রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৪ (২)
সোহানা ইসলাম
বিকেল তিনটা। রোদটা তখন আর তেমন গরম নেই, নরম একটা আলো শহরের গায়ে লেগে আছে। আরমান হাঁটছে এদিক–ওদিক, চোখে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে বারবার। তিনটা পেরিয়ে গেছে, অথচ এখনো জারার কোনো খবর নেই।
মেসেজ দিয়েছে, “বউ, বের হয়েছো?”
রিপ্লাই আসে না। আরমান নিজের ফোনটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে, তারপর নিজের মনে বলে—
“এই মেয়েটা সময়ের কোনো দাম বোঝে না!”
এদিকে জারা তখন নিজের ঘরে ছোটখাটো “অপারেশন” চালাচ্ছে। ভিডিও কলে ফিহার সাথে কথা বলছে। ফিহা বিছানায় বসে চোখ বড় বড় করে দেখছে—
__“তুই কি সত্যিই যাচ্ছিস জানু?”
জারা গম্ভীর মুখে বলে,
__“হ্যাঁ, যাচ্ছি। কিন্তু তুই আমাকে সাহায্য করবি!”
ফিহা অবাক হয়ে বলে,
__” আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”
__” তুই আম্মু কে কল করে আমাকে বাড়ি থেকে বের করার ব্যবস্থা কর। আমি ওনাকে বলে
জাহেদ ভাইয়ার ময়মনসিংহ যাওয়া আটকে দিব।”
ফিহা ভ্রু কুঁচকে বলে,
___“সত্যি ?”
__” হুম! ”
ফিহা দুষ্টু হেসে বলে,
__“ আচ্ছা ডিল পাক্কা !”
জারা হাঁফ ছেড়ে বলপ
__“আচ্ছা, ঠিক আছে। তুই তাহলে আম্মুর সাথে কথা বল।” এই বলে কল কেটে দিয়ে জারা রেডি হতে থাকে। জারা যানে ফিহা বা মিম কল করলে, মারজিয়া বেগম না করবেন না।
ফিহা মারজিয়া বেগমকে কল দিয়ে বলে,
__“আন্টি, আমাদের তো আগামী সপ্তাহে পরীক্ষা আছে। তাই জারা’কে নিয়ে এক বান্ধবীর বাড়িতে নোটস নিতে যাবো , একটু যেতে দিবে?”
মারজিয়া বেগম প্রথমে একটু গম্ভীর হলেও পরে বলে,
__“যাও, কিন্তু বেশি সময় বাইরে থাকবে না।”
ফিহা আচ্ছা আন্টি বলে কল কেটে দেয়। তারপর কল করে জারা’কে। ফোন ধরতেই ফিহা হেসে বলে,
__“তোর জন্য একটা বিপদে পড়বো আমি।”
__” আম্মু রাজি হয়েছে? ”
__” হুম! ”
জারা কল কেটে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে কালো বোরকা পরে, হিজাব গুছিয়ে নেয়।আয়নায় তাকিয়ে নিজের দিকে মৃদু হাসে। সুন্দর লাগছে তাকে। এখন বোরকা পরে বের না হলে আম্মু সন্দেহ করতে পারে। তাই বোরকাই পরেছে।
গেটের সামনে আসতেই জোহান দাঁড়িয়ে আছে হাতে চিপস নিয়ে। জোহান চোখ কুঁচকে বলে,
__“এই শুনো, আমার জন্য চকলেট না আনলে আম্মুকে সব বলে দিবো!”
জারা বিরক্ত মুখে বলে,
__“চুপ কর মীরজাফর! অনেক কথা বলিস তুই।”
জোহান হেসে বলে,
__“আম্মুকে এখনই বলে দেই তাহলে ?”
জারা হালকা রেগে গিয়ে জোহানের মাথায় হালকা চাপড় দেয়।তারপর একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে দিয়ে বলে —
