Home উপসংহারে তুমি সিজন ২ উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ২

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ২

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ২
রুহানিয়া ইমরোজ

নিস্তব্ধ রজনী। চারপাশটা আঁধারে নিমজ্জিত। অনেকে বলে ঢাকা শহর নাকি কখনো ঘুমায় না। কথাটা অবশ্য সত্য। ঘড়ির কাঁটা রাত তিনটার ঘরে থাকলেও মাঝে মধ্যে ভেসে আসছে গাড়ির হর্ণের শব্দ। কখনও আবার দল বেঁধে কিংবা একেলা, মানুষজন কে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। বারান্দার রোলিংয়ে থুতনি ঠেকিয়ে উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে সেই দৃশ্য গুলোই দেখছে চিত্রলেখা।

আত্মিক মৃত্যু ঘটলেও শরীরী মৃত্যু হয়নি তার। দুর্বলতা এবং ব্যথা পাওয়ার দরুন জ্ঞান হারিয়েছিল কেবল। হুঁশ ফিরেছে আনুমানিক বারো ঘন্টা পর। তন্মধ্যে কোনো ঝুট-ঝামেলা ছাড়াই তাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন নিতু মেহবুব। গাঢ় ঘুমে আছন্ন চিত্রা কিচ্ছুটি টের পায়নি।ঘুম ভাঙার পর তো একদম হকচকিয়ে উঠেছিল বেচারি।
হুড়মুড়িয়ে বারান্দায় এসে বাইরের ব্যানারে উল্লেখিত ডিটেইলস দেখে নিশ্চিত হয়েছিল, তাকে ঢাকায় আনা হয়েছে। এটা যে নিতু মেহবুব ব্যতীত অন্য কারও কাজ নয় সেটাও সুস্পষ্ট ভাবে বুঝতে পেরেছিল চিত্রা। কারণ জ্ঞান হারানোর পূর্বে ওই একটা মানুষই তাকে বুকের মধ্যে আগলে রেখেছিল।
নির্মম পৃথিবীতে চিত্রা একদম একা। তার মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নাই। আপন কোনো আশ্রয় নাই। আাপতত সে পরনির্ভরশীল বিধায় হুঁশে আসার পর কোনরকম সিনক্রিয়েট করেনি। নিতু মেহবুব যদি তাকে বাড়ির গৃহ পরিচারিকা হিসেবে ব্যবহার করে তবে কিচ্ছুটি বলার থাকবে না তার৷ চুপচাপ মেনে নিতে হবে কারণ পেটের দায় মেটাতে হলে উপার্জন করাটা জরুরি। নিশ্চয়ই কেউ তাকে বসিয়ে খাওয়াবে না?
জ্ঞান ফেরার পর থেকেই বিষন্ন মনে এসব ভাবছিল সে৷ চক্ষুদ্বয়ে টলমল করছিল নোনাজল। কি অদ্ভুত নিয়তি তাই না? সকাল থেকে ঘটে যাওয়া অমানবিক নির্যাতন নিয়ে দুঃখ বিলাস করার আগে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হচ্ছে। বাস্তবতা এতটা নিষ্ঠুর না হলেও বোধহয় পারতো। আগামীতে ঠিক আর কী কী অপেক্ষা করছে তার জন্য সেসব ভেবে বুকের ব্যথাটা হু হু করে বাড়ছে চিত্রার৷ এমন সময় আকস্মিক পেছন থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠ বলে উঠে,

-“ ঘুম ভাঙলো তবে? কখন উঠলে? এখন কেমন বোধ করছ?
প্রশ্ন করা মানুষটা আর কেউ নয় বরং নিতু মেহবুব। হুট করে শব্দ করায় চমকে উঠে চিত্রা৷ তাকে চমকে উঠতে দেখে নিতু মেহবুব তার পিঠে হাত রেখে বলেন,
-“ রিল্যাক্স! আমি এসেছি..
কুণ্ঠায় জমে যায় চিত্রা। অপরিচিত নিতু মেহবুবের এত সহজ আচরণ মেনে নিতে কিঞ্চিৎ কষ্ট হয় তার। কোনো মতে ভয়ার্ত গলায় জবাব দেয়,
-“ এক্ টু আগে উঠেছি। ভালো লাগছে এখন..
পেশায় শিক্ষক হওয়ার দরুন, চিত্রার গুটিয়ে যাওয়াটা স্পষ্ট টের পেলেন নিতু মেহবুব। তবে তৎক্ষনাৎ তাকে শান্ত করতে গেলেন না। চিত্রার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শূন্যে দৃষ্টি রেখে পুনরায় শুধালেন,
-“ আমায় চেনো? শুনেছ কখনো আমার ব্যপারে? ”
চিত্রা নিশ্চুপ। সে আসলেই চেনে না তাকে। বিয়ের সময় শুনেছিল, ঢাকা থেকে নাকি তার মায়ের খুবই প্রিয়তম বান্ধবী এসেছে তাকে আশির্বাদ দেওয়ার জন্য। তখন অতোটা আমলে নেয়নি। আবার দেখা-সাক্ষাৎ করারও সুযোগ হয়ে উঠেনি। সহসাই সে না বোধক মাথা নাড়ল।
নিতু মেহবুব লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

