Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৫

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৫

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৫
সোহানা ইসলাম

এই প্রশ্ন শুনে জারা তো একেবারে জমে গেলো। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী থেমে গেছে। পুলিশ আবার একটু জোরে বললো,
__“বলুন ম্যাডাম, এই লোক আপনার কে?”
জারা তোতলাতে তোতলাতে বলে ফেললো,
__“আমি… আমি উনাকে চিনি না স্যার… গাড়ি পাচ্ছিলাম না, তাই সাহায্য চেয়েছিলাম।”
পুলিশের চোখে সন্দেহ। আরমান মুহূর্তে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে নিজের বউয়ের দিকে। মনে হচ্ছে মাটি ফেটে যাক আর তাতেই ঢুকে যাক ও। পুলিশ সামনে তাই দমক ও দিতে পারছে না সে। আরমান নিচু গলায় বলে উঠলো

__“চিনো না!?”
জারা অনবরত ডানে বামে মাথা নেড়ে বোঝায়। সে চিনে না।
আরমান অবাক হয়ে বলে উঠলো,
__ “এই পল্টি-বাজ বউ…আমায় চিনো না?”
জারা আবারও মাথা নেড়ে না বলে।কারণ পুলিশ গুলো জারা’র দিকে বড় বড় চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছে। এমনিতেই সে পুলিশ কে খুব ভয় পায়। তারউপরে এতো জেরা করছে। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। হাতে তালু ঘামছে।
আরমান পুলিশ কে বোঝানুর মতো করে বলে
__” স্যার! ও আমার বউ হয়। ”
পুলিশ বলে,

__“ওহ, বউ! কিন্তু ওনি তো বলছে চেনে না।”
___“চিনে না মানে?”
আরমান রাগে দাঁত চেপে বললো,
__“স্যার, এই মেয়েটাই আমার বউ, আমার ঘরের বউ!”
আরমান জারা’র দিকে তাকিয়ে বলে
__” এই হাফ ইঞ্চির বাচ্চা! বল আমি তোর কি হই!”
জারা কিছু বলতে যাবে তার আগে একজন পুলিশ ওর হাত থেকে বড় ব্যাগ টা কেড়ে নেয়। জারা হতভম্ব। হাত কাপছে তার। পুলিশ ব্যাগ টা খুলে দেখে ভিতরে কয়েক রকমের চিপস, চকলেট আর ঠান্ডা জাতীয়।
__” এগুলোর ভিতরে নিশ্চয় কোনো বেঝাল আছে। একজন বলছে বউ হয় আরেক জন বলছে চিনে না। ”
কিন্তু জারা তখনও ভয় পেয়ে মুখ নিচু করে আছে। পুলিশের চোখে রাগের ছায়া

___ “দু’জনকে থানায় নিতে হবে।”
জারা তাড়াতাড়ি করে ব্যাগ থেকে চিপস বের করে বলে
__” দ..দেখুন স্যার! এগুলো চিপস। ”
তারপর চিপস ছিড়ে পুলিশদের একটা একটা করে দিয়ে বলে
__” চিপস খান! আর আমাকে ছেড়ে দিন! আমি নির্দোষ! ”
একজন পুলিশ গম্ভীর মুখে বলে
__ “আপনি কী আমাদের ঘোষ দিচ্ছেন, চিপস দিয়ে?”
জারা বোকার মতো একটা হাসি দিয়ে বলে
__” হ্যাঁ…মানে না…ওই আর কী! ”
পুলিশ আর কোনো কথা না শুনে না কারো
___” বাইকের চাবি নিয়ে নাও! আর দুজনকে থানায় পাঠাও।
“ বিপদে পরলে ঘরের বউ ও পল্টি খায়”মনে মনে বলে আরমান জারা’র দিকে তাকিয়ে। জারা তবু মাথা নিচু করে থাকে। আরমান ফিসফিসিয়ে বলে,
__“ পাকামো করে তুই না পল্টির খেলি, বউ! যা গিয়ে জেলখানায় শক্ত রুটি খা! ”
জারা এবার ভয়ে কান্না করে দেয়। নাক টানতে টানতে বলে

__” স্যার! আমাকে না নিয়ে ওনাকে নিয়ে যান। আমি তো ওনাকে চিনি না! ”
আরমান ও বলে
__” বাইকে আমি একা ছিলাম না। নিলে দুজনকেই নিতে হবে। ”
এই বলে জারা র মাথা থেকে হেলমেট খুলে আরমান নিজের মাথায় পরে নেয়। আর মনে মনে বলে ‘ শালার পল্টি বাজ বউ ’!পুলিশ তাদের আরও জেরা করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অনেক কথা, ঝামেলা, তর্ক-বিতর্কের পর আরমান নিজের পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে পুলিশের হাতে গুঁজে দেয়। পুলিশের মুখ নরম হয়, বাঁশ তুলে দেয়।
বাইরে বের হয়ে আসে আরমান। কিন্তু এবার বাইকে জারাকে উঠতে দেয় না। বাইক স্টার্ট দেয়ার আগে বলে,
__“আপনি তো আমাকে চিনেন না, আপা! এখন বাড়ি যান একা একা।”
জারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। পুলিশ চোখের আড়াল হতেই সে দৌড়ে এসে বোরকা সামলে আরমানের সামনে দাঁড়ায়,
__“শুনবেন না, স্বামীজান? রাগ করবেন না প্লিজ!”
আরমান মুখ ফিরিয়ে বলে,
__“না না, আপনি তো চেনেন না আমাকে, তাই না? আমি এখন অপরিচিত লোক।”
জারা হাল ছাড়ে না। আরমানের জ্যাকেটে ধরে টান দেয়,
__“আপনি আমার স্বামীজান, আমাকে একা রেখে চলে যাবেন আপনি?”
আরমান ঠোঁটে হাসি টেনে বলে