__“এই নে! এখন শান্ত?”
জোহান খিলখিলিয়ে হাসে,
__“ঠিক আছে, চকলেট আনবে কিন্তু!”
জারা মাথা নাড়িয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে।
মেইন রোডে এসে দাঁড়াতেই হাওয়ার ঝাপটা লাগে বোরকার ঘেরায়। দূর থেকে কালো বাইক, কালো জ্যাকেট, আর কালো সানগ্লাস পরা একটা ছেলে।
আরমান—দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মুখে গম্ভীর ভাব।
জারা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায়। একে বারে আরমানের সাথে ঘেষে দাড়ায়। আরমান তখন চোখ না তুলে বলে ওঠে,
__“সিস্টার, একটু ডিসট্যান্স মেনটেইন করেন।
আমার বউ আছে, এমন ঘেঁষে দাঁড়াবেন না।”
জারা স্তব্ধ! চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে আরমানের দিকে। বোঝলো আরমান তাকে চিনতে পারে নি। তাই একটু মজা নিবে ভাবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ।
মানজারা আরমানের দিকে আরও ঘেঁষে দাঁড়ায়।আর আরমান দূরে সরে দাড়ায়।মানজারা আরও এগিয়ে একেবারে আরমানের গায়ে ঠলে পরে। আরমান বিরক্ত হয়ে বাইকের কাছ থেকে সরে এসে দূরে দাঁড়ায়। আরমানের কান্ড দেখে জারা নিকাবের নিচে হেসে কুটিকুটি। হাসি চেপে রেখে আবার গিয়ে আরমানের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়।
এমন গায়ে পরা মেয়ের প্রতি আরমানের বহুত রাগ হচ্ছে। এখন যদি ওর লক্ষী বউ চলে আসে। এসব দেখলে ভুল বোঝতে পারে। মেয়ে টাকে কিছু না বলে আবার দূরে সরে দাড়ায়।জারা ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে আবার যায় আরমানের পিছনে। এবার আরমান সহ্য করতে না পেরে ঠাসস! করে চড় বসিয়ে দিয়ে বলে
__” নির্লজ্জ মেয়ে মানুষ! বললাম না আমার বউ আছে। তারপর ও এমন ঘেঁষে ঘেঁষি করছিস কেনো?”
জারা গালে হাত দিয়ে ছলছল চোখে তাকায়। তারপর মুখের নিকাব আলতো করে তুলে ফেলে। কাদোঁ কাদোঁ মুখ নিয়ে বলে,
__“আমি আপনার বউ—পর নারী না!”
আরমানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, চোখে বিস্ময়, মুখে হাসি ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে।
___“ বউ! আমি তো একদম চিনতেই পারিনি!
বোরকায় তুমি অন্য করম লাগছে, একদম আমার লক্ষী বউয়ের মতো।”
জারা হালকা ভ্রু তুলে বলে,
__” চড়’টা কিন্তু অনেক জোরে লেগেছে? ”
আরমান জারাকে গালে হাত দিয়ে আদর করতে করতে বলে
__” সরি, সোনা! আমি চিনতে পারি’নি ”
জারা গাল ফুলিয়ে বলে
__“চলুন, সময় নষ্ট করবেন না।”
আরমান হাসতে হাসতে হেলমেট হাতে নেয়,
__“বউ, হেলমেট পর। কালো বোরকা আর কালো হেলমেট,দারুণ লাগবে তোমায়!”
বাইকটা স্টার্ট হয়, গর্জে ওঠে ইঞ্জিন। নরসিংদীর ভেতর দিয়ে ঘুরে যায় দুইজন,রাস্তার পাশে সারি সারি নারকেল গাছ, বাতাসে ধানের গন্ধ। আকাশে রোদ নরম হয়ে আসছে।
বিকেলে চারটার পর। বড় মাঠের বাড়ির বারান্দায় বসে আছে তিনজন—জাহেদ, রোহান আর রাশেদ। জিনিয়া রুমে ঘুমিয়ে আছে। রোহান ওকে বলেছে আজ ময়মনসিংহে যাবে না। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকতে। জিনিয়াও রোহানের কথা মতো ঘুমিয়ে আছে। চারদিকে হালকা সূর্যের আলো, দূরে পাখিদের ডাক। জাহের মুখে গভীর ভাব, চোখে চক্রান্তের ঝিলিক।
জাহেদ বলল, “দেখ ভাই, আজ যদি আমি ময়মনসিংহ চলে যাই, তাহলে ফিহার সাথে আর কখনো দেখা হবে না। এখন চলে গেলে বছরে ও আসতে দিবে না ভাইয়া।”
রোহান কপালে হাত রেখে হেসে বলল, “তাহলে এখন কি করবে ভাবচ্ছো?”
