Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৬

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৬

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৬
সুমাইয়া ইসলাম নূর

বিশাল অডিটোরিয়াম জুড়ে তখনও করতালির ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ইউভির বক্তব্য শেষ হওয়ার পর উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখে-মুখে স্পষ্ট মুগ্ধতা।কর্পোরেট জগতে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।যেখানে সাফল্যের মঞ্চে দাঁড়িয়েও একজন মানুষ নিজের পরিবারকে সবচেয়ে বড় অর্জন বলে ঘোষণা করে।
উপস্থাপক মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে আবার মঞ্চের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।গম্ভীর অথচ উষ্ণ কণ্ঠে বললেন—লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান…
আজ আমরা শুধু একটি সফল কোম্পানির গল্প দেখিনি।আমরা দেখেছি একটি পরিবারের গল্প।
আমরা দেখেছি দুই ভাইয়ের প্রতি দুই ভাইয়ের অটুট ভালোবাসা।পুরো হলরুমের সবাই আবার করতালিতে মুখর হয়ে উঠল।উপস্থাপক আবার বললেন—

— আর এখন…
আমি আমন্ত্রণ জানাতে চাই এ.এস.ইউ গ্লোবাল হোল্ডিংসের কো-ফাউন্ডার এবং ডিরেক্টর মিস্টার রেদোয়ান চৌধুরীকে।দর্শকদের মাঝখানে বসে থাকা রেদোয়ান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।পুরো হলরুমের দৃষ্টি এখন তার দিকে।আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সে।সেই মুহূর্তে সামনের সারিতে বসে থাকা রতিব চৌধুরীর চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।না..এটা কষ্টের কান্না নয়।এটা একজন বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্বের মুহূর্ত তার কাঁপা ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক তৃপ্তির হাসি।
মঞ্চে উঠে ইউভির পাশে দাঁড়াল রেদোয়ান।
দুই ভাই একবার একে অপরের দিকে তাকাল।
কোনো কথা বললো না দুজনেই তবু ও সেই এক দৃষ্টিতেই যেন হাজারো অনুভূতি লুকিয়ে ছিল।
ইউভি নিজের হাতে পুরস্কারটি রেদোয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল।রেদোয়ান সেটি গ্রহণ করতেই পুরো হলরুমের সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল।কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর রেদোয়ান মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলতে শুরু করলো।

তার কণ্ঠ ছিল স্থির।কিন্তু চোখেমুখে ছিলো স্পষ্ট আবেগ মানুষ প্রায়ই বলে.. সফল মানুষের পেছনে অনেক গল্প লুকিয়ে থাকে। কিন্তু আজ আমি একটা সত্যি কথা বলতে চাই।আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো কোম্পানি নয়।কোনো পদবি নয় আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার ভাইয়া।
রেদোয়ান ইউভির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললল
ছোটবেলায় যখন আমি পড়ে যেতাম তখন সবার আগে যে হাতটা আমাকে তুলে দাঁড় করাতো সেই হাত আজও বদলায়নি শুধু দায়িত্ব বেড়েছে।
অবস্থান বদলেছে কিন্তু মানুষটা বদলায়নি।
পৃথিবীতে রক্তের সম্পর্ক অনেক আছে। কিন্তু সব ভাই ভাই হয় না।কেউ কেউ বন্ধুর চেয়েও বেশি হয়। অভিভাবকের চেয়েও বেশি হয়। আমার কাছে শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী ঠিক তেমনই একজন।
তারপর হালকা হেসে বললো
আজ সবাই শেহজাদ ইউভি চৌধুরীর সাফল্য দেখছে।

