নীরব উন্মাদনা পর্ব ৩১
সুরাইয়া জিয়াসমিন
নুবার চোখে আফসোসের দাগ টানছে,, শুধু একটা কারনেই ইস্ মেয়েটার জীবন টা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে,,,একটা চরিত্রহীনের কে স্বামী হিসাবে আপন করছে,,নুবা সেদিকে চেয়ে রইলো কাজি বিয়ে পড়াচ্ছে,,,যখনি আরাফ কবুল বলবে তখনি নুবার সামনে আরহাম এসে দাঁড়ালো,,,মুখে তার বিরক্তির ভাঁজ,,মা আসেনি তাকে একদম একা একা লাগছে,, এদিকে আরশি রিহানের সাথে লেগে আছে,,,আরশির সাথেও এতটোআ কথা হয়নি যতটা নুবার সাথে হয়েছে আরহামের,,,
আরহাম এসেই নুবার এক হাতের কব্জি ধরে কোথাও নিয়ে যেতে লাগলো,,তখন নুবার কানে ভেসে আসলো
_ কবুল,,,
নুবা শক্ত করে আরহামের ধরে রাখা হাতটা চেপে ধরলো,,মনে হলো বুকের উপর থেকে কোনো বোঝা নেমে গেলো,,, দ্বিতীয় বা কবুল ভেসে আসলো,,,নুবার শরীর ভেঙ্গে আসলো,,সে জানে না এটা দুঃখে নাকি চরিত্রহীন থেকে ছাড়া পাওয়ার খুশিতে,,,
আরহাম একটি ফাঁকা রুমে নুবাকে নিয়ে আসলো,,,একটু আগে এই রুমটা রেস্ট নেওয়ার জন্য হারুন মির্জা দেখিয়ে দিয়েছে
হারুন মির্জা বুঝতে পারছিলো তার ছেলে অসুস্থ বোধ করছে তাই বেয়াইকে বলে রুম খুঁজে বারির একটা লোককে দিয়ে আরহামের কাছে পাঠালো
লোকটা আরহামের কাছে যেএ বললো
_ ভাইয়া আপনার যদি বেশি খারাপ লাগে আপনি ওই পাশের রুমে যেএ বসতে পারেন ওটা পুরো খালি,,
আরহাম আয়ারকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো,,তবে কাউকে সাথে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনবোধ করলো কারণ মেয়েটাকে শুইয়ে দিলেই কান্না করবে,,তখন খেলায় করলো নুবা একটু দূরেই দাঁড়ানো,,, তাড়াতাড়ি কাউকে না পেয়ে নুবাকেই ফাঁসিয়ে দিলো,,,
হারুন মির্জা দূর থেকেই ছেলের পাশে থাকলো কারণ সে জানে,সে যদি কাছে আসে নিজে ছেলেকে সাহায্য কররা চেষ্টা করে তবে আরহাম নির্ঘাত কোনো কর্মকান্ড করে বসবে,,
এদিকে আরশিকে হারুন মির্জা তখন থেকে খুঁজছে,,এই মেয়েকে আসার আগে বলেছে ভাই এর খেয়াল রাখতে,,আমিনা বেগম ১০০ বার বুঝিয়ে দিয়েছেন আরহামের খেয়াল রাখতে কিন্তু সে উধাও,,
আরহাম রুমে এসে নাক মুখ কুচকালো,,রুমটা তার মোটেও পছন্দ হয়নি কিন্তু কিছু করার নেই,,, আরহাম এসে বিছানায় বসলো,,এখনো নুবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে,,,
আরহাম নুবার হাত ছেড়ে দিলো,,,নুবাকে এভাবে অন্য কোথাও মগ্ন থাকতে দেখে আরহাম ডেকে উঠলো
_এই বিচ্ছু,,,এই দৌড়ানো বিচ্ছু,,,
নুবা চোখ তুলে আরহামের দিকে তাকাবেই তার চোখ থেকে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো,,, চোখের পাতা ভিজে উঠলো,,,
আরহাম বিরক্তি নিয়ে বললো
_মারতে আনিনি তোমাকে এখানে ,যে কান্না করছো,,
