যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১২
মুন্নি আক্তার প্রিয়া
“রাতে কী খাবে বলো?”
কতক্ষণ রাহাত ভাইয়ের আলিঙ্গনে ছিলাম সেই সময়-জ্ঞান আমার নেই। তার প্রশ্ন শুনে হুশ ফিরল। কিন্তু ওয়েট, এখন তো তিনি আমার স্বামী! তাহলে ভাই ডাকছি কেন? এখন থেকে আর কোনো ভাই না। রাহাত বলব। যদিও একইসাথে খুব উইয়ার্ড এবং লজ্জা লাগছে শুনতে! সমস্যা নেই, আস্তে-ধীরে অভ্যাস হয়ে যাবে।
আমি মৃদুস্বরে বললাম,
“আপনার যা ইচ্ছে।”
তিনি হাত ঘড়িতে সময় দেখে বললেন,
“অনেক রাত হয়ে গেছে। না হলে বাইরে গিয়ে খেয়ে আসতাম। হোটেলেই অর্ডার দেই। চলো দেখি ওদের মেনুতে কী আছে।”
তিনি হাত ধরে আমাকে রুমে নিয়ে এলেন। আমাকে বিছানায় বসিয়ে, মেনু কার্ড নিয়ে তিনিও পাশে বসলেন। বললেন,
“দেখো কী কী খাবে?”
“আপনার যা ইচ্ছে হয় অর্ডার দিন।”
“তুমি তো ইলিশ আর চিংড়ী ছাড়া তেমন কোনো মাছ পছন্দ করো না। তাহলে ইলিশের দোপেয়াজা, চিংড়ী দিয়ে করলা ভাজি, শুটকি ভর্তা, টমেটো ভর্তা, ডাল আর সাদা ভাত অর্ডার দেই? সাথে ঠান্ডা কী নেব? কী খাবে তুমি?”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সে কীভাবে আমার পছন্দ-পছন্দ-অপছন্দ জানে? আমি তো কখনো বলিনি। বিস্ময় নিয়েই তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি জানেন কীভাবে?”
তিনি রহস্যময় হাসি দিয়ে বললেন,
“আমি তোমার ব্যাপারে সবই জানি।”
এরপর টেলিফোনে তিনি খাবার অর্ডার দিয়ে আবার আমার পাশে এসে বসলেন। মুখোমুখি বসে আমার দুহাত ধরে চোখের দিকে তাকালেন। আমি লজ্জায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছি। তিনি হেসে বললেন,
“তোমার অনুভূতি বলো?”
“কী নিয়ে?”
“সবকিছুই।”
“বুঝতে পারছি না। কেমন যেন মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। ভালোলাগা, ভয়…”
“ভয় কেন?”
“চাচ্চু আর চাচিমনি জানলে যে কী হবে!”
তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন,
“যতদিন না তুমি চাইবে, ততদিন আব্বু-আম্মু কিছু জানতে পারবে না, প্রমিস। তুমি ভয় পেও না।”
আমি ভরসা পেয়ে মৃদু হাসলাম। ঠিক সেই সময়েই আমার ফোনে চাচ্চুর কল এলো। ভয়ে কলিজা শুকিয়ে কাঠ আমার! আমি ভয়ে শক্ত করে তার হাত চেপে ধরে বললাম,
“চাচ্চু কল করেছে!”
“আরে তুমি ভয় পেও না। কল রিসিভ করে স্বাভাবিকভাবে কথা বলো।”
“কী বলব?”
“দেখো আগে আব্বু কী বলে! সেই অনুযায়ী জবাব দেবে।”
আমি ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করে সালাম দিলাম,
“আসসালামু আলাইকুম।”
চাচ্চু সালামের জবাব নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কেমন আছিস?”
আমার হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল। রাহাত পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল,
“রিল্যাক্স! আমি আছি তোমার সাথে।”
নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে আমি চাচ্চুকে বললাম,
“ভালো চাচ্চু। তুমি কেমন আছো?”
“ভালো। রাতে খেয়েছিস?”
“না, খাব একটুপর। তুমি খেয়েছ?”
“হ্যাঁ, এত রাত করে খাচ্ছিস কেন? আগে আগে খেয়ে নিবি।”
“আচ্ছা।”
“তোর কিছু লাগবে আপাতত?”
“না।”
“আচ্ছা যখন যা লাগবে আমাকে বা তোর চাচিকে কল দিস।”
“ঠিক আছে।”
“খেয়ে ঘুমিয়ে পড়িস। রাখছি।”
“আচ্ছা।”
চাচ্চু কলটা রাখতেই ফোন বিছানার ওপর রেখে আমি জোরে শ্বাস নিলাম। রাহাত আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তুমি এত অল্পতেই ভয় পাও কেন বলো তো?”
“আপনি বুঝবেন না আমার টেনশন।”
“তাই? আমার অতশত না বুঝলেও হবে। আমি শুধু আমার প্রিয়কে বুঝতে চাই।”
“হয়েছে, হয়েছে! শুনুন আমার শাড়ি খুলব।”
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু বাঁকিয়ে বললেন,
“এখনই?”
