Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫
মেহজাবিন নাদিয়া

সারিম মৃধার জুতো জোড়ার ভারী এবং চাবুকের মতো শব্দটা যখন করিডোর পার হয়ে ধীরে ধীরে দূর-দূরান্তে মিলিয়ে গেল, ৩০৪ নম্বর হলরুমে তখনও যেন এক অদ্ভুত, থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। বাতাসের সেই জমাটবদ্ধ ভারী ভাবটা কাটতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। হলের ইনভিজিলেটর শিক্ষকরা এতক্ষণ কাঠের পুতুলের মতো আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন; এবার তারা বুক ফুঁড়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেললেন। সারিমের সেই তীব্র ব্যক্তিত্ব আর ক্ষমতার দাপট হলের সবাইকে আক্ষরিক অর্থেই কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে।

শিক্ষকদের একজন দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে সারিমের নির্দেশ মোতাবেক অরির পাশের বেঞ্চে বসা সেই মেয়েটির খাতা এবং নকলের চিরকুটটা তুলে নিলেন। মেয়েটি তখন অপরাধবোধ আর ভয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছে। এই মেয়েটিই একটু আগে অরিকে বিপদে ফেলার জন্য নিজের চিরকুটটা অরির খাতার নিচে গুঁজে দিয়েছিল লিখতে দেওয়া নাম করে। আজ নিজের পাপের ফল সে হাতেনাতে পেল। এজন্যই হয়তো বলে-পাপীর চেয়েও যারা পাপ করতে প্ররোচিত করে, তাদেরই বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। একজন শিক্ষক এসে মেয়েটিকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে খাতা কেড়ে নিলেন এবং হল থেকে সোজা বহিষ্কার করে দিলেন। মেয়েটি যখন কাঁদতে কাঁদতে হলরুম থেকে বের হয়ে আসছিল, অরির মনে তখন তার জন্য করূণা আর খারাপ লাগা কাজ করতে থাকে।

তবে ওর হাতে কিছুই করার ছিল না; নিয়তির বিচার এড়ানো যায় না।
এদিকে হলের অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা মনে মনে এক ধরণের স্বস্তি পাচ্ছিল বটে, কিন্তু সবার মনের ভেতরেই একটা মস্ত বড় খটকা আর বিস্ময় তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল। সবাই আড়চোখে তাকাচ্ছিল মাঝখানের সারির সেই মেয়েটির দিকে। অর্থাৎ অরির দিকে। পুরো হলের পরীক্ষার্থীদের মনে একটাই প্রশ্ন-মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী কেন এই মেয়েটার খাতার নিচে স্পষ্ট নকলের কাগজ দেখার পরও কিচ্ছু বললেন না? শুধু কেড়েই নিলেন না, বরং অত্যন্ত যত্ন সহকারে খাতাটা আবার হার্ডবোর্ডের ক্লিপে আটকে দিয়ে গেলেন! এমনকি যাওয়ার আগে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে গেলেন, এই মেয়েটির খাতা একদম পরিষ্কার, ও নিজের মেধায় লিখছে।ওকে যেন কেউ ডিস্টার্ব না করে। এই অলৌকিক ক্ষমার রহস্য কী? এই একটা প্রশ্নই হলের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
বেঞ্চে বসে থাকা অরির নিজের অবস্থাও তখন স্বাভাবিক ছিল না। ও পাথরের মূর্তির মতো মাথা নিচু করে বসে ছিল। ওর বুকের ভেতরটা তখন কামারের দোকানের নেহাইয়ের মতো ধড়ফড় করে কাঁপছিল। অরি নিজের ফর্সা দুটো হাত দিয়ে শক্ত করে কাঠের বেঞ্চের কোণাটা ধরে রেখেছিল। চোখের কোণায় জমে থাকা ভয়ের নোনা জলটা তখনও শুকায়নি। মনে মনে ভাবছিল-ও কি আসলেই বেঁচে গেল? নাকি এটা কোনো অলীক স্বপ্ন?

কিছুটা সময় পার হওয়ার পর অরি খুব ধীরে ধীরে ওর মাথাটা ওপরে তুলল। চোখের ওপর চশমাটা আলতো করে ঠিক করে নিয়ে ও নিজের খাতার দিকে তাকাল। খাতাটা ঠিক যেভাবে সেই ক্ষমতাধর পুরুষটি গুছিয়ে রেখে গেছেন, ঠিক সেভাবেই আছে। অরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর ফর্সা গাল দুটোতে ভয়ের সেই লালচে ভাবটা কমে এখন এক অদ্ভুত লজ্জার রঙ ধারণ করেছে। মনে মনে ভাবল,
“লোকটা আমার সঙ্গে এমন কেন করল? সকালেই তো আমাকে ডিভোর্স দিলেন। আচ্ছা, আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার পর তো লোকটার ঘাড় থেকে একটা উটকো ঝামেলা নেমে গেছে। এখন উনি পুরোপুরি দায়মুক্ত। সেজন্যই বোধহয় আমার ওপর এই করূণা দেখিয়েছেন।”
তবে যাই হোক না কেন, অরির জন্য তা জীবনের এক চরম শিক্ষা হয়ে রইল। অরি এটাকে নিজের জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ ভেবে নিল। ওর বাবা আরিশান মৃধার সম্মান, ওর নিজের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন—সব কিছু এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশে যেত নয়তো।
অরি বেশিক্ষণ এই চিন্তায় মগ্ন থাকার সুযোগ পেল না। পরীক্ষার আর মাত্র অল্প কিছু সময় বাকি। ও নিজেকে শক্ত করল। নিজের মনকে শান্ত করে, রিডিং গ্লাসটা নাকের ওপর ভালো করে চেপে ধরে আবার কলম হাতে তুলে নিল। এবার ও আর কারও দিকে তাকাল না, কোনো চিরকুটের সাহায্য নিল না। নিজের মগজে এতদিনের জমানো সমস্ত পড়া, সমস্ত মেধা ঢেলে দিয়ে ও দ্রুত গতিতে খাতার বাকি উত্তরগুলো বানিয়ে বানিয়ে লিখতে শুরু করল। পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বাজার আগেই ও অত্যন্ত সুন্দরভাবে ওর বাকি পরীক্ষাটা শেষ করল।

অরি নিজের খাতাটা ইনভিজিলেটর স্যারের হাতে জমা দিয়ে একটা পরম তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। স্যারও খাতাটা নেওয়ার সময় অরির দিকে কেমন একটা সমীহ আর সম্মানের দৃষ্টিতে তাকালেন। সারিম মৃধার সেই কড়া নির্দেশের পর কলেজের কোনো স্টাফের সাধ্য ছিল না অরির দিকে বাঁকা চোখে তাকায়।
অরি হলরুম থেকে বের হয়ে করিডোরে আসতেই দেখল জেবা ওর জন্য অপেক্ষা করছে। জেবা অন্য একটা রুমে পরীক্ষা দিচ্ছিল, তাই ও ৩০৪ নম্বর রুমের এই ঐতিহাসিক নাটকের কিছুই জানত না। অরিকে দেখেই জেবা চিৎকার করে ছুটে এল।

“কী রে অরি! কেমন দিলি পরীক্ষা? শুনলাম আজ তোর ঐ শিক্ষামন্ত্রী ভাই পরীক্ষা হল পরিদর্শন করতে এসেছে। আমাদের হলেও এসেছিল। আমার দুই বেঞ্চ পিছনে বসা একটা মেয়েকে উনি নকল করতে ধরে দেখে ফেলেন। মেয়েটাকে ডাইরেক্ট বহিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। হেব্বি কড়া রে তোর ভাই!”
জেবা একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছিল। অরি শুধু মৃদু হাসল। ও জেবাকে হলের ভেতরের সেই রোমাঞ্চকর ঘটনার কিছুই বলল না। নয়তো দেখা যাবে এই মেয়ে ওকে নকল করার দায়ে সারাদিন খোঁচাতে থাকবে। এমনিতেই জেবার ননস্টপ বকবকানি শুনতে শুনতে অরির দিন শুরু হয়, রাত শেষ হয়। পরীক্ষার বাহানায় জেবা এই পুরো একমাস মৃধা নিবাসেই থাকবে। জেবার মা ছোটবেলায় রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন। সেই থেকে জেবা তার বাবার কাছে একা হাতে মানুষ হয়েছে। সোলেমান শেখ নিজের বিজনেসের কাজে প্রায় সময় খুব ব্যস্ত থাকেন। উনি জেবাকে ঠিকঠাক মতো সময় দিতে পারেন না। সেজন্য উনি জেবাকে আরিশান মৃধার বাড়িতেই অরির সঙ্গে রেখে আসেন..মেয়ের নিরাপত্তা আর একাকিত্ব দূর করার চিন্তা ভেবে।
জেবাকে নিজের সঙ্গে পেয়ে অরি যেমন খুশি হয়, ঠিক তেমনি জেবাও খুশিতে ফেটে পড়ে প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে একসাথে থাকতে পারায়।