— কিন্তু আমি সেই মানুষটাকে দেখেছি যে নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে সবার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছে মুহূর্তের মধ্যেই করতালিতে কেঁপে উঠল পুরো অডিটোরিয়াম।
কিছুক্ষণ পর উপস্থাপক আবার মঞ্চে ফিরে এলেন।
ধন্যবাদ মিস্টার রেদোয়ান চৌধুরী।এবং এখন আমরা ঘোষণা করতে যাচ্ছি এই বছরের তৃতীয় স্থান অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম।বড় স্ক্রিনের দিকে তাকাল সবাই।কয়েক সেকেন্ডের নাটকীয় বিরতির পর সোনালি অক্ষরে ভেসে উঠল—
MALITHA INDUSTRIES AND COMPANY
পুরো হলরুম আবারো।করতালিতে ভরে উঠল।

কিন্তু মালিথা পরিবারের সদস্যদের মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল তীব্র ক্ষোভ।রবার্ট মালিথা সাজ্জাদ মালিথার রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।বোর্ড সদস্যদের চোখেমুখেও স্পষ্ট হতাশা।তারা দ্বিতীয় স্থান আশা করেছিল।কিন্তু বাস্তবতা তাদের তৃতীয় স্থানে নামিয়ে এনেছে।তবুও শত শত মানুষের সামনে নিজেদের আবেগ প্রকাশ করার সুযোগ নেই।কর্পোরেট জগতে পরাজয়ও হাসিমুখে গ্রহণ করতে হয়।তাই বাধ্য হয়েই মুখে সৌজন্যের হাসি রেখে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন মালিথা ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিনিধিরা।ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানির মাঝেই তারা পুরস্কার গ্রহণ করলেন।
কিন্তু তাদের চোখে তখন একটাই প্রতিজ্ঞাএই হার তারা ভুলবে না।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগে উপস্থাপক আবার মাইক্রোফোন হাতে নিলেন। লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান।আজকের এই অসাধারণ সন্ধ্যার সমাপ্তি ঘোষণা করার আগে আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা রয়েছে।

সবার দৃষ্টি আবার মঞ্চে গিয়ে থামল।
আগামীকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর রয়্যাল গ্র্যান্ড কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত হবে কর্পোরেট এলিট গালা অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং নাইট। যেখানে উপস্থিত থাকবেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারী, শিল্পপতি, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি এবং কর্পোরেট নেতারা। আমরা আশা করছি আপনারা সবাই আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন।
সঙ্গে সঙ্গে আবার করতালিতে মুখর হয়ে উঠল পুরো অডিটোরিয়াম।ধীরে ধীরে শেষ হতে লাগল অনুষ্ঠান।অতিথিরা একে একে নিজেদের আসন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করলেন।সাংবাদিকরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সাক্ষাৎকার নিতে।

চারপাশে এখনও অতিথিদের ভিড়, সাংবাদিকদের ব্যস্ততা আর কর্পোরেট জগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আনাগোনা।মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন লিখন চৌধুরী ও ইউভি। ঠিক তখনই খান ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কোম্পানির সিইও তাদের কাছে এগিয়ে এলেন। সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বললেন কনগ্র্যাচুলেশনস, মিস্টার লিখন চৌধুরী।
লিখন চৌধুরী সৌজন্য হাসি দিলেন।ধন্যবাদ।তারপর ভদ্রলোকের দৃষ্টি গিয়ে থামল ইউভির উপর।কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললেন আপনার ছেলে সত্যিই অসাধারণ।
এত অল্প বয়সে এমন অর্জন সচরাচর দেখা যায় না।ইউভি বিনয়ী ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
— থ্যাংক ইউ।ভদ্রলোক হালকা হাসলেন।
কিছুক্ষণ ব্যবসায়িক আলোচনা করার পর হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে থামল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়ার উপর।
লালচে- চুল গুলো।বাতাসে উড়ে এসে মুখে পরছে।
মুখে মিষ্টি হাসি ভীষণ মায়াবী লাগছে মেয়েটাকে পাশে দাঁড়িয়ে আছে পিয়াসা।
ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন মিস্টার ইউভি, ওই লাল চুলের মেয়েটাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে।
অসাধারণ ব্যক্তিত্ব মেয়েটার মধ্যে আমার একমাএ ছেলের বউ বানাতে চাই.
ভদ্রলোকের কথা শেষ হতেই ইউভির মুখের ভাব একটু ও বদলালো না।বরং আরও স্থির হয়ে উঠল।
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল—