___“ মিষ্টি কথায় কাজ হবে না। আর আমার কোনো বউ নাই।এখন বাইকের কাছ থেকে সরে দাড়ান আপা । ”
জারা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে,
___“ ভয়েই বলেছি, জান। পুলিশ কে আমি অনেক ভয় পাই.”
জারার মুখে জান ডাক শুনে নরম হয়ে আসে আরমানের মন। তবুও আরমান মুখের ভাব কঠিন করে বাইকের দিকে তাকিয়ে বলে,
___“ তাই বলে বউ হইয়া পল্টি মেরে দিলে পুলিশের সামনে? ”
জারা এবার এগিয়ে এসে ওর কাঁধে জড়িয়ে ধরে বলে ,
__“ও..স্বামীজান!আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।কিন্তু এখন তো আপনি আমার স্বামীজান বলুন?”
আরমান এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে, তারপর ধীরে হেসে বলে,
__” তাহলে তখন বললে না কেন,আমি তোমার স্বামীজান?”
জারা বোঝতে পারলো এই ভাবে বললে কাজ হবে না। বুদ্ধি লাগিয়ে আরমান কে পটাতে হবে। জারা টুপ করে আরমান মাথার হেলমেট খুলে ওর গালে চুমু খায়। আরমান গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে আছে জারা’র দিকে। জারা লজ্জা পায়, তবুও বলে

__” এখনও নিবেন না? ”
__” বউ তুমি আমাকে ঘোষ দিচ্ছো?”
জারা গাল ফুলিয়ে বলে
__” থাক!নিতে হবে না আমায়। আমাকে শুধু কিছু টাকা দিয়ে যায়। আমি একায়ই বাসে করে চলে যাব।”
আরমান তাড়াতাড়ি করে জারা’কে কাছে টেনে ওর কপালে চুমু দিয়ে বলে
__“চলো, বউ! কিন্তু পরেরবার পুলিশ যদি জিজ্ঞেস করে আমি কে, তখন যেন না বলো ‘চিনি না’। না হলে তোমার ওই মুখ বাইকের নিচে চাপা থাকবে।”
জারা ভয় পেলো। কিন্তু হেসে বলে,
___“ঠিক আছে, স্যার। আমি তখন বলব— উনি আমার জীবন।আমার স্বামীজান!”
আরমান হেসে হেলমেট জারাকে পরিয়ে ওঠার ইশারা করে।জারা বাইকে ওঠে, এবার আগের মতো ভয় নেই, শুধু ভালোবাসা ভরা এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস।রাতের রাস্তায় বাইকটা ছুটে চলে।

আরমান জারাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যেতে যেতে রাত আটটা বেজে যায়। জারা গেট খুলে বাড়িতে ঢোকে। সিঁড়ির নিচে আলোটা আধো ঝিমঝিম করছে, যেন তার সঙ্গেই ক্লান্ত। হাতে বড় একটা ব্যাগ। ক্লান্ত মুখে একটা হালকা চাপা ভয়, কিন্তু মুখে যেন কিছুই নেই।
মারজিয়া বেগম ড্রইং রুমে বসে ছিলেন। চোখ তুলে তাকাতেই মেয়ের হাতে ব্যাগ দেখে কপালে ভাঁজ পড়ে। কিছু না বলেও তাঁর চোখ অনেক কিছু বলে দেয়।মারজিয়া বেগম বলেন
__” এতো বড় ব্যাগে কী? ”
ভয় পায় সে। কিন্তু নিকাপ পরা থাকায় এতো ধরতে পারলো মারজিয়া বেগম। জারা এগিয়ে যায়, হাসি টেনে বলে,

__“এগুলো জোহানের জন্য। নোটও এনেছি।”
মারজিয়া বেগম কিছু বলেন না। শুধু ব্যাগটার দিকে হাত বাড়ান। খুলে দেখেন ভেতরে চিপস, চকলেট, বিস্কুট, জুস— নানা কিছু।কোনো নোট চোখে পড়ে না।
চোখের ভেতর তীক্ষ্ণ সন্দেহের রেখা।
___“এতসব কেন? আমি তো তোকে এমন টাকা দেইনি, জারা।”
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। জারা নিচু গলায় বলে,
__“ওই…ওই আসার সময় জিনিয়া আপুর সাথে দেখে করতে গিয়ে ছিলাম, তখন জাহেদ ভাইয়া কিনে দিয়েছে জোহানের জন্য ।”
কণ্ঠে মিথ্যার ভার।মারজিয়া বেগমের মুখ শক্ত হয়।

