Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫১
সোহানা ইসলাম

রোহান মোবাইল হাতে নিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে আগুন, ঠোঁট কামড়ে ধরে বলছে
— “আজকে যদি পারতাম, ঐ মীরজাফরের বাচ্চা জোহানকে মোবাইল থেকেই এমন এক ধাক্কা দিতাম, সরাসরি মেঝেতে পড়ত!”
সে জিনিয়াকে ভিডিও কল করে। জিনিয়া স্ক্রিনে আসতেই মিষ্টি হেসে বলে
— “কী হয়েছে? এমন ফুঁসছো কেন?”
কিন্তু উত্তর দেওয়ার আগেই জোহান হঠাৎ মুখ গলিয়ে ফোনের সামনে এসে দাঁড়ায়। ছোট্ট বাচ্চা হলেও একেবারে গম্ভীর ভঙ্গি।
___“হ্যালো হিংসুটে ভাইয়া! দেখো, আমি কিন্তু কিউটি গার্লের একদম পাশে বসে আছি। আমের আচার খেতে খেতে ভাব জমাচ্ছি ওর সাথে। পরে টুপ করে চুমু খেয়ে নিবো ভাবছি!”
রোহান চিৎকার দিয়ে ওঠে—
___“এই মীরজাফর , চুপ কর! তুই সর ওর কাছ থেকে, না হলে…”
জোহান পাকা গলায় বলে

___“না হলে কী করবে ভাইয়া? বড়’রা তো মারামারি করে না। তুমি তো আমার থেকে অনেক বড়—এভাবে জেলাস হলে তো ছোটদের মতো লাগবে।”
রোহান থমকে যায়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবার গর্জে ওঠে
____ “এই যে দুষ্ট বাচ্চা, তুই কি আমাকে শিখাবি? তোকে মাথায় তুলে আছার মেরে ভর্তা করে দেব!”
জোহান ভীষণ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে
____“ভাইয়া, শান্ত থাকো। ডাক্তার বলে, রাগ করলে গ্যাস্ট্রিক হয়। তুমি গ্যাস্ট্রিকে ভুগবে, আমি তো কেবল পাশে বসেছি।”
জিনিয়া হেসে ফেটে পড়ে। স্ক্রিনে তার হাসি দেখে রোহানের আরও রাগ বাড়ে।
____ “জিনিয়া! তুমি হাসছো কেনো?।”
__“আরে, ও তো বাচ্চা ছেলে, মজা করছে। আপনি এতো সিরিয়াস হচ্ছেন কেন?”
কিন্তু জোহান ছাড়ার পাত্র না। সে আবারও ফোনের সামনে এসে পাকা কণ্ঠে বলে

—“শুনো ভাইয়া, জেলাসি করলে কিন্তু মেয়েরা হাসে। তোমার কিউটি গার্লও হাসছে। এখন তুমি যদি কাঁদতে শুরু করো, আমি টিস্যু এনে দেব।”
রোহান হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে, মনে মনে ভাবে—“এই বাচ্চা ছেলেটা যদি আরেকটা কথা বলে, আমি ফোনের ভেতরেই ঢুকে ওকে ধরে বের করে আনব।”
__ “তুই কি জানিস আমি তোকে পেটাতে পারি?!”
জোহান একটু ভেবে বলে
___ “জানতাম… কিন্তু এখন বুঝলাম তুমি শুধু ভয় দেখাও। বড়রা শুধু ছোটদের ভয় দেখায়, মারতে পারে না। তাই না ভাইয়া?”
জিনিয়া একেবারে হাসতে হাসতে শেষ। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বলল
—“আচ্ছা, আচ্ছা, অনেক হয়েছে। জোহান, তুমি যাও তো, আমি তোমার হিংসুটে ভাইয়ার সাথে কথা বলব।”
জোহান নাটকীয় ভঙ্গিতে বিছানা থেকে থেকে উঠে দাঁড়ায়, দরজার দিকে হাঁটে। বের হওয়ার আগে আবার মুখ গলিয়ে বলে

—“ভাইয়া, কিউটি গার্লকে কেয়ার করতে হলে আগে জেলাসি কন্ট্রোল করতে শিখতে হবে। আমি গেলাম, তুমি রিল্যাক্স করো।”
চোখ বন্ধ করে রোহান চুপচাপ বসে থাকে। তার মুখ লাল, কান লাল, পুরো শরীর জ্বলে যাচ্ছে। জিনিয়া মিষ্টি হেসে বলে
__ “রাগ করছেন কেনো, ও তো বাচ্চা মানুষ ।”
রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে
__ “তুমি জানো না, তোমার পাশে অন্য কাউকে দেখলেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। সেটা বাচ্চা হোক বা অন্য কেউ। ”
জিনিয়া মিষ্টি গলায় উত্তর দেয়
___ “তাহলে মাথা খারাপ করবেন না, আমি তো আপনারই। ”

ড্রইং রুমে হালকা গুঞ্জন। রাতের চাঁদের ম্লান আলো জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। খোলা টিভি টলির পর্দায় ঝলমলে বিজ্ঞাপন চলছে, কিন্তু কারও দৃষ্টি সেদিকে নেই। সবাই ব্যস্ত, সবাই চিন্তিত। কেউ কুশন উল্টাচ্ছে, কেউ পর্দার আড়ালে তাকাচ্ছে, আবার কেউ হাপরের মতো নিঃশ্বাস নিচ্ছে। যেন একটা অদৃশ্য আতঙ্ক ছড়িয়ে আছে।
ঠিক তখনই জোহান, তার নিজস্ব ভঙ্গিতে ড্রইং রুমে প্রবেশ করে। হালকা ঢোলা প্যান্ট, গায়ে কার্টুন প্রিন্টের টি-শার্ট, চোখেমুখে চঞ্চল কৌতূহল। এসে থমকে দাঁড়িয়ে জারাকে জিজ্ঞেস করল—
— “বোনু, তোমরা কী খুঁজছো গো? সবাই এত টেনশনে কেন?”
তার এই প্রশ্ন শুনে এক মুহূর্তের জন্য সবাই থেমে যায়। মিম চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে বলে—
— “জোহান, তুমি আমার মোবাইল দেখেছো? কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।”
জোহান একটু ভেবে গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ে।
— “না গো আপু, আমি তো কিউটি গার্লের কাছে ছিলাম।”
এই কথায় ঘরে খানিকটা চিন্তা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মিমের মন খারাপ হয়ে আছে, তার ভেজা চোখ জ্বলজ্বল করছে।
ফিহা ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসে পড়ে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে

— “এত খুঁজেও কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। মাথা ঘুরে যাচ্ছে আমার ।”
মারজিয়া বেগমের শরীর ভালো লাগছে না। মাথাব্যথায় কপাল চাপতে চাপতে তিনি ধীরে ধীরে নিজের রুমে চলে গেলেন। জারা ফিহার পাশে গিয়ে বসল, সান্ত্বনা দিতে হাত রাখল তার কাঁধে।
মিম প্রায় কেঁদে ফেলল। গলাটা কেঁপে উঠল—
— “ওই মোবাইলে আমার কত স্মৃতি আছে জানিস? ছবি, নোট—সবই তো হারিয়ে যাবে।”
তার কান্না দেখে সবার মুখে গাম্ভীর্য নেমে এল।
জোহান তখনো ছুটে বেড়াচ্ছে, ছোট্ট গোয়েন্দার মতো সবদিকে খুঁজে দেখছে। হঠাৎই তার চোখ পড়ে টিভি টলির পিছনে। ছোট্ট হাত দিয়ে টেনে বের করল একটা মোবাইল। আনন্দে লাফাতে লাফাতে সবাইকে দেখাতে নিয়ে আসে—
— “এই দেখো! আমি মোবাইল পেয়েছি!”
সবাই ঝুঁকে আসে তার দিকে । মিম দৌড়ে এসে মোবাইলটা নিয়ে ভালো করে দেখে। তারপর কপালে হাত চাপড়ে বলে—

— “আরে এটা না! এইটা আমার না।”
অবাক হয়ে সবাই তাকিয়ে থাকে। মিম মোবাইলটা অন করে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে দুইজন বৃদ্ধা কাপালের ছবি। ওরা কারা, কেউ চেনে না।
জারা ভ্রু কুঁচকে বলে
— “এ মোবাইলটা এখানে এলো কোথা থেকে?”
সবাই স্তব্ধ। মিমের চোখে দুশ্চিন্তা আরও গভীর হয়। ফিহা তো সোফায় বসে আছে যেন হতবাক হয়ে।
তখন হঠাৎ জোহান হাত তালি দিয়ে বলে
— “আরে এতো চিন্তা করছো কেন? কারও ফোন থেকে কল দাও মিম আপুর নম্বরে। তাহলেই তো বোঝা যাবে মোবাইলটা কোথায়।”
সবাই এক মুহূর্ত চুপ থাকে। তারপর একসাথে বলে ওঠে—
— “আরে এটা তো কারো মাথায়ই এল না!”
ফিহা তাড়াতাড়ি নিজের মোবাইল বের করে কল দেয় মিমের নম্বরে। রিং হতে থাকে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—ঘরের কোথাও কোনো শব্দ নেই।

অন্যদিকে,
রাশেদ বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছে। মন তার ভীষণ খারাপ। অতীতের কিছু ভাঙা টুকরো স্মৃতি যেন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। যে মানুষটাকে সে কখনো না দেখেই ভালোবেসেছিল, সেই-ই মানুষ তাকে সবচেয়ে বড় আঘাত দিয়েছে। বুকের ভেতর এক অদৃশ্য যন্ত্রণা।
তার পাশে বসে আছে জাহেদ, কানে হেডফোন, মোবাইলে ব্যস্ত। হঠাৎ বেডসাইড টেবিলে রাখা একটা মোবাইল বেজে ওঠে। ঝনঝন শব্দ যেন রাশেদের নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয়।
রাশেদ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মোবাইলটা হাতে তুলে নেয়। চোখ আধবোজা অবস্থায় রিসিভ করে। ওপাশ থেকে ভেসে আসে কিশোরী কণ্ঠ, তীক্ষ্ণ, তীব্র, ঝড়ের মতো—
— “তুই আমার মোবাইল চুরি করেছিস! চুর!”
রাশেদ যেন বজ্রাহত হয়।তাকে কল করে চুর বলছে?
— “কি? আমি আবার কার মোবাইল চুরি করলাম?”
ওপাশ থেকে ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর বলে
— “বেশি চালাকি করিস না। আমার মোবাইল তোর কাছে আছে। ফেরত দে। নাইলে ভালো হবে না !”
রাশেদের রাগ চেপে রাখতে কষ্ট হয়। কণ্ঠ ভারি হয়ে ওঠে—
— “এভাবে কথা বলছেন কেন?আর আমি আপনার মোবাইল কেন নিতে যাব?।”
__” কারণ আপনি চুর!”