জাহেদ গম্ভীর কণ্ঠে বলে
__” ভাবচ্ছি কট খেয়ে বিয়ে করে নিব। তারপর বউ নিয়ে একবারে ময়মনসিংহে ফিরব।”
রাশেদ একটু অস্বস্তিতে পড়ে বলল
__ “এই প্ল্যানটা ঠিক ভালো লাগছে না স্যার। এসব করলে পরে ঝামেলা হবে।”
রোহান হেসে রাশেদের কাঁধে হাত রাখল
__“তুই বুঝবি না, এটা প্রেমের জ্বালা ! একই টুকু অ্যাডভেঞ্চার ছাড়া প্রেম টেকে না।”
জাহেদ গম্ভীর গলায় বলল
__“ আমি লোক ঠিক করে ফেলেছি। একটু টাকা খাওয়ালেই কাজ হবে।”
রাশেদ অবাক হয়ে বলল
__“লোক? মানে কেমন কাজ?”
রোহান চোখ টিপে বলল
___“এই দেখ—আজ রাতে জাহেদ ফিহার সাথে দেখা করতে যাবে। ফিহা এসবের কিছু যানে না,শুধু আমরা জানি। তখন লোকগুলো ওদের ধরে ফেলবে, কট দিয়ে বিয়েটা সেরে ফেলবে!”
রাশেদ চমকে উঠল
___“পাগল নাকি! এভাবে কেউ বিয়ে দেয়?”
রোহান হেসে বলল
__“ভাই, এই যুগে সব সম্ভব। বিয়ে হয়ে গেলে জাহেদ ফিহাকে নিয়ে বাসর সেরে তারপর ময়মনসিংহে যাবে ”
জাহেদ তাড়াতাড়ি মোবাইল বের করে কয়েকটা নাম্বারে কল দেয়।
___“হ্যাঁ, ভাই, ওই কাজটা আজ রাতেই হবে। ঠিক ১০:৩০ এ ও আসবে রাস্তার ওপাশে । টাকা হাতে পেয়ে যাবেন।”
ওপাশ থেকে নিশ্চিত উত্তর আসে। জাহেদ ফোন রেখে বলে
__ “সব সেট। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
রাশেদ মাথা নাড়ে
___ “তোমরা পাগল হয়ে গেছো। আমি এই প্ল্যানের মধ্যে নেই।”
রোহাম মুচকি হেসে বলে
__ “থাক তুই, আমরা সামলে নেবো।”
রাশেদ চিন্তিত কন্ঠে বলে
__“আরমান স্যার এসব যানতে পারলে ওদের বিয়ের গিফট হিসেবে,ফ্রীতে ‘ফর্সা ফিউচার প্যাকেজ দিয়ে দিবে!’”
সবাই হেসে ওঠে। ঠিক তখনই জাহেদ বসা থেকে উঠে দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়। মুখে হাসি, চোখে উজ্জ্বলতা।
___“ভাইরা, আমার জন্য দোয়া করো। আজ রাতে ফাইনাল খেলা হবে। মনে হচ্ছে আজ আমার জীবনে সবুজ বাতি জ্বলবে!”
রাশেদ গম্ভীর মুখে বলে
__ “সবুজ না, লাল বাতি জ্বলতে পারে!”
জাহেদ কিছু বলে না, হেসে বলে,
__ “তোমরা শুধু দোয়া করো। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।”
ওর পেছনে তাকিয়ে রোহান বলে,
___“ভরসা আল্লাহর, কিন্তু চালাকি আমাদের!”
তিনজনের হাসির শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়। রাশেদ চুপ করে বসে থাকে—মনে মনে ভাবে, এই প্ল্যান যদি উল্টে যায়, তাহলে কারোই মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না।
জারা ভয় পেয়ে আরমানের পিঠে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে।আরমান আরও জোরে বাইক চালায়। জারা ভয়ে আরমানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আরমান মৃদু হেসে বলে,
