শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৪
সুমাইয়া ইসলাম নূর
এরই মাঝে কেটে গেছে তিনটি দিন।
চৌধুরী পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সবাই ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বছরের শেষ প্রান্তে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক বিজনেস র্যাংকিং ও কর্পোরেট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডকে ঘিরে দেশের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয় কোন কোম্পানি সেই বছরের সেরা অবস্থানে থাকবে।তাই চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কোম্পানির ওপরও কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
ইউভি আর রেদোয়ান দেশে না থাকায় পুরো দায়িত্বের বড় অংশ এসে পড়েছে লিখন চৌধুরী রাতিব চৌধুরী ও রবিউল চৌধুরীর ওপর।
তার ওপর তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মালিথা ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কোম্পানি এবার যেকোনো মূল্যে প্রথম স্থান দখল করতে মরিয়া হয়ে গেছে । ব্যবসায়িক নীতির সীমা অতিক্রম করতেও তারা দ্বিধা করবে না—এমন আভাস ইতিমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে।রায়হান চৌধুরীও ভাইদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। তবে তার মন পড়ে আছে অন্য এক চিন্তায়।
কিছুদিন আগেই তিনি তার প্রাণের কোম্পানি LLB কোম্পানির মালিকানা মেয়ের নামে লিখে দিয়েছেন। কোম্পানিটা ছিল তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।তবুও অদ্ভুত কারণে তিনি লন্ডনে নিজের কোম্পানির কারও সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছেন না।
এমনকি নিজেও লন্ডনে ফিরতে পারছেন না।
প্রতিবারই তিয়া তাকে আশ্বস্ত করে বলছে,
বাপি, কোম্পানির সবকিছু ঠিক আছে। তুমি কোনো চিন্তা কোরো না।মেয়ের কথায় আপাতত ভরসা করলেও রায়হান চৌধুরী জানতেই পারছেন না, তার অনুপস্থিতিতে LLB কোম্পানির ভেতরে কী ভয়ংকর পরিবর্তন ঘটে চলেছে।
সকালের নাস্তার টেবিলে।সবাই একসঙ্গে নাস্তা শেষ করে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বের হওয়ার আগে লিখন চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, সাবিহা, তুমি প্রতিদিন গার্ডদের সঙ্গে যাবে। আয়াত আর আতিকাকে স্কুলে পৌঁছে দেবে, আবার নিয়ে আসবে।সাবিহা চৌধুরী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।এরপর তিনি নুসরাত চৌধুরীর দিকে তাকালেন।নুসরাত, তুমি রিধকেও একইভাবে স্কুলে দিয়ে আসবে এবং নিয়ে আসবে।
নুসরাত চৌধুরী ও সম্মতি জানালেন।
এরপর লিখন চৌধুরী রেশমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আর তুমি বড় দুই বাঁদরকে দেখে রেখো।কথাটা শুনে উপস্থিত সবার মুখে হালকা হাসি ফুটলেও রেশমা চৌধুরীর মুখ গম্ভীরই রইল।
তিনি ধীরস্বরে বললেন,ওরা আসলে কী করতে চাইছে, ইউভির বাবা?লিখন চৌধুরীর চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। ক্ষমতার জন্য মানুষ অনেক নিচে নামতে পারে, রেশমা। আমার বাবার সঙ্গে যা হয়েছিল, আমি আর কাউকে সেই পরিণতির মুখোমুখি হতে দেব না।কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন, ইউভি আর রেদোয়ান বাংলাদেশে ফিরে আসলে আমি একটু শান্তি পাব।তার কথায় উপস্থিত সবার মন ভারী হয়ে উঠল।এরপর একে একে সবাই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
এই তিন দিনে তিয়ার আচরণও অনেক বদলে গেছে।সে বাড়িতেই থাকে, কিন্তু আগের মতো কারও সঙ্গে তেমন কথা বলে না।বেশিরভাগ সময় গম্ভীর হয়ে থাকে।মাঝেমধ্যে কাউকে কিছু না বলেই কোথায় যেন বেরিয়ে যায়, আবার কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে।তার চোখেমুখে সবসময় এক ধরনের অস্থিরতা আর উদ্বেগের ছাপ দেখা যায়।