___“তাই নাকি? আর এতো রাত হলো কেন? নোট আনতে গেলে এতো রাত হওয়ার তো কথা না?”
জারা দম নেয় ধীরে, চোখ নিচু করে বলে,
__“ কাকলির আম্মু ছাড়তে চায়নি, বলেছে থেকে যেতে। কিন্তু আমি আর ফিহা জোর করে এসেছি।বিশ্বাস না হলে ফিহা কে জিজ্ঞেস করো।”
মারজিয়া বেগম কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চুপচাপ।সেই নীরবতা জারাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়।একটা সময় তিনি শুধু বলেন,
___“তুই বড় হচ্ছিস, জারা… কিন্তু মনে রাখিস, রাত মানে সব সময় নিরাপদ না।”
জারা মাথা নাড়ে। চোখের কোণে একটু ভেজা ভাব।তারপর ব্যাগটা নামিয়ে রেখে হালকা করে হেসে বলে,
__“তুমি কিছু খেয়েছো আম্মু?”
মারজিয়া বেগম তখন আর কিছু বলেন না। তিনি জানেন, মেয়ের মুখে যা-ই থাক, অন্তরে হয়তো অন্য কিছু চলছে। কিন্তু মেয়ের মুখের ক্লান্ত হাসিটা তাকে নরম করে দেয়।জারা দ্রুত জোহানকে ডাকে।ছোট্ট ভাইটা ছুটে আসে, চোখে কৌতূহল।জারা ব্যাগ থেকে চিপস, চকলেট বের করে দেয় হাতে। জোহান খুশিতে গদগদ হয়ে রুম থেকে বের হয়ে বলে

__” বোনু তোমরা জন্য একটা খবর…!”
মারজিয়া বেগম চোখ পাকিয়ে তাকায় ছেলের দিকে। জোহান চুপ করে যায়। জারা বোঝতে পারে না জোহানের কথা। আর এতো মাথাও ঘামায় না।
__“এই নে, তোর জন্য।”
জোহান উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে ওঠে,
__“বাহ! এনেছো তাহলে।”
জারা একচিলতে হাসে। তারপর চুপচাপ রুমে ঢোকে। দরজা বন্ধ করে আয়নায় নিজের দিকে তাকায়। চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে লুকোনো দুঃখ।
ফ্রেশ হয়ে তারপর টেবিলে বসে বই খুলে।
বাইরে হালকা হাওয়ার শব্দ।বইয়ের পাতায় আলো পড়ে, কিন্তু চোখ বারবার ফাঁকা হয়ে যায়।
মনের ভেতর ভেসে ওঠে বিকেলের স্মৃতি— কারও মুখ, কারও হাসি, কোনো গোপন কথা।
তারপর নিজের হাতের দিকে তাকায়, মনে হয়,কত গল্প লুকিয়ে আছে এই নীরবতায়।
কিন্তু সে কিছুই লেখে না, কিছুই বলে না।
শুধু পাতা উল্টাতে থাকে, যেন সেই শব্দে মন শান্ত হবে। বাইরে থেকে মা ডাকে,
__“জারা, খেয়ে নিস মা।”
জারা জবাব দেয়,
“আচ্ছা আম্মু …”
কণ্ঠটা খুব শান্ত, কিন্তু ভেতরে ঝড় বয়ে যায়।

রাত নয়টা বাজে। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু মাঝে মাঝে দূরের কুকুরের ডাক আর হালকা বাতাসের শব্দে অন্ধকার ভাঙছে। জাহেদ দাঁড়িয়ে আছে একটা পুরনো খেজুর গাছের পাশে। রাস্তার হালকা লাইটের আলোয় তার মুখ দেখা যায় আধো-আধো। তার সামনে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে, হাতে সিগারেট। জাহেদের হাতে একটা ছোট ব্যাগ — ভেতরে টাকা।
___“ভাই, কাজ একটাই,” জাহেদ নিচু গলায় বলে, “আমাকে কোনো মেয়ের সাথে দেখেলেই ধরবা, একটু চেঁচামেচি করবা, তারপর কট দিয়ে দিও। কাজিটা আমি রেডি করছি। রাত বেশি না, এই কাজ হইলেই সব ঠিক।”
একজন লোক ঠোঁটে হাসি টেনে বলে
__“বুঝছি ভাই, চিন্তা নাই। আমরা কারও কথা রাখি না, পেমেন্ট ঠিক থাকলে কাজ ফাইনাল।”
জাহেদ ব্যাগটা খুলে টাকাগুলো গুনে হাতে তুলে দেয়। পাশে দাঁড়িয়ে আছে রোহান, মুখে দুষ্টু হাসি। সে বলে,
__“দেখো শালাবাবু, প্রেম-টেমে কেউ যদি জীবন পায়, একটু নাটক করে পেতে হয়?”
রাশেদ তখন পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে কিন্তু অস্বস্তি। সে নিচু গলায় বলে,
___“স্যার আপনারা যা করছেন এটা ঠিক না। মেয়েটার সম্মান আছে, গ্রাম ছোট… এমন হলে পরে সবাই কথা তুলবে।”
রোহান হেসে বলে,
__“বাহ! তুই এখন নীতিবোধ শেখাস! ভালোবাসা না বুঝে বড় জ্ঞানী হয়েছিস। চিন্তা করিস না, কিছু হইব না।”
জাহেদ বলে,
__“শুন, আরমান ভাই কাজ করছে । সব ঠিকঠাক হলে সকালেই খবর দিবো— কাজ শেষে।”
তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসে।কিন্তু রাশেদের মুখে হাসি কম ভয় বেশি। বাতাসে কেমন একটা অদ্ভুত গন্ধ—যেন অঘটনের আভাস।

