Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১১

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১১

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১১
নুসাইবা আরা নুরি

নাকের উপরে আসা গোল ফ্রেমের চশমা টা ঠেলে চোখে পরে বিরক্তিতে ইরুর দিকে তাকালো ফাহিম।হাতের ফর্সা ত্বক চা পড়াই লালচে রঙ ধারন করেছে।জালা করছে সেখানে।ফাহিম কে চুপ থাকতে আর তার দিকে বিরক্তভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইরু কিছু ধীর কন্ঠে বলল,
-আসলে সরি ভাইয়া দেখতে পাইনি।তাই ইটের সাথে হোচট খেয়ে এই অবস্থা।
ইরুর কন্ঠ কাপা কাপা।ফাহিম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে প্যান্টের পকেটে ডান হাত পুরে সাভাবিক কন্ঠে বললো,
-কান্ডজ্ঞান আছে তোমার কতক্ষন দাঁড়িয়ে আছি আমি।পুরো উনিশ মিনিট দেরিতে এসেছো আজ।
ফাহিম হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কথা টা বলে।তারপর আবার বলে,

-তোমার বান্ধুবী কোথাই??
-কে শ্রেয়সী??
-হুম।
ফাহিমের কন্ঠে তেজ মিশ্রিত।গম্ভীরতা ছেয়ে আছে।ইরু কিছুটা কেপে উঠে তারপর কাপা কাপা কন্ঠে বলে,
-ওর মন ভালো নেই।ওর আম্মু বললো আজ আসবে না কোচিং এ তাই আমি একা এসেছি।
-ওর মন খারাপ কেনো??
-জানিনা।
ইরুর কথা শেষ হতে না হতেই ফাহিম একটা ধমক দেয় ইরুকে। ইরুর কেদে ফেলার জোগাড়।সব সময় সাভাবিক থাকলেও এই লোক এর সামনে কথা বলতে গেলেই তার অবস্থা টাইট হয়ে যায়।যেদিন থেকে শুনেছে ফাহিম এডভোকেট সেদিন থেকেই ইরুর ভয় শুরু।বরাবরের মতো ইরু ভীতু।তার উপর ফাহিম সেদিন বলেছিলো তার সাথে কথা না বললে খু*নের মামলায় জেল এ ভরে দিবে।পরে ইরুর ফাশি হবে।সেই থেকে ইরু আরো ভয় পায় ফাহিম কে।
ইরুর ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে ফাহিম ফোশ করে শ্বাস ছেড়ে বলে,

-কেমন বেস্ট ফ্রেন্ড তুমি যে বান্ধুবীর মন খারাপের কারন জানো না??
-জানি আসলে।
-আসলে আবার কি।
ইরু ছোট্ট করে কাদো কাদো কন্ঠে বলে,
-কোচিং এ লেট হয়ে যাচ্ছে প্লিজ পথ ছাড়ুন নয়তো স্যার ভীষন বকবে লেট করে গেলে।
ফাহিম নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকায়।তিনটে বেজে সাত চল্লিশ।ইতিমধ্যে সাত মিনিট সতেরো মিনিট দেরি।ফাহিম কথা না বাড়িয়ে ইরুর দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,
-গাড়িতে গিয়ে বসো।
-মানে??
-আমার গাড়িতে গিয়ে বসো পৌছে দিচ্ছি।
ফাহিমের কথায় চোখ দিয়ে এক টোপ পানি পড়ে যায় ইরুর।ভয়ে ভয়ে ফাহিমের সাদা রঙের প্রাইভেট এ গিয়ে দরজা খুলে বসে পড়ে।ফাহিম চায়ের দোকানদার এর বিল দিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে সিটবেল বেধে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়।তারপর এগিয়ে চলে চিকন সরু রাস্তা দিয়ে।

