Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৬

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৬

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৬
সোহানা ইসলাম

রাতভর বৃষ্টি হয়েছিল। সকালে উঠেই আকাশে রোদ উঠলেও বাতাসে ছিলো ভেজা মাটির গন্ধ। সময় গড়িয়ে এখন সকাল আটটা। আজ জারাদের প্রথম পরীক্ষা। বাড়ির মধ্যে হালকা উত্তেজনা, তবু এক ধরনের নরম নীরবতা ছড়িয়ে আছে। মারজিয়া বেগম সকাল থেকেই ব্যস্ত—খাবার রান্না, মেয়ের জামাকাপড় গুছিয়ে রাখা, আর জোহান যেন কিছু না ভুলে যায়, সেটাও দেখছেন।
জারা রেডি হয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ায়। সাদা কলেজ ড্রেস , মুখে হালকা ক্লান্তি, চোখে টেনশন। টেবিলে সাজানো খিচুড়ি আর ডিম ভাজা। মারজিয়া বেগম প্লেটে তুলে দিচ্ছেন মেয়েকে। পাশে বসা জোহান ফিসফিস করে বলছে

__“ তোমার পরীক্ষা ভালো হবে বোনু।”
জারা হালকা হেসে মাথা নাড়ে, তবু মনে চিন্তার ভার। প্রথম পেপার বলে উত্তেজনা কাজ করছে।
ঠিক তখনই কলিং বেল বাজে—একটা, দুইটা, তিনটা… যেন তাড়াহুড়োর সুর। মারজিয়া বেগমের হাত থেমে যায়। চোখে অদ্ভুত এক ঝলক। জোহানও তাকায় মায়ের দিকে। দুজনের মুখে মিলেমিশে থাকা আতঙ্ক আর প্রত্যাশার ছাপ। তিনি ধীরে ধীরে দরজার দিকে যান। জারা তখনও চামচ মুখে তুলছে, কিন্তু কানটা দরজার দিকেই।
দরজা খোলার শব্দ। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর হঠাৎ ঘরের ভেতর কান্নার আওয়াজ।
জারার হাত থেকে চামচ পড়ে যায়। ওর বুক কেঁপে ওঠে—এই কান্না মা’র নয়, অন্যরকম, গভীর। ও উঠে দৌড়ে দরজার দিকে যায়।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন আনিছুর রহমান—জারার বাবা। দীর্ঘদিন পর ফিরে আসা মানুষ। চোখে ক্লান্তি, মুখে গভীর শান্তি। মারজিয়া বেগম ফুপিয়ে কাঁদছেন, বলছেন কিছু না, শুধু চোখে চোখ রেখে আছেন।
জারা এসে দাঁড়াতেই বাবার দিকে তাকায়—এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়, যেন সময় থেমে গেছে। তারপর হঠাৎ কান্না ভেঙে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে।

___“আব্বু!” —জারার কণ্ঠ ভিজে যায়।
জোহানও এগিয়ে এসে বাবার পেছনে হাত রাখে, মুখ নিচু করে ফেলে।
আনিছুর রহমান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বলেন
___ “বাবা এসেছি তো, তোমাদের কাছে! আবার ফিরে এসেছি, আর যাব না ।”
জারার চোখে জল টলমল করে ওঠে। বুকের ভিতর জমে থাকা অভিমান যেন কেঁপে ওঠে।
ও ফিসফিস করে বলে
__“একবারও খবর দিলে না আব্বু? আমি জানতে পারলাম না…”
আনিছুর রহমান হাসেন
___ “তোমায় সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম, মা।”
মারজিয়া বেগম দাঁড়িয়ে থাকেন একটু দূরে, চোখে লজ্জা আর কৃতজ্ঞতার মিশ্র ছায়া। জারা তাকায় মায়ের দিকে—চোখে প্রশ্ন

___“তুমি জানতে তাও কিছু বললে না কেন?”
মারজিয়া বেগম মাথা নিচু করে বলেন
__ “বললে তো সারপ্রাইজটা নষ্ট হয়ে যেতো…”
জারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি—রাগের ভিতর ভালোবাসা মিশে আছে।
খাওয়া শেষ করে হাতে ফাইল নিয়ে জারা বের হতে যায়। জারা দেখে ওর বাবা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে,
__ “দোয়া করে দাও আব্বু! ”
আনিছুর রহমান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন
___” মন দিয়ে পরীক্ষা দিও।”
মারজিয়া বেগম মুখ ফিরেয়ে নিয়ে বলেন
__ ” এখন বাবাকে পেয়ে, আমাকে ভুলেই গেছে! ”
জারা হাসে। এগিয়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে
__” তুমি তো আমার পৃথিবী আম্মু! ”
জারা বাবা কে আর মাকে পায়ের কাছে বসে সালাম করে, তারপর চোখের জল মুছে হাসে।
বলে

