ডেসটেনি পর্ব ৩১
সুহাসিনি মিমি
ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলেও আজ আর সেখানে যাওয়া হলো না প্রিয়ন্তীর। রাস্তাতেই পায়ের গতিপথ পাল্টে গেল। গন্তব্য এখন সোজা শ্রেয়াদের বাড়ি। গতকালের ওই কালবৈশাখী ঝড়ের পর থেকে শ্রেয়ার সাথে যোগাযোগের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল ও। কিন্তু মেয়েটার ফোন বন্ধ পেয়েছে বারবার। যদিও,কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় প্রিয়ন্তী নিজেও ছিল না।
এই পুরো সর্বনাশের পেছনে তো দায়ী ওই শ্রেয়াই! ও যদি তাকে ওই অচেনা জায়গায় একা ফেলে ওভাবে হাওয়া না হয়ে যেত, তবে কি আজ প্রিয়ন্তীর জীবনের সমীকরণ এভাবে ওলটপালট হতো? তীব্র রাগ আর অভিমান বুকে চেপে প্রিয়ন্তী এসে দাঁড়াল শ্রেয়াদের বাড়ির সদর দরজায়। করাঘাত করতেই দরজা খুলে দিলেন শ্রেয়ার মা। প্রিয়ন্তী কোনোমতে সৌজন্যতা রক্ষা করে হন্তদন্ত হয়ে সোজা চলে গেল দোতলায়।
দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রিয়ন্তীর রাগ মুহূর্তে সপ্তম আকাশে উঠল।
যেখানে তার বুকের ভেতর প্রতিনিয়ত সুনামি বয়ে যাচ্ছে, সেখানে অপরাধী মহাশয়া এসি ছেড়ে, কম্বল মুড়ি দিয়ে পরম শান্তিতে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছে! প্রিয়ন্তীর হাতজোড়া রাগে কাঁপতে লাগল। নিজেকে সামলাতে পারল না আর।এক টানে শ্রেয়ার গায়ের কম্বলটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে উঠে বসালো।
”শ্রেয়া! ওঠ বলছি! গেট আপ!”
ঘুমের ঘোরে এমন অতর্কিত আক্রমণে ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকাল শ্রেয়া। প্রিয়ন্তীকে ওমন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের চোখ দুটো রগড়ে নিয়ে হাই তুলতে তুলতে বলল,
”কী রে প্রিয়?তুই এখানে কি করছিস? ভার্সিটি যাসনি?”
”তোকে আজকে কবর দিতে এসেছি। জ্যান্ত কবর দিবো আজ তোকে আমি!”
“ইন্নালিল্লাহ। কিসব অলুক্ষুনে কথাবার্তা বলছিস এমন সাত সকালে। এভাবে রেগে আছিস কেন?কি হয়েছে?”
“কি হয়েছে? এখানে আমার গোটা জীবনের বারোটা বেজে তেরোটা হয়ে গেছে। আর তুই এখানে এসি ছেড়ে আরামে ঘুমাচ্ছিস? তোর একটুও অনুশোচনা হচ্ছে না রে?”
শ্রেয়া এবার বিছানায় সোজা হয়ে বসল। বান্ধবীর চোখ-মুখের ফ্যাকাশে ভাব দেখে ঘুমের ঘোর কাটল।প্রিয়ন্তীর দুটো হাত চেপে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল,
”কী হয়েছে ঘটনাটা একটু খুলে বলতো। গতকাল বিকেলে তোকে ওখানে রেখে যাওয়ার পর সত্যি অনেকটা সময় নিয়ে তোকে খুজেছিলাম আমি। বাট পাইনি দোস্ত। তোকে ফোন করেছিলাম। সেটাও তো বন্ধ পেলাম। তুই প্লিজ একটু খুলে বলতো এরপর ঠিক হয়েছিল তখন তোর সাথে?”
প্রিয়ন্তী ধপ করে বিছানার এককোণে গিয়ে বসল। ছলছল দু-চোখ বেয়ে অবাধ্য অশ্রুধারা নেমে এল রমণীর। বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস। অগত্যা ভাঙা ভাঙা গলায়, গতকালের সেই ভয়ঙ্কর বখাটেদের আক্রমণ থেকে শুরু করে বয়স্ক লোকটার জবরদস্তি, আর শেষমেশ তাজধীরের সাথে তার সেই আকস্মিক অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের পুরো ঘটনাটা সবিস্তারে উগড়ে দিল বান্ধবীকে। পুরোটা সময় পাথরের মতন স্তব্ধ হয়ে বসে বসে সবটা শুনল শ্রেয়া। চোখ দুটো চড়কগাছ মেয়েটার!
“কিহ! তোর বিয়ে হয়ে গেছে?এক মিনিট,এক মিনিট আমি ঠিক শুনছি তো?মানে কেমনে পসিবল ভাই?”
পরোক্ষনেই আবার ঠোঁটের কোন ঘেঁষে পরিলক্ষিত হলো এক চিলতে বাঁকা হাসি। সেই হাসির রেশ অক্ষুন্ন রেখেই আলগোছে মেয়েটা বলে উঠল এবার,
”তবে যাই বলিস ভাই। তুই তো দেখছি মেঘ না চাইতেই জল পেয়ে গেছিস! এর জন্য তো তোর অবশ্য আমাকে মস্ত বড় একটা গ্র্যান্ড ট্রিট দেওয়া উচিত। যে লোকটার জন্য তুই মনে মনে এতদিন ধরে চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত ছিলি, শেষমেশ সেই নিরামিষ কমান্ডারের সাথেই এভাবে এক সুতোয় জড়িয়ে গেলি? তাও আবার আমার জন্য!ইশ! কি কাকতালীয় ব্যাপার সেপার!”
শ্রেয়ার রসিকতাপূর্ণ মন্তব্যয় প্রিয়ন্তীর রাগ উঠল। ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিছানার ওপর থাকা বালিশটা সজোরে ছুঁড়ে মারল শ্রেয়ার মুখ বরাবর। দাঁতে দাঁত পিষে চেঁচিয়ে উঠল,
”শাট আপ শ্রেয়া! জাস্ট শাট আপ! ফাজলামো পেয়েছিস এসব? তুই জানিস না উনি আমাকে বিন্দুমাত্র পছন্দ করেন না? যার মনে আমার জন্য কোনো স্থান নেই, যে মানুষটার চোখে আমার জন্য অনুভূতির এক কণা অব্দি অবশিষ্ট নেই, তার সাথে আমি সারাজীবন কীভাবে কাটাবো? তুই কি ভেবেছিস এটা কোনো সিনেমার গল্প? বাস্তব বড্ড কঠিন রে!”
প্রিয়ন্তী একটু থামল। নিজের ওড়নার খুঁটটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে নিচু, কম্পিত স্বরে আবার বলল,
”তাছাড়া ভাইয়া যদি এই বিয়ের কথা একটাবার জানতে পারে, তবে কী তাণ্ডব হবে তুই ধারণা করতে পারিস? ভাইয়া আমাকে জ্যান্ত কবর দেবে!”
” অযথা এতো ভাবিস নাতো। পাভেল ভাইয়া তোকে কতটা ভালোবাসে সেটা তুই নিজেও জানিস। হ্যাঁ, একটু রাগারাগি হয়তো করবে। কিন্তু পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে ঠিকই তোকে মেনে নেবে। আর তা ছাড়া, তুই তো নিজে থেকে কোনো অন্যায় করিসনি। তুই তো পরিস্থিতির শিকার, প্রিয়!”
