কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৭ (২)
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
ইউশাকে ওটি থেকে সোজা আই-সি-ইউতে নেয়া হলো। চব্বিশ ঘন্টার একটা কড়া নজরদারিতে রাখা হবে এখন। পোস্টপার্টাম ইক্ল্যাম্পসিয়ার ভয় তো পুরোপুরি কাটেনি।
অয়ন মেয়েকে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে, স্ত্রীর কাছে ফিরল এবার।
ইউশার মুখে মাস্ক,বুকে মনিটর হাতে সূচ ফোটানো। স্যালাইন চলছে নিরন্তর। অয়ন টলতে টলতে পা টেনেটুনে চেয়ার নিয়ে বেডের পাশে বসল। এতগুলো মাস ফোলা, ভারি শরীর বয়ে বেড়ানো ইউশার মেদহীন পেট এখন ফাঁকা পড়ে আছে। অয়ন ঢোক গিলে সেই পেটের দিকে আঙুল বাড়িয়েও ফেরত আনল। ওই হাতটাই তুলে রাখল ওর মাথায়।
নিবিড় স্পর্শে বোলাতে বোলাতে ডাকল,
“ ইউশা! শুনতে পাচ্ছো ইউশা?”
অ্যানাস্থেসিয়ার বিবশ প্রভাবে ইউশা তখনো আচ্ছন্ন। রক্তচাপ একটু নিয়ন্ত্রণে এখন। চোখের পাঁপড়ি দুটো নড়তে দেখে আরো উদগ্রীব হয়ে এগিয়ে বসল অয়ন। তেমনই ব্যস্ত ভাবে ধীরস্বরে ডাকল,
“ ই-উশা… তাকা না। কতক্ষণ আমাকে দেখিসনি। কথা বলিসনি। তাকা না একটু!”
আকুল ঐ স্বর ইউশার কানে সাড়া ফেলল। দু তিন মিনিট সময় নিয়ে খুব আস্তে চোখদুটো মেলল ও। দেখে মনে হলো এই তাকানোতে যেন কয়েক যুগ লাগছে। কিংবা এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে কষ্ট হচ্ছে ইউশার। অয়ন আরো উদ্বেগ নিয়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
“ ইউশা,আমি এইত এইদিকে।”
ইউশা ধীরুজ বেগে ঘাড়টা ফেরাল হালকা। অয়ন মৃদূ হেসে শুধাল,
“ এখন ভালো লাগছে?”
ইউশার কথা বলার শক্তি নেই। উত্তরে মাথাও নাড়তে পারল না। চেয়ে রইল শূন্য চোখে। অয়ন নিজেই বলল,
“ আমাদের মেয়ে হয়েছে জানিস। খুব সুন্দর একটা মেয়ে! কী সুন্দর ওর চোখগুলো।”
ইউশা চেয়ে রইল। কথা বলতে পারলে বোধ হয় জিজ্ঞেস করত কিছু। অথচ স্ত্রীর চোখের ভাষাতেই বুঝল অয়ন। নিজেই বলল,
“ দিদুনের মতো গায়ের রং পেয়েছে। দিদুনের গায়ের রং যেমন ভিন্নরকম ফরসা,সেরকম।
নাকটা আমার মতো। তবে…”
এটুকু বলে থামল অয়ন। নিচে চেয়ে জিভে ঠোঁট ভেজাল। আবার বলল,
“ এখন শুনে লাভ নেই। সুস্থ হলে নিজেই দেখো।”
ইউশা চেয়ে থাকে। স্বায় দিলো বোধ হয়। অয়ন বলল,
“ কষ্ট হচ্ছে?”