রোহানের রাগ উঠে যায়। কথা নেই, বার্তা নেই সোজা তাকে চুর বলছে?
___” এই চোর কাকে বলছিস, আবাল মেয়ে? ”
__” আপনাকে বলছি। আপনি চুর। আমার মোবাইল যদি ভালোই ভালোই না দেন তো, আ..আপনার কখনো বিয়ে হবে না! ”
রোহান গম্ভীর কণ্ঠে বলে
__’ আমি কখনো বিয়ে করতে চাও না! ”
___” এটা আমি যানি না। আপনি আমার মোবাইল ফেরত দিবেন ব্যাস।
রোহানের এবার বেজায় রাগ উঠে যায়। বার বার এক কথা মজা লাগছে না তার কাছে। রাগে দাঁত চেপে বলে
___” আর একবার ফাউল কথা বললে চড়িয়ে সিধে করে দিব, বেয়াদব মেয়ে মানুষ। আমার লাখ টাকার মোবাইল রেখে তোর দুই টাকার মোবাইল আমি নিতে যাবো কোন সুক্ষে? ”
কথাগুলো শুনে ওপাশে মুহূর্তের জন্য নীরবতা। মিম যেনো কণ্ঠ চিনে ফেলেছে। এই ভাবে তাকে আরও একজন বলেছিলো।এই কন্ঠ, এই রাগ সবই তার চিনা। তারপর আচমকা কল কেটে যায়।
রাশেদ ক্ষিপ্ত হয়ে মোবাইলটা শক্ত করে ধরে রাখে। ভাবতে থাকে—কোন পাগল মেয়ে এভাবে কথা বলেছে তার সাথে ?তাকে চুর বলছে, এতো বড় সাহস?

কিন্তু তখনই তার চোখ আটকে যায় মোবাইলের স্ক্রিনে। স্ক্রিন ফাটা, পাশে আঁচড়। মোবাইল টা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বুঝতে পারে—এটা তো তার নিজের ফোন নয়। কৌতূহলী হয়ে মোবাইলটা অন করে। আর তখনই তার দুনিয়া যেন কেঁপে ওঠে।
ওয়ালপেপারে ভেসে ওঠে এক ছবি। ছবিতে তার আর জারা ম্যামের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী মিমের ছবি, নিখুঁতভাবে এডিট করা। হাসিমুখে তাকিয়ে আছে।
রাশেদের বুকের ভেতর কেমন যেন ধাক্কা লাগে।তার মানে এটা মিমের ফোন!আর ওর সাথে এতো ক্ষন মিম এই ভাবে কথা বলছিলো? কিন্তু এভাবে এডিট করা ছবি কেন ওয়ালপেপার?
এমন সময় আবার ফোন আসে। স্ক্রিনে লেখা— “ফিহু জানু।”
রাশেদ এক মুহূর্ত দেরি না করে কল রিসিভ করে। ওপাশে প্রথমে নীরবতা। তারপর কাঁপা কণ্ঠে ভেসে আসে মিমের গলা—

— “আ… আপনি আমার মোবাইল ভুল করে নিয়ে গেছেন।”
রাশেদ বুঝতে পারে, এটা মিমেরই কণ্ঠ। সে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করে—
— “তোমার মোবাইলে আমার ছবি ওয়ালপেপার দেওয়া কেন?”
প্রশ্ন শুনে মিম থমকে যায়। বুক ধড়ফড় করতে থাকে। উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেও পারে না। কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
রাশেদের চোখ রক্তিম। রাগী গলায় বলে ওঠে—
___” বলছো না কেন? তোমার মোবাইলে আমার ছবি কেন? ”
মিম ভয়ে কান্না করে দেয়। তার সাথে আবারও এই একই ভাবে কথা বলছে রাশেদ। ফিহা শুধু বসে আছে মিমের কাছে। জারা গেছে জিনিয়ার কাছে। আরমান ওর কল রিসিভ করছে না। জিনিয়া যেনো কল করে বলে আরমান ওর কলটা রিসিভ করতে।
ফিহা মিমকে কান্না করতে দেখে বোঝতে পারে। রাশেদ কোনো কারণে মিমকে রাগ দেখাচ্ছে। রাশেদ কী তাহলে ওকে চিনে ফেললো। আর চিনলেই বা কী। ও তো আর মিমকে ভালোবাসে না? মিম কান্না করতে করতে বলে
__” আমি বলতে পারব না! আ…আপনি প্লিজ আমার মোবাইল টা দিয়ে দিন।”
রোহান শান্ত কন্ঠে বলে
— “কাল সকালে ঘাটে এসে নিয়ে যাবে।”এটা বলেই কল কেটে দেয়।
মিম স্থবির হয়ে বসে থাকে। হাতে কাঁপুনি, চোখ ভিজে আসে ভয়ে আর লজ্জায়। সে কি তবে বুঝে ফেলল?
অন্যদিকে রাশেদের বুকের ভেতর ঢেউ খেলে যায়। মোবাইলটা শক্ত করে ধরে রাখে, চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই মোবাইল, এই ছবি, এই মেয়ে তার সব কিছু কেমন গন্ডগোল লাগছে।

মাঝরাত। চারপাশ নিস্তব্ধ। জানালার কাঁচ বেয়ে চাঁদের আলো ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতর, যেন নরম রুপালি ধোঁয়া। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে ধীরে, আর সেই নিঃশব্দতার মাঝে বেডের উপর গোল হয়ে বসে আছে চারজন মেয়ে—জারা, জিনিয়া, ফিহা আর মিম।
চারজনের মুখেই গাম্ভীর্য, তবুও চোখেমুখে কৌতূহল আর একটু আতঙ্ক। যেন ওরা কোনো দারুণ গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা করছে, যা হয়তো সারা গ্রাম কাঁপিয়ে দিতে পারে—অন্তত তাদের কাছে তাই মনে হচ্ছে।
জারা চুপচাপ বসে আছে কোণে। ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে নিজের সামনে ছড়িয়ে রাখা গিফটগুলোর দিকে—আরমানের দেওয়া গিফট। কয়েকটা সুন্দর বক্স, রিবন বাঁধা, এক পাশে বড় একটা গোলাপ ফুলের তোড়া । কিন্তু তার চেয়ে বড় হলো সেই অভিমান, যা এখনো তার বুকের ভেতর ভার হয়ে বসে আছে।আরমান অভিমান করেছে।আর সে—জারা’র—এখনো কল ধরেনি।
আরমান যাওয়ার পর থেকে ফোনে কল করে অথচ সে একবারও ধরেনি। হয়তো একটু রাগে, হয়তো একটু ভয়েই। এখন রাতের এই নরম নিস্তব্ধতার মধ্যে বসে সে বারবার ভাবছে—‘এখন কী করে তার রাগ ভাঙাবে?’
চারজনের সভা বসেছে সেই নিয়েই।মিম নিচু গলায় বলল,

