উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ২
রুহানিয়া ইমরোজ
(পরদিন সকালে)
অভিশপ্ত রাত পেরিয়ে রৌদ্রজ্জ্বল দিনের আগমন ঘটেছে। সময়কাল দুপুর একটার ঘরে। লম্বা একটা ঘুম দিয়ে জেগে উঠল নাওয়াফ। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই কাঁধে জ্বলুনি অনুভব হলো। ঘুমঘুম চোখে সেদিকে ফিরে চাইতেই দেখল, দাঁতের দাগ বসে আছে। সাথে সাথেই ভ্রু কুঁচকে গেলো ওর। মস্তিষ্ক সচল হতেই মনে পড়ল গতকাল রাতে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা। আস্তে-ধীরে ভ্রু’র ভাঁজ মিলিয়ে বিরাট এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে। গত রাতে নেশার ঘোরে কি কি বলেছে মনে পড়তেই বিরক্তিতে ছেয়ে গেল মন।
চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে চেয়ে চিত্রাকে খুঁজল কিন্তু পেলো না। কৌতূহলী নাওয়াফ বেড ছেড়ে উঠে গোটা বাড়িতে নিরব অনুসন্ধান চালাল। কোথাও দেখা মিলল না চিত্রার। নাওয়াফ ভাবল, হয়তো ওর কথা শুনে পাশের ফ্ল্যাটে গেছে তাই খুব বিশেষ একটা ভাবান্তর হল না তার। চিত্রাকে খুঁজছিল কিছু প্রশ্নোত্তরের জন্য নয়তো সে যা অন্যায় করেছে এরপর তার মুখোমুখি হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই নাওয়াফের।
চিত্রা ওর বিশ্বস্ততার সুযোগ নিয়েছে, এই ব্যপারটাই মানতে পারছে না নাওয়াফ। তার উদ্দেশ্য ক্ষতিকর না থাকলেও একধরনের প্রতারণা করেছে চিত্রা৷ সে আঘাত হেনেছে তার বিশ্বাসে। যা একদমই নিতে পারে না নাওয়াফ। ও বুঝে না, কেনো বারবার ওর সাথে এমন হয়? ভাবতে ভাবতেই তুমুল রাগ চেপে বসে তার মাথায়।
কোনোমতে নিজেকে শান্ত করতে ড্রয়িংরুমে আসে। এই জায়গাটা ওর ভীষণ পছন্দের,এক পাশে স্বচ্ছ কাঁচের সিলিং থাকায় ব্যস্ত ঢাকা শহরের চমৎকার সব দৃশ্য দেখা যায়। ভারি পর্দা সরিয়ে, এসির টেম্পারেচার নামিয়ে সোফায় বসে পড়ে নাওয়াফ। নিরব চোখে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে বাইরের দৃশ্য কিন্তু কিছুতেই মন শান্ত হয় না।
অদ্ভুত এক কারণে হাস ফাঁস করছে নাওয়াফের ভেতরটা। ফলে মেজাজও ঠান্ডা হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে চিত্রাকে ধরে এনে আচ্ছামত ধমকাতে। নিজের এই রেডিকিউলাস চাইল্ডিশ বিহেভিয়ারের উপরেও প্রচুর বিরক্ত নাওয়াফ। কি হচ্ছেটা কি তার সাথে? এমনতো না যে চিত্রা ওর জীবনের প্রথম নারী।
চৈত্রিকার সাথে প্রায় বছর খানকের সংসার ছিল। বেশ অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছে তারা। এরপরেও ওর জন্য কখনো এমন কোনো অনুভূতি কাজ করেনি। বলতে হবে, এই মেয়ের এলেম আছে নয়তো এত বছরের গুপ্ত সত্য ওর সামনেই কেনো প্রকাশ পেল? নাওয়াফের এন এস আইতে থাকার ব্যপারটাও জেনে গেছে অথচ এক ছাদের নিচে থাকা সত্ত্বেও তার বাবা মা জানে না এখনো।