উত্তর আসে না।
“ তুই সুস্থ হচ্ছিস,ইউশা। কাল ভালো থাকলে একবারে কেবিনে শিফট করবে। আর ভাবিস না,আমি তো সব সময় সাথেই আছি। থাকবও।”
ইউশা ভাবল, অয়ন দেখা করতে এসেছে। কথা শেষে চলেও যাবে আবার। কিন্তু সে গেল না৷ বরং স্ত্রীর রুগ্ন বাম হাতটায় নিজের গাল ঠেকিয়ে বসে রইল। ইউশার প্রচণ্ড কান্নায় ঠোঁট ভেঙে আসে। নিস্পন্দ চোখের কোণ ছুঁয়ে দু ফোঁটা জল নেমে যায়। বাচ্চা হওয়ার নটা মাস অয়ন যে ওর কী সেবা করেছে! মা থাকতেও ইউশার মাকে দরকার হয়নি। এই মানুষটা বাচ্চা যে কত ভালোবাসে ইউশা জানে,বোঝে। একবার রায়ান গায়ে পটি করে দিলো,অয়ন নিজে পরিষ্কার করেছে সেসব। ঘেন্নায় এক চুলও ভ্রু কোঁচকায়নি। যে মানুষটা কাছেই এসেছিল আরেকটা রায়ান পাওয়ার আশায়,ইউশা তাকে শরীরের অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ফেরায় কী করে? মেয়েটা নিষ্পলক চেয়ে থাকতে দেখে অয়ন বলল,
“ কিছু বলতে চাও?”
ইউশার চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল ওর ভেতরটা ছটফটে কত! কিন্তু, শক্তিতে কুলোয় না। অয়ন
মুচকি হেসে বলল,
“ গল্প পড়ে শোনাব? দাঁড়াও,আসছি।”
অয়ন গিয়ে হাতে করে দুটো ইংলিশ নোভেলের বই নিয়ে এলো। একটা টেবিলে রাখল। পাশে বসে আরেকটার পৃষ্ঠা উলটে উলটে পড়ার মাঝে, একবার চেয়ে দেখল ইউশার অসুস্থ চেহারা। রাত তখন অনেক বাজে! অয়ন একটা একটা পাতা উলটে জোরে জোরে বই পড়ছে,আর মুগ্ধ হয়ে শুয়ে শুয়ে শুনছে ইউশা। বইটা ছোট থাকায় শেষ হলো দ্রুত। অয়ন শেষ পাতা ভাঁজ করতে করতে ভ্রু নাঁচাল,
“ কেমন ছিল?”
ইইউশা কোনোমতে মণিদুটো নাড়ল। অয়ন বলল,
“ তাহলে আরেকটা পড়ে শোনাই।”
এবার দৃষ্টিতে অনীহা দেখা গেল মেয়েটার। অয়ন বলল,
“ তাহলে কী করব? গান শুনবি?”
ইউশার নীরব চোখের ভাষা সরব হলো। আনন্দিত কিছু শুনলে মানুষের যা হয়! অয়ন ফোস করে শ্বাস ফেলল। ওর শরীর ক্লান্তিতে চুর। গত কাল রাতে ডিউটি শেষে ফিরতে রাত হয়েছিল। ঘুমোতে ঘুমোতে ভোর। আর ঠিক তার ক ঘন্টার মাথায় ইউশার খিচুনি উঠল। এরপর থেকে ও এক দণ্ড জিরোয়নি। হাসপাতালের এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে ছুটেছে। ঘুমে চোখ ভেঙে যাচ্ছে এখন। কিন্তু অয়ন, কী সানন্দে ছেলেটা ঝুঁকে এসে ইউশার কার্নিশের পানিটা মুছিয়ে দিলো। আই-সি-ইউয়ের চার দেওয়ালের কাচবিশিষ্ট এই বিলাসবহুল ঘরটায় কেবলই ওরা দুজন তখন। ইউশা যখন মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় অয়নের দিকে চেয়ে থাকে,ছেলেটা কণ্ঠ চেপে মৃদূ শব্দে সুর ধরল,
“ Khamoshi me teri, meri sadaayein hain
Meri hatheli me, teri duaayen hain,
Ik saath tera ho toh sau manzile ho
Tanhaai teri, meri mehfile ho
Hum teri nigahon se
khud me jhilmilate hain
Khud ko tere paas hi chhod aate hain
Tujhse apni raaton ko subah banate hain
Khud ko tere paas hi chhod aate hain…
গান শেষ করে থামল অয়ন। দম নিলো। তাকিয়ে দেখল,ইউশা বিস্ময় নিয়ে চেয়ে আছে ওর দিকে। দুইদিকে ঠোঁট টেনে নিঃশব্দে হাসল ছেলেটা। কথায় ওর দুষ্টুমি ,
“ এভাবে দেখছিস কেন,গান ভালো হয়নি?”
