Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৭

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৭

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৭
জেরিন আক্তার

পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গেলো প্রাণেশা। সারারাত ঘুম হয়েছে কিনা সন্দেহ। স্নিগ্ধর সাথে দেখা করতে যাবে ভেবেই খুশি। তার মধ্যে আজকে সৌরভ বাড়িতে থাকছে না, আরশাদ খানের সাথে শহরের বাহিরে একটা কাজে যাবে।
স্নিগ্ধ ঘুম থেকে উঠেই ফোনটা হাতে নিয়ে প্রাণেশাকে মেসেজ দিলো,
“গুড মর্নিং, প্রাণ।”
প্রাণেশা মেসেজটা দেখে নিয়ে কল দিলো। স্নিগ্ধ রিসিভ করে ঘুমজড়ানো গলায় বলল,

“গুড মর্নিং ম্যাডাম।”
“গুড মর্নিং। স্যার ভালো আছেন?”
“এখন স্যার বলতে হবে না। ক্লাসে গেলে বইলেন।”
“না আমার যখন ইচ্ছা হবে তখনই বলবো। আপনিই না বললেন আমি আপনার স্পেশাল স্টুডেন্ট। তাহলে আপনিও আমার স্পেশাল স্যার।”
স্নিগ্ধ হেসে “হুমমম” বলল। প্রাণেশা বলল,
“আপনি ঘুমিয়ে আছেন নাকি?”
“হুমম। বোঝোই তো বউ নেই কে জাগিয়ে দিবে?”
“কেনো বিয়ে করুন!”
স্নিগ্ধ অবলীলায় বলে দিলো,
“তুমি রাজি থাকলে তোমাকেই বিয়ে করবো ইনশাআল্লাহ।”
প্রাণেশা চুপ করে রইলো। স্নিগ্ধ কিছু সেকেন্ড পরে বলল,
“কি হলো কথা বলছো না যে?”
প্রাণেশা থমথমে গলায় বলল,
“ভালোবাসেন আমায়?”
“উহু!”
প্রাণেশা ফোনটা কেটে দিলো। স্নিগ্ধ হেসে ফোনটা পাশে রেখে উঠে বসলো। এরপরে বিছানায় থেকে নেমে চলে গেলো ফ্রেশ হতে।
প্রাণেশা ফোনটা রেখে রুম থেকে বেরোলো। স্নিগ্ধর কথায় মনটা বেশ খারাপ হয়েছে। একবার ভালোবাসি বললেই বা কি এমন ক্ষতি হতো।

দুপুর দুপুরে আরশাদ খান আর সৌরভ যাওয়ার জন্য রেডি হলো। প্রাণেশা ড্রইং রুমে বসে আছে। সৌরভ কাছে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“এই শোন বাড়ির বাহিরে বের হবি না। বাড়িতেই থাকবি। আর আমাদের ফিরতে।একটু রাত হবে টেনশন করিস না। রোকেয়া আন্টিকে তোর সাথে সাথে থাকতে বলেছি।”
প্রাণেশা মাথা নাড়ালো। সৌরভ এরপরে আরশাদ খানের সাথে চলে গেলো। এরপরে প্রাণেশা উঠে রোকেয়া বেগমের কাছে চলে এলো। তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আন্টি, জানো আজকে আমি খুব খুশি।”
রোকেয়া বেগম হেসে হেসে বললেন,
“হুমম, আমি একটু একটু আন্দাজও করতে পারছি। মনে হচ্ছে আমার মেয়েটা প্রেমে পড়েছে।”
বড্ড লজ্জা পেলো প্রাণেশা। মিটিমিটি হেসে বলল,

“তুমি কি করে জানলে?”
“আমার সন্তান নেই। তুমিই আমার সন্তান। তোমার বয়স যেদিন ২ দিন সেদিন থেকে তোমার সাথে আছি। তোমার মনের কথা ধরতে পারবো না এটা কি কখনও হয়েছে?”
প্রাণেশা মাথা নাড়ালো। রোকেয়া বেগমের স্বামী যিনি, তিনি এই বাড়িতেই ড্রাইভারের কাজ করে। তাদের সন্তান নেই। তবুও কোনো আফসোস নেই। আল্লাহ যেহেতু দেননি সেহেতু উনারাও এই নিয়ে অসুখী নন। দুজনই প্রাণেশাকে আদর করে।
প্রাণেশা স্নিগ্ধর ব্যাপারে সব কথা রোকেয়া বেগমকে বলল। তারও ইচ্ছা জাগছে ছেলেটাকে দেখতে।
বিকেলের দিকে স্নিগ্ধ রেডি হয়ে রুম থেকে বের হলো। সাঈদ রেজা চৌধুরী জিজ্ঞাসা করলেন,
“কোথাও বেরোচ্ছো?”
স্নিগ্ধ ঘাড় চুলকে মুখে হাসি রেখে বলল,
“ওই আসলে প্রাণেশার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।”
“ওকে যাও।”