ওরা দুজনে গল্প করতে করতে কলেজের মেইন গেট পার হয়ে বাইরের রাস্তার দিকে এগিয়ে আসে। পরীক্ষা ভালো হওয়াতে জেবা ভীষণ ফুরফুরে মেজাজে ছিল। ও অরিকে বলল,
“চল দোস্ত, আজ পরীক্ষা উপলক্ষে তোকে ফুচকা খাওয়াব।”
“ঠিক আছে, চল!” অরিও জেবার কথায় রাজি হলো।
ওরা রাস্তার ধারের একটা ফুচকার দোকানের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই একটা কর্কশ মোটরবাইকের হর্নের আওয়াজে ওদের পথ আটকে গেল।
একটা ছ্যাঁচড়া ধাঁচের মোটরবাইক নিয়ে ওদের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল তিনজন ছেলে। বাইকের চালকের আসনে যে বসে ছিল, তার পরনে চকচকে নোংরা ডিজাইনের শার্ট, গলায় মোটা চেইন আর চুলে অদ্ভুত এক কালার করা। ছেলেটার নাম রাফান। তবে এই এলাকায় সবাই তাকে ‘রাফাইন্না’ বলেই ডাকে। রাফান হলো এই এলাকার এক মূর্তিমান আতঙ্ক।

সে বর্তমান বিরোধী দলের প্রভাবশালী নেতা রাজন খন্দকারের দলের একজন ছোট খাটো পাতি নেতা বলা চলে। রাজন খন্দকারের ক্ষমতার দাপটে রাফান এলাকায় চরম বিটলামি, মারামারি, চাঁদাবাজি আর দলের পাওয়ার দেখিয়ে বেড়ায়। সাধারণ মানুষ তাকে দেখে ভয়ে পথ ছেড়ে দেয়।
রাফান বেশ কিছুদিন ধরেই অরিকে পিছু করছে। কলেজের সামনে, রাস্তার মোড়ে অরিকে দেখলেই সে নানারকম কুপ্রস্তাব দেয় এবং প্রেম করার জন্য জোর করে। তবে রাফান বিন্দুমাত্র জানত না যে অরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধার ছেলের বউ,
কিংবা সে দেশের শিক্ষামন্ত্রী সারিম মৃধার আইনত স্ত্রী! অরি সবসময় খুব সাধারণভাবে চলে, সাধারণ মেয়েদের মতো কলেজে যাতায়াত করে। আর আরিশান মৃধাও মেয়ের সুরক্ষার জন্য সবসময় ওনার পার্সোনাল বডিগার্ডদের সাধারণ পোশাকে অরির আশেপাশে লুকিয়ে রাখতেন, যাতে অরির সাধারণ জীবনে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। রাফান অরির সৌন্দর্য দেখার পর থেকে ওর জন্য প্রায় পাগল হয়ে গেছে। প্রায় সময় অরিকে দেখামাত্রই ওর সঙ্গে প্রেমের জন্য কুপ্রস্তাব পাঠাত। তবে অরি সেসবে পাত্তাই দিত না। বরাবরই অরি পড়াশোনা আর স্বপ্ন পূরণের পিছে ছুটেছে; এসব প্রেম-ভালোবাসা ওর জন্য নয়, তা অরি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে।

আজকে অরিকে দেখে রাফানের ভাবভঙ্গি আরও বেশি নোংরা হয়ে উঠল। সে বাইক থেকে নেমে অরির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটোতে ছিল এক ধরণের লম্পট চাউনি। সে নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে বলল,
“উফফফ সুন্দরী! পরীক্ষা কেমন হলো? এত ভাব মারো কেন বলো তো? কতদিন ধরে পিছু করছি, একটা বার তো ভালো করে কথাও বলো না। আজকে তো পরীক্ষা শেষ, চলো আমার বাইকে ওঠো। একটু ঘুরে আসি। রাফান ভাইয়ের সঙ্গে প্রেম করলে এই এলাকায় রানী হয়ে থাকবে, কেউ তোমার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না।”
রাফানের এই নোংরা কথাবার্তা আর সস্তা ভাব দেখে জেবা ভয়ে অরির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। রাফানকে দেখে অরির ভেতরের রাগ যেন চড়চড় করে মাথায় উঠছিল। একে তো সকাল থেকে মনের ওপর দিয়ে এত বড় ঝড় বয়ে গেছে, তার ওপর এই বখাটে ছেলের এরকম নোংরা আচরণ দিন দিন ওর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে।
অরি রাফানের দিকে তীব্র ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“রাস্তা ছাড়েন বলছি। নিজের সীমার মধ্যে থাকেন। ভদ্রভাবে বলছি, আমাদের পথ থেকে সরেন।”
রাফান অরির এই ধমক শুনে হো হো করে হেসে উঠল। ওর পেছনের দুই চামচাও দাঁত বের করে হাসতে লাগল। রাফান আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে অরির জামার হাতার কোণাটা ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে বলল,
“আরে বাহ্! সুন্দরীর তো রাগও অনেক! এই রাগটাই তো আমার ভালো লাগে…”
রাফানের হাতটা অরির জামা স্পর্শ করার আগেই, ওকে পুরো স্তব্ধ করে দিয়ে একটা চটাশ করে শব্দ হলো! অরি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে রাফানের গালে এক মস্ত বড় থাপ্পড় কষিয়ে দিল! থাপ্পড়ের চোটে রাফানের মুখটা একদিকে ঘুরে গেল এবং ওর ঠোঁটের কোণ ফেটে সামান্য রক্ত বের হয়ে এলো।
রাফানের চামচারা এবং আশেপাশের সাধারণ মানুষজন এই দৃশ্য দেখে চোখ বড় বড় করে ফেলল। এই এলাকায় রাফাইন্নাকে থাপ্পড় মারার দুঃসাহস আজ পর্যন্ত কেউ দেখায়নি! রাফান নিজের গালে হাত দিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোখের মনিতে এখন অপমান আর তীব্র হিংস্রতা ফুটে উঠল। সে রেগে চিৎকার করে বলল,

“কী! তোর এত বড় সাহস! তুই রাফান তাহমিদকে থাপ্পড় মারলি? আজ তোকে আমি…”
রাফান অরির দিকে হাত তুলতে যাবে, ঠিক তখনই যেন আকাশ থেকে বজ্রপাত হলো। রাস্তার চারপাশ থেকে সাধারণ পোশাকে থাকা চার-পাঁচজন বিশাল দেহের সুঠাম পুরুষ চিতাবাঘের মতো ছুটে এলো। এরা আর কেউ নয়, আরিশান মৃধার স্পেশাল বডিগার্ড ফোর্স, যারা এতক্ষণ অরির সুরক্ষায় আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল।
গার্ডদের লিডার এসে এক ঝটকায় রাফানের তোলা হাতটা ধরে ফেলল এবং মট করে একটা শব্দ করে ওর হাতটা ঘুরিয়ে দিল। রাফান ব্যথায় চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল। বাকি গার্ডরা রাফানের দুই চামচাকে ধরে লাথি আর কিল-ঘুষি মারতে মারতে রাস্তার ধুলোয় মিশিয়ে দিল। গার্ডদের মারের তীব্রতা দেখে রাফানের দলের লোকজনের অহংকার এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে গেল। তারা মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল।
গার্ডদের লিডার অরির সামনে এসে অত্যন্ত বিনীতভাবে মাথা নিচু করে বলল,

“ম্যাম, আপনি ঠিক আছেন তো? আমাদের আসতে কয়েক সেকেন্ড দেরি হওয়ার জন্য দুঃখিত।”
অরি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আমি ঠিক আছি। এই মাস্তানগুলোকে এখনই লোকাল পুলিশের হাতে তুলে দিন। এদের যেন উপযুক্ত শাস্তি হয়।”
গার্ডরা তৎক্ষণাৎ লোকাল থানার ওসিকে ফোন করল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পার্সোনাল ফোর্সের ফোন পেয়ে ওসি সাহেব নিজের চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিশের দুটি ভ্যান সাইরেন বাজাতে বাজাতে এসে হাজির হলো। পুলিশ এসে রাফান এবং ওর চামচাদের কুকুরের মতো টেনেহিঁচড়ে ভ্যানে তুলল।
রাফান তখনও ভ্যানের ভেতর থেকে অরির দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে চিৎকার করে হুমকি দিচ্ছিল,
“তোর এত বড় সাহস মা*গি! তুই জানিস না তুই কার গায়ে হাত দিয়েছিস! আমাদের লিডার হলো রাজন খন্দকারের ছেলে আফিম খন্দকার! ও এই শহরের রাজা সে! তোকে আর তোর এই গার্ডদের ও জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে! দেখে নিস তুই!”

