফোন করছি।
কয়েক মুহূর্ত পর গাড়ির আলো দূরে মিলিয়ে গেল।
রাজ্য চলে যাওয়ার পর আবার বাচ্চাদের মাঝে মিশে গেল তিনজন।আশ্রমের উঠান জুড়ে ছুটে বেড়াতে লাগল সবাই।পিয়াসা এক কোণে বসে কয়েকজন শিশুকে গল্প শোনাচ্ছিল।তার গল্প শুনে বাচ্চাগুলো কখনো হেসে উঠছে, কখনো অবাক হয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকছে।
একসময় একটি ছোট্ট ছেলে চুপচাপ এসে পিয়াসার পাশে বসে বলল—আপু তোমরা চলে গেলে আবার আসবা তো?প্রশ্নটা শুনে মুহূর্তের জন্য সবাই থমকে গেল।পিয়াসা ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে বললো অবশ্যই আসব। বারবার আসব।
কারণ তোমরা তো আমাদের পাখি।
ছেলেটা তখন নিঃশব্দে পিয়াসার হাত জড়িয়ে ধরল।
সেই দৃশ্য দেখে ইনায়া, তুবা, এমনকি রিতার চোখেও এক অদ্ভুত কোমলতা নেমে এলো।

গভীর রাত ধীরে ধীরে চৌধুরী ভিলার চারপাশকে নিজের আঁধারে জড়িয়ে নিচ্ছে। দূরের আকাশে ছড়িয়ে থাকা তারাগুলোও যেন আজ কেমন নিস্তব্ধ। রাস্তার ব্যস্ততা অনেক আগেই কমে এসেছে। কেবল মাঝেমধ্যে দূর থেকে ভেসে আসা গাড়ির শব্দ জানান দিচ্ছে শহর এখনো পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়েনি।তুবাকে তার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে ইনায়া আর পিয়াসা অবশেষে চৌধুরী ভিলায় পৌঁছালো।
কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতেই ড্রয়িংরুম থেকে লিখন চৌধুরীর গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো। আগামী কয়েকদিন কেউ বেশি সময় বাইরে থাকবে না। পরিবারের কোনো সদস্য বডিগার্ড ছাড়া বাইরে যাবে না।ঘরের সবাই চুপচাপ শুনছে।ইনায়া বেশি কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়াসার দিকে একবার তাকালো।দুজনের চোখাচোখি হতেই যেন কয়েক সেকেন্ডে হাজারটা কথা আদান-প্রদান হয়ে গেল।
পিয়াসা ভ্রু নাচালো।ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
ব্যাস!এরপর দুজন সেখান থেকে সটকে পড়ল।
নিজেদের রুমে ফিরে এসে দুজনই ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ইনায়া হঠাৎ বলল বেবি…

— হুম?
ভাইয়া কি তোর সাথে কথা বলছে?
পিয়াসা নির্দ্বিধায় বললো
— হ্যাঁ। কেন?ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বালিশে ঘুষি মেরে বললো আমার বালের শেহেজাদা! সারাদিন কোনো খোঁজ নাই। রাত হলেই ম্যাসেজ দিবে, “আদর কেমন আছো?”
পিয়াসা হেসে উঠে বসে বললো তুইও তো মিস করছিস তুই কল দে।ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কোনদিনও না! মিস করতে করতে জ্ঞান হারাবো, তবুও আগে ম্যাসেজ দিবো না।
পিয়াসা এবার হো হো করে হেসে উঠল।
এইদিকে তিয়া ইউভির রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পুরো কথোপকথন শুনে ফেলল।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসল সে।
তার চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক খেলে।গেলো
খুব আস্তে বললো হাসতে থাকো যত খুশি হাসো
তারপর ধীরে ধীরে সরে গেল।কারণ এই হাসির স্থায়িত্ব আর খুব বেশি সময় নয়।
ঠিক তখনই ইনায়ার ফোন বেজে উঠল।
ভিডিও কল। বালের শেহজাদা নাম টা ভেসে উঠতেই ইনায়ার ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসি ফুটে উঠলেও মুখে রাগী ভাব এনে কল রিসিভ করল।
ভিডিও ওপেন হতেই দেখা গেল গার্ডেন বসে আছে ইউভি চারপাশে হালকা আলো দেখা যাচ্ছে
ইউভির পরনে কালো শার্ট, কালো কোট।