চৈত্রিকার নোংরামি সম্পর্কেও কেউ জানে না। বলা বাহুল্য, নাওয়াফ কখনোই কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করেনি। চৈত্রিকা জীবিত থাকলেও এসব নিয়ে হাউকাউ করত না নাওয়াফ। সে অন্যের মতো হক অধিকার,কিংবা ভালোবাসা ভিক্ষা চাইতে পছন্দ করে না। তাদের সুন্দর একটা সংসার ছিল। অতিরঞ্জিত প্রেম না থাকলেও সাদামাটা অনুভূতির জোয়ার ছিল। তাই তো বিয়ের পরপরই সন্তান নেওয়ার ব্যপারে দু- জন সম্মত হয়।
তাদের চাওয়া অপূর্ণ রাখেনি খোদা।বিয়ের এক মাসের মাথায় সুখবর আসে। তবে হরমোনাল সমস্যা থাকায় কনসিভ করার পর বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে চৈত্রিকা। ডক্টর তাকে বেড রেস্টে রাখার পরামর্শ দেন। নাওয়াফ আদর্শ স্বামীর ন্যায় অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সমস্ত ইন্সট্রাকশন। চৈত্রিকা যখন আড়াই মাসের প্রেগন্যান্ট তখনই মিশনে যাওয়ার প্রস্তাব আসে।
নাওয়াফ নাকচ করতে চায় কিন্তু সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে তার দায়ভার ছিল আকাশচুম্বী। সবটা তো চাইলেই আর ঝেড়ে ফেলা যায় না। বাধ্য হয়ে সে চৈত্রিকার থেকে অনুমতি চায়। চৈত্রিকাও খুব বিশেষ জোরাজোরি কিংবা কান্নাকাটি না করেই তাকে যেতে দেয়।
সন্তানের আগমের খবরে নাওয়াফ বেশ আবেগ তাড়িত হয়ে পড়ে। মিশনে গিয়েও মন টিকতো না তার। ফোনে একটু নেট পেলেই চৈত্রিকার সাথে কথা বলার জন্য মুখিয়ে থাকত তবে এসব ব্যপারে চৈত্রিকা ছিল নির্বিকার। নাওয়াফের সাথে কথা বলতে চাইতো না তেমন। তার কর্মকান্ডের কোনোটাই চোখ এড়ায়নি নাওয়াফের। ভীষণ মন খারাপ হতো তার কিন্তু সেই নিজেকে সান্ত্বনা দিত। সমস্তটা হরমোনাল ইমব্যালেন্সের দোষ বলে উদাস মনকে বোঝাতে চাইতো কিন্তু মন কি আর ঠুনকো যুক্তি বোঝে?
রাত বিরেতে কল দিলে চৈত্রিকাকে পাওয়া যেত না। ওদিকে তার মা অর্থাৎ নাজনীন বেগম জানাতেন, চৈত্রিকা নাকি রাতে ঘুমায় না, সারারাত কার সাথে জানি কথা বলে। মাঝে মধ্যে একঝাঁক বন্ধু বান্ধব আসে তার বাড়িতে। চৈত্রিকা নাওয়াফের কথা অমান্য করে যেখানে সেখানে ঘুরতে যায়৷ দূর দেশে থাকা নাওয়াফ তখন পুরোপুরি বিভ্রান্ত।
একদিকে মনে হয়, সব যুক্তি অযৌক্তিক,মা তার বউকে হিংসা করে তাই বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছে, হয়তো চৈত্রিকা তার উপর অভিমান করেছে তাই ফোন ধরে না। অন্যদিকে মনে হতে থাকে, সমান্য দূরত্ব সবকিছু শেষ করে দিল? চৈত্রিকা কীভাবে এত নির্বিকার? কেনো এত পাল্টে গেল?