পুলিশের ভ্যানটি রাফানদের নিয়ে থানার দিকে রওনা হয়ে গেল। অরি জেবাকে শান্ত করল, কারণ জেবা তখনও ভয়ে কাঁপছিল। অরি জেবাকে নিয়ে গার্ডদের গাড়িতে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
এদিকে, রাফানদের থানায় নিয়ে লকআপে পুরে রাখার খবরটা খুব দ্রুত খন্দকারের দলের প্রধান কার্যালয়ে পৌঁছে গেল। রাজন খন্দকারের একমাত্র ছেলে আফিম খন্দকার, তখন ওর বিলাসবহুল এয়ারকন্ডিশনড রুমে বন্ধুদের নিয়ে মদ্যপান আর আড্ডায় মত্ত ছিল। আফিম হলো এই শহরের এক কুখ্যাত ও নোংরা চরিত্রের ছেলে। বাবার অঢেল টাকা আর রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সে শহরে যা ইচ্ছা তাই করে বেড়ায়। বিশেষ করে মেয়েদের প্রতি ওর এক চরম লোভ ও লালসা রয়েছে। মেয়েদের শারীরিক ভোগ করাটাই ওর প্রধান নেশা। এই পর্যন্ত ওর নামে প্রায় পঁচিশটার মতো ধর্ষণের ফাইল কেস থানায় জমা পড়েছে, কিন্তু প্রতিবারই ওর বাবা রাজন খন্দকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে আর ক্ষমতার জোর দেখিয়ে ওকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। আইনের হাত ওর ওপর কখনোই পৌঁছাতে পারেনি।
রাফানের এক চামচা কোনোমতে আফিমের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট জারিফকে ফোন করে জানাল,

“ভাই, রাফান ভাইকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। কলেজের সামনে একটা মেয়ের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, আমি ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখছি, কিছু করা যায় কিনা।” জারিফ এরপর ফোনটা কেটে, আফিমকে এসে ব্যাপারটা জানায়।
আফিম যখনই এই খবর শুনল, ও চরম বিরক্ত হলো। ও নিজের মদের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল,
“কী! রাফাইন্নাকে পুলিশ লকআপে ভরার সাহস পায় কোত্থেকে? ও কার দয়ায় চলে তা কি ওসি ভুলে গেছে?”
আফিম তৎক্ষণাৎ ওর বিশাল গাড়ির বহর আর একদল সন্ত্রাসী বাহীনি নিয়ে সোজা লোকাল থানায় গিয়ে হাজির হলো। থানায় আফিম কে ঢুকতে দেখেই ওসির কপাল দিয়ে ঘাম ছুটতে লাগল। আফিম ওসির টেবিলের ওপর ধপ করে হাত মেরে বলল,

“ওসি সাহেব, রাফানকে এখনই ছাড়ুন। কার ইশারায় ওকে ধরেছেন?”
ওসি সাহেব ভয়ে তোতলামি করতে করতে বললেন,
“আফিম ভাই, আমি তো কিছু করতে পারব না। ওপরের কড়া নির্দেশ আছে। ওনাকে সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পার্সোনাল গার্ডরা ধরে আমাদের হাতে দিয়েছে। মামলা খুব কড়া।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম শুনে আফিম মনে মনে একটু দমে গেলেও বাইরে ওর অহংকার কমল না। সে বাবার নাম ব্যবহার করে এবং ওসির পকেটে এক মস্ত বড় টাকার বান্ডিল গুঁজে দিয়ে জোরপূর্বক রাফান এবং ওর চামচাদের লকআপ থেকে ছাড়িয়ে নিজের গাড়িতে তুলল।
থানা থেকে বের হয়ে আফিম ওর জিপ গাড়ির পেছনের সিটে বসল। রাফানের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছিল রে রাফাইন্না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লোক তোদের ওভাবে মারল কেন? তুই কি আরিশান মৃধার কোনো লোকের ওপর হাত দিয়েছিলি?”
রাফান তখনও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল আর ওর গালে অরির থাপ্পড়ের দাগটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে অত্যন্ত ক্ষোভ আর রাগ নিয়ে বলল,
“না ভাই! আরিশান মৃধার কোনো লোকের ওপর না। কলেজের সামনে একটা মেয়ের সঙ্গে একটু জাস্ট কথা বলতে গিয়েছিলাম। মেয়েটা দেখতে ভাই মারাত্মক সুন্দর, এত সুন্দর মেয়ে আমি আগে কখনো দেখিনি, যেন কোনো মানুষ নয়—আস্ত একটা হুরপরি! কিন্তু শালির যা তেজ! ও সবার সামনে আমাকে একটা থাপ্পড় মেরে দিল! মেয়েটা থাপ্পড় মারার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশ থেকে ওই গার্ডগুলো এসে আমাদের কুত্তা-মারা দিল। আমরা তো বুঝতেই পারছি না, ওই সামান্য মেয়েটার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গার্ডরা কেন আসবে?”
রাফানের কথা শুনে আফিমের চোখের মনিতে এক অদ্ভুত কুৎসিত মনোভাব ফুটে উঠল। একটা সাধারণ মেয়ে, তার আবার এত তেজ কিসে? সে আফিম খন্দকারের ডান হাত রাফানকে থাপ্পড় মারে! আফিম মেয়েটার মারাত্মক সৌন্দর্যের বর্ণনা শোনার পর, ওর ভেতরের সেই নোংরা রাক্ষসটা এক মুহূর্তে জেগে উঠল। ওর মাথায় এক চরম কু-চিন্তা এবং তীব্র লালসা ভর করল। ও নিজের ঠোঁটটা জিব দিয়ে চাটতে চাটতে বলতে লাগল,

“একটা সাধারণ মেয়ের এত বড় সাহস! এর অহংকার আমি আফিম খন্দকার সামান্য একহাতের তুড়ি মেরেই ভেঙে ফেলব। আরিশান মৃধার গার্ডরা হয়তো এমনিতেই ওই এলাকায় ডিউটিতে ছিল। এই মেয়েটাকে আমার চাই-ই চাই। এর শরীরের সব তেজ আমি এক রাতে ধুলোয় মিশিয়ে দেব।”
আফিম রাফানের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নোংরা একটা হাসি দিয়ে বলল,
“মেয়েটার নাম আর ঠিকানা বের কর রাফান। ওর এই তেজী রূপটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। পঁচিশটা ফাইল তো অলরেডি ক্লোজড, ছাব্বিশ নম্বর ফাইলটা এই মেয়ের নামেই খোলা যাক।”
রাফান আফিমের কথা শুনে বেশ আনন্দিত হলো। ওর ভিতরে এতক্ষণ যাবত মেয়েটার জন্য পুষে থাকা রাগ, পৈশাচিকতায় রূপ নিল। আফিম আর বেশিক্ষণ থাকল না সেখানে, নিজের কালো জিপটা টেনে নিয়ে গেল বাড়ির উদ্দেশ্যে।

খন্দকার ভিলার বিশাল ড্রয়িংরুম। সোফায় হেলান দিয়ে বসে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন রাজন খন্দকার। পাশে রাখা টেবিল থেকে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপটা হাতে নিলেন। এটা ওনার নিত্যদিনের স্বভাব। সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দিন শুরু করলেও, বিষণ্ণ বিকেলে এক কাপ কড়া গরম কফি ওনার চাই-ই চাই।
ছিমছাম গড়নের হ্যাংলা-পাতলা একহারা গড়ন তাঁর। মাথার চুলে অনেক আগেই রূপোলি পাক ধরেছে। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা, যা ওনার অবয়বে এখনো একটা মার্জিত নেতার ভাব ধরে রেখেছে। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন এক তুখোড় দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। বাবা-মায়ের অমতে, পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। সময়ের সাথে সাথে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাড়াও মিলেছিল উপচে পড়া। পরপর দুবার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
তবে রাজনীতির পরিচ্ছন্ন আকাশটা মেঘলা হতে শুরু করল যেদিন থেকে আরিশান মৃধা ওনার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়ালেন। শিক্ষা, যোগ্যতা, সততা আর দায়িত্ব পালনের অনন্য দক্ষতায় আরিশান মৃধা সবদিক থেকে রাজন খন্দকারের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। ফলে জনতা আর রাজন খন্দকারকে নয়, আরিশান মৃধাকেই বেছে নিল।

এই পরাজয় নিয়ে রাজন খন্দকারের মনে কোনো ক্ষোভ বা আফসোস ছিল না। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন—রাজনীতি জোর খাটানোর জায়গা নয়, ভালোবাসা আর বিশ্বাস দিয়ে মানুষের মন জয় করার জায়গা। জনগণ যার কাছ থেকে ভরসা আর নিরাপত্তা পাবে, তার দিকেই ছুটবে। আরিশান মৃধাকে তিনি মনে মনে এই দায়িত্বের জন্য যোগ্য ব্যক্তি বলেই গণ্য করেন। রাজনীতি তিনি একেবারে ছেড়ে দেননি, প্রতিবারই নির্বাচনে দাঁড়ান, কিন্তু বিজয়ের মালাটা প্রতিবারই আরিশান মৃধার গলায় ওঠে। এটা ভেবে মাঝেমধ্যে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ওনার বুক চিরে—জনগণের আস্থা আজ ওনার ওপর কতটা কমে গেছে! অবশ্য এলাকার ছোট-বড় সবাই এখনো ওনাকে ব্যক্তি হিসেবে শ্রদ্ধা করে, সম্মান দেয়। এইটুকুই যা ওনার প্রাপ্তি। মানুষের সেই ভালোবাসাটুকু পেলে ভেতরের দীর্ঘশ্বাসটা ক্ষণিকের জন্য হলেও বাতাসে মিলিয়ে যায়।

কিন্তু রাজনীতির ময়দানে শান্ত থাকলেও, নিজের ঘরোয়া জীবনে রাজন খন্দকারের বিন্দুমাত্র শান্তি নেই। নিজের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ওনার যন্ত্রণার শেষ নেই। ছেলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে, মারপিট করে পুরো এলাকায় সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করেছে। জড়িয়ে পড়েছে শহরের সমস্ত নোংরা আর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।
আজ এই পড়ন্ত বয়সে এসে রাজন খন্দকার নিজের ভুলটা বুঝতে পারেন। মা-মরা ছেলেটাকে ছোটবেলা থেকেই বড্ড অবহেলা করেছিলেন তিনি। রাজনীতি, ক্ষমতা আর বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসার আড়ালে তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে ওনার একটা সন্তান আছে। কাজের লোকেদের কাছে অবহেলা আর অনাদরে বড় হয়েছে আফিম। আর নিজের অপরাধবোধ ঢাকতে রাজন খন্দকারও ছেলের যেকোনো আবদার, যেকোনো চাওয়াকে চোখ বন্ধ করে পূরণ করেছেন। কিন্তু কে জানত, অন্ধ ভালোবাসার এই আশকারা পেয়ে ছেলেটা দিনে দিনে এতটা বেয়াদব, চরিত্রহীন আর কুখ্যাত এক বখাটেতে পরিণত হবে!
থানার ক্রিমিনাল লিস্টে নিজের একমাত্র ছেলের নাম জ্বলজ্বল করতে দেখলে আজ ওনার বুকটা ভীষণ ভারী হয়ে আসে। অপমানে, লজ্জায় কুঁকড়ে যান তিনি।