তার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। আমিও কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছি। বোঝার চেষ্টা করছি তার হাসির রহস্য।
“আপনি হাসছেন কেন?”
“কী বললে তুমি এখনই?”
“কী বলেছি?”
“শাড়ি খুলবে! এত এক্সাইটেড? আমার থেকেও বেশি?”
রহস্য উদঘাটন করে যেন মাথায় বাজ পড়ল আমার! কীভাবে আমাকে পচাচ্ছে সে! আমি তড়িঘড়ি করে বললাম,
“না, না! আমি বলতে চেয়েছি শাড়ি চেঞ্জ করব। জোর করে আপনি ঢাকা থেকে আমাকে শাড়ি পরিয়ে আনলেন। এখন গরমে ম’রে যাচ্ছি আমি।”
তিনি হেসে বললেন,
“ওহ আচ্ছা, তাই? আমি তো ভাবলাম অন্যকিছু! খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। যাই হোক, ব্যাপার না!”
আমার মন চাচ্ছিল মাটি দুভাগ করে ভেতরে ঢুকে যাই আমি। কী লজ্জা, কী লজ্জা! লজ্জা এড়িয়ে যেতে আমি দ্রুত উঠে লাগেজ থেকে টি-শার্ট আর প্লাজো নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। ওয়াশরুম থেকেই শুধু শাড়িটা আগে খুলে রুমের ফ্লোরে ছুঁড়ে বললাম,
“শাড়িটা একটু উঠিয়ে রাখুন তো।”
এরপর আবার দরজা লক করে আমি ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আমি শাড়ি খুঁজছি, তখন আমার চোখ গেল টেবিলের ওপর। সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা। আমি অবাক হয়ে রাহাতের দিকে তাকালাম। বিছানায় বসে নিজের মনে ফোন চাপছে। সে যে এতটা কেয়ারিং আমি কল্পনাও করিনি। আমি ভেবেছিলাম, সে বড়োজোর শাড়িটা শুধু ফ্লোর থেকে তুলে বিছানায় বা আলমারিতে রাখবে। সুন্দর করে ভাঁজ করে যে রাখবে এটা আশা করিনি! আমি মনে মনে মুচকি হাসলাম।
তিনি ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ফ্রেশ হয়েছ?”
“হুম।”
“আচ্ছা আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
আমি তখনো বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলাম। সে ফ্রেশ হয়ে আসার পর ওয়েটারও খাবার নিয়ে এসেছে। তিনি দরজা খুলে খাবার নিলেন। এরপর বসে বললেন,
“আজ তুমি আমাকে খাইয়ে দেবে।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,
“না, না! আমি পারব না।”
আসলে আমি একা খাওয়া শেখার পর থেকেই কখনো কারো হাতে খাইনি চাচিমনি ছাড়া। এমনকি কাউকে কখনো খাইয়েও দেইনি। রাহাতকে তো আরো খাইয়ে দিতে পারব না। লজ্জাতেই ম’রে যাব!
তিনি এক প্লেটে খাবার নিয়ে বললেন,
“ঠিক আছে, আমি তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছি।”
তিনি খাবার মেখে আমার মুখের সামনে ধরতেই আমি বিনাবাক্য ব্যয়ে খেয়ে নিয়েছি। তার জায়গায় অন্য কেউ হলে জীবনেও কারো হাতে খেতাম না। কিন্তু তাকে আমি ‘না’ বলতে পারিনি। এমনকি অন্যদের বেলায় যেই অনীহা কিংবা অস্বস্তিটা আসে, সেটি তার বেলায় হয়নি। যদিও লজ্জার জন্য আমি চার লোকমার বেশি খাবার খেতে পারিনি। তিনি তখন বললেন,
“এত অল্প খেলে হবে?”
“আমার তো এখন ক্ষুধা নেই। আপনার জন্য এইটুকু খেলাম। আমি না খেলে তো আপনিও এখন খেতেন না।”
“ঠিক আছে। বাকি খাবার তাহলে এখানেই রইল। যখন ক্ষুধা লাগবে আমাকে বলবে।”
“আচ্ছা।”
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সব গুছিয়ে তিনি বিছানায় গিয়ে বসলেন। আমি তখনো সোফায় বসে আছি। এবার এক অদ্ভুত ভয় করছে আমার। তিনি আমাকে ডেকে বললেন,
“প্রিয়, দূরে কেন তুমি? এখানে আসো।”
আমি ভয়ে ভয়েই বিছানার অন্যপাশে গিয়ে বসলাম। তিনি আমাকে টেনে তার বুকে নিলেন। একহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে, অন্য হাতে রিমোট দিয়ে টিভি ছাড়লেন। আমি তখন বললাম,
“ঘুমাব। ঘুম পাচ্ছে আমার।”
“সত্যিই? এত তাড়াতাড়ি?”