নুবার অধর গুলো তিরতির করে কেঁপে উঠলো,,সে চেষ্টা করছে নিজেকে সামলাতে,, নিজেকে দেখাতে যে সে আরাফেক ঘৃনা করে,,তবে বর্তমান তাকে টেনে হিচরে অতীতে নিয়ে যাচ্ছে,,নুবা যখনি ভাবছে আরাফ কবুল বলেছে,,সে অন্য কারো তখনি আরাফের মিথ্যা ভালোবাসা গুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে,,,সে যতো নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে আরাফ একটা জঘন্য মানুষ,,নুবা ততটাই ভেঙ্গে পড়ছে,,,
আরহাম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_ এই কান্না অফ করো,, সবসময় ফেত ফেত কি দিয়ে তৈরি তুমি,,এতো ভয় কোথা থেকে আসে,,
নুবা আরহামের দিকে তাকাতেই আরফের কথা মনে পড়ে গেলো,,,নুবা কম্পিত কন্ঠে বললো,,,
_ সবাই এভাবে ঠকায় কেন,,মন দিয়ে ভালোবাসলে এর প্রতিদান কেন ধোঁকা হয়,,, শুধু কি গড়িব বলে,,,
আরহাম নুবার কথা কিছুই বুঝলো না,,সে কখনো কাউকে ভালোবাসেনি,,,,মেয়ের,আর মায়ের ব্যপার আলাদা তবে কেউ কখনো তাকে আগলে নেয়নি না সে নিয়েছে,,সে কি করে বুঝবে এই সবের মর্ম
নুবার যেনো পাথরের কাছে নিজের মনের অনুভূতি প্রকাশ করলো,, আরহাম নাক মুখ কুঁচকে রেগে বললো
_ what the h*** কান্না অফ করো,,কাকে নিয়ে আসলাম,,,
নুবা চোখের পানি মুছে পাশে বসলো,, আরহাম মেয়েকে নুবার কোলে ধরিয়ে দিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো,,, বিরবির করে বললো,,
_ মাথা ব্যথা করছে টেনে দেও তো,,,
নুবার হেলদোল হলো না,,,আয়রার দিকে তাকিয়ে রইলো ,যে কিনা ক্ষুধায় তার বুকে হাতাহাতি করছে,,
নুবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো,,,পাশ ফিরে দেখলো আরহাম কপালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে,,,নুবা আয়ারকে হিজাবের নিচে ডেকে ফিভ করাতে করাতে বললো
_ বালিশ নিয়ে এদিকে ঘুরুন টেনে দি,,,
নুবার অনুভূতি গুলো যেনো আজ সব মুছে গেলো,,নুবার মনে হচ্ছিল, তার সব অনুভূতিগুলো আজ ধুলোয় মিশে গেছে।যাকে ঘিরে সে হাজারো স্বপ্ন বুনেছিল, সেই মানুষটিই তাকে সবচেয়ে বড় আঘাত দিয়েছে,,, চরিত্রহীন মানুষ টা তাকে ভিতর থেকে ভেঙ্গে দিয়েছে,,,ভালোবাসার নামে পাওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি আজ নিছক মিথ্যে বলে মনে হচ্ছে।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুগুলো বারবার গড়িয়ে পড়ছে, অথচ বুকের ব্যথা কমছে না।নিজেকে ভিষন একা লাগছে সব আশা ভেঙ্গে গেছে,,ভাঙা হৃদয়ের আর্তনাদ যেন নীরবে গিলে ফেলছে সে।আজ নুবার কাছে ভালোবাসা মানেই একরাশ অপূর্ণতা আর গভীর বিষাদ।,
নুবা হেরে গেলো অভিনয়ের কাছে,,,তবু সে অতীতের আরাফকে ঘৃনা করতে পারলো না,,সে পারলো না সেই সুন্দর মূহুর্ত গুলোকে ভুলে থাকতে,,,
আরহাম বালিশ নিয়ে ঘুরে নুবার দিকে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করলো,,,নুবা সুন্দর করে ঘুরে বসলো,,, কম্পিত ডান হাতটা আরহামের মাথায় রাখলো,,, আরহাম শান্ত কন্ঠে আবদার করে বললো
_ কোলে মাথা রাখি,,,
নুবা কেমন নিরবে বললো
_ আয়রা আছে,,,