ডিউটির চাপ, নির্ঘুম রাত আর বুক ভরা তৃষ্ণা; নাওয়াফকে পাগল করে তুলেছিল। বেচারা অসুস্থও হয়ে পড়ে খানিকটা। এরমধ্যে মিশন শেষ হয়ে যায়। কাউকে কিছু না জানিয়ে দেশে ফিরে অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নাওয়াফ কেননা চৈত্রিকার ডেলিভারির পর লম্বা একটা ছুটি নেওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। শত ব্যস্ততার মাঝেও স্ত্রী, সন্তানের স্বাস্থ্যের দিকটা খেয়াল রাখতে ভুলতো না অবশ্য।
তবে চৈত্রিকা পুরোপুরি পাল্টে যায়। নাওয়াফের সাথে লং টাইম কলে থাকতে বিরক্তবোধ করত। কিছুক্ষণ থাকলেও এডাল্টিক কথাবার্তার বাইরে অন্য কোনো টপিকে কথা বলতে চাইতো না। এমনকি তার কিছু কিছু কাজকর্ম সীমা ছাড়িয়ে যেত৷ নাওয়াফ ভাবত, হয়তো দীর্ঘদিন দূরে থাকার ফলে এমনটা হচ্ছে। ব্যপারটাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে সে।
ডক্টর যদি নিষেধাজ্ঞা না দিত তাহলে নাওয়াফ কখনোই এত দীর্ঘ সময় মিশনের বাহানায় দূরে থাকতো না।মূলত নিজের উপর কন্ট্রোল রাখতেই এসব করা তবে স্ত্রীর মনোভাব বুঝে বাড়ি ফেরার সিধান্ত নেয়। অফিস আওয়ারে তীব্র অসুস্থতার নাটক করে ছুটি নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ইচ্ছে ছিল স্ত্রীকে চমকে দেওয়ার কিন্তু বেচারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি ওর জন্য কত বড় শকিং নিউজ অপেক্ষা করছে৷
বাড়ি ফিরে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতেই অত্যন্ত জঘন্য এক দৃশ্যের সম্মুখীন হয় নাওয়াফ। দেখে, ডাইনিং টেবিলের উপর নগ্ন শরীরে চাদর চেপে বসে আছে চৈত্রিকা। তার পাশে গা ছাড়া ভাবে নির্বিকার ভঙ্গিমায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজন তালুকদার তথা তার কুখ্যাত বেস্ট ফ্রেন্ড ৷ প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারে না নাওয়াফ৷
বোকার মতো তাকিয়ে থাকে স্রেফ পরক্ষণে তার কানে আসে কিছু কথা, পরকীয়া করতে গিয়ে নাজনীন বেগম এবং আশরাফ সাহেবের কাছে ধরা খেয়েছে চৈত্রিকা। নাওয়াফ অবশ্য ঠিক সময়ে পৌঁছে ষোলোকলা পূর্ণ করেছে৷ কথাটা শোনার পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় নাওয়াফ অবাক হয়ে চেয়েছিল স্ত্রীর পানে। কোনো সন্তানসম্ভবা নারী যে এমন কুরুচিপূর্ণ কাজ করতে পারে সেটা তার কল্পনাতীত ছিল।
স্ত্রীর কান্ডে বড় একটা ধাক্কা খায় নাওয়াফ। তার তিলে তিলে গড়ে ওঠা বিশ্বাসের দেওয়াল এক ঝটকায় চূর্ণ- বিচূর্ণ হয়ে যায়৷ নাজনীন বেগম চেঁচামেচি করে রাগ ঝেড়ে নিচ্ছিলেন কিন্তু নাওয়াফ সামান্য কথাটুকুও বলতে পারছিল না৷ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে চৈত্রিকাকে দেখছিল৷ ওর মস্তিষ্ক ঘুরপাক খাচ্ছিল এক অবুঝ প্রশ্ন, যেখানে ও সন্তানের কথা ভেবে দীর্ঘ আট মাস সংযম বজায় রেখেছে সেখানে চৈত্রিকা আর কয়টা দিন অপেক্ষা করতে পারেনি?
পুরো বিষয়টা ভীষণ বাজেভাবে আক্রমণ করে বসে নাওয়াফকে। ওকে দেখে তার সো কল্ড বেস্ট ফ্রেন্ড রাজন তালুকদার হাসতে হাসতে ঘর ছেড়ে বেরোনোর সময় বলে যায়,”তোর বউয়ের দম আছে নাহলে এই অবস্থায়..” বাকিটা না বলে শীষ বাজাতে বাজাতে চলে যায় রাজন। তার কথা শুনে সম্বিৎ ফিরে পায় নাওয়াফ৷ রক্ত চড়ে যায় তার মাথায়। মন চায় দু’টোকে শেষ করে দিতে কিন্তু অনাগত সন্তানের ভেবে চৈত্রিকার গায়ে হাত তুলতে পারে না। মানসিক ধাক্কাটা তখনও ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছিল৷