— She isn’t just beautiful, sir.
She is my wife.
Mrs. Chowdhury.
এক মুহূর্তের জন্য ভদ্রলোকের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।ওহহ
— I’m sorry.
— I didn’t know that.
ইউভি ভদ্রভাবে মাথা নাড়ল।
— It’s okay, sir.
ভদ্রলোক এবার হাসতে হাসতে পিয়াসার দিকে তাকালেন।তাহলে পাশের মেয়েটিও কিন্তু কম সুন্দর নয়।কথা শেষ হওয়ার আগেই ইউভি শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললো ও আমার ছোট বোন।
আর তার এনগেজমেন্ট ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে।
কথাটা শুনে ভদ্রলোক হেসে উঠলেন। তাহলে বুঝলাম, আমি বেশ দেরি করেই এসেছি।
লিখন চৌধুরী বিস্মিত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।এনগেজমেন্ট?
ইউভির চোখ মুহূর্তের জন্য সরু হয়ে এলো।
লিখন চৌধুরীর মুখ থেকেও হাসি মিলিয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য তিনজনের মাঝখানে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এলো।তারপর খান ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও আবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেসে বললেন—

যাই হোক আগামীকালের গালা নাইটে দেখা হবে।
কথা শেষ করেই তিনি ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে গেলেন।খান ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও আর বিষয়টা বাড়ালেন না।আরও কিছুক্ষণ ব্যবসায়িক আলোচনা করে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
ভদ্রলোক চলে যেতেই চারপাশ কিছুটা শান্ত হয়ে এলো।ইউভি ধীরে ধীরে বাবার দিকে ফিরল।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক কোমলতা।
গম্ভীর কণ্ঠে বললো বাবা… তোমার কাছে আমার একটা চাওয়া আছে।লিখন চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন কী চাই বলো।ইউভি এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।তারপর বাবার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে নরম স্বরে বললো তুমি আমাকে কথা দাও আমার কথাটা মন দিয়ে শুনবে?লিখন চৌধুরী এবার ছেলের চোখের দিকে তাকালেন।
— বলো।
ইউভি ধীরে ধীরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রেদোয়ানের দিকে তাকাল।
তারপর মুগ্ধ কণ্ঠে বললো

মালিথা ভিলার ডাইনিং রুমটা যেন আজ এক অদৃশ্য ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।
চারপাশে পিনপতন নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। বিশাল ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন সাজ্জাদ মালিথা।
তার চোখে স্পষ্ট ক্রোধ, অপমান আর হিংসার আগুন জ্বলছে। মুখের প্রতিটি রেখায় ফুটে উঠেছে জমে থাকা রাগ।হঠাৎ তিনি টেবিলে হাত আঘাত করে গর্জে উঠলেন ছিঃ! লজ্জা করে না তোমাদের?
মালিথা পরিবারের সন্তান হয়ে আজ তোমাদের এই অবস্থা?তার কণ্ঠে তীব্র তাচ্ছিল্য।চৌধুরী বাড়ির একটা একটা ছেলে-মেয়েকে দেখো! সবাই যেন এক একটা রত্ন।
আর তোমরা?ছ্যা
— তোমাদের কাছে আছে শুধু টাকা ওই টাকা দিয়ে সারাদিন পার্টি নাইট ক্লাব মদ জু য়া এই সব নিয়ে থকো কিন্তু সেই টাকা দিয়ে যোগ্যতা কেনা যায় না!
সাজ্জাদ মালিথা রাগে সামনে থাকা রবার্টের দিকে তাকালেন।ওই ইউভিকে দেখো। তোমার বয়সী একটা ছেলে… কিন্তু আজ সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?নিজের পরিচয়, নিজের সাম্রাজ্য, নিজের নাম তৈরি করেছে।আর তুমি?এত বছর ধরে শুধু নিজের রাগ আর অহংকার নিয়েই পড়ে আছো!
রবার্টের চোখে আগুন জ্বলে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলল না।এদিকে সাজ্জাদ মালিথা ও থামলেন না।
আর তিয়া?