নিজের জীবনের এই ব্যর্থতার খতিয়ান যখন ওনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, ঠিক তখনই ওনার ভাবনায় ছেদ পড়ল। ড্রয়িংরুমের সুবাস হঠাৎ বদলে গেল কড়া পারফিউমের তীব্র গন্ধে। ওনার পাশে এসে বসল এক অতীব আকর্ষক, উগ্র সুন্দরী রমণী। পরনে তার ফিনফিনে পাতলা সিল্কের জর্জেট শাড়ি, যা নারীর শরীরের অনাবৃত অংশগুলোকে অত্যন্ত খোলামেলা আর দৃশ্যমান করে তুলেছে।
রমণীটি সোফায় বসেই অত্যন্ত চপলতায় রাজন খন্দকারের কাঁধের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তারপর দুই হাত দিয়ে ওনার গলা জড়িয়ে ধরে মাদকতাভরা গলায় আদুরে সুরে বলে উঠল,
“বেবি! এত গম্ভীর হয়ে কী ভাবা হচ্ছে? খবরের কাগজে দেশ-দুনিয়ার খবর তো রোজই পড়ো, আজকে কি নিজের এই রূপসী বউটার দিকে একটু তাকানো যাবে না?”
রাজন খন্দকার কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে একটা মৃদু হাসলেন। ওনার এই বিষণ্ণ মনটাকে পলকে চাঙ্গা করে তোলার জাদুকরী ক্ষমতা কেবল এই একটি মানুষেরই আছে। মেয়েটির নাম অনুপমা। রাজন খন্দকারের দ্বিতীয় স্ত্রী। বয়স মাত্র ছাব্বিশের কোঠায়। রাজন খন্দকারের চেয়ে বয়সে অর্ধেকেরও ছোট অনুপমা দেখতে যেমন মোহনীয়, তেমনি চতুর।

রাজন খন্দকার নিজেও খুব ভালো করেই জানেন, অনুপমা ওনাকে বা ওনার এই বুড়ো বয়সকে ভালোবেসে এই ঘরে আসেনি; এসেছে খন্দকারদের অঢেল ঐশ্বর্য, বিলাসবহুল জীবন আর ওনার টাকার লোভে। কিন্তু তাও, প্রৌঢ়ত্বের এই নিঃসঙ্গ জীবনে অনুপমার এই কৃত্রিম ভালোবাসার ছোঁয়াটুকুই রাজন খন্দকারের কাছে অমৃতের মতো মনে হয়। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর যে শূন্যতা ওনাকে গ্রাস করেছিল, অনুপমা এসে তা পূর্ণ করেছে—তা সে টাকার বিনিময়েই হোক কিংবা মোহের বশে। রাজন খন্দকার ওকে বড্ড ভালোবাসেন, ওনার সমস্ত অন্ধতা আর দুর্বলতা এখন এই ছাব্বিশ বছরের তরুণীটিকে ঘিরেই।
অনুপমার গলার হালকা আঁচলটা ওনার কাঁধে স্পর্শ করতেই রাজন খন্দকার ওনার একটা হাত অনুপমার চিবুকে রাখলেন। ওনার ক্লান্ত চোখে তখন এক অদ্ভুত প্রশ্রয়ের ছায়া। তিনি নরম গলায় বললেন,
“ভাবছিলাম অনু, আমার জীবনের খতিয়ানটা নিয়ে ভাবছিলাম। রাজনীতিতে হারলাম, সমাজসেবায় হারলাম, আর সবচেয়ে বড় হারটা হারলাম আমার নিজের ছেলের কাছে। আফিম দিন দিন হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।”
অনুপমা ওনার কথায় কান না দিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে একটু আদুরে অভিনয় করল। রাজন খন্দকারের গলার বাঁধন আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওনার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল,

“ধুর! রাখো তো তোমার ওই গুণধর ছেলের কথা! ও বড় হয়েছে, নিজের ভালো-মন্দ বোঝে। তুমি শুধু শুধু নিজের শরীরটা খারাপ করছ। তার চেয়ে বলো, আজকে আমাকে কেমন লাগছে?”
রাজন খন্দকার দীর্ঘশ্বাস চেপে অনুপমার চোখের দিকে তাকালেন। পাতলা জর্জেট শাড়ির আড়ালে ওর শরীরের উন্মুক্ত সৌন্দর্য আর চটুল চাউনি যেকোনো পুরুষকে ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট। তিনি অনুপমার কোমরে হাত রেখে একটু টেনে নিজের আরও কাছে এনে বললেন,
“তোমাকে তো সবসময়ই পরীর মতো লাগে অনু।”

অনুপমা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে ড্রয়িংরুমের গুমোট ভাবটা যেন কেটে গেল।কিন্তু ড্রয়িংরুমের সেই চটুল পরিবেশটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। অনুপমা যখন রাজন খন্দকারের কাঁধে মাথা রেখে ওনার কফির কাপটা সরিয়ে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই খন্দকার ভিলার সদর দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। বাইরের তপ্ত দুপুরের চেয়েও উত্তপ্ত এক আবহাওয়া সঙ্গে নিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল আফিম। ভেতরে ঢুকেই সোফায় নিজের বাবার পাশে অনুপমাকে ওভাবে ঘেঁষে বসে থাকতে দেখে আফিমের ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ও নিজের হাতের চাবির রিংটা খটখট শব্দে ঘোরাতে ঘোরাতে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।

ছেলের এই উদ্ধত ভঙ্গি আর অবয়ব দেখামাত্রই রাজন খন্দকারের ভেতরের শান্ত মানুষটা মুহূর্তে কঠোর হয়ে উঠল। তিনি অনুপমাকে নিজের কাছ থেকে সামান্য সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। ওনার কণ্ঠস্বরে এতক্ষণের নরম ভাবটা কেটে গিয়ে এক গম্ভীর ও ক্ষুব্ধ স্বর প্রকাশ পেল।
“থানায় গিয়ে আবার কী কীর্তি করে এলি আফিম? তোকে আমি কতবার বারণ করেছি এই সমস্ত নোংরামি বন্ধ করতে?” রাজন খন্দকার সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বললেন। ওনার সমস্ত শরীর রাগে কাঁপছিল।
আফিম নিজের পকেটে হাত গুঁজে বাবার দিকে তাকিয়ে একটা সস্তা ও তাচ্ছিল্যভরা হাসি দিল। ও অত্যন্ত অবহেলার সুরে বলল,

“বাবা তুমিও না! ঘরে পা দিতে না দিতেই শুরু করে দিলে? তোমার ওই লেকচারগুলো এবার বন্ধ করো তো। থানায় কী হয়েছে না হয়েছে তা তোমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। আমার লোককে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে, আর আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকব? খন্দকার পরিবারের ক্ষমতাটা কি তুমি বিলিয়ে দিয়েছ নাকি?”
“মুখ সামলে কথা বল আফিম!” রাজন খন্দকার চিৎকার করে উঠলেন।
“তুই যাকে ক্ষমতা বলিস, সেটা ক্ষমতা নয়—ওটা গুণ্ডামি! তুই দিন দিন একটা জানোয়ারে পরিণত হচ্ছিস।”
আফিম একধাপ এগিয়ে এসে ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই শহরে আফিম খন্দকার যা চায়, তা-ই হয়। তুমি বুড়ো হয়েছ, রাজনীতিতে হেরে ঘরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছ, নাও। কিন্তু আমার রাস্তায় বাধা দিতে এসো না। আমি রাফানকে ছাড়িয়ে এনেছি, আমার ইচ্ছেতেই। যে মেয়েটা আমার লোকের গায়ে হাত তুলেছে, তাকে আমি দেখে নেব।”
“তুই একটা চরম চরিত্রহীন!”