শ্রেয়া বিছানা থেকে নেমে এসে প্রিয়ন্তীর পাশে বসল। ওর কাঁধে হাত রেখে গলার স্বর নরম করে আবার বলতে শুরু করল,
“আর তুই বললি না, কমান্ডার সাহেব তোকে পছন্দ করেন না? আরে ধুর! বিয়ের আগের ভালো লাগা আর বিয়ের পরের ভালোবাসার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত আছে। উনি তোকে ঐ বখাটেদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন, নিজের নাম দিয়েছেন, এর মানে ওনার মনে কোথাও না কোথাও তোর জন্য একটা সফট কর্নার তৈরি হয়েছে। তুই ওনাকে একটু সময় দে। নিজেকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দে। দেখবি, সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
প্রিয়ন্তী মুখ তুলে শ্রেয়ার দিকে তাকাল। রমণীর চোখের কোণে এখনো অশ্রুবিন্দু চকচক করছে। শ্রেয়ার এই ইতিবাচক কথাগুলো মনের ভেতরের ভয়কে পুরোপুরি দূর করতে না পারলেও বুকের ওপর চেপে থাকা পাথরের মতো ভারী কষ্টটার লাঘব টানল কিছুটা। ভঙ্গুর গলায় বান্ধবীকে জানাল এবার,
“উনি স্রেফ পরিস্থিতির চাপে পড়ে আমাকে ওই বখাটেদের হাত থেকে উদ্ধার করতে এই ডিসিশন নিয়েছেন রে শ্রেয়া। এর বাইরে কিছু না। এটা একটা সমঝোতার খাঁচা ছাড়া আর কিছু নয়! নাথিং!”
প্রিয়ন্তীর শেষাক্ত বাক্যয় শ্রেয়া কেবল চুপচাপ শুনে মাথা নেড়ে গেল। মনের মধ্যে কথার সুনামি বইলেও মুখ ফুটে ব্যক্ত করল না আর একটি মাত্র শব্দও। মনে মনে কেবল বিড়বিড় করল মেয়েটা,
’বোকা মেয়ে, তুই তো জানিস না তোর এই নিরামিষ কমান্ডার তোকে নিজের খাঁচায় বন্দী করার জন্য ঠিক কোন পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারে! কি কি করতে পারে! তোকে পাওয়ার জন্য লোকটা যে কতটা নিখুঁত আর ঠাণ্ডা মাথায় পুরো গেমটা সাজিয়েছে, তার বিন্দুমাত্র আইডিয়াও তোর ওই ছোট্ট মগজে নেই। যদি থাকতো তাহলে এখন কান্না করার বদলে পাগলা ড্যান্স দিতি। আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতি। তাজধীর সিদ্দিক আযান এমনি এমনি নিজের পিঠ ঠেকিয়ে ফাঁদে পড়ার বান্দা নয় রে প্রিয়!”
ভোরের ঘটনার পর আর রুম ছেড়ে বেরোয়নি মেহরিণ। খাটের এককোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। বুকের ভেতর ভয়ের এক মস্ত বড় ঢোল অনবরত বেজেই চলেছে। ধুপধাপ সেই শব্দের চোটে নিজের কান দুটোই ঝাঁঝাঁ করছে ওর। ভয়টা অবশ্য বাগান ধ্বংস করার জন্য নয়। ভয়টার উৎস অন্য জায়গায়। যখনই সে ঝুমুর আপার মুখে শুনেছে এই গম্ভীর, রুদ্রমূর্তিধারী খিটখিটে পুরুষটাই আসলে সুমি আন্টির ছেলে ‘সেহরোজ’, তখনই মেহেরিনের গায়ের সমস্ত রক্ত এক সেকেন্ডে হিম হয়ে গেছে!
খাটের ওপর হাঁটু দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে বসে শুকনো একটা ঢোক গিলল মেহরিণ। নিজের কপালে নিজেই এক চাপড় বসাতে ইচ্ছে করছে ওর। মনে পড়ে গেল কয়েকদিন আগের সেই রাতের কথা। ঢাকা থেকে সুমি আন্টি যখন বিয়ের প্রস্তাবটা পাঠালেন, মেহেরিন তখন না জেনে, না শুনে, ছেলের একটা ছবি পর্যন্ত না দেখে স্রেফ জেদের বশে ওই নম্বরে ফোন দিয়েছিল। এরপর মেহেরিন খৈ ফোটার মতোন ফটফট করে কত শত কথাই না শুনিয়ে দিল! বিয়ে ভাঙা অব্দি তো ঠিক ছিল, তবে শেষপর্যন্ত সুগার ড্যাডি!
না জেনে না শুনে ওই জংলি ব্যাটারে কত আজেবাজে কথাই না বলে আসলো! এখন এই লোকটা যদি ওই ফোনের গলার আওয়াজ চিনে ফেলে? যদি বুঝতে পারে সেই ত্যাঁদড় মেয়েটা আর কেউ না, খোদ সে নিজেই? এই ব্যাটা যেমন খড়খড়ে আর রাগী যদি এখন সুমি আন্টিকে সব বলে দেয়? আর সুমি আন্টি যদি ওর মায়ের কানে কথাটা তোলে, তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই। জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে ওকে ওর মা!”
ভাবতেই মেহেরিনের মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে ফোঁসফোঁস করে নিজেকেই বকল,
“সব সময় দুই লাইন বেশি বুঝে পাকনামি কেন করতে হবে তোর? কে বলেছিল না জেনে না শুনে ওমন করে রিজেক্ট করতে? এমন হ্যান্ডসাম, রাজপুত্রের মতো দেখতে লোককে কোন হিসেবে তোর সুগার ড্যাডি মনে হইছিল রে বলদা মাইয়া?”
ঘুম থেকে ওঠার পর পেটে তেমন খাবার পড়েনি। সকালটা কোনোভাবে ঘরের ভেতর কুঁকড়ে পার করলেও বিপত্তিটা ঘটল ঠিক দুপুরের দিকে। ক্ষুধার চোটে মেহেরিনের পেটটা তখন কামড়ে কামড়ে উঠছে। তবুও কিছুতেই রুম থেকে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছে না মেয়েটা।ঠিক তখুনি ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন সুমি।মেহেরিনকে ওভাবে বিছানায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে দেখে ওনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মেহেরিনের পাশে বসে আদুরে গলায় শুধালেন,
“কী হয়েছে রে মা? সকাল থেকে দেখছি এই ঘরের ভেতর নিজেকে বন্ধ করে রেখেছিস। শরীর খারাপ লাগছে নাকি তোর? কিছু কি হয়েছে?”
মেহেরিন ভয়ার্ত চোখে আন্টির দিকে তাকাল। মুখটা শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে ওর। আমতা আমতা করে বলল,
“না তো আন্টি। কিছুই হয়নি। এমনিই!”
“এমনি এমনি ঘর কুনো হয়ে পরে আছিস কেন তবে? সকালেও খেতে বেরোলি না। বলতো খুলে ব্যাপারটা কি?”
প্রশ্ন করে উত্তরের আশায় ভ্রু উঁচিয়ে চেয়ে রইলেন সুমি। মেহরিণ ইতিউতি করল। কথা খুঁজল কি বলবে, কি বলবে। তখুনি ঝাঁটা হাতে ঝুঁমুর এগিয়ে এলো ভিতরে। একগাল হেসে বলেই ফেলল,
“আরে খালাআম্মা, আপনে বুঝতাছেন না কেন? ছোটমণি তো ডরের চোটে ঘর থেইকা বাইর হইতাছে না!”
সুমি বেগম ভ্রু কুঁচকালেন,
“ডর? কিসের ডর?”
”সকালে সেহরোজ ভাইজানের বাগানে আফামনি সূর্যমুখী ফুল ছিড়সিলো। বাগানে ওই অবস্থায় ছোটমণিরে পাইয়া যা চিল্লাইনডাই না চিল্লাইছে শেহরোজ ভাই! বাঘের মতো একখান হুংকার দিছে ভাইজানে। ওই ডরেই ছোটমণি সকাল থেইকা ঘরে সেঁধাইয়া রইছে।”
এতটুকু বলে থামল ঝুমুর। এরপর সুবিন্যাস্ত ভাবে সবটা খুলে বললেন সুমিকে। পুরোটা শুনে সুমি বেগম প্রথমে অবাক বলেন বটে। তবে পরক্ষণেই আলতো করে হেসে উঠলেন তিনি। হাসতে হাসতে মেহেরিনের পাশে আরও একটু ঘেঁষে বসলেন। পরম মাতৃস্নেহে মেহেরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে, চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“আরে বোকা মেয়ে! আমার এই পাগল মেয়েটা স্রেফ এই সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে ওমন ভয় পেয়ে ঘরের কোণে লুকিয়ে আছে? তুই তো আমার ভালোর জন্যই ফুল কাটতে গিয়েছিলি। একটা ফুল ছিঁড়েছিস, না হয় দুইটা ফুল ছিঁড়েছিস। তাতে কী হয়েছে?”