__ “আজ আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাওনা তুমি , আব্বু ।”
বাবা-মা দুজনেই তাকিয়ে থাকেন ওর দিকে। জারা বের হয় বাড়ি থেকে।
ঘাটের রাস্তায় আসে জারা। সকালটা ঝলমলে, নদীর হাওয়ায় মাটির গন্ধ মিশে আছে। ঘাটে পৌঁছে দেখে ফিহা আর মিম দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই সাদা পোশাকে, মুখে টেনশন লুকোনো আনন্দ। রাশেদ, আর আরমানও সেখানে। রোহান আর জিনিয়া কোথাও নেই।আরমান কাল রাতে বলেছিলো রোহান জিনিয়াকে নিয়ে ময়মনসিংহে গেছে সকালে,
জারাকে দেখে ফিহা বলে,
__“তুই কেঁদে ছিলি জানু? চোখ লাল কনে!”
জারা হালকা হেসে বলে,
__“আব্বু এসেছে।”
সবাই এক মুহূর্ত থেমে যায়—আরমানের মুখে বিস্ময়ের ছায়া, তারপর নরম হাসি ফুটে ওঠে।
মিম বলে,

__“এটা তো দারুণ খবর।”
__” কবে এসেছে? আগে তো বললি না আসবে যে!” বলল ফিহা
__” সকালে এসেছে! আর আমিও জানতাম না। ”
আরমান এসে জারা’র হাত শক্ত করে ধরে। আরমান ওকে নিয়ে যাবে। যদিও জারা না করেছিলো। কিন্তু আরমান যাবে। আরমান যাবে মানে রাশেদ যাবে। জাহেদ এখন ঘুমের দেশে।
জারা মুখ নিচু করে হেসে ফেলে। কিন্তু ওর চোখে এখনও একটু ভেজা আভা।নৌকায় চড়ার সময় বাতাসে আরমানের চুল উড়তে থাকে। আরমান তাকিয়ে থাকে জারার দিকে কিছুক্ষণ, তারপর মুখ ফিরিয়ে নেয়—ওর চোখে অদ্ভুত এক কোমলতা।
ফিহা ফিসফিস করে বলে
__“রাশেদ ভাই ওনি কোথায়?”
রাশেদ হেসে বলে,

__ “ও মনে হয় এখনো ঘুমায়। গত রাতের ঘটনার পর ঠিক ঘুমোতে পারেনি।”
আরমান জাহেদ, রোহান আর রাশেদ কে কাল রাতে ধরে। সুযোগ খুঁজছিলো আরমান। ওই দিন রাতের ঘটনা কার প্ল্যান ছিলো জিজ্ঞেস করতে । তিনজনের গলা শুকিয়ে কাঠ। রাশেদ আর রোহান দুজন মিলে সব দোষ চাপিয়ে দেয় জাহেদের উপর।
এতো বড় মীরজাফরী করলো ওর সাথে। জাহেদ করুন চোখে তাকিয়ে থাকে দুইজনের দিকে। আরমান জাহেদ আর রোহান কে সারা রাত বারান্দায় বসে থাকে বলে। যদিও রোহানের কম শাস্তি দিয়েছে আরমান। কিন্তু জাহেদ ওপর দিয়ে ঝড় ভয়ে গেছে।
আরমান জাহেদ কে ৫০০ বার বলেছে এখান থেকে নদীর ঘাটে যাবে আর আসবে। জিরানো যাবে না। জাহেদ আরমানের পা ধরে বলেছে শাস্তি কমিয়ে দিতে। কিন্তু আরমান একটুও কমায় না। বরং রোহান কে বসিয়ে রাখে। জাহেদ কে পাহাড়া দিতে।
আর রাশেদ কে শাস্তি দিয়েছে, দ্বিতীয় বার বিয়ে হওয়ার আগে যেনো মিমের আশপাশেও না যায়। আর যদি যায় তো বিয়ে কেনসেল। রাশেদ বেশি কথা বলে না। মাথা নিচু করে সব মেয়ে নেয়। আফসোস নেই। ও তো ওর ভালোবাসার মানুষ টা কে পেয়ে গেছে।
রাশেদ হেসে বলে,

__ “তবে এখন ওর প্ল্যানের জায়গায় আমার বিয়ে হয়ে গেছে তো এই আফসোসে
বুক পুরে যাচ্ছে ।”
সবাই হেসে ওঠে—শুধু মিম চুপচাপ বসে থাকে একপাশে, মুখে চিন্তার ছাপ ।
জারা দূর থেকে তাকিয়ে দেখে, ওর বন্ধুদের জীবনে এখন নতুন রঙ লেগেছে। মিম এখন রাশেদ ভাইয়ের বউ। বাড়িতে সবাই ওকে জামাই বলে ডাকে। আরমান বড় ভাইয়ের মতো সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে—বিয়ের কথা পাকা করেছে, পরীক্ষার পর হবে অনুষ্ঠান।
বাতাসে বইছে শরতের গন্ধ, কাশফুলে ভরা মাঠের উপর দিয়ে সূর্যের আলো পড়ে।
সবাই হাসছে, কিন্তু কোথাও একটা গম্ভীরতা লুকিয়ে আছে। নৌকা চলছে আপন গতিতে। পার দেখা যাচ্ছে।
আরমানের হাতে এখনো জারার হাত। জারা নদীর দিকে তাকিয়ে বলে,
___“জীবন কখন কেমন মোড় নেয়, কেউ জানে না।”
আরমান হালকা স্বরে বলে,
__“মোড় বদলায়, কিন্তু যারা পাশে থাকে—তারাই আসল।”
জারা তাকায় ওর দিকে, কিছু বলে না। শুধু হাসে—একটা নরম, শান্ত, গভীর হাসি।নৌকা ধীরে ধীরে নদীর পারে এগিয়ে যায়।