সময় গড়ায়। রাত দশটা। রোহান তখন কাজির সঙ্গে দেখা করতে গেছে। রাশেদকে বলা হয়েছে রাস্তায় একটু আগেই দাড়াতে— ফিহা এলেই যেন ওকে নিয়ে আসে। জাহেদ ব্যস্ত ফোনে ফিহাকে বলছে,
____“তুমি একটু বের হইও, আমি সামনের মোড়ে আছি।”
কিন্তু ফিহা দিক থেকে শব্দ আসে টুকরো টুকরো,
___“নেট… ঠিক নাই… কিছু শুনতে… পাচ্ছি না…”
জাহেদের কপালে ঘাম জমে,
___“এই নেটওয়ার্কের কারণে,আমার কপালে বিয়ে থাকবে না মনে হয়।”
রাশেদ তখন এগিয়ে গিয়ে বলে,
___“আমি একটু সামনে গিয়ে দেখি, কিন্তু আমায় এসবের কিছুতে জরাবেন না। ”
__“হ্যাঁ, কিন্তু সাবধানে যাও” — জাহেদ বলে,
রাশেদ মাথা নেড়ে সামনে এগিয়ে যায়। অন্ধকার রাস্তায় কেবল টিউবলাইটের হালকা আলো, ছায়াগুলো লম্বা হয়ে মাটিতে পড়ছে।
অন্যদিকে ফিহা নিজের ঘরে বসে আছে, হাতে ফোন, বারবার কল দিচ্ছে কিন্তু নেটওয়ার্ক যাচ্ছে না। জাহেদের কোনো কথা বোঝতে পারছে না সে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে আকাশ মেঘে ঢাকা, বাতাসও বাড়ছে। মনে কেমন একটা অশুভ আশঙ্কাতবুও সে বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ঠিক সেই সময় মিম নিজের রুমে বসে বই খুলে রেখেছে। সামনে পরীক্ষা। কিন্তু মন বসছে না। ওর মা অসুস্থ, সারাদিনে একটু খেয়েছে মাত্র। বাবার ফোন আসে,

___“আমি রাস্তায় আছি। একটু বের হয়ে আমাকে নিয়ে যা মা।”
মিম একটু দ্বিধায় পড়ে। রাত দশটা পেরিয়ে গেছে, এখন সে কিভাবে যাবে?তবুও সে নিজের মোবাইল হাতে নিয়ে বের হয় বাবাকে আনতে। যাওয়ার আগে মাকে বলে,
__“আমি যাচ্ছি আম্মু, বাবাকে রাস্তার মোড় থেকে আনতে।”
মা বলে
___ “বেশি দূর যাস না মা।”
মিম ফ্লাস অন করে বাইরে বের হয়।রাস্তায় বাতাস ঠান্ডা, আকাশে হালকা কুয়াশা।রাস্তায় কেউ নেই,নিস্তব্ধতা। মিম একদম মোড়ের কাছে এসে দেখে সামনে একটা ছায়া। মনে হয় কেউ দাঁড়িয়ে আছে।আরও কয়েক পা এগুতেই সেই ছায়া নড়ে ওঠে
___“কে… কে ওখানে?”
ছায়া কিছু বলে না।হঠাৎ পেছন থেকে একটা আওয়াজ
___“মিম!”
ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠে মিম। চোখ বন্ধ করে ফেলে।এক মুহূর্ত পর বুঝতে পারে, ওটা রাশেদ। রাশেদ দ্রুত দৌড়ে এসে মিমকে ধরে ফেলে।
__“এই মিউ! ভয় পেয়েছো?” — রাশেদ বলে।
মিম তখনও হাঁপাচ্ছে, বুক ওঠানামা করছে, চোখে ভয় আর বিস্ময়।
___“আপনি এখানে কেন?”
রাশেদ কিছু বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই
অন্ধকার গলি থেকে কয়েকজন লোক বেরিয়ে আসে।