ইউশার নয়নতারায় স্পষ্ট বিভ্রম তখনো। এই গানের কটা লাইন ঠিক ৬ বছর আগে ও গেয়েছিল পাটায়ায়া। অয়ন কি সেসময় শুনে ফেলেছিল? ধারেকাছেই ছিল সে?
মেয়েটার এই প্রচ্ছন্নতা আর সব প্রশ্নের মাঝেই অয়ন ডাকল হঠাৎ।
“ ইউশা…”
বেখায়ালি চোখ সতর্ক ভাবে চাইল ইউশার।
অয়ন ওর বাম হাতটা ফের মুঠোয় তুলল। চুমু খেল উল্টোপিঠে। তারপর এক দমে বলল,
“ আমি তোকে খুব ভালোবাসি!”
তুরন্ত, ইউশার চোখের সব অস্থিরতা শূন্য হয়ে যায়। অক্ষিকূটে ছড়িয়ে আসে বিহ্বলতার ভেলকি। থমকে, চমকে বিমুঢ় নয়নে চেয়ে থাকে ও। জিভটা অসাড় নেহাৎ । নাহলে এই মূহুর্তে ইউশা নিশ্চিত খুশিতে চিৎকার করে উঠতো। দৃষ্টিতে অবিশ্বাস নিয়ে হড়বড় করে বলতো অনেক কিছু। এত বছর বিয়ের,এই টানাপোড়েন, এই সংকোচ আর জড়োতার পর অয়ন ওকে প্রথম ভালোবাসি বলেছে। ইউশা কথা বলতে পারেনি। আনন্দ আর সুখের তোড়ে শুধু দুই চোখ ঝাপসা করতে পারল। পারল কার্নিশ বেয়ে বেয়ে ঝর্ণা নামাতে। নিচের ঠোঁটটা পিষে ধরতে ওপরের ঠোঁট দিয়ে। সেই সাথে নিজের শরীরী সব অসুস্থতা ইউশার কেমন করে হাওয়া হলো। মনে হলো ও সুস্থ,একদম সুস্থ ও! এই সুস্থতা কিংবা মনের জোরই বোধ হয় অয়নের ভালোবাসা ছিল। যা ইউশার খাতায় একটা অপ্রাপ্তি হয়ে ঝুলছিল এত কাল। আজ তা মিলেছে,ধরা দিয়েছে বুকের মাঝে। ইউশার আর কী চাই? এখন যে মরেও সুখ!
সী সেকশনে তিনদিন রোগীকে নবজাতক সহ হাসপাতালে থাকতে হয়। সেজন্যে একটা কেবিন নেয়া হয়েছে। তুশি নিজের সবটুকু দিয়ে বাবুর দেখভাল করছে । কাউকে দরকারই পড়ছে না।
রায়ান এই মাত্র রাতের খাবার খেয়েছে। দিদান খাইয়ে দিয়েছে। এরপর আবার বসেছে চিপস নিয়ে। কিন্তু বাচ্চাটার মনে আনন্দ নেই। এই প্রথম ও বাড়ির কারো থেকে তেমন পাত্তা পাচ্ছে না। সবাই কাড়াকাড়ি করছে এই বস্তাটাকে নিয়ে। কেবিনে রীতিমতো উৎসব লেগেছে।
রাত প্রায় একটা বাজে। সার্থ ভেতরে এলো কেবিনের। তুশি বাবুকে ঘুম পাড়াচ্ছে। ও জিজ্ঞেস করল,
“ বাড়ি যাবে না?”