__“বউ, ভয় পাস না, আমি আছি!”
জারা চেঁচিয়ে বলে,
__“চুপ করুন! আমি ভয় পাচ্ছি।”
আরমান ধীরে চালিয়ে বাইক একপাশে সাইড করে। জারা’কে নিজের সামনে বসিয়ে বলে,
__“ভয় পাস না, আমার বুকে আশ্রয় আছে তো।”
জারা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়।আরমান হেসে বলে,
___“এই তো, এখন ঠিক লাগছে লক্ষী বউ!”
জারা মাথা নাড়ে, ঠিক লাগছে। জারা একে বারে আরমানের বুকে ছুট্টো বিড়াল ছানার মতো বসে আছে। আরমান জারাকে বলে কোথায় যাবে। জারা ড্রিম হলিডে পার্কে যাবে বলেছে।কিন্তু আরমান এসব চিনে না। মোবাইলে লোকেশন দেখে বাইকটা নিয়ে ওরা যায় নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কের কাছাকাছি একটা শান্ত জায়গায়।চারদিকে সবুজ, দূরে নদীর শব্দ।
আরমান বাইক থামিয়ে বলে,
__“এই জায়গায় আগে এসেছিলে বউ?”
জারা বলে,
__“এসেছি! যখন ছোট ছিলাম ?”
দুজন কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকে। হালকা বাতাসে জারার হিজাব নড়ে ওঠে। আরমান হঠাৎ বলে,
__“জান, আজ তোমায় দেখে মনে হচ্ছে কালো রঙটাই সবচেয়ে পবিত্র।”
আরমান বাইক চালাচ্ছে। বিকেল হলেও রোদ কমেনি। আরমান একেবারে ঘেমে গেছে। জারা একটু পর পর হাত বারিয়ে আরমানের মুঘের ঘাম মুছে দেয়। বোরকার হাতা দিয়ে। আরমান বিরক্ত হয় না বরং জারা’র কেয়ারিং দেখে আলতু করে হাসে।
কিছু দূর আসার পর জ্যামে আটকা পড়ে ওরা। জারা আরমানের সামনে থেকে মেনে আবার গিয়ে পিছনে বসে। আরমান শুধু জারা’র কান্ড দেখছে। তার বউ কেমন বাচ্চাদের মতো ছটপট করছে।
জারা বাইরের পিছনে বসে। ওর হিজাবের বেশি অংশ টেনে এনে আরমানের মাথায় দিয়ে দেয়। যাতে ওর গায়ে রোদ কম লাগে। জারা দেখে আরমান এতো রোদের মাঝে ঘেমে গেছে আর মুখটাও লাল হয়ে আছে। আরমান ওর হেলমেট জারাকে পরিয়ে দিয়েছে তাই ওর মাথা খালি।
ঝরঝেট হিজাব বলে বার বার আরমান মাথা থেকে পরে যায়। জারা এতো খুব বিরক্ত। বাইকের মিনরে জারা’র কার্য কলাপ দেখছে আরমান।
জারা বিরক্ত হয়ে বলে
__” স্বামীজান! ”
আরমান হেসে বলে
__” বলুন লক্ষী বউ! ”
জারা গাল ফুলিয়ে বলে
__” আপনার মাথায় হিজাবটা থাকছে না। বার বার পরে যায় শুধু। ”
__” আমাকে এতো কেয়ার করতে হবে না আপনার। পিছনে বসেছেন, একটু নিজের বোরকা সামলে রাখবেন ম্যাডাম! ”
এর মাঝে জ্যাম ছুটে যায়। আরমান জারাকে বলে তাকে ভালো করে ধরে বসতে। তারপর বাইক স্টার্ট দেয়।
রোদটা একটু নরম হয়েছে। বিকেলের আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে চারপাশ। হালকা বাতাসে গাছের ডাল দুলছে আর সেই বাতাসে জারার বোরকার ঘেরটা একটু উড়ছে। পুরো কালো পোশাকে জারাকে আজ অন্যরকম লাগছে—চুপচাপ, গম্ভীর, আবার একটু কিউটও।
আরমান বাইকটা এনে থামায় ড্রিম হলিডে পার্কে সামনে। পাশে জারা দাঁড়িয়ে, মাথায় কালো হেলমেটটা ।
আরমান বলল
__“দাও, আমি খুলে দেই।”
কোনো উত্তর না দিয়ে জারা মাথা একটু নিচু করল। আরমান হেলমেটটা তুলে নিয়ে আস্তে করে তার মাথা থেকে খুলে দিল। আঙুল ছুঁয়ে গেল জারার কপালের কাছে। মুহূর্তের জন্য ওদের চোখ দুটো আটকে গেল একে অপরের দিকে, কিন্তু জারা দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল। আরমান টিকিট কাউন্টারে গিয়ে দুইটা টিকিট কেটে আনে।