___“এই এই, কীরে রাত-বিরাতে প্রেম করিস?” — একজন গলা চড়িয়ে বলে।
রাশেদ হতভম্ব হয়ে তাকায়,
___“না ভাই, আপনি ভুল বুঝেছেন!”
লোকগুলো কেউ একটা বাঁশ তুলে নেয়, কেউ মাটিতে থুতু ফেলে বলে,
___“ওরে ধরা খাইছে! এখন বিয়ে দে, কাজি রেডি কর।”
মিম চিৎকার করে বলে,
___ “না! আপনি বুঝছেন না! আমি আমার বাবাকে আনতে বের হয়েছি!”
কিন্তু কেউ শোনে না।একজন লোক জোরে ধাক্কা দেয় রাশেদকে
___“রাত-বিরাতে মেয়ের সঙ্গে ধরা, এখন পালাবি কই?”
রাশেদ রাগে গলা কাঁপিয়ে বলে,
___“আপনারা জানো না আপনারা কী বলছেন?আপনাদের আনা হয়েছে অন্য জনের কাজ করার জন্য। আপনারা আমাকে ধরছেন কেন?!”
লোকগুলো হেসে বলে,

___“ ধরা খাওয়ার পর সবাই এভাবেই বলে ভাই!”
মিম কান্না শুরু করে
___ “আমরা কোনো খারাপ কাজ করিনি!”
ঠিক তখন দূর থেকে দৌড়ে আসে মিমের বাবা। কিন্তু মুখে ভান করে অবাক হওয়ার ভাব নিজের মেয়েকে এখানে এতো মানুষের মধ্যে দেখে।
__“এই কী হয়েছে রে!”
রাশেদ কিছু বলার আগেই গ্রামের লোকজন এসে জমে যায়। চিৎকার, হৈচৈ, টর্চের আলোয় মুখগুলো অচেনা হয়ে যায়।
একটু পরেই রোহান হাজির হয় কাজি নিয়ে।
জাহেদের মুখে তখন অদ্ভুত এক আত্মতৃপ্তির ছাপ। কিন্তু সামনে দৃশ্য দেখে সে স্তব্ধ। জাহেদ তো দেখছে—মিমের পাশে দাঁড়িয়ে রাশেদ! সে এতোক্ষণ ফিহার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছিলো। নেটওয়ার্ক এর কারণে কথা বলতে সমস্যা হওয়ার কারণে একটু দূরে গিয়ে ছিলো। এসে এমন কিছু দেখবে কল্পনা ও করতে পারে নি সে। রোহান জাহেদ এর কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে,
___“এইটা কী হইল রে!”
__” আমার জায়গায় রাশেদ ভাই কেন বসে আছে?”
রোহানও হতভম্ব, কাজির দিকে তাকিয়ে বলে,
___“ভাই, ভুল হইছে! এইটা সেই জোড়া না!”
জাহেদ ভীড়ের মাঝে গিয়ে বলে
__” আরে ভাই আমি কট খাব! ও নয়! ”
কিন্তু তখন আর কেউ শুনছে না। জাহেদর লোক গুলো এখন জাহেদ এর কথাও শুনছে না। ছেলে মেয়ে এক সাথে পেয়েছে মানে এরাই। জাহেদ শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে সব। এর মাজে কিছু গ্রামের লোকজন বলছে,

___“যা হবার হইছে। এখন মান-সম্মান বাঁচাতে হইলে বিয়া দিতে হইব।”
কাজি নিঃশব্দে খাতা খুলে বসে। রাশেদ তো পুরো ঘামছে। মিম বোবা হয়ে গেছে। মিমের বাবা সব দেখছে কিন্তু কিছুই বোঝতে পারছে না তিনি। যখন শুনলো মিমের বিয়ের কথা ঠিক তখন মিমের বাবা আসে—
___“মিম! এটা কী হচ্ছে?”তার চোখে আতঙ্ক, লজ্জা, অপমানের ছাপ একসাথে।
গ্রামের মানুষ মিমের বাবাকে যা নয় তাই বলছে। মেয়ে নাকি রাত বিরাতে ছেলের সাথে ধরা খেয়েছে। আরও নানান কথা। মিমের কোনো বড় ভাই বোন নেই। সে একাই। তাই মিমের বাবা এতো জোরও দেখাতে পারলেন না। চারপাশের মানুষ নোংরা কথা বলছে। এটা বাবা হয়ে তিনি সহ্য করতে পারছেন না।লজ্জায় মাথা নিচু করে নেন।
চারপাশে লোকের গুঞ্জন—“মেয়েটা কালো, ছেলেটা তো দেখতে হ্যান্ডসাম।“এই বিয়ে টিকবে তো?”
মিম চোখ নিচু করে, আর রাশেদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
__“কারও মুখে এমন কথা শুনব না আমি!”
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা।
__“ও কালো না, ও আমার মিউ। আমার ভালোবাসা।আর একজন ওকে বাজে কথা বললে মুখ ছিড়ে ফেলব আমি!”
চারপাশে নীরবতা নেমে আসে। কাজির কলম চলে। বিয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। আলোর ঝলকানির বদলে বাতাসে লজ্জা আর বিস্ময় মিশে থাকে। মিম আর রাশেদ কে মিমের বাড়িতে এনে বিয়ে সম্পূর্ণ হয়। ওদের বিয়ে দেখে জাহেদ প্রায় কান্নাই করে দেয়।
রোহানের কাঁধে কপাল ঠেকিয়ে বলে
__” গেলো আমার সব গেলো। আমার টাকা, আমার বিয়ে সব গেলো। বালের কপাল আমার। ”
রোহানও আফসোস সুরে বলে
__” আসলেই বালের কপাল!”
বিয়ে পড়ানোর মাঝে রোহান আরমানকে কল দিয়ে সব বলে। এসব আকামের কথা শুনে আরমানের মাথায় রাগ উঠে যায়। মানসম্মান আর কিছু রাখলো না এই বলদ তিনটা। জিনিয়াকে নিয়ে রাত বারোটায় মিমদের বাড়িতে বাইক নিয়ে ছুটে আসে আরমান। কানে খবর পৌঁছেছে—মিম আর রাশেদের এতো ক্ষনে বিয়ে হয়ে গেছে। ছুটে এসে শ্বাসকষ্টে বলে ওঠে,