“ আমি তো এখানেই থাকব। আপনি বরং মাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। কেঁদেকেটে খুব কাহিল হয়ে গেছে।”
রেহণূমার গলা বসে গেছে। বললেন,
“ আমি যাব না।”
তনিমা মৃদূ রেগে বললেন,
“ বললেই হলো? তোর চেহারা দেখেছিস? গিয়ে একটু ঘুমা। আবার সকাল সকাল চলে আসিস, যা। আপাতত আমি আর তুশি থাকি।”
সাইফুলও একই কথা বললেন। শেষে রাজি হলেন তিনি। ইউশার সাথেও তো আর দেখা করতে দেবে না। কিন্তু নাতনি রেখেও যেতেও ইচ্ছে করছে না। বাবুকে অনেকগুলো চুমু খেয়ে শেষে চলে গেলেন তিনি। সার্থ তখনো দাঁড়িয়ে। তুশি স্বামীর মুখ দেখেই বুঝে গেল এই লোক ওকে ছাড়া বাড়ি যেতে নারাজ। ফোস করে শ্বাস ফেলে রায়ানকে বলল,
“ বাবা, তুমি পাপার সাথে যাবে?”
রায়ান এমনি হলে এক লাফে যেত। কিন্তু এখন এই বস্তার কাছে মাম্মাকে রেখে যাওয়া যাবে না। দুপাশে ঘাড় দোলাল,
“ না মাম্মাম।”
সার্থ কাঁধ উঁচিয়ে বলল
“ তাহলে আমি গিয়ে কী করব? বাকিদের পাঠাই। অয়ন একা। মিন্তু আছে, আমি ওদের সাথে থাকি।”
“ ঠিক আছে।”
তনিমা আর রায়ান এক বেডে শুয়েছেন। তুশি শুয়েছে বাবু নিয়ে। তনিমা হঠাৎ নেমে ওয়াশরুমে গেলেন। বছর কয়েকে ওনার একটা রোগ ধরা পড়েছে – ডায়াবেটিস।
এরপরপরই তুশির ফোন ভাইব্রেট হলো। স্ক্রিনে সার্থর কল। আবার ম্যাসেজ – বাবুরা ঘুমিয়েছে? বাইরে এসো তাহলে।
দীর্ঘশ্বাস টেনে হাসল তুশি। দুপাশে মাথা নেড়ে বলল,
“ এই লোকটাও না!”
বাবুর দুইপাশে কোলবালিশ দিয়ে নেমে এলো ও। রায়ানকেও দেখল,ঘুমোচ্ছে। মাথার চুলটায় হাত বুলিয়ে বুক অবধি কাঁথা টেনে দিলো ছেলের। বাইরে থেকে দরজা বন্ধের শব্দ পেতেই তড়াক করে চোখ মেলল রায়ান। উঠে এলো তার চেয়েও ধড়ফড়ে গতিতে।
বাবু বিভোর হয়ে ঘুমোচ্ছে। পরনে একটা নিমা,ডায়াপার। চারপাশে বালিশ,নকশা আঁকা কাঁথা। রায়ান দুইহাতের ভর দিয়ে ওর মুখের ওপর ঝুঁকে রইল । ঠোঁট চেপে দেখল খুঁটে খুঁটে। তারপর দুম করে বাবুর ফরসা,নরম উরুতে একটা চিমটি কেটে দিলো। অমনি ঘুমের মধ্যে গলা ফাটিয়ে ওয়া ওয়া করে চিৎকার ছুড়ল মেয়েটা। রায়ান ভড়কে যায়,ভয় পায়। কান্না শুনে তো সবাই চলে আসবে। ও নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে ফিসফিসিয়ে ধমকাল
“ চুপ করো,চুপ করো, অ্যাই বস্তা চুপ করো।”
বাবু কিছু বুঝল না। হাত পা ছুড়ে ছুড়ে কাঁদল। বরং শব্দ বাড়ল আরো। রায়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ আমার আদরের ভাগ নেবে আর? কাঁদুনি বুড়ি,মাম্মাম থেকে দূরে থাকো!’’
