উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ১
রুহানিয়া ইমরোজ
-“ পঞ্চাশ হাজার টাকার বিনিময়ে, পার্মানেন্টলি আমার বাড়ির কাজের লোক হিসেবে কিনে নিতে চাই আপনার
সৎ মেয়েকে।
সদ্য বিয়ে ভাঙা চিত্রলেখার জন্য প্রস্তাবটা রাখলেন নিতু মেহবুব। বিয়ের সাজে থাকা অষ্টাদশী চিত্রা চমকে উঠে অশ্রু ভেজা চোখে তাকাল। লজ্জায়, অপমানে বুকটা হুঁ হুঁ করে উঠল তার। দিশেহারা লাগলো নিজের মৃত মায়ের কথা ভেবে।
এই সুবিশাল পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই চিত্রার। আছে কেবল সিমেন্টের স্তুপে ঢাকা তার মায়ের কবর। তার একমাত্র শান্তির ঠিকানা। অত্যাচারিত হওয়ার পর কিংবা মন খারাপের দিনে ওই কবরটাই তার একমাত্র আশ্রয়। মা’কে ফেলে কোত্থাও যেতে চাই না চিত্রা কিন্তু মুখ ফুটে সেকথা বলা যাবে না। বলবে কীভাবে? টু শব্দ করলেই তো অকথ্য ভাষার গালাগাল শুনতে হবে। ভরা মজলিসে তার মৃত মা’কে টেনে নোংরা কথা বলা হবে৷ এসব সহ্য করার ক্ষমতা নেই তাই নিশ্চুপ রইল আর মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে থাকল।
নিতু মেহবুবের প্রস্তাবটা মন্দ লাগলো না, চিত্রার সৎ মা চাঁদনী বেগমের। উনার টাকার লোভ নেই কিন্তু চিত্রাকে ঘাড় থেকে নামানোর আকাশসম ইচ্ছে আছে৷ সতীনের মেয়েটা তার দুচোখের বিষ। তাইতো, আঠারোর ঘরে পা দিতেই মোটামুটি একটা স্বচ্ছল পরিবারের হাতে গছিয়ে দিতে চেয়েছিলেন চিত্রাকে।
পরিকল্পনা মাফিক আজ চিত্রার বিয়ে ছিলো কিন্তু বর আসেনি। শেষ মুহূর্তে বন্ধুদের সাহায্যে পালিয়েছে এবং বলে গেছে, “ চিত্রার মতো কালির ড্রাম কে বিয়ে করতে পারবে না সে । ” যদিও প্রকৃত পক্ষে চিত্রার গায়ের রঙ খুব একটা চাপা নয় তবে কাজের চাপ আর মানসিক অশান্তিতে থাকার ফলস্বরূপ খানিকটা কালচে দেখায় তার দেহের বরন৷
এমনিতে মেয়েটার গঠন খুব সুন্দর। খাড়া নাক, হরিণী চোখ, ঘন কালো মসৃণ চুল যা একদম জমিন ছুঁই ছুঁই। স্বভাবে মিষ্টি এবং মিশুকে। ঘরের কাজকর্মে নিপুণা। বয়স এর তুলনায় বেশ দায়িত্বশীল মেয়েটা। তার গুনের বাহার থাকলেও ভাগ্যটা অপ্রসন্ন। তাইতো, প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও কাজের লোক হিসেবে নিলামে উঠানো হচ্ছে তাকে৷
ঘরভর্তি মানুষজন৷ বিয়ে খেতে এসেছিল সবাই। বর আসেনি শুনে ভীড় জমিয়েছিল চিত্রার ঘরে৷ ভেবেছিল স্বান্তনা মূলক দু’টো খোঁচা দিয়ে বেরিয়ে যাবে কিন্তু নিতু মেহবুবের প্রস্তাব শুনে হকচকিয়ে তাকিয়ে আছে সবাই৷ পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে ঘরে। চিত্রার সৎ মা চাঁদনী বেগম কিছু একটা ভাবছেন। এরমধ্যে হুট করে আগমন ঘটে চিত্রার পিতা জনাব আশিকুর শিকদারের। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে চিল্লিয়ে বলেন,
-“ খা*নকির বেটি, বাইর হ আমার বাড়ি থেকে। ওর মা আমার সুখশান্তি খাইছে আর এই অপ/য়াকে রাইখা গেছে আমার সম্পদ খাওয়ার লাগি। কোন কু/ক্ষণে যে ওরে জন্ম দিছিলাম। কু*ফা একটা…