___“কে করেছে এসব? কার প্ল্যান ছিলো?”
জাহেদ কপালে হাত দিয়ে ফিসফিস করে,
___“বিয়ে তো হলোই না! উল্টো এখন বড় ভাইয়ের হাতে দোলাই খেতে হবে! ”
আরমান তাকিয়ে দেখে,রাশেদ আর মিম বসে আছে। জিনিয়া গিয়ে মিমের পাশে বসে। কিছু হয়নি। যারা মন থেকে ভালোবাসে আল্লাহ তাদের কোনো না কোনো ভাবে মিলন করিয়ে দেয়। শান্তনা দেয়। মিম কান্না করছে। বিয়ে হয়েছে তার জন্য না, গ্রামে এখন ওর মা বাবা মুখ দেখাতে পারবে না সে জন্য। মানসম্মান সব শেষ হয়ে গেছে ।
চারপাশে গ্রামবাসীর মুখে চাপা হাসি।কেউ বলছে, “ভালোই হইছে, মেয়ের ভাগ্য জেগেছে।নয় তো বাবার যে রোজগার মেয়েকে বিয়ে দিতে পারতো না কি সন্দেহ ।”
কেউ আবার ফিসফিস করছে,
“কালো মেয়ে, এত সুন্দর জামাই!”
রোহান আর সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে বলে

___” মিমকে নিয়ে আর একটাও বাজে কথা বলবেন না কেউ। মিম আমার বউ। সে আমার জন্য চাঁদ। ওর গায়ের রং নিয়ে কেউ বাজে কথা বলবেন না বলে দিলাম।”
মিমের মা চুপচাপ বসে আছেন। মুখে কোনো কথা নেই। হঠাৎ মাথা ঘুরে যায় তাঁর, মানুষ দৌড় দেয় পাশে।মিম তাড়াতাড়ি এসে মাকে ধরে নেয়।
আরমান গ্রাম বাসি দের বাড়িতে চলে যেতে বলে। ওরা মিমকে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নিয়েছে। তাদের আবার বড় করে বিয়ে হবে। আরমান ওর বাবাকে কল করে সব বলে। তিনি বলেন আরমান যেনো সব কিছু সামলে নেয়। আর বিয়ের ব্যবস্থা করে। তারা গিয়ে মেয়েকে তুলে আনবে।
এসব শুনে গ্রাম বাসির মুখ কালো হয়ে যায়। তারা যারা বাড়িতে চলে যায়। ঝামেলা শেষ হয় শেষ রাতে। আরমান মিমের বাবাকে বোঝায়। তাদের মেয়ের কোনো অসম্মান হতে দিবে না তারা।রাশেদ ভালো ছেলে। মিমকে ভালো বাসে। আজ বিয়ে না হলে একদিন অবশ্যই তাদের বিয়ে হতো। মিমের বাবা কিছু বলে না। তিনি গিয়ে মিম কে বলে সবার দেখভাল করতে। ওনি আছে এখানে। মিম জিনিয়াকে নিয়ে চলে আসে তাদের আরেক টিনের ঘরে। মিমদের বাড়ি এতো বড় না শুধু দুইটা টিনের ঘর আছে। একটা নতুন আর একটা পুরুনো।

রাত কেটে ভোর। সূর্যের আলোয় গ্রামের আকাশে একরাশ ধুলো আর ফিসফাস ভাসছে।
রাশেদ বাইরে বসে আছে। চোখে একধরনের অপরাধবোধ, আবার অদ্ভুত প্রশান্তিও আছে।
সে জানে, কিছু ভুল হয়ে গেছে, কিন্তু তবু কারও প্রতি ঘৃণা নেই। মনে মনে খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু সম্মানের ভয়ে দমে আছে।
মিম চুপচাপ উঠোনে বসে আছে জিনিয়ার সাথে । তার চোখে জল শুকিয়ে গেছে। তার মায়ের ঘরে ওষুধের গন্ধ।
আরমানের চোখ শুধু রোহান আর জাহেদ এর দিকে। সুযোগ পেলে ইচ্ছে মতো দিবে তাদের। রোহান আর জাহেদ দুইজন বসে আছে এক কোণে। জাহেদ এর আফসোসের শেষ নেই। রোহান তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কী ভেবেছিলো আর কি হলো?