কলেজ চত্বরে সকালটা জমজমাট। গেটে ভিড়—ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, হাসি-চাপা উত্তেজনা, আর একটু গরম রোদ। আজ জারাদের পরীক্ষা। চারদিকে যেনো এক অদ্ভুত তাড়াহুড়োর পরিবেশ, কেউ শেষবার প্রশ্ন দেখছে, কেউ কলম খুঁজছে ব্যাগে।
জারা গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে যায়। হাতে ফাইল। আজ প্রথম কলজে পরীক্ষা দিবে। প্রশ্ন কেমন হয় কোনো ধারণা নেই । মুখে হালকা টেনশন—চোখের নিচে ঘুমহীনতার ছাপ। পাশে ফিহা, মিম, রাশেদ, আর আরমান।আরমানের মুখে স্বভাবসুলভ শান্ত ভাব, কিন্তু চোখে মায়া ঝলকাচ্ছে।
__“ভালো করে পরীক্ষা দিবে!” বলে আরমান, জারার দিকে তাকিয়ে।
জারা মাথা নাড়ে। হালকা হাসি দেয়, কিন্তু গলার স্বর যেনো আটকে যায়।
চারপাশের ছাত্রছাত্রীরা ওদের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ চুপিচুপি ফিসফিস করছে

—“ও না মানজারা, সঙ্গে ছেলেটা কে!”
কারও মুখে কৌতূহল, কারও চোখে ঈর্ষা।
জারা কিছুই বলে না। শুধু চুলের গোছা কানে গুঁজে নেয়, যেনো নিজের অস্থিরতা লুকাতে চায়।
ফিহার মনটা ভারী হয়ে আছে। জাহেদ আজও আসেনি। সকাল থেকে বারবার ফোন দিয়েছে, কিন্তু লাইন কেটে যায়। মুখে কিছু না বললেও চোখে তার অভিমান স্পষ্ট।
রাশেদ পাশে এসে বলে
__“মন খারাপ করো না বোন,এখন পরীক্ষা আগে দেও, জাহেদ স্যার দেখে করে নিবে।”
ফিহা শুধু মাথা নাড়ে, কিছু বলে না।
রাশেদ মিমের ফাইল টা খুলে দেখে, তারপর বলে,
__“সব কিছু নিয়েছো তো? কলম আছে ? বাড়তি একটা রাখো, দরকারে লাগবে।”
মিম হালকা হেসে বলে

__ “এমন ভাব করছে মনে হচ্ছে আমি বাচ্চা? প্রয়োজনীয় জিনিস ঠিক মতো আনব না।”
ওদের কথায় একটু হালকা ভাব আসে, তবুও বাতাসে টেনশন মিশে আছে।
আরমান পাশের দোকান থেকে তিনটা পানির বোতল নিয়ে আসে। ঘাম মুছে প্রত্যেকের হাতে একটা করে দেয়।
__“নাও, ঠান্ডা পানি। ভিতরে গরম বেশি থাকবে।”
__“ আরে ভাইয়া এটা শুধু কলেজের সাধারণ পরীক্ষা। আমরা বোর্ড পরীক্ষা দিচ্ছি না? ” বললো ফিহা।
জারা বোতল নেয়, হালকা হেসে বলে,
___“আপনারা এমব করছেন কেনো?আমরা কী বাচ্চা যে, আজ প্রথম পরীক্ষা দিব?”
___” হুম বাচ্চা! এখন রাখো চুপচাপ! ”
__” আপনি একদম আমার আব্বুর মতো সব দিকে লক্ষ রাখেন আর কেয়ার করেন!”
আরমান মৃদু হেসে বলে

__ “আমি কেয়ার না করলে কে করবে, বলো?”
এক মুহূর্তের জন্য ওদের চোখ মেলে যায়। চারপাশের কোলাহলের মাঝেও সময় যেন থেমে যায়। তারপর হঠাৎ—আরমান হাত বাড়িয়ে জারার কপালে আলতো করে চুমু খায়।
সবকিছু থমকে যায়। জারার বুক কেঁপে ওঠে, মুখ লাল হয়ে যায়। ও চোখ নামিয়ে ফেলে, কিছু বলে না। শুধু ঠোঁটে হালকা হাসি, আর বুকের ভেতর কেমন এক ধক্‌ ধক্‌ শব্দ।
ফিহা পাশে তাকিয়ে দেখে, চুপ করে হাসে।আর ফিসফিস করে বলে
—“এটা কলেজ ভাইয়া! মেয়েটা কে লজ্জায় ফেলবেন না ।”
আরমান হেসে নিজের মাথা চুলকাতে থাকে।
জারা কিছু না বলে দরজার দিকে হাঁটে। পরীক্ষার হলের ঘণ্টা বাজতে আর দু’মিনিট বাকি।