মাথায় কালো ক্যাপ। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মিশনের প্রস্তুতি চলছে।পাশেই রেদোয়ান কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিচ্ছে।
ইউভি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকে।
আর ইনায়া মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
ইউভি মৃদু হেসে বললো
আমার বেয়াদব বউটা এদিকে তাকাবে না?
ইনায়া কোনো উত্তর দিল না। সরি আদর একটুও সময় পাইনি। সরি শব্দ টা শোনার পরে তবুও ইনায়া চুপ করে আছে ইউভি আবার বললো
তাকাও না।অবশেষে ইনায়া তাকাল।
ইউভি মুচকি হেসে বললো তুমি ও তো খোঁজ নাওনি এই তুমি আমার খেয়াল রাখবে। তুমি তো ভুলেই গিয়েছো আমাকে
ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে বললো
শুনেন আপনার প্রতি অভিমান জমলেও আপনাকে কখনো ভুলে থাকতে পারি না। এটাই হয়তো আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা।
ইউভির ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।তাহলে বলছো অভিমান করেছো?ইনায়া আবার মুখ ফিরিয়ে নিল।
জানি না।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রেদোয়ানও হেসে ফেলল।
কিন্তু পরক্ষণেই ইউভির মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
আদর সাবধানে থাকবে।ইনায়া ভ্রু কুঁচকাল।

—কেন? কি হইছে একটু বলবেন বাড়ির সবাই এতো টা ভয়ে আছেন কেন আমাকে নিয়ে?
ইউভি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল কিছু জানোয়ারের বা*চ্চার নজর পড়েছে আমার দুর্বলতার উপর।
ইনায়ার বুক ধক করে উঠল। আপনার দুর্বলতা?
ইউভি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললো
হ্যাঁ আমার দুর্বলতা। আগে আমার কোনো দুর্বলতা ছিল না। তবে এখন তুমি আমার দুর্বলতা।
কথাটা শুনে ইনায়ার গাল লাল হয়ে উঠল।
সে একটু ঝুঁকে বললো রিয়েলি মিস্টার চৌধুরী? আমি আপনার দুর্বলতা?
ঠিক তখনই রেদোয়ান ভদ্রভাবে সরে গেল।
আর একই সাথে পিয়াসাকে কল করে বারান্দায় চলে যেতে বলল।
ইনায়া আবার বললো বলুন না।ইউভি গভীর শ্বাস নিল। কিছু সেকেন্ডের জন্য ইনায়ার থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে মনে মনে বলল—

“কন্ট্রোল ইউভি… কন্ট্রোল…”
তারপর হেসে বললো
তোমার বুকে থাকা তিলটার উপর ভীষণ হিংসা হচ্ছে যানো ওখানে তো আমার থাকার কথা ছিল আদর অথচ সে দিব্যি আমার জায়গা দখল করে বসে আছে।ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নিল।
লুচ্চাবেডা, বেহায়া অসভ্য লোক একটা আপনি
ইউভি হেসে উঠল।
বেশ কিছু সময় পর ইনায়া নিরাবোতা বালিশ বুকে জড়িয়ে ইনায়া ফিসফিস করে বললো আমাকে ছাড়া ভালো লাগছে আপনার?ইউভি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার বিয়াদোব বউ টার দিকে
তারপর খুব ধীরে গেয়ে উঠল—

— “তোকে ছাড়া চলে না…
রাতে রাত ঢলে না…
কোনো কথা বলে না এ মন…”
দূরে দাঁড়িয়ে রেদোয়ান থমকে গেল।
মুগ্ধ হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মুচকি হেসে মনে মনে বললো জানি না আজ আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। তবুও মানুষটা দেখ নিজের সব চিন্তা ভুলে বোনুর অভিমান ভাঙাতে ব্যস্ত।
এইদিকে ইনায়া খিলখিল করে হেসে উঠল।
ইউভি মুগ্ধ হয়ে সেই হাসিটাই দেখতে লাগল।
এই হাসিটা দেখার জন্যই তো তার মন এতক্ষণ ব্যাকুল হয়ে ছিল।হাসতে হাসতে ইনায়া হঠাৎ বুকে হাত রাখল।ইউভি সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল।
কী হয়েছে আদর? বুকে ব্যথা করছে?
ইনায়া গভীর শ্বাস নিয়ে বললো না না কিছু হয়নি।তারপর লাজুক হেসে বললো