শারমিন খাতুন একের পর এক কল করে যাচ্ছেন মেহেরাজ কে।সবার নাম্বার ব্লাকলিস্ট এ ফেললেও দাদির নাম্বার টা আর পারেনি।সবার উপর অভিমান জমলেও দাদির উপর অভিমান হয়না মেহেরাজের।
প্রায় অনেকবার কল বাজার পর মেহেরাজ বিরক্ত হয়ে ফোন অফ করতে গেলো।তবে কি মনে করে কল টা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শারমিন খাতুনের কান্নার শব্দ ভেসে এলো।দাদির কান্না প্রথমে সাভাবিক মনে হলেও পরক্ষনে মনে কু ডাকতেই মেহেরাজ শান্ত গম্ভীর কন্ঠে সালাম দেয়।মেহেরাজের কন্ঠ শুনে শারমিন খাতুন আরো শব্দ করে কেদে উঠে বলে,
“দাদুভাইরে তোর আম্মু ভীষন অসুস্থ।হসপিটালে ভর্তি করেছি।তোরে খুজছে বার বার।একটু আই আর রাগ করে থাকিস না।
মেহেরাজ ক্ষনিকের জন্য চুপ হয়ে গেলো।বুকের ভিতর জেনো শত কেজি ওজনের একটা বিশাল পাথর চেপে বসলো হটাৎ।শারমিন খাতুনের কান্নায় মেহেরাজের ঘোর কাট মতেই মেহেরাজ শান্ত কন্ঠে বলল,

-কি হয়েছে আম্মুর।
-জানিনা হটাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেছে এখন অক্সিজেন চলছে আর বার বার তোরে খুজছে।
মেহেরাজের বুকের ভেতর কেমন ব্যাথা করে উঠলো।মেহেরাজ কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
-কোন হসপিটাল।
-সিটি হসপিটাল।
-আমি আসছি দাদু।এক্ষুনি আসছি।
মেহেরাজ বিছানায় এতক্ষন সুয়ে ছিলো টানটান হয়ে ।ফাহিম ওর উপর রাগ করেছে মেহেরাজ বুজতে পেরেছে।তবে সে কি করবে।সে জানে সে দোষি।তবে ভুল শুধরানোর তো সুজোগ লাগবে।কিন্তু মেহেরাজ কি করে কি করবে সেটাই বুজে উঠতে পারেনি।তাইতো এমন দিশেহারা হচ্ছে।মেহেরাজ ওয়ালেট টা ট্রাওজার এর পকেটে পুরে গাড়ির চাবি নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলো শাহিদা খাতুনকে বলে।
পার্কিং থেকে গাড়ি নিয়ে ফুল স্পীড এ অগ্রসর হলো সিটি হসপিটালের দিকে।মেহেরাজ বাবার কথায় রাগ করে বাড়ি ছাড়লেও এখন নিজের মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে কোনো সন্তান কি পারবে সেই রাগ ধরে রাখতে।মেহেরাজের মনে উলটা পালটা চিন্তায় ভরে গেছে।গাড়ি ফুল স্পীডে চালিয়ে জ্যাম ঠেলে কিছুক্ষনের মাঝেই এসে পৌছালো সিটি হসপিটালের সামনে।পার্কিং এ গাড়ি রেখে ছুটে হসপিটালের ভেতরে চলে গেলো।
আসার সময় শারমিন খাতুনের কাছ থেকে কেবিন নাম্বার জেনে নিয়েছিলো তাই আর সমস্যা হয়নি মেহেরাজের।তিনতলার ৩০৭ নাম্বার কেবিনের সামনে এসে থামে।তাড়াহুড়োয় মেহেরাজ ভিড় ঠেলে সিড়ি বেয়ে উঠেছে লিফটের অপেক্ষা করেনি।কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মেহেরাজ জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সাভাবিক করে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে।

বিছানার উপর সুয়ে আছে নাহিদা খাতুন। নাকে অক্সিজেন এর সরু পাইপ দেওয়া হাতে স্যালাইন।তার পাশেই টুল এ বসে আছে শারমিন খাতুন। আর একটু দূরে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে নিলয় মির্জা।মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে।মেহেরাজ কে কেবিনে ঢুকতে দেখে শারমিন খাতুন উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে এসে মেহেরাজ কে জড়িয়ে ধরে কেদে ফেলে।মেহেরাজ দাদিকে শান্তনা দিয়ে নিজের মায়ের কাছে এগিয়ে আসে।
নাহিদা খাতুনের সেন্স নেই।মেহেরাজ দূরে সোজা হয়ে তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিলয় মির্জা কে দেখে শারমিন খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলে,