অন্যদিকে ইনায়া আর পিয়াসা নিজেদের পড়াশোনা, বিজনেস অ্যাসাইনমেন্ট আর ক্লাস নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছে।তবে যত ব্যস্ততাই থাকুক, বিকেলের কিছুটা সময় তারা নিজেদের জন্য আলাদা করে রাখে।সেই সময়টায় রিটার তত্ত্বাবধানে চলে বিশেষ প্রশিক্ষণ।কেরাতে, আত্মরক্ষা কৌশল, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই ধৈর্যের সঙ্গে শেখাচ্ছে রিটা।ইনায়া আর পিয়াসাও মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি বিষয় শিখছে।কারণ তারা বুঝতে শুরু করেছে।সময় সবসময় একরকম থাকে না।আর সামনে আসছে এমন এক ঝড়, যার জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
গোধূলি বিকেল।পশ্চিম আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে কমলা আর সোনালি রঙের মায়াবী আলো। অস্তগামী সূর্যের শেষ আলো গাছের পাতায় এসে পড়ছে, যেন প্রকৃতি নিজেই সেজেছে বিদায়ের রঙে।ফাঁকা হাইওয়ে ধরে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি।দুই যুবকের মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে ছিল অদম্য দৃঢ়তা।
হঠাৎ সামনের গাড়িতে বসে থাকা এক যুবকের চোখ রাস্তার পাশে বসা ছোট্ট একটি মেলার দিকে আটকে গেল।মেলার এক কোণে একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে চুড়ির দোকান সাজিয়ে বসে আছে।
যুবকটি মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির গতি কমিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে দিল।পিছনের গাড়িটিও তার অনুসরণ করল।গাড়ি থেকে নেমে যুবকটি ধীরে ধীরে চুড়ির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
অগণিত রঙের চুড়ির মাঝখান থেকে তার দৃষ্টি গিয়ে থামল একজোড়া কলাপাতা রঙের সবুজ কাশ্মীরি চুড়ির ওপর।কী মনে করে সেটি হাতে তুলে নিল সে।তারপর পাশে রাখা রূপালি নকশার একটি সুন্দর পায়েলও কিনে নিলো কাশ্মীরি চুড়ি আর পায়েলের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। পাশ থেকে রেদোয়ান বলে উঠলো বাহ ভাইয়া, চুড়ি কিনছো বোনুর জন্য?ইউভিও হালকা হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
রেদোয়ান কিছুক্ষণ চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বললো জানো ভাইয়া, তুমি যেভাবে বোনুকে আগলে রাখো, বিষয়টা আমার ভীষণ ভালো লাগে।
তোমার চোখে সবসময় ওর জন্য আলাদা একটা মায়া দেখি। পৃথিবীর যেকোনো বিপদের সামনে তুমি দাঁড়িয়ে যাবে, কিন্তু বোনুর গায়ে একটা আঁচড়ও লাগতে দিবে না।রেদোয়ানের কথাগুলো শুনে ইউভি শান্ত দৃষ্টিতে রেদোয়ান এর দিকে তাকিয়ে রইল।
কথাটা শুনেই সে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। এদিকে রেদোয়ান ও গাড়ির দিকে যেতে লাগলো
কিন্তু কয়েক কদম যেতেই ইউভির গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো, ঠিক একইভাবে যদি কেউ আমার বোনটারও খেয়াল রাখত…তাহলে আমারও একই ফিলিংস হতো, রেদোয়ান। কিন্তু ব্যাড লাক…
— আমার বোনের জন্যও এমন কাউকে এখনও খুঁজে পেলাম না।কথাটা বলেই ইউভি মুচকি হেসে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।আর রেদোয়ান কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।কেন জানি না, ইউভির কথাগুলোর ভেতরে অন্য কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে বলে মনে হলো তার।
কিন্তু সেটার অর্থ ঠিক বুঝে উঠতে পারলো কী সে।
গোধূলির শেষ আলোটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। পশ্চিম আকাশজুড়ে জমেছে ঘন কালো মেঘ। মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের চিকচিক আলো মেঘের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে বৃষ্টির আগমনী গন্ধ।আকাশের দিকে তাকাতেই ইনায়ার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল।এক মুহূর্তও দেরি না করে সে পিয়াসার হাত ধরে টান দিল।
চল বেবি! বৃষ্টিতে ভিজি!বলেই দৌড় দিল ছাদের দিকে।পিয়াসাও হেসে তার পিছন পিছন ছুটল।
ঠিক তখনই নিচ থেকে নুসরাত চৌধুরীর কণ্ঠ ভেসে এলো, এইইই! যাস না দুজন! এই সময় বৃষ্টিতে ভিজিস না মা! কিন্তু কে শোনে কার কথা!