“উ উনি ভীষণ রেগে গেছেন আন্টি!”
“আরেহ, বাবু তো একটা আস্ত হাড়কিপ্টে আর খিটখিটে ছেলে! ওর বাগানের ফুল নিয়ে তোকে কথা শোনানোর এত বড় সাহস কোথা থেকে পায়? হু! তুই একদম ভয় পাবি না। তোর যদি ফুল পছন্দ হয়, তুই প্রতিদিন ওই বাগানে যাবি। ও যদি কিছু বলে, তুই সোজা আমার কাছে চলে আসবি। প্রয়োজনে আমি তোকে বাজার থেকে আরও হাজারটা ফুল গাছ এনে দেব। ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে তুই ওর সামনেই ফুল ছিড়বি তখন।কেমন?”
ভদ্রমহিলার কথার পরিপেক্ষিতে কিঞ্চিৎ ভরসা পেল মেহরিণ। ভয়টা একটু হলেও হালকা হলো। সুমি বেগম মেহেরিনের চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে বললেন,
“এখন চল, অনেক দুপুর হয়েছে। নাস্তা তো করিসইনি। এখন দুপুরের খাবার খেতে নিচে চল।ইশ! মুখটা শুকিয়ে একদম আমসি হয়ে গেছে আমার মেয়ের।”
মেহেরিন এবারও একটু ইতস্তত করল। নিচু গলায় আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না আন্টি আমি এখন নিচে যাব না। আপনি ঝুমুর আপাকে দিয়ে খাবারটা এখানেই পাঠিয়ে দিন না প্লিজ?”
ঝুমুর দাঁত বের করে মেহেরিনের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
“আরে ছোটমণি, আপনে খামোখাই ভয় পাইতাছেন। ভাইজান তো বাড়িতে নাই! বাইরে গেছেন। আর ভাইজান একবার বের হইলে রাতের আগে বাড়িতে আসেন না। আপনে একদম নিশ্চিন্তে আইতে পারেন!”
ঝুমুরের কথায় আশ্বস্ত হয়ে সত্যি সত্যি নিচে নামল মেহরিণ। টেবিলের ওপর হরেক রকমের পদের বাহার দেখে ওর পেটের ভেতরের ইঁদুরগুলো যেন আরও জোরে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে।
যেহেতু ঝুমুর আগেই নিশ্চিত করেছে যে খিটখিটে বাঘটা বাড়িতে নেই, তাই মেহেরিন নিজের সমস্ত জড়তা ঝেড়ে ফেলল এযাত্রায় । চেয়ার টেনে বসতে গিয়েও অসস্তি হলো কেমন। এই চেয়ার-টেবিলে বসে খাওয়ার অভ্যাস নেই ওর। গ্রামের বাড়িতে সবাই মেঝেতে পাটি পেতে কিংবা পিঁড়িতে বসে খায়।গ্রামের পিঁড়িতে কিংবা মেঝেতে বাবু হয়ে বসে খাওয়ার যে তৃপ্তি, এই সাহেবি চেয়ার-টেবিলে কি তা পাওয়া যায়? মেহেরিন এদিক-ওদিক তাকিয়ে সুমি আন্টির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে চট করে একটা পা চেয়ারের ওপর তুলে হাঁটু ভাঁজ করে জাঁকিয়ে বসল।
তারপর প্লেটে মস্ত বড় এক দলা ভাত নিয়ে তাতে একে একে শাক, মাছের ঝোল আর ডাল—সব একসাথে ঢালল। গ্রামের মানুষেরা যেভাবে পরম তৃপ্তিতে সব চটকে মাখায়, মেহেরিনও ঠিক সেভাবে হাত ডুবিয়ে পুরো ভাতটা মাখালো। ভাতের ওপর একটা আস্ত বোম্বাই মরিচ ভেঙে নিতেই তার তীব্র সুবাসে পুরো ডাইনিং টেবিল ম ম করে উঠল।এভাবে দুই লোকমা তৃপ্তি সহকারেই খেলো মেয়েটা। তবে বিপত্তি ঘটল তৃতীয় লোকমা উঠানোর সময়।
সদর দরজা পেরিয়ে পরিপাটি শার্ট প্যান্ট পরিহিত সেহরোজ ফিরে এলো তখুনি। সোজা গিয়ে বেসিংয়ে হাত পরিষ্কার করে এসে বসল নিজের জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ারটায়। অমনি চোখ পড়ল ঠিক ওর বিপরীতে বসা মেহরিনে। মেয়েটার বসার স্টাইল আর খাবারের অদ্ভুত দৃশ্য দেখা মাত্রই অতীবমাত্রায় ভ্রু কুঁচকে গেল মানবের। চোয়ালটাও কেমন শক্ত হয়ে উঠল।নাক-মুখ কুঁচকে গেল ঘৃনায়। ভ্রুর মাঝখানে গভীর ভাঁজ পড়ল।ঠিক সেই সময় কিচেন থেকে পানির জগ হাতে বের হয়ে এলো ঝুমুর।সেহরোজকে দেখে বেচারির প্রাণ ওষ্ঠাগত।হাত কেঁপে প্রায় জগটাই পড়ে যাচ্ছিল।মনে মনে বলল,
“ইন্নালিল্লাহ! আইজ আবার খাইছে!”
বলতে বলতেই তড়িঘড়ি এসে সেহরোজের সামনে প্লেট এগিয়ে দিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে খাবার পরিবেশন করতে লাগল। সুমি বেগমও এলেন তখন। তবে ছেলের ওই কুঁচকানো মুখভঙ্গি ভেঙে দিব্যি ভাবলেশহীন ভদ্রমহিলা। উল্টো মেহেরিনের পাশে বসে পরম স্নেহে বললেন,
” খা মা, মন ভরে খা। একদম লজ্জা পাবি না।”
সেহরোজ সামনে প্লেট নিয়ে বসলেও তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল মেহেরিনের হাতের দিকে। পুরো হাত বেয়ে ঝোল গড়িয়ে পড়ছে।সেইসঙ্গে সবজি-মাছ-ডাল একসাথে ওমন চটকানীর দৃশ্য দেখে হাই-ফাই সোসাইটিতে বড় হওয়া এই নেভি অফিসারের পাকস্থলী উল্টে আসার উপক্রম হলো।অবশেষে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।হঠাৎ করেই পুরো ডাইনিং রুম কাঁপিয়ে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল সে,
“ডিসগাস্টিং !আম্মু! তুমি এই আনকালচার্ড ইডিয়টটাকে কোথা থেকে তুলে নিয়ে এসেছ?আমি সিরিয়াসলি বলছি। এটাকে এক্ষুনি যেখান থেকে এনেছ সেখানে ফেরত পাঠাও। আদারওয়াইজ আমি নিজে পার্সেল করে এটাকে গ্রামে পাঠিয়ে দেব!”
সেহরোজের আচমকা বজ্রকঠিন চিৎকারে চমকে উঠে হাত থামাল মেহরিণ।ক্ষুদার তাড়নায় খাবারে ডুবে থাকা মেহরিন এবার চোখ তুলে তাকাল সামনে। দেখল,সেই রাগী লোকটা জলজ্যান্ত মূর্তি হয়ে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেহেরিন থতমত খেল। ভাবল লোকটা হয়তো ওকেই দেখছে। পরক্ষণেই ভাবল, তো কোনো অন্যায় করেনি! ও খাচ্ছিল নিজের মতো। তাহলে এই লোকটা শুধু শুধু ওর ওপর ওমন করে চিল্লাইল কেন?