— প্রিয় পুরুষের কণ্ঠ শুনলে প্রিয়তমার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় মিস্টার চৌধুরী।
ইউভির ঠোঁটেও হাসি ফুটে উঠল।
ইনায়া আবার বললোএত সুন্দর গানের গলা আপনার সারাদিন এত ব্যস্ত থাকেন গানগুলো শোনেন কখন?ইউভি মৃদু হেসে বললো
আমার একটা নিষিদ্ধ পাখি আছে। পাখিটা সারাদিন আমার মনের মধ্যে উড়ে বেড়ায় আর গুনগুন করে ভালোবাসার গান গায়। তার থেকেই শেখা ইনায়া আবার হেসে ফেলল।
ইউভি ভাইয়া আমি অনেক লাকি। আপনি আমাকে একটুও মন খারাপ করে থাকতে দেন না।
ইউভির চোখ আবার গম্ভীর হয়ে উঠল। আমাদের যেতে হবে আদর। এখন?

— হুম।
— সাবধানে থাকবে।
ইনায়া মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
ইউভি আবার বললো আমার সামনে যত খুশি বাচ্চামি করো। কিন্তু শত্রুপক্ষের সামনে…
তোমাকে হতে হবে আগুনের মতো। শান্ত দেখাবে, কিন্তু ছুঁতে গেলে পুড়িয়ে দেবে।
ইনায়া মনোযোগ দিয়ে চুপচাপ শুনল কথা গুলো।
হঠাৎ ইউভির পোশাকের দিকে তাকিয়ে বলল—
ইউভি ভাইয়া আপনারা দুজন এখন কোথায় যাবেন?রেদোয়ান সামনে এসে হাসল। সময় হলে বলব বোনু। এখন ঘুমিয়ে পড়।তারপর ভালোবাসা মাখা গলায় বললো ভালো থাকিস।
ইউভি শেষবারের মতো ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল আর হ্যাঁ বারান্দার অ্যালোভেরা গাছগুলোর যত্ন নিও বউ আমার।
ইনায়া চোখ বড় বড় করে বললো অসভ্য লোক একটা!তারপর লজ্জায় কল কেটে দিল।
কল কেটে যাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ল ইনায়া।মৃদু গলায় গুনগুন করে উঠল—
— “আমায় ডুবাইলি রে…
আমায় ভাসাইলি রে…
অকূল দরিয়ায় বুঝি
কূল নাই রে…”
তারপর আলমারি খুলে ইউভির একটা টি-শার্ট বের করল।গায়ে জড়িয়ে নিয়ে পিয়াসার দিকে তাকিয়ে বললো বেবি তোর ভাইয়ার সব টি-শার্ট আমার!
আর পিয়াসা ইনায়ার পাগলামি দেখে হাসছে সারাদিন পর এমন ভাবে হাসতে দেখলো মেয়েটা কে।

গভীর রাত। শহরের আলো অনেকটাই নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর মাঝে মাঝে দূরের গাড়ির শব্দ।লন্ডনের সবচেয়ে বড় কোম্পানির একটি হলো —LLB কোম্পানির বিশাল বিল্ডিং। চারদিকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গেটে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী, ভেতরে আধুনিক সিকিউরিটি সিস্টেম।কিন্তু সেই রাতেই অন্ধকারের আড়াল থেকে এগিয়ে এলো দুটো ছায়ামূর্তি।কালো শার্ট, কালো কোট, মাথায় কালো ক্যাপ। মুখের বেশিরভাগ অংশ ঢাকা। শুধু চোখ দুটোই দেখা যাচ্ছে—যেখানে ছিল আত্মবিশ্বাস আর ভয়ংকর স্থিরতা।তারা আর কেউ নয়…শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী আর মাহতিব রেদোয়ান চৌধুরী
দুজনের কানে ছোট কমিউনিকেশন ডিভাইস লাগানো, যার মাধ্যমে একে অপরের সাথে কথা বলছে।রেদোয়ান নিচু স্বরে বললো ভাইয়া, ভেতরের সিকিউরিটি আগের চেয়েও বেশি।ইউভি শান্ত গলায় উত্তর দিল জানি। তাই তো আমরা এসেছি।
দুজন নিঃশব্দে এগিয়ে গেল।এক মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের নিরাপত্তার লোকজন তাদের উপস্থিতি টের পেল।কয়েকজন এগিয়ে আসতেই রেদোয়ান আর ইউভি একে অপরের দিকে তাকাল।
তারপর শুরু হলো কঠিন লড়াই।দুজনের চলাফেরা ছিল এতটাই দ্রুত আর নিখুঁত, যেন বহুদিনের প্রশিক্ষণ তাদের প্রতিটা পদক্ষেপে মিশে আছে।
রেদোয়ান একপাশ সামলাচ্ছে, আর ইউভি সামনে আসা বাধাগুলো ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করছে।
কিন্তু হঠাৎ একজন সুযোগ নিয়ে রেদোয়ানের দিকে এগিয়ে গেল।ঠিক সেই মুহূর্তে ইউভি এক ধাপ সামনে এসে রেদোয়ানকে সরিয়ে দিল।আঘাতটা এসে লাগল ইউভির হাতে।কয়েক সেকেন্ডের জন্য রেদোয়ানের চোখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।

