লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১২
নুসাইবা আরা নুরি
ফাহিম আর ইরুর দেখা হয়েছিলো এক রোদে পোড়া দুপুরে।ফাহিম এর গায়ে সেদিন ও ইরু হোচট খেয়ে পড়েছিলো।আর এর ফলে ফাহিম ইরুকে নিয়ে রাস্তার মাঝে পড়ে যায়।সেদিন শ্রেয়সী ইরুকে সেই লজ্জা আর ভয়ের হাত থেকে বাচালেও সেদিনের পর ফাহিম ইরুর পিছু নেওয়া শুরু করেছিলো।
আর যখন শুনেছে ইরু এই রাস্তায় কোচিং এ যায়।তখন থেকে মোড়ের মাথার চায়ের দোকানে এসে দাঁড়িয়ে থাকে একই সময়ে।যদিও শ্রেয়সী কিংবা ইরু এসবে পাত্তা দেই না।তবে কিছুদিন আগেও এমন ঘটনা ঘটায় ফাহিম রেগে যায়।রাগী কন্ঠেই বলে,
-এই মেয়ে তুমি কি ইচ্ছা করেই আমার গায়ের উপর এসে পড়ো।পছন্দ হলে বলে দাও। প্রপোজ করে বিয়ে শাদি করে সংসার গুছিয়ে নেই।প্রায় প্রায় হুঠাট আমার উপর পড়ে ধুলোবালি মাখিও না।
ফাহিম ভেবেছিলো ইরু সেদিন কথা বলবে তবে তাকে ভুল প্রমান করে দিয়ে ইরু ভয়ে কেদে ফেলেছিলো।তখন ফাহিম একটা ধমক দিয়ে বলে,
-আমি কে যানো??
ফাহিমের কথায় ইরু না বোধক মাথা নাড়ায়।তখন ফাহিম রাগী কন্ঠেই বলে,
-আমি এডভোকেট ফাহিম আহমেদ।মাইন্ড ইট ইরাবতী। আমাকে ইগনোর করলে কিংবা আমার সাথে কথা না বললে তোমাকে মিথ্যা খু*নের দায়ে জেল এ ভরে দিবো।তারপর নিজ দায়িত্বে ফাশির দড়িতে ঝুলিয়ে দিবো।
সেদিন ফাহিমের ভয়ে নাঝেহাল অবস্থা ইরুর।শ্রেয়সী কে বাড়িতে এসে সব বলে।শ্রেয়সী জানতো ইরুর সাথে কথা বলার জন্যই লোকটা এমন কথা বলেছে তাই সে নিজেই ইরুকে বুজিয়েছে ফাহিমের সাথে কথা বলার জন্য। কারন ছেলেটা হয়তো ইরুকে ভালোবাসে।সৎ মায়ের কাছে বড় হওয়া ইরু ছোট থেকে অত্যাচার সহ্য করতে করতে ভিতু হয়ে গেছে।ইরুর বা প্রবাশী।বাবাকে দেখেনি ইরু বহুদিন।
সেদিনের পর থেকে ইরুর সাথে একটা দুটো কথা হয় ফাহিমের।ফাহিম এতেই খুশি।বেশ মনে ধরে গেছে এই বাচ্চা মেয়েটাকে।তার উপর যখন শুনেছে সৎ মায়ের কাছে বড় হয়েছে ইরু তখন থেকে একটু বেশি খেয়াল রাখে ফাহিম সব কিছুর।
সামনা সামনি এক টেবিলে বসে আছে ইরু আর ফাহিম।দুজনের সামনেই কফি আর বার্গার।যদিও এগুলো ফাহিম অর্ডার দিয়েছে ইরুকে বল্লেও ইরু দেইনি।ইরু মাথা নিচু করে বসে আছে।ইরুকে চুপচাপ থাকতে দেখে ফাহিম গলা ঝাড়া দেয়।এতে ইরু ফাহিমের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।ফাহিম কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলে,
-তোমার সাথে কথা ছিলো ইরু।
ফাহিমের শান্ত কন্ঠ।ইরু সামান্য মাথা উচু করে ফাহিমের কাপ ধরে রাখা হাতের দিকে তাকিয়ে বলে,
-ববলুন।
-যা বলবো সত্যি উত্তর দিবা।যতটুকু জানো সব কিছুই খোলাশা করবা।আমি যতটুকু শ্রেয়সী কে বন্ধুর বউ হিসেবে চিনি তার থেকে বেশি তোমার বান্ধুবী হিসেবে চিনি।আর তার থেকে বেশি আমি তোমাকে চিনি।সো সত্যি কথা বলবা।
-আচ্ছা।
ইরুর ছোট্ট প্রতিউত্তর ফাহিমের মনমতো হয়না।মনে হয় মেয়েটা যদি বেশি বক বক করতো তাহলে ভালো লাগতো।ফাহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করে,
-মেহেরাজ আর শ্রেয়সীর বিয়ে হয় দুই পরিবার এর অনুমতি নিয়েই।যদিও তুমি বিয়েতে ছিলে না।কিন্তু সব কিছুই জানো।মেহেরাজের চলে যাওয়া ডিভোর্স দেওয়া।এমনকি এই যে নতুন করে মেহেরাজের আবারো শ্রেয়সীর পিছনে পড়া।
-জ্বী।
-তোমার কি মনে হয়।শ্রেয়সীর পিছনে ঘোরা কি উচিত মেহেরাজের।আর এটা শ্রেয়সী কেমন নজরে দেখছে বলে মনে হয় তোমার??