ওই ইনায়া, পিয়াসা,
তোমার বয়সে ছোট হয়েও তারা আজ সবার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে কারণ তাদের মধ্যে আছে শিক্ষা, বুদ্ধি, সাহস তোমাদের মধ্যে আছে শুধু নিজের বড়াই করার অভ্যাস!তারপর তার গলা আরও নিচু হলো। আমি আজ অপমানিত হয়েছি।
মালিথা নামটা আজ চৌধুরীদের ছায়ায় চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি…এই অপমানের হিসাব আমি একদিন নেব।তার চোখে ভয়ংকর দৃঢ়তা। চৌধুরীরা ভাবছে তারা সবসময় জিতবে?
তারা ভুল করছে কারণ সাম্রাজ্য যত বড়ই হোক, তার পতনের জন্য একটা ছোট্ট ফাটলই যথেষ্ট।
ঠিক তখন রুমি মালিথা এগিয়ে এলো।
শান্ত গলায় বললো যথেষ্ট হয়েছে। রাগ দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে।
চৌধুরীদের দুর্বল জায়গাটা খুঁজে বের করতে হবে।
সাজ্জাদ মালিথা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুমির দিকে তাকালেন। আমি জানি রুমি প্রতিটা মানুষেরই একটা দুর্বলতা থাকে। আর সেই দুর্বলতাই একদিন তাদের পতনের কারণ হয়।ঠিক তখন এতক্ষণ চুপ থাকা তিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।

তার চোখে আত্মবিশ্বাস, ঠোঁটে রহস্যময় হাসি।
বাপি..
সাজ্জাদ মালিথা মেয়ের দিকে ত তাকালেন।
তিয়া শান্ত গলায় বললো তুমি এত রাগ করো না।
কালকের পার্টিতে সব বদলে যাবে।
তিয়া ধীরে ধীরে বললো এবার সবাই দেখবে…
তিয়া মালিথা কে।আমি প্রমাণ করে দেব, আসল রানি কে। চৌধুরী বাড়ির আলো যত উজ্জ্বলই হোক…একটা অন্ধকার ছায়া সব আলো ঢেকে দিতে পারে।রুমি মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
সাজ্জাদের মুখেও ধীরে ধীরে কঠিন এক হাসি ফুটে উঠল।কারণ তারা দুজনেই বুঝে গেছে আগামীতে কি হবে।

চৌধুরী বাড়ি আজ যেন উৎসবের নগরী।
চারদিকে হাসি, আনন্দ আর উল্লাস।
প্রোগ্রাম থেকে ফেরার পর থেকেই বাড়ির সবাই একসাথে বসেছে।শুধু তিয়া উপস্থিত নেই।
তবে বিষয়টা নিয়ে ইউভি কিংবা রেদোয়ান কেউই বিশেষ মাথা ঘামাল না।তারা দুজনেই ভালো করেই জানে সে কোথায় আছে।
কিছু সময় পর হঠাৎ ইউভি হাতে এক বাক্স মিষ্টি নিয়ে হাজির হলো।সোজা রেদোয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।তারপর এক টুকরো মিষ্টি তুলে ধরে বললো
— নে ব্রো, মিষ্টি খা।রেদোয়ান অবাক হয়ে বলল—
আবার কিসের মিষ্টি?ইউভি গম্ভীর মুখে উত্তর দিল
আমার বোন পিয়াসা জান্নাত চৌধুরীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।আমাদের বোনের বিয়ের মিষ্টি।
— খেয়ে দেখ, সেই টেস্ট!

