Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৬
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

চন্দ্রকাননে সকাল সকাল কিসের একটা বিশাল আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছে। কেমন একটা সাজ সাজ রব বলেই মনে হচ্ছে। কি কারণে এতো আমোদিত সকলে সেটা বোঝা যাচ্ছে না ঘর থেকে। তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে আসছে নিচ থেকে। চোখ বন্ধ করেও ঈশান বলে দিতে পারলো তিতির বিছানা বা ঘরে কোত্থাও নেই। নিচে গিয়েছে, এবং তাদের বেডরুমের দরজাটা হাট করে খুলে রেখে গিয়েছে। মেয়েটা আগে উঠলে এই এক সমস্যা। কখনো ভালোমতো দরজা আটকে যাবে না। হতে পারে ইচ্ছে করেই এমন করে!
বালিশ আকড়ে উপুর হয়ে শুয়ে আছে ঈশান। বাঁ গালটা ডুবে আছে নরম বালিশের মধ্যে। দুহাতে মাথার বালিশ খামচে ধরে আছে। মাথা টা সামান্য উঁচিয়ে নিভু নিভু চোখে ফোনে সময় দেখলো। তিতির সত্যিই বিছানায় নেই। দরজাটাও খুলে দেওয়া। আড়মোড়া ভাঙলো ঈশান।
ওঠা উচিত। বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। আজকে অফিসে সকাল সকাল যাওয়ার কথা।
ঈশান পেশল দু হাতে ভর দিয়ে উদাম শরীর নিয়ে উঠে বসে, ফোনটা মুখের সামনে ধরতেই খেয়াল হলো বেশকিছু ফোনকল। অপরিচিত নাম্বার যেমন আছে। কিছু পরিচিত নাম্বার ও আছে। অমিত, নিয়াজ! ঈশান প্রথম কল ব্যাকটা অমিতকেই করলো। সেখানে দরকারি কথাগুলো শেষ করে, নিয়াজ কে । সাজিদের সাথে কিসের কথা থাকতে পারে তার, সে হিসেব জলদিই মিলবে।
নিয়াজ বোধহয় অপেক্ষাতেই ছিলো ঈশানের ফোনের। রিসিভ হলো একটা মাত্র রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। উত্তেজিত কন্ঠে বললো,

—’ তোকে আজকাল পাওয়া যায় না কেনো বলতো? দেখা করা তো বন্ধ করেছিসই, ফোনেও পাই না। বউয়ের আঁচলের তলায় ঢুকে থাকিস নাকি! আশ্চর্য। বউকে রাখবিই না, এর সাথে সংসার করবিই না। এই বলতে বলতে সেই বিয়ের কয়েকদিন পর থেকেই তুই লাপাত্তা। সুন্দর বউ পেলে এমন হয়, সেটা জানি। তাই বলে এতোটা পরিবর্তন। মানা যায়না ভাই। বউয়ের সাথে তো কিছু করিসও না, তাহলে এতো গা ঘেঁষাঘেঁষির কি আছে? ‘
ছেলেটা ফোন দিয়েই ফাইজলামি শুরু করে দিয়েছে। গড়গড় করে বাজে কথা গুলো আউরে গেলো। ইচ্ছে তো হচ্ছে একটা রামধমক দিয়ে ফোন কেটে দিতে। তবে সকাল সকাল চেঁচামেচি করতে ইচ্ছে হলো না।
হাতের উল্টোপিঠে চোখটা ডলে ঘুম ঘুম কন্ঠে ঈশান ধমক দিলো একপ্রকার।
—’ মুখ বন্ধ। গা ঘষাঘষি করি, না অন্য কিছু করি সেটা তোর না জানলেও চলবে। কি বলার জন্য কল দিয়েছিস সেটা বল। আমি আমার বউ নিয়ে কি করবো তাতে তোর কাজ কি!’
ফোনের ওপাশ থেকে নিয়াজের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কানে শোনা গেলো। সম্ভবত ব্যাঙ্গ করছে ঈশানকে। নিয়াজ খুকখুক করে কেশে নিলো কয়েকবার। তারপর ভারি করলো কন্ঠস্বর।

—’কি করছিস আজকাল? দেখা করিস না কেনো?’
—’রিসেন্টলি, একটু বিজি। বল এখন। ফোন দিচ্ছিলি কেনো? এটা বলতে?’
—’দেখা কর। কবে থেকে আড্ডা হয়না বলতো। একটা নিউজও দেওয়ার আছে। ‘
ঈশান ভাবলো কিয়ৎক্ষন। সময়ের হিসেব করলো খানিকটা। তারপর গম্ভীর সুরেই বললো,
—’আজ হবে কি-না বুঝতে পারছি না। বিকেলের দিকে জানাই। আজ না হলে কাল। ‘
—’আজ না। কালই আয়। তিতিরকে নিয়ে আসবি।’
—’ওকে কি দরকার?’
—’আরেহ্ আমাদের আরও কিছু ফ্রেন্ড রা থাকবে। ফাহিমদের চিনতি না? ওরা আসছে। এমনিতেই। তিতিরকে তো কেউ চেনেই না। তুই যে বিয়ে করেছিস এটাও কেউ জানে না প্রায়। নিয়ে আয়, ভালো লাগবে মেয়েটার। ওদেরও সারপ্রাইজ হবে। তুই রুষা কে বাদে অন্য কাউকে বিয়ে করেছিস…আই মিন রুষা তোর ঘাড় থেকে নেমেছে, এটা জানলে সবার রিঅ্যাকশন কেমন হবে ভাবতে পারছিস?’’