কলেজের বাইরে রোদটা একটু কমেছে। পরীক্ষার হলের দরজা বন্ধ, ভেতরে নিস্তব্ধতা—বাইরে শুধু হালকা কোলাহল। ছায়াঘেরা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আরমান আর রাশেদ।
দুজনের মুখে একরাশ বিরক্তি আর একঘেয়েমি।
জারা, মিম আর ফিহা এখন পরীক্ষার হলে। তিন ঘণ্টা সময় — কিন্তু এই তিন ঘণ্টা যেন তিন বছর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরমান একটা লাঠি হাতে ঘাসে দাগ কাটতে কাটতে বলে,
__“তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলে আমি তো বুড়ো হয়ে যায় রে রাশেদ!”
রাশেদ হাই তুলে বলে,
___“তাহলে বসে থাকি স্যার, তাতেও সময় যাবে।”
আরমান বসে পড়ে গাছের গোড়ায়। দু’মিনিটও যায় না, আবার উঠে দাঁড়ায়।
___“না, না, বসেও ভালো লাগছে না। ঘড়ি দেখিস তো? কয়টা বাজে?”
রাশেদ ঘড়ি দেখে বলে,
___“সবে এগারোটা ত্রিশ। এখনো আড়াই ঘণ্টা বাকি।”
আরমান চোখ বড় বড় করে বলে,

___“তুই কি পাগল? সময় তো এগোয় না!”
রাশেদ হাসে, “তাহলে কী করি স্যার?”
আরমান ভাবে, তারপর বলে, “তুই একটা উপায় বের কর। সময় কাটানো দরকার। দাঁড়িয়ে থাকলে কোমড়ে লাগছে।”
রাশেদ মাথা চুলকায়। একটু ভেবে বলে,
___“চলুন স্যার, হাঁটতে যাই।”
আরমান চোখ ঘুরিয়ে বলে,
__“তুই কী বউ না-কি, যে তোর সাথে হাটতে যাবো ?”
রাশেদ একটু থেমে বলে,
___“তাহলে গল্প করি, স্যার।”
___“তুই যা গল্প করিস, শুনলেই মাথা ব্যথা শুরু হয়,”
আরমান বলে গম্ভীর মুখে।
__“তাহলে স্যার, গান গাই?”
আরমান কপালে হাত দিয়ে বলে,
__“তুই গাইলে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যাবে। এটা কলেজ এলাকা, শ্মশান না।”
রাশেদ একটু ভেবে হেসে বলে,

__“তাহলে আমরা ছবি তুলতে পারি।”
আরমান হালকা রেগে বলে,
__“তুই বুঝি মেয়েদের ইনফ্লুয়েন্সারে ভর্তি হয়ে গেছিস! আমি বসে সেলফি তুলবো?”
রাশেদ চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর বলে,“তাহলে গেম খেলি?”
আরমানের চোখ চকচক করে ওঠে।
“গেম? কোনটা?”
“মোবাইলে, স্যার,” রাশেদ বলে।
“না না না,” আরমান তাড়াতাড়ি বলে, “ওসব বাজে গেমে চোখ নষ্ট হয়। আমি মোবাইল গেম খেলি না।”
রাশেদ হাঁফ ছাড়ে,
__ “তাহলে কী করি স্যার? সময় কাটবে কিভাবে?”
আরমান একটু নীরব থাকে, তারপর বলে,
__“তুই না বলেছিলি তোর দাদু নাকি গ্রামের অনেক খেলা জানতো? তোর কিছু মনে আছে?”
রাশেদ চোখ ঘুরিয়ে ভাবে, তারপর হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে,“আছে স্যার! আসেন একটা খেলি—একদম গ্রামের, পুরান দিনের খেলা।”
আরমান আগ্রহভরে বলে, “কি খেলা?”
রাশেদ হাসি আটকাতে না পেরে বলে,

__“কুত কুত!”
আরমান ভুরু কুঁচকে বলে,
__“কী কুত কুত? তুই আবার অশ্লীল কিছু বললি না তো?”
রাশেদ হতভম্ব হয়ে বলে,
__“না স্যার! এটা অশ্লীল খেলা না!”
__” তোর মতলব ভালো না রাশেদ! তুই আমার সাথে দূরে থাক!”
__“এটা গ্রামের খেলা! ধান কুত কুত! কাঠি লুকানো খেলা!”
আরমান কৌতূহল নিয়ে বলে,
__“শোনা দেখি কেমন খেলা।”
রাশেদ এখন পুরো শিক্ষক মোডে ব্যাখ্যা শুরু করে—“স্যার, একটা ছোট কাঠি নিতে হবে। তারপর ঘাসের ভিতরে লুকাবো। আপনি খুঁজে পাবেন কি না, সেটাই খেলা।”
আরমান চোখ বড় বড় করে বলে,
__“এটা তো খুব সহজ!”
রাশেদ গর্বিত ভঙ্গিতে বলে,
__“সহজ ভাবছেন তো, কিন্তু খুঁজে না পেলে মাটিতে বসে ‘ধান কুত কুত’ বলতে হবে।”
আরমান হেসে বলে,

__“তুই খেলা শেখাতে শেখাতে নাটক শেখালি!”
দুজনেই এখন মাঠের এক পাশে গোল হয়ে বসে। আশেপাশে কয়েকটা পিঁপড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে, বাতাসে গাছের পাতা দুলছে।
রাশেদ ঘাসের একদিকে তাকিয়ে কাঠিটা লুকিয়ে ফেলে, মুখে গুনগুন করে—
__“ধান কুত কুত… ধান কুত কুত…”
আরমান চুপ করে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে,
__“দম শেষ? এখন খুঁজা শুরু?”
রাশেদ নাটকীয়ভাবে বলে,
__“হ্যাঁ স্যার, শুরু করুন।”
আরমান মনোযোগ দিয়ে ঘাস নেড়ে দেখে।
“এই তো পেলাম!”সে কাঠি তুলে নেয়।
রাশেদ হতভম্ব,
_“এটা কিভাবে বুঝলেন স্যার?”
আরমান হেসে বলে, “তুই কাঠি রাখার সময় চোখ এদিকেই ছিল। তোর চোখে ধরা খেয়ে গেলি!”
রাশেদ মুখ বাঁকিয়ে বলে, “চিটিং স্যার, চিটিং!”
আরমান গম্ভীরভাবে বলে,