__“চলো, এবার ভিতরে যাই,” আরমান বলল।
জারা ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল
__” আচ্ছা। ”
আরমান জারা’র হাত ধরে ভিতরে চলে যায়। পার্কের ভেতরে ঢুকে জারা আহ্লাদী কন্ঠে বলে
__ “আমাকে একটা ছবি তুলে দিবেন?”
আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
___ “আমি ?”
__“হ্যাঁ,দিন না একটাই তুলব।”
এই বলে জারা নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিল।
__” আমার টা দিয়ে তুলে দেন! ”
কালো পোশাকে, বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে সে একরকম পোজ নিল—এক হাত হেলমেটের উপর, আরেক হাত বোরকার ঘের সামলে। সূর্যের আলো বোরকার কালো রঙে মিশে গিয়ে একটা অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছে। আরমান জারা’র কাছে এসে হেলমেট পরিয়ে দেয়। আরমান জারার মোবাইলের অবস্থা দেখে বলে
___“আমারটা দিয়ে তুলে দেই?”
জারা মুখ বাঁকিয়ে বলল
___“আপনার মোবাইলের ক্যামেরা ভালো না।”
এই এক বাক্য শুনে আরমানের মুখের ভাব মুহূর্তেই পাল্টে গেল। এতক্ষণ যে ছেলেটা মনোযোগ দিয়ে পোজ দেখাচ্ছিল, এখন সে তাকিয়ে আছে নিজের হাতে ধরা ফোনটার দিকে।দামী ফোন, চকচকে নতুন iPhone 16 Pro Max। মনে মনে বলল, ‘এটার ক্যামেরা ভালো না? মানে, এটা কি মজা নাকি অপমান?’ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝাই যাচ্ছিল, মস্তিষ্কে ছোট খাটো ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
জারা এদিকে নিজের বোরকা ঠিক করছে,বার বার বাসাতে উড়ে যায়। জারা আরমানের মুখ দেখে হেসে ফেলল। ওর হাসিটা এমন যে, কেউ দেখলে ভাববে, এই মেয়েটা ইচ্ছে করেই আরমানকে খোঁচা দিতে পছন্দ করে।
আরমান এবার ফোনটা তুলে বলল
___ “ঠিক আছে, তোমার ফোনেই তুলি।”
তিনটা ছবি তোলার পরই সে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল।
ছবি দেখে জারা হাসতে হাসতে বলল
___ “দেখেছেন আমার মোবাইলের ক্যামেরা কতো ভালো।ছবিও ভালো হইছে।”
আরমান শান্ত মুখে বলল
___“হুম, ভালো হইছে, কারণ ক্যামেরা তো ‘স্যাংস্যাম’। আমি তো গরিব, আমারটা শুধু প্রোম্যাক্স।”
জারা আর থামতে পারল না, হেসে কুঁকড়ে গেল।
__“ওরে, এতো রাগ কেরছেন কেনো!আমি তো মজা করছিলাম।”
আরমান গম্ভীর মুখে বলল
__” হুম বোঝেছ! ”
তারপর নিজের মোবাইলটা জারার হাতে তুলে দিয়ে, জারার দিকে তাকিয়ে বলল
___“আজ থেকে এটা তোমার ।”
জারা অবাক হয়ে তাকাল। আরমানের মুখে হালকা একরকম গর্ব, আবার লুকানো রাগও।
___“সত্যি ?”
__“না,” আরমান বলল”
জারা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে হাসল,
___ “আপনি রাগলে খুব কিউট লাগে।”
আরমানের মুখের রাগ মিলিয়ে গেল মুহূর্তে।
সে তাকিয়ে রইল জারার দিকে—কালো বোরকার নিচে অল্প দেখা মুখটা, হেলমেটের নিচে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
শুক্রবার বিকেল। পার্কটায় আজ একটু বেশি ভিড়। পরিবার বন্ধুদের দল, বাচ্চাদের হাসির শব্দ সব মিলে জমে উঠেছে বিকেলটা।কিন্তু এই ভিড়ের মাঝেও একটা ছোট্ট জগৎ যেন আলাদা করে তৈরি হয়েছে — যেখানে আছে শুধু আরমান আর জারা।
জারা আজ হালকা কালো বোরকা পরে এসেছে, বোরকার নিচে চুপি চুপি হাসছে। আরমান পাশে হাঁটছে, দুজনের হাত একে অপরের মধ্যে জড়িয়ে আছে নিঃশব্দে। এই এক ছোঁয়াতেই কত শান্তি, কত নিশ্চিন্ততা— কথায় বোঝানো যায় না।
হাওয়াটা নরম। গাছের পাতা দুলে ছায়া পড়ছে ওদের মুখে। জারা চুপচাপ, মাঝে মাঝে কিছু না বলেই হেসে ফেলছে। আরমান জিজ্ঞেস করল,
— “হাসছো কেন?”