আকস্মিক অকথ্য গালিগালাজ শুনে চমকে উঠে চিত্রা। মারের ভয়ে পিছিয়ে যায় দু কদম। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নেয় কথাগুলো। কথার আঘাত ক্ষতবিক্ষত মনকে সামলাতে খামচে ধরে লেহেঙ্গার দু’পাশ। তাতে বসানো তীক্ষ্ণ ধারাল স্টোন গুলো বিঁধে যায় চিত্রার হাতে। গাঢ় লালচে তরলে মেখে যায় কোমল হাতখানা কিন্তু কারও দেখার ফুরসত নেই।
চিত্রা নিজেই অনুভব করতে পারছে না কিছু। শারীরিক আঘাতের চাইতে কথার আঘাতটা বেশি গায়ে লেগেছে। আশিকুর শিকদারের বলা অপ্রীতিকর শব্দচয়ন চিত্রার বুকে গিয়ে বিঁধে ফলস্বরূপ বহুক্ষণ ধরে আঁটকে রাখা অশ্রু কণারা বাঁধন হারায়।গাল বেয়ে গড়িয়ে গিয়ে স্পর্শ করে চিবুক। তার মতো আর একটাও অভাগী আছে? সৎ মায়ের চাইতেও জন্মদাতার নিকট বেশি অবাঞ্ছিত সে৷
স্বামীকে অস্বাভাবিকভাবে রেগে যেতে দেখে চটজলদি ছুটে আসেন চাঁদনী বেগম৷ সামাজিকতা বজায় রাখতে মিছে ভান ধরে বলেন,
–“ শান্ত হোন। কিসব বলছেন! মানছি চিত্রার দোষে বিয়েটা ভেঙেছে তাই বলে আপনি এভাবে চিল্লাপাল্লা করে অসুস্থ হবেন? আপনার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে?
স্ত্রীর ন্যাকা কান্নায় আরও বেশি রেগে গেলেন আশিকুর সাহেব। হাই প্রেশার রুগী বলে হাজারটা রেস্ট্রিকশন মানতে হয় অন্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। সাময়িক চিল্লাপাল্লায় হাঁপ ধরে গেল উনার৷ দরদর করে ঘামতে লাগলো শরীর। স্থিরচিত্তে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা চিত্রার দিকে তাকাতেই মাথায় আগুন ধরে গেলো রীতিমতো। আর নিতে পারছেন না তিনি। মেয়েটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে পদ্মায় ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। সেটা তো আর সম্ভব নয় তাই রাগে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
–“ আজ এমুহূর্তে, এই মেয়েকে ত্যাজ্য করলাম আমি৷ আমার কোনোকিছুর ভাগ পাবে না সে। এক্ষুণি বেরিয়ে যেতে বলো তাকে…
চিত্রা আঁতকে উঠে বাবার কথায়। চট করে মুখ তুলে তাকায়। বিস্মিত তার হাবভাব। আশিকুর শিকদার রাগে জেদে হাস ফাঁস করছেন রীতিমতো। চিত্রা কোনোকিছু না ভেবে সোজা ছুটে আসে তার বাবার কাছে। দুই হাতে তার পা জড়িয়ে মাথাটা জমিনে ঠেকিয়ে ক্রন্দনরত সুরে বলে,
-“ আব্বা.. ও আব্বা? কালো হয়ে জন্মে ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছি আমি। শাস্তিস্বরূপ না-হয় আমার গায়ের কুৎসিত চামড়াটা নাহয় কেটে ফেলেন তবুও আমায় ত্যাজ্য করিয়েন না। নির্মম পৃথিবী আমায় বাঁচতে দিবে না আব্বা। দোহাই লাগে আল্লাহর, একটা সুযোগ দেন আমায়।
ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠে সকলে। আশিকুর শিকদার তৎক্ষনাৎ কিছু বলেন না। তাকে থমথমে মুখে বসে থাকতে দেখে চিত্রা আবারও আর্তনাদ করে বলে উঠে,
