লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১০
নুসাইবা আরা নুরি
ফাহিমকে একা একা বিড়বিড় করতে দেখে মেহেরাজ গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-কি হলো কি বিড়বিড় করছিস??
মেহেরাজের কথায় চমকে যায় ফাহিম তারপর বলে,
-কই কিছু না তো।
-বল করেছিস??
-আসলে??
-আসলে কি??
-মনে ছিলো না।আমি ভাবছি তুই মজা করে বলেছিস।তাই আর তেমন গুরুত্ব দেই নি।
ফাহিমের কথা শুনে মেহেরাজের মেজাজ গরম হয়ে যায়।মেহেরাজ তবুও নিজেকে শান্ত করার আপ্রান চেষ্টা করে।ফাহিম বুজতে পারে মেহেরাজের রাগ।মেহেরাজ যখন রেগে যায় তখন ওর হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়।যা মেহেরাজের রাগ বুজিয়ে দিতে সক্ষম।ফাহিম শান্ত কন্ঠে মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
-একটা কথা ভেবে দেখ।শ্রেয়সীর বাড়ির লোকরা তোদের বাড়িতে এসে ঝামেলা করলেও দোষ কিন্তু আসলেই তোদের ওদের কিন্তু না।
ফাহিমের কথায় মেহেরাজ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয় ফাহিমের মুখের দিকে।ফাহিম একটা শুকনো ঢোক গিলে বলে,
-আমি যেহেতু আইন নিয়ে পড়েছি তাই বলছি।যেহেতু প্রথমত বিয়েটা তোর মত নিয়ে হলেও তুই চলে গিয়েছিস বিয়ে করে বাড়িতে রেখেই।এটা একটা মেয়ের কাছে সব থেকে কষ্টের বিষয়।যে তার স্বামি তাকে না দেখে চলে গেছে।হ্যা আমি বুজি তোর কাছে তোর জব ইম্পোর্টেন্ট কিন্তু নতুন বিবাহিত মেয়েটা কিন্তু বুজতে পারেনি।তখন শ্রেয়সীর বাবা রাগ করে মেয়েকে নিয়ে যায় আর হুমকি ধমকি দেয়।আলতাফ শেখ মানে শ্রেয়সীর বাবা কিন্তু তার পনেরো বছরের মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলো তোর বাবার জোরাজোরিতে।তাহলে এখানে দোষ কার??কোনো মেয়ের বাবা কি চাইবে তার মেয়েকে এমন কোনো যায়গায় রাখতে যেখানে মেয়ের স্বামি মেয়েকে বাসর ঘরে রেখে চলে গেছে।আমি তো ভাই হিসাবে আমার ছোট বোন মাহির সাথে এমন হলেও তো আমি রাখতাম না সেখানে আলতাফ শেখ তো বাবা তো তিনি ঠিকই করেছেন।কারন তোর পরিবার তোর মিথা সিগ্নেচার করা ডিভোর্স পেপার দিয়েছেন নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে।
ফাহিম থামে।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো বলে,
-আজ যখন তারা এসে তোর বাবার কলার চেপে ধরলো তোর যেমন খারাপ লেগেছে রাগ হয়েছে তাদের ও কিন্তু একই ভাবে রাগ হয়েছে যখন বুজতে পেরেছে ডিভোর্স দেওয়ার পরে তুই আবারো তার মেয়ের পিছনে পড়েছিস।আমি বরাবরই তোর সমর্থন করি।তবে এই কাজ এ তোকে সমর্থন করতে পারবো না।হ্যা তোদের আসল ডিভোর্স হয়নি এটা তোর পরিবারকে বলে দিতে বল।তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।আমারো তো একটা ছোট বোন আছে আমি ভাই হয়ে কখোনো এমন কিছু মেনে নিতে পারতাম না।যে আমার বোন একবার কেদেছে আবার কাদবে।একই ভাবে শ্রেয়সীর ভাই ও মেনে নিতে পারছে না।