এদিকে নাওয়াফ কে দেখে অতি ভয়ে টেবিল ছেড়ে নামতে গিয়ে ধপ করে টাইলসের ফ্লোরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে চৈত্রিকা। সাথে সাথেই মরণ-চিৎকার দিয়ে উঠে। নাজনীন বেগম এবং আশরাফ সাহেব হতভম্ব হয়ে যান৷ চৈত্রিকা দোষী হলেও তাদের বংশধর তো নির্দোষ এই মর্মে দ্রুত হসপিটালে কল দেন৷ ঢাকার চিরাচরিত জ্যামের ভরসা নেই ভেবে নাওয়াফকে তাগাদ দেন, চৈত্রিকাকে নিয়ে আগানোর জন্য।
শুরুতে নাওয়াফের রুচি হয় না ওকে ধরার। চৈত্রিকা ভয়ে ব্যথায় হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। অতিরিক্ত চাপ পড়ায় ওয়াটার ব্রেক হয়ে যায়। চৈত্রিকা প্রসব বেদনায় ছটফটিয়ে উঠে। আশরাফ সাহেব ছেলের অবস্থা বুঝেও অপারগ হয়ে তাকে জোরাজোরি করতে থাকেন৷ নাজনীন বেগমও পীড়াপীড়ি করেন কিন্তু নাওয়াফ অনড়। অসহ্য ব্যথা সইতে না পেরে চৈত্রিকা ভাঙা গলায় জানায়,” তার গর্ভে থাকা ছোট্ট শিশুটা নাওয়াফেরই। চাইলে সে ডিএনএ টেস্ট করিয়েও দেখতে পারে। ”
এমন যুক্তি শুনে ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠে নাওয়াফের। নিজেকে চরম লেভেলের বলদ মনে হয়। মস্তিষ্ক তাকে তিরস্কার করে যা তা বলতে থাকে। তরতরিয়ে রাগ বাড়ে তার৷ দাঁতে দাঁত পিষে নিজেকে আঁটকে রাখার চেষ্টা করে। মস্তিষ্ক উদভ্রান্ত কিন্তু কোথাও না কোথাও নিজের সন্তানের চিন্তা নাওয়াফকে থামিয়ে দিচ্ছিল।
ততক্ষণে চৈত্রিকার অবস্থা বেগতিক। ও আস্তেধীরে ঝিমিয়ে পড়তে থাকে। বাধ্য হয়ে মেজাজে লাগাম টেনে এবং নিজের সন্তানের কথা ভেবে তাকে কোলে তুলে নাওয়াফ। ওর শরীরে হাত ঠেকতেই গা গুলিয়ে উঠে বেচারার। ভেতর থেকে উগড়ে আসতে চায় সমস্তটা৷ নিজেকে দমাতে ব্যর্থ হয় সে৷
চৈত্রিকাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে পাশ ফিরতেই গলগলিয়ে বমি করে বসে। ওর এতটাই অরুচি হয়েছিল যে পরবর্তী দুই ঘন্টায় টানা চার বার বমি করে সে। বিশ্বাসঘাতকতার চরম আঘাতটা সইতে পারেনি নাওয়াফ। চৈত্রিকার প্রতি জন্মানো সূক্ষ্মতর স্বচ্ছ অনুভূতির অবমূল্যায়ন মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। এত আত্মত্যাগের পর যদি কাউকে ধরে রাখা না যায় তাহলে সে মানুষটা কীভাবে অন্য কাউকে বিশ্বাস করবে?
এর পরের ঘটনা গুলো খুব দ্রুত ঘটে। জ্ঞান ফেরার পর পরই মৌখিক ভাবে চৈত্রিকাকে তিন তালাক দেয় সে। তাতে অবশ্য চৈত্রিকা কিছুই বলেনি বরং সেদিনই সে রাজনের হাত ধরে পালিয়ে যায়। নাওয়াফ জানা সত্ত্বেও তাকে থামানোর বা তাদের থেকে বদলা নেওয়ার চেষ্টা করেনি। নাফিমকে বুকে রেখে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছে । স্ত্রীর প্রতি এতটা বিতৃষ্ণা ধরেছিল যে তার শূন্যতা বিন্দু পরিমাণও ছুঁতে পারেনি তাকে।
এরমধ্যে চৈত্রিকার মৃত্যুর খবর শোনা যায়। সবাই বলে এক্সিডেন্টে মৃত্যু ঘটেছে। সাজানো হয়েছে সেই ভাবে কিন্তু নাওয়াফ খুব ভালো মতো জানে, রাজন নিজ হাতে হত্যা করেছে চৈত্রিকাকে। এসব নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যথা ছিল না। উল্টো খরবটা অদ্ভুত এক প্রশান্তি এনে দিয়েছিল তাকে। নাওয়াফ এতটাই পাষাণ হয়ে গিয়েছিল যে নিজের স্ত্রীর জানাজায় পর্যন্ত উপস্থিত হয়নি।