ইনায়া তখন প্রায় ছাদের দরজার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।নুসরাত চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বললেন,
— এই রেদোয়ান এর বাবা ! একটু উপরে যাও তো। দুইটাকে নিয়ে আসো।এদিকে আয়াত, আতিকা আর রিধও খবর পেয়ে দৌড় শুরু করে দিয়েছে। আমরাও ভিজব! আমরাও!
রতিব চৌধুরী আর লিখন চৌধুরী হেসে বললেন,
আচ্ছা আচ্ছা, তোমরা যাও। আমরা আসছি।
বলেই ছাদের দিকে রওনা হলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে চৌধুরী ভিলার সামনে এসে থামল দুটি কালো বিলাসবহুল গাড়ি।গাড়িগুলোর উপস্থিতিতেই যেন চারপাশের পরিবেশ বদলে গেল।
গেটের নিরাপত্তারক্ষীরা মুহূর্তেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।দুটি গাড়ির দরজা ধীরে ধীরে খুলল।
অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্ব আর কর্তৃত্ব যেন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
এদিকে ছাদে…মুহূর্তের মধ্যেই ঝমঝমিয়ে নেমে এলো বৃষ্টি।প্রথমে কয়েক ফোঁটা নামলো তারপর একেবারে মুষলধারে নামতে শুরু করলো ইনায়া দুই হাত ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।পিয়াসা, আয়াত, আতিকা আর রিধও বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করল।চারদিকে হাসির শব্দে মুখর হয়ে উঠল ছাদ।
ইনায়া ঘুরতে ঘুরতে গাইতে শুরু করল—
— “যাও বলো তারে মেঘের ওপারে,
বৃষ্টি বন্দনা জুড়ে ধরণীতল…
যাও বলো তারে শ্রাবণ – আষাঢ়ে
মেঘের শতদলে ছুয়েছি ভেজাজল…”
— “মাতাল হাওয়ার ধ্বনি,
বৃষ্টি কি শোনে না?
ময়ূর পেখমতলে
ধীম তানা দেরে না…”
“ধীম তা না
বাজে…
ধীম তা না
বাজে…
ধিম তানা দেরে না…
ওওওও…
ধীম তানা
বাজে…
ধীম তানা
বাজে…
ধীম তানা দেরে না…”
আয়াত আর আতিকা তালি দিতে দিতে নাচছে।
রিধও তাদের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই কয়েকটি ছাতা নিয়ে ছাদে এসে পৌঁছালেন লিখন চৌধুরী আর রতিব চৌধুরী।
লিখন চৌধুরী প্রথমেই আয়াত আর আতিকাকে ধরে ফেললেন।দুজনই ঠকঠক করে কাঁপছে।
ব্যাস! অনেক হয়েছে।তারপর ইনায়া আর পিয়াসার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের বয়স কি উল্টো দিকে যাচ্ছে? অসুস্থ হলে তখন কিন্তু আমার কাছে আসবে না!
কথাটা বলেই আয়াত, আতিকা আর রিধকে নিয়ে নিচে চলে গেলেন তিনি।এদিকে রতিব চৌধুরী প্রাণপণ চেষ্টা করেও পিয়াসা আর ইনায়াকে ধরতে পারছেন না।হঠাৎ পিয়াসা হেচি দিতে শুরু উঠল।
তারপর হেচি যেন থামছেই না।রতিব চৌধুরী চিন্তিত হয়ে চিৎকার করে বললেন,নুসরাত! ইনহেলার নিয়ে আসো! তাড়াতাড়ি!পিয়াসা হাসতে হাসতেই বলল,
চাচ্চু, আমি ঠিক আছি। এক্ষুনি চেঞ্জ করে ফেলব।
রতিব চৌধুরী তাকে প্রায় জোর করেই নিচে নিয়ে যেতে লাগলেন।যাওয়ার সময় ইনায়াকে বললেন,
তাড়াতাড়ি আসো মা!ইনায়া মিষ্টি হেসে বলল,
আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাবা কথাটা বলেই আবার বৃষ্টির মধ্যে ঘুরতে শুরু করল।ঠিক তখনই রতিব চৌধুরীর পেছন থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠস্বর— ওকে সামলে রাখার মতো ধৈর্য আর ক্ষমতা আল্লাহ একমাত্র আমাকেই দিয়েছেন, চাচ্চু।আপনি নিচে যান। আমি নিয়ে আসছি।
কণ্ঠটা শুনেই রতিব চৌধুরীর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল কখন আসলে বাবা ইউভি শান্ত কন্ঠে বলল মাএ এসেছি চাচ্চু ।তারপর পিয়াসার দিকে তাকিয়ে সেই কণ্ঠ আবার বললো দ্রুত চেঞ্জ কর বোনু। এক্ষুনি ইনহেলার লাগবে বলে মনে হচ্ছে।পিয়াসা মাথা নেড়ে বললো। আমি ঠিক আছি ভাইয়া।তুমি আগে ওকে নিয়ে আসো, না হলে ওরই জ্বর আসবে।
এরপর রতিব চৌধুরী আর পিয়াসা নিচে নেমে গেল।
আর ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া তখনও বৃষ্টিতে ভিজছে।চোখ বন্ধ করে ঘুরতে ঘুরতে গাইছে—