কথাটা বলেই জোর করে মিষ্টিটা রেদোয়ানের মুখে ঢুকিয়ে দিল।পরের মুহূর্তেই—বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করল রেদোয়ান।ইনায়া দৌড়ে রান্নাঘরে চলে গেল।কয়েক সেকেন্ড পর পানির গ্লাস নিয়ে ফিরে এসে বললো এই নাও ভাইয়া, পানি খাও!
রেদোয়ান তাড়াতাড়ি পানি খেল।
আর ইউভি দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে হাসছে।
এই যে, ভাইয়ের চামচি। আজ থেকে পানির গ্লাস সবসময় সাথে নিয়ে ঘুরবি। ওর এখন থেকে সবসময় কাশি উঠবে
রেদোয়ান এমনভাবে ইউভির দিকে তাকাল যেন এখনই তাকে মিষ্টির বাক্সসহ জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলবে।দূর থেকে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।রবিউল চৌধুরী হেসে বললেন।কী হয়েছে রেদোয়ান?
ইউভি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল তেমন কিছু না।
বোনের বিয়ের কথা শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে।
সবাই অবাক হয়ে বলল বোনের বিয়ে মানে? রেদোয়ানের মুখ আরও কালো হয়ে গেল।
ঠিক তখনই লিখন চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন।

তার গম্ভীর কণ্ঠে মুহূর্তেই পুরো ড্রয়িংরুম শান্ত হয়ে গেল।সবাই শোনো।আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।শুধু আমি একা নই।ইউভিও এই সিদ্ধান্তে আমার সঙ্গে আছে।সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকাল।
লিখন চৌধুরী ধীরে ধীরে বললেন আমরা খান পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়তে চাই।
আমাদের পরিবারের এক মেয়ের সঙ্গে তাদের পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারীর বিয়ের ব্যাপারে কথা হয়েছে।ঠিক সেই সময় পিয়াসা মোবাইল স্ক্রল করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল।
অন্যদিকে তিয়াও বাড়িতে ঢুকে রায়হান চৌধুরীর পাশে এসে দাঁড়াল।রায়হান চৌধুরী মেয়ের মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিলেন।
রেশমা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন কার বিয়ের কথা বলছো?লিখন চৌধুরী মুচকি হেসে ইউভির দিকে তাকালেন।ইউভি শান্ত কণ্ঠে বললো
আমার একমাত্র বোন… পিয়াসা জান্নাত চৌধুরী।
ঠাস!

পিয়াসার হাত থেকে ফোন মেঝেতে পড়ে গেল পুরো বাড়ির সবার দৃষ্টি তার দিকে ঘুরে গেল।পিয়াসা হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে উঠল কখনো না!
আমি বিয়ে করব না ভাইয়া!ইউভি গম্ভীর কণ্ঠে বললো শেহজাদ ইউভি চৌধুরী এক কথার মানুষ বোনু আশা করি জানা আছে কথাটা।
কথা দিয়ে এসেছি। আর সেটাই হবে।
এদিকে রেদোয়ানের হাতে ধরা কাঁচের গ্লাসটা কখন যে তার মুঠোর চাপে ভেঙে গেছে সে নিজেও বুঝতে পারেনি।কাঁচের ধারালো টুকরো হাতে ঢুকে গেছে।
ফোঁটা ফোঁটা রক্ত মেঝেতে পড়ছে।কিন্তু তার কোনো খেয়াল নেই।তার চোখ স্থির হয়ে আছে শুধু পিয়াসার দিকে।কাঁপা কণ্ঠে বললল পিয়াসার বিয়ে হবে না। শুনেছো সবাই?
ঘরের সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রেদোয়ান এর দিকে ইউভি হালকা মুচকি হাসল।
আরে ব্রো, এইসব এখন থাক।বোনের বিয়ে।
অনেক কাজ আছে।রেদোয়ান এবার প্রায় চিৎকার করেই বললো বোন মানে পিয়াসা তোমার বোন।
আমার না! আর পিহু, তুই উপরে যা।
তোর মতের বিরুদ্ধে কেউ তোকে বিয়ে দিতে পারবে না।রেদোয়ান এর কথায় পিয়াসার চোখ ভিজে উঠল।আর ইউভির ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।যে হাসির অর্থ এই মুহূর্তে কেউ বুঝতে পারছে না।