ঘরের দোর আঁটকে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিজের সাথে বোঝাপোড়া করছিল। সেদিন চৈত্রিকার সাথে নিজের সমস্ত অনুভুতি দাফন করে দিয়েছিল সেই সাথে নিজেকে কঠিন থেকে কঠিন বানানোর সিধান্ত নিয়েছিল। মানুষ ভেবেছিল নাওয়াফ হয়তো শোকে কাতর কিন্তু তার মস্তিষ্কে অদ্ভুত সুখ বিরাজ করছিল তখন।
কারও জন্য জীবন থেমে থাকে না। চৈত্রিকার মৃত্যুর পরের সপ্তাহে সবটা স্বাভাবিক হয়ে উঠে। ছোট্ট নাফিমের আগমন মাতিয়ে তুলে পুরো শিকদার ভিলা। ছেলের মোহে পড়ে খুব জলদি মানসিক টানাপোড়ন থেকে বেরিয়ে আসে নাওয়াফ। তবে চরম বিশ্বাসঘাতকতার স্বীকার হওয়া নাওয়াফ সিধান্ত নিয়ে ফেলে, কখনো কাউকে মনের ঘরে ঠাঁই দিবে না, এই ছন্নছাড়া জীবনকে সংসারে বাঁধবে না,নারীসঙ্গ হতে নিজেকে বিচ্যুত রাখবে।
চাইলেই কি সব হয়? নিয়তির লিখন যে খন্ডানো দায়। তাই তো নাওয়াফের পানসে জীবনে চিত্রলেখা নামক বোকাসোকা রমণীর আগমন হয়।
অতীতের খেয়ালে ডুবে থাকা নাওয়াফের ধ্যান ভাঙে মাগরিবের আযান শুনে। নড়েচড়ে উঠে ও। বুক চিরে বেরিয়ে আসে প্রবল দীর্ঘশ্বাস। এই এক জীবনে কেউই তাকে তার মতো করে বুঝল না; দিনশেষে পাশে রইল না। নাওয়াফ কত যত্ন নিয়ে আগলে রেখেছিল তারা কেবল পাষাণ রূপটাই বিচার করল৷ অন্য মানুষের কত সুন্দর পরিবার থাকে অথচ তার থেকেও নেই।
ছোটোবেলায় নিজের জন্মদায়িনীর কাছেও অবহেলিত ছিল নাওয়াফ কারণ নাজনীন বেগম মেয়ে সন্তান পছন্দ করতেন এবং তা-ই চেয়েছিলেন। আকস্মিক নাওয়াফ হওয়ায় তার সেই কি আফসোস! এসব নিয়ে প্রায়ই হীনমন্যতায় ভুগতেন তিনি। নাওয়াফকে উল্টাপাল্টা কথা বলে বসতেন এমনকি মারতেনও। প্রথমদিকে ব্যপারটা না বুঝলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে মায়ের সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলে নাওয়াফ।
বিনা দোষে তাচ্ছিল্য হজম করার চেয়ে নিরবে সরে আসা উত্তম মনে হয়েছিল তার। এরপর থেকেই পরিবার বিমুখ সে। আশরাফ সাহেবকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা করলেও তার প্রতি অতি আবেগময় ভালোবাসা কোনোকালেই ছিল না। কেননা কঠোর শাসনে রাখতে গিয়ে নাওয়াফের স্বপ্ন, শখ সবকিছুই কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি।
নাওয়াফ অভিযোগ করতে জানে না। অভিমান তার আসে না। বাস্তববাদী মানুষ বলে এক ঝটকায় সরে যায় সবকিছু থেকে৷ তার মনে হয় তিলেতিলে মরার চেয়ে সাময়িক মরণ যন্ত্রণা অনেক ভালো কিন্তু এই দূরত্বের বিরহ একদমই সহ্য হচ্ছে না তার। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে চিত্রার অভিমানে টইটম্বুর চেহারাটা না দেখতে পেলে অনর্থক ঘটে যাবে।
মন মস্তিষ্কের মাঝে তুমুল দ্বন্দ্ব লাগে। নানান যুক্তি তর্কে যাওয়ার পর আচমকা গতরাতের কিছু মুহূর্ত মনে পড়ে তার। চিত্রার ক্রন্দনরত মুখশ্রী, আহাজারি, দুর্বলতা, রীতিমতো অশান্ত করে তোলে নাওয়াফকে। মনে হতে থাকে, দোষ তো তারও আছে। শুরু থেকে মেয়েটাকে স্বাভাবিক একটা সংসার দিলে গতকাল নিশ্চয়ই ওসব করতে যেতো না?