জারা নিচু গলায় বলল,
— “কারণ জানি না, কিন্তু ভালো লাগছে।”
ওর সেই উত্তর শুনে আরমানের মুখেও হাসি ফুটল। দুজন একটু হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় থামল। সামনে ছোট্ট একটা লেক, পানিতে সূর্যের শেষ আলোটা ঝিকমিক করছে। জারা লেকের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “এই সময়টা আমার সবচেয়ে পছন্দের।”
আরমান বলল,
— “আর আমার তোমাকে।”
জারা তাকিয়ে রইল ওর দিকে। চোখে কোনো কথা নেই, শুধু একটা শান্ত অনুভব। ওদের দুজনের হাত তখনো শক্তভাবে জড়িয়ে আছে।
ভিড়ের মাঝে থেকেও মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা থেমে গেছে এই মুহূর্তে।
একটা হালকা বাতাস এসে জারার হিজাব উড়তে লাগে । আরমান হাত বাড়িয়ে সেটা ধরল,আলতো করে ওর কাঁধে তুলে দিল।জারা কিছু বলল না, শুধু চোখ নামিয়ে হেসে ফেলল।
পাশে থাকা দোকান থেকে ভেসে আসছে ভুট্টা পোড়ানোর গন্ধ, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে।
জারা আরমানের হাত জাঁকিয়ে বলল,
— “চলুন, মাটির ভাড়ে চা খাই।”
আরমান হেসে বলল,
— “বউয়ের আবদার, রাখতে তো হবেই।”
চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে দুজনের মাঝে কিছু কথা, কিছু চুপ থাকা,যেন প্রতিটা নীরবতাও মিষ্টি। জারা চায়ের কাপে ফুঁ দিচ্ছে, আরমান তাকিয়ে আছে সেই দৃশ্যের দিকে,সাধারণ একটা মুহূর্ত, কিন্তু তাতেই যেন হাজারটা ভালোবাসার রঙ লুকানো।
চা শেষ করে দুজন আবার হাঁটতে শুরু করল।
আকাশে তখন লালচে সূর্য ঢলে পড়ছে, পাখিরা ফিরছে বাসায়। রাস্তায় ভিড় এখনো আছে, কিন্তু জারা হালকা গলায় বলল,
— “আপনি জানেন, আমি ভিড় পছন্দ করি না।”
আরমান হাসল,
— “তাই তো তোমার হাতটা ছাড়িনি।”
এই কথায় জারা চুপ করে গেল।তারপর ধীরে মাথা নিচু করে বলল,
— “হারিয়ে গেলে খুঁজবেন আমায়?”
— “না,” আরমান শান্ত ভাবে বললো।
আরমান ওকে খুঁজবে না শুনে জারা’র চোখ ছলছল হয়ে আসে। ঠিক তখন আরমান গম্ভীর কণ্ঠে বলে
__“ কখনো হারাতেই দেব না।সেখানে খুঁজার কথা আসে কোথা থেকে? ”
এই এক কথায় যেন পুরো বিকেলটা থেমে গেল।
চারপাশের শব্দ মিলিয়ে গেল এক মায়াবী নীরবতায়। শুধু পাতার মৃদু শব্দ, হাওয়ার ছোঁয়া আর হাতের উষ্ণতা,যেন জীবনের সবচেয়ে শান্ত, সুন্দর অনুভব।জারা চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা যেন থেমে থাকে সারাজীবন।না কোনো তাড়া, না কোনো ভয়, না কোনো দূরত্ব,শুধু দুজন মানুষ, একসাথে হাঁটছে বিকেলের আলোয়,যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু একটা নরম ছোঁয়া, আর একটা শান্ত নিশ্বাস।
দুজন পৌঁছে গেল লেকের ধারে ছোট একটা পার্কে। সেখানে বিক্রেতারা ফুচকা, চটপটি, আইসক্রিম নিয়ে বসেছে। বাতাসে ভেসে আসছে তেতো-ঝাল-টক গন্ধের মিশ্রণ। জারা লাফাতে লাফাতে বলে
