রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৯
সোহানা ইসলাম
— “জিনিয়া!!”
সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠলো।
মারজিয়া বেগম ছুটে গিয়ে জিনিয়াকে বুকে আগলে নিলেন। কাঁপা গলায় বললেন—
— “হায় আল্লাহ!এই কী হয়েছে তোমার?”
জোহান, ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো। তার চোখ ভিজে গেলো, হাত কাঁপছে।
— “কিউটি গার্ল!ও কিউটি গার্ল, চোখ খোলো!”
আরমান হাতে থাকা গিফট আর ছোট ব্যাগগুলো তাড়াহুড়ো করে একপাশের সিঙ্গেল সোফায় রাখলো। তারপর রোহানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে দৌড়ে এসে জিনিয়াকে তুলে বড় সোফায় শুইয়ে দিলো।
মিম আর ফিহা হতভম্ব। তাদের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে যেনো বোঝার চেষ্টা করছে—এমন কেন হলো?
এদিকে জাহেদ, ছটফট করতে লাগলো। বুক ফেটে যাচ্ছে তার বোনের অবস্থা দেখে। হঠাৎই চিৎকার করে উঠলো—
— “পানি! কেউ পানি আনো! আমার বোনের কি হয়ে যাচ্ছে!”
জারার শরীরও কাঁপছিলো। মাথা ঘুরে যাচ্ছিলো এস দেখে। সে ছোট্টে দৌড়ে গেলো রান্নাঘরের দিকে। হাত কাঁপতে কাঁপতে গ্লাসে পানি ভরে নিয়ে এলো। আরমানকে পানি এগিয়ে দেয় জারা। আরমান পানি টা নিয়ে জিনিয়া চোখে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু জাহেদের মাথায় তখন আগুন। “রোহান? বিয়ে?” তার বুকের ভেতরে আগুন লেগেছে। সে দৌড়ে গিয়ে রোহানের কলার চেপে ধরলো।
— “হারামজাদা! তুই আমার বোনকে ভালোবাসিস, আর এখন অন্য মেয়েকে বিয়ে করবি?”
তার চোখ লাল, গলা ফাটছে। মুখ থেকে গালিগালাজ বের হচ্ছিলো।
রোহান কিন্তু কোনো জবাব দিলো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। তার হাতে থাকা মিষ্টির প্যাকেটগুলো মেঝেতে পড়ে ছড়িয়ে গেলো।
রাশেদ তখনই দৌড়ে এসে জাহেদকে ধরলো।
— “পাগলামি করবেন না জাহেদ স্যার! ছাড়োন, প্লিজ!”
কিন্তু জাহেদ থামছিলো না। ঘরের পরিবেশ ক্রমেই গরম হয়ে উঠছিলো।
এবার আরমানের মাথা একেবারে ছিঁড়ে গেলো। তার ধৈর্য ভেঙে গেলো পুরোপুরি। জিনিয়াকে জারার কাছে দিয়ে এসে সে এগিয়ে গেলো। হঠাৎ ঠাস করে এক চড় মারলো জাহেদের গালে।
সেই শব্দে যেনো ঘর কেঁপে উঠলো।
জাহেদ হতভম্ব হয়ে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে বিস্ময়, ঠোঁট কাঁপছে। গাল চেপে ধরে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।
কিন্তু এখানেই শেষ হলো না। আরমান হঠাৎ রোহানের দিকেও ফিরলো। তার চোখ রক্তবর্ণ, কণ্ঠ কাঁপছে রাগে। হঠাৎ আরেকটা ঠাস—
রোহানের গালে থাপ্পড় বসে গেলো।
ঘরের ভেতর সবাই স্তব্ধ। মিম, ফিহা আর জারা কেঁপে উঠলো। তারা দ্রুত মারজিয়া বেগমকে সাহায্য করে জিনিয়াকে টেনে রুমের ভেতরে নিয়ে গেলো। মাথায় পানি দিতে লাগলো, মুখে বাতাস করতে লাগলো।
এদিকে রাশেদ দূরে দাঁড়িয়ে গেলো। মুখে বিরক্তি। মনে মনে ভাবলো—“আবহাওয়া ভয়ংকর গরম। দূরে না দাঁড়ালে আমাকেও একখানা বসিয়ে দিতো স্যার।”
রোহান গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ মুখ খুলে চেঁচিয়ে উঠলো—
— “বাল, মারছিস কেনো?”
আরমান ফুঁসে উঠলো।
— “তুই জানিস না! তুই কি বলছিস আর কেনো মারছি?”
রোহান কাঁপা গলায় উত্তর দিলো—
— “ হ্যাঁ..আমি শুধু বিয়ের কথা বলেছি।”
— “বিয়ের কথা কীভাবে বলেছিস, গাধা?!”
— “বলেছি আমার বিয়ের মিষ্টি…”
আরমান আর রাগ সামলাতে পারলো না। আবারও ঠাস করে এক থাপ্পড় মারলো রোহানকে।
রোহান এবার গর্জে উঠলো।
— “আবার মারছিস কেনো শালা?”
আরমান চিৎকার করে উঠলো—
— “ওরে বোদাই? তোর বিয়ের কথা শুনে আমার বোন অজ্ঞান হয়ে গেছে! এটা তোর দোষ না নাকি?”
রোহানের চোখ ভিজে এলো। মুখ কাঁপছে, গলা আটকে আসছে। সে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো—
— “তোর বোন আমার পুরো কথা না শুনেই জ্ঞান হারিয়েছে। আমি তো শুধু বলেছি বিয়ের মিষ্টি। বলিনি যে আমি অন্য কাউকে বিয়ে করছি। বাকি কথাটা বলার আগেই ও পড়ে গেছে…”
ঘর একেবারে নীরব হয়ে গেলো। সবাই স্তব্ধ।
মারজিয়া বেগম তখন ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। তার মুখে ক্লান্তি, চোখে অশ্রু। কণ্ঠে তীব্র ব্যথা—
— “তোমরা কেনো এমন করছো?নিজেদের মাঝে ঝামেলা না করে বসে কথা বলো? ”
ফিহা আর মিম পেছন থেকে ভাঙা গলায় বললো
— “আন্টি আপনি এখানে আ আসুন? জিনিয়া আপুর জ্ঞান ফিরছে না। আমরা পারছি না সামলাতে। ”
মারজিয়া বেগম চঞ্চল পায়ে চলে গেলেন রুমের ভিতর।
রোহান বুক চাপড়ে বললো—
— “ আমি ভুল সময়ে ভুল কথা বলে ফেলেছি। কিন্তু আমার ভালোবাসা একটাই—জিনিয়া।ওকে এখন কী করে বোঝাব?!”
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। কণ্ঠে তীব্র যন্ত্রণা।জাহেদ এখনো গাল চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তবে তার বুকেও ধাক্কা লেগেছে। সে ধীরে ধীরে বললো—
— “তুমি সত্যিই আমার বোনকে ভালোবাসো।তোমার সাথে জিনিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে?।”
__” আরে শালাবাবু কাল তো এইজন্যই ময়মনসিংহে গিয়েছি আমরা! জিনিয়া আর আমার বিয়ের কথা পাকা করতে? ”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। শুধু সবার শ্বাস, সবার ব্যথা, সবার দুঃখ ভাসছিলো বাতাসে।
ভেতরে মিম, ফিহা আর জারা চেষ্টা করছিলো জিনিয়ার জ্ঞান ফেরানোর। পানি ছিটাচ্ছিলো, মাথায় হাত বুলাচ্ছিলো।
বাইরে দাঁড়িয়ে রোহান দুই হাতে মুখ ঢেকে রেখেছে হাত দিয়ে। তার চোখ ভিজে গেছে, বুক ফেটে যাচ্ছে। আরমান এখনো রাগে গজগজ করছে, কিন্তু তারও বুকের ভেতরে যন্ত্রণা।সব গাধা তার কপালে এসে জুটেছে! কী যন্ত্রণা, একটা কথাও ঠিক করে বলতে পারে না। যা-ও বলেছে, তাতে আরও হিতে বিপরীত হয়ে গেছে।
হঠাৎই জারাদের বাড়ির দরজা খোলা দেখে প্রতিবেশীরা একে একে ভিড় জমাতে শুরু করলো। রহিমা বেগম আর তার সঙ্গী রাবিয়া বেগম এগিয়ে এসে মুখ বাঁকিয়ে বললেন—
“হায় হায়, ঘরে যুবতি মেয়ে রেখে আবার অচেনা ছেলেপুলে ঢোকানো হচ্ছে! বাহ, বাহ! এ কী অবস্থা রে?”
আরমান আর রোহান কে জারাদের বাড়িতে ডুকতে দেখে রহিমা বেগম তাদের সাথে করে নিয়ে আসেন। ওই দিনের কথাগুলো ওনার হজম হচ্ছিল না। উত পেতে বসেছিলো মারজিয়া বেগম কে হেনস্তা করতে। যেই না সুযোগ পেলে এমনি হাতিয়ে নেয়।
তখন তার কথার সাথে সাথে পাশে থাকা আরেক প্রতিবেশী রাবিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন—
“স্বামী বিদেশে, বড় ছেলে বিদেশে… আর ঘরে এখন অচেনা ছেলে আসছে? বুঝলে তো সব!”
তাদের কণ্ঠে বিদ্রূপ, আর চোখে সন্দেহের শলাকা। ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ খিকখিক করে হাসছে, কেউ আবার ধীরে ধীরে গুনগুন করছে।
কথাগুলো শুনে আরমানের চোখে রাগের আগুন জ্বলে উঠলো। তার মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেলো। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জবাব দিলো—
____ “আন্টি, মুখ সামলে কথা বলেন! আমার আর মানজারার সম্পর্ক নিয়ে আপনাদের বাজে ইঙ্গিত করার অধিকার নেই। আপনাদের মতো মানুষ শুধু অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায়।”
__” তোমার এতো গায়ে লাগছে কেন বাপু?কিছু আছে নাকি ওর সাথে..? ”
আরমানের রাগ যেনো তরতর করে ভারতে থাকে।
___” একদম বাজে ইঙ্গিত করবে না। নয় তো খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম? ”
এবার তো রহিমা বেগম আরও চিৎকার করে উঠলেন—
___“হায় হায়! আমাদেরই উল্টা দোষারোপ করছো কেন? তুমি নিজেকে কি ভদ্রঘরের ছেলে মনে করো না-কি ? কারা কারা যে এ ঘরে ঢুকছে, আল্লাহই জানে!”
ড্রইং রুম থেকে চেচামেচির শব্দ শুনে জারা বের হয়, কী হয়েছে দেখার জন্য। আর এই কথা শুনে জারা তাড়াতাড়ি আরমানকে চোখে ইশারা করলো—“চুপ থাকেন আপনি, কিছু বলবেন না,প্লিজ ।”
কিন্তু সেই ইশারাতেই যেনো আরমানের রাগ আরও বেড়ে গেলো। তার গলা ভারী হয়ে উঠলো, মুখ দিয়ে কঠিন শব্দ বের হতে চাইছিলো।
রোহান সঙ্গে সঙ্গে তার হাত চেপে ধরলো।
____ “শান্ত হ বন্ধু। এদের সাথে তর্ক করে কোনো লাভ নেই।”
তবুও আরমান যেনো ধৈর্য হারাচ্ছিলো। তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে।
ঠিক তখনই আসল মারজিয়া বেগম এগিয়ে এলেন। তার চোখে ভরপুর তেজ। তিনি আর থেমে থাকলেন না।
____“আমার মেয়েকে নিয়ে এত বড় বড় কথা বলছেন কেন? যখন চেয়ারম্যানের ছেলে জোর করে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছিলো, তখন তো আপনাদের কাউকে দেখি নাই! তখন তো সাহস করে কেউ আমার দরজায় দাঁড়ায়নি। আজ যখন এই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আমার ঘর সামলাতে এসেছে, এখন কেন আপনাদের গায়ে আগুন ধরছে? আর ওরা সবাই আমার সন্তানের মতো। ওদের নিয়ে বাজে কথা বলবে না?”
তার কণ্ঠ এত দৃঢ় ছিলো যে চারপাশের ভিড় মুহূর্তেই থমকে গেলো।জোহান ও মায়ের পিছনে আসে ড্রইং রুমে। ওদের কথাগুলো বোঝার মতো বুদ্ধি ওর হয়েছে।
কিন্তু রহিমা বেগম হাল ছাড়লেন না। দাঁত খিঁচে বললেন—
__“ওইসব গল্প শোনানোর দরকার নাই! আমরা তো শুধু সত্যিটাই বলছি। কে জানে, এই ছেলেগুলো আসলে কিসের জন্য এ ঘরে ঢুকছে? মা যেমন মেয়েও তো তেমনই হবে ?”
এবার মাঠে নামলো মিম আর ফিহা। দুই বান্ধবীর চোখে তখন আগুন।
___“আন্টি, আমাদের সবারই চোখ আছে। আমরা জানি কে ভালো, কে খারাপ। আর যাদের ভেতর খারাপ চিন্তা আছে, তারাই অন্যকে খারাপ চোখে দেখে।”বললো মিম
ফিহা:-“ঠিক তাই। আপনারা যদি সত্যিই ভালো প্রতিবেশী হতেন, তাহলে জারাকে অপমান না করে পাশে দাঁড়াতেন। কথায় কথায় বদনাম করা আপনারা শিখেছেন, সম্মান দেওয়া নয়।”
তাদের মুখের ঝাঁঝালো কথায় মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো রহিমা আর তার দলবল।
এদিকে ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলো রাশেদ আর জাহেদ। দু’জনেই মিম আর ফিহার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। চোখেমুখে প্রশংসার ঝিলিক। মনে মনে ভাবলো—
“বাহ বা! কী জাজ এই দুই মেয়ের! কী সাহস!”
বোনকে নিয়ে বাজে কথা গুলো ওর গায়ে লাগছে। ছোট দেখে কী হয়েছে সেকি একেবারে কিছুই বোঝে না? এবার জোহান ও বলে
__” আপনার জামাই যে মন্তুুর কাকার বেগুন খেত থেকে বেগুন চুরি করেছে আমি কি তা একবারও বলছি কাউকে রাবিয়া কাকি?”
রাবিয়া বেগম এর মুখটা চুপসে গেলো জোহানের কথা শুনে। মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে তার আগে জোহান আবার বলে
__” ও.. কাকি তোমার মেয়ে আমার প্রাইভেট টিচারের সাথে পালিয়ে গেছে, এটা কী একবার ও বলেছি আমরা? তোমার মেয়ের তো চোখ খারাপ ছিলো,আমার দিকে কেমন করে যেনো তাকিয়ে থাকতো! কই আমি তো সে কথা বলি নি কখনো। তাহলে তোমরা কেন আমাদের নিয়ে বাজে কথা বলছো?”
এমন পরিস্থিতিতে জোহানের কথা শুনে মারজিয়া বেগম সহ সবাই মুখ টিপে হসেই ফেললেন। কিন্তু আরমান এখনো গম্ভীর মুখে দাড়িয়ে আছে।
ফিহা এবার একটা বাংলা বুলি ছাড়ে প্রতিবেশীদের দিকে। ফিহা মুখ বাকিয়ে বলে
___”বোঝলি জোহান!এদের নিজের পু*কি*তে দেড় মোন ঘু। অন্যেরে কয় খল-খলাইয়া দু।”
ফিহার কথা শুনে জাহেদ যেনো হতবুদ্ধ হয়ে গেছে। তার কটকটি আগের ফর্মে ফিরে এসেছে। কীভাবে কোমড় বেদে ঝগড়া করছে। এই মেয়ে তাকে ভবিষ্যতে খুব নাচাবে মনে হচ্ছে।
___” এখন এসেছে অন্যের নামে মিথ্যা বদনাম বের করে নিজেদের দোয়া তুলশী পাতা প্রমাণ করতে! যত্তসব ফাউল আর উটকো বেডি মানুষ? ” মিম ও ফিহার সাথে তাল মিলিয়ে বলে কথা গুলো।
রাশেদ শুধু সাধারণ মানুষের মতো ঝগড়া দেখে যাচ্ছে। তার কি যে মজা লাগছে ঝগড়া দেখতে?
প্রতিবেশীদের মুখে যেনো আর জবাব রইলো না। বারবার চেষ্টা করেও তারা মিম আর ফিহার কথার সামনে টিকতে পারছিলো না।
রহিমা বেগম রাগে গজগজ করতে করতে বলে
__“ঠিক আছে ঠিক আছে, যা খুশি করো। কিন্তু মনে রেখো, লোকজন কী বলছে! আমাদের মুখে না বললেও পাড়ায় সব খবর ছড়াবে।”
এই বলে তারা গজগজ করতে করতে চলে গেলো। তাদের সাথে যারা দাঁড়িয়ে ছিলো, তারাও আর কিছু বলতে পারলো না।
ঘরের ভেতর আবার শান্তি ফিরলো। তবে সেই শান্তি ছিলো দৃঢ়তায় ভরা।
আরমান রাগ সামলাতে না পেরে গর্জে উঠলো—
“এরা কারা রে! আমাদের সম্পর্কে এরকম বাজে কথা বলে? হাফ ইঞ্চির বাচ্চা, তুই কেন আমাকে তখন চুপ থাকতে বললি?”
রোহান পাশে দাঁড়িয়ে আরমান কে আটকানোর চেষ্টা করছে বার বার। এখানে জারা’র মা আছে। আরমান যদি জারা’র সাথে এই ভাবে কথা বলে তাহলে সন্দেহ করতে পারে।
মারজিয়া বেগম বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরমানের দিকে। এই ছেলে কার কথা বলছে? আরমান জারাকে হাফ ইঞ্চি বলাতে মারজিয়া বেগম কিছু বোঝতে পারলেন না।
__” তুমি কার কথা বলছো বাবা?”
আরমান রাগে ফুঁসছে। চোখ দুটু জেনো নিমিষেই রক্ত লাল হয়ে উঠে আরমানের চোখ। রোহান পরিস্থিতি সামলাতে বলে
__” আ আন্টি ও আসলে আমাকে বলেছে? রেগে আছে তো মাথা ঠিক নেই ওর! ”
মারজিয়া বেগম এবার জারাকে জড়িয়ে ধরলেন।
___“মা আমার, মাথা উঁচু করে থাকিস। এই সমাজ শুধু দোষারোপ করতে জানে। কিন্তু আল্লাহ সত্য জানেন।”
মিম আর ফিহা তখনও রাগে ফুঁসছিলো। তারা একসাথে বলে উঠলো—
___“আন্টি, ভয় পাবেন না। আমরা আছি আপনার সাথে। কে কী বললো তাতে কিছু আসে যায় না।”
ঘরের ভেতর একটা দৃঢ় নীরবতা নেমে এলো। চারজন তরুণ-তরুণী, এক অসহায় মা আর তার সাহসী মেয়ে—সবাই যেনো বুঝলো, প্রতিবেশীর কটূক্তি থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু তাদের জবাব দেওয়া সম্ভব।
বাইরে তখনও বিকেলের সূর্যের আলো ঝলমল করছে। প্রতিবেশীরা রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেছে।
মিম, ফিহা,জোহান আর মারজিয়া বেগম জিনিয়ার কাছে চলে আসে। তাদের পিছন পিছন রোহান, জাহেদ আর রাশেদও চলে আসে। ড্রইং রুমে জারা শুধু দাড়িয়ে আছে।চোখে ভয়ের ছাপ। আরমানকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক রেগে আছে।
জারা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এলো। তার চোখ লাল, ঠোঁট কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে আরমান প্রচণ্ড রেগে আছে। এক মুহূর্তের জন্যও তার দিকে চোখ তুলছে না।
আরমান যে গিফট গুলো জারার জন্য এনেছে সেগুলো জারার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
—” এগুলো রাখো, আমি আসচ্ছি।”
কথাগুলো যেনো বজ্রপাতের মতো আঘাত করল জারার বুকে। সে হকচকিয়ে গিফটগুলো বুকে চেপে ধরল। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
— না… না, আপনি যাবেন না। প্লিজ।
জারার হাতের উষ্ণতা আরমানের বুকের ভেতর জমে থাকা আগুনটাকে একটু হলেও শান্ত করল। তবুও ঠোঁটে কড়া গলায় বলল,
—” আমি ভয়ংকর রেগে আছি, মানজারা। আমার সাথে কথা বাড়িও না।”
জারা চোখ মুছে নরম গলায় বলল,
— ” আমি জানি, আপনার রাগ ভয়ংকর। তবুও আমি চাই আপনি আমার পাশেই থাকুন। আপনার রাগ আমি মেনে নেব, কিন্তু আপনার চলে যাওয়া আমি মেনে নিতে পারব না।”
এই কথা শুনে আরমান থেমে গেল। চোখ নামিয়ে চেয়ে রইল মেঝের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে যেনো তার বুকের ভেতর নরম কিছু ভেঙে পড়ল। সে ধীরে ধীরে জারার হাত ছাড়াতে চাইলো, কিন্তু জারা ছাড়ল না। বরং আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
তারপর ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল,
— ” ও..স্বামীজান! আপনি আমার সবকিছু। দয়া করে আমাকে একা ফেলে যাবেন না। আপনার লক্ষী বউয়ের কথা রাখবেন না? ”
আরমান চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ এক ফোঁটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এলো। জারার কণ্ঠে যে ভরসা, যে আকুতি—সেটা যেনো তার সমস্ত ক্ষত ধীরে ধীরে সেলাই করে দিচ্ছে।
সে ধীরে জারার মাথায় হাত রাখল।
— ” ঠিক আছে, যাচ্ছি না। ”
জারা কান্নাভেজা চোখ তুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে এক ফোঁটা হাসি ফুটে উঠল। সে মাথা নাড়ল সম্মতিতে।
জিনিয়া তখনও অচেতন হয়ে শুয়ে আছে। সবার মুখে চিন্তার ছাপ। এমন সময় আরমান আর জারা ধীরে ধীরে রুমে ঢোকে। জারা এগিয়ে গিয়ে ফিহার পাশে দাঁড়ায়। হাতে ধরা গিফটগুলো এক কোণে আস্তে করে রেখে দেয়। মুহূর্তেই রুমটা ভারী হয়ে ওঠে, কেউ যেনো স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতেও পারছে না।
জোহান চুপিচুপি জিনিয়ার পাশ ঘেঁসে বসতে যায়। তার ছোট্ট মন জানে— তার “কিউটি গার্ল” অসুস্থ। এই অবস্থায় তাকে সেবা করতে হবে । কিন্তু তার এই কাণ্ডে রোহানের গা জ্বলে ওঠে। চোখ রাঙিয়ে তাকালেও জোহানের কিছু যায় আসে না। সে গম্ভীর ভঙ্গিতে জিনিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করল—মায়ের দেখা দেখি।
রোহানের মাথায় যেনো রক্ত চড়ে গেল। ছোট্ট এক বাচ্চা তার জায়গা নিয়ে বসে আছে—এটা সে মেনে নিতে পারছে না। তাই এক ঝটকায় জোহানকে কোলে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মনে হলো পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এখন এই ছোট্ট ছেলেটা।সব সময় তার সাথে মীরজাফরের মতো করে।
জোহান রোহানের কোলে হাত-পা ছুঁড়ছে, কিন্তু রোহান শক্ত করে ধরে রেখেছে। রুমে উপস্থিত সবাই এই দৃশ্য দেখে হেসে ফেলে। এত বড় মানুষ একটা বাচ্চার সাথে হিংসে করছে—এটা ভেবে কারো মুখে হাসি চেপে রাখা যাচ্ছে না।
মারজিয়া বেগম মুচকি হেসে সবকিছু বুঝে ফেললেন। তিনি জানেন রোহান আসলে জিনিয়ার জন্য কতোটা অস্থির। তাই এ নিয়ে বেশি কিছু বললেন না।
এদিকে আরমান ঠোঁট কামড়ে হেসে রোহানের দিকে এগিয়ে গেল। রোহানের কোল থেকে জোহানকে সাবধানে নামিয়ে নিল নিজের কোলে। মুখটা জোহানের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
—” কী শালাবাবু, এখনই মেয়েদের পিছনে লাইন মারছো নাকি? বড় হলে কী করবা?”
কথাটা শুনে জোহানের মুখ লাল হয়ে গেল। তাকে “শালাবাবু” ডাকা মানে তার ছোট্ট অহংকারে বড় আঘাত। সে চেঁচিয়ে উঠল—
— ” তুমি আমাকে গালি দিবে না! একদম না!”
আরমান হেসে ফেলল।
— ” গালি কই দিলাম? তুমি তো আমার নাদান শালাবাবু।”
জোহান দাঁত কেলিয়ে তাকাল। যেনো মনে মনে ভাবছে—এই লোকটা কেনো বারবার তাকে খোঁচায় শালাবাবু বলে?প্রথম দিন দেখে হয়েছিলো সময় ও বলেছিলো?কেনো? হোয়াই? মনে সন্দেহ নিয়ে প্রশ্ন করে জোহান
___”আচ্ছা আপনার বাড়ি টা যেনো কোথায়? ”
___” ময়মনসিংহ! ”
জোহান বাবুক হয়ে বলে
___” ওহ মমিসিং! তাহলে মনে হয় আপনাদের ওখানে বাচ্চাদের শালাবাবু বলে? তাই না? ”
আরমান জোহানের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
__” মমিসিং নয়! ময়মনসিংহ! ”
__” ওই.. দু’টু… একই তো হলো মমিসিং! ”
আরমানের এখন নিজের কপালে নিজেই মারতে ইচ্ছে করছে। এই ছেলেকে সে বলছে এক। আর এই পটল টা বলছে আর এক। আরমান বোঝানোর মতো করে বলে
_” দু’টু এক হবে না। ময়মনসিংহ হবে!ময়..মন..সিংহ! ”
___” হ্যাঁ বোঝেছি তো কানের কাছে এমন করার কী আছে? “বিরক্ত হয়ে জােহান বলে।
__” বোঝে থাকলে বলো এবার ময়মনসিংহ? ”
___” হ্যাঁ…হ্যাঁ বলছি! বলছি! মমিসিং।”
___ ” শালা পটলের বাচচ্চ্চ্চ্চ্চ্চা! “রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে আরমান।
ঠিক সেই সময় জিনিয়ার চোখের পাতা আস্তে কাঁপতে শুরু করল। জারা বিচলিত কন্ঠে বলে ___” আম্মু দেখো জিনিয়ার আপুর জ্ঞান ফিরছে!”
সবাই দম বন্ধ করে তাকিয়ে রইল জিনিয়ার দিকে। ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফিরছে। চোখ খুলতেই সে চারপাশের মানুষের মুখ দেখতে লাগল।
___” মা ‘এখন শরীর কেমন লাগছে? “বললেন মারজিয়া বেগম। জিনিয়া মাথা নাড়িয়ে বোঝায় ভালো।
কিন্তু জিনিয়ার যখন রোহানের দিকে চোখ যেতেই হঠাৎ সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। রোহানের বুকটা হুহু করে উঠল।
___” আপু তোমার এখন কেমন লাগছে?” বললো মিম আর ফিহা।
মারজিয়া বেগম সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। মেয়ের জন্য কিছু একটা করতে হবে। রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেলেন সুপ বানাতে।
রুমে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা নেমে এলো। জাহেদ টের পেল—এই পরিস্থিতি থেকে জিনিয়াকে আলাদা রোহানের সাথে কথা বলতে দিতে হবে। সবার সামনে কিছু বলা যাবে না। তাই গলা খাঁকারি দিয়ে বলল—
— চলো, আমরা সবাই একটু বাইরে যাই। ওকে বিশ্রাম নিতে দিই।
সে ফিহার দিকে তাকিয়ে হালকা ইশারা করল—ঘরের বাইরে চলে আসতে। বাকিরাও আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় মিমের সাথে রাশেদের ধাক্কা লাগে। মিমের শরীর টা কেঁপে ওঠে। রাশেদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে নিজের মতো করে চলে যায়। মিম রাশেদের চলে যাওয়া দেখছে পিছনে দাড়িয়ে।
সবাই যখন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে গেল। আরমান, হঠাৎই জারার দিকে ঝুঁকে টুপ করে এক চুমু খেয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে জারার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে এক ঝলক চারপাশে তাকিয়ে দেখল—কেউ বুঝি দেখে ফেলল না?
কিন্তু নিয়তি দুষ্টুমি করতেই হয়। এই দৃশ্যটা চোখে পড়ে গেল ছোট্ট জোহানের। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে যেনো বিস্ফোরিত হলো।
“এই লোকটা আমার বনুকে কেনো চুমু খাচ্ছে?”—ছোট্ট মনের ভেতর প্রশ্নটা ঝড় তুলল।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৮
জারা তড়িঘড়ি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁট কামড়ে নিচ্ছে। মনে হচ্ছে লজ্জার আগুনে পুড়ে যাচ্ছে ভেতরটা। কিন্তু একইসাথে কোথাও একটুকরো অদ্ভুত সুখও খেলে যাচ্ছে তার চোখেমুখে।
আরমানের ঠোঁটে হালকা হাসি। যেনো সে বুঝে ফেলেছে—কেউ না কেউ হয়তো দেখে ফেলেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা নিয়েও তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ ওর শাশুড়ী আম্মা না দেখলেই হলো!
রুমের ভেতরে বাতাস ঘন হয়ে এল, যেনো সবাই বের হয়ে গেলেও কিছু গোপন কথা থেকে গেল দেয়ালে।
সবাই চলে যেতেই রোহান ধীরে পায়ে এগিয়ে আসে জিনিয়ার কাছে।