মেহেরিন সূক্ষ্ম চোখে খেয়াল করল এবার। লোকটার রাগ আসলে ওর ওপর না, ওর খাবারের প্লেটের ওপর। ব্যাস! মেহেরিনের ভেতরের ত্যাঁদড়ামি বুদ্ধিটা আবারও চাড়া দিয়ে উঠল। ও দমবার পাত্রী নয়। সেহরোজের চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে প্লেট থেকে আরও এক দলা ভাত হাত উঁচিয়ে কায়দা করে মাখল। একে একে মিশালো বাকি সব আইটেমও।দৃষ্টি ওখানে নিবদ্ধ রেখেই বোম্বাই মরিচটায় মটমট শব্দে মস্ত বড় একটা কামড় বসালো!
ওদিকে এসব দেখে বেচারা সেহরোজ এর খাবার রুচি’ই উড়ে গেল। রাগে রি রি করতে করতে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হনহন করে ড্রয়িংরুমের দিকে যেতে যেতে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“ইডিয়েট!”
সুমি বেগম ছেলের পেছন থেকে ডাকলেন,
“আরে আরেহ বাবু না খেয়ে এভাবে উঠে গেলি যে? খাবি না?”
“আমার খাওয়া হয়ে গেছে!’
চলে গেল সেহরোজ। সুমি বেগম সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশাস ফেললেন। মেহেরিনের প্লেটে আরও এক টুকরো মাছ তুলে দিতে দিতে বললেন,
“আর কিছু লাগবে মা? নে, ভালো করে মাখিয়ে খা। তোর জন্যই তো এসব রান্না করা হয়েছে। ঝাল লেগেছে খুব? আর একটু ডাল দেব?”
বোম্বাই মরিচের ঝালে চোখ দিয়ে জল এলেও মনে মনে এক বিশাল বিজয়ের হাসি হাসল মেহরিণ। খিটখিটে কমান্ডারকে টেবিলে টেক্কা দিয়ে তাড়াতে পারার আনন্দেই ওর পেটের ক্ষুধা দ্বিগুণ হয়ে গেল!গদগদ হয়ে আরেক টুকরো মাছ নিয়ে খেতে শুরু করল ও।
নেভাল বেইজের প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত বিশেষ কনফারেন্স রুম। আপাতত কক্ষটায় বড্ড থমথমে পরিবেশ বিরাজমান। চারকোনা মস্ত বড় টেবিলটার চারধারে বসে আছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তিনজন চৌকস অফিসার। তাজধীর, অর্ণব,এবং ফাহিম। টেবিলের প্রধান আসনে গম্ভীর মুখে বসে আছেন তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কমোডর খুরশিদ আলম এবং ক্যাপ্টেন রাশেদ চৌধুরী।
তাজধীর অনেকদিন ছুটির পর আজই বেইজে জয়েন করেছে। তবে মানবের বসার ভঙ্গি দেখে বোঝার উপায় নেই যে ব্যক্তিগত জীবনে গত চব্বিশ ঘণ্টায় এক বিশাল ঝড় বয়ে গেছে তার। গায়ে নেভির ধবধবে সাদা ইউনিফর্ম। কাঁধে জ্বলজ্বল করছে পদবির স্ট্রাইপ। তাজধীরের তীক্ষ্ণ, কড়া নজর জোড়া আটকে আছে টেবিলের ঠিক মাঝখানে প্রজেক্টরের আলোয় ভেসে ওঠা বঙ্গোপসাগরের ডিজিটাল ম্যাপটার ওপর।
কমোডর খুরশিদ আলম চশমাটা নাক থেকে কিঞ্চিৎ নামিয়ে সরাসরি তাজধীরের দিকে তাকালেন।বললেন কঠোর গলায়,
“কমান্ডার তাজধীর, আপনি ঠিক সময়েই ছুটিতে থেকে ফিরেছেন। আমাদের সামনে একটা অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল এবং হাই-রিস্ক মিশন অপেক্ষা করছে। ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলসীমার খুব কাছাকাছি, বঙ্গোপসাগরের গভীর তলদেশে একটি বিদেশি চোরাকারবারি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে।গত এক মাস ধরে এই সেক্টরে সন্দেহজনক কিছু নৌযানের গতিবিধি লক্ষ্য করা গেছে। স্যাটেলাইট ডাটা অনুযায়ী তারা নিয়মিত রুট ব্যবহার করছে না।”
ফাহিম ভ্রু কুঁচকে বলল,
“স্মাগলিং?”
“সম্ভাবনা প্রবল।আমাদের ইন্টেলিজেন্স বলছে, তারা অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের সমুদ্রসীমা লঙ্ঘন করে অবৈধ অস্ত্র এবং ভ য়ানক মা দকের চালান পাচারের চেষ্টা চালাচ্ছে।”
ক্যাপ্টেন রাশেদ চৌধুরী পাশ থেকে একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“ইয়েস। এই মিশনের কোড নেম—’অপারেশন ব্লু কারেন্ট’। চক্রটা মূলত সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের গভীর চ্যানেলগুলোকে ব্যবহার করছে। যেখানে সাধারণ রাডার স্ক্যানিং কিছুটা দুর্বল। তারা ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং তাদের গতিবিধি অত্যন্ত নিখুঁত।”
অর্ণব এবং ফাহিম সোজা হয়ে বসল। অর্ণব’ই আগে বলল,
“স্যার, আমাদের কাছে কি ওদের মাদার ভেসেলের নির্দিষ্ট কোনো লোকেশন বা টাইমিং আছে? কারণ ওই এরিয়াটা বড্ড বেশি ডাইভারসিফাইড।”
ক্যাপ্টেন রাশেদ জানালেন,
“লোকেশন ট্র্যাক করা যাচ্ছে না। কারণ ওরা স্যাটেলাইট ব্ল্যাকার ব্যবহার করছে।”
পুরোটা সময় তাজধীর একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। এতক্ষন যাবৎ টেবিলের ওপর রাখা ম্যাপ এবং ফাইলের ডেটাগুলো নিজের ক্ষুরধার মগজে সাজিয়ে নিচ্ছিল। ডান হাতের আঙুল দুটো টেবিলের ওপর মৃদু তালে ড্রামিং করছে। বুঝাই যাচ্ছে এটা তার গভীর মনোযোগের লক্ষণ। তাজধীরের এই নিখাদ গম্ভীর এবং তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্বের সামনে বাকিরা একপ্রকার সমীহ করেই চলে। হঠাৎ তাজধীর আঙুল থামাল। ওর গম্ভীর কণ্ঠস্বর পুরো কনফারেন্স রুমে প্রতিধ্বনিত হলো এবার,
“ওরা স্যাটেলাইট ব্ল্যাকার ব্যবহার করছে না স্যার। ওরা সমুদ্রের কারেন্ট বা জোয়ার-ভাটার টাইমিংটা হ্যাক করেছে।”
তাজধীরের এই আকস্মিক ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে কমোডর খুরশিদ আলম ভুরু কুঁচকে তাকালেন,
“কী বলতে চাচ্ছেন কমান্ডার?”
তাজধীর উঠে দাঁড়িয়ে প্রজেক্টরের স্ক্রিনের দিকে এগিয়ে গেল। স্ক্রিনের একটা নির্দিষ্ট পয়েন্টে আঙুল দিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলতে লাগল,
“দেখুন, সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের এই অংশটায় আন্ডারওয়াটার কারেন্ট প্রচণ্ড বেশি থাকে। সাধারণ কোনো জাহাজ এই রুটে চললে রাডারে বড় সিগন্যাল আসবে। কিন্তু যদি ওরা সাবমার্সিবল বা সেমি-সাবমার্সিবল ক্রাফট ব্যবহার করে, তবে জোয়ারের তীব্র স্রোতের সাথে মিশে ওরা অনায়াসে রাডারের চোখ এড়াতে পারবে। ওরা ব্ল্যাকার ব্যবহার করছে না, ওরা মূলত ন্যাচারাল হাইড্রো-গ্রাফিক কন্ডিশনকে নিজেদের শিল্ড বানাচ্ছে। আর ঠিক এই কারণেই সাধারণ স্ক্যানিংয়ে ওদের ধরা যাচ্ছে না।”
তাজধীরের এমন নিখুঁত আর তুখোড় বিশ্লেষণ শুনে ফাহিম আর অর্ণব মনে মনে চমকে উঠল। ছুটির পর প্রথম দিন এসেই ব্যাটা যেভাবে মিশনের মূল পয়েন্টটা ধরে ফেলেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।ক্যাপ্টেন রাশেদ চৌধুরী সন্তুষ্ট চিত্তে মাথা নাড়লেন,
“এক্সিলেন্ট অবজারভেশন, তাজধীর। তাহলে আপনার প্ল্যান কী?”