(তাদের মূহুর্ত টুকু দেখে মনে হলো,, গভীর বন্ধনে আবদ্ধ তারা,,আসলে এমন কিছুই না একজন লাগাম ছাড়া,,, সবকিছু তার কাছে স্বাভাবিক,,তার মন যা বলবে তাই করবে,,আর একজন ex কে কবুল বলতে শুনে অর্ধ পাগল হয়ে গেছে,,,ওই টমা থেকে বেড় হতে পারছে না,, সবকিছু কেমন ছন্নছাড়া লাগছে)
এতো দিন নিজেকে বেঁধে রাখলেও এবার নুবা বেশ ভেঙ্গে পড়লো,,না চাইলো না ভেঙ্গে পড়তে তবে নিজ অজান্তেই ভেঙে পড়লো,,আরফ না ভালো বাসলেও সে বেসেছিলো মন থেকে,,
নুবা আনমনে আরহামের মাথায় হাত বুলিয়ে চুল টেনে দিলো,,, আরহামের বেশ ভালো লাগায় ঘুম ধরে গেলো,,,নুবা মাথা নিচু করে আরহামের দিকে তাকালো,,যে কিনা সোজা হয়ে বুকে হাত গুজে চোখ বন্ধ করে আছে,,,
আরহামের চেহারাটা দেখতেই নুবার আরফের কথা মনে পড়লো,, অধর দুটো কেঁপে উঠলো,,, চোখের পাতা ভিজে উঠলো,,,টুপ করে চোখের পানি আরহামের কপালে যেএ পড়লো,,,
নুবা হাত দিয়ে চোখের পানি টুকু মুছতে দিলো,,, পরপরই আরহামকে ভুল করে আরাফ ভেবে নুবা মুচকি হাসলো বিরবির করে বললো
_ আমাদের এরকম একটা টুনাটুনির সংসার হতে পারতো,,,
তবে হলো না তার সংসার,,, স্বপ্ন গুলো এক নিমিষেই ভেঙ্গে গেলো,,,নুবার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো আরহামের দিকে তাকিয়ে রইলো,,মনে হলো একটু গালে হাত বুলিয়ে দিতে,,তবে পারলো না সে,,
নুবা আরহামের সিল্কি চুল গুলো আস্তে আস্তে টেনে দিলো,,,তার মাথার ভিতরে ঘেমে গেছে,,নুবার ভাবনার ভিতরে কেউ কম্পিত কন্ঠে বললো
_ কেলো তোমরা,,,
নুবার হুস ফিসে আসলো,,, পরপরই নিজের অবস্থান বুঝতে পেরে নিজেই চম্কে উঠলো সে,,,আয়রা কোলের ভিতরে,,,, আরহাম বালিশ নিয়ে নুবার সামনে মাথা রেখে শুয়ে আছে,,,
নুবা মুখ দিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে আশে পাশে তাকালো,,,নজরে পড়লো একজন বুড়ি হাতে লাঠি নিয়ে এদিকেই আসছে,,,বুড়ি আবারো বলে উঠলো
_ তোমরা কেডা,,,
নুবা তাড়াতাড়ি আরহামের মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিলো,, আরহাম বিরক্তকে মনে মনে চ উচ্চারণ করলো,,,
নুবা সরে বসতে চাইলো তবে পারলো না,,,বাপ মেয়ে এমন ভাবে নুবার সামনে একজন কলো একজন ডোলে বসে আছে সরা মুসকিল,,,
নুবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_ ছেলের পক্ষ থেকে দাদি
বুড়ি দাবি কম্পিত কন্ঠে বললো
_ ও,,আমি একটু জিরাইতে আইছিলাম,,,বুঝছো,, কিন্তু,,,তোমগো সমস্যা হইবো,,তোমরা থাকো,,,
নুবা বিচলিত কন্ঠে বললো
_ না না,,,আপনি বসুন,,, সমস্যা নেই,,,
_ না থাক,,,
_ আরে দাদি আসুন,,,
বুড়ি দাদি এক গাল হেঁসে বিছানার এক কোনায় বসলো,,,
নুবা বুঝতে পারলো না কি করবে,,,,হুতসে আরহামের মাথা টেনে দিলেও এখন কেমন অস্থির লাগছে,,,আজ পর্যন্ত সে কখনো আরাফের মাথায়ও এভাবে হাত বুলায়নি সেখানে আরাহম নিছক অস্থিরতা ব্যতিত কিছুই নয়,,
এর ভিতরে আবার কোলের ভিতরে বিচুটি পাতা চকচকচ শব্দ তুলছে কি একটা অবস্থা,,,