—’ নাহ তো। ভাবতে পারছি না, ভাবতে চাচ্ছিও না। ‘
তিতিরকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা তৎক্ষনাৎ নাকচ করে দিলো ঈশান। সাজিদ, নাঈমরা বাদে বাকি ফ্রেন্ডদের সাথে কোনো জীবনেই মাখো মাখো সম্পর্ক ছিলো না ঈশানের। তাদের এই ছয়জনের একটা গ্রুপ বাদে কারোর সাথেই ওঠাবসাও ছিলো না ঈশানের। বরাবরই গম্ভীর হয়ে থাকতো সে। কাজের বাইরে কথা বলা হতো না আগে থেকেই। তাছাড়া নিয়াজ যাদের কথা বলছে –এদের কোনোটা খাঁটি বাংলায় বলতে গেলে মেয়েখো’ড় অথবা বাজে ধরনের। কয়েকজনের মধ্যে তো পুরুষমানুষ হিসেবে যতটা বাজে গুণাবলি থাকা যায়, সব আছে। মেয়ে দেখলে হুশ থাকে না এদের। তিতিরকে এর মধ্যে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ঈশান রাশভারি জবাব দিলো।

—’অন্য সময়। যখন আমাদের গ্রুপের আড্ডা হবে তখন নিয়ে যাবো। এবার নাহ।’
নিয়াজ ব্যাস্ত হলো খানিকটা। ব্যাস্ত গলা বললো,
—’শোন না। বুঝিস না কেনো তুই? এদিকে অনিমা, রিতু আছে। ওদিকে তিতিরকে নিয়ে আয়। এক কাজ কর। সাথে নিশি, নূরিকেও নিয়ে আয়। তাই আর একা লাগবে না তিতিরের। ভালো লাগবে বিশ্বাস কর। ‘
—’ফাহিম পুরুষ মানুষ? কেমন পুরুষ জানিস না? সেখানে আমি আমার বাড়ির মেয়েদের নিয়ে যাবো৷ আর ইউ ম্যাড?’
—’ক্ষেপে যাচ্ছিস কেনো, বাডি। খোলাখুলিই বলি। সবাই ওরা একটা ছোট্ট গেট টুগেদার করছে। নরমালই আরকি। কোনো পরিকল্পনা নেই। ঢাকা থেকে এসেছে ওরা আজই। শুধু ফাহিমের কথা ধরছিস। ওর কথা তো আমি বললাম জাস্ট উদাহরণ হিসেবে। ও না হয় বাজে। ভালোরা কি থাকবে না? তাছাড়া আমরা আছি কি করতে? আমরা থাকতে কি করবে, কি বলবে? চল না। কতদিন পর দেখা হবে সবার বলতো। কারোর কারোর দেখবি বাচ্চা কোলে নিয়ে আসছে। তুই যাবি বউ নিয়ে। থ্রিলিং ব্যাপার না?’
ঈশানের মোটেই থ্রিলিং ব্যাপার লাগছে না। এমনিতেই তার হৈ হট্টগোল খব একটা পছন্দ নয়। নিয়াজদের ছেলেমানুষী বা হৈ চৈ ছাড়া আর কারোর সাথে হাসাহাসি করতে পারে না সে। তবে নিয়াজের লাগাতার অনুরোধে খানিক নরম হলো বোধহয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
—’বেশ, দেখি। পরিস্থিতি বুঝে। আজ ব্যাস্ত। ওটা কবে?’
—’কালকে।’
—’ওকে। দেখি।’

গোটা একটা ঘরের অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হতে হয়। বিধ্বস্ত সবকিছু। মনে হচ্ছে খানিক আগেই তান্ডব বয়ে গিয়েছে। কোনো জিনিস তার জায়গামতো নেই। কাচের জিনিস থেকে শুরু করে আসবাবপত্র, সবই ভাঙাচোরা অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বাঁ হাতের কনুই এর দিকটা ছড়ে গিয়েছে প্রায়। টপটপ করে রক্ত পরছে সেখান থেকে। সে নিয়ে কাউচের ওপর কঠিন মুখে বসে আছে ইয়াজ। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে রাগে। কপালের শিরা উপশিরা ফুলেফেঁপে আছে। দপদপ করছে সে-সব। চোখের দৃষ্টিতে কাউকে ভষ্ম করে দিতে সম্ভব সে! খানিক দূরেই পাথরের মতো দাড়িয়ে আছে তার বাড়ির সেই কাজের মেয়েটা। মিতু! মেয়েটা যেনো নড়তে, চড়তে ভুলে গিয়েছে। বরফ হয়ে জমে আছে৷ শ্বাস ফেলছে কি -ফেলছে না, বোঝা যাচ্ছে না!
ইয়াজ চুপ করে বসা প্রায় মিনিট বিশেক। দুজনের কেউ-ই কোনো কথাই বলছে না। এতক্ষণে মুখ খুললো ইয়াজ। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

—’ তোমার সাহস কি করে হয় আমার বাচ্চা পেটে ধরার? আনসার মি। কোন সাহসে এমন একটা কাজ করে বসলে?’
মিতু পাথরবনে যায়। সাহস! সে কাজের মেয়ে বলে মাতাল হয়ে রোজ রাতে তার ওপর অত্যাচার করা যায়। তাতে সাহসের দরকার পরে না! দরকার পরে কখন! যখন সেই অনাকাঙ্ক্ষিত রাতগুলোর সাক্ষী হিসেবে আর একটা ছোট্ট প্রান তৈরি হয়! মিতু জবাব দিতে পারে না, আর না তো এসব ব্যাক্ত করতে পারে। সে কে! সামান্য কাজের মেয়ের। রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে আসা মেয়ে। আজ বাড়ির মালিকের কাছে অত্যাচারিত হয়েছে, এ বাড়িতে না আসলো পথেঘাটে হতো। যেতে আসতে পুরুষ মানুষ নাক হিং’স্র প্রানীরা খু’বলে খে’তো তাকে! ভাগ্য তার একই থাকতো। বদলাতো না কখনো।
ইয়াজ গজগজ করছে রাগে। দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরছে বারংবার। অসহায় লাগছে কি! লাগছে তো। সে তো মনেই করতে পারছে না এই মেয়ের সাথে সে ঠিক কি করেছে। কোনো একদিন ভুলে ভুল হয়ে গিয়েছিলো কি! নাকি ছলনায় মজেছিলো সে! নারীজাতির ছলনা! ইয়াজ পুনরায় চেঁচিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,