তাজধীর নিজের হাত দুটো পেছনে বেঁধে জানালার বাইরে দূর সমুদ্রের নীল জলরাশির দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক অদম্য শিকারির চাতুর্য।ধীরস্থির, ইস্পাতকঠিন গলায় বলল,
“প্ল্যান সিম্পল স্যার। আমরা ফিশিং ট্রলারের ছদ্মবেশে আমাদের দুটো ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট (FAC) নিয়ে ওই চ্যানেলের মাউথে পজিশন নেব। ওরা যখন ভাববে জোয়ারের মুখে রাডার ফাঁকা, ঠিক তখনই আমরা ওদের সারপ্রাইজ দেব। হেড-অন ট্যাকল নয়। আমরা ওদের চারপাশ থেকে লক করব। আই উইল লিড দ্য ফার্স্ট স্ট্রাইক টিম।”
কমোডর খুরশিদ আলম টেবিল চাপড়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন,
“ব্রিলিয়ান্ট! অপারেশন ব্লু কারেন্টের দায়িত্ব আমি কমান্ডার তাজধীর সিদ্দিকের হাতেই সঁপে দিচ্ছি। অর্ণব, ফাহিম—তোমরা তাজধীরের উইং হিসেবে কাজ করবে। আমাদের হাতে সময় মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা। গেট রেডি, জেন্টলম্যান।”
”ইয়েস, স্যার!”
সবাই একযোগে স্যালুট জানিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল।মিটিং শেষ হতেই ক্যাপটিন রাশেদ বেরিয়ে গেলেন।
কনফারেন্স রুমে এখন শুধু তাজধীর আর ওর দুই বন্ধু। অর্ণব তাজধীরের কাঁধে হাত রেখে বাহবা দিয়ে জানাল,
“দোস্ত, তুই আসলেই একটা জিনিয়াস! ছুটিতে থেকেও তোর মগজ যে এভাবে বুলেটের গতিতে চলে, ভাবা যায় না।”
ফাহিম একগাল হেসে চোখ টিপে বলল,
“তা তো চলবেই। ভাবির চিন্তায় মগজের ধার বোধহয় একটু বেশিই বেড়ে গেছে। কী বলিস তাজধীর?”
কাজের জায়গায় খুবই স্ট্রিক্ট পার্সন তাজধীর। রুমে থাকলে বিষয়টা অন্য। তাই সেগুলো আমলে নিলোনা তেমন। উল্টো চোখের হিমশিতল চাহুনিতে বুঝালো আপাতত মিশনে ফোকাস করতে।সেই তীক্ষ্ণ চাহনি দেখেই ফাহিমের হাসি হাসি মুখটা মলিন হলো।কমোডর খুরশিদ আলম নিজের ফাইলগুলো গুছাচ্ছিলেন। প্রধান আসনে পুনরায় বসে পিছনে থেকে ডাকলেন তিনি,
“কমান্ডার তাজধীর, আপনি থাকুন। আপনার সাথে পার্সোনালি কিছু কথা আছে।”
অর্ণবরা স্যালুট ঠুকে রুম থেকে বেরিয়ে দরজাটা টেনে দিল।বিশাল কনফারেন্স রুমে এখন শুধু কমোডর খুরশিদ আলম আর তাজধীর।কমোডর সাহেব চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। ওনার কড়া অফিসার সুলভ চাউনিটা এবার কিছুটা শিথিল হলো। সেখানে ফুটে উঠল একটা অভিভাবকসুলভ ভাব। তাজধীরকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি হাত দিয়ে ইশারা করলেন,
“বসো, আযান।”
চেয়ার টেনে বসল তাজধীর। মেরুদণ্ড সোজা, দৃষ্টি স্থির সামনের অফিসারের উপর।কমোডর খুরশিদ আলম একটু হেসে পেছনের দিকে হেলান দিয়ে বললেন,
“শুনলাম ইদানীং ঘন ঘন ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছ। অফিশিয়াল কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ তোমার এই ব্যাক-টু-ব্যাক লিভ নেওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু নেভাল হেডকোয়ার্টারের রুটিন ডায়েরিতে একটু খটকা লাগাচ্ছে। ব্যাপার কী বলো তো? অলওয়েজ অন-ডিউটি থাকার বান্দা তুমি, হঠাৎ বাড়ির প্রতি এত টান?”
তাজধীর ক্ষণিকের জন্য চোখের পলক ফেলল। অত্যন্ত ধীরস্থির এবং মাপা গলায় উত্তর দিল,
“স্যার, পারিবারিক কিছু জরুরি এবং আকস্মিক পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। যা আমার ব্যক্তিগত উপস্থিতির দাবি রাখছিল। তবে আমি আপনাকে অ্যাসুরেন্স দিচ্ছি, এতে আমার অফিশিয়াল ডিউটি বা আসন্ন মিশনে কোনো প্রভাব পড়বে না।”
কমোডর সাহেব চোখ ছোট ছোট করে তাকালেন। বললেন,
“আরেহ ইয়াং ম্যান! এভাবে অফিসিয়াললি আনসার দিতে হবেনা। বি নরমাল। তোমার আঙ্কেল হই আমি। তা বিষয়টা কি শুধুই পারিবারিক পরিস্থিতি? নাকি গোপনে বিয়ে-টিয়ে করেছ? ডিফেন্সের নিয়ম ভেঙে আমাদের না জানিয়েই কি কোনো শুভ কাজ সেরে ফেললে নাকি আবার?”
কাজের ক্ষেত্রে কমোডর খুরশিদ আলম আর তাজধীরের সম্পর্কটা যেমন কঠোর অফিশিয়াল এবং নিয়মের বেড়াজালে বন্দি। পার্সোনাল লাইফে সমীকরণটা ঠিক ততটাই ভিন্ন। খুরশিদ আলম ছিলেন তাজধীরের বাবার বাল্যকালের বন্ধু। সেই সূত্রে তাজধীরকে তিনি ছোটবেলা থেকে নিজের সন্তানের মতোই বড় হতে দেখেছেন। পেশাগত জায়গায় তাঁরা একে অপরকে সর্বোচ্চ সমীহ আর প্রোটোকল মেনে চললেও, চার দেয়ালের আড়ালে একা হলেই সেই অফিশিয়াল খোলসটা মুহূর্তেই খসে পড়ে।
“নিয়ম ভাঙার রেকর্ড তাজধীর সিদ্দিকের প্রোফাইলে নেই, আংকেল। সময় হলে এবং অফিশিয়াল প্রসিডিউর মেনেই সবকিছু আপনার সামনে আসবে। আপাতত পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী কিছু বিষয় একটু ব্যক্তিগত রাখতেই হচ্ছে।”
কমোডর খুরশিদ আলম একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই ছেলের মুখ থেকে কথা বের করা আর জলন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে বরফ আশা করা একই কথা! তাজধীর ছোটবেলা থেকেই বড্ড চাপা আর ভীষণ জেদি। নিজের মনের ভেতরে কী স্ট্র্যাটেজি বা মাস্টারপ্ল্যান চলছে, তা তার মুখের ওই পাথুরে এক্সপ্রেশন দেখে পৃথিবীর কারোর সাধ্য বুঝার। তার এই ইস্পাতকঠিন গোপনীয়তা আর তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্বই তাকে নৌবাহিনীর অন্যতম সেরা ‘মাস্টারমাইন্ড’ করে তুলেছে।
খুরশিদ আলম সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। কারণ
তিনি আগে থেকেই জানতেন তাজধীরকে সহজে দমানো বা তার পেট থেকে কথা বের করা অসম্ভব।
টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা পুরনো লাল কভারের থিক ফাইল বের করে তাজধীরের সামনে রাখলেন তিনি। ফাইলের ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা—’কেস নম্বর: ০৭/বি-ব্লাস্ট’।কমোডর সাহেব অত্যন্ত তীক্ষ্ণ নজরে তাজধীরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“আই নো ইউ আর এ ডিসিপ্লিন্ড অফিসার, আযান। ইন্টেলিজেন্স উইং থেকে জানতে পারলাম, তুমি গত মাঝরাতে বেইজের মেইন সার্ভার থেকে এই পুরনো কেস ফাইলটা পুনরায় ওপেন করেছ এবং রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছ। ওয়ান্স এগেইন, হোয়াই, আযান? হঠাৎ এত বছর পর এই ডেড ফাইল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার কারণটা কী?”