নুবার ভাবনার ভিতরেই বুড়ি দাদি বলে উঠলো
_ কি লাগো বরের,,,
নুবা কি বলবে,,, কিছু সময় ভেবে আরহামের দিকে ইশারা করে বললো
_ বরের বড় ভাই হয়,,
_ হেডাতো দেইখাই বুঝছি,,,যে কেউ বুইঝা যাইবো,,, তুমি কি হও,,,বরের ভাবি নাকি,,,
নুবার মুখ ভেচকিয়ে গেলো এই লোকটা সবসময় তাকে ফাঁসিয়ে দেয়,,যেভাবে কোলের ভিতরে শুয়ে আছে যে কেউ দেখলে এটাই ভাববে,,,
নুবা মাথা ঝুকলো,,,না,, হ্যাঁ,,,,জানি না,,
নুবা কি বলবে সে নিজেও জানে না,,,বুড়ি দাদি হেসে বললেন
_ বুঝি বুঝি,, লজ্জা পাইয়ো না,,,দেখাইয়া বুঝা যাইতেছে স্বামী স্ত্রী হইবা,,, বাচ্চাটা সুন্দর আছে তোমার লাহান হইছে,,
নুবা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে শুনলো,,,মনে মনে বলে উঠলো
“আরে বুড়ির বাচ্চা,, জামাই না আমার,,এই বাচ্চাও আমার না,,এখন দেখি পিঠে লিখে ঘুরতে হবে এটা আমার জামাই না এটা আমার বাচ্চা না,,আর এই পাগল লোকটা শোয়ার আর জায়গা পেলো না,,,আর এই বিচুটি পাতার এখনি ক্ষুধা লাগার ছিলো,,যদি সবাইকে প্রথম থেকে সব কিছু খুলে বলতে পারতাম আফসোস ahh,, আমার সাথেই কেন”
বুড়ি দাদি অনেকটা সময় বসে নুবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো যাওয়ার আগে এতো গুলো দোয়া দিয়ে গেলো যা নুবার কাজে আসবে না,,
“তোমরা সুখী,হও,,এটাও হও ভালো থাকো কত কিছু”
বুড়ি দাদি যেতেই নুবা ফিসফিস করে বললো
_ এই উঠুন তো,,, এখানেই থাকার নিয়ত নাকি,,সবাই চলে যাবে তো
আরহামের হেলদোল হলো না,,নুবা কপাল চাপড়ালো,,কই ফেসে গেলো,,,
পরপরই নুবা আরহামের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবলো
“এই লোকটা কালকে গলায় বন্দুক ধরলো,,, সেদিন পানিতে চুবালো,,২/৩ দিন থাপ্পরো মেরেছে,,, আমার সাথে মিসবিহেব করেছে,,,আমি কেন এই লোকটার সেবা করবো আজব,,,”
ভেবেই নুবা আরহামের মাথায় ঠেলা দিয়ে বললো
_ উঠেন,,,অন্য দিকে যেএ ঘুমান,,,
কিন্তু আফসোস বেচারি আরহামকে একটুও নড়াতে পারলো না,,,নুবা বিরক্ত হয়ে কোনো মতে ঠেলে গুতে আয়রাকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো,,মাজা ধরে গেছে,,,
নুবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইশিতাকে দেখছে,,যে কিনা নিজ মা বাবাকে জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে,,,নুবা সেই দৃশ্য দেখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে,,
ইশিতার বাবা নিজের মেয়ের হাত আরাফের হাতে তুলে দিলো,, ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_ খুব আদরের মেয়ে আমার সামলে রেখো বাবা
আরফ ইশিতার হাত ধরে মৃদু কন্ঠে বললো
_ চিন্তা করবেন না,আমি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে ওকে ভালো রাখার চেষ্টা করবো
আরাফের কথায় নুবার টনক নড়লো,,,সবার থেকে দূরে আরহাম দাঁড়িয়ে ছিলো,,,নুবা এগিয়ে গেলো আরহামের সামনে যেএ মাথা নিচু করে বললো,,