— ভাইয়া সে দ্রুত ইউভির কাছে এগিয়ে এলো।
কিন্তু ইউভি বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বললো
— Nothing happened,
রেদোয়ান অবাক হয়ে বললো কিন্তু ভাইয়া তোমার হাত..ইউভি কথাটা শেষ করতে দিল না।
পরে দেখব। আগে কাজ শেষ করি।আহত হাত নিয়েও তার চোখের দৃঢ়তা একটুও কমল না।শেষ পর্যন্ত তারা LLB কোম্পানির গোপন কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে গেল।সেখানে রাখা গুরুত্বপূর্ণ পেপারগুলো ইউভির হাতে এলো।রেদোয়ান ফাইলটা নিয়ে বললো পেয়ে গেছি।ইউভি মৃদু হাসল। তাহলে এবার বের হওয়ার সময়।দুজন দ্রুত বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠে গেল।ছাদের ওপর অপেক্ষা করছিল একটি হেলিকপ্টার।দুজন শেষবারের মতো নিচের দিকে তাকাল।এত কঠোর নিরাপত্তার মাঝেও তারা তাদের লক্ষ্য পূরণ করেছে।ইউভির ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। চৌধুরীরা হার মানে না।
তারপর দুজন হেলিকপ্টারে উঠে গেল।কয়েক মুহূর্ত পর আকাশের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল হেলিকপ্টারটি।আর দুই ভাইয়ের মুখে তখন ছিল শুধু বিজয়ের হাসি।
কিছুক্ষণ পর…

LLB কোম্পানির বিশাল গেটের সামনে এসে থামল কয়েকটা গাড়ি।দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল রবার্ট।তার মুখে তখন স্পষ্ট রাগ আর অস্থিরতা বিরাজ করছে এত লোক কোম্পানিতে থেকেও তোমরা কিছু টের পেলে না?কঠিন গলায় বলতেই সে সরাসরি সিকিউরিটি রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
সব ক্যামেরার ফুটেজ বের করো। এখনই!
সিকিউরিটি টিম দ্রুত সব স্ক্রিন অন করল।
একটার পর একটা ক্যামেরার ভিডিও চেক হতে লাগল।কিন্তু…রবার্টের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
কোথাও কিছু নেই কোনো পরিষ্কার মুখ নেই।কোনো পরিচয় নেই পাওয়া যায় নি কোনো প্রমাণ নেই।
মনে হচ্ছিল কেউ যেন পুরো ঘটনাটাকে অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে দিয়ে গেছে।রবার্ট অবিশ্বাসের চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।হঠাৎ সে রাগে চিৎকার করে উঠল এটা হতে পারে না! LLB কোম্পানি তে এখানে ঢোকা এত সহজ না! এত নিরাপত্তার মাঝেও কেউ ঢুকে সব নিয়ে গেল?তার কণ্ঠে ছিল হতাশা আর ক্রোধ।সে একের পর এক স্ক্রিন দেখতে লাগল।কিন্তু যতই খুঁজছে, ততই অবাক হচ্ছে।
রবার্ট ধীরে ধীরে বুঝতে পারল.যে এসেছে, সে সাধারণ কেউ নয়।
অন্যদিকে শহরের অনেক দূরে হেলিকপ্টারের ভেতরে বসে ছিল ইউভি আর রেদোয়ান।
রেদোয়ান ফাইলটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
ভাই, এত কঠিন সিকিউরিটির মাঝেও একটা প্রমাণ রাখলে না।ইউভি জানালার বাইরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো কিছু অসৎ কাজের আসল পরিচয় হলো কাজ শেষ হওয়ার পরেও যেন কেউ বুঝতে না পারে কাজ টা কীভাবে হলো।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫২

এইদিকে
LLB কোম্পানির ভেতরে দাঁড়িয়ে রবার্ট শুধু একটাই কথা ভাবছিল…
কে ছিল তারা শেহজাদ ইউভি চৌধুরী নয় তো

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here