তনিমা ছুটে বের হলেন। উদ্বীগ্ন হয়ে বললেন,
“ কী হলো? কাঁদছে কেন দাদুভাই?”
রায়ান ছিটকে সরে গেল।
দুহাত তুলে বলল,
“ আমি কিছু করিনি দিদান। আমি তো দেখতে এলাম কেন কাঁদছে!”
“ খিদে পেয়েছে মনে হয়। আমি দুধ বানাই। তুমি একটু কোলে নাও তো।”
রায়ান নাক কুঁচকে ফেলল৷ ও কোলে নেবে?ইস! তুশি এলো তক্ষুনি। ত্রস্ত কোলে নিলো বাবুকে। এত বেশি কাঁদছে মেয়েটা,সন্দেহ হলো ওর। আবার গভীর ঘুমে দেখে যাওয়া রায়ানও দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। চেহারার কাচুমাচু ভাব দেখে বলল,
“ রায়ান, তুমি আবার বাবুকে কিছু করোনি তো?”
“ না মাম্মাম।”
কিন্তু তুশির চোখ ঠিক গিয়ে বাবুর উরুতেই পড়ল। সদ্যোজাত বাচ্চা,এটুকু চিমটিতে কোমল ত্বকে গাঢ় দাগ বসে গেছে। তুশির মাথা ফেটে গেল রাগে। চ্যাঁচিয়ে বলল,
“ রায়ান!”
চিমটি দিয়েছ ওকে?”
রায়ান ঢোক গিলল। তুশি আরো রেগে বলল,
“ এই ছেলে,ওকে মেরেছিস?”
ও তেড়ে আসতেই তনিমা এসে নাতিকে আড়াল করলেন। বললেন,
“ থাক থাক বাচ্চা তো। ওই বা কত বোঝে!’’
“ তাই বলে মারবে? ইস,কত ব্যথা পেলো না জানি!”
রায়ান কেঁদে ফেলল কষ্টে। মাম্মাম
ওর কান্না দেখে ধরলও না। বাবুকেই দোলাল। ভীষণ অভিমান হলো ওর।
এক ছুটে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। সার্থ হাঁটছিল করিডোরে। ঘুম আসছে না ওর। পরনের ইউনিফর্ম পাল্টেছে। শার্ট-প্যান্ট পরেছে এখন। পাপাকে দেখেই এক দৌড়ে গিয়ে দুইহাতে কোমর জড়িয়ে ধরল রায়ান। ঠোঁট ফুলিয়ে জানাল,
“ পাপা, মাম্মাম বাবু পেয়ে আমায় ভুলে গেছে।”
সার্থ চমকায় কিছু। পরপর কথা শুনে হেসে ফেলে। এক টানে কোলে তুলে চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলে,
“ ভুলে যাবে কেন? কে বলল এসব?”
“ ওই যে বস্তাটাকে নিয়েই তো পড়ে আছে। ভ্যা ভ্যা করা কাঁদুনি বস্তা।”
“ রায়ান এগুলো বলে না। তোমার ছোট বোন ও!”
রায়ান মুখ ফিরিয়ে নিলো। সার্থ ওকে নিয়েই কেবিনে এলো এবার। তুশি তখনো বাবুকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছে। সার্থকে দেখেই বলল,
“ আপনার ছেলে বাবুকে চিমটি দিয়েছে।”
“ জানি।”
“ জানেন,কিছু বলবে না?”