ফাহিমের কথায় বেশ কিছুক্ষন চুপ থাকে ইরু।হাতের উপর হাত রেখে কচলাতে থাকে।যদি মিথ্যা বললে লোকটি বুজে যায়।তাই শুকনো ঢোক গিলে ইরু সত্যি টাই বলল শান্ত কন্ঠে,
-আসলে আ আমার মনে হয়না মেহেরাজ ভাইয়ার শ্রেয়সীর পিছনে পড়া উচিত।কারন ওদের ডিভোর্স হয়ে গেছে।আর আমাদের সমাজ এটা খারাপ নজরে দেখে।এমনকি আপনি আমাকে এনেছেন এটা কেও দেখলেও কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।শ্রেয়সী কাল রাতে অনেক কেদেছে চোখ মুখ ফুলে গেছে ওর।প্রথমে যখন যানতো না মেহেরাজ ভাইয়া ওর প্রাক্তন তখন কলেজ এ দেখে ক্রাশ খেয়েছিলো।কিন্তু কাল বিকালে যখন জানলো ওই লোকটাই ওর প্রাক্তন।আর ওর পিছনে আবারো পড়েছে।তখন ও ভেঙে পড়েছে।আমি চাই মেহেরাজ ভাইয়া ওর পিছু ছেড়ে দিক যেহেতু ওদের ডিভোর্স হয়ে গেছে তাই এখন এমন কোনো ঘটনা মেনে নেওয়া যায়না।
ইরু থামে।জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে।এক দোমে কথা গুলো বললো এতক্ষন ও।ভুকেই গেছিলো ফাহিমের সাথে বলছে নয়তো কিছুই বলা হতো না।ইরুর কথা শুনে ফাহিম শান্ত কন্ঠে বলে,
-ওদের ডিভোর্স হয়নি। যেটা হয়েছিলো সেটার কথা মেহেরাজ জানতো ও না।
-মানে??
ইরু ফাহিমের কথায় অবাক হয়।ইরুকে অবাক হতে দেখে ফাহিম বলে,
-মেহেরাজের বাবা নিজের সম্মান বজায় রাখতে মেহেরাজের অজান্তেই ওর সিগনেচার নকল করে ডিভোর্স পেপার পাঠাই শ্রেয়সীদের।আর শ্রেয়সীরা সেটাকে আসল ভেবেছে।আর এটা মেহেরাজ এবার বাড়ি আসার পরেই জেনেছে।ওদের কিন্তু ডিভোর্স হয়নি।আর এই সমস্যার সমাধান একমাত্র তুমিই করতে পারো।
-আমি কিভাবে??
-তুমি শ্রেয়সী কে সব বুজিয়ে বলবা।তাও যদি না বুজতে পারে।তবে কাল যেভাবেই হোক শ্রেয়সী কে সাথে নিয়ে এখানে আসবে এই সময়ে।
-আচ্ছা।
ইরুর কথার পিঠে ফাহিম বলে,
-তোমার মোবাইল কোথায়??
-আমার??
-হুম দাও।
ইরু ভীত নয়নে ব্যাগ থেকে নিজের মোবাইল টা বের করে দেয়।ফোনের স্ক্রীনে কোনো লক নেই।ফাহিম হোয়াইটসঅ্যাপে গিয়ে নিজের নাম্বার সেভ করে ফোন ইরুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
-নাও আমার নাম্বার সেভ করে দিয়েছি।শ্রেয়সীর ফেসবুক আইডি আর নাম্বার সেন্ড করে দিও।
ইরু তাকায় নাম্বারের দিকে।সবার উপরে ফাহিম আহমেদ লেখা।ইরুর সমস্ত শরীরে কম্পন দিয়ে উঠে গায়ের পশম গুলো দাঁড়িয়ে যায় শিহরন বয়ে যায় সর্ব অঙ্গে ঠান্ডা শীতল স্রোতের।
-লা*শ কি করমু ভাই??