—“দেখ, বেশি শব্দ করবি না। পাশের রুমে আন্টি আর জোহান ঘুমাচ্ছে।”
জারা মাথা নাড়ল। আর পাশে বসা জিনিয়া একটু হাসল, হাতে রাখা গোলাপ ফুলের তোড়াটা ঠিক করতে করতে। তোড়াটা রোহান দিয়েছে তাকে—লাল গোলাপ। তার মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
কিন্তু মিমের চোখে তেমন প্রশান্তি নেই। সে অন্য একটা বিষয়ে ভয় পেয়ে আছে—তবু জারা’কে একা চিন্তা করতে দিতে চায় না। তাই ভয়টা মাথা থেকে সরিয়ে রেখে মন দিয়েছে একটাই কাজে—আরমান ভাইয়ার রাগ ভাঙানোর মিশনে।
অনেকক্ষণ ভাবার পর জিনিয়া বলল,
—“শোনো আমার হাফ ইঞ্চি ভাবি, আরমান ভাইয়া তোমায় যে নীল শাড়িটা গিফট করেছে, সেটা পরো। তারপর একটা সুন্দর পিক তুলে ভাইয়াকে পাঠাও। দেখবে,ভাইয়ার সব রাগ কেমন করে গলে যাবে।”
ফিহা সাথে সাথে বলে উঠল,
—“হুম, ঠিক বলছে! ছেলেরা রাগ করে থাকে, আবার এমন কিছু দেখলে নিজে রাগ ঠেলে দিয়ে। তোর কাছে হুমড়ি খেয়ে পরবে।”
জারার মুখ লাল হয়ে গেল। হাতের আঙুলগুলো একসাথে মুঠো করে নরমভাবে বলল,
—“কিন্তু আমি তো কোনোদিন শাড়ি পরিনি… আর পরতেও পারি না। আজ প্রথম, তাহলে যদি ভালো না লাগে?”
মিম আর ফিহা একসাথে বলল,

—“আরেহ জানু, চিন্তা করিস না! আমরা আছি না। তুই শুধু রেডি হয়ে যা।”
তারপর তারা শাড়িটা বের করল—আরমানের গিফট করা নীল শাড়ি। নরম সিল্কের মতো কাপড়, একটু ঝলমলে, তবু শান্ত নীল রঙ। হাতের আলোয় চকচক করছে, যেন ছোট ছোট তারা বোনা আছে তার ভেতরে।
ফিহা শাড়ি ধরল, আর মিম পিনগুলো গুছিয়ে নিল। কিন্তু দেখা গেল, কাজটা যতটা সহজ ভাবছিল, ততটা নয়।
ফিহা অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে—একবার ওপাশ থেকে পেঁচায়, একবার এপাশ থেকে। কিন্তু ঠিক হচ্ছেই না। শাড়ির আঁচল কখনো কাঁধ থেকে পড়ে যায়, কখনো কোমর থেকে খুলে আসে। ক্লান্ত হয়ে সে শেষে বসে পড়ল, মুখে বিরক্তির ছাপ।
—“আহ্! এই জিনিসটা, কে ডিজাইন করেছে বল তো? ছেলেরা জিন্স পরে ঘুরে বেড়ায়, আর আমরা এই লম্বা কাপড় পেঁচাতে গিয়ে ঘামছি!”
সবাই হেসে ফেলল, শুধু জারা’র চোখে জমে উঠল একটু জল। সে আস্তে বলল,
—“আমার তো কিছুই হচ্ছে না… এখন কী করে ওনার রাগ ভাঙাব?”
এই বলে সে হঠাৎ কান্না করে ফেলল। নরম কণ্ঠে কান্নার শব্দটা ছড়িয়ে গেল ঘরে।
জিনিয়া সাথে সাথে এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল,
—“এই দেখো, আমার বোকা ভাবি কাঁদে না। আমি আছি না? আমি কিছু একটা করছি।”
জিনিয়া তাকে বার বার ভাবি বলায় খুব লজ্জা করছে তার। বয়সে বড় হয়েও তাকে ভাবি বলছে।
সে নিজের ফোন বের করে ইউটিউব খুলল। ভিডিও সার্চ দিতে লাগল, “How to wear saree easily”। সবাই চুপচাপ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। কয়েক মিনিট পর জিনিয়া যেন যুদ্ধ জিতে ফেলার মতো করে বলল,