___“ আমি ফুচকা খাব!”
আরমান চোখ বড় করে বলল,
__“এসব অখাদ্য খেলে পেট খারাপ করবে ! অন্য কিছু বলো কিনে দিচ্ছি।”
আরমানের মুখে না শুনে জারা আরমানের পা ধরে মাটিতে বসে। বাচ্চাদের মতো গোল গোল চোখে মুখে থাকে আরমানের দিকে। জারা’র কান্ড দেখে আশেপাশের মানুষের হাসাচ্ছে। আরমান ফুস করে শ্বাস ফেলে। কপালে আঙুল ঘেঁষে বলে
__” মানজারা উঠো! ”
__” আগে বলুন খাওয়াবেন! ”
__” না খাইয়ে উপায় আছে আর?” এই বলে আরমান জারাকে নিয়ে ফুচকার স্টলে এসে দাঁড়াল। আরমান অর্ডার দিল
__ “এক প্লেট খুচকা, ঝালটা একটু কম ।”
জারা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল
___“না না, ঝালটা বেশি দিন।”
আরমান তাকিয়ে বলল,
__“তুমি ঝাল খেতে পারবে না।”
জারা গর্বের ভঙ্গিতে বলল,
___“আমি ঝাল চব্বিশ ঘণ্টা খায়! আর এটা পরব না ।”
প্রথম ফুচকাটা মুখে দিয়েই জারার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। আরও দুই, তিনটা খাওয়ার পর চোখ লাল, নাক টানছে, আর মুখে আগুন লেগেছে যেন। আরমান মনে করে বোদ হয় কম জ্বল লেগেছে জারার। আরমান হাসি চাপতে পারল না।
___“আমি তো বলেছিলাম…ঝা…”
ঠিক তখন চোখে পানি নিয়ে আরমানের কাছে পানি চাইলো। আরমান দ্রুত বোতল এগিয়ে দিল, কিন্তু পানি খেয়েও জ্বাল কমল না। জারা হালকা কাশতে লাগল। আরমান তখন এক মুহূর্তও দেরি করল না, পাশের দিকের দোকানের দিকে ছুটে গেল।
___“এই ভাই! দশটা কুন আইসক্রিম দিন, তাড়াতাড়ি!”
দোকানদার ফ্রিজ খুলে আইসক্রিম একটা একটা করে প্যাকেটে বরছে। আরমান বার বার পিছনে জারা’র দিকে তাকিয়ে দেখে। জ্বালে মেয়েটার অবস্থা খারাপ। আর এদিকে লোকটার এমন কচ্ছপের মতো কাজ করতে দেখে আরমানের রাগ উঠে যায়।
__” বা*লের পোলা! তাড়াতাড়ি আইসক্রিম দে!আমার বউয়ের ঝাল লেগেছে। “এই বলে প্যাকেট’টা দোকানদার থেকে কেঁড়ে নিয়ে একহাজার নোট দিয়ে দৌড়ে জারা’র কাছে চলে আসে।
আর দোকানদার এখনো আরমানের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে আছে। লোকটা মনে মনে ভাবে ‘এমন ভাবে করছে যেনো পৃথিবীতে আর কারো বউ নেই? ‘
জারা অবাক হয়ে দেখল, আরমান একহাতে দশটা আইসক্রিম নিয়ে দৌড়ে ফিরে আসছে। শ্বাস নিচ্ছে হাঁপাতে হাঁপাতে।একটা আইসক্রিম খুলে জারার হাতে দিল।
___“এই নাও বউ, খাও, ঠান্ডা লাগবে।”
জারা একবারও ভেবে না খেয়ে আইসক্রিমে কামড় বসাল। ঠান্ডা মিষ্টি স্বাদটা মুখে পড়তেই একটু স্বস্তি পেল সে। আরমান সামনে বসে তাকিয়ে আছে, চোখে একরকম শান্তি, যেন জারার প্রতিটা হাসি তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী জিনিস।
দুই মিনিটের মধ্যেই জারা একটার পর একটা দুইটা আইসক্রিম শেষ করে ফেলল। আরমান হেসে বলল,
__“এইভাবে খেও না! ভালো ভাবে খাও, তোমার আইসক্রিম কেউ দিবে না ।”
জারা হাসল, আরমান দেখে জারার ঠোঁটে একটু ক্রিম লেগে গেছে, সেটা আলতো করে মুছে দেয়।জারা একটু লজ্জা পেয়ে বলে,