পাঁচমিশেলি চিন্তা নাওয়াফকে পাগল করে তুলল৷ সহসাই নিকোটিনের তৃষ্ণা চেপে বসল মস্তিষ্কে। অতিরিক্ত স্ট্রেসড থাকলে এমনটা হয় তার। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই কলিং বেলটা বেজে উঠে। অসময়ে কেউ আসায় খানিকটা বিরক্ত হয় নাওয়াফ পরক্ষণে কিছু একটা মনে হতেই হুড়মুড়িয়ে গিয়ে দরজা খুলে। তার আশায় এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে দরজার ওপাশে নাজনীন বেগম বলে উঠেন,
–” কি ব্যপার? আজ বাইরে যাসনি যে ? ”
নাওয়াফ হকচকায়৷ অন্যমনস্ক থাকায় একটু বিব্রত হয়ে বলে,
–” না, আসলে শরীরটা ভালো না লাগায় ছুটি নিয়েছি।”
ছেলের চোখেমুখের অপ্রস্তুত ভাবটা দেখে কিঞ্চিৎ খুশি হোন নাজনীন বেগম। তিনি এসেছেন চিত্রার থেকে আসল খবরটা জানতে কিন্তু মেয়েটাকে তো দেখাই যাচ্ছে না। স্বামীর ভার সামলাতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ল নাকি?
নাজনীন বেগমের চোখ মুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠে। নাওয়াফের হাবভাব আর চিত্রার অনুপস্থিতি দেখে তিনি সবটা বুঝে গেছেন। পরিশেষে আহাম্মক দু’টোর গতি হলো তবে। পরিস্থিতি বুঝেও কেনো যেনো নিজেকে দমাতে ব্যর্থ হলেন নাজনীন বেগম৷ হাতের নাস্তা টেবিলের উপর রেখে বললেন,
–” তুই খেয়ে নে বাবা। আমি একটু চিত্রার সাথে দেখা আসি৷ কই যে থাকে মেয়েটা। আমি না আসলে তো তার দেখাই পাওয়া যায় না। রুমে আছে নাকি তোর বৌ?”
নাজনীন বেগমের প্রশ্নটা চমকে দেয় নাওয়াফকে। ও প্রশ্নাত্মক কন্ঠে শুধায়,
–” চিত্রা কই মানে? ও তোমাদের ফ্ল্যাটে নেই?”
নাজনীন বেগম ভারী অবাক হোন ছেলের প্রশ্নে। ভ্রু কুঁচকে বিস্মিত কন্ঠে বলেন,
–” তোর বৌ আমাদের ফ্ল্যাটে কেনো থাকতে যাবে? সকাল থেকে তো তোরা দরজায় খুলিসনি। আমি আরও ভাবলাম কোনো সমস্যা হলো নাকি…”
নাওয়াফের মাথার রীতিমতো বাজ পড়ে৷ মা’কে পাশ কাটিয়ে পুরো ফ্ল্যাট তন্নতন্ন করে খোঁজে কিন্তু চিত্রার হদিস মিলে না। নিজের ফ্ল্যাটেও চেক করে কিন্তু ফলাফল শূন্য। চিত্রা কোথাও নেই। নাওয়াফের বুক কেঁপে উঠে শঙ্কায়। নাফিমের খবর শোনার পর যেমন অস্থিরতা অনুভব হয়েছিল ঠিক তেমনটাই অনুভূত হয়। তবে এবারের ব্যথাটা তীব্র। বুকের বাঁ পাশটা তীক্ষ্ণ ব্যথায় ছেয়ে যাচ্ছে।
উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ১
নাওয়াফ থেমে থাকে না। হাত ঘড়িতে সময় দেখে নেয় আগে। চিত্রার বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় বারো ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। ও যদি রংপুর যায় তাহলে পাঁচ ঘন্টা আগেই পৌঁছে যাওয়ার কথা। নাওয়াফ অপেক্ষা না করে সোজা আশিকুর শিকদারকে কল দেয়। তার তরফ থেকেও কিছু জানা যায় না৷ চিত্রা ঢাকায় নেই, রংপুরেও যায়নি। তাহলে গেল কোথায় মেয়েটা?