“ তখন বোঝেনি। এখন বুঝে আদর দিতে এসেছে। ”
রায়ান ঠোঁট গোঁজ করে বলল,
“ আমি আদর দেব না।”
“ পাপা বললেও না?”
রায়ান দমল এইবার। হার মেনে বলল,
“ আচ্ছা দেব।”
তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
“ বাচ্চাটাকে একটু শাসনও করেন না।”
“ শাসনের বয়স হয়নি ওর।”
তুশি বিড়বিড়িয়ে বলল,
“ একদিন মজা বুঝবেন।”
সার্থ বাবুকে ওর কোল থেকে নিয়ে,বেডে বসল। রায়ানের সামনে ধরে বলল,
“ দাও আদর দাও।”
রায়ান চেহারা ভোঁতা করে বাবুর দিকে চেয়ে রইল। এতক্ষণ কান্নায় সারা মুখ টকটকে লাল হয়ে আছে। পাপা বলেছে যখন,আদর দিতে হবেই। খুব অনীহায় বাবুর ছোট্ট গালে চুমু খেল সে।
সার্থ হেসে ফেলল। তুশির দিকে চেয়ে বলল,
“ আমি মাথায় হাত বোলাতে বুঝিয়েছি। ছেলে ডিরেক্ট চুমু দিয়ে ফেলল!’’
তুশি বলল,
“ আপনারই ছেলে তো!”
রায়ান তক্ষুনি বলল,
“ পাপা আরেকটা আদর দেব?”
তুশি বলল,
“ না আর লাগবে না। এখন ঘুমাও। অনেক পকপক হয়েছে।”
রায়ান উঠে শুলো দাদির পাশে৷ তুশি ওর গায়ে চাদর টেনে দেয়। সার্থ বেরিয়ে যায়। তুশি আলো নেভায় কেবিনের। রায়ান শুয়ে শুয়ে ভাবে,
“ এক গালে চুমু দিলে দাঁতে পোকা হয়। কাল সকালে আমি ওর অন্য গালেও আরেকটা চুমু দেবোই দেবো মাম্মাম।”
ঠিক দুপুরে,
ইউশাকে কেবিনে আনা হলো। টানা দুটোদিনের শরীরী ধকল পেরিয়ে একটু উঠে বসেছে মেয়েটা। স্যালাইন আর চলছে না। মুখের মাস্কটাও তোলা হয়েছে। খুব দূর্বল থাকলেও এখন একটু কথা বলতে পারে! হুইল চেয়ারে বসিয়ে ওকে নিয়ে অয়নই কেবিনে এলো। সাথে নার্স,আয়া দুজনেই ছিলেন। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে ইউশা চমকে গেল করোতালি আর বেলুন ফোটার শব্দে। ওর কাজিনরা এসেছে। মিন্তু কেক এনেছে একটা! কেকের ওপর লেখা ‘’ওয়েলকাম”।
মিন্তু আর আগের মতো নেই। তার বেশভূষা পালটে গেছে। জিম করে ; শরীরটা হিরোর চেয়ে কম না। চুলের মধ্যে অফ হোয়াইট হাইলাইটার করা। বোনকে দেখেই কেক নিয়ে ছুটে এলো। হাঁটুমুড়ে বসল কাছে। ইউশা বলল,
“ তুই কখন এলি?”
মিন্তু রেগে রেগে বলল,
“ পরশু। খুব তো মরার ভয় দেখাচ্ছিলি সবাইকে। চল্লিশাটা খেতে অন্তত আসতে হতো না আমার?”
রেহণূমা এক ধমক দিলেন। কিন্তু হাসল ইউশা। ভাইয়ের চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
“ নতুন কালার করেছিস,বুড়ো বুড়ো লাগছে!’’