সন্ধ্যার আগ দিয়ে স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গাড়িতে উঠল। প্রাণেশার মনটা খারাপ। এতক্ষন সময় দুজন একসাথে ঘুরলো কিন্তু এর মাঝে স্নিগ্ধ ওকে একবারও বলেনি যে ভালোবাসে। প্রাণেশাও আর বলেনি।
স্নিগ্ধ ড্রাইভ করছিলো, প্রাণেশা জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলো। এরপরই মনে হলো ২-৩ টা বাইক ওদের ফলো করছে।
স্নিগ্ধ মিনিট দুই যাওয়ার পরেই একটা ফাঁকা জায়গায় এলো। এরপরে গাড়ি থামিয়ে প্রাণেশাকে বলল,
“প্রাণ বের হও মনে হচ্ছে কেউ ফলো করছে।”
“আমারও তাই মনে হচ্ছে।”
দুজনে গাড়ি থেকে নামতেই ৪ টা বাইক এসে ওদের ঘেরাও করে ঘুরতে লাগলো। সবার মাথায় হেলমেট। প্রাণেশা ভয়ে স্নিগ্ধর হাত ধরে একটু ঘেঁষে দাঁড়ালো। যদি ওর ভাই এই ছেলেগুলোকে পাঠিয়ে থাকে তখন? তাহলে তো স্নিগ্ধকে মারবে।
স্নিগ্ধ প্রাণেশার ভয়ার্ত মুখখানা দেখে মুগ্ধ হলো। বুঝতেও পারছে কি নিয়ে ভয়ে আছে।
এর পরপরই বাইকগুলো থামলো। ছেলেগুলোও নেমে হেলমেট খুলল। স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে ছাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,

“একটা মিনিট দাড়াও আমি এক্ষুনি আসছি।”
স্নিগ্ধ চলে গেলো গাড়ির কাছে। ব্যাক সিটের দরজা খুলে একগুচ্ছ লাল গোলাপ বের করে আনলো। প্রাণেশা ছেলেগুলোকে চেনার চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে একঝলক কোথাও দেখেছে। কিন্তু মনে পড়ছে না।
স্নিগ্ধ এসে প্রাণেশার কাঁধে হাত রাখলো। প্রাণেশা পেছন ফিরতেই স্নিগ্ধ হাটু গেরে বসলো। বাকি ছেলেগুলো ওদের ওপরে গোলাপের পাঁপড়ি ছিটিয়ে দিলো। প্রাণেশা ছেলেগুলোকে দেখে বড় অবাক হলো। এরপরে স্নিগ্ধর দিকে তাকাতেই স্নিগ্ধ হেসে ফুলগুলো এগিয়ে ধরে বলল,
“আই লাভ ইউ প্রাণ।”
প্রাণেশা এবার বুঝতে পারছে এগুলো তাহলে ওকে সারপ্রাইস দেওয়ার জন্য।
স্নিগ্ধ আশাবাদী হয়ে তাকিয়ে আছে। প্রাণেশা হেসে ফুলগুলো নিয়ে বলল,
“আই লাভ ইউ টু।”

স্নিগ্ধ হাসলো, আর বন্ধুরা তখনও গোলাপের পাঁপড়ি ছিটিয়ে দিচ্ছিলো। স্নিগ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে একটা রিং বের করে প্রাণেশার হাতটা নিয়ে পড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ভালোবাসি শুনতে চেয়েছিলে না, আমি ইচ্ছে করেই বলিনি। ভেবেছি একটু স্পেশাল ভাবে বলবো। তাই এটা একটা ছোট্ট সারপ্রাইস ছিলো। কয়েকদিনের মধ্যে আমার বউ করে, আমার ঘরে নেওয়ার ব্যবস্থাও করবো। নাকি আরও আগে চান ম্যাডাম?”
প্রাণেশা লজ্জা পেয়ে স্নিগ্ধর বুকে চাপর মারলো। একে একে স্নিগ্ধর বন্ধুগুলো প্রাণেশার সাথে পরিচিতও হলো। সুবহার বান্ধবীর জন্মদিনে প্রাণেশা স্নিগ্ধর এই বন্ধুগুলোকে দেখেছিলো, তাই মনে করতে পারছিলো না কোথায় দেখেছিলো।
সন্ধ্যার আগ দিয়ে স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে ওর বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলো। প্রাণেশা সোজা বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। রোকেয়া বেগম ওর সামনে এসে অস্থির বললেন,
“তুমি এসেছো? তাড়াতাড়ি রুমে যাও, তোমার ভাই এলো বলে।”
প্রাণেশা কপাল কুঁচকে বলল,