—“পেয়ে গেছি!”
তার চোখে তখন একরাশ আত্মবিশ্বাস।সে উঠে দাঁড়াল, শাড়িটা হাতে নিল, আর জারা’কে বলল—“চলো, এবার তুমি উঠে দাড়াও।”
জারা উঠে দাঁড়ায়। নিঃশব্দ রাতের মাঝে শুধু শাড়ির কাপড়ের মৃদু শব্দ। জানালার বাইরে চাঁদ হেসে তাকিয়ে আছে, যেন এই ছোট্ট মিশনে ওরাও অংশ নিচ্ছে।
জিনিয়া ভিডিও দেখে দেখে ধীরে ধীরে জারাকে শাড়ি পরায়। অনেকবার ভুল হয়, আবার ঠিক করে। শেষ পর্যন্ত শাড়িটা একরকম হয়ে যায়—একটু এলোমেলো, তবু পরিপাটি। জিনিয়া এক পা পিছিয়ে দেখে, তারপর হাসে,
—“চলবে। খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে ভাবি।ছবি তোলা পর্যন্ত শুধু মেনেজ করে নাও। ”
জারা আয়নায় তাকায়। নিজেকে দেখে তার বুক কেমন হালকা হয়ে আসে। শাড়িটা ঠিকঠাক গায়ে লেগেছে, নীল রঙে সে যেন নিজের ভেতরের আসল সৌন্দর্য বেরে উঠেছে—একটা নতুন মানজারা, যে হয়তো আজই প্রথম নিজের রূপ দেখতে পাচ্ছে।শাড়িতে তাকে অপরূপা লাগছে। এই শাড়ি যেনো তার রুপ আরও তিনগুণ বারিয়ে দিয়েছে।
ফিহা আর মিম ততক্ষণে ব্যস্ত সাজানোর কাজে। তারা চুল ছেড়ে দেয়, আরমানের দেওয়া কাচের চুড়ি মেচিং করে হাতে পরিয়ে দেয়। কানের দোল পরিয়ে দেয়। চুড়িগুলো টুংটাং করে বাজে, শব্দটা যেন নরম হাসির মতো।
তারপর মিম চুলে লাগিয়ে দেয় আরমানের দেওয়া লাল গোলাপগুলো। কানের পাশে ফুলগুলো দুলে ওঠে, জারার মুখে ছায়া ফেলে।
সবাই একসাথে চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।ফিহা মুগ্ধ হয়ে বলে,

—“বাহ্, জানু, তুই তো একদম সিনেমার হিরোইনে মতো লাগছিস।”
মিমও ফিসফিস করে বলে
___” তোকে এই ভাবে দেখলে ভাইয়া পাগল হয়ে যাবে জানু। ”
জারা লজ্জায় মুখ নিচু করে।এরপর শুরু হয় ছবির সেশন। ফিহা হাতে ফোন নিয়ে বলে,
—“আয়, একটু কাঁধ ঘুরা, হ্যাঁ, এখন একটু হাস। না, এমন না, একটু মিষ্টি করে…”
জারা চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। আর সবাই হেসে হেসে তার স্টাইল ঠিক করে দেয়।
জিনিয়া পোজ দেখায়—“এইভাবে হাত রাখো, এখন আয়নায় তাকাও…”
মিম এসে চুলের গুচ্ছ ঠিক করে দেয়।একটা, দুইটা, তিনটা—ছবি তোলা চলতেই থাকে। মাঝে মাঝে সবাই নিজের হাসি চেপে রাখতে পারে না।
জারা ভাবে, “এই মেয়েগুলো না থাকলে আমি কিছুই পারতাম না।”
ফিহা সব ছবিগুলো দেখে বলে,

—“এই তো, পারফেক্ট!”
জারা তখনো জানে না, ফিহা তার কিছু অতি সুন্দর, একটু হট ছবিও তুলেছে—যেগুলো সে বুঝতেই পারেনি।
ফিহা সেগুলোর মধ্য থেকে বেছে নেয় নয়টা ছবি। একটা একটায় জারা’র মায়াবী মুখ, একটায় নীল শাড়ির ঝলক, আর একটায় হাসির আড়ালে লাজুক চোখ।
ফিহা ছবি গুলো পাঠিয়ে ফোনে টাইপ করে
___“আমাকে কেমন লাগছে? আপনার দেওয়া নীল শাড়ি পরেছি।”
বার্তা পাঠিয়ে সে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
—“ডান।”
ঘরে কিছুক্ষণের জন্য একদম নীরবতা নেমে আসে। যেন চারজনেই অপেক্ষা করছে—ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসে কি না।
জারার বুক ধকধক করছে। হাতের আঙুলগুলো জোড়া করে সে শুধু ফিসফিস করে বলে,
—“ওনার রাগটা ভাঙুক… শুধু একবার ‘সুন্দর লাগছে’ বলুক।”
জানালার বাইরে চাঁদটা যেন একটু হেসে ফেলে।

রাত তখন প্রায় দুইটা।ঘর নিস্তব্ধ, শুধু জানালার পর্দা হালকা দুলছে, বাতাসে মিশে আছে একধরনের শূন্যতার গন্ধ।
আরমানের চোখ তখনও ফোনের পর্দায় আটকে।
“আপনার দেওয়া নীল শাড়ি পরেছি। কেমন লাগছে?”একটার পর একটা ছবি স্ক্রল করছে—সব একই মানুষের, কিন্তু প্রতিটা ছবিতেই যেন নতুন করে হারিয়ে যাচ্ছে সে।আরমানের দৃষ্টি স্থীর হয়ে গেলো স্কিনে। সময় যেনো থমকে গেছে তার।
” মানজারা।তার লক্ষী বউ ।”
মানজারাকে সে আগে হাজার বার দেখেছে। কিন্তু এই মানজারা একেবারে নতুন।নীল শাড়িতে মোড়ানো, নরম আলোয় দাঁড়িয়ে আছে। মুখে লাজুক হাসি, চোখে অনন্ত কোমলতা।নীল শাড়ির ভাঁজে কোমড় টা যেনো সমুদ্রের ডেউ খেলে আছে।ওই চোখে একরাশ শান্তি । কখনো আয়নায় তাকিয়ে, কখনো ক্যামেরার দিকে সামান্য কাত হয়ে।