—’ জবাব দিচ্ছো না কেনো? কিভাবে হলো? কবে কাছে গিয়েছিলাম আমি? হু?’
—’একদিন? ‘
ভ্রু কুঁচকে আসে ইয়াজের।
—’কিসের একদিন? ‘
সামান্য নড়েচড়ে উঠলো মেয়েটা। ইয়াজ কি ভাবছে একদিন কাছে এসেছিলো সে! হাসি পেলো যেনো। এবং খানিকটা সাহসও সঞ্চয় হলো আচমকা কোথা থেকে যেনো। মিতু মিহি কন্ঠে বললো,
—’বিগত কয়েকমাস যাবৎ রোজ রাতে আপনি আমার ঘরে আসতেন, সাহেব। রোজ… রোজ আমাকে…’
থমকায় ইয়াজ। মেয়েটাকে বাড়ি এনেছে মাস তিনেক হবে। কি যা তা বলছে মেয়েটা! ইয়াজ কড়া কন্ঠে বললো,

—’মাথা খারাপ তোমার? ছলনা কার সাথে করছো বুঝে করছো না? এর পরবর্তীতে তোমার সাথে কি হবে বুঝতো পারছো?’
মস্তিষ্ক নত হয় মেয়েটার। হাঁটু ভেঙে বসে পরে মেঝেতে। হাঁটুর নিচে কিছু বিধলো কি! বিধলো মনে হয়…
—’আপনার কোনো রাতের কথাই মনে নেই? নেশা করে থাকতেন আপনি। ‘
—’তুমি কাছে আসতে দিতে কেনো, ব্লাডি উইমেন!’
—’পুরুষমানুষের জোরের সাথে আমি পারি? প্রথম রাতে…সেদিন রাতে হাত পা বেধে ফেলেছিলেন আমার ওড়না দিয়ে। তারপর…’
মাথা ভনভন করে উঠলো ইয়াজের। বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গাল চেপে ধরলো মেয়েটার। ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠলো সে।

—’একবার গিয়েছিলাম। পরের দিন জানাস নি কেনো আমাকে? ব্লা ‘ডি কোথাকার। মালিকের সাথে শোয়ার লোভ ছাড়তে চাসনি? রাস্তার মেয়ে ছিলি তুই, বোঝা উচিত ছিলো। শ খানেক পুরুষ মানুষ রোজ সামলাতি তোরা। এখানে এসে এতো রঙহীন জীবন তোর পোষাবে কেনো? তাই সোজা নামলি মালিককে বশ করে। ‘
আরও অসংখ্য অকথ্য গালি দিলো ইয়াজ। থরথরিয়ে কেঁপে উঠছো মেয়েটা। ইয়াজের হাতের চাপে চোয়াল ছিড়ে যাচ্ছে বোধহয়। চোখজোড়া লাল হয়ে আসছে। মণি বের হয়ে আসার উপক্রম। ইয়াজ হিসহিস করে বললো,

—’তোকে রেখেছিলাম কেনো, আর তুই করে বসলি কি? তোর মতো মেয়ে প্রসি’টিউড হবে না তো কি! ‘
ধা’ক্কা দিয়ে ফেলে দিলো মেয়েটাকে। হুড়মুড়িয়ে কা’চের ওপর পরলো মেয়েটা। ব্যাথায়, অপমানে ম’রে যাচ্ছে জেনো। সত্যিই তো কেনো পরের বার গুলোতে বাঁধা দেয়নি সে, কেনো জানাননি ইয়াজকে! অথবা আর কাউকে! এইতো গত রাতেও ইয়াজ এসেছিলো তার কাছে। সারারাত চলেছে তান্ডব। কেনো পরে আর বাঁধা দেয়নি তার কারণ বিশাল। এখন এক পুরুষ স্পর্শ করে তাকে। এই বাড়ি থেকে বের করে দিলে তার জায়গা কোথায়? কোনো পতি*তালয়েই তো হতো। কে বিয়ে করতো তাকে, কে ঘর সংসার দিতো। এখানে আর কিছু পাক না পাক। অদৃশ্য একটা সংসার তো আছে। মাতাল স্বামী রা যেমন সারাদিন দেশ দেশান্তর ঘুরে ঠিকই রাতে বউদের কাছে ফেরে, আদর করতে মরিয়া হয়। সে তো তার আর ইয়াজের সম্পর্কটাও এমন দেখতে শুরু করেছিলো। একটা ছোট্ট সংসার ভাবতে শুরু করেছিলো। সে খুব ভালো করে জানে, পুরোপুরি অলীক স্বপ্ন এটা তার। তবুও! দশ পুরুষের স্পর্শের থেকে এক পুরুষেরা স্পর্শে কেটে যাক এই পাপের জীবন…কিন্তু এই পাপের ফসল! এই বাচ্চাটা কি করে দুনিয়ায় এলো তা জানা নেই তার। জানা নেই একদমই।
ইয়াজ কাঙ্ক্ষিত জবাব না পেয়ে উগ্র হলো আরও বেশি। মেয়েটার নরম গালে প্রহার করে গেলো লাগাতার! মিতু প্রতিবাদ করে না, কোনো উচ্চ বাক্য করে না। কন্ঠস্বরে যেনো শব্দ ফুরিয়েছে তার।

—’এই বাচ্চা আজকেই ফেলে দিয়ে আসবি তুই। না হলে জানে মেরে দেবো তোকে।’
বজ্রপাত হলো যেনো মেয়েটার মাথায়। শ্বাস আটকে এলো এক মূহুর্তের জন্য। সম্ভবত এই মূহুর্তে কাচের ওপর কাত হয়ে পরে আছে সে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চিনচিন ব্যাথা শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে সে-সব অসহ্য যন্ত্রনা অনূভুত হলো না। ইয়াজের এই একটা কথায় দম ফুরিয়ে এলো যেনো তার। লোকটা কি বলেছে বুঝতে পারা মাত্রই হামাগুড়ি দিয়ে উন্মাদের মতো এগিয়ে এলো ইয়াজের পায়ের কাছে। ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললো, আকুতিভরা কন্ঠে আউরালো,
—’এটা করবেন না। এ মহা পাপ। মানুষ হত্যা মহা পাপ। এ আমি করতে পারবো না।’
তীব্র রাগ নিয়ে তাকালো ইয়াজে। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