_ কোনটায় বসবো,,,
আরহাম ভুরু কুঁচকে বললো
_ what,,
নুবা এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বললো
_ গাড়ি,,সবি একরকম কোন টায় আসছিলাম আমরা,,
নুবা চুপচাপ গাড়িতে বসে আছে,,আরশির উপর প্রচন্ড অভিমান হয়েছে তার কারণ এই মেয়েটা তাকে রেখে জামাইকে নিয়ে টই টই করে ঘুড়ে বেড়িয়েছে,,
ইতিশা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বাবা মায়ের থেকে বিচ্ছেদে যন্ত্রণা শুধু একটা মেয়েই বুঝবে,,আরাফ ইশিতার কান্না দেখে নিজের সাথে আগলে নিলো,,ইশিতার হাতটা শক্ত করে ধরে বললো
_ কান্না করছো কেন,,আমি আছি না
ইশিতা আরাফের বুকে মাথা গুঁজে বিরবির করে বললো
_ তুমি সপ্তায় সপ্তায় আমাকে বাসায় নিয়ে আসবে,,আমি আম্মু আব্বুকে ছাড়া থাকতে পারবো না
_ ওকে darling ,,,এবার কান্না অফ করো,,,রাতের জন্য তো কিছু চোখের পানি বাঁচিয়ে রাখো
ইশিতা মুচকি হেসে আরাফের বুকে আঘাত করে বললো
_ তুমিও না,,,
তাদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো,,বাড়িতে এসে গাড়ি থামতেই নুবা তাড়াতাড়ি করে নেমে গেলো,,,কোনো দিকে না তাকিয়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো,,,
কিছু রিচুয়াল মেনে আমিনা বেগম সহ বাড়ির মধ্যবয়স্ক মহিলারা ইশিতাকে বরন করলো,,,আমিনা বেগম তো মহা খুশি ছেলের বউকে দেখে,,,
নুবার হাত পা কাঁপছে,,,সে নিজেও জানে না কেন,,নুবা মুখে পানির ছিটা দিয়ে সামনে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের গালে নিজে জোরে জোরে দুটো থাপ্পর মেরে বললো
_ একদম কান্না করবি , be strong নুবা,,, এমন তো কথা ছিলো না,,,ওই মানুষ টাকে তুই ঘৃনা করিস,,,তার জন্য কাঁদলেও তোর পাপ হবে,
কিন্তু নুবা তো আরাফের জন্য কাঁদছে না তাহলে কেন তার এতো কষ্ট হচ্ছে,,,নুবা দুই হাত দিয়ে নিজের গলা চেপে ধরে বললো
_ আর একবার নাটক করলে তোকে মেরে ফেলবো আমি,,, তুই তো জানিস এই সব মিথ্যা ছিলো তবে কেন বুঝতে চাইছিস না,,
নুবা নিজেকে নিজে অনেক মানানোর চেষ্টা করলো,,তবে হয়তোবা একটু সময় লাগবে কিন্তু সে পারবে ,,
বাসর ঘড় সাজানো হচ্ছে,,আরাফের বন্ধুগন ,,তার কাজিন সবাই মিলে এই কাজটা করছে,,আরশি এসেছিলো নুবাকে ডাকতে তবে নুবা যায়নি,,
আরহাম এসেই আগে শাওয়ার নিতে ডুকেছে,না হলে সারাদিনের এতো ধুলো ময়লা তার ঠিক হজব হবে না,,
আরহাম শাওয়ার নিয়ে এসে দেখলো আয়রা উপরের দিকে তাকিয়ে হাত পা নেমে হাসছে,,,মুখ দিয়ে শব্দ করলে,,,
আরাহাম হাসলো,তাওয়াল দিয়ে মাথা মুছে , বিছানায় যেএ মেয়ের পেটে সুরসুরি দিয়ে বললো
_ আমার আম্মুটা কি করছে,,
আয়রা বাবার চুল টেনে ধরলো,, পরপরই বাবার চুল টেনে সে আ উ শব্দ করে হাসতে লাগলো,,,, আরহাম মেয়ের ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো চুল থেকে ছাড়িয়ে হাতে চুমু খেলো,,,মেয়ের নাকে নাক ঘষে ফিসফিস করে বললো