__“অনেক ঝাল লেগেছে তাই.. ওই.. এরকম ।”
__“ খাও বউ তুমি! তুমি না থাকলে আমি কাকে দৌড়ে আইসক্রিম খাওয়াতাম?”
এইরকমই তাদের আলাপ চলতে লাগল, একটুখানি খুনসুটি, একটুখানি যত্ন, আর তার মাঝখানে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট ভালোবাসা।
জারা তখনো ঠান্ডা আইসক্রিমে ব্যস্ত। তৃতীয়টা খুলেই একটু থেমে আরমানের দিকে তাকাল। আরমান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জারা’র গোলাপি ঠোঁটের দিকে। ওর চোখে তখন মিষ্টি হাসি, মুখে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু একধরনের তৃপ্তিও ছিল।জারা আরমানের মুখের কাছে আইসক্রিম এগিয়ে দিয়ে বলে,
__“ নিন! একটু খান ।”
আরমানের চোখে নেশা, গোর লাগা কন্ঠে হালকা গলায় বলল,
__“ আইসক্রিম না! তোমার ওই গোলাপি ঠোঁট দুটো খেতে চাই। দিবে? ”
জারা লজ্জা পেয়ে আইসক্রিম নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। আকাশে হালকা লালচে আলো, বাতাসে ঠান্ডা ভাব। আরমান সাতটা আইসক্রিম একসাথে প্যাক করে জারার হাতে দিল।তারপর স্টল থেকে আরও অনেক ধরনের চিপস, ঠান্ডা জাতীয় খারাপ কিনে জারা’র হাতে দেয়।
___“বাড়িতে নিয়ে যাবে, একা খাবে না! আমার ছুট্টো নাদান শালাবাবুকে দিয়ে খবে।”
জারা বোকার মতো তাকিয়ে আছে আরমানের দিকে। সে কি রাক্ষস? এতো গুলো খাবার সে একা খাবে?
___এতো বড় ব্যাগে টা আমি বাড়ি নিয়ে যাব?আপনি কী পাগল।”
___“তোমার জন্য পাগল! ”
রাত সাতটা বাজে। চারপাশে হালকা হালকা অন্ধকার নেমে এসেছে। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলো ঝলমল করছে। বাতাসে ধুলোর গন্ধ, মানুষের ভিড় কমে এসেছে। জারা কালো বোরকা পরে বাইকের পিছনে বসে আছে, আরমান হেলমেট না পরে জারা কে পরিয়ে দেয়। আর নিজে সাবধানে বাইক চালাচ্ছে। বাইকটা চলতে শুরু করল। শহরের বাতি জ্বলে উঠছে, দোকানের আলো, মানুষের ভিড়, সব মিলিয়ে একটা শন্তির মতো পরিবেশ।জারা হেলমেট পরে আরমানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আছে।
তারা নরসিংদির পাশ ঘেঁষে এক ছোট্ট নদীর ব্রিজ পার হচ্ছিল ঠিক তখনই পুলিশ চেকপোস্টে বাঁশ নামানো দেখে আরমান ব্রেক কষে দাঁড়ায়।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৪
__“হেলমেট কই আপনার?”
একজন পুলিশ গম্ভীর গলায় বললো।
আরমান একটু হেসে বলে
__“স্যার, আমারটা বউকে পরিয়ে দিয়েছি…..”
___“মানে কী? রাস্তায় নিয়ম জানেন না? লাইসেন্স, কাগজপত্র দেন!”
আরমান পকেট থেকে কাগজ বের করছে, আর পেছনে বসা জারা’কে দেখে মনে হচ্ছে যেন তার হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। মুখ ঢাকা থাকলেও ভয়টা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। জারাকে ভয় পেতে দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়। একজন পুলিশ লাইট মেরে জারার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো —
__“আপনি এই লোকটার কে? স্ত্রী? আত্মীয়?”