ফাহিম থামে।জোরে একটা দম নেই।মেহেরাজ চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে।ফাহিমের কথা গুলো সে ভেবে দেখেনি।বাবার উপরে রাগ করে পরম সৎ্য কথা গুলো ভাবে নি।আসলেই তো তার পরিবার এর দোষ।সে কেন ওই পরিবার এর দোষ দিচ্ছে।মেহেরাজকে মাথা নিচু করে থাকতে দেখে ফাহিম ছোট করে বলল,
-তোর কাজ হয়ে যাবে।তবে আমার মতে তোর উচিত আঙ্কেল কে দিয়ে শ্রেয়সীর বাবাকে সব সত্যি কথা বলতে।তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে।তোর বউ তোরই থাকবে।কিন্তু তুই যা করতে চাচ্ছিস এতে ঝামেলা বাড়বে।আমাকে ভুল বুজিস না।সবার প্রথম দুই পক্ষের কথা আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।এক পক্ষকে দোষারোপ করে লাভ নেই।আমি যদি বলি তুই দোষি।আমি বললেই কি তুই দোষি।ঠিক এমনই আমার কথা গুলো মন থেকে ভেবে দেখ।আসি।
আর দাঁড়ায় না ফাহিম।ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।মেহেরাজ এক পলক তাকায় ফাহিমের চলে যাওয়ার দিকে।তারপর আবারো মাথা নিচু করে নেই।ফাহিম দরজা ভেজিয়ে চলে যায়।মেহেরাজের কানে এখন ফাহিমের বলা প্রত্যেক টা কথা বেজে চলেছে।সত্যিই তো কোনো মেয়ের বাবা কি এসব মেনে নিতে পারবেন।কিন্তু মেহেরাজ তো চেয়েছিলো তাকে বুজিয়ে বলতে।কিন্তু তার আগেই ঘটনা টা কেমন হয়ে গেলো।
মেহেরাজ নিজের উপরেই ভীষন বিরক্ত।তবে নিজের সিধান্তের উপর থেকে সে নড়লো না।সে যা ভেবেছে তাই করবে।তবে ফাহিমের কথা মতো মেহেরাজ যদি পারতো বাড়িতে গিয়ে সব মিটমাট করে নিতো।কিন্তু তা তো সম্ভব না।কারন মেহেরাজ রাগ করে বাড়ি ছেড়েছে।মেহেরাজ আর যাবেনা সেখানে।কেন যাবে যেখানে তার বাবা বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে।
চট্রগ্রাম বন্ধর থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে জঙ্গলের ঝোপঝাড়। পাশেই শষান ঘাট।এখানে তেমন মানুষ জন আসেনা বললেই চলে।জঙ্গলের পাশ দিয়ে বন্দরে যাওয়ার পাকা রাস্তা করা।তবে সেই রাস্তা সব সময়ের জন্য বন্ধই থাকে।কেও কখোনো খোলা রাখেনি।এমনকি এই জঙ্গলে হিংস্র পশু আছে বলে স্থানীয় থানা থেকে এই জায়গায় সাধারন জনগন যাওয়া সম্পুর্ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভর দুপুর।মাথার উপরে সুর্য তার রনচন্ডী রুপ দেখাচ্ছে।।সমুদ্রের দমকা বাতাস জঙ্গলের ভিতরেও বইছে।সাথে ভেসে আসছে সমুদ্রের ঢেও এর গর্জন আর জাহাজের হুইশেল এর শব্দ।জঙ্গলের ঠিক মাঝ বরা বর ছোট একটা ভাঙা চুরা কাঠের পোড়া বাড়ি।বাইরে দেখে দেখলে যে কেও ভিতরে ঢুকতে ভয় প্ববে কেমন ভুতুড়ে পোড়া বাড়ির মতো।
আর সেই বাড়ির পাতাল ঘরে একটা আধমরা লোক পড়ে আছে।পাশে থাকা দানবীয় দুজন লোকটার দু হাত কেটে নিয়েছে করাত দিয়ে।লোকটি স্থানীয় পুলিশের গুপ্তচর।সামান্য সন্দেহের তাগিতেই জঙ্গলে প্রবেশ করেছিলো তাতেই তার জীবন আজ বিপন্ন।দুহাত দিয়ে গল গল করে রক্ত বের হচ্ছে লোকটার।তবে চোখ মেলে তাকানোর উপাই নেই।কারন তাকে বেধড়ক পিটিয়েছে লোক গুলো।ছেলে দুটো তাকে সোজা করে চেপে ধরে রেখেছে।