রাজন খন্দকার আর নিজের রাগ সংবরণ করতে পারলেন না। ওনার হাতটা রাগে কাঁপতে লাগল।
“পঁচিশ-পঁচিশটা ধর্ষণের কেস তোর নামে! প্রতিবার তোকে বাঁচিয়ে আমি সমাজের বুকে মুখ দেখাতে পারি না। আর আজ আবার একটা নতুন মেয়ের পেছনে লাগছিস? তোকে আমি জন্ম দিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি!”
আফিম এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠল, যা ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
“ভুল তো তুমি করেছই বাবা! বিরাট বড় ভুল!”
বাবা-ছেলের এই চরম কথা কাটাকাটি আর ঝগড়া যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই মাঝখানে এসে দাঁড়াল অনুপমা। ও নিজের সিল্কের শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে নিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে রাজন খন্দকারের হাতটা চেপে ধরল। ও জানত কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।
অনুপমা অত্যন্ত কোমল আর আদুরে গলায় রাজন খন্দকারকে বলল,
“আহা, তোমরা বাবা-ছেলে দেখা হলেই কেন এভাবে ঝগড়া শুরু করো বলো তো? ওনার প্রেসারটা এমনিতেই হাই, তুমি একটু শান্ত হও আফিম।” ও রাজন খন্দকারকে আলতো করে চেপে সোফায় বসিয়ে দিল। ওনার বুকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

“তুমি শুধু শুধু রাগ করছ। আফিম তো এখন ছোট নয়। তুমি একটু পানি খাও, শান্ত হও।”
রাজন খন্দকার অনুপমার ছোঁয়ায় কিছুটা শান্ত হয়ে সোফায় মাথা নিকু করে বসে রইলেন। ওনার বুকটা তখনও দ্রুত ওঠানামা করছিল।
ঠিক তখনই আফিম সোফার ওপাশে দাঁড়িয়ে অনুপমার দিকে তাকাল। অনুপমার পাতলা শাড়ির আড়ালের শরীর আফিমের চোখ এড়ালো না। ও ঠোঁটের কোণে একটা কুৎসিত ও বাঁকা হাসি ফুটিয়ে অনুপমার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ওর বাবার সামনেই ও অনুপমাকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত গভীর ও ইঙ্গিতপূর্ণ গলায় বলল,

“আম্মু, বাইরে যা গরম পড়েছে না… মাথাটা একদম গরম হয়ে আছে। আমার জন্য রুমে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জুস নিয়ে আসো। ভেতরের গরমটা একটু ঠাণ্ডা করতে হবে।”
অনুপমা আফিমের সেই লোলুপ দৃষ্টির ভাষা পলকে ধরে ফেলল। ও রাজন খন্দকারের দিকে এক পলক তাকিয়ে, আবার আফিমের দিকে তাকিয়ে একটা অত্যন্ত মায়াবী ও বাঁকা রহস্যময় হাসি দিল। রাজন খন্দকারের কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,
“আচ্ছা,তুমি রুমে যাও।আমি এখনই রান্নাঘর থেকে তোমার জন্য ঠাণ্ডা জুস বানিয়ে আনছি।”
অনুপমা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল, আর আফিম একটা পৈশাচিক হাসি দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
রাজন খন্দকার সোফায় বসে নিজের কপালে হাত দিয়ে ভাবছিলেন-ছেলের এই দিন দিন অবনতি আর পৈশাচিক জানোয়ারে রূপান্তরিত হওয়ার কারণ কী। হঠাৎ করেই ওনার কী যেন একটা মনে পড়ে গেল, পুরো হুশ ফিরে এলো ওনার। মনের ভেতর এক তীব্র আশঙ্কার জন্ম নিল।
“না, এটা হতে পারে না!”

রাজন খন্দকার বিড়বিড় করে উঠলেন এবং সোফা ছেড়ে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। ওনার মনে হলো উনি প্রতিবারের মতোই এবারও এক মস্ত বড় ভুল করতে যাচ্ছেন, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। উনি আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে দ্রুত পায়ে ভেতরের করিডোর দিয়ে আফিমের ঘরের দিকে দৌড়াতে লাগলেন। ওনার হৃদস্পন্দন তখন চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। কিন্তু ততক্ষণে, প্রতিবারের মতোই আবার দেরি হয়ে গেছে।
অনুপমা ট্রে-তে করে জুসের গ্লাস নিয়ে ঠিক তখনই আফিমের ঘরের সামনে পৌঁছেছিল। আফিম দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। অনুপমা ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই আফিম অত্যন্ত দ্রুততায় খটাস করে ভেতরের লকটা আটকে দিল এবং দরজাটা বন্ধ করে দিল।
রাজন খন্দকার ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার সামনে এসে পৌঁছালেন। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে ওনার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। উনি দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিতে লাগলেন এবং চিৎকার করে বলতে লাগলেন,

“আফিম! দরজা খোল বাবা! অনুপমা, তুমি বাইরে আসো! তোরা ভেতরে কী করছিস? আফিম, তোকে আমি বলছি দরজা খোল!”
ঘরের ভেতরে তখন সম্পূর্ণ অন্য দৃশ্য। দরজা বন্ধ হতেই আফিম জুসের গ্লাসটা টেবিলের ওপর ছুড়ে মারল। ওর ভেতরের সেই পৈশাচিক লালসা আর শরীরের ক্ষুধা তখন চরমে। ও অনুপমার দিকে এগিয়ে গেল। অনুপমাও কোনো প্রতিরোধ না করে, ওর সেই বাঁকা হাসিটা ধরে রেখে দাঁড়িয়ে রইল।
আফিম আর সময় নষ্ট করল না। ও নিজের গায়ের শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল এবং নিজের গায়ের কাপড় খুলতে শুরু করল। অনুপমাও অত্যন্ত চতুর ও লোলুপ ভঙ্গিতে নিজের গায়ের সেই ফিনফিনে পাতলা সিল্কের জর্জেট শাড়ির বাঁধন আলগা করে দিল। একের পর এক কাপড় মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে লাগল এবং দুজনেই সম্পূর্ণ নগ্ন ও উন্মত্ত হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল।
রাজন খন্দকার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত ধাক্কা দিচ্ছিলেন আর ওনার গলার রগ ফুলে উঠছিল। তিনি তীব্র যন্ত্রণায় চিল্লিয়ে বলতে লাগলেন,

“অনুপমা! তুমি আমার স্ত্রী, তুমি ওর সাথে ওসব করবে না! আফিম, ও তোর মা সমতুল্য, ওকে ছেড়ে দে! ও ব্যথা পাবে আফিম, ওকে ছেড়ে দে! তোরা এই পাপ করিস না!”
কিন্তু ঘরের ভেতরের দুজন মানুষের কানে তখন কামনার অন্ধ নেশা ছাড়া আর কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছিল না। তারা বাইরের এই চিৎকারকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিছানায় আছড়ে পড়ল। আফিম অত্যন্ত হিংস্র ও বন্য উল্লাসে অনুপমার শরীরে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে লাগল। কামনার তীব্র তীব্রতায় দুজনেই চরম মদমত্ত হয়ে উঠল। অনুপমা চরম সুখে মুখ থেকে অস্ফুট সূরে আফিমের পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিল, আর দুজনে মিলে এক তীব্র আদিম খেলায় মেতে উঠল।
রাজন খন্দকার দরজার বাইরে মাটিতে বসে পড়লেন। ওনার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল, আর কানের ভেতর আসছিল ওনার স্ত্রী আর নিজের একমাত্র ছেলের সেই তীব্র মিলনের শব্দ। ওনার জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় এই বন্ধ দরজার ওপাশে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে উদযাপিত হচ্ছিল।

দুপুরের কড়া রোদের তীব্রতা কমে বিকেলের আকাশে তখন হালকা মেঘের আনাগোনা। জানলা দিয়ে আসা মৃদু, শীতল হাওয়া ঘরের রেশমি পর্দাগুলোকে আলতো করে দুলিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু প্রকৃতির সেই ফুরফুরে আবহাওয়াও পারছিল না জেবা ও অরির মাথার ওপর চেপে বসা কঠিন পড়ার চাপকে বিন্দুমাত্র হালকা করতে।
আজকের পরীক্ষার সেই জটিল প্রশ্নপত্র জেবা আর অরিকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ওরা হাড়হাড় টের পেয়েছে, এইচএসসি-র এই বৈতরণী পার হতে হলে শুধু সাজেশনের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। প্রশ্নকর্তারা যে যেকোনো মুহূর্তে ‘গুগলি’ ছুঁড়তে পারেন, তার প্রমাণ আজ ওরা হাতেনাতে পেয়েছে। তাই দুজনে মিলে ঘরে ফিরেই এক অলিখিত পণ করে ফেলেছে-প্রশ্ন যতই কঠিন হোক, উদ্দীপক যতই ঘুরিয়ে আসুক না কেন, সিলেবাসের প্রতিটি পাতা তারা এমনভাবে খুঁটিয়ে পড়বে যেন কোনো খামতিই আর অবশিষ্ট না থাকে। আগামীকালের পরীক্ষার জন্য নিজেদের সেরা প্রস্তুতিটা ওরা আজকেই নিয়ে ছাড়বে।

দোতলার পড়ার ঘরটাতে যেন একটা ছোটখাটো যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। টেবিল, সোফা, এমনকি মেঝের এক কোণাতেও ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে রাশি রাশি বই, খাতা আর হরেক রঙের হাইলাইটার। জেবা মেয়েটা স্বভাবগতভাবেই একটু চঞ্চল প্রকৃতির। এক জায়গায় সোজা হয়ে বসে বেশিক্ষণ পড়াশোনা করা ওর কোষ্ঠীতেই নেই। ও প্রথমে বেশ কায়দা করে টেবিল-চেয়ারে বসে পড়া শুরু করেছিল, কিন্তু আধা ঘণ্টা যেতে না যেতেই ওর পিঠ আর কোমরে ব্যথা চাড়া দিয়ে উঠল।
ও ব্যাকারন এর মোটা বইটা হাতে নিয়ে ধপ করে গিয়ে শুয়ে পড়ল তুলতুলে খাটের ওপর। উপুড় হয়ে শুয়ে, দুই কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে, পা দুটো বাতাসে দুলিয়ে ও পড়াগুলো মুখস্থ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। ওর ঠোঁট দুটো অনবরত বিড়বিড় করে নড়ছে।
কিন্তু এভাবেও বেশিক্ষণ টেক্কা দেওয়া গেল না। একটু পরেই ও চিত হয়ে শুয়ে বইটা চোখের একদম সামনে ধরে পড়তে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জেবার মনে হলো, এভাবে শুয়ে পড়লে পড়াশোনা নয়, বরং কুম্ভকর্ণের ঘুম চলে আসতে পারে। তাই ও এক ঝটকায় খাট থেকে নেমে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল। এবার ও ঘরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় অস্থির পায়ে পায়চারি করতে করতে পড়তে লাগল। বইয়ের দিকে তীক্ষ্ণ চোখ রাখছে, আর জোরে জোরে মুখ ফুটিয়ে পড়াগুলো আউড়াচ্ছে, যেন ও কোনো বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দিচ্ছে!