-“ আমারে কেবল এক বেলার খাবার দিয়েন। আপনার মন চাইলে ইচ্ছে মত মারধোর করিয়েন। আমি একটুও কান্না করব না, চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলব না। বাড়ির সব কাজও করে দিব। খালি আমারে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েন না। আম্মুকে ছাড়া কীভাবে থাকব আমি? একটুখানি দয়া করেন…
মৃত স্ত্রীর নামটা রাগের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল৷ আশিকুর শিকদার বাছবিচার না করেই কষিয়ে এক লাত্থি মারলেন। বুকের মধ্যে প্রবল এক ধাক্কা খেয়ে তিন হাত দূরে ছিটকে পড়ল চিত্রা৷ সাংঘাতিক ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে জোরালো চিৎকার দিয়ে বসলো। তাতে বিন্দুমাত্র মন গললো না আশিকুর শিকদারের।
বসা থেকে উঠে গিয়ে ব্যথাতুর অর্ধ অচেতন চিত্রার হাত টেনে ধরে তাকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে বাইরের সিঁড়ির দিকে ধাক্কা মারলেন।মেয়েটা পাক খেয়ে একদম মইন রোডের উপর গিয়ে পড়ল। চিত্রা তখন বেহুঁশ প্রায় কিন্তু তার কানে এসে পৌঁছালো কিছু নোংরা কথা,
-“ কোনো বে/শ্যার মেয়ের জায়গা নেই এবাড়িতে। আর যদি কোনোদিন চৌকাঠ মাড়াতে দেখি তাহলে ভাড়াটে গুন্ডাদের হাতে তুলে দিয়ে আসব। মায়ের মতো ধ/র্ষিত হয়ে মরিস তখন।
চিত্রার আধবোজা চোখের কোল ঘেঁষে গড়িয়ে পড়ল উষ্ণ পানির ফোঁটা। আফসোস হল নিজের জন্মপরিচয় নিয়ে। খোদার উপর অভিমান জন্মাল। মুখ ফুটে কিছু বলতে গেলে বমির মতো গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসল। চিত্রার এলোমেলো মস্তিষ্কে উঁকি দিল একটা প্রশ্ন, “ সে কি মরে যাচ্ছে? ”
মৃত্যু তো বহুকাল আগে থেকেই চেয়ে আসছে। আজ বুঝি খোদার দয়া হলো? বেশি একটা ভাবলো না সে৷ স্মিত হেসে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাইল। এরপরই নিশ্চয় মায়ের কাছে চলে যাবে? তার বুকে ঘুমাবে, মন ভরে আদর খাবে, বাবার নামে অভিযোগ দিবে, আর.. আর কক্ষনো পৃথিবীতে আসতে চাইবে না। এদের রুপ তার রুহ কাঁপিয়ে ছেড়েছে৷
অসহ্য রকমের ব্যথা হচ্ছে চিত্রার বুকে। তার আত্মা টেনে বের করা হচ্ছে বুঝি? কিন্তু আজরাইল কই? তার ভয়ানক মুখশ্রী তো দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কী চিত্রা মারা যাচ্ছে না? ব্যপারটা ভালোভাবে বুঝতে ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসতে থাকা চোখের পাতাগুলো খোলার চেষ্টা করল চিত্রা৷ তার নিভু নিভু দৃষ্টিতে ভেসে উঠে নিতু মেহবুবের স্নিগ্ধ মুখখানি। যিনি ব্যস্ত ভঙ্গিতে তাকে ডেকে যাচ্ছে। চিত্রা অস্ফুটস্বরে বলল,
–“ আ মি ক্লান্ত। আর কোনো কাজ করতে পারব না। ছেড়ে দিন আমায়৷ যেতে দিন আম্মুর কাছে…
তার ফিসফাস কথা কারও নিকট পৌঁছালো না। নিতু মেহবুব নিজ দায়িত্বে তাকে নিয়ে ছুটলেন পাশ্ববর্তী এক সরকারি হাসপাতালে। চিত্রা শরীরী মৃত্যু চেয়েছিল কিন্তু তার এখনও জীবন্ত লাশ হওয়া বাকি। সে কীভাবে মুক্তি পাবে এত তাড়াতাড়ি?