মিন্তু বোনের হাতটা মাথা থেকে এনে মুঠোতে ধরল। চোখদুটো ভিজিয়ে ঘাড় নুইয়ে ডুকরে উঠল অমনি। ইউশা আহাম্মক বনে যায়। মিন্তু ওর কোলের ওপর মুখ গুজে জোরে কেঁদে ফেলল। যেন ছোট কোনো বাচ্চা! অমন হাউমাউ করেই বলল,
“ কত্ত ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি! কত্ত ভয় পেয়েছিলাম!”
বাকিরা মুচকি মুচকি হাসলেন। এটাই তো ভাইবোনের ভালোবাসা! ইউশা ভাইয়ের পিঠে হাত বোলায়। নিজেও ফুঁপিয়ে কাঁদে। বলে,
“ আমি ঠিক আছি এখন মিন্তু! শোন না, দেখি… তুই দাঁড়ি কাটিস না? রবীন্দ্রনাথ হবি?”
মিন্তু হাসল। চোখ মুছতে মুছতে মুখ তুলে ইউশার মাথায় গাট্টা মারল। পরপর জড়িয়ে ধরল দুইহাতে। মাঝে একটা হাত বাড়িয়ে বলল,
“ তুমি বসে আছ ক্যানো? এসো।”
তুশি যেন এই ডাকের অপেক্ষায়। ছুট্টে এলো অমনি। তিন ভাই বোন গলাগলি করল ওইটুকু কেবিনে। রায়ানকে ডাকা হলো না,কিন্তু সেও হাজির। মামার কোলের ভেতর পা-টা ঢোকানোর চেষ্টা করে বলল – “ আমাকেও নাও,আমাকেও নাও মামু।”
মিন্তু ওকে কোলে নেয়ার বদলে হাতে শুয়ে ফেলল। পটাপট চুমু দিয়ে বলল,
“ তুমিত আমার সব ভাগ্নে! তোমাকে রাখব মাথায়।”
অয়ন ডিউটি থেকে কটা দিন ছুটি নিয়েছে। দুটো কচকচে নোট আয়া-কে বখশিশ দিতেই সালাম ঠুকে চলে গেলেন তিনি। ইউশা এবার আশেপাশে তাকায়। বাচ্চা খোঁজে! কাল একটু মুখটা দেখেছিল, তাও ভালো করে না। তনিমা বুঝতে পারলেন। কোলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে কাছে দিলেন ওর। ইউশা কেমন আহাজারির মতো মেয়েটাকে বুকের কাছে নিলো। কত সাধনা আর কত স্বপ্নের ফল! বাচ্চাকে ধরতে ধরতে আবার মুখ তুলে অয়নকেও দেখল একবার। তৃপ্ত চোখে শুধু হাসল মানুষটা।
ইউশা নিজের গালে মেয়ের ছোট্ট গাল মিলিয়ে হুহু করে উঠল। চোখের জলে ভিজে গেল বাবুর চুল। ঘাবড়ে গেল সে। ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠল নিজেও। মা-মেয়ের কান্না সবাই চুপচাপ দেখলেও,তুশি বলল
“ ভয় পেয়েছিলে?”
ইউশা চোখ মোছে। বলে,
“ উহু, আমার কিছু হলেও আমার মেয়ে যে তোমাদের কাছে রাজকন্যার মতো থাকবে আমি জানতাম। শুধু ভাবছিলাম, আমার জীবনের এই সুন্দর সময় গুলো আর ফিরবে কিনা! তোমাদের সাথে আর দেখা হবে কিনা!”