কমোডর খুরশিদ আলম ফাইলের ওপর নিজের হাতটা রাখলেন। তিনি তাজধীরের দিকে ঝুঁকে এসে নিচু কিন্তু অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বললেন,
“দেখ আযান তুমি খুব ভালো করেই জানো এই ফাইলটা কেন স্থগিত রাখা হয়েছিল। আজ থেকে চার বছর আগে যখন এই ব্লাস্ট কেসটা নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়, তখন এর ফলস্বরূপ আমাদের একজন অত্যন্ত সৎ এবং সিনিয়র কর্মকর্তার অবস্থা কতটা শোচনীয় হয়েছিল, তা কি তোমার মনে নেই? ওনার পুরো ক্যারিয়ার তো ধ্বংস হয়েইছে, উপরন্তু ওনাকে নিজের জবটাও হারাতে হয়েছে। এক অদৃশ্য ক্ষমতার সুতোর টানে ওনার জীবনটা আজ নরকসম।”
তিনি থামলেন। তাজধীরের পাথুরে মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরামর্শের সুরে আবার বললেন,
“একজন শুভাকাঙ্ক্ষী আর তোমার মেন্টর হিসেবে আমি তোমাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি, তাজধীর। এই ফাইলে হাত দেওয়া মানে জলজ্যান্ত একটা আগ্নেয়গিরিকে খুঁচিয়ে তোলা। এখানে শুধু ক্যারিয়ারের ক্ষতি নয়, তোমার মস্ত বড় ‘লাইফ রিস্ক’ ও আছে। তুমি দেশের একজন সম্পদ। এই আসন্ন মিশন ছেড়ে কেন তুমি নিজেকে এমন এক চক্রের সামনে দাঁড় করাচ্ছ যাদের শেষ সীমানা তুমি নিজেও জানো না?”
তাজধীর সিদ্দিক কি এসব কিছু না জেনেই এই জ্বলজেন্ত আ গুনে পা ফেলেছে? উহু!একটুও না।
তাজধীর সোজা হয়ে বসল আরো। জানাল,
“উইথ অল ডিউ রেসপেক্ট স্যার, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একজন অফিসার হিসেবে আমাকে প্রথম দিন থেকেই শেখানো হয়েছে শত্রু সামনে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, রণক্ষেত্র ছেড়ে পিছু হটা কাপুরুষতার লক্ষণ। যে সিনিয়র কর্মকর্তার কথা আপনি বললেন, উনি ওনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সিস্টেমের বলী হয়েছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে অপরাধীরা চিরকাল অন্ধকারের আড়ালে পার পেয়ে যাবে।”
থামল তাজধীর। গলার স্বর দৃঢ় করে বলেই গেল অনর্গল,
“ওনার ওই তথাকথিত অ্যাক্সিডেন্টের পেছনে যে সাধারণ কোনো মেকানিকাল ফল্ট ছিল না, তা এই ফাইল স্থগিত করার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় স্যার। যদি সেখানে কোনো অপরাধের অস্তিত্বই না থাকত, তবে এত বড় একজন সিনিয়র অফিসারকে বলী দিয়ে ফাইলটা বন্ধ করার জন্য অদৃশ্য কোনো মহল থেকে চাপ আসত না। আর লাইফ রিস্কের কথা বলছেন স্যার? এই ধবধবে সাদা ইউনিফর্মটা যেদিন গায়ে জড়িয়েছি, সেদিনই নিজের জীবনটা দেশের নামে, ন্যায়ের নামে আমানত করে দিয়েছি। মৃত্যুর ভয়ে যদি তদন্তই না করি, তবে এই কাঁধের স্ট্রাইপ আর পরনের ইউনিফর্মের অবমাননা করা হবে। আমি কোনো অন্যায় করছি না স্যার, আমি স্রেফ সত্যটা সামনে আনতে চাচ্ছি।”
তাজধীরের মুখে এমন অকাট্য যুক্তি আর দেশের প্রতি, নিজের কর্তব্যের প্রতি এমন নিখাদ, নির্ভীক মনোভাব দেখে কমোডর খুরশিদ আলম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এই ছেলের শিরায় শিরায় যে খাঁটি অফিসারের রক্ত বইছে, তা ওনার আর বুঝতে বাকি রইল না। আফটার ওল দেখতে হবেতো ছেলেটা কার! হাল ছাড়লেন তিনি। উঠে দাঁড়িয়ে তাজধীরের কাঁধে আলতো করে একটা চাপ দিয়ে ভরসা দিলেন,
“আমি জানতাম তুমি এটাই বলবে। তোমার এই তেজ আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির সামনে আসলেই কোনো যুক্তি টেকে না। ঠিক আছে। তুমি যখন নিজের সিদ্ধান্তে এতখানি অটল, আমি তোমাকে আর বাধা দেব না।”
“ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড একটা কথা বলতে চাই আংকেল?”
“ইয়াহ!ইয়াহ স্পিক আপ!”
“সমুদ্রের ঝড় কোন দিকে বইবে, কিংবা স্রোতের টান কোন দিকে যাবে সেটা হয়তো ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সেই উত্তাল সমুদ্রে জাহাজের হাল কীভাবে ধরতে হবে বা দিক কোন দিকে ঘুরবে সেটা সম্পূর্ণ আমার কন্ট্রোল! ডেসটিনির দোহাই দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার মানুষ আমি নই। আমার ডেসটিনি, আমি নিজেই কমান্ড করি!”
চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে তাজধীরের প্রত্যেকটা কথাই শুনলেন খুরশিদ।বিচক্ষণ লোকটা বুঝলেন অনেক কিছুই। তাজধীর মুখে প্রকাশ না করলেও তিনি যথেষ্ট বুঝদার এবং জ্ঞানী একজন ব্যক্তি। বিষয়টা যে তাজধীরের কোনো পার্সোনাল ইস্যুর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বুঝতেই মনে মনে সন্তুষ্টও হলেন। এইবার যেহেতু বিষয়টা কমান্ডার তাজধীর সিদ্দিক আযান সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে তাহলে যে সামনে কোনো বড় ঘূর্ণিঝর’ই আসতে চলেছে ভেবে ভয় ও পেলেন। অবশেষে শান্তনা দিয়ে বললেন,
“যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো প্রয়োজনে আমি সবসময় তোমার পাশে আছি। এই কেস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যদি কোনো বাধা আসে, অফিশিয়াল বা আনঅফিশিয়াল যেকোনো রকমের হেল্প লাগে—সরাসরি আমাকে জানাবে। আই হ্যাভ ইওর ব্যাক, কমান্ডার।”
তাজধীর চেয়ার ছেড়ে সটান দাঁড়িয়ে উঠল। হাত দুটো সজোরে কপালের কাছে উঠে এলো তার। কমোডর খুরশিদ আলমকে নিখুঁত স্যালুট ঠুকল তাজধীর।বলল,
”থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার!”