__“ চিটিং কই করলাম? ভালো ভাবে খেলে জিতেছি। এখন তোর পালা।”
রাশেদ কাঠি নেয়, এবার সে খুঁজবে।
আরমান এবার চোখ বন্ধ করে কাঠি লুকায়। মুখে গম্ভীর ভঙ্গি—“ধান কুত কুত…”
রাশেদ চুপ করে বসে, আর মনে মনে ভাবে, “এই স্যার যেনো ডিটেকটিভ হয়ে যায়নি।”
আরমান বলে, “শুরু কর!”
রাশেদ ঘাস নেড়ে, মাটি ঘেঁটে, হালকা কাঁদায় হাত ঢুকিয়ে—সব জায়গা খুঁজে ফেলে। তবুও কাঠি মেলে না।
শেষে বিরক্ত হয়ে বলে,
___“স্যার, কাঠি কই?”
আরমান হেসে পকেট থেকে বের করে বলে,
___“এখানে!”
রাশেদ অবাক হয়ে বলে,
“স্যার! এটা তো নিয়মবিরুদ্ধ!”
আরমান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
__“জীবনে জেতার জন্য নিয়ম ভাঙতে হয়, গাধা।”

দুজনেই হেসে গড়িয়ে পড়ে। হাসতে হাসতেই সময় কখন পেরিয়ে যায়, বোঝা যায় না।একসময় কলেজের ভেতর থেকে ঘণ্টা বাজে। পরীক্ষা শেষের সংকেত।
রাশেদ ঘড়ি দেখে বলে,“স্যার! তিন ঘণ্টা শেষ!”
আরমান বিস্মিত হয়ে বলে,“সত্যি? কুত কুতেই তিন ঘণ্টা কেটে গেল?”
রাশেদ হেসে বলে,“দেখলেন তো স্যার, গ্রামের খেলাতেই মজা।”
আরমান হালকা হেসে বলে,
“তুই ঠিকই বলেছিলি, রে রাশেদ। মাঝে মাঝে কুত কুত খেললেও সময় সুন্দর কেটে যায়।ভাবচ্ছি বিয়ের পর তোর ভাবির সাথে ও খেলব! ”
রাশেদ আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে।
“ এই ভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? খারাপ কিছু বলেছি আমি? ”
রাশেদ বোকার মতো করে বলে “ বলেছেন তো স্যার!”

__“ একদম মিথ্যা অপবাদ দিবি না! আমি ভালো মানুষ! ”
ওরা উঠে দাঁড়ায়, কাপড় ঝেড়ে নেয়। দূর থেকে জারা, মিম আর ফিহাকে বের হতে দেখা যায়।
আরমানের মুখে তৃপ্তির হাসি
—“চল, আমাদের বিজয়িনী দলকে নিতে যাই।”
রাশেদ হেসে বলে,
__“কিন্তু স্যার, কুত কুত খেলার চ্যাম্পিয়ন তো আপনি।”
আরমান হেসে বলে,
__“বউ নিয়ে এখনো মাঠে নামিই নি!চ্যাম্পিয়ন হলাম কখন !”
__” ছিঃ! অশ্লীল শব্দোচ্চারণ করেন স্যার!”
__” আমাকে অশ্লীল বলিস?তোর বিয়ে আর এই জীবনে হবে না! ”
“ উচিত কথাও এখন বলা যাবে না! হুমকি দিয়ে বিয়ে পিছিয়ে দিবে?যতো ঝালা আমার! ’মনে মনে কথা গুলো বলে রাশেদ
বাতাসে ভেসে আসে ঘণ্টার শব্দ, রোদে গাছের ছায়া লম্বা হয়ে যায়। কলেজের সামনে দুই জন দাঁড়িয়ে—একজন প্রেমে হেরে, খেলায় জিতে; আরেকজন খেলায় হেরে, বন্ধুত্বে জিতে।তিন ঘণ্টা যেন জীবনের সবচেয়ে মজার অপেক্ষা হয়ে গেল।

কলেজের পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় সবার মুখে হাসি। জারা, ফিহা আর মিম—তিনজনের মুখে তৃপ্তির ছাপ। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রাশেদ আর আরমান। দুজনের চোখে উৎকণ্ঠা—তারা অপেক্ষা করছিল অনেকক্ষণ ধরে। আরমান দৌড়ে জারা ‘র কাছে এসে ফাইলটা হাতে নিয়ে বলে,
— “বউ, কেমন হলো পরীক্ষা?”
জারা হালকা হাসে, ঘেমে থাকা মুখটা হিজাবের কোনা দিয়ে মুছে বলে।
— “ভালোই হয়েছে।”
আরমান জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
রাশেদ মিমকে বলে,
— “তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছে মিম?।”
মিম হেসে উত্তর দেয়,
— “ ভালো হয়েছে ।”
আরমান ফিহার দিকে তাকিয়ে বলে
__” সিস্টার! তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছে? ”
__” ভালো হয়েছে ভাইয়া! ”