-“ তোমার আম্মু আমার ক্লাসমেট ছিল। আমরা খুবই ভালো ফ্রেন্ড ছিলাম। আকস্মিক কিছু অঘটনের জন্য মনমালিন্য হয় আমাদের মাঝে এরপর থেকে সম্পূর্ণ রুপে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় । বহু বছর পর আচমকা তোমার মায়ের মৃত্যুর খবর শুনি। সেসময় আমি সন্তান সম্ভবা ছিলাম বলে যওয়া হয়নি। তারপর তোমারা গ্রামে চলে গেলে, এদিকে ঠিকানা জোগাড় করতে বহু বছর লেগে গেলো আমার। গিয়ে উপস্থিত হতেই ঘটে গেলো আরেক লংকা কান্ড।
অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত রুপে বললেও ঘটনাটা বিস্তর। বুদ্ধিমতি চিত্রা টের পেলেও সেটা নিয়ে প্রশ্ন করল না।।মায়ের এত ভালো ফ্রেন্ড হওয়ার পরেও তাকে কাজের লোক হিসেবে কিনে নিতে চাওয়ার কারণটাও অজানা। নিতু মেহবুবের অধিকতর সহমর্মিতাও ভীষণ ভাবে ভাবাচ্ছে তাকে। যেখানে তার নিজের জন্মদাতা পিতা তাকে এত ঘৃণা করে সেখানে এই অজানা মানুষটা, কেনো তাকে নিয়ে এতটা চিন্তিত?
মাথায় শ খানেক প্রশ্ন ঘুরপাক খেলেও জবাব শূন্য।নিতু মেহবুব কে চিনে না বলে সরাসরি প্রশ্ন করার সাহস পাচ্ছে না। তাছাড়াও নিয়তি মেনে নিয়েছে চিত্রা। ভাগ্য তাকে কঠোর ভাবে বিশ্বাস করিয়েছে, সে অপয়া। তাই কখনোই তার সাথে খুব একটা ভালো কিছু ঘটবে না, সেটা নিশ্চিত। বেঁচে থাকার নামে রোজ একটু একটু করে মরে যাওয়ায় তার নিয়তি।
চিত্রাকে গুম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিতু মেহবুব নিজেই বলে উঠলেন,

–“ তোমায় কাজের লোক হিসেবে কিনে নিতে চাওয়ার প্রস্তাবটা নিয়ে ভাবছ?
চিত্রা মুখে কিছু না বললেও খুব কৌতূহল নিয়ে তাকাল নিতু মেহবুব স্মিত হেসে জবাব দিলেন,
-“ আমি চাইলেও তোমাকে এডপ্ট করতে পারব না। উপন্যাসের মতো আমার কোনো ছেলেও নেই যে তার বউ বানিয়ে আনব। শেষপর্যন্ত তোমাকে ওই নরক থেকে বের করে আনার জন্য এই প্রস্তাবটাই যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল আমার৷ তুমি কি কষ্ট পেয়েছ তাতে?
ছোটো বেলা থেকে গালি খেয়ে খেয়ে সমস্ত কিছু গা সওয়া হয়ে গেছে চিত্রার৷ তাছাড়াও সে তো কাজেরই লোক। বাবার বাসায়ও সেই পরিচয়েই ছিলো। অন্য কে আর কি দোষ দিবে? তাই মাথা নাড়িয়ে চিত্রা বলে উঠল,