—’পাপের ফসল ওটা। সেটাকে জিয়িয়ে রাখতে চাস? আমার সব শেষ করতে চাস? আমাকে ধ্বংস করতে চাস ওটাকে দুনিয়ায় এনে! একটা প্রস্টি*টিউটের পেটে আমার সন্তান? পাগল পেয়েছিস আমাকে?’
ইয়াজ ঝুকে এলো সামান্য। মিতু তখনো তার পায়ের কাছে মাথা ঠেকিয়ে আকুতি করেই যাচ্ছে। তবে সে-সবে কান দেওয়ার সময় এখন নয়। ঝটকা টানে পা’টা সরিয়ে গটগট করে বের হয়ে গেলো ঘর থেকে।
ইয়াজ বের হওয়া মাত্র মুখ চেপে চিৎকার আটকালো মেয়েটা। তার মতো মেয়েকে ইহজন্মে মেনে নেবে না ইয়াজ। আর না তো এই বাচ্চাটাকে। যতরাত লোকটা তার কাছে এসেছে সজ্ঞানে তো থাকতই না। বরং অন্য এক নারীর নাম জপ করতো পুরোটা সময়। তাকে কল্পনা করতো কি! কার জন্য এতো পাগলামি করে এই মানুষ টা। সে নারীকে দেখার বড্ড সাধ হচ্ছে আজকে তার। গতরাতেও তাকে ওই মেয়ে মনে করেই ডেকেছে। আদর করেেছে! ‘তিতির!’ তিতির নাম মেয়েটার। মাঝেমধ্যে সে নিজেই ভুলে বসতো, সে আদতে তিতির নয়, মিতু!

—’ লাশের নখে যে সামান্য রক্ত, আর মাংসের অংশ পাওয়া গিয়েছিলো সেটার রিপোর্ট এসেছে? জানা গিয়েছে সেরকম কিছু? ‘
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাজিদ। এটা সুবর্ণার রিপোর্ট । ডাক্তার মাথা নাড়লো। গম্ভীর মুখে বললো,
—’মেয়েটার নয়। খুব সম্ভবত খু’ নির। মেয়েটাকে যখন টর্চার করা হচ্ছিলো, তখন মেয়েটা আত্মরক্ষার জন্য খামচে ধরেছিলো। ‘
—‘এই স্যাম্পল আগের কোনো লাশের কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছে কি?’
ডানে বায়ে মাথা নেড়ে নাকচ করলো ডাক্তার।
—’নাহ। যায়নি। এটা শুধু এই লা’শের নখেই পাওয়া গিয়েছে । তবে হ্যা। একটা জিনিস। একই রক্ত আর এক জায়গায় পেয়েছি আমি।’
ভ্রু জোড়ার ভাজে সরু ভাজ ফেলে সাজিদ জিজ্ঞেস করলো,
—’কোথায়?’
—’ওই বোতামে। সেখানটায় সুক্ষ্ম একটু রক্ত ছিলো। বোতামে লেগে থাকা রক্ত আর ভিকটিমের নখের রক্ত একই মানুষের। একই ব্লাড গ্রুপ। বি নেগেটিভ।’
থমকায় সাজিদ। আয়নার দেখলে হয়তো টের পেতো তার মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গিয়েছে প্রায়। বোতাম টা পাওয়া যায় লা’শ থেকে সামান্য দূরে। ধুলো মাখা অবস্থায়। মাথা ভনভন করে উঠলো সাজিদের। গলা শুকিয়ে এলো। অনেকগুলো সূত্র মিলে যাচ্ছে। কিন্তু কেনো মিলছে! এতো কাকতালীয় কি করে হতে পারে সবটা। এখন আবার ব্লাড গ্রুপও! তা কি করে হয়। সাজিদের কন্ঠস্বর ভোতা হয়ে এলো খানিকটা।

—’আর কি জানা গিয়েছে?’
—’ওটা পুরুষ মানুষের রক্ত, আর মাংস ছিলো। বয়স আনুমানিক ২৭ থেকে ৩২। দেহে হিমোফিলিয়া বি এর উপসর্গ আছে। সম্ভবত লোকটা আক্রান্ত এই রোগে। সম্ভবত না, আক্রান্তই…’
কি আশ্চর্য! আজকে সাজিদের পাগল হওয়ার দিন কি! কেনো হচ্ছে এসব! সে পুরুষ মানুষ তার ওপর পুলিশ। তার কি খুনির পরিচয় জানতে গিয়ে এতো বোধবুদ্ধি লোপ পেলে চলবে। সাজিদ একটা চেয়ার টেনে নিজে বসলো, ডাক্তার কেউ ইশারা করলো বসতে। তারপর ধীর কন্ঠে বললো,
—’মেয়েটার দেহ থেকে কোনো সিমেন পাওয়া যায়নি বলছিলেন?’
—’জ্বী। যায়নি। আপনাদের ভাষ্যমতে তখন কোনো এক বৃদ্ধা পৌছে গিয়েছিলো সেখানে। আশেপাশে মানুষের আঁচ করতে পেরে, খুনি সম্ভবত তৎক্ষনাৎ খুন করে পালিয়ে যায়। নিজের চাহিদার শেষ অবধি থাকেনি বা থাকতে পারেনি।’

—’ওটা পাওয়া গেলে একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়া যেতো। যার রক্ত পাওয়া গিয়েছে নখে। মানুষ টা একই কি-না। ‘
—’নিঃসন্দেহে একই মানুষ ছিলো। মেয়েটা যেভাবে খামচে ধরেছিলো। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কি পরিমাণ টর্চারের সময় ধরেছিলো মেয়েটাকে। ‘
সাজিদ থ মেরে থাকে। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
—’বাকি লাশগুলোতে যে সিমেন স্যাম্পল পাওয়া গিয়েছে, সেটার ডিনএনএ টেস্ট মিলিয়ে দেখেছেন এই ব্লাড স্যাম্পলের সাথে? ‘
—’ওগুলোর স্যাম্পল তো ঢাকা থেকে এসে পৌছায়নি স্যার।’
থমতমে মুখটা রক্তিম দেখাচ্ছে সাজিদের। হালকা কন্ঠে বললো,
—’আমাকে আরও পনেরো দিন আগে জানিয়েছে পাঠাচ্ছে। এখনও আসেনি! ‘
উঠে দাড়ালো সাজিদ। শান্ত স্বরে বললো,