হাতের প্রচন্ড যন্ত্রনায় যেখানে লোকটার ছটফট করার অবস্থা সেখানে এক চুল নড়ার ফুসরত নেই।তার সামনেই কাঠের চেয়ারে বসে আছে সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরা এক লোক।ঘাড়ে সাদা গামছা।হজ করে আসার পর থেকে সাদা জিনিস পরতে ভিষন ভালো লাগে তার।লোকটি গালে থাকা পান গুলো থু থু করে পাশে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।তারপর।
আদমরা বেদনাশিক্ত লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।আহত লোকটা মুখ তুলে তাকানোর আগেই সাদা পাঞ্জাবি পরা লোকটা আহত লোকটার কাটা দু হাতে দু মুঠো লবন চেপে ধরে কিড়মিড় কতে বলে,
-শু*য়োরের বা*চ্চা আমার রাজত্ব ধ্বংস করবি বলে এসেছিলি খবর নিতে।এখন ভাব তোর মরার খবর কেও পাবে কিনা।
লোকটি অসহ্য যন্ত্রনায় ছটফট করে উঠে।পান খাওয়া লোকটা লাল হয়ে যাওয়া দাত বের করে হেসে তাকে ধরে রাখা ছেলে দুটোকে ইশারায় ছেড়ে দিতে বলে।সাথে লোকটা ধপাশ করে মাটিতে পড়ে গিয়ে যন্ত্রনায় ছটফটাতে থাকে।তার কাটা হাত দুটো পাশেই বিদেশি দুটো কালো রঙের হিংস্র কুকুর পরম শান্তিতে ছিড়ে ছিড়ে খাচ্ছে।
পাঞ্জাবি পরা লোকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে উদ্দেশ করে বলে,
‘টমি আর নমি কে ওর পা দুটো কেটে দে।ওরা অনেক দিন ধরে মানুষের স্বাদ পাচ্ছে না ঠিক মতো।
লোকটইর কথা শেষ হতেই বিশাল ধার ওয়ালা রাম দা নিয়ে ছেলেটা এগিয়ে আসে।যেমন রাম দা তেমন ওর শরীর।আহত লোকটা কেদে উঠে।ছেড়ে দেওয়ার আকুতিতে।তবে কারোর মন গলেনা।এক কোপে আলাদা হয়ে যায় পা দুটো।লোকটা বিকট চিল্লানি দিয়ে উঠে যন্ত্রনায়।পাঞ্জাবি পরা লোকটা আরো জোরে হেসে উঠে বলে,
-আমার রাজত্ব দেখতে চেয়েছিলি না।দেখে নে।এই টমির পেটে তোর মতো আরো কত গুলো পুলিশ গুপ্ত চর গেছে তার হদিশ নেই।
লোকটি ছটফট শুরু করে একটা ছেলে এসে কাটা পা দুটোয় লবন আর গুড়ো মরিচ দিয়ে যন্ত্রনা বাড়িয়ে দেয়।মুখের মাঝে ঝালের গুড়ো পুরে তুলে পুরে চুন লাগিয়ে দেয়।লোকটি অসহ্য যন্ত্রনায় ছটফট শুরু করে।যা দেখে পাঞ্জাবি পরা লোকটা পৈশাচিক শান্তি পাই।তারপর ছেলে দুটোর দিকে তাকিয়ে বলে,
-ওর শরীরের সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ গুলো খুলে ল্যাবে দিয়ে আসবি।মনে রাখিস এই শু*য়োরের বাচ্চা বেচে থাকতেই সব খুলবি যাতে মৃত্যুর মিষ্টি স্বাদ ও নিতে পারে।
শ্রেয়সী আজ কোচিং এ যাবেনা তাই ইরু একা একা চলে গেছে।যদিও আজ সেও যেতোনা তবে বাড়ি থেকে গুছিয়ে বের হওয়ার পর এখন আবার ফিরে গেলে নিশ্চয় তার আম্মু আর না বকে থাকবে না।তাই ইরু মন খারাপ করে রাস্তার পাশের ফুটপত ধরে আপন মনে হেটে যেতে শুরু করে।হাটতে হাটতে হুট করে ইরু কিছু এক্টার সাথে হোচট খেয়ে পড়ে যেতে নিয়ে ধাক্কা খায় কারো বক্ষে।তার হাতে থাকা চায়ের কাপটা দূরে ছিটকে পড়ে।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৯
সামান্য চা লোকটির হাতেও পড়ে।ইরু নিজেকে সামলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় তারপর ধাক্কা খাওয়া লোকটির দিকে তাকাতেই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ওর।কাপা কাপা কন্ঠে বলে উঠে,
-আপনি এখানে??