ছবিগুলোর রঙ, আলো, সবকিছু মিলে যেন তার বুকের ভেতর একটা ঝড় তুলে দিচ্ছে।
আরমানের বুক ধকধক করছে।মাথায় হাজার চিন্তা, কিন্তু একটাও ঠিকভাবে ধরতে পারছে না।
আরমানের বুকের ভিতরে হঠাৎ করে ঝড় উঠে যায়। হাতে থাকা মোবাইল টা কাঁপতে থাকে। মনে মনে ভাবে ” রাগ করে তবে ভালোই হয়েছে। নাহলে এই রুপটা আমার চোখে ধরাই পরত না!”
সে একবার ফোনটা নামিয়ে চোখ বন্ধ করল। মনে হলো কেউ যেন হালকা করে বুকের ভেতর কিছু লিখে দিচ্ছে—”এই মেয়েটা আমাকে পাগল করে দেবে।রাগ করে থাকায় যায় না বা*ল। এখন বোঝি পাগল হয়ে যাবো তোকে কাছে না পেলে হাফ ইঞ্চি মেয়ে ।”
তারপর আবার ফোনটা হাতে নিল। ছবিগুলো একে একে দেখে গেল।জারা’কে কখনো এত সুন্দর লাগেনি।এই নীল রঙটা যেন ঠিক তার জন্যই তৈরি।
আরমানের ঠোঁটে অচেতন একটা হাসি ফুটে উঠল।একই সাথে রাগ, মায়া, ভালোবাসা, আর একটা অজানা ব্যথা।
সে ভাবল,

___“এই মেয়ে যদি জানত, আমি কেমন করে প্রতিদিন ওর জন্য অপেক্ষা করি!নিজেকে কীভাবে সামলাই, তাহলে হয় তো এই ছবিগুলো পাঠাতো না। ”
তারপর আবার সেই ছবির দিকে তাকাল।
চোখে যেন কুয়াশা জমে গেল।
___“তুই এমন করে তাকাস না, মানজারা…”
সে ফিসফিস করে বলল নিজের মনেই।
___“এই চোখদুটো, এই মুখটা—আমাকে একদম হারিয়ে ফেলছে।কী মায়ায় জড়িয়ে নিলি আমায় তুই? হাফ ইঞ্চি মেয়ে ।”
ফোনটা টেবিলে রাখল, কিন্তু শান্ত থাকতে পারল না। মাথার ভেতর এক ঝড় বইছে।রাগ আছে, কিন্তু রাগের নিচে একটা ভয়ানক টান।সে চায় সামনে দাঁড়িয়ে জারাকে দেখতে।এই মুহূর্তেই।
তার বুকের ভেতর থেকে একটা তাগিদ উঠল

—“যেতে হবে। ওকে সামনাসামনি না দেখলে শান্তি পাবো না ।”
দ্বিতীয়বার ভাবে না। শুধু একটা জ্যাকেট পরে বাইকটা স্টার্ট দেয়। রাতের হালকা ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগে, রাস্তার থোকা থোকা আলো গুলো লম্বা ছায়া ফেলে যায় তার পেছনে।
পুরো গ্রাম তখন ঘুমিয়ে।কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই।মাথার ভেতর শুধু একটাই ছবি ঘুরছে—
তার লক্ষী বউয়ের মুখ। তার চোখের সেই কোমল দৃষ্টি, যেন কিছু বলছিল নরম করে—“রাগ কোরো না।”
বাইকটা ছুটে চলছে। বাতাস চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে, কিন্তু সে কিছুই টের পাচ্ছে না।
একবার নিজেকে বলে,
__“পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি। রাত দুইটায় কারো বাড়ি যাওয়ার মানে হয়?”
তারপর নিজেই উত্তর দেয়,

__“হয়। যদি সেই মানুষটা তার লক্ষী বউ হয়, তাহলে একবার কেনো হাজার বার যাওয়ার মানে হয়।”
তার ভেতরকার রাগটা যেন ধীরে ধীরে অন্য কিছুর জায়গা নিচ্ছে। আকুলতার, ভালোবাসার।
আকাশে চাঁদ তখন মেঘে ঢাকা।রাস্তায় ঝিরঝিরে বাতাস।আরমানের মাথায় একসাথে হাজারটা চিন্তা—
___“ও হয়তো ঘুমাচ্ছে। না, হয়তো এখনো ফোনের পাশে বসে আছে আমার রিপ্লাইয়ের অপেক্ষায়…”
সে হঠাৎ থেমে যায় রাস্তার পাশে।বাইকটা বন্ধ করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে।পকেট থেকে ফোন বের করে আবার সেই ছবিগুলো খুলে দেখে।
একটার পর একটা।প্রতিটা ছবিতে যেন তার হৃদয়ের ভেতর দিয়ে একটা নরম ঢেউ বয়ে যায়।
তারপর মৃদু হেসে বলে,

___“তুই জানিস না লক্ষী বউ , আমি তোর উপর রাগ করলে কেমন লাগে। আমি রাগ করি শুধু এই জন্য যে, আমি তোকে ছাড়া ভাবতেই পারি না।আমার রাগ টা শুধু তোকে ঘিরে জান।”
আস্তে করে ফোনের স্ক্রিনে টিপে একটা বার্তা লেখে—
___“তুই যে আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিস, জানিস?কিন্তু ঠিক আছে… নীলটা তোর গায়ে যেভাবে মানিয়েছে, তাতে সব রাগ চলে গেছে আমার। এখন শুধু তোকে সামনে থেকে দেখতে ইচ্ছে করছে বউ।”
সে পাঠিয়ে দেয় বার্তাটা।
তারপর বাইকটা আবার চালু করে, ধীরে ধীরে এগোতে থাকে জারাদের বাড়ির দিকে।চোখে তখন এক অদ্ভুত আলো—যেখানে মিশে আছে ভালোবাসা, পাগলামি আর একটু ভয়।
রাতের বাতাস কানে ফিসফিস করে বলে যায়,