জেবার এই বিচিত্র পড়ার ভঙ্গি দেখে ঘরের এক কোণায় থাকা কাজের মেয়ে সুফিয়া ঘর মুছতে এসে দরজায় হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। বেচারি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে মনে মনে ভাবল,
“ছোট আপার বান্ধবীর কি মাথাটা পুরোই খারাপ হইয়া গেল নাকি? একবার শোয়, একবার বসে, আবার খাড়াইয়া চিল্লাইয়া পড়ে! এগুলো আবার কেমন পড়া? বাপের জন্মেও কাউরে এমনে পড়তে দেহিনাই!”
কিন্তু জেবার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ওর লক্ষ্য এখন একটাই—আজ রাতের মধ্যে পুরো সিলেবাস শেষ করতেই হবে।
এদিকে অরি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল, একটানা পড়ার কারণে ওদের দুজনেরই মগজের গ্লুকোজের মাত্রা একদম শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। বিশেষ করে জেবা যেভাবে শারীরিক কসরত করে ক্লান্তিহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, ওর এখনই কিছু পুষ্টিকর এবং ঠাণ্ডা এনার্জি ড্রিংক দরকার। তাই অরি বইটা হাতে নিয়েই ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো রান্নাঘরের দিকে।

মৃধা নিবাসের বিশাল ও আধুনিক রান্নাঘরটা দিনের এই সময়ে একদম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর শান্ত থাকে। অরি রান্নাঘরে ঢুকেও কিন্তু ওর পড়া থামাল না। ও বাম হাতে মোটা বইটা শক্ত করে ধরে রাখল আর ডান হাত দিয়ে নিখুঁত নিপুণতায় ফ্রিজ খুলে চকোলেট সিরাপ, ঠাণ্ডা দুধ আর ভ্যানিলা আইসক্রিমের বক্সটা বের করল।
রান্নাঘরের মার্বেল কাউন্টারের ওপর বইটা খোলা। অরি ব্লেন্ডারের জগে দুধ ঢালছে, আর একই সাথে ওর চোখ নিবদ্ধ রয়েছে বইয়ের পাতার দিকে। ও এক নজর বইয়ের দিকে তাকাচ্ছে, একটা কঠিন অনুচ্ছেদ মনে মনে আওড়াচ্ছে, আর তারপর চকোলেট সিরাপের বোতলটা চেপে ব্লেন্ডারে ঢালছে। আইসক্রিমের স্কুপ দিয়ে আইসক্রিম তোলার সময়ও ও মুখ ফুটিয়ে জোরে জোরে পড়ছে।
রান্নাঘরের প্রধান শেফ শাহীন মিয়া তখন পাশে দাঁড়িয়ে রাতের রান্নার জন্য সবজি কাটছিলেন। তিনি অরির এই ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার কায়দা দেখে পুরোপুরি তাজ্জব বনে গেলেন। তিনি জীবনে অনেক পরীক্ষার্থী দেখেছেন, কিন্তু ব্লেন্ডার চালানোর তীব্র শব্দের ওপর দিয়ে পড়া মুখস্থ করার মতো অলৌকিক দৃশ্য তিনি কখনো দেখেননি।
শাহীন মিয়া কিছুটা ভড়কে গিয়ে বিনীত স্বরে বললেন,

“ছোট আম্মা, আপনে একটু বইসা পড়েন না? আমি মিল্কশেকটা বানাইয়া দেই? আপনার আবার পড়াশোনার ভুল হয়া যাইব!”
অরি বই থেকে চোখ না তুলেই ওনার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,
“না আঙ্কেল, একদম ঠিক আছে। আমি নিজেই বানাচ্ছি। হাত সচল থাকলে মাথাও দ্রুত চলে। আপনি আপনার কাজ করুন।”
অরি ব্লেন্ডারের সুইচটা অন করে দিল। ‘ররররর’ শব্দে ব্লেন্ডার ঘুরতে লাগল, আর সেই শব্দের তীব্রতা ছাপিয়েই অরির কোমল কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠস্বর শোনা যেতে লাগল, যা আপনমনে পড়া মুখস্থ করছিল। মিল্কশেক তৈরি শেষ হতেই ও দুটো কাঁচের লম্বা গ্লাসে ওটা ঢালল। ওপর থেকে কিছুটা চকোলেট কুচি ছড়িয়ে দিয়ে ট্রেতে করে গ্লাস দুটো আর বইটা নিয়ে ও আবার ওপরের ঘরের দিকে রওনা দিল।

সাধারণত এই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধা কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরেন, ড্রয়িংরুমে ওনার গম্ভীর কণ্ঠস্বরের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। কিন্তু আজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি রাষ্ট্রীয় বৈঠক থাকায় ওনার ফিরতে বেশ দেরি হবে। উনি আগেই ফোন করে অরিকে জানিয়ে দিয়েছেন যেন ওরা ওনার জন্য অপেক্ষা না করে রাতের খাবার খেয়ে নেয় এবং মন দিয়ে পড়াশোনা করে।
বাবার এই অনুপস্থিতি যেন অরিকে মনে মনে আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তুলেছে। অরি ট্রে হাতে রুমে ঢুকতেই দেখল জেবা তখন ক্লান্ত হয়ে মেঝের কার্পেটের ওপরই সটান শুয়ে পড়েছে, আর বইটা ওর মুখের ওপর উল্টো হয়ে পড়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে অরি শব্দহীন হেসে ফেলল। ও ট্রেটা টেবিলের ওপর রেখে জেবার মুখের ওপর থেকে বইটা সরাল।
“এই নে বাদামনী, তোর এনার্জি বুস্টার এসে গেছে।আগে এটা খা, মাথা আবার ঝড়ের গতিতে কাজ করা শুরু করবে।”

চকোলেট মিল্কশেকের নাম শুনতেই জেবা এক ঝটকায় উঠে বসল, যেন ওর গায়ে জিনের আছর হয়েছে! জেবা চকোলেট মিল্কশেকের গ্লাসটা দুই হাতে ধরে এমনভাবে দ্রুত চুমুক দিচ্ছিল যেন ওটা কোনো স্বর্গীয় অমৃত। এক মস্ত চুমুক দিয়ে ও “আহ্” করে একটা পরম তৃপ্তির শব্দ করল। তারপর গ্লাসটা নামিয়ে রেখে অরির দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখন এটার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল দোস্ত। এতগুলো পড়া একসাথে গিলতে গিলতে আমার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিল এতক্ষণ।”
অরি নিজের গ্লাসে একটা স্ট্র ডুবিয়ে আস্তে করে চুমুক দিল। বইটা আবার কোলের ওপর খুলে রেখে শান্ত গলায় বলল,
“একটা একটা করে অধ্যায় পড়। বেশি প্যারা নিলে পরীক্ষার হলে কিছুই মনে থাকবে না।”
জেবা কার্পেট থেকে উঠে সোফায় বসে পড়ল। পা দুটো সোফার ওপর তুলে দিয়ে বইটা কোলে টেনে নিল।
“হ্যাঁ, ঠিক বলছিস। কিন্তু এই বইয়ের পাতাগুলো দেখলে আমার মাথা এমনিই গরম হয়ে যায়। এত যুদ্ধ, এত রক্ত, এত চক্রান্ত… মানুষ এত খারাপ কেন হয় বল তো?”
অরি বইয়ের লাইন থেকে চোখ তুলে জেবার দিকে তাকাল। ওর চোখে তখন এক গভীর ও শান্ত দৃষ্টি। ও মৃদু স্বরে বলল,

“মানুষ খারাপ হয় বলেই তো বই লেখা হয়, জেবা। ভালো মানুষদের সহজ সরল জীবনকে সবাই এভাবে পাতায় পাতায় মনে রাখে না। মনে রাখে তাদের, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, যারা দেশ বাঁচিয়েছে। আমরাও একদিন ডাক্তার হয়ে মানুষের জীবন বাঁচাব। সেটাই আমাদের নিজেদের ইতিহাস হবে।”
জেবা অরির কথা শুনে কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো চুপ করে রইল। তারপর আস্তে করে মাথা নেড়ে সায় দিল,
“তোর ভেতরের গভীরতাটা সত্যি অসাধারণ রে অরি! তুই সবসময় এত সুন্দর করে কথা বলিস কেন? আমার তো শুনলেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে মন ভালো হয়ে যায়।”
অরি হাসল। হাসিটা খুব ছোট, কিন্তু তার চোখে এক অদ্ভুত মায়া জড়ানো ছিল। ও কলমটা তুলে নিয়ে বলল,
“চল, অনেক গল্প হলো, এবার আবার পড়া শুরু করি।”
দুজন আবার মনোযোগ দিয়ে বই খুলে বসল। ঘরের মধ্যে শুধু হালকা পাতার উল্টানোর শব্দ আর জেবার মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে পড়ার আওয়াজ। বাইরে বিকেলের সোনাঝরা আলোটা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে। জানলার পর্দা গলে গোধূলির কমলা রঙের রোদ এসে পড়েছে ঘরের নরম কার্পেটের ওপর, যেন এক শান্তিময় আবহ তৈরি করে রেখেছে দুই বান্ধবীর স্বপ্ন ছোঁয়ার লড়াইয়ে।