কমোডর সাহেব প্রতি-স্যালুট জানিয়ে ফাইলটা তাজধীরের দিকে এগিয়ে দিলেন। তাজধীর ফাইলটা হাতে নিয়ে শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। হিংস্র শিকারির মতো জ্বলজ্বল কর উঠল চোখের মণি দুটো।
সময়টা ঠিক সন্ধ্যা নামার পথে। কথামতোই বাড়িতে ফিরে রেডি হয়ে ভাই ভাবীর সঙ্গে গাড়িতে উঠেছে প্রিয়ন্তী। গাড়ির সামনের সিটে বসে আছে পাভেল। পাশে মিতালী। আর পিছনের সিটে এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে প্রিয়ন্তী।প্রায় চল্লিশ মিনিটের যাত্রা শেষে গাড়িটা গিয়ে থামল শহরের অন্যতম অভিজাত এলাকায়।
অভিরাজ চৌধুরী কেবল একজন সফল তরুণ বিজনেসম্যানই নন,বরং তার রুচি আর আভিজাত্য এ শহরের বুকে এক অনন্য দৃষ্টান্তই বলা চলে। গাড়ি থেকে নামতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল প্রিয়ন্তীর। চারপাশটা আলো দিয়ে মোড়ানো। মস্ত বড় ডুপ্লেক্স ও ট্রিপ্লেক্সের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে তৈরি বাড়িটি। যার স্থাপত্যশৈলীতে আধুনিকতার পাশাপাশি এক ইউরোপীয় রাজকীয় ছোঁয়াও বিদ্যমান। সদর দরজা পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাটার দুপাশে নিখুঁতভাবে ছাঁটাই করা সবুজ ঘাসে মোড়ানো। তার ওপর জ্বলছে নরম আলো। এত সুন্দর বাড়ি এর আগে কখনো স্বচক্ষে দেখেনি পাভেল। বাড়িটা সে আনন্দে গদগদ হয়েই দেখল! এতো বড় বাড়িতে তার বোন থাকবে ভাবতেই ভাইয়ের অন্তর টায় আনন্দের জোয়ার বইল। পৃথিবীর সব ভাইয়েরাই চায় তার বোন বিয়ের পর সুখী থাকুক, রাজরানীর মতো থাকুক। পাভেলের ইচ্ছাটাও যে এভাবে পূরণ হয়ে যাবে ভাবতেই পারেনি কোনোদিন।
“বাহ! অভিরাজ ভাইয়ের বাড়ি সম্পর্কে লোকসম্মুখে অনেক শুনেছিলাম। সামনাসামনি দেখে বুঝলাম মানুষ অনেক কমই বলে।এটা বাড়ি নাকি রিসোর্ট।বাপরে!”
ওদের গাড়িটা এসে থামতেই ভেতর থেকে এগিয়ে এলেন এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা।পাভেল দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সালাম জানাল,
“আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।”
“ওয়ালাইকুম সালাম।”
হাসিমুখে হাত বাড়ালেন তিনি।
“তুমি পাভেল, তাই না?”
“জি।আংকেল, ভালো আছেন?”
“এইতো বাবা। অনেকদিন ধরে তোমার কথা শুনছি। অবশেষে দেখা হলো তাহলে।”
এরপর পরিচয় হলো মিতালীর সঙ্গে।সবশেষে প্রিয়ন্তীর দিকে তাকালেন মহিলা।আজ প্রিয়ন্তী হালকা নীল রঙের একটি লং থ্রি-পিস পড়েছে। চুলগুলো খুলে রাখা। কানে ছোট ছোট মুক্তোর দুল একজোড়া দুল। বাস্ এতটুকুই।তাতেই মেয়েটাকে দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলেন ভদ্রমহিলার। মহিলা মুগ্ধ হয়ে বললেন,
“মাশাআল্লাহ, কী মিষ্টি মেয়ে!”
প্রিয়ন্তী বিব্রত হেসে সালাম করল।ওদের নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন উনারা। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই আবারও বিস্মিত হলো পাভেল। তবে মিতালীর মুখোভঙ্গি দেখে বুঝা গেলোনা তেমন কিছুই। মেয়েটা সবসময়ের মতোই স্বাভাবিক।প্রিয়ন্তীও বড্ড চুপচাপ। ওরা গিয়ে বসল লম্বা সোফাটায়। পাভেল বসতেই ভদ্রলোক বললেন,
“আমরা তো তোমাদের বিয়েতেও থাকতে পারিনি। তখন দেশের বাইরে ছিলাম।তাই ফিরে এসেই বললাম, না এবার সবাইকে নিয়ে একসাথে বসতেই হবে।”
“জ্বি, অভিরাজ ভাই বলেছিলেন।”
একে একে সার্ভেন্টরা হরেক রকম নাস্তা নিয়ে টেবিল সাজাতে লাগল। তখুনি পরিষ্কার পরিপাটি ফর্মাল পোশাকে উপর থেকে নেমে এলো অভিরাজ। লোকটাকে বরাবরের মতোই অত্যন্ত আকর্ষণীয় লাগছে দেখতে। আর সবথেকে আকর্ষণীয় ওই অদ্ভূত অলিভ গ্রিন মণিদুটো। নীল রঙের শার্ট আর অফ হোয়াইট রঙের প্যান্ট পরে, প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে নেমে এসে দাঁড়ালো সেখানে।
অভিরাজ মুগ্ধ হয়ে শুধু প্রিয়ন্তীকেই দেখে গেল শুধু। নিজেকে ধাতস্থ করে এগিয়ে এলো। কুশল বিনিময়ের পর সবার মধ্যে বেশ জমজমাট কথোপকথন শুরু হলো। ডিনারের আরও কিছুটা সময় বাকি থাকায় আড্ডার আমেজটা বেশ জমে উঠেছে। একপর্যায়ে অভিরাজের মা সোফায় হেলান দিয়ে মৃদু হেসে ছেলের দিকে তাকালেন। পরপরই প্রিয়ন্তীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“অভি, প্রিয় মামুনিকে বসিয়ে না রেখে আমাদের বাড়িটা একটু ঘুরিয়ে দেখাও।”
প্রিয়ন্তীর টনক করল। ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে গেল মেয়েটা। গতকালের ঘটনার পর নিজেকে কেমন অন্যরকম মনে হয় আজকাল।কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“না আন্টি, ইটস ওকে। আমি এখানেই ঠিক আছি!”
পাভেল পাশ থেকে বোনের এই জড়তা দেখে ধমকের সুরে বলল,
“আরে প্রিয়, যা না। অভিরাজ ভাই যখন বলছে, একটু ঘুরে দেখে আয়। এত বড় বাড়ি। তোর ভালো লাগবে।”
ভাইয়ের জোরাজুরিতে প্রিয়ন্তী আর না করতে পারল না। তবে সে একা যেতে রাজী নয়। চট করে মিতালীর হাতটা ধরে বলল,
“ভাবি, তুমিও চলো না আমার সাথে।”
মিতালী সোফা থেকে উঠতে নিলেই পাভেল চোখের ইশারায় যেতে না করল স্ত্রীকে। উঠতে উঠতেও বসে পড়লে মিতালী। পাভেল বলল,
” এই সময়ে তোর ভাবির এত সিঁড়ি ভেঙে হাঁটাহাঁটি করা বারণ, তুই সেটা জানিস না? ডক্টর ওকে বিশ্রামে থাকতে বলেছেন। তুই যা অভিরাজ ভাইয়ের সাথে।”
ভাইয়ের যুক্তির সামনে প্রিয়ন্তী সম্পূর্ণ নিরুপায় । না চাইতেও স্রেফ ভাইয়ের মুখের কথা রক্ষা করতে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটার চোখে ম্মুখে স্পষ্ট অসস্তি লক্ষ্য করেও আড়ালে হাসল অভিরাজ। বলল,
“আসুন প্রিয়ন্তী।”
প্রিয়ন্তী ধীর পায়ে অভিরাজের পেছনে পেছনে গেল।অভিরাজ ওকে সোজা নিয়ে এলো বাড়ির তিনতলায়। তিনতলার করিডোর পার হতেই প্রিয়ন্তীর চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল প্রায়। এই তলাটার একপাশে সুসজ্জিত কয়েকটি রুম থাকলেও, অন্যপাশটা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। ঘরের ভেতর যেন আস্ত একটা ছোটখাটো মাঠ বা রুফটপ গার্ডেন তৈরি করা হয়েছে। আর সেখানে কাচের বিশাল দেয়ালের ওপাশে সারি সারি সাজানো রয়েছে নাম না জানা কত শত গাছ। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, সেখানে বনসাই করা একটা চমৎকার কৃষ্ণচূড়া গাছও রয়েছে। যার ডালে ছোট ছোট লাল ফুল ফুটে আছে। আরও রয়েছে পারিজাত ও কাঠগোলাপের চারাও।
প্রিয়ন্তী মুগ্ধ হয়ে শুধু চারপাশের এই সবুজ আর প্রকৃতির ছোঁয়া দেখেই গেল। ওদিকে মুগ্ধতার চরম সীমায় পৌঁছে একদৃষ্টিতে শুধু প্রিয়ন্তীকেই দেখে গেল অভিরাজ। এই এত সুন্দর বাগানের সমস্ত সৌন্দর্য প্রিয়ন্তীর ওই একটা হাসির সামনে ম্লান, বড্ড ফিকে।
প্রিয়ন্তী একটা গাছের পাতা আলতো করে ছুঁয়ে চারপাশটা দেখতে দেখতে আপনমনেই বলে উঠল,
“ভারী অদ্ভুত তো! ঘরের ভেতর এত সুন্দর বাগান।এটা কার?”