এদিকে…
সবাই যখন পিয়াসার বিয়ের কথা শুনে নানা রকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তখন ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিয়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।তার চোখে যেন লুকিয়ে আছে অন্যরকম এক আনন্দ।সে মনে মনে বলল—
“অবশেষে…”যে মুহূর্তটার অপেক্ষায় ছিলাম, সেটা এসে গেছে।দুই ভাইয়ের মধ্যে ফাটল ধরানোর জন্য আমাকে খুব বেশি কিছু করতেও হলো না।পিয়াসা আর রেদোয়ানের সম্পর্কের কথা আমি জানতাম।আমি জানতাম, এই খবর শুনলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে।তিয়ার চোখ ঘুরে গেল রেদোয়ানের দিকে।রেদোয়ানের চোখে তখন শুধু কষ্ট আর অস্থিরতা।সেটা দেখে তার হাসি আরও গভীর হলো।মনে মনে বললো
“ইশ! কী সুন্দর একটা দৃশ্য।”
যে পরিবারকে সবাই এত শক্তিশালী বলে আজ সেই পরিবারের ভেতরেই ফাটল ধরবে।চৌধুরী পরিবার ভেঙে যাবে.আর আমাকে কিছুই করতে হবে না।আমি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখব।এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো সে জিতে গেছে।

ইউভি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে গম্ভীর কণ্ঠে বললো মিসেস চৌধুরী. রুমে আসেন। আপনার এখন অনেক দায়িত্ব। একমাত্র ননদের বিয়ে সামনে।কথাটা বলেই সে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।ইনায়াও মুখ গোমড়া করে তার পিছু পিছু চলল।ইউভি ভাইয়া। পিহুর বিয়ে হয়ে গেলে আমি কীভাবে থাকব? প্লিজ, ওকে বিয়ে দিয়েন না।ইউভি কোনো উত্তর দিল না।
যেন কিছুই শোনেনি।শুধু হেঁটে চলল নিজের রুমের দিকে।ইনায়া এবার আরও দ্রুত হাঁটতে লাগল।
— শুনছেন? ওকে বিয়ে যখন দেবেন. আমার ভাইয়ার সাথেই দেন না। আমি আর আপনি তাহলে বিয়াই-বিয়ান হবো।কথাটা বলেই নিজেই হেসে ফেলল। ইশ! কী মজা হবে!কিন্তু ইউভি তখনও নিশ্চুপ।রুমে ঢুকে সোজা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।ধীরে ধীরে চুল ঠিক করতে লাগল।
মুখরাই গম্ভীর ভাব।কিন্তু ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে আছে ক্ষীণ হাসি।যেটা ইনায়ার চোখে পড়ল না।
ইনায়া আবার বললো হবেন না আমার বিয়াই?

— বলেন না… কী সুন্দর মানাবে!
পরের মুহূর্তেই সবকিছু ঘটে গেল এত দ্রুত যে ইনায়া বুঝে ওঠার সুযোগই পেল না।ইউভি হঠাৎ পিছন ফিরে দাঁড়াল।এক ঝটকায় ইনায়াকে নিজের সামনে নিয়ে এলো।ইনায়া অবাক হয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল।ইউভি নিচু স্বরে বলল—

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৫

আমার মতো এত নিরীহ…এত ভদ্র… এত নিষ্পাপ একটা ছেলেকে না খেপালে তোর ভালো।লাগে না?
ইনায়া হতভম্ব হয়ে গেল ইনি নাকি নিরীহ, নিষ্পাপ।
ইউভি ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললো নিজেই নিজের বিপদ ডেকে নিয়ে আসিস.. তারপর আবার কান্না করে বলিস…ইউভি ভাইয়া, আপনি অনেক স্বার্থপর.আমার কষ্টটা একটুও বোঝেন না শুধু কষ্ট দেন।
বিয়াদোব বউ”

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here