ছেলেটার কথা সুনে পাঞ্জাবি পরা লোকটা বেশ কিছুক্ষন ভাবে তারপর বলে,
-মাগুর মাছের হাউজ এ দিয়ে দিবি।পুরো কুচি কুচি করে।যেনো মাছের খেতে কোনো কষ্ট না হয় আমার শখের মাছ কিন্তু ওরা।
লোকটার কথায় ছেলে দুটো শুকনো ঢোক গিলে।জঙ্গলের ভিতরে এসেছে আজ প্রায় এক বছর।প্রতি মাসের প্রথম দুদিন তাদের ছুটি থাকে এই দুদিন অনেকেই বাড়ি ফিরে।আবার অনেকেই থেকে যায়।লোকটাই ওদের সব।ওদের আগে না ছিলো থাকার যায়গা না ছিলো খাওয়া ঠিকমতো।কিন্তু লোকটার সাথে কাজে ঢোকার পর তাদের আর কষ্ট হয়নি।যদিও নিকৃষ্টতম কাজ তবুও তারা ভালো আছে।
আআন্ডারগ্রাউন্ড এর পাতাল ঘর বিশাল যায়গা মিলে অবস্থিত।উপরে ছোট একটা কুড়ে ঘর থাকলেও নিচে বিশাল সম্রাজ্য।এর ভিতরে বিশাল একটা ল্যাব আছে।তারা জানে না ওই ল্যাবের ভিতরে কি আছে প্রবেশ নিষেধ তবে যারা ঢুকেছে তারা আর ফেরেনি।আর টমি আর নমি সব সময় ল্যাব পাহারা দেই।তারা শব্দহীন কুকুর।শব্দ ছাড়াই ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে।আর পর একাধিক ঘর।সব গুলোই শব্দ মুক্ত ভেতরের আওয়াজ বাইরে আসে না।আর সব শেষ এর ঘরে বিশাল দুটো হাউজ।এক্টাই পিরানহা মাছ আর অন্য টাই আফ্রিকান যাতের হিংস্র মাগুর।নিমিষেই একটা মানুষকে ছিড়ে খেয়ে ফেলতে সক্ষম ওরা।
ছেলেদুটো কাজে লেগে পড়ে।গুপ্তচর লোকটিকে জীবিত রেখেই তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ খুলতে শুরু করে।তা দেখে পাঞ্জাবি পরা লোকটা আড়ামোড়া খেয়ে চলে যায় ল্যাবের দিকে।তার এখানে আর কাজ নেই।বাকি কাজ ছেলে দুটো করে দিবে।
নাহিদা খাতুনের জ্ঞান ফিরেছে।মেহেরাজ কে নিজের হাত ধরে বসে থাকতে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে কেদে ফেলেছেন তিনি।মেহেরাজ নিজের মায়ের মাথায় হাত দিতে শান্তনা দেই।তবে শান্ত হয় না নাহিদা খাতুন।ছেলের বায়ারি ছেড়ে চলে যাওয়া মা হয়ে তিনি মেনে নিতে পারছেন না।
নাহিদা খাতুনের কান্না দেখে।বেশ কিছুক্ষন পর নিলয় মির্জা এগিয়ে আসে মেহেরাজের দিকে।তারপর গলার স্বর নিচু করে বলে,
-মেহেরাজ বাড়িতে ফিরে চলো।আমি চাচ্ছি না তোমার চিন্তায় তোমার আম্মু আরো অসুস্থ হয়ে যাক।
বাবার কথার কোনো প্রতিউত্তর করেনা মেহেরাজ।নিলয় মির্জা যানে ছেলে তার ভীশন রাগী আর অভিমানি।ছেলে যখন বলেছে কথা বলবে না তো বলবে না।নিলয় মির্জার খারাপ লাগে সেদিন সে রাগ সামলাতে না পেরে বলে ফেলেছিলো।তাই বলে তার ছেলেটা এমন ভাবে অভিমান করে বাড়ি ছাড়বে।কোনো বাবা কি সত্যি বলতে পারে তার ছেলেকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে।
নিলয় মির্জা মাথা নিচু করে সরে আসে।তা দেখে নাহিদা খাতুন মেহেরাজের হাত আকড়ে ধরে করুন সুরে বলে,
-বাড়িতে ফিরে চল না বাবু।বাড়িটা কেমন শুন্য লাগছে আজ দুদিন।চল না রাগ করিস না।সব সমস্যার সমাধান করে দিবো আমি চল।
-কি সমাধান করবা আম্মু।যে সমস্যা গুলো তোমরা নিজ ইচ্ছাতেই তৈরী করে আমাকে ছোট করে দিয়েছো সকলের কাছে??
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১১
মেহেরাজের শান্ত কন্ঠ অথচ রাগ ঝরে পড়ছে সেই কন্ঠে।নিলয় মির্জা মাথা নিচু করে নেন।মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন।সম্মান গেলে যাবে সত্যি টা বলে না আবার সব ঠিক করে দিবে।ছেলেটা খুশি থাক।এই কয়েকদিনেই তার হাসি খুশি বাড়ি টা কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে।ছেলের এমন কথা শুনে নাহিদা খাতুন ফুফিয়ে কেদে উঠে বলে,