আরমান সবাই কে নিয়ে কাছের একটা রেস্টুরেন্টে যায়। দুপুরের রোদে ছাতার নিচে বসে তারা খাওয়া দাওয়া শেষ করে । রাশেদ খাওয়া শেষে বলে,
— “স্যার, এখন থেকে কী আমরা প্রতিদিন এসে পরীক্ষার হলের সামনে বসে থাকব?”
আরমান হেসে বলে,
— “ এটা তোর ভাবির উপর নির্ভর করছে। ”
আরমান জারাকে জিজ্ঞেস করে
__” বউ! আর কয়টা পরীক্ষা আছে? ”
জারা মুখ কালো করে জবাব দেয়।
__” আজ থেকে মাএ দেওয়া শুরু করলাম! এখনই জিজ্ঞেস করছেন কয়টা আছে?”
সবাই হেসে ওঠে। হাসির রেশে দুপুরটা কেটে যায়। তারপর সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যায়।

সময় গড়িয়ে যায়। একে একে সব পরীক্ষা শেষ, শুধু একটা বাকি—আইসিটি। পরীক্ষার আগে তিন দিনের ছুটি। কিন্তু আজ রাতটা অন্যরকম।
ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁয়েছে। আরমান সোফায় বসে আছে, মোবাইল হাতে। পর্দায় লক্ষী বউ নাম জ্বলছে— “Calling…”
কিন্তু কোনো সাড়া নেই। একবার, দু’বার, তিনবার—প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর কল দিচ্ছে, কিন্তু মোবাইলটা বারবার বন্ধ পাচ্ছে।
আরমানের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা জন্ম নেয়। মনে হয়, কিছু একটা হয়েছে।
সে ফিসফিস করে বলে,
— “আমার বউটার একটুও মায়া দয়া নাই! কতো দিন হলো ভালো করে কথা হয় না, একটু নিজ থেকে কল করে কথা বলবে, তা না করে মোবাইল বন্ধ করে বসে আছে। …”
রাশেদ আরমানের পাশে বসে কোম্পানির কাজ করছিলো। নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের পথে।এখনো শুধু সুন্দর করে গুছিয়ে ওপেনিং করা বাকি।রাশেদ আরমানকে চিন্তিত দেখে বলে,

— “স্যার, হয়তো চার্জ শেষ। চিন্তা কইরেন না।”
আরমান মৃদু গলায় বলে,
— “তুই বুঝবি না রাশেদ, কতো দিন ঠিকমতো কথা হয় নাই। আজ ভেবেছিলাম একটু কথা বলবো…”
চোখে বিরক্তি, মনে রাগ, আর বুকের ভেতর অস্থিরতা।
রাশেদ ও বলে
__“ বউ মানেই নির্দয়! আমার বউ তো নিজ থেকে কল করেই না। আর যাওয়ার কথাও বলে না। যদিও আব্বু আম্মু বলে যাওয়ার কথা। কিন্তু লজ্জা করে। ”
__“ তোর সুযোগ আছে শশুড় বাড়িতে যাওয়ার। কিন্তু আমার? ভাবছি তোদের বিয়ে পর আব্বু কে নিয়ে জারা’র মা-বাবার সাথে কথা বলতে যাব! বউ ছাড়া আর ভালো লাগে না! ”

অন্যদিকে জারার ঘরে শান্ত পরিবেশ।
পরীক্ষার চাপ কমে গিয়ে মনটা হালকা লাগছে।
আজ সে বাবা—আনিছুর রহমান—এর সাথে মন খুলে গল্প করছে। এই কয়দিন পরীক্ষার টেনশনে বাবার সাথে কথা বলার সময়ই পায়নি। তাই আজ গল্পের শেষ নেই।
বাবা মেয়ে দুজনই ডাইনিং টেবিলে বসে পুরনো দিনের কথা বলছে। বাবা হেসে বলেন,
— “তোর ছোটবেলায় তুই কিন্তু খুব বদ ছিলি, জানিস?”
জারা হেসে বলে,
— “এখন কিন্তু ভালো হয়ে গেছি আমি।”
দুজনেই হেসে ওঠে।মারজিয়া বেগম পাশে বসে তাকিয়ে আছেন—মেয়েকে হাসতে দেখলে তাঁর চোখেও জল আসে।
রাত দশটা। সবাই খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে যায়।জারা নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়।হালকা বাতাসে পর্দা নড়ে ওঠে।
টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা চোখে পড়ে—বন্ধ।
জারা মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফিসফিস করে,

— “ওরে বাবা… আজ সারাদিনেই অন করিনি।”
সুইচ অন করতেই ডিং…ডিং… করে নোটিফিকেশন বেজে ওঠে।৮০৩টা মিস কল, ১৯৭টা মেসেজ। সব একই নাম—“স্বামীজান💙”
জারার মুখ শুকিয়ে যায়। বুকের ভেতর কাঁপুনি।
মনে হয়, এখনই যদি ও সামনে থাকতো, তাহলে বকাবকি খেয়ে কেঁদে ফেলতো।
চোখে জল চলে আসে।
— “এই কদিন ঠিকমতো কথা হয়নি, আজ একটু কথা বলতে চেয়েছিলো হয় তো, আর আমি…নিশ্চয় রেগে আছে.. ”
ওর হাত কাঁপতে থাকে। ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ—সব মিলে বুক ভারি হয়ে যায়। জারা বারবার ভাবে, “এখন কীভাবে রাগ ভাঙাবো?”
রুমে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, “যদি একটা ছবি পাঠাই…” মাথায় বাজের মতো আইডিয়া আসে।
ওয়ারড্রব খুলে জারা তাকিয়ে থাকে জামাগুলোর দিকে। তার চোখ পড়ে একটা লাল রঙের পাকিস্তানি শারারায়—যেটা আরমান গিফট করেছিলো ওকে।ওর ঠোঁটে হালকা হাসি ফোটে।