_ কি করছে আমার আম্মুটা,,, সারাদিন শুধু দুষ্টামি হুম,,
আয়রা ফোকলা মারি বের করে খিলখিল করে হাসলো,,, আরহাম টুকুর টুকুর মেয়ের সাথে কথা বলতে লাগলো,,,
রাত ১০ টা,,,নুবা শুয়ে ছিলো আরশি এসে নুবাকে উঠিয়ে বিচলিত হয়ে বললো
_ উঠ,,,
নুবা কান্ত কন্ঠে বললো
_ কি হয়েছে
_ আরে বাসর ঘড় সাজিয়েছি,,দেখে আয় আর একটু পরে ভাইয়ার থেকে টাকা আদায় করবো না,, তাড়াতাড়ি চল,,,
নুবা নিষ্পাপ দৃষ্টিতে আরশির দিকে তাকালো,, বিধায় ভালো লাগছে না তার তাই কোনো প্রশ্ন না করে আরশির সাথে আসলো,,সেও এই সব দেখে নিজেকে শক্ত করতে চায়,,,
রাজকিও রুমটাকে ফুল দিয়ে সাজিয়ে তুলা হয়েছে,,,রুমের ফ্লোরে,,ঘড়ের আসবাবপত্রের উপর ফুলের পাপড়ি,,,ছোটো ছোটো মোম বাতি রাখা হয়েছে একটু পর হয়তোবা জ্বালানো হবে,,
নুবা মাথার ওরনা টেনে কম্পিত হাতে ফুল গুলো ছুঁয়ে দিলো,,মন থেকে তাদের জন্য দোয়া প্রার্থনা করলেও বুকটা তার ফেটে আসলো,,
ইশিতাকে রুমে আনা হয়েছে,,,মেয়েটাকে দাদি নানিরা ঘিরে বসে আছে,,আরাফের নানি এসেছে,,,দাদি নাকি অনুষ্ঠানের দিন আসবে,,,দাদা,,নানা বেঁচে নেই তবে নানি দাদি বেঁচে আছে কিন্তু তাদের দুই জনের ভিতরে সম্পর্ক কেউ বুঝে না কখনো অনেক ভালো আবার কখনো দুই বেয়াই দুই জনকে সহ্য করতে পারে না,,,দুই জনের ভিতরে লেগেই থাকে,,
ইশিতাকে ঘিরে নানি দাদিরা দুষ্টু কথা বার্তা বলতে লাগলো,,ইশিতা মর্ডান হওয়ায় এতোটা লজ্জা লাগলো না তার সেও নানি দাদির সাথে তাল মিলালো,,
আরাফ এক গ্লাস মদ গিলে বিরবির করে বললো
_ আজকে ফাটিয়ে দিবো দোস্ত,,,,তোরা শুধু দেখিস,,,
আরাফের বন্ধুগন হাসলো,,, পরপরই কিছু অবাঞ্চিত জিনিস আরাফের হাতে ধরিয়ে দিয়ে সবাই হাসাহাসিতে ফেটে পড়লো,, বন্ধুদের ভিতরে যা হয় আরকি,,,
আরাফের রুমের সামনে সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে,,টাকা না দিলে ভিতরে যেতে দেওয়া হবে না,, কিন্তু সবার ডিমান্ড বেশি তাই আরাফ দিবে না বলছে,,,
আরাফের কাজিনরা এগিয়ে এসে বললো
_ ১ লাক্ষ,,তাও কম হয়ে যাচ্ছে,,,সবার ভিতরে ভাগাভাগি করলে ৩ হাজার করেও পড়বে না,,
_ তাহলে দেও ভাইয়া সময় নষ্ট করো না ভাবি তোমার জন্য অপেক্ষা করছে,,
_ পাগল পেয়েছিস আমাকে,, ১ লাক্ষ,,সর,, আমার বউ আমাকে ভিতরে যেতে দে,,,
আরশি এগিয়ে এসে বললো
_ না না চলবে না,,,তাড়াতাড়ি দেও,,,
আরাফ ঠেলে ঠুলে ভিতরে যাওয়ার চেষ্টা করলো তবে এতো গুলো মানুষ কে ঠেলে ভিতরে যাওয়া অসম্ভব,,,
_ আরে ভাই যেতে দে রাত শেষ হয়ে যাবে,,
_ তাই তো বলছি তাড়াতাড়ি দেও,,
সবাই স্লোগান দিলো ১ লাক্ষ,, এদিকে বাড়ির বড়রা হাসাহাসি করছে এই বাচ্চা গুলো বড় হয়েও বাচ্চা রয়ে গেলো,,,
আরাফ খেলায় করলো ভিরের এক কোনায় নুবা চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে,,আরশি নিয়ে এসেছে তাকে না হলে এখানে আসার তার কোনো ইচ্ছাই ছিলো না,,,