-“ ক্ষয়ে ক্ষয়ে সয়ে গেছে সব। ছোটোখাটো বিষয়ে মন খারাপ হয় না এখন।
নিতু মেহবুব স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন চিত্রার দিকে। ছোট্ট একটা মেয়ে অথচ তার কথাবার্তা পরিণতদের মতো। তিনি খুব একটা অবাক হলেন না। ওই বাড়ির যেরকম পরিবেশ দেখে এসেছেন তাতে এমন হওয়ারই ছিলো।
বয়সের তুলনায় বেশ ম্যাচিওর মেয়েটা। এটাই তারজন্য ভালো। এই কঠিন দুনিয়ায় টিকে থাকতে গেলে বাস্তব সম্মত জ্ঞান এবং এক্সপেরিয়েন্স থাকতে হয়। চিত্রা দুই দিক দিয়েই চ্যাম্পিয়ন।নিতু মেহবুব আর ভনিতা করতে গেলেন না। সরাসরি আসল কথা বলতে শুরু করলেন,

-“ আমি তোমার মায়ের কাছে চরম ঋণী। সে বিশাল এক কুরবানি দিয়েছিল আমার জন্য। ঠিক এজন্যই তোমায় সাহায্য করছি। বলতে পারো, ফেবার রিটার্ন করছি। বাড়ির কাজের লোক হিসেবে কিংবা তোমার প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর জন্য ঠাঁই দিইনি তোমায়।
চিত্রা উৎসুক হয়ে তাকাল৷ কি এমন করেছিল তার মা সেটা জানার জন্যই নিতু মেহবুবের মুখের দিকে তাকাল কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। কিছু সত্য অজানা থাকা ভালো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিতু মেহবুব বললেন,
-“ আমি গাইডলাইন দিব কিন্তু তোমায় পথ চলতে হবে। আপাতত আমি যে কলেজ শিক্ষকতা করছি সেখানেই এডমিট করিয়ে দিব তোমায়। তবে প্রত্যেকটা এক্সামে দুর্দান্ত রেজাল্ট চাই আমার। নাহলে আর পড়াশোনা করাব না৷ যেহেতু তুমি কলেজের স্টুডেন্ট তাই বাসা ভাড়াটা আমি বেয়ার করব। খাওয়া খরচ এবং পকেট মানি তোমায় পরিশ্রম করে আর্ন করতে হবে।
চিত্রা অস্ফুটস্বরে শুধাল,

-“ কীভাবে?
নিতু মেহবুব তৎক্ষনাৎ জবাব দিলেন,
-“ স্কিল কাজে লাগিয়ে।
চিত্রা ভাবতে পারলো না কিছু। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল নিতু মেহবুবের দিকে। তিনি তৎক্ষনাৎ কিছু একটা ভেবে শুধালেন,
-“ ক্লাস ওয়ান টু ফোর এর বাচ্চাদের পড়াতে পারবে?
ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনাতে খুব ভালো চিত্রা। সে কখনোই ক্লাসে সেকেন্ড হয়নি। এজন্যই পাশের বাসার কাকিমা তার ছেলেমেয়েকে প্রায়শই পড়তে পাঠাতেন। দীর্ঘ দুই বছর তাদের পড়িয়েছে চিত্রা। সেই আত্নবিশ্বাস থেকে নিতু মেহবুবের প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়াল। এতে করে তিনি খুশি হয়ে বললেন,
-“ গ্রেট। আমি তোমাকে একটা ব্যাচ ম্যানেজ করে দিব। বাকিটা তুমি দেখে নিয়ো।
চিত্রা ধীর গলায় বলল,
-“ আচ্ছা। ”
এ পর্যায়ে চিত্রার দিকে তাকালেন নিতু মেহবুব। চিত্রাও তার মুখপানে দৃষ্টি রাখল। কোনো সংকোচ ছাড়াই চিত্রা কে বুকে জড়িয়ে নিয়ে নিতু মেহবুব বললেন,

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ১

-“ এতকাল যা হয়েছে সেটাকে অতীত ভেবে ভুলে যাও৷ মনে করো স্বপ্নের মধ্যে ছিলে। পিছুটান ভুলে জীবনকে নতুন করে সাজাও। সচারাচর নরক থেকে বেরোনোর সুযোগ কেউ পায় না। তুমি পেয়ে হারিয়ো না। কেমন?
ছোট্ট একটা কথা, সামান্য আশ্রয় ; চিত্রাকে নিমিষেই আপন করে তুলল৷ নিতু মেহবুব কে না চিনলেও তার জন্য একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্মালো। মেয়েটা আবেগপ্রবণ হয়ে নিঃশব্দে কেঁদে ফেললো। বহু বছর তাকে কেউ আগলে নেয়নি বুকে। মাথায় বুলিয়ে দেয়নি স্নেহের হাত তাইতো এইটুকুন আহ্লাদ পেয়ে নিতু মেহবুব কে বিশ্বাস করার মতো ভুলটা করল।

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৩