বিকেলের তপ্ত রোদের পর পদ্মাপাড়ের শহর রাজশাহীর আকাশে তখন সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। শহরের এক কোণে অবস্থিত মৃধা আবরার সারিমের বিশাল বাংলো,বাড়ির ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা এই মুহূর্তে এক অদ্ভুত গম্ভীরতায় থমথম করছিল। ঘরের ভেতরের সেন্ট্রাল এয়ারকন্ডিশনারের একটানা মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
সোফায় হেলান দিয়ে বসে সারিম। ওর পরনের ধবধবে সাদা শার্টের হাতা দুটো বরাবরের মতোই কনুই পর্যন্ত নিখুঁতভাবে গোটানো। এক হাতের আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত দামী চুরুট, যার নীলচে ধোঁয়া ড্রয়িংরুমের বিলাসবহুল ঝাড়বাতির আলোয় এক মায়াবী ও রহস্যময় কুয়াশার সৃষ্টি করছিল। সারিমের চোখ জোড়া দৃষ্টি ছিল শূন্যে ছড়ানো। ওর সেই পাথরের মতো শক্ত আর ধারালো চেহারায় এখন এক অদ্ভুত, চতুর হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। যতবার ওর চোখের সামনে সেই সকালের দৃশ্যটা ভেসে উঠছিল—সেই দুধ-সাদা গায়ের রঙের ওপর ভোরের কাঁচা সোনা রোদ, এলোমেলো বাদামী সিল্কি চুল আর হরিণীর মতো টানা টানা চোখ—ততবারই ওর চুরুটের ধোঁয়ার গতি তীব্র হচ্ছিল। মনে মনে অনবরত আওড়াচ্ছিল,
“আমার চন্দ্রিমা।সে আমার চন্দ্রিমা,
পাঁচ বছর ধরে অরিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক ভেবে দূরে সরিয়ে রেখেছিলো সারিম,অথচ এতোদিন কিনা আস্ত একটা চাঁদের টুকরো হয়ে ঘরের কোণে লুকিয়ে ছিলো ওর চন্দ্রিমা!চন্দ্রিমাকে হাতছাড়া করা মানে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।সারিমের এখন মূল উদ্দেশ্যে যেভাবেই হোক অরি কে ফিরে পেতে হবে,

এরজন্য এখন ওকে নিজের কঠোর বাবার খাঁচা থেকে বের করে অরিকে বুকে টেনে নিতে হলে, সারিম কে এক চরম খেলা খেলতে হবে। এমন এক চাল চালতে হবে,যা পুরো দেশকে ও নাড়িয়ে দেবে।”
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের ভারী দরজাটা ঠেলে তটস্থ পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল আলভি। আলভির মুখের অবস্থা তখন দেখার মতো। ওর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, আর চোখ গোল গোল হয়ে আছে।ফাইভ স্টার রেস্তোরাঁয় চারটে নেড়ি কুকুরকে নিয়ে ‘বিফ স্টেক’ খাওয়ানোর মতো ঐতিহাসিক ও যন্ত্রণাদায়ক ডিউটি শেষ করে ও মাত্রই রাজশাহী এসে পৌঁছেছে। বসের এই আকস্মিক পাগলামি ও কোনোভাবেই হজম করতে পারছিল না।
আলভি সোফার কিছুটা দূরত্বে এসে অত্যন্ত বিনীতভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। ওর গলা শুকিয়ে কাঠ।তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“স… স্যার! আপনার নির্দেশমতো কাজ একদম ১০০ পারসেন্ট কমপ্লিট করা হয়েছে।”
সারিম চুরুটে একটা শেষ টান দিয়ে অ্যাশট্রেতে ওটা গুঁজে দিল।ও মাথা না তুলে অত্যন্ত শীতল ও গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“মিডিয়ার কী অবস্থা, আলভি? আমি যা যা বলেছিলাম, সব ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছেছে তো?”
আলভি পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল। ও ঢোক গিলে বলল,
“জি স্যার। দেশের যত বড় বড় নিউজ চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল আর প্রিন্ট মিডিয়ার টপ রিপোর্টার আছে, সবাইকে অত্যন্ত গোপন মাধ্যমে খবর পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
আলভি একটু থামল। ওর কৌতূহলী ও ভীতু মগজটা আর নিজের কৌতুহল চেপে রাখতে পারল না। ও নিজের দুই হাত কচলাতে কচলাতে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“কিন্তু স্যার… একটা ছোট প্রশ্ন ছিল।
“বলো?
“আপনি আর আমিতো এখানে!একদম সুস্থ-সবল অবস্থায়। তাহলে বাইরে মিডিয়াতে আপনার ওপর হামলার এই আগাম ভুয়া খবর ছড়ানোর মানেটা কী, স্যার? আসলে কার ওপর হামলা হতে চলেছে? কে সেই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, যে আমাদের এই বাড়িতে অ্যাটাক করবে?”
সারিম কোনো উত্তর দিল না। ও সোফা থেকে অত্যন্ত ধীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। ওর সুঠাম দীর্ঘ অবয়ব ড্রয়িংরুমের আলোয় এক তীব্র দাপট ফুটিয়ে তুলল।সারিম আলভির দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময়, বাঁকা হাসি দিল।সারিম যখন হাসে, তখন ওর ধারালো চোয়ালের শিরাগুলো এক অদ্ভুত পুরুষালি হিংস্রতায় কেঁপে ওঠে।
সারিম আলভিকে কিছু বলার আগেই ড্রয়িংরুমের পেছনের দরজা দিয়ে একে একে প্রবেশ করল প্রায় দশ-বারোজন বিশাল দেহের মানুষ। এদের প্রত্যেকের পরনে কুচকুচে কালো রঙের পোশাক, মুখে কালো কাপড়ের মাস্ক আর চোখে অন্ধকার চশমা। দেখতে হুবহু পেশাদার কোনো গ্যাংস্টার বা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর মতো লাগছে। আলভি এদের দেখামাত্রই ভয়ে এক লাফে সোফার পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। ও কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠতে চাইল,

“ওরে বাবারে! ডাকাত পড়ছে! স্যার, বাঁচান!”
“চুপ করো, আলভি! এত ভয় পেলে আমার পিএ হিসেবে চাকরি করবে কীভাবে?” সারিমের কড়া ধমকে আলভি সোফার আড়াল থেকে উঁকি দিল।
সারিম শান্ত গলায় বলল,
“এরা অন্য কেউ নয়। আমার হায়ার করা লোক।
আলভি এবার নিজের বোকা মাথায় হাত দিয়ে সোফার আড়াল থেকে বের হয়ে এলো। ও হাঁ করে বসের দিকে তাকিয়ে রইল।মনে মনে ভাবল,
“বসের মাথাটা আজ সকাল থেকেই পুরো ড্যামেজ হয়ে গেছে! সকালে রাস্তার চারটা নোংরা কুত্তাকে ফাইভ স্টার রেস্তোরাঁয় নিয়ে লাখ টাকার বিফ স্টেক খাওয়ালো, আর এখন নিজের বাড়িতে নিজের টাকা দিয়ে দশ-বারোটা লোক ভাড়া করে গুন্ডা সাজিয়ে বসিয়ে রেখেছে! উনি কি কোনো ক্রাইম থ্রিলার সিনেমার ডিরেক্টর হওয়ার শখ জাগাইছেন নাকি!”

সারিম ওর প্যান্টের পকেট থেকে একটা চকচকে, কুচকুচে কালো রঙের লাইসেন্সড রিভালভার বের করল। লাইটের আলোয় সেই মারাত্মক অস্ত্রের ধাতব শরীরটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। আলভি পিস্তলটা দেখামাত্রই নিজের দুই হাত মাথার ওপর তুলে তিন ফুট পিছিয়ে গেল। ওর কলিজা তখন শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে।
সারিম অত্যন্ত নিখুঁত ভঙ্গিতে রিভালভারটা আলভির দিকে বাড়িয়ে দিল। আলভি তো অবাক! ও কাঁপা কাঁপা হাতে পিস্তলটা কোনোমতে ধরল, যেন ওটা কোনো জ্যান্ত বোম!
ঠিক তখনই সারিম ওর দুই হাত চওড়া করে, আলভির একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আকস্মিক ও গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিল,
“শুট মি, আলভি! ফায়ার!”
“অ্যাঁ?!”

আলভির হাতের পিস্তলটা প্রায় হাত থেকে খসে পড়ার দশা হলো। ও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। ও চোখ দুটো চড়কগাছ করে বসের দিকে তাকিয়ে রইল। ও ভাবল ও নির্ঘাত কোনো হরর স্বপ্ন দেখছে।
“স… স্যার! কী বললেন?! আমি… আমি আপনাকে গুলি করব?! আমার চৌদ্দ গুষ্টির তো ফাঁসি হয়ে যাবে স্যার! আমি তো মশা মারতেও ভয় পাই, আর আপনি দেশের মন্ত্রীকে গুলি করতে বলছেন?!”
“আমি তোমাকে যা বলছি, ঠিক তা-ই করো, আলভি! দিস ইজ মাই অর্ডার!” সারিমের গলার স্বর এবার আরও কঠোর ও বজ্রকঠিন হয়ে উঠল।
“আমার এই ডান হাতের বাহুতে সরাসরি গুলি করো। নিশানা যেন ঠিক থাকে। শুধু চামড়া ঘেঁষে মাংসপেশি ভেদ করে গুলিটা বেরিয়ে যাবে। কুইক!”
আলভি এবার পুরোপুরি বোকা বনে গেল। বেচারা কিছুতেই এই আত্মঘাতী কাহিনীর কোনো মাথা-মুণ্ডু বুঝতে পারছিল না। ও পিস্তলটা ধরে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“না স্যার! আমার দ্বারা এই পাপ কাজ হবে না! আপনি দরকার হলে আমাকে চাকরি থেকে তাড়িয়ে দেন, আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলেন, তাও আমি আপনাকে শুট করতে পারব না! আপনি পাগল হইছেন নাকি স্যার? নিজেরে নিজে কেউ গুলি করায়?!”

সারিম এক ধাপ এগিয়ে এসে আলভির শার্টের কলারটা এক হাত দিয়ে খপ করে ধরে ফেলল। ওর চোখ দুটো রাগে ও জেদে লাল হয়ে উঠেছে। ও ধমক দিয়ে বলল,
“আলভি! তোমার ফালতু বকবকানি শোনার সময় আমার নেই! তুমি যদি এখন আমাকে শুট না করো, তবে এই পিস্তল দিয়ে আমি এখনই তোমার মাথায় গুলি করব! চয়েস ইজ ইয়োরস!”
সারিমের কড়া ও ভয়ংকর ধমক খেয়ে আলভির প্যান্ট ভেজার দশা হলো। ও বুঝতে পারল, বস এখন পুরোপুরি সিরিয়াস। ও যদি এখন গুলি না চালায়, তবে বস ওকেই ইহলোক থেকে বিদায় করে দেবে। বাধ্য হয়ে আলভি চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। ওর পুরো শরীর তখন ম্যালেরিয়া রোগীর মতো কাঁপছে। ও কাঁপতে কাঁপতে পিস্তলটা সারিমের ডান হাতের বাহুর দিকে তাক করল।
ওর আঙুলটা ট্রিগারের ওপর কাঁপছিল। ও মনে মনে আল্লাহর নাম জপতে জপতে বলল,
“ইয়া আল্লাহ্, বসের মাথাটা আজ আসলেই গেছে! আমি স্রেফ ওনার হুকুম পালন করতেছি, আমারে মাফ করে দিও!”

এরপর ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে এক বিকট শব্দের গুলি ফোটার আওয়াজ হলো। বারুদের তীব্র গন্ধ আর ধোঁয়ায় পুরো ঘরটা ভরে গেল। সারিমের ডান হাতের বাহু ঘেঁষে গুলিটা নিখুঁতভাবে মাংস ভেদ করে পেছনের দেওয়ালে গিয়ে আঘাত করল। ফিনকি দিয়ে তাজা লাল রক্ত সারিমের সাদা শার্টের হাতা বেয়ে মেঝের দামী কার্পেটে পড়তে লাগল।
সারিম ব্যথায় চোখ-মুখ সামান্য কুঁচকে ফেললেও ওর মুখ থেকে কোনো আর্তনাদ বের হলো না। ও নিজের বাঁ হাত দিয়ে ক্ষতস্থানটা চেপে ধরে সেই কালো পোশাকধারী ভাড়াটে গুন্ডাদের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কড়া গলায় বলল,
“এবার তোমরা তোমাদের কাজ শুরু করো। ঘরের আসবাবপত্র ভাঙো, বাইরে গিয়ে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করো, যেন পুরো এলাকাবাসী মনে করে এখানে হামলা চলছে! কুইক!”
ভাড়াটে গুন্ডারা তৎক্ষণাৎ ড্রয়িংরুমের দামী ফুলদানি, কাঁচের টেবিল লাথি মেরে ভাঙতে শুরু করল। বাইরে গিয়ে ধুমধাম ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে লাগল। পুরো বাড়ি জুড়ে যেন এক নরক গুলজার পরিবেশ তৈরি হলো। আলভি ততক্ষণে পিস্তলটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে নিজের মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে গভীর চিন্তা করছে।ভাবছিল,দেশের শিক্ষামন্ত্রীকে গুলি করে ফেলেছে। না জানি এখন ওর জীবনে আর কোনোদিন জেল থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়!

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক বিলাসবহুল, ভিআইপি কেবিন। ঘরের চারপাশটা একদম সাদা ও পরিষ্কার। জানলা দিয়ে বাইরের রাতের অন্ধকার দেখা যাচ্ছে।
কেবিনের মেডিকেল বেডে শুয়ে আছে মৃধা আবরার সারিম। ওর ডান হাতটা ব্যান্ডেজে ঢাকা, আর সাদা শার্ট বদলে ও এখন হাসপাতালের হালকা নীল রঙের পেশেন্ট গাউন পরে আছে। কপালে সামান্য ঘামের ফোঁটা থাকলেও ওর চেহারায় কোনো যন্ত্রণার ছাপ নেই; বরং ও অত্যন্ত আরামদায়ক ভঙ্গিতে বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে।
ওর বাম হাতে একটা চকচকে লাল আপেল, আর ডান হাতের আঙুলগুলো ব্যান্ডেজের ভেতর থেকেও কোনোমতে সচল রেখে ও বাম হাত দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে ‘ক্যান্ডি ক্রাশ’ গেম খেলছিল! সারিম এক নজর ফোনের দিকে তাকাচ্ছে, একটা করে ক্যান্ডি ম্যাচ করছে, আর অন্য হাত দিয়ে আপেলে মস্ত একটা কামড় বসাচ্ছে,

‘ঠিক তখনই কেবিনের দরজাটা ভয়ে ভয়ে, একদম ইঞ্চি ইঞ্চি করে ফাঁক করে ভেতরে ঢুকল আলভি। ও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে বসের এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখছিল। আলভি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। একে তো এই লোকটা নিজের টাকা খরচ করে, লোক ভাড়া করে, নিজের পিএকে দিয়ে নিজেকে গুলি করাল! আর এখন হাসপাতালে এত বড় ব্যান্ডেজ নিয়ে, ব্যথানাশক ওষুধের কোনো বালাই ছাড়া, অত্যন্ত আনন্দের সাথে বসে বসে আপেল খাচ্ছে আর মোবাইলে গেম খেলছে! মানুষের মগজ এতটা জটিল আর অদ্ভুত কীভাবে হতে পারে, তা আলভির ক্ষুদ্র বুদ্ধির বাইরে।
সারিম আপেলে আরেকটা কামড়। আলভির দিকে ফিরে তাকাল,বলল,
“টিভিটা অন করো তো, আলভি। দেখি আমার অভিনয়ের রেটিং কেমন হলো।”
আলভি রিমোট দিয়ে কেবিনের দেওয়ালে থাকা বড় এলইডি টিভিটা অন করে দিল। টিভি অন হতেই দেশের এক নম্বর নিউজ চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজের সেই পরিচিত ও তীব্র টোন বেজে উঠল,’
পর্দায় এক নারী রিপোর্টার অত্যন্ত উত্তেজিত ও নাটকীয় ভঙ্গিতে লাইভ রিপোর্টিং করছিলেন। ওনার ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যাচ্ছে সারিমের রাজশাহীর সেই বাংলো বাড়ি, যা এখন শত শত পুলিশ, আর্মি ফোর্সের গাড়ি দিয়ে কর্ডন করা। চারদিকে লাল-নীল সাইরেনের আলো জ্বলছে।
রিপোর্টার চিৎকার করে বলছিলেন,

“দর্শক, এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় ও চাঞ্চল্যকর ব্রেকিং নিউজ! রাজশাহী থেকে সরাসরি জানাচ্ছি, দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও তরুণ শিক্ষামন্ত্রী মৃধা আবরার সারিমের ওপর এক মস্ত বড় ও সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে! আজ সন্ধ্যায় ওনার নিজ বাসভবনে একদল মুখোশধারী, কালো পোশাক পরিহিত দুর্ধর্ষ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী বাহিনী অতর্কিতে হানা দেয়! ওনার নিরাপত্তা রক্ষীদের সাথে সন্ত্রাসীদের তুমুল গুলিবিনিময় হয়।
আমাদের কাছে আসা সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ওনার নিজের জীবন বাজি রেখে সন্ত্রাসীদের সাথে লড়াই করেছেন এবং ওনার ডান বাহুতে সরাসরি একটি গুলি লেগেছে! ওনাকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ ও আর্মি ফোর্সের কড়া পাহারায় স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুরো রাজশাহী জুড়ে এখন রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকছেন প্রশাসন…”

টিভির এই লাইভ নিউজ দেখে আলভি হাঁ করে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল, আর সোফায় বসা সারিম এক চিলতে বিজয়ের হাসি হাসল। ওর এই নাটক যে এতটা সফল হবে, তা ও নিজেও ভাবেনি।
সারিম আপেল খাওয়া শেষ করে ফোনটা টেবিলের ওপর রাখল। ওর চেহারায় এখন এক গভীর ও দূরদর্শী শিকারির চাতুর্য ফুটে উঠেছে। ও খুব ভালো করেই জানে, এই নিউজের পর ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কী ধরণের সুনামি বয়ে যাচ্ছে। ওর বাবা আরিশান মৃধা,নিশ্চই এতক্ষনে ওনার একমাত্র ছেলের ওপর এই হামলার খবর শুনে নিজের চেয়ারে স্থির থাকতে পারবেন না।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪

সারিম হঠাৎ করেই বেড থেকে পা দুটো নিচে নামিয়ে বসল। ও আলভির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর ও হুকুমের সুরে বলে উঠল,
“আলভি! এখনই হাসপাতালের বাইরে গিয়ে দেখো,ঐ সরাস্ট মন্ত্রী আমায় বাড়ি নিতে আসছে কিনা।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here