“কি ভাইয়া আসছে? কিন্তু বলল যে দেরি হবে আসতে।”
“এখন ফোন দিয়েছিলো। তোমাকে ফোনে না পেয়ে আমাকে বলল যে প্রাণেশা কোথায়? আমি বলেছি ঘুমিয়েছো। এরপরে বলল। আমরা বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছি।”
প্রাণেশা দৌড়ে উপরে নিজের রুমে এসে ড্রেস চেঞ্জ করলো। এর মিনিট পাঁচেক পরেই আরশাদ খান আর সৌরভ এলো। সৌরভ সোজা উপরে এসে প্রাণেশার রুমে নক করে ঢুকে বলল,
“কল দিলাম ধরলি না কেনো?”
“ভাইয়া একটু ঘুমিয়েছিলাম।”
“তু্ই তো এই টাইমে ঘুমাসনা!”
“আজকে কেমন করে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না ভাইয়া।”
সৌরভ নিজের রুমে চলে গেলো। এই প্রাণেশাকে নিয়ে। চিন্তা করতে করতে ওর মাথাটা যাবে মনে হয়। ৩ টা মাস বাড়িতে না থাকার কারণেই এই মেয়ের আচরণ এমন হয়েছে। তার মূলেই হচ্ছে ওই দিনকানা বান্ধবীটা।
আরশাদ খান সোফায় বসে তার ওয়াইফ সারিকা খানের ফ্রেমবন্দী ছবি দেখে নিঃশব্দে কাঁদছেন। সৌরভ এসে নক করতেই, আরশাদ খান ছবিটা পিঠের পেছনে রেখে টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে ছেলেকে রুমে ঢুকতে বললেন। সৌরভ রুমে ঢুকে এগিয়ে এসে বলল,

“প্রাণেশাকে নিয়ে কথা আছে।”
“বসো।”
সৌরভ বসে বলল,
“প্রাণেশা যেহেতু আমার ছোট বোন, আমি তার একজন গার্ডিয়ান। সেই হিসেবে প্রাণেশার বিয়ে নিয়ে কথা বলার রাইট তো আমার আছে?”
আরশাদ খান বললেন,
“হুমম। অবশ্যই আছে।”
“তুমি কি ওকে বিয়ে দিবে এখন, নাকি পড়াবে?”
“সবটাই তোমার বোনের উপরে ছেড়ে দিয়েছি। ও পড়তে চাইলে পড়বে। আমার কোনো সমস্যা নেই।”
সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আমার সমস্যা আছে। আমি ওর হাবভাব দেখে বুঝতে পেরেছি নিশ্চই কোনো প্রেমে জড়াচ্ছে। আমি থাকতে এই বাড়িতে কোনো প্রেমের বিয়ে হতে দিবো না। হ্যা, প্রেম করে বিয়ে করলে কিছু কাপল সুখী হয়। আবার কিছু কিছু সময় দেখা যায় প্রেম করে বিয়ের পরে অনেক কাপলের মাঝে ঝামেলা হয়। পরবর্তীতে ডিভোর্স নেয়। সেই ভয়টা পাই ওকে নিয়ে। ওকে অনেক যত্নে, ভালোবাসায় বড় করেছি, কেউ কিছু বললে আমি ভাই হয়ে সেটা সহ্য করতে পারবো না। তার থেকে দেখেশুনে বিয়ে দিবো। তাই তোমার সাথে কথা বলতে এলাম।”
আরশাদ খান ওর কথা বুঝে নরম কণ্ঠে বললেন,

“কি করতে চাও এখন?”
“আমার বন্ধু আছে না, নাম হামিম। শুনেছোই তো। ও দেখতে-শুনতে ভালো। প্রাণেশার কলেজের লেকচারার। ও প্রাণেশাকে দেখে আমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। ওর সাথে আমার অনেকদিনের পরিচয়, বন্ধুত্ব। খারাপ না ছেলেটা। সবদিক দিয়েই ভালো, সাথে ফ্যামিলিও। হামিমকে সামনে থেকে দেখলে তোমারও পছন্দ হবে।”
আরশাদ খান ছেলের উপরে বিশ্বাস রেখে বললেন,
“তুমি যখন তোমার বন্ধুর কথা বলছো তাহলে ভালোই হবে। তোমার উপরে বিশ্বাস আছে আমার। কালকে ওই ছেলেকে এই বাড়িতে আসতে বলো, আমি দেখতে চাই। এরপরে ওদের বাড়ির সবাইকে আসতে বলবো।”
সৌরভ মাথা হালকা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে, কল করে জানাচ্ছি।”
সৌরভ হামিমকে কল দিয়ে কালকে আসতে বলল। হামিম যাবে বলেছে।
কিন্তু একা একা প্রাণেশার বাবার সাথে কথা বলতে যেতে হবে শুনে বেশ নার্ভাস। অনেকক্ষণ ভেবে স্নিগ্ধকে কল দিলো। ভালোমন্দ কথা বলার পরে বলল,

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৬

“স্নিগ্ধ শোন না, কালকে একটা জায়গায় যাবো। আমার সাথে তোকে যেতে হবে।”
“কোথায়?”
হামিম মুচকি হেসে বলল,
“তোকে বললাম না একজনকে পছন্দ হয়। ঐতো সেই মেয়ের বাবা ডেকেছে। তারই সাথে কথা বলতে যাবো। আর একা একা যাবো তাই ভাবলাম তোকে সাথে নিয়ে যাবো। যাবি না?”
স্নিগ্ধ সম্মতি জানিয়ে বলল,
“ঠিক আছে যাবো। তু্ই গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে নিয়ে যাস।”
হামিম হাফ ছেড়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ বন্ধু, বাঁচালি। অনেক অনেক থ্যাংক ইউ তোকে।”

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here