—’আমি যোগাযোগ করছি। তারপর পাঠিয়ে দেবো। আর কিছু জানা গেলে জানাবেন।’
পা দুটো থরথর করে কাঁপছে সাজিদের। বছর সাতেক আগে একদিন এলাকার মাঠে ক্রিকেট খেলার কথা মনে পরে গেলো। সেদিন কিভাবে যেনো পা কেটে গিয়েছিলো ঈশানের। আশ্চর্যের বিষয় ওইটুকু কাটা থেকে রক্ত পরা বন্ধ হচ্ছিলো না কিছুতেই। অগত্যা ছেলেটাকে জোর করেই ধরে নিয়ে যেতে হলো হসপিটালে। কি কারণ বলেছিলো ডাক্তার? হিমোফিলিয়া না? হ্যা, তাই তো।
অনিমার মায়ের অপারেশন আঁটকে ছিলো রক্তের জন্য। বি নেগেটিভ রক্ত তারও। পাওয়া যাচ্ছিলো না কিছুতেই। ঈশান দিয়েছিলো না সেদিন রক্ত? হ্যা ঈশানই তো দিয়েছিলো।
সুবর্ণা যেদিন মারা যায়, সেদিন ঈশানের বাড়িতে ইফতার মাহফিল ছিলো। ওই সময়টায় দু’ঘন্টার জন্য কোথাও গিয়েছিলো না ঈশান? সুবর্ণার মৃত্যুর সময় আর ওই সময় টা কি এক ছিলো? একই তো ছিলো বোধহয়। আর বোতাম টা! ঈশানের ওই শার্টটা সম্ভবত অনিমা গিফট করেছিলো। কোনো এক বছরের জন্মদিনে। কেনার সময় সে-ও ছিলো সাথে। স্পটে রয়েল এনফিল্ডের চাকার দাগ। ঈশানের বাহুতে রক্তের ছাপ।
শক্তপোক্ত পুলিশ অফিস সাজিদ তালুকদারও চোখে অন্ধকার দেখলো এক মূহুর্তের জন্য। আর কিসের ভিত্তিতে দেরি করবে! অন্য কাউকে সন্দেহ করলে সাজিদ কি এতক্ষণে অ্যারেস্ট করে ফেলতো না? করতো তো। আজ পারছে না কেনো! পারা উচিত তো তার। একজন সৎ পুলিশ অফিসার হিসেবে এক্ষুনি তার ছোটা উচিত সন্দেহভাজন কে গ্রেফতার করে ফেলা। কিন্তু, সাজিদ সেটা পারছে না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। বল পাচ্ছে না শরীরে। গটগট করে গিয়ে উঠে বসলো গাড়িতে। ড্রাইভার কে গম্ভীর কন্ঠে আদেশ করলো থানার দিকে যেতে।

—’ বস, মেয়েটার ডিএনএ রিপোর্ট এসেছে। সব পরিকল্পনা তো ঘেটে যাচ্ছে আপনার বন্ধুর জন্য। এখন কি করবেন। খুব সম্ভবত দু এক এর মধ্যেই কিছু একটা ঘটে যাবে।’
সোমবার দুপুর। ঠিক দুপুর বলা চলে না, দুপুড় পেরিয়ে বিকেল হতে যাচ্ছে। ঈশান অফিসে ছিলো। অমিতের ফোন পেয়ে মুখ গম্ভীর থেকে দ্বিগুণ গম্ভীর হলো।
—’সাজিদের ট্রান্সফার কার্যকর হতে কতদিন? ‘
—’ডিআইজি বলেছে সামনে মাসে।’
—’অনেক দেরি হয়ে যাবে ততদিনে। সবেতে জল ঢেলে দেবে।’
—’সেটাই তো বলছিলাম, বস। কি করবেন? আপনি ঢাকা চলে আসুন। আমার কেনো যেনো মনে হচ্ছে যেকোনো সময়… ‘
ঈশান থামিয়ে দিলো অমিতকে। শীতল কন্ঠে বললো,
—’বাকি স্যাম্পলগুলো আটকে রাখতে বলেছিলাম। রাখা হয়েছে?’
—’হয়েছে, বস।’
—’গুড জব। সাজিদের বদলির আগে যেনো সে-সব এখানে এসে না পৌছায়। তিতিরকে রেখে কোথাও যাওয়া নিরাপদ নয়। আমি সরা মাত্র ইয়াজ মির্জা হামলে পরবে।’

—’বস, ইয়াজ মির্জাকে আমরা কোনোভাবে…’
পুনরায় কথায় বাঁধা দিলো ঈশান। রাশভারি জবাবে বললো,
—’পারি না। প্রমান কোথায়? এ দেশে ওর অস্তিত্ব প্রমান করো আগে। তারপর না বাকিটা। যেখানে সিঙ্গাপুরে ওর নাগরিকত্ব আছে, সেখানে ওদেশ থেকে ওর বিরুদ্ধে কিছু জোগাড় করতে পারবো না আমরা। ‘
—’ আপনি কয়েকটা দিন গা ঢাকা দিন, বস।’
শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান।
—’কাকে কি বলছো? কে গা ঢাকা দেবে৷ ঈশান আরশাদ? হাসালে,অমিত।’
—’হাসবেন না, বস। ভালোর জন্য বলছি। সব এলোমেলো হয়ে যাবে না হলে। ম্যাডামকে আমি দায়িত্ব নিয়ে দেখে রাখবো। আপনি সরে যান।’