— “ধীম তানা
বাজে…
ধীম তা না
বাজে…
ধীম তা না দেরে না…
ওওওও…
ধীম তা না
বাজে…
ধীম তা না
বাজে…
ধীম তা না দেরে না…”
সে এখনো জানে না…
তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষটা, যার জন্য তার এত এত অপেক্ষা।হঠাৎ ইনায়া ঘুরতে ঘুরতে পিছনের দিকে তাকাল।প্রথমে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারল না। ইউভিকে দেখেছে বলে মনে হলো তার। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে বুঝ দিল— না, এটা হয়তো মনের ভুল।
কয়েক সেকেন্ড পর আবারও ঘুরে তাকাতেই দেখল…না, এবার ভুল নয়।সত্যিই ইউভি দাঁড়িয়ে আছে।বৃষ্টিভেজা ছাদের এক কোণে, দু’হাত পকেটে গুঁজে, গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ইনায়া বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল আমি কি স্বপ্ন দেখছি?নিজের হাতেই নিজেকে চিমটি কাটতে যাবে, ঠিক তখনই ইউভির রাগী কণ্ঠ ভেসে এলো—
— একটা থাপ্পড় দিবো বেয়াদব!
তুই জানিস না বৃষ্টিতে ভিজলে তোর জ্বর হয়?
তারপরও কে বলছে তোকে বৃষ্টিতে ভিজতে, হ্যাঁ?
ইনায়ার ঠোঁটে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
চোখ দুটো আনন্দে চিকচিক করে উঠল।না… সত্যি আপনি এসেছেন?ইউভি ভাইয়া…!এক মুহূর্তও দেরি করল না সে।দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ইউভিকে।
কিন্তু আশ্চর্য!ইউভি একবারও হাত তুলল না।
একইভাবে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রইল।দু’হাত এখনও পকেটেই।বিষয়টা ইনায়ার একদম ভালো লাগল না।
এতদিন পর দেখা…আর মানুষটা একবারও জড়িয়ে ধরল না!অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে সে সরে গিয়ে ছাদের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে রইল।চারপাশে তখন টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ।শীতল বাতাসে ইনায়ার ভেজা চুলগুলো উড়ছে।ঠিক তখনই ইউভি ধীরে ধীরে তার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল।
ইনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ডান পাটা আলতো করে নিজের হাঁটুর উপর তুলে নিল।
তারপর কোটের পকেট থেকে একটি রুপালি পায়েল বের করল।অসীম যত্নে পায়েলটি ইনায়ার পায়ে পরিয়ে দিল।বৃষ্টির ফোঁটা তখনও ঝরে পড়ছে দুজনের উপর।পায়েল পরানো শেষ করে ইউভি এক হাতে ইনায়ার পা ধরে রাখল।অতঃপর মাথা নিচু করে পায়ের উপর আলতো করে ঠোঁয় ছুঁইয়ে দিল।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
লজ্জায়, বিস্ময়ে, আবেগে সে আমতা আমতা করে বলল— কী… কী করছেন ইউভি ভাইয়া?ইউভি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।মুগ্ধ চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল—
শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৩
মাশাআল্লাহ…
ইনায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
ঠিক তখনই ইউভি আবার পকেট থেকে কাগজে মোড়ানো ছোট্ট একটি প্যাকেট বের করল।
সাবধানে খুলতেই বেরিয়ে এলো সবুজ কাশ্মীরি চুড়ি।এক এক করে চুড়িগুলো ইনায়ার হাতে পরিয়ে দিতে লাগল সে।ইনায়া নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইউভির দিকে।তার মনে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে—একটা মানুষ এতটা পারফেক্ট হয় কীভাবে?”আমার মনের সব ইচ্ছে আমি বলার আগেই কীভাবে জেনে যায়?”
চুড়ি পরানো শেষ করে ইউভি আলতো করে ইনায়ার হাত নিজের হাতে তুলে নিল।তারপর হাতের পিঠে ঠোঁয় ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল—
— মাশাআল্লাহ…
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন আরও জোরে ঝরতে লাগল