“আজকের এই নীল শাড়ি পরা মেয়েকে টা হয়তো ওর মনে চিরকাল দাগ কেটে যাবে? এই মেয়ে টা তার রক্তে মিশে যাচ্ছে। …”
আরমানের ঠোঁটে ছোট্ট একটা হাসি।
সে জানে, এই রাতটা আর স্রেফ একটা রাত নয়
এটা তাদের গল্পের শুরু,যেখানে ভালোবাসা রাগকে হার মানায়,আর নীল শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে থাকে দুইটা হৃদয়ের নীরব প্রতিশ্রুতি।
________
রাত প্রায় আড়াইটা।সব কিছু নিঃশব্দ—শুধু দূরের কোনো কুকুরের ঘেউ ঘেউ, আর বাতাসে দুলে ওঠা গাছের পাতা।
আরমান বাইকটা এসে থামাল জারাদের বাড়ির সামনের কাঁচা রাস্তায় । চারপাশে অন্ধকার, বাড়িটা নিস্তব্ধ। মাথার ওপর চাঁদ আধো আলো ফেলেছে।
সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। এক মুহূর্ত থেমে লক্ষী বউ নামটায় আঙুল রাখল।
রিং বাজছে।প্রতিটা টোন যেন ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে তার।অবশেষে ওপাশ থেকে এক মৃদু, ঘুম জড়ানো গলা ভেসে এল—“হ্যালো…”
আরমানের ঠোঁটে অচেতন হাসি ফুটে উঠল।
___“বের হও জান।”
জারা প্রথমে বুঝতেই পারল না।
___“কী?”
___“বের হতে বলেছি, বাইরে আসো। আমি তোমাদের বাড়ির সামনে।”

জারার বুক ধক করে উঠল।রাতের এই সময়! সে কিছু বলতে গেল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। চোখে ভয়, মুখে লজ্জা, মনজুড়ে হঠাৎ বৃষ্টির মতো অস্থিরতা।
ফোনের ওপাশ থেকে আরমানের গলা এবার নরম, কিন্তু দৃঢ়—
__“রাগ তোমার উপর না, নিজের উপর। এখন বের হও, দেখতে হবে তোমাকে ভালো করে। নাহলে মনের জ্বালা মিঠবে না আমার।চোখ দুটু খুব জ্বলছে তোমাকে দেখার জন্য । ”
ফোন কেটে গেল। জারা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার দুই বান্ধবী—মিম, ফিহা আর জিনিয়া ওর দিকে চুপচাপ তাকিয়ে আছে। তিনজনের চোখেই একরকম বিস্ময়কর ।তারা ভাবতেই পারেনি আরমান এতো রাতে চলে আসবে এখানে।
ফিহা হাসি চেপে বলল,
—“জানু, ভইয়া তো পুরোই পাগল হয়ে গেছে? ”
মিমও মজার ছলে বলে
___” যা, জানু এক বার তোর ওই চাঁদ মুখ খানা দেখিয়ে আয় ভাইয়া কে! ”
জারা অবাক চোখে তাকাল,
—“এই এতো রাতে? আমি পারব না।”
জিনিয়া এগিয়ে এসে তার হাত ধরল,
—“আমরা সামলে নেব। তুমি যাও। আমার ভাইয়াকে আর বেশি অপেক্ষা করিও না। নয় তো দেখবে ড্রেসপারেট হয়ে বাড়ির ভিতরে চলে এসেছে।”
ফিহা ফিসফিস করে বলল,

—“দেখ, এই সুযোগ বারবার আসে না। সে তো তোকে দেখতে এসেছে। যা, কিচ্ছু হবে না। ”
জারা স্থির হয়ে গেল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে। আয়নায় একবার তাকাল—চুল কিছুটা এলোমেলো, কিন্তু চোখে এক অজানা দীপ্তি।
সে চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিল, তারপর জানালার দিকে এগোল। বাইরে এখনো আলো-ছায়া মেশানো রাত। পেচানো শাড়ির জন্য ঠিক মতো হাটতে পারছে না সে। কেমন যেনো খুলে আসছে, এমন লাগছে তার কাছে।
এদিকে, রাস্তায় আরমান দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে অস্থিরতা। ফোনটা পকেটে রাখে, তারপর আরেকবার ঘড়ির দিকে তাকায়।জারা এখনো আসেনি।
সে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। একটা বের করে , আগুন ধরায়।
ধোঁয়া ওঠে, রাতের আলোয় মিশে যায়।একটার পর একটা সিগারেট।প্রতিটা টান যেন অপেক্ষার মাপ নিচ্ছে।
সময় গড়িয়ে যায়। পাঁচটা সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। আরমান আবার প্যাকেট থেকে একটা বের করে হাতে নেয়।
ঠিক তখনই,একটা মৃদু কণ্ঠ বাতাসে ভেসে আসে, নরম অথচ স্পষ্ট—

___“বুদ্ধিমান পুরুষ কখনো সিগারেট খায় না… কারণ সে জানে, এই ঠোঁট দুটো তার স্ত্রীর হক।”
শব্দটা থেমে যায়, কিন্তু প্রতিধ্বনি যেন বাতাসে থেকে যায়।
আরমান একদম থেমে যায়।তার চোখ ধীরে ধীরে ঘুরে যায় সেই দিকের দিকে।বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জারা।
চাঁদের আলোয় নীল শাড়িটা হালকা বাতাসে দুলছে। চুল এলোমেলো, চোখে এক মায়াময় দীপ্তি। হাতে ছোট্ট আঁচলটা ধরা, ঠোঁটে হাসি—যেন তার বলা কথাগুলো এখনো বাতাসে ছড়িয়ে আছে।
ধীরে ধীরে ঘুরে এগোতে থাকে সে। রাস্তার হালকা আলোয় দাঁড়িয়ে আছে জারা—নীল শাড়ির ভাঁজে যেনো চাঁদের আলো গলে গেছে। এলোমেলো খোলা চুল কাঁধে লুটিয়ে পড়েছে, কানের পাশে গুঁজে দেওয়া গোলাপের পাপড়িগুলো নড়ছে বাতাসে। চুড়ির টুংটাং শব্দে যেনো সময় থেমে গেছে।
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে—একদম নির্বাক। তার ঠোঁট শুকিয়ে আসে, বুকের ভেতর কেমন একটা আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