—’তোমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে?’
—’তাই রাজি। তবুও যান।’
সন্তুষ্টির হাসি হাসে ঈশান। নরম হয়ে আসে সে নিজেও। অমিত তার অন্ধভক্ত। সে দিলে হাসিমুখে বিষও গলাধঃকরণ করবে ছেলেটা।
—’না অমিত, তা হয়না। নিজেকে বাঁচাতে তোমাকে ডোবাতে পারি না। তুমি এক কাজ করো। নিজের মতো করে রুষমিতা মির্জা আর ইয়াজ মির্জার খবর করো। জাস্ট একটা প্রমান বের করো। যেটা এ দেশে পাওয়া সম্ভব। তারপর দেখছি আমি সবটা।’
—’বস, আর একটা খবর। ওই তাহমিদ কায়েস। উনি মোহাম্মদপুর থানার এসপি ছিলো। ও রুষমিতা মির্জার পিছু লেগেছে। কোনো টিচার ফিচার নয়।’ ‘
পুনরায় হাসলো ঈশান। বাঁকা কন্ঠে বললো,
—’ওই চুনোপুঁটি আমাকে নিয়ে খেলতে চায়। ছল করে আমার বউয়ের জন্য সম্বন্ধ নিয়ে আসে! আমাকে ধরতে। আমার পরিচয় জানতে! আমারই এলাকায়। ও ভেবেছে আমি এতোই বোকা, ওর সম্পর্কে খোঁজ নেবো না? ননসেন্স একটা। ওকেও খেলাবো, নাচাবো। ওর কথা বাদ দাও। যেটা বললাম করো। রুষা থেকে ইয়াজ অবধি পৌছাও। যা করতে হয়, তার জন্য। করে ফেলো।’

আজকে ঈশানদের গেট টুগেদারের আয়োজন করা হয়েছে ছোট্ট করে। ঈশান বারবার না করা সত্বেও ছেলেগুলো ছাড়েনি। তিতির আর নিশিকে নিয়ে ঈশান বের হয়েছে একটু আগেই। নূরি যায়নি। না যাওয়ার কারণ, আজকাল ঈশানের সামনে যেতে পারে না সে। চোখ তুলে তাকানো তো দূরে থাক। তার ওপর ওখানে নাঈম থাকবে! তবে নিশির না করার কারণ নেই। কারণ নিয়াজ আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিলো তাকে। তার ওপর তিতিরের বায়না তো আছেই। তিতির বেশ করে লক্ষ করছে ঈশানের মুখটা। অন্যদিনের থেকে গম্ভীর হয়ে আছে না! তাই তো। কাল রাতেও আজেবাজে কিছু বায়না করেনি। নিঃশব্দে ঘুমিয়ে গিয়েছে।সারাদিনও টুকটাক কথা শুধু। প্রচন্ড কাজের চাপ চলছে কি মানুষটার!
নিশি বসেছে পিছনে। দু কানে হেডফোন গোঁজা তার। এদিকে তিতির বারংবার তাকাচ্ছে ঈশানের দিকে। আড়চোখে অবশ্যই। গন্তব্য দূর নয় খুব একটা, কাছেই। আধঘন্টার রাস্তা। এখানকার একটা ছোট্ট
রেস্তোরাঁয় আয়োজন করা হয়েছে গেট টুগেদারের।

—’দুপুরে খেয়েছেন?’
—’হু।’
—’শরীর কি খারাপ আপনার?’
ঈশান একবার তাকালো তিতিরের দিকে। গম্ভীর মুখটা স্বাভাবিক হয়ে এলো খানিকটা। মাথা নাড়লো ডানে বায়ে। মুখেও বললো,
—’অল গুড।’
তিতির শাড়ি পরে এসেছে। হালকা পারপেল রঙের একটা শাড়ি। শাড়িটা গত ঈদে তার বড় মামা উপহার দিয়েছিলো। পরাই হয়নি। আজ পরলো। ঈশান কি খেয়াল করেছে সেটা ? আজকে এতো অমনোযোগী কেনো লোকটা! সে শাড়ি পরেছে,, আর ঈশান তাকাচ্ছে না! রমনীর কি স্ত্রীগত অধিকার থেকে সামান্য আহ্লাদী হওয়া উচিত এখন? রাগ করা উচিত স্বামী সাজগোছে খেয়াল দিয়ে সুন্দর বলেনি বলে! তিতির আনমনেই মিটিমিটি হাসলো নিজের ছেলেমানুষী চিন্তাভাবনা দেখে।

ছোটখাটো রেস্তোরাঁ! সেটাই তো বলেছিলো ঈশান। কিন্তু মোটেই ছোটখাটো নয়। এটা সিলেট শহর থেকে একটু বাইরের দিকে। অন্য জেলার মধ্যে পরে হয়তো। বেশ ছিমছাম, নিরিবিলি পরিবেশে গুছানো একটা রেস্তোরাঁ। কাঠের তৈরি বলে মনে হচ্ছে। ফেইরি লাইট পেঁচানো পুরো ভবন জুড়ে। নিশি আর তিতিরকে নিয়ে ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেলো বাইরে থেকে যত নিরব মনে হচ্ছে, ভিতরটা ততটা নিরব নয়। বরং প্রায় সবাই এসে পরেছে। নিয়াজ, নাঈম দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। ওইতো ওদিকটার একটা টেবিল থেকে অনিমা আর রিতু হাত নাড়ছে। ওদেরকে যেতে বলছে ওখানটায়।

ঈশানকে দেখে প্রায় সকলেই হৈ চৈ শুরু করে ফেললো। এদিকটায় এগিয়ে এলো সবাই। তিতির খানিকটা আড়ালই হলো ঈশানের পিছনে। এরকম পরিবেশে অভ্যস্ত নয় সে। নিশি খুব একটা ইতস্তত করছে না। হতে পারে বয়সের ম্যাচুইরিটি। তাছাড়া নিশি যে ঈশানের আপন ছোট বোন সেটা সবাই জানে। আর নিয়াজের সাথেও যে কিছু একটা আছে সেটার হদিশও জানে অনেকেই। সুতরাং অনাকাঙ্ক্ষিত আরেক নারীকে দেখে নড়েচড়ে উঠলো সকলেই। বন্ধু মহলে ঈশানের বিয়ে সম্পর্কে আরও অবগত নয় কেউ। ক্ষুনাক্ষরেও বোধহয় কারোর আন্দাজ নেই ঈশান বিয়ে করতে পারে।
নাঈম, নিয়াজ দাত বের করে হাসছে দু’জনেই। নিয়াজ গলা খাদে নামিয়ে ঈশানকে উদ্ধেশ্য করে বললো,
—’দোস্ত, এনাউন্সমেন্ট টা কিভাবে করবি। এক্সাইটেড আমরা। ট্রাস্ট মি।’
ঈশান চোখ গরম করলো। কিভাবে করবে এনাউন্সমেন্ট। বিয়ে করেছে সে। এটায় সবাই অবাক হবে এমন মনে করছে কেনো ফাজিলগুলো! নিয়াজের বাঁকা কথায় পিঠে সম্পূর্ণ অন্য প্রশ্ন করলো ঈশান