আরাফ শয়তানি হাসি দিলো আরশিকে বললো
_ নুবাকে চাইতে বল তালহে দিবো,,,
যারা যারা নুবাকে চিনে সবাই মিলে তাকে ধরে বেঁধে আরাফের সামন দাঁড় করালো,,আরশি বিরবির করে বললো
_ তাড়াতাড়ি চা ভাই,,,আর দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না,,,
নুবা এক পলক মাথা উঁচু করে আরাফের মিচকে শয়তানের মতো মুখটার দিকে তাকিয়ে কম্পিত হাত এগিয়ে দিয়ে বললো
_১ লাক্ষ,,,
আরাফ মনে মনে কুটিল হাসলো,,নুবার ক্লান্ত চোখ দুটো দেখে সে বুঝে গেলো তার মনের ভিতরে কি চলবে,,নুবাকে আরো জ্বালানোর জন্য বলে উঠলো
_ শুনিনি জোরে বল,,,
নুবা হাত মুঠো বদ্ধ করে বললো
_ আপনি যদি ভিতরে যেতে চান তাহলে ২ লাক্ষ দিতে হবে,,
আরাফ ভুরু কুঁচকে বললো
_ একটু আগে তো ১ লাক্ষ বললি
_ আপনি তো বললেন শুনেনি,,আর সময় যত যাবে তত টাকার পরিমাণ বাড়বে,,
_ যদি না দেই,,,
নুবার ঠোঁট হেলিয়ে হাসলো দুই হাত বুকে গুজে হাস্যোজ্জ্বল চোখে আরাফের দিকে তাকালো,,,আরাফ ভুরু কুঁচকে নিলো,,একটু আগে দহনে পুড়ছিলো এখন আবার চোখ মুখে অন্য রকম ঝাঁঝ,,
_সবাই কষ্ট করে বাসর সাজিয়েছে দিতে তো হবেই না হলে ভিতরে যাওয়ার কথা ভুলে যান,,, আপনার বউ অপেক্ষা করতে থাকুক,,,
আরাফ নিজের ডেবিট কার্ড নুবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তার কাছে এগিয়ে যেএ বিরবির করে বললো
_ ৩৭***** ,,কোড বলে আরাফ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো যা নুবার কানে যেএ স্পর্শ করলো,,নুবা সরে যেতে চাইলে আরাফ মুচকি হেসে বললো
_ ইস্,, আফসোস তুই পেলি না আমাকে,,আর লোভে পড়ে ২ লাক্ষের বেশি উঠাবি না,,,
নুবা সরে দাঁড়িয়ে বললো
_ সুখি হোন, আবর্জনা আমার লাগবে না, All the best ,,,আরাফ ভাই,,,
সবাই সরে গেলো,,,আরাফ এক পলক নুবার দিকে তাকিয়ে কুটিল হেসে ভিতরে চলে গেলো,,,
সবাই নুবার দিকে তাকিয়ে সন্দেহ করে বললো
_ কানে কানে কি বললো রে,,
_ টাকা উঠাবা কোড লাগবে না সেটাই,,,
নুবা কোড আর কার্ড টা আরাশির হাতে ধরিয়ে চলে গেলো,,,
বাড়িতে ৬ কার্টুন এর মতো কোন আইসক্রিম আনা হয়েছে,, সবাইকে দেওয়া হচ্ছে,, এমন একটা সময়ে আইসক্রিম না আনা হলে হয়,,,
নুবা একটা আইসক্রিম নিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো,,, নিজেকে বুঝালো সব শেষ,,,
রাত যখন দেরটা তখনো বাড়ির কেউ ঘুমায়নি,,,সবাই অনেক দিন পর এক সাথে হওয়ায় গল্পে মেতে আছে,,এই সবের ভিতরে সব থেকে খুশি আমিনা বেগম,, অনেক দিন পর সবাই এক জোট হয়েছে
নুবা আয়ারকে ফিড করাচ্ছে আর তার পিঠে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে,,
তার চেষ্টায় সে সফলো হলো আয়রা ঘুমিয়ে গেলো,,,নুবা আয়ারকে দিয়ে আসার জন্য আমিনা বেগম কে খুঁজলো তবে সে গল্পে ব্যস্ত,,নুবার বিরক্ত করতে ইচ্ছে হলো না,,নিজের সর্বোচ্চটা মাকে বলে আয়ারকে দিয়ে আসতে চলে গেলো
করিডোর দিয়ে