“হু।”
“ঠিক আছে।”
আমি চুপচাপ গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়েছি। তিনি টিভি অফ করে লাইট নিভিয়ে আমার পাশে, আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লেন। আমার শরীর তখন অজানা ভয়ে জমে বরফ হয়ে গেছে। আমি একদম পাথরের মূর্তির মতো শুয়ে আছি শক্ত হয়ে। তার এক হাত আমার পেটের ওপর। টি-শার্ট ভেদ করে তার হাতের স্পর্শ লাগতেই আমি খপ করে তার হাত ধরে ফেললাম। শোয়া থেকে উঠে বসেছি সাথে সাথে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে?”
“আপনি কী করছিলেন?”
“এখনো তো কিছুই করিনি।”
“আপনি দূরত্ব রেখে ঘুমান।”
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন,
“কী! কেন?”
“আমার অস্বস্তি লাগছে!”
“আমাকে?”
“না, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শকে!”
“অভ্যাস করতে হবে না?”
“এখনই না। আপনি দূরে যান।”
তিনি এবার অভিমানি কণ্ঠে বললেন,
“ঠিক আছে।”
এরপর সত্যিই মাঝখানে দূরত্ব রেখে অন্যপাশে মুখ করে শুয়ে পড়েছে। আমি কিছুটা হাফ ছেড়ে নিজেও শুয়ে পড়লাম। মনের ভয়টা যদিও এখনো যায়নি! সে কাছে আসলে যেমন ভয় লাগছিল, ঠিক তেমনই এখন দূরে যাওয়ার পরও ভালো লাগছে না। কিন্তু কী করব তাও বুঝতে পারছিলাম না। চোখটা প্রায় যখন লেগে আসছিল ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে তিনি আমাকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। মৃদুস্বরে বললেন,
“সরি!”
এরপর শরীরের ভারটুকু আমার ওপর ছেড়ে দিয়ে পুরো আমিটাকেই দখল করার পায়তারা করলেন। প্রথম দখল করলেন ভয়ে কাঁপতে থাকা আমার ঠোঁট দুটো।
খুব ভোরে ভারী নিঃশ্বাস চোখে-মুখে পড়তেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখি রাহাত এক হাতের ওপর ভর দিয়ে মাথা রেখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ভয়ে আঁতকে উঠতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“আমি, আমি! এত ভয় পাও তুমি!”
আমি স্থির হলাম কিছুটা। তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।
“কী দেখছেন?”
“তোমাকে। দেখছি আর ভাবছি।”
“কী?”
“তুমি কবে বড়ো হবে!”
“আমি তো বড়ো-ই।”
“না, এখনো বড়ো হও-নি। তাহলে তো আর আমাকে আপসেট থাকতে হতো না এখন।”
“আপনি আপসেট কেন?”
“আবার আমাকে জিজ্ঞেস করছ? যেভাবে রাতে কাঁদছিলে, মায়া হলো তাই ছেড়ে দিলাম। মধুচন্দ্রিমা তো হলো না। আপসেট হবো না তাহলে?”
আমি লজ্জা পেয়ে সাথে সাথে কম্বল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললাম। তিনি কম্বল সরানোর চেষ্টা করে বললেন,
“আমার বাচ্চা বউটা কবে বড়ো হবে?”
আমি কম্বল না সরিয়েই বললাম,
“জানিনা।”
তিনি হতাশ হয়ে শুয়ে বললেন,
“হায়রে কপাল!”
অনেকক্ষণ তার সাড়া-শব্দ না পেয়ে আস্তে আস্তে কম্বল সরিয়ে আমি পাশে তাকালাম। দেখি, তিনি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। এতক্ষণ পর তাকে ভালো করে দেখার সুযোগ হলো আমার। নয়তো জেগে থাকলে বা তাকিয়ে থাকলে তো আমি লজ্জায় তাকাতেই পারি না। আমি আরেকটু কাছে গিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে তাকে দেখছি। কী মায়া তার মুখে! ইচ্ছে করছে চুমুতে চুমুতে মুখটা ভরিয়ে দেই। কিন্তু সেটা সম্ভব না। লজ্জাতেই ম’রে যাব। আচমকা তিনি চোখ মেলে তাকালেন। চোখ টিপে বললেন,
“আমি কিন্তু ঘুমাইনি। এভাবে এত কাছে এসেছ যে? মুড চলে আসলে কিন্তু আর রক্ষা নেই। আর এরকম আবেদনময়ী হয়ে তাকিয়ে ছিলে কেন হুম? কী চাচ্ছ? আমাকে? আদর লাগবে?”
আমি আবার সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় কচ্ছপের মতো কম্বলের ভেতর ঢ়ুকে গেছি। তিনি কম্বলের ওপর থেকেই আমাকে জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বললেন,
যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১১
“বাচ্চা কচ্ছপ, আমাকে জ্বা’লি’য়ে-পু’ড়ি’য়ে এখন খোলসের ভেতর ঢুকে বসে আছো! জলদি বের হও বলছি।”
দুজনের শব্দময় হাসিতে পুরো রুমটা একদম মুখরিত হয়ে গেছে। তিনি কম্বল থেকে আমাকে বের করার চেষ্টা করছেন, আর আমি শক্ত করে কম্বল টেনে ধরে রেখেছি। একটা যু’দ্ধ চলছিল যেন। অবশ্য শেষ জয়টা কিন্তু তারই হয়েছিল!