সকাল সাতটা। ফিহা আর মিমের বাড়ি প্রায় কাছাকাছি। মিমের খবর টা শুনতে সময় লাগে নি ওর। ফিহা জারা’কে কল করে সব বলে। খবর শুনে জারা আর ফিহা ছুটে আসে।দুইজনের মুখে অবিশ্বাস, কিন্তু চোখে কৌতূহল।জারা বলে,
___“এসব হলো কীভাবে? ”
___” যানি না আমি কিছু! কিন্তু শুনেছি রাশেদ ভাইয়ার সাথে বিয়ে হয়েছে! ”
জারা দৌড়ে গিয়ে মিমকে জড়িয়ে ধরে। মিম বসে আছে ওর রুমে। পাশে জিনিয়া, রাশেদ, জাহেদ আর রোহান। ওদের বিয়ে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই কারো। সবাই খুশি। জারা বলে
__“এসব কী করে হলো জানু?”
ফিহা হেসে বলে,
___“বিনা প্রেমেই বিয়ে হয়ে গেছে। তোর বিয়ের কথা শুনে আমার তো নাচে মন চাইছে রে জানু!”
ফিহা খুশিতে জিনিয়া আর জারা র হাত ধরে দুজন কে নিয়ে খুশিতে নাচতে শুরু করে রুমের ভিতরে। তাদের হাসি যেন রাতের ভার ভেঙে দেয়। রোহান দূর থেকে দাঁড়িয়ে আছে, মুখ কালো হয়ে গেছে। জাহেদ পাশে এসে বলে,

___“ কটকটির বাচ্চা, তোর বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। শুধু নেটওয়ার্ক না থাকায় সব গোলমাল।”
রোহান হেসে বলে,
__“যা হয় ভালোর জন্যই হয় ভাই!”
ফিহা জারা’র আর জিনিয়ার হাত ধরে নাচতে থাকে। জারা তাকিয়ে দেখে মিমের মুখে এক শান্ত হাসি। তার চোখে আর ভয় নেই, শুধু একরাশ নিশ্চুপ মেনে নেওয়া ভালোবাসা।
আরমান পেছন এসে জারা’র মাথায় গাট্টা মেরে বলে,
___“বিয়ে টা কি তোমার হয়েছে যে এই ভাবে নাচছো?।”
সবাই চুপ হয়ে যায়। জারা নাচ থামিয়ে, মাথায় হাত বুলাতে থাকে। জারা আরমানকে মুখ বাঁকিয়ে অন্য দিকে তাকায়। সবাই হেসে ফেলে জারার মুখ বাঁকানো দেখে।
আরমান মিমের বাবা আর মায়ের সাথে কথা বলতে যায় বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে। আরমানের পিছন পিছন সবাই বের হয়ে যায় ঘর থেকে। মিম আর রাশেদের একা কথা বলা দরকার। কাল রাত থেকে তারা আলাদা কথা বলার সুযোগ পায়নি।
________
সূর্যের আলো গাছের পাতা ছুঁয়ে উঠোনে পড়ে। মিমের মনে নতুন নতুন অনুভূতি রা এসে কড়া নাড়ছে।রাশেদ কে দেখে লজ্জা লাগছে। বিয়ে টা যে ভাবে হোক। হয়েছে তো। এখন থেকে এই লোক তার স্বামী। নতুন একটা সম্পর্ক, নতুন একটা পরিচয়। মিম নিচু গলায় বলে,
___“হয়তো এইটাই ছিলো আমাদের ভাগ্য!”
রাশেদ পাশে এসে দাঁড়ায়,
___“ঠিক না হলে মনে এমন শান্তি লাগত?”

দুপুরের রোদটা ঠিক যেনো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বাতাসে ধুলো, তবুও গ্রামের পরিবেশে একটা অদ্ভুত শান্তি। মিমের বাড়িতে আজ যেন অন্য রকম আবহ। রাত আর সকালের বিশৃঙ্খলার পর এখন সব কিছু থিতু হয়ে এসেছে। উঠানে ধোঁয়া উঠছে, রান্নার হাঁড়িতে ভাত ফুটছে। মিমের মা ঘুরে ঘুরে কাজ দেখছেন,ওনার শরীর এখন কিছু টা ভালো। আর মাঝেমাঝে রাশেদের দিকে তাকাচ্ছেন, এমনভাবে, যেনো মেয়ের জামাইকে দেখছেন, রাজপুত্তুর।
রাশেদ চুপচাপ বসে আছে মিমদের ঘরের বারান্দায়। তার চোখে অজানা স্বস্তি, মাঝে মাঝে দৃষ্টি গিয়ে থেমে যায় মিমের মুখে। এত কিছু ঘটলো, তবুও মেয়েটার মুখে একটুখানি হাসি আছে। হয়তো লজ্জায়, হয়তো ভালোবাসায়। মিম নিজের মনে ভাবে, “এই মানুষটার জন্যই হয়তো আমার জীবনের পথ অন্য দিকে মোড় নিলো।”
দুপুরে সবাই একসাথে খেতে বসে। মিমের বাবা নিজের হাতে রাশেদকে ভাত বেড়ে খাওয়ায়। যত্নে, স্নেহে — যেনো আগের দিনের সব সন্দেহ, লজ্জা মুছে গেছে। মিমের মা বারবার রাশেদের থালা ভর্তি করে দেন, বলেন—