-কি হয়েছিলো আম্মুর দাদি??
মেহেরাজের কথায় শারমিন খাতুন উড়নার কোনা দিয়ে চোখ মুছে ধীর কন্ঠে বলেন,
-আজ সকালে শ্রেয়সীদের বাড়ি থেকে আলতাফ আর সিয়াম এসেছিলো।এসে আমাদের হুমকি দিয়েছে আর তোর হাত পা ভেঙে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে।এইসব শুনে তোর দাদা রেগে যায়।ওরা চলে যাওয়ার পর তোর আব্বুর উপর রাগ করে ভিষন।একে তো তুই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিস তার উপর আলতাফ এর এমন কথায় তোর চিন্তায় বউমার প্রেশার বেড়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছিলো।তারপর থেকেই তোর কাছে কল দিচ্ছি তুই ধরিস নি।একটু আগে ধরলি।
দাদির কথা শুনে মেহেরাজের নিজেকে ভিষন অপরাধী মনে হতে শুরু করে।সে এতোটাই রেগে ছিলো যে নিজের মায়ের কল টাও রিসিভ করেনি।সে কেমন ছেলে।মেহেরাজ টুল টেনে নাহিদা খাতুনের পাশে বসে।মায়ের হাত টা নিজের হাতের মুঠোই নিয়ে চুমু খায়।তারপর কপালে ঠেকিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকে মায়ের সুস্থতার জন্য।

ভিন্নরাস্তায় গাড়ি প্রবেশ করতেই ইরু ফাহিমের দিকে তাকিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলে,
-ভুল রাস্তায় যাচ্ছেন।এখানে গাড়ি থামান প্লিজ।
ইরুর কথা ফাহিম কানে তুলে না।ইরু দরজা খোলার চেষ্টা করে তবে পারে না।ইরু আবারো ফাহিম গাড়ি থামাতে আকুতি মিনতি করতে শুরু করে।স্যার বকবে ওকে দেরিতে গেলে।ইরুর এমন বাচ্চামো আর কাদো কাদো কন্ঠ দেখে ফাহিম বিরক্ত হয়ে ধমক দেয়।ফাহিমের ধমক ওষুধের মতো কাজ করে ইরুর উপর।চুপ চাপ সোজা হয়ে বসে ফুফাতে শুরু করে ইরু।
ফাহিম ইরুর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে কড়া কন্ঠে বলে,
-আজ পড়তে যাওয়া লাগবে না।তোমার সাথে আমার দরকার আছে।
ফাহিমের কতগার মানে ইরু বুজতে পারেনা।তার সাথে এই লোকের আবার কি দরকার থাকতে পারে।ইরু বোকা বোকা কন্ঠে বলে,

-আমার সাথে কি দরকার।
-শ্রেয়সী আর মেহেরাজ এর বিয়ে আর ডিভোর্স নিয়ে তোমার সাথে কথা বলার আছে।আমি জানি তুমি অনেক কিছুই জানো আর তোমার সাথে বললেই কাজ হবে।
-কি কাজ হবে??

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১০

ফাহিম ইরুর কথার উত্তর দেই না।গাড়ি থামায় একটা পার্কের সামনে।বিকাল বেলা বেশ লোকজন।পার্কের ভিতর একটা কফিশপ এ নিয়ে গিয়ে বসে ইরুকে।ফাহিম উপরে উপরে মেহেরাজের উপরে রেগে থাকলেও মনে মনে সে মেহেরাজের খুশি টা দেখতে চাচ্ছে।সেও চাচ্ছে শ্রেয়সীর সাথে তার সব সম্পর্ক ঠিক হয়ে যাক।তাইতো আজ দুপুর থেকে অপেক্ষা করছে ইরুর জন্য।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here