___“তুমি জানো লক্ষী বউ ,” সে নিচু গলায় বলে, “আমি ভেবেছিলাম রাগ করে থাকব অনেকদিন… কিন্তু তোমায় এভাবে দেখার পর মনে হচ্ছে, বা*লের রাগ। রাগটা আবার কী?কীভাবে করে সেটা? বা*লের রাগটাই করতে পারি না আমি । সব ভুল আমার বউ। আমি ভুল করেছি।তুমি ভুল করতেই পারো না। তোমার যা ইচ্ছে শাস্তি দাও আমায়। সব মনজুর তোমার জন্য। এখন শাস্তি হিসেবে একটা ঠান্ডা চুমু দিলেও মাইন্ড করব না। ”
জারা লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নেয়, কিন্তু তাতে আরমানের চোখ আরও স্থির হয়ে পড়ে তার উপর।
____“এই নীল শাড়িটা শুধু গিফট দিইনি, আমি ভেবেছিলাম, যেদিন তুমি এটা পরবে, সেদিন তোমায় দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। ঠিক তাই হলো।”
জারা হালকা গলায় বলে
____, “এমন কথা বলবেন না আপনি , আর শব্দ করবেন না, কেউ শুনে ফেলবে।”
আরমান মৃদু হেসে উত্তর দেয়

___ “এই রাতে শুধু তারারাই জেগে আছে, আর এই তারাগুলো তো আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী।”
এক পা এগিয়ে আসে সে, জারার মুখের পাশে এসে থেমে যায়। তার চোখে গভীর দৃষ্টি—তীব্র, কোমল, আর কিছুটা অস্থির।
___“আমি জানি, আমার এই ঠোঁটগুলো তোমার নামে লেখা, অন্য কিছু স্পর্শ করার অধিকার আমার নেই। তাই তো সিগারেটটা ফেলে দিলাম।এখন তার বিনিময়ে আমি কী পাবো?”
জারার গাল লাল হয়ে ওঠে। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দ খুঁজে পায় না। আরমান তখন তার দিকে তাকিয়ে বলে
___“তুমি জানো না, এই মুহূর্তে তুমি কতোটা বিপদে আছো।”
জারা অবাক হয়ে তাকায়
___“বিপদে?”
আরমানের চোখে দুষ্টুমি খেলে যায়।

___“হ্যাঁ, কারণ আমি এখন আমার বউকে ভালোবাসায় ডুবিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় আছি। ওই ডেউ খেলে কোমড় টা আমায় তোমার দিকে বার বার টানছে।”
জারা তাড়াতাড়ি পিছিয়ে যায়, কিন্তু তার চুড়ির শব্দে যেনো রাতটা আরও মধুর হয়ে ওঠে। নিজেকে ভালো করে ডাকতে চাই সে। শাড়ির আঁচল টেনে কোমড় ডাকার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো কাজ হয় না। শাড়ি টা শুধু কোমড়ে পেঁচানো কুঁচি ছাড়া।
___” আ..আপনার চোখ ভালো না। এই নষ্ট চোখ দিয়ে তাকাবেন না! ”
আরমান একটু হাসলো জারা’র কথায়। জারা’র দিকে আরও দুই পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলে
…” আমি নষ্ট মনে নষ্ট চোখে দেখি তোমাকে…
……মন আমার কি চায় বুঝাই কেমনে
….আপনে গুরু আমি শীর্ষ বুদ্ধি আমার কম
..আপনে বুঝাইয়া দিলে বুঝিতে সক্ষম…”🎶
গানটা কানে যেতেই জারা এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।ওর গাল গরম হয়ে যায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। নিজের হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে বুঝতে পেরে আঁচলটা টেনে নেয় বুকে।
কেন জানি চোখ নামিয়ে ফেলে, কিন্তু তবুও ভেতরে একটা কাঁপন থেকে যায়।লজ্জা, ভয় আর এক অচেনা অনুভূতি মিশে যায় ওর মনে।
তখন জারা চুপচাপ হয়ে যায়।নিজেকে আরও গুটিয়ে নেয়। আরমান এখন জারা’র ঠিক সামনে দাড়িয়ে আছে। ওর বুকে জারা’র নাক ঘেঁষে আছে। জারা আরও পিছিয়ে যায়।
আরমান ফিসফিসিয়ে বলে

___“তুমি যত দূরেই যাও, আমি তোমায় চোখে ধরে রাখব। তোমার এই শাড়ির নীল রঙে আমি হারিয়ে গেছি, মানজারা। তোমার ওই ঠোঁটের কোণের বাদামি তিলটা একটু স্পর্শ করতে দিবে?”
এই কথা শোনার পর জারা আরও দুই পর পিছিয়ে যায়। লজ্জা মাথা নিচু করে শাড়ির আঁচলে আঙুল পেঁচাতে থাকে।
আরমান এক মুহূর্ত থামে।ফুস করে একটা শ্বাস ফেলে , তারপর গম্ভীর হয়ে বলে,

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫০

__“আজ বুঝলাম, তুমি কেবল আমার জীবনের ভালোবাসা না… তুমি আমার ধৈর্যের শেষ সীমা।”
জারা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলে যায়।
__” এই পাগলী, আমার সাথে নদীর পারে যাবি?”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here