রেহণূমা আঁতকে বললেন,
“ এসব আর বলবি না মা। আল্লাহর মেহেরবানি আমরা আবার সব ফিরে পেয়েছি।”
মিন্তু দুইহাত তুলে বলল,
“ আচ্ছা এখন এসব দুক্ষ-টুক্ষ বাদ। ইউশা, কেক এনেছি দেখেছিস? বাবুর নাম কী রাখবি বল। কাল থেকে সবাই বাবু বাবু করছে। একটা নাম চাই না? নাম রাখ,তারপর কেক কাট।”
রায়ান বলল,
“ হ্যাঁ মামু,বাবু তো শুধু আমি।”
মিন্তু ঘাড় ঝাঁকাল,
“ একদম ভাগ্নে।”
ইউশা বলল,
“ আমি নাম ভেবেছি। কিন্তু, মেজো ভাইয়া, চাচ্চু বাবা, কেউ নেই কেন?”
তুশি বলল,
“ বাবা অফিসে গিয়েছেন। দুটো দিন যাননি,ভাবলেন একবার দেখে আসবেন। আরেক বাবা গিয়েছেন ফল কিনতে। আর উনি থানায় গিয়েছেন। চলে আসবেন বিকেলের মাঝে। তুমি কী নাম রাখবে বলো না!”
ইউশা হাসল এবার। বলল,
“ তুমি একটা নাম ভেবেছিলে না? আমাদের নামের সাথে মিলিয়ে। কী সেটা?”
তুশির হাসিটা মুছে গেল। বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
“ সেটা দিয়ে কী করবে?”
“ ও তো তোমারও মেয়ে,ওর নাম রাখবে না?”
তুশি থমকাল,
“ আমার ভাবা নাম?”
“ হ্যাঁ। ওর ঠোঁটের তিলটা দেখেছ, তোমার মতো। মাথার চুলগুলোও তো কার্লি হবে মনে হচ্ছে।”
রায়ান উঁকি দিলো। চোখ গুছিয়ে দেখল বাবুর ঠোঁটের পাশে তিল। বিরক্তিতে বিড়বিড় করে বলল,
“ আমার মাম্মামের বিউটি স্পটটাও নিয়ে নিলো?”
তুশি ইতস্তত করে বলল ,
“ আমি, মানে, কেন ইউশা? অয়ন ভাই হয়ত মেয়ের কোনো নাম ভেবেছেন। আমি রাখলে কেমন দেখাবে?”
অয়ন বলল,
“ আমি ওর ভালো নাম ভেবেছিলাম। ডাকনাম যে কেউ রাখতে পারে। তাছাড়া তুমি ওর খালামণি, খালামণিরা নাম রাখবে স্বাভাবিক না? আমি এতে কী ভাবব?”
মিন্তু অধৈর্য হয়ে বলল,
“ আহা,নাম কেউ রাখলে রাখো না। কতক্ষণ এই কেক নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকব? আমার ইমেজের সাথে এসব যায়! এই তুশিপু, রাখো তো নাম,কী রাখবে!”
তুশি আঁচলের কোণা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল
“ ইউশা আর আমার নাম মিলিয়ে ‘ইতু’ রাখব ভেবেছিলাম।”
ইউশা উচ্ছ্বল হয়ে বলল,
“ ইস,এত্ত কিউট নাম! এজন্যেই আমাকে আগেভাগে জানাতে চাওনি। এটাই থাকবে। ইতু। আমার ইতু….”
রেহণূমা বললেন,
“ আর পুরো নাম? অয়ন কিছু বল!”
সে বলল,
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৭
“ অরশা….?”
ইউশা বলল,
“ এটাও তো সুন্দর। পুরো নাম তাহলে
‘ অরশা তাইমিন ইতু!’
সেই ছয় বছর আবারও নাম রাখা নিয়ে সৈয়দ পরিবারে হাত তালি পড়ল। সবাই ফেটে পড়ল উল্লাসে। নামটা সাদরে গ্রহণ করল তারা। হইহই করে কেক কাটা হলো। শুধু হিংসুটে রায়ান বাবুর দিকে চেয়ে থাকে। রেগেমেগে ভাবে,
“ ইতু? এটা একটা নাম হলো! এর থেকে কাতুকুতু, লুতুপুতু নাহলে হাগুমুতু রাখতো!’’