— “আমাকে লাল রঙে দেখতে চায় , তাই না স্বামীজান? তাহলে আজ দেখেবেন।”
রুমের দরজা খুলে দেখে, মা-বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে।বুক থেকে নিঃশ্বাস পড়ে বের হয়।
হালকা করে দরজা লাগিয়ে আবার রুমে ফিরে আসে।
আলমারির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজতে শুরু করে। লম্বা চুলগুলো আলতো করে খুলে ফেলে।
চোখে একটু কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক।
হাতের চুড়িগুলো একটার পর একটা পরে নেয়।
তারপর শারারাটা গায়ে দেয়।আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে একটু হাসে—সাজগোজ মানে শুধু নিজের জন্য নয়, প্রিয়জনের জন্যও।
আরমানের দেওয়া জামাটা অনেক বারি। এই ৩৮ কেজি শরীরে ১০ কেজি ওজনের মাজা পরেছে সে। যদিও এখন পর্যন্ত দুই এক বার হুঁচট খেয়ে পেরে গেছে। কিন্তু কোনো ব্যপার না। এই টুকু তো সহ্য করাই যায়।
ওর গলায় হালকা গন্ধ ছড়ায়—আরমানের দেওয়া পারফিউমের। মোবাইলটা টেবিলে রেখে টাইমার সেট করে সেলফি তোলে—একটা, দুইটা, তিনটা। প্রথম ছবিটা দেখে ওর মুখে লজ্জার হাসি—“না, এটা বেশি সিরিয়াস।” ওড়না নেওয়া না এটায়।
দ্বিতীয়টা দেখে,

__“এইটা মিষ্টি।” মাথায় সুন্দর করে ওড়না দেওয়া। পুরো বউ বউ লাগছে তাকে।
তৃতীয়টা দেখে,
___ “এইটা পারফেক্ট।” মাথায় ওড়না দেওয়া আর মুখে মিষ্টি একটা হাসি টানা।
ছবিটা বেছে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে যায়। আরমানের চ্যাট ওপেন করে টাইপ করে
—“সরি স্বামীজান! মোবাইল বন্ধ ছিলো। রাগ করো না প্লিজ।”
তারপর ছবিটা পাঠিয়ে দেয়। মেসেজটা সেন্ড হতে না হতেই জারার বুক ধকধক করতে থাকে।
মনে হয়, এখনই রাগী স্বামী ফোন করবে।

রাত দশটা পেরিয়েছে।আরমান বসে আছে ল্যাপটপ খুলে, কোম্পানির ফাইন্যান্স রিপোর্ট তৈরি করছে।স্ক্রিনে লাইন লাইন হিসাব, চোখে ক্লান্তি।বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। ঘর নিঃস্তব্ধ।
রাশেদ একটু আগে বেরিয়ে গেছে।ওর শাশুড়ি ফোন করে বলেছে,আজ রাতে খাওয়ার জন্য যেনো আসে তারা অপেক্ষায় থাকবে ।”
রাশেদ তো খুশিতে আটখানা, যাওয়ার সময় বলে গিয়ে ছিলো আরমান কে ওর সাথে যেতে।কিন্তু বারণ করে দেয় কাজ আছে বলে।
তাই রাশেদ জাহেদ কে নিয়ে যায় সাথে করে। ,
জাহেদও রাশেদের এক কথায় রাজি হয়ে যায়। জাহেদ আসলে গিয়েছিলো ফিহাকে দেখতে।মিম আর ফিহার বাড়ি প্রায় অনেক টা কাছে। অনেক দিন দেখা নেই, কথা ও হয় ভালো করে। নিশ্চয় অনেক অভিমান করছে ওর উপর? জাহেদ ভাবছে, “যাওয়ার আগে একবার দেখা না হলে মন শান্তি পাবে না।”
কিছু দিন পর থেকে রাশেদের বিয়ে তুর জুর শুরু হয়ে যাবে। তাই আরমান জাহেদ কে বলেছে ময়মনসিংহে বেক করতে। তারপর রাশেদের বিয়ের দিন আসবে।
আরমান ল্যাপটপে মনোযোগ দিচ্ছে।কোথাও একটা ভুল হচ্ছে, রিপোর্টের হিসাব মিলছে না।ঠিক তখনই হঠাৎ “টিং” করে একটা নোটিফিকেশন।
ওর চোখ চলে যায় মোবাইলের স্ক্রিনে।