__“আরো নে বাবা, তুই তো আজ থেকে আমাদের ছেলে।”
রাশেদ নিচু গলায় বলে,
___“আমি ভাগ্যবান খালা। এই বাড়িটা এখন আমার আশ্রয়।”
___” খালা কি শব্দ? মা বলবি। ”
রাশেদ হেসে মাথা নিচু করে নেয়।খাওয়া দাওয়া শেষ করে উঠোনে বসে আছে সবাই,বাতাস বয়ে আসে। ফানুসের মতো আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিকে। আরমান বসে আসে, সঙ্গে জারা। তাদের মুখে হাসি, চোখে ঝিলিক। রাশেদকে দেখে রোহাম এগিয়ে গিয়ে বলে,
___“দেখ, রাজ বাবু, অবশেষে তোমার রাজকন্যাকে পেয়ে গেলে।”
__” এখন শুধু আমার জন কে ঘরে তোলার পালা।”জারার দিকে তাকিয়ে বলে আরমান।
রাশেদ মৃদু হেসে মাথা নিচু করে, জারা একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে, ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে এক অদ্ভুত উষ্ণতা আছে, যেটা শুধু আরমান বুঝতে পারে। একটু পরে সে জারার কানে ঝুঁকে বলে,

___“বউ, এই রোদে তোর গালে আলোটা এমন লাগছে, চোখ ফেরানো যায় না।তাড়াতাড়ি মুখে নিকাপ ফেল।”
জারা মুখ লাল করে পাশ ফিরিয়ে নেয়। তার বুকের ভেতর তীব্র ঢেউ ওঠে। এই মানুষটার কথাগুলো মাঝে মাঝে ঝড়ের মতো লাগে, তবু সে চায়, এই ঝড় যেনো সারাজীবন তার পাশে থাকে।
রোহান, জাহেদ, ফিহা— সবাই এসে একসাথে বসে গল্প করে। ফিহা মজা করে বলে,
__“এখন তো শুধু মিম জানুর পরীক্ষা শেষ হওয়া বাকি, তারপর আবার প্যান্ডেল সাজাতে হবে।”
সবাই হেসে ওঠে। রোহান বলে,
_“ এবার আর কাজির দায়িত্ব আমি নিব না ভাই।”
জাহেদ চুপচাপ বসে থাকে। তার মনে অদ্ভুত এক শূন্যতা। হালকা হেসে বলে,
___“যে জায়গায় আমি চেয়েছিলাম দাঁড়াতে, সেখানে এখন অন্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে।”
আরমান তার কাঁধে হাত রেখে বলে,
___“একটু পর তোরা দুইটা যে কোন জায়গায় দাঁড়াবি আল্লাহ ছাড়া কেউ যানে না ।”

সন্ধ্যার পর গ্রামের আকাশে তারা জ্বলছে।জারা ওরা সবাই চলে গেছে। শুধু রাশেদ থেকে যায়। মিমের মা বাবা যেতে দেয় নি। নতুন জামাই কি করে যেতে দেয় তারা। মিম বসে আছে নিজের রুমে , পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু মন বারবার উড়ে যাচ্ছে রাশেদের দিকে। বারান্দায় বসে আছে রাশেদ। রাশের ওর বাবার সাথে কথা বলছে। মিম তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখে ভালোবাসার নরম আলো। কেউ কিছু বলে না, তবুও বোঝা যায়, এই নীরবতা এখন তাদের ভাষা।
রাত গাঢ় হয়ে আসে। বাতাসে কিসের যেনো এক আশীর্বাদ মিশে আছে। মিমের মা দরজায় দাঁড়িয়ে বলেন,

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৪ (২)

__“বাবা রাশেদ, আমার মেয়েকে বিয়ে করে তোমার আফসোস হচ্ছে না তো।”
__” না! হচ্ছে না! আমি ওকে ভালোবাসি আর মিম এখন আমার স্রী। ওর পরিচয় এখন আমার সাথে যুক্ত। আফসোস হওয়ার কিছু নেই। বরং আমি লাকি ওকে আমার জীবনে পেয়ে। ”
__” তাহলে মিমের পরীক্ষার পর বিয়ে টা পাকা করে দাও! ” বললেন মিমের বাবা
রাশেদ মাথা নিচু করে সম্মতি জানায়। চোখে তার কৃতজ্ঞতার আলো। সেই আলো ছুঁয়ে যায় মিমের গালেও।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here