“বাড়িটা যেহেতু আমার, আর এখানে আমি একাই যেহেতু থাকি তবে নিশ্চই আমারই হবে!”
প্রিয়ন্তী জানে অভিরাজ বাংলাদেশে একাই থাকেন। উনার বাবা মা ব্যবসার কাজে বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরেই কাটান। একমাত্র সন্তান হওয়ার সুবাধে মাঝে মধ্যে ছেলেকে দেখতে চলে আসেন দুজনে।ফট করেই আবারও প্রশ্নঃ করে বসল অভিরাজ,
“আপনার ফুল খুব পছন্দ?”
“মেয়েদের আবার ফুল অপছন্দ হয় বুঝি?”
“উহু! তবে এখনকার মেয়েরা ফুল থেকে এক্সপেন্সিভ গিফটস টা বেশি প্রেফার করে।”
“আমি ওরকম নই। ফুল আমার ভীষণ পছন্দ। কৃষ্ণচূড়া, আর পদ্মটা বেশি ভালো লাগে!”
“তাহলে কালই পদ্ম বিলের সমস্ত আয়োজন শুরু করা হবে!”
“জিহ কিছু বললেন?”
“উহু!”
” ওই কৃষ্ণচূড়ার নিচে যদি একটা দোলনা বসানো যেত, তবে খুব ভালো হতো। বিকেলের দিকে বসে আকাশ দেখা যেত।
মেয়েটার আকুলতা আর নিষ্পাপ চাহুনির অবলোকন করল অভিরাজ। বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি চাইলে এই পুরো বাগানটা কেন, আমার গোটা জীবনটাই তোমার দোলনা বানিয়ে দেব ব্লুবেড়ি। শুধু একবার চেয়ে তো দেখ!”
প্রিয়ন্তী তার দিকে মুখ ফেরাতেই অভিরাজ চট করে নিজের কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক করল। একটু এগিয়ে এসে বলল,
“দোলনার আইডিয়াটা চমৎকার। আমি কালকের মধ্যেই এখানে একটা কাস্টমাইজড কাঠের দোলনা বসানোর ব্যবস্থা করছি।”
প্রিয়ন্তী কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে হাত নাড়ল,
“আরে না না! আমি তো এমনিই বলছিলাম। আপনার বাড়িতে আমি বলার কে!”
এরপর আরো কিছুক্ষন কথাবার্তা চলল দুজনের। পুরোটা সময় অভিরাজ কথা বলে গেলেও প্রিয়ন্তী শুধু উত্তরটুকুই দিলো। আগ বাড়িয়ে আর কিছুই বলল না। অমনি হাতের ছোট ভেলভেটের পার্সটার ভেতর ফোনটা তীব্রভাবে ভাইব্রেট করে উঠল প্রিয়ন্তীর। পার্স থেকে ফোনটা বের করল ও। স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠেছে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত নতুন নম্বর। চেনা কোনো নম্বর না হওয়ায় প্রিয়ন্তী কলটা রিসিভ করল না। ফোনটা সাইলেন্ট করে হাতের মুঠোতেই চেপে ধরে রাখল। ও ভাবল, হয়তো কোনো স্প্যাম কল। ওর স্বস্তি স্থায়ী হলো না। ঠিক দুই মিনিটের মাথায় হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা আবারও কেঁপে উঠল। এবার একটা মেসেজের তীক্ষ্ণ টোনে কাপল সেটা।
প্রিয়ন্তী স্ক্রিনটা অন করতেই ওর শাসরুদ্ধ হয়ে এলো যেন। ওপর থেকে ভেসে আসা টেক্সটটার এক-একটি শব্দ বুলেটের মতো বুকের ভেতর এসে বিঁধল ওর। যেখানে জ্বলজ্বল করছে কিছু পরিমিত লেখা,
”আপনার সাথে এখন আমার ও আমার পরিবারের সম্মান জড়িত। যেখানেই যান, নিজেকে সেভাবে মেইনটেইন করবেন।কোথাও যাওয়ার আগে আমাকে জানালে বিষয়টা অনেক বেশি জাস্টিফাইড হতো। না জানিয়ে গিয়েছেন, ভবিষ্যতে যেন এমন আর না হয়। দুই মিনিটের মধ্যে আপনার ভাবির কাছে ফিরে যান। টেক কেয়ার।”
মেজেসটার নিচে কোনো নাম লেখা ছিল না। কিন্তু এই নিখুঁত, গম্ভীর, আজ্ঞাবহ আর পাথুরে টোনটা ঠিক কার তা বুঝতে প্রিয়ন্তীর এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। এ যে খোদ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তাজধীর সিদ্দিকের হুকুমনামা!
মেসেজটা পড়া মাত্রই প্রিয়ন্তীর পুরো শরীর জুড়ে এক তীব্র ভয়ের হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। হাতজোড়া থরথর করে কাঁপতে লাগল। মুখ থেকে সমস্ত রক্ত এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। এক মিনিটের জন্যও মাথায় এলোনা লোকটা কিভাবে জানতে পারল ওর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে! সেই বিষয়টাও।
ওদিকে প্রিয়ন্তীকে এভাবে হঠাৎ অতিমাত্রায় নার্ভাস হয়ে কাঁপতে দেখে অভিরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। নজর পড়ল ওর হাতে কাঁপতে থাকা ফোনটায়।
প্রিয়ন্তী ভয়ার্ত চোখে শেষবার ফোনের স্ক্রিনের তাকিয়ে সেটার স্ক্রিন অফ করল তৎক্ষণাৎ। কোনোমতে নিজের কাঁপাকাঁপা ঠোঁট দুটো জোড়া লাগিয়ে ভাঙা গলায় বলল,
“আমি নিচে যেতে চাই।”
কথাটা শেষ করেই প্রিয়ন্তী আর অভিরাজের উত্তরের অপেক্ষা করল না। প্রায় ছুটে যাওয়ার ভঙ্গিতে করিডোর ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আর ওর চলে যাওয়ার পথেই নিবদ্ধ রইলো একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ। অভিরাজ নিজের পকেটে হাত গুঁজে অত্যন্ত সন্দেহজনক ও অন্যরকম চোখে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে আওড়াল,
ডেসটেনি পর্ব ৩০
“অনেক সময় দিয়েছি, নিয়েছি। আর নয়। পাখিকে মুক্ত আকাশে উড়তে দিলে কলিজা বড় হয়ে যায়। সুযোগ বুঝে বেঈমানিও করতে পারে। তাই খাঁচার পাখিকে খাঁচাতেই বন্ধি করতে হবে। আর আপনার খাঁচাটা স্বয়ং এই আমি, অভিরাজ চৌধুরী! মিস ব্লুবেড়ি!”