“লক্ষী বউ 💞 sent a photo.”
এক সেকেন্ড স্থির থাকে।রাগ আছে, কিন্তু কৌতূহলও জাগে মনে।ভাবছে, “কি পাঠাইল আবার! রাগ ভাঙাতে নতুন চাল! নাকি ঘুষ দিয়ে আবার মন গলানোর চেষ্টা?”
ল্যাপটপ বন্ধ করে মোবাইল হাতে নেয়।ওপেন করতেই চোখ স্থির হয়ে যায়।মনে হয় সময় থেমে গেছে।
ছবিতে জারা—হালকা আলোয় লাল পাকিস্তানি শারারা। যেটা সে জারাকে গিফট করে ছিলো।জারা’র চোখে কাজল, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি।
আর সেই একটুখানি “সরি স্বামীজান” লেখা মেসেজ।
আরমানের বুকের ভেতর ধপ করে কিছু একটা নড়ে ওঠে।হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় পড়ে যায়।
ওর গলায় শব্দ আটকে যায়।
বিছানায় শুয়ে পড়ল ও।চোখ বন্ধ করে বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছে।নিজের বুকের উপর হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল,

— “এই মেয়ে আমাকে শেষ করে দেবে একদিন… রাগ তো দূরের কথা, নিঃশ্বাসই বন্ধ হয়ে যায়।”
হঠাৎ মনে হলো, এই নীরবতা চলবে না। আমার এই বালের রাগ ভাঙানোর দরকার নেই,আমার এখন বউকে ভালোবাসা দেখানো দরকার।
তাই আরমান সময় নষ্ট না করে WhatsApp খুলে ভিডিও কল দেয় জারাকে।
ওদিকে জারা তখনও ফোনটা হাতে নিয়ে বসে।
বারবার স্ক্রিনে তাকাচ্ছে, কেউ লিখছে না, শুধু “Delivered।”
হঠাৎ ফোনটা কাঁপতে শুরু করে।স্ক্রিনে লেখা —
“স্বামীজান💙 Video Calling…”
জারার বুক ধক করে ওঠে।মুখে একসাথে ভয় আর লজ্জা। হাতের তালু ঘেমে যায়।
একটু ইতস্তত করে, তারপর ধীরে ধীরে “Accept” বাটনে চাপ দেয়।
স্ক্রিনে মুখ আসে আরমানের।চোখে আগুন আর স্নেহ মিশে আছে একসাথে।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।দুজনেই শুধু তাকিয়ে থাকে একে অপরের দিকে।
আরমানের চোখ স্থির হয়ে আছে স্ক্রিনে।
ও যেনো নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। চোখের সামনে বসে আছে সেই মেয়েটি—
যার সাথে সে রাগ করে, ভালোবাসে, হারিয়ে যায় প্রতিদিন।
জারা নিচু স্বরে বলে,

— “রাগ করেছেন?”
আরমান কিছু বলে না, শুধু তাকিয়ে থাকে।
জারা মুখ নামিয়ে হেসে বলে,
— “মোবাইল বন্ধ ছিলো, চার্জ শেষ… সরি।”
আরমান তখনও চুপ, ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি।
জারার লজ্জা বাড়তে থাকে।স্ক্রিনে নিজের মুখও আর দেখছে না, শুধু আরমানের চোখে নিজের প্রতিবিম্ব।
আরমান মৃদু গলায় বলে,
— “বউ, আমি এখন যদি তোমাকে সামনে থেকে না দেখি, তাহলে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যাবো?”
জারা মৃদু হাসে,
— “রাগ ভাঙেছে নাকি অন্য কিছু করতে হবে ।”
— “রাগ ভেঙে, হার্টবিট বন্ধ হয়ে গেছে ।”
জারা মুখ নিচু করে লজ্জায় গাল লাল করে ফেলে।
আরমান নরম গলায় বলে,

— “বউ আমি এখন আসি তোমার সাথে দেখা করতে ?”
জারা চমকে উঠে। এতো রাতে আসবে। আবার এখনর ওর আব্বুও বাড়িতে। জারা হেসে বলে
— “ আগে বলুন আমাকে কেমন লাগছে।”
— “একদম আমার রানি সাহেবা। আমার লক্ষী বউ ।”
ওদের দুজনের কথার মাঝে এক ধরণের শান্তি নেমে আসে।বাইরে বাতাস বইছে, ঘরের ঘড়ি টিকটিক করছে, কিন্তু সেই শব্দও হারিয়ে যায়।
আরমান ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
— “বউ একবার দাড়াঁও তো দেখি কেমন লাগছে।”
জারা’র মুখ ফ্যাকাসে হয়ে। এটা যেই ভারি জামা। দাঁড়ালেই না পরে যাবে সে,
আরমান আবার বলে
— “কি হলো বউ দেখাবে না।”
— “হুমম।”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৫

জারা আর কিছু না বলে ড্রেসিং টেবিল এর উপর মোবাইল টা রেখে। সুন্দর করে উঠে দাঁড়ায়।
আরমান তাকিয়ে আছে মোবাইলের স্কিনে। তার মিষ্টি বউটাকে মন বরে দেখছে সে।
জারা নার্ভাস ফিল করে আরমানের চাহনি দেখে। সুন্দর করে ওড়না ঠিক করে দাঁড়িয়ে আরমান কে দেখাবে। এমনি… ধপ করে পরে গেছে।
আরমান তাকিয়ে ছিলো।হঠাৎ এই ভাবে পরে যেতে দেখে আত্মা কেঁপে ওঠে ওর। তাড়াতাড়ি মোবাইল টার দিকে তাকিয়ে বলে
__” বউ কি হয়েছে? দাঁড়া আমি এক্ষুনি আসছি। ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here