—’সাজিদ আসেনি?’
ঠোঁট উল্টালো নাঈম। হতাশ কন্ঠে বললো,
—’কাজে আটকে আছে। রাত হবে সম্ভবত। ‘
ঈশান ভ্রু কোচকায়। যত ব্যাস্ততাই থাকুক। এ ধরনের ফাংশনে দেরি করে আসার বান্দা সাজিদ নয় মোটেই। আজ একবার মুখোমুখি হওয়া দরকার সাজিদ তালুকদারের। মুখোমুখি ফিল নেওয়া যায় অনেক কিছুর। পরবর্তী পরিকল্পনা সাজাবে তার পরেই। তিতির এরইমধ্যে নিশিকে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। টুকটাক কথাবার্তা হচ্ছে সবার মধ্যেই।
ফাহিম নামের ছেলেটাই উচ্ছ্বসিত হয়ে এগিয়ে এলো প্রথমে। নিশির দিকে তাকিয়ে সংযত মিষ্টি হাসি দিয়ে, আড়চোখে তিতিরকে দেখিয়ে বললো,
—’ওটা কে দোস্ত? ‘

ঈশান ঘাড় বাঁকিয়ে দেখলো তার থেকে খানিকটা পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা তিতিরকে। মৃদু হেসে পরিচয় দিতে যাবে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চোখে পরলো ওদিকটায় ড্রিংকস কাউন্টারের দিকে। হাতে অরেন্স জুস নিয়ে দাড়িয়ে আছে সয়ং তাহমিদ কায়েস। বলতে গিয়েও থমকালো ঈশান। তাহমিদ ছেলেটা পুলিশ হতে পারে, তবে তার সম্পর্কে যা রিপোর্ট অমিত জোগাড় করে দিয়েছে তা মোটই সন্তোষ জনক নয়। ছেলেটা হাত ধুয়ে নেমেছে তার পিছনেও। কারণ টা কি! শুধু রুষা নিশ্চয় নয়। ঢাকার অনেক পলিটিক্যাল মানুষজনের সাথে রাতদিন ওঠাবসা ছেলেটার। ভালো ক্যারেকটার সার্টিফিকেট পায়নি সে। তার কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে নিজের পরিচয় বদলে শিক্ষকগিরি করার! আদৌ রুষাকে খুঁজছে! নাকি ইয়াজ মির্জার লোক ও!
সত্যিই কি জানে না তিতির তার বউ, নাকি জেনে বুঝে খেলতে চাচ্ছে ঈশানের সাথে। ঈশান দু সেকেন্ড ভাবে কিছু একটা। তারপর। গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,

—’কাজিন।’
চমকে তাকালো তিতির। বলাবাহুল্য নিয়াজরাও সবাই হা করে তাকালো। কারণ তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো, ঈশান আজকে উঁচু গলায় পরিচয় করিয়ে দেবে তিতিরকে। ছেলেটা আজও সেটা করলো না! তাহমিদ কায়েসের নজরে পরেছে এদিকটার ভিরভাট্টা। ভিরের মধ্যে লম্বা মতো সুপুরুষ কে দেখে উজ্জ্বল হলো তার চেহারা। একপ্রকার সবাই ঠেলেঠুলে এদিকটায় এসে ঈশানের সাথে হাত মেলাতেই দৃষ্টি আটকালো পাশের পুতুলটার দিকে। একগাল হেসে মাথা ঝুকিয়ে অভিবাদন জানালো তিতিরকেও। সৌজন্যতার হাসি হাসলো তিতিরও।
অনিমা আর রিতু এদিকে এসে তিতির আর নিশিকে মেয়েদের ওদিকটায় নিয়ে যেতেই সংযত মুখের ভাষাগুলো লাগামছাড়া হলো। অশ্লীল কথার ফুলঝুড়ি ছুটলো একেকজনের মুখ থেকে। এসবের মধ্যে চোখ গরম করে এগিয়ে এলো নাঈম আর নিয়াজ।

—’কি রে ভাই। কোথা ভাবলাম বউয়ের পরিচয় টা দিবি। কিসে আটকায় তোকে বার-বার! আজব পাবলিক তুই।’
—’তাহমিদ কায়েস কে দেখিসনি?’
—’তো? সেকারনেই তো আরও মাইকিং করে জানাবি, যে ওটা তোর বউ।’
—’সাজিদ আসছে না কেনো?’
—’কথা ঘুরাবি না।’
—’স্টুপিডের মতো পিছু পরে থাকিস না। আমার বউ কে নিয়ে আমি কি করবো সেটা তোদের বলবো! ‘
বিরক্ত মুখে অন্য দিকে তাকায় ঈশান। যতটুকু যেনেছে ততটুকুতে ছেলেটাকে মোটেই সুবিধার লাগেনি ঈশানের। তিতির তার বউ জানার পর ছেলেটা চটে যাবে কি! তিতিরকে উল্টোপাল্টা জানাতে চাইবে কি! যদিও ঈশান খুব ভালো করে জানে, যে কেউ এসে যা তা বললেই তিতির বিশ্বাস করবে না। তবুও। এখান থেকে যতদ্রুত সম্ভব মেয়ে দুটো কে নিয়ে বিদেয় হবে সে।

ঈশান চুপচাপ বসা। আড্ডা চলছে পুরোদমে। কলেজ, ভার্সিটি লাইফের গল্পে মশগুল সবাই। স্মৃতিচারণে ব্যাস্ত। পায়ের টেবিলেই বসা তিতিররা। তিতির বারংবার তাকাচ্ছে গম্ভীর ঈশানের দিকে। অস্বাভাবিক মন খারাপ হয়েছে মেয়েটার। ক্ষিন অভিমানও বলা যেতে পারে। ফাহিম হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলো,
—’তোর কি অবস্থা সেটা বল। রুষা আসলো না কেনো? আগের নাম্বারটায়ও পেলাম না ওকে।’
টেবিলের ওপাশেই, ঈশানের মুখোমুখি বসে আছে তাহমিদ কায়েস। নড়েচড়ে বসলো এই কথায়। ঈশান কি জবাব দেয় সেটা শুনতে মহা আগ্রহী। ঈশানও সম্ভবত এরকম কিছু একটা চাচ্ছিলো। লোকটার মতিগতি বুঝতে। যতদূর জেনেছে, তার এক কলেজ ফ্রেন্ডের পরিচিত। সে সূত্রেই আজকের গেট টুগেদার এ এসেছে ছেলেটা। ঈশান হাতের জুসে চুমুক দিতে দিতে বললো,

—’জানি না।’
—’আজ কথা হয়নি?’
—’কখনোই হয় না।’
মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো উপস্থিত সকলে। রুষার নাম শোনা মাত্র কান খাড়া করে দিয়েছে তিতিরও। সরু চোখে দেখছে ঈশানকে। নিয়াজ, নাঈম বিরক্ত মুখে বসা। এই ছেলের মতিগতি বোঝা তাদের এ জীবনে সম্ভব নয়। ফাহিম চেয়ারটা খানিক এগিয়ে নিয়ে এসে বললো। ভ্রু নাচিয়ে বললো,
—’ গার্লফ্রেন্ড রাগ করেছে বুঝি?’
—’ কে গার্লফ্রেন্ড! ‘
—’দোস্ত মনোমালিন্য হয়েছে বুঝতে পারছি। ওইসব একটু আধটু হয়ই।’
ঈশান হাতের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে বললো,
—’আমার সাথে ওর কখনো সম্পর্ক ছিলো না ওর। সেটা তোরাও জানতি। ‘
দাত বের করে হাসলো ফাহিম। বাঁকা গলায় বললো,
—’মেয়েটা তো শাড়ির আঁচল ফেলে পরে থাকতো তোর পিছে। অমন মেয়ে আমাদের পিছনে পরে থাকলে আমরা কবে… উহুম উহুম…’

—’তার জন্যই আমার সাথে গেলো না ওর। বুকের আঁচল ফেলে দাড়িয়ে থাকা মেয়েরা কখনো ঘরের বউ হতে পারে না। আর সেই পুরুষটা যদি হয় ঈশান আরশাদ দেওয়ান। ‘
শব্দ করে হেসে ফেললো সকলেই। রুষার সম্পর্কে কমবেশি জানে সবাই। মেয়েটা ঈশানকে পেতে কি না কি করেছে। ড্রামা বাজ পুরো। ঈশানও তখন কেনো সায় দিতো সেটা অবশ্য সবারই অজানা।
দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে তিতির। বউ হলো সে। অথচ পুরোটা সময় আড্ডা হচ্ছে রুষা কে নিয়ে! মেজাজ খারাপ হচ্ছে তার। ইচ্ছে হচ্ছে নির্লজ্জতার চূড়ান্ত করে লোকটার ঠোঁট ঠোঁট চেপে সবাইকে নিজ থেকে জানিয়ে দিতে।
অনিমারা সবাই বুঝতে পারছে সেটা। তিতিরের মুখাবয়ব রক্তিম হয়ে গেছে রাগে। নিচু কন্ঠে বললো,
—’ঈশানকে একটা শাস্তি দেওয়া উচিত তিতির। নিজ থেকে এ ছেলে কবে স্বীকার করবে বলোতো? এতো লুকোচুরি কিসের ওর?’

তিতির চুপ করে থাকে। মাথা দপদপ করে উঠছে। রুষার সাথে যোগাযোগ নেই শোনা মাত্র, একগাদা মহিলা ঘুরঘুর শুরু করে দিয়েছে ঈশানের আশেপাশে। হি হি, হা হা করতে ব্যাস্ত। অনিমা ঠোঁট টিপে হাসলো।
—’তোর সংসারের ভয় নাই ভাই? তোর বউয়ের চেহারা দেখেছিস? তাকালেই ভষ্ম করে দেবে।’
নিয়াজের কথায় চকিত পিছনে তাকালো ঈশান। তিতির তার থেকে দু হাত দূরের টেবিলে বসা। চোখ বুঝে ফেললো সে। সর্বনাশ করেছে। একপ্রকার আতঙ্কিত হয়ে নিচু কন্ঠে বললো,
—’ওরা এখানে বসেছে কখন?’
—’সেই শুরুতেই।’
—’সব শোনা যায়?’
—’অনি তো তাই বললো।’
—’গেলো।’
নিয়াজ কাঁধ জড়িয়ে ধরলো ঈশানের। গম্ভীর গলা বললে,
—’এমন তো নয় যে এই রাগে বউ কাছে ঘেষতে দেবে না তোকে। তোর তো আর সে চিন্তা নাই।’
—’কে বললো নেই?’
নাঈম, নিয়াজ দু’জনেই ঝট করে তাকালো একে অপরের দিকে। একইসাথেই চেঁচিয়ে উঠলো দু’জনে

—’আছে?’
ওপর নিচ নির্বিকার মাথা নাড়লো ঈশান।
—’তুই কি…তুই কি বাসর টা সেরে ফেলেছিস দোস্ত? ‘
ঈশান বিরক্ত মুখে তাকালে বন্ধুদের দিকে। ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো,
—’ বিয়ে করা বউ ও আমার। বিয়ের আড়াইমাস চলে। কোন ধরনের প্রশ্ন করলি?’
আকাশ থেকে পরলো দু’জনে। নিয়াজ নিজেকে সামলে কপট অভিমান দিয়ে বললো,
—’জানালিও না?’
—’এটা মাইকিং করার বিষয়?’

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৫

—’তাহলে তোর গেছে ভাই। বাসর সেরেও বউয়ের পরিচয় দিচ্ছিস না। পরের গেট টুগেদার এ কি সোজা নিজের বাচ্চা নিয়ে এসে বলবি–ওর তুই মামা লাগিস?’
—’শাট আপ।’
—’তোর বউয়ের আশেপাশে আজকে মৌমাছির অভাব নেই। দেখ কয়টা প্রস্তাব পাস আজকে আবার।’

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here