Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫০

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫০

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫০
সোহানা ইসলাম

সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাস জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছে। চারপাশে কেমন এক অচেনা নিরবতা ছড়িয়ে পড়েছে। দূরে কোথাও মাগরিবের আজান ধ্বনি মিশে যাচ্ছে কাকের ডাকের সঙ্গে। আকাশে অর্ধেক আলো–অর্ধেক আঁধার, যেন দিনের শেষ আলোটা ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অথচ রাত ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
জারাদের বাড়ির ভেতরে নিস্তব্ধতা আরও গভীর। সবার ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা জমে আছে, কিন্তু মুখে কেউ কিছু বলছে না। এই অদ্ভুত পরিবেশে জিনিয়া একা শুয়ে আছে বিছানায়। চোখ ভিজে আছে কান্নায়, ঠোঁট কাঁপছে। তার বুকের ভেতর বারবার তোলপাড় হচ্ছে, অথচ কোনো শব্দ নেই।
দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে রোহান। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে অপরাধবোধের দাগ। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে জিনিয়ার পায়ের কাছে বসল। হাত কাঁপছে, তবুও আলতো করে স্পর্শ করল জিনিয়ার পা।
স্পর্শ পাওয়ার সাথে সাথেই জিনিয়া চমকে উঠল। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু এবার সে পা সরিয়ে নিল দ্রুত। না তাকিয়েই বুঝে ফেলল—এটা রোহানের স্পর্শ।রোহান নিচু গলায় ডাকল, যেন কোনো অপরাধী ক্ষমা চাইছে—

—“চাঁদ সুন্দরী…”
এই ডাক শোনামাত্রই জিনিয়া হঠাৎ ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। গলার স্বর ভেঙে গেল। বুকের সব জমে থাকা কষ্ট হুহু করে বের হতে লাগল।
রোহান তড়িঘড়ি করে উঠে গেল তার মাথার কাছে। দু’হাতে তাকে উঠাতে চাইল।
—“জিনিয়া, উঠো… কেঁদো না।”
কিন্তু জিনিয়া তীব্র প্রতিবাদে রোহানের হাত সরিয়ে দিল। গলা ভাঙা, তবু কষ্টে ভারী কণ্ঠে বলল—
—“না! আমাকে ছুঁবেন না। আমার নোংরা শরীরে আপনার পবিত্র হাতে স্পর্শ করবে না।”
এই কথাটা শুনে রোহানের বুকটা হুহু করে উঠল। যেন ভেতরে আগুন লেগে গেল। সে আবারও জিনিয়াকে আগলে নিতে চাইলো, কিন্তু জিনিয়া বারবার হাত সরিয়ে দিল।
চোখে পানি ভরা, ঠোঁটে কাঁপা কাঁপা শব্দ—
—“আমাকে কেন ভালোবাসলেন না রোহান ভাই? আমি ধর্ষিতা জেনে যাওয়ার পর আমার প্রতি আপনার সব ভালোবাসা কি নিমিষে শেষ হয়ে গেছে? আমার মুখ কি আপনাকে আর দেখার মতো রইল না?”
কথাগুলো ছুরি হয়ে বিঁধল রোহানের মনে। সে মুহূর্তের জন্য দম বন্ধ হয়ে গেল, তারপর হঠাৎই জিনিয়ার গালে এক চড় বসিয়ে দিল—

—“ঠাসসসসস!”
কথার মতোই আঘাত গায়ে বাজল। জিনিয়া কেঁপে উঠল। চোখ বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে।
রোহান দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
—“আর একবার এসব কথা মুখে আনলে সরাসরি মেরে কবরে পাঠাব তোমাকে! বুঝেছো?”
জিনিয়া আবারও ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দ যেন পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। অথচ রোহানের চোখে তখন অগ্নি–ঝড়, আবার ভালোবাসার বেদনা। সে জিনিয়াকে জোর করে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল।
—“তুমি আমার। তুমি শুধু আমারই থাকবে।তুমি আমার পবিএ ফুল।যে ফুলের ভোমর শুধু মাএ আমি ।”
জিনিয়া রোহানের বুকের ভেতর মাথা গুঁজে দিলেও কান্না থামল না। ভাঙা কণ্ঠে বারবার অভিযোগ করে উঠল—

—“তাহলে কেন অন্য কাউকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন রোহান ভাই? আমি সহ্য করতে পারছি না। বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে বারবার। আপনি আমার কাছে কেন এভাবে নিষ্ঠুর হচ্ছেন? ”
রোহান শক্ত হাতে তাকে আঁকড়ে ধরল। গলার স্বর এবার শান্ত, কিন্তু ভেতরে আগুনে ভরা দৃঢ়তা—“চাঁদ সুন্দরী, আমি অন্য কাউকে কখনো বিয়ে করব না। তুমি ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না।আমার সঙ্গে বিয়ে হবে তোমার। করব না বিয়ে অন্য কাউকে। ”
জিনিয়া চোখ মুছতে মুছতে আবার ফুপিয়ে উঠল—
—“না, আমি বিশ্বাস করি না। আপনি অন্য কাউকে বিয়ে করে নিবেন। সেই খুশিতে মিষ্টিও নিয়ে এসেছেন। এখন কেনো মিথ্যা আশা দিচ্ছেন বলুন?”
রোহান এবার একটু ধমক দিল—
—“চুপ করো! আমার মুখ থেকে কথা শোনার পরেও সন্দেহ করবে? তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে বিশ্বাস করতে হবে।”
কথাগুলো যেন গুঁড়িয়ে দিল জিনিয়ার অন্তর। সে হাহাকার করে কেঁদে উঠল—

—“তাহলে এতদিন আমার কষ্ট বুঝলেন না কেন?তাহলে কেনো কাল ওই ভাবে চলে গেলেন আমায় একা রেখে। ওই…ওইদিনও সব কিছু জানার পর আমাকে একা করে রেখে গেছেন। আমি কী সসত্যি আপনার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নই।”
রোহান তার মুখ দু’হাতে তুলে ধরল। চোখে চোখ রেখে বলল—
—“শোনো জিনিয়া, পৃথিবী যদি তোমাকে হাজারবার নোংরা বলে, তবু আমার চোখে তুমি পবিত্র। তুমি ধর্ষিত হওনি, তুমি ভিকটিম। আর আমি তোমাকে কোনোদিনও ছেড়ে যাব না। তুমি ছাড়া আমার জীবন নেই।খুব ভালোবাসি তোমায় চাঁদ সুন্দরী ।”
জিনিয়া কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরে জমে থাকা বরফ যেন ধীরে ধীরে গলতে শুরু করল। তবু কান্নার শব্দ থামল না।
সে হাহাকার করে বলল—

—“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রোহান ভাই। প্রতিদিন বুকের ভেতর আগুন জ্বলে। মনে হয়, আমি আপনার থেকে চিরকালের জন্য দূরে হয়ে যাচ্ছি।”
রোহান শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল। কণ্ঠে একরাশ দৃঢ়তা—
—“না, তুমি কখনো দূরে যাবে না। আমি যদি মরেও যাই, তোমাকে ছাড়ব না। তোমার হাত ধরে আমি বাকি জীবন কাটাতে চাই। তুমি শুধু আমার সাথে, আমার পাশে থেকো যেও। আমি তোমায় আমার বুকে যত্ন করে আগলে রাখবো ।”
জিনিয়া চোখ মুছতে মুছতে মাথা রাখল রোহানের বুকে। অশ্রু ভিজিয়ে দিল তার শার্ট।
রোহান আলতো করে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
—“কাঁদো না চাঁদ সুন্দরী। আমি আছি সোনা। ”
ঘরে তখন সন্ধ্যার আলো আরও ফিকে হয়ে আসছে। বাইরের বাতাসে শীতলতা, অথচ ভেতরে এক তীব্র উষ্ণতা। কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে, জায়গা নিচ্ছে নিঃশব্দ বিশ্বাস।
রোহান জিনিয়ার কানে কানে আবার বলল—

—“তোমার বাবা আমাকে বলেছে,আমি যেনো তোমার আশেপাশেও না আসি। তিনি কী জানেন তার মেয়ে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে?”
জিনিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে কান্না করতে করতে বলে __” আব্বু যা খুশি বলুক! আপনি প্লিজ আমায় ছেড়ে যাবেন না! মরে যাবো আমি?”
রোহান জোর করে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। কান্নায় ভেজা মেয়েটি অবশেষে শান্ত হলো।
____” এতো ভালোবাসা আমি কোথায় রাখি বলো, জান? চলো বিয়ে করে ফেলি! তারপর আমার হিটলার শশুড় কে একটা ফুটফুটে নাতি উপহার দিবো? ”
জিনিয়া লজ্জায় লাল হয়ে যায়। রোহানের বুকে নিজেকে ও গুটিয়ে নেয়। এই মানুষ টা তাকে এতো ভালোবাসে কেন আল্লাহ? আমি তো কখনো কল্পনা ও করতে পারিনি এতো সুখ আমি পাবো?
রোহান জিনিয়ার কপালে চুমু খায়। গালে নিজের দু-হাত দিয়ে ভালোবাসার পরশ এঁকে বলে

___’ অপেক্ষা করো আমি এক্ষুনি আসছি! ”
রাতের নীরবতা ভেঙে আচমকা রোহানের কণ্ঠস্বর ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনিত হলো।
— “এই আরমান…!”চিৎকার করছে রোহান।
ঘর ভরে উঠল তার ডাকাডাকিতে। যেন নিজের বাড়ি টা। আশেপাশে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই সময়ে এত চেঁচামেচি কেন করছে রোহান?
আরমান রাগে চোখ বড় বড় করে তাকাল তার দিকে। তার দৃষ্টি যেন তীক্ষ্ণ ছুরির মতো। চুপচাপ থাকতে পারল না, দাঁত চেপে বলল—
— “চেঁচাবি না! অন্যের বাড়ি এটা।”
কিন্তু রোহান থামার পাত্র নয়। তার চোখে রাগ আর অস্থিরতা। দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ বলে উঠল—
— “আমার কিডনি ফেরত দে! আমি বিয়ে করব।”
ঘর মুহূর্তে থমকে গেল। সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। মারজিয়া বেগম ভাবেন কিডনির সঙ্গে আবার বিয়ের সম্পর্ক কী?
আরমান ঠান্ডা কণ্ঠে উত্তর দিল—

— “যতোদিন না এই গাধার মতো আচরণ বন্ধ করবি, ততোদিন কিডনি পাবি না।”তার কণ্ঠে রাগ আর ব্যঙ্গ দুটোই মিশে ছিল।
__” আরে ভাই, আমার কিডনি আমাকে দিবি না?
__” দিব না কখন বলেছি?”
__” তাহলে দে! আমার বউ একটা কিডনি ছাড়া জামাই পাবে এটা আমি চাই না! তাড়াতাড়ি ফেরত দে! ”
রাশেদ আর জাহেদ ও বলে
___” আমাদের টাও লাগবে কিন্তু! রোহান ভাইয়াকে একা দিলে হবে না! ”
রোহান অসহায় ফেইস নিয়ে আরমান কে বলে
__” ভাই, তুই কী করে পারলি আমাদের কিডনি গুলো ওকে দিয়ে দিতে? এগুলো ছাড়া ও তো অন্য কিছু দেওয়া যেতো বল? ”
___” বেশি কথা বললে কিডনি খুলে নগদ টা দিয়ে দিব। কোনো বাকি রাখবো না! মরে গেলে আমাকে দোষ দিবি না। ” বলে আরমান
তিন জন ভোঁতা মুখে তাকিয়ে আছে আরমানের দিকে। কী নিষ্ঠুর মানব।

__” আমাদের কিডনি আর আমাদেরই মেউ। ” বললো রাশেদ।
কথাগুলো মিম আর ফিহা বুঝল।হাসিও পাচ্ছে তাদের । জারাও বুঝে ফেলল। তার বুকটা কেঁপে উঠল। মাথা নিচু করে ফেলল লজ্জায়। মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা—যে রাতের পর তার জীবন বদলে গিয়েছিল। যেভাবে হুট করেই তাকে বিয়ে করেছিল আরমান। সেই স্মৃতি যেন হাড়ভাঙা ব্যথার মতো বুকের ভেতর বেজে উঠল।
মারজিয়া বেগম প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রোহানের দিকে। চোখের কোণায় বিস্ময়।
— “কিডনি আর বিয়ের মধ্যে সম্পর্কটা কী?”
মারজিয়া বেগম এর কথা শুনে চুপসে গেলো সবার মুখ। জাহেদ তৎক্ষণাৎ কথা ঘুরিয়ে নিল। হাসিমুখে অফিসিয়াল ডিল, পারিবারিক আলোচনা—এসব ব্যাখ্যা দিতে লাগল, যেন বিষয়টা খুবই সাধারণ কিছু। পরিবেশটা ঠান্ডা করার চেষ্টা করল সে।
মারজিয়া বেগম আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। হাতে সুপের বাটি নিয়ে সরাসরি জিনিয়ার ঘরের দিকে রওনা হলেন।
মিম, ফিহা আর জারাও ধীরে ধীরে চলে গেল মায়ের পেছন পেছন। তাদের চোখেমুখে কৌতূহল, আবার অস্বস্তিও। জাহেদ ফিহাকে ইশারা করে ওর সাথে থাকতে, কিন্তু ফিহা মুখ বাকিয়ে চলে যায়। আরমান চুপচাপ বসে আছে। না জারা’র দিকে তাকাচ্ছে, আর না কোনো কথা বলছে বেশি।
ড্রইং রুমে তখন এক অদ্ভুত পরিবেশ। জোহান চুপচাপ বসে আছে আরমানের কোলে। আরমান তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে, যেন কাউকে কেড়ে নিতে দেবে না। শাস্তি দিবে এই পটলকে। জোহানের চোখে এক ধরনের ভয়ার্ত দৃষ্টি। যেন সেও সব বুঝতে পারছে, অথচ ভাষায় বলতে পারছে না।
রোহান হঠাৎ ধপাস করে আরমানের পাশে বসে পড়ল। তার মুখে গাম্ভীর্য নেই, বরং একধরনের শিশুসুলভ একগুঁয়েমি।

— “বিয়ে করব আমি।”রোহানের কণ্ঠে জেদ, চোখে অবাধ্যতা।
জাহেদ একটু সামনে ঝুঁকে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল—
— “তোমার আর জিনিয়ার মধ্যে সব কিছু ঠিক হয়েছে?”
রোহান কৌতুক ভরা কণ্ঠে উত্তর দিল—
— “আরে শালাবাবু, ঠিক মানে? তোমার বোন তো আমায় ছাড়তে চাইছিলই না। আমি-ই জোর করে পালিয়ে এসেছি।”
ঘরের ভেতর হালকা হাহাকার ছড়িয়ে গেল। রোহানের কথা শুনে আরমান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক চাপর বসিয়ে দিল রোহানের মাথায়।
— “চুপ কর গাধা!”
রোহান কষ্ট পেল না। বরং হেসে উঠল শিশুর মতো। আর তখন জোহান একদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ছোট্ট গলায় হঠাৎ সে-ও বলে উঠল
— “ তুমিও ওকে শালাবাবু বলছো কেন?!”
__” শালাবাবু হয় , তো কি বলবে? বললো আরমান
__” তাহলে তুমি আমাকে এই নামে ডাকো কেন?”
__” কারণ এই পটল টা আমার নাদান শালাবাবু হয়, তাই!” জোহানের পেটে সুরসুরি দিয়ে বলে আরমান।
___” তুমি মেয়েদের মতো আমাকে চেপে ধরে আছো কেন? ছাড়ো আমাকে, আমি কিউটি গার্লের কাছে যাব! ”
রোহান তড়াত করে বলে উঠে

__” মীরজাফর তুমি একদম আমার চাঁদ সুন্দরীর কাছে যাবে না! ”
কিন্তু জোহান আরমানের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে এক দৌড়ে চলে যায় জিনিয়ার কাছে। তাকে আর পায় কে?
__” তুমি একটা হিংসুটে ভাইয়া! “ঘরের ভিতরে দৌড়াতে দৌড়াতে বলে জোহান।
ঘরে হালকা হাসির ঢেউ বয়ে গেল। তবে কেউ স্পষ্ট করে হাসল না, শুধু ঠোঁটের কোণে একচিলতে বাঁকা রেখা এঁকে উঠল।
রাশেদ তখনো নিজের জগতে ব্যস্ত। মোবাইল হাতে নিয়ে ব্লগ লিস্টে আঙুল চালাচ্ছে। অন্যের সব নাটক যেন তার জীবনে কোনো মূল্যই রাখে না। কিন্তু তার ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
সে মনে মনে ভাবছে—আজ তার চোখের সামনে আরও একটা সম্পর্কে পূর্ণতা দেখতে পেল। ভালোবাসা, ঝগড়া, অভিমান—সব মিলিয়ে সম্পর্কের আসল রূপ। আর তার মনে পড়ে গেল সেই মানুষটার কথা, যে একসময় তার পৃথিবী ছিল।
হাত কাঁপছে, চোখ কেঁপে উঠছে।ব্লক লিস্টে নিজের আঙ্গুল গুরাচ্ছে সে।কাঙ্ক্ষিত মানুষটার ব্লক খুলে কী একটা মেসেজ লিখবে ভেবেও আবার থেমে গেল। মনে পড়ল, সেই মানুষটা তাকে ঠকিয়েছিল। খেলেছিল তার অনুভূতি নিয়ে। “বেইমান”—এই শব্দটিই ঘুরপাক খেতে লাগল রাশেদের মনে।
সে আর লিখল না। মোবাইলটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করে গভীর নিশ্বাস নিল। তার চারপাশে যত হৈচৈ, তার ভেতরে তত নীরবতা।

রাত আটটা বাজে। সারাদিনের ক্লান্তি আর উত্তেজনার পর জারাদের বাড়িতে যেন এক অদ্ভুত টানটান পরিবেশ বিরাজ করছে। আরমান বলেছে জিনিয়াকে নিয়ে চলে যাবে—এমনটা সবাই জানে। কিন্তু মারজিয়া বেগম চুপচাপ একথা জানিয়ে দিয়েছেন, “এই শরীর নিয়ে আমি মেয়েকে পাঠাব না। আগে সুস্থ হোক, তারপর নিয়ে যেও তোমাদের বোন।”
এ কথা বলার পর থেকে পুরো বাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা। শুধু রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে হাঁড়ির ঢাকনার শব্দ, থালা-বাসনের ঝনঝনানি।
এদিকে ডাইনিং টেবিলে বসেছে সবাই। টেবিলে সাজানো ধোঁয়া ওঠা ভাত, নানান রকম ভর্তা, মাছের তরকারি, মুরগি, —সব মিলিয়ে জমজমাট আয়োজন। ফিহা আর মিম দুজন মিলে মারজিয়া বেগমকে হাতে হাতে সাহায্য করছে। কে কোন বাটি বাড়াবে, কার পাতে কী তুলে দেবে—সব কিছুতেই তারা ব্যস্ত।
কেবল জারা দাঁড়িয়ে আছে দূরে, এক কোণে। টেবিলের কাছে আসছে না। মুখে একরকম দ্বিধার ছায়া।
আরমান টেবিলে বসে থেকেই চোখে চোখে খুঁজে ফিরছিল তাকে। অবশেষে জারাকে দেখে হালকা ইশারা করল, যেন কাছে এসে তাকে বেরে খায়ওয়ায়। কিন্তু জারা একটুও নড়ল না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আরমানের বুকটা হু-হু করে উঠল। ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড অভিমান জমে উঠল জারার উপর। “তুমি একবার আসতে পারতে… একবার পাশে দাড়াতে পারতে মানজারা …”—মনে মনে বলতে লাগল সে।
আরমানের ঠিকমতো খাওয়া আর হলো না। দুই-এক কণা ভাত মুখে তুলে চুপচাপ উঠে পড়ল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট অভিমান।
রোহান তখনও খেতে ব্যস্ত। জাহেদ একেক সময় উচ্ছ্বাস ভরা গলায় বলছে—

— “ও আন্টি গো, কি মজা হয়েছে ভর্তাগুলো ! আরেকটু ভাত দাও আমাকে।”
ফিহা আবার হাসতে হাসতে জাহেদের পাতে একটু এঁটে দিচ্ছে। মজার ছলে কখনও তরকারি বাড়ছে, কখনও মাছের টুকরো তুলে দিচ্ছে। টেবিলের পরিবেশে কোথাও হালকা হাসি, কোথাও আবার ভারী নীরবতা।
আরমান খাওয়ার সময় জোহানকে বারবার খুঁচিয়ে মজা করছে। কখনও আদর করছে, কখনও টুকটাক বকছে। জোহানও একেকবার খিলখিল করে হেসে উঠছে। তার হাসি শুনে টেবিলের গুমোট ভাব একটু হালকা হলেও আরমানের ভেতরের রাগ আর অভিমান কমছে না।
খাওয়া শেষে ধীরে ধীরে সবাই চুপচাপ বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর রোহান উঠে দাঁড়ায়। বের হওয়ার আগে সে জিনিয়ার ঘরে ঢুকে একবার দেখা করে আসে। জিনিয়া ঠোটের কোণে হাসি নিয়ে তাকায় তার দিকে। রোহান মুচকি হেসে বলে,

— “তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও। আমি কাল আবার আসব জান ।”
জিনিয়া কোনো উত্তর দেয় না। শুধু লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নেয় বালিশের দিকে।রোহান চলে যাওয়ার সময় জিনিয়া পিছু ডাকে।
___” শুনুন! ”
রোহান হাসি মুখে পিছন ফিরে তাকায় তার চাঁদ সুন্দরীর দিকে।
___” হেপি বার্থডে! ”
রোহানের হৃদয়ে ঠান্ডা বাতাস ভয়ে যায়। ছুট্টে এসে জিনিয়াকে জড়িয়ে ধরে গালে টুপ করে চুমু বসিয়ে দেয়।
এদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে আরমান রোহান কে ডাকছে তাড়াতাড়ি আসার জন্য। দরজার সামনে দাড়িয়ে ছিল জারা। তার চোখ তখন কেবল আরমানকে খুঁজে ফিরছে। কিন্তু আরমান একবারও জারার দিকে তাকাল না। মাথা নিচু করে চুপচাপ বের হয়ে গেল, কিছু না বলে।
জারার বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল—আরমান তার উপর ভয়ানক রেগে আছে। কিছু বলতে চেয়েও গলা থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল দরজার দিকে, যতক্ষণ না আরমান দূরে চলে গেল।
মাঝ রাস্তায় এসে মনে পরে রোহান তার মোবাইলটা রেখে এসেছে। রাশেদ এসে মোবাইলটা টিভির পাশে চার্জে বসানো মোবাইল টা নিয়ে যায় তাড়াহুড়ো করে। ব্যাটারিতে চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল। সব কিছু ফেলে রেখে হুটহাট তাড়াহুড়ো করে চার্জ থেকে মোবাইল তুলে নিল। একবার কারও দিকে তাকাল না। চুপচাপ দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

রাত দশটা। মিম ওর মোবাইল পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজছে। তার মনে আছে সে টিভির কাছে মোবাইল টা চার্জ বসিয়ে ছিলো। কিন্তু এখন পাচ্ছে না। ফিহা আর জারাও ওর সাথে খুঁজছে। ওদের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ। হুট করে মোবাইল টা কোথায় চলে গেলো?
__” মিম তুই ভালো করে মনে করে দেখ, কোথায় রেখেছিলি?” বললো ফিহা
__” তোমরা আরও ভালো করে খুঁজে দেখো, পেয়ে যাবে। এই টুকু সময়ে মোবাইল টা কোথায় চলে যাবে? ” বললেন মারজিয়া বেগম।
জোহান বসে আছে জিনিয়ার কাছে। জোহান আমের আচার ভাটিতে করে নিয়ে এসে জিনিয়া কে দেয়। ভাব করছে ওর সাথে। যদি ওকে ভালোবেসে টুপ করে দুই এক টা চুমু খায়? ইসস কী লজ্জা। জোহানের খুব পছন্দ জিনিয়াকে। ওর মতো সুন্দর, ওর নামের সাথে ও নাম মিলো। ওদের দুইজনের কতো মিল।
__” ও কিউটি গার্ল তোমার মোবাইল টা কোথায় গো? “বলল জোহান
জিনিয়া আচার খেতে খেতে বলে

___” ড্রেসিং টেবিল এর উপরে আছে ভাই! ”
জোহান বিছানা ছেড়ে মোবাইল টা নিতে নিতে বলে
__” আমাকে ভাই বলবে না কিউটি! আমি কিন্তু তোমাকে পছন্দ করি! ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৯

জিনিয়া হাসলো ওর কথায়। কি পাকা ছেলে ভাবা যায়? জোহান মাএ মোবাইল নিয়ে জিনিয়ার পাশে এসে বসে। এর মাঝেই ওর মোবাইল টা বেজে ওঠে। বড় বড় অক্ষর দিয়ে লেখা রোহান ভাই! ভিডিও কল করেছে সে। জিনিয়ার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। জিনিয়া কোনো দ্বিধা ছাড়াই কলটা রিসিভ করে। মুখের সামনে মোবাইল টা ধরতেই জোহান বলে
___” ও..হিংসুটে ভাইয়া! দেখো আমি কিউটি গার্ল এর পাশে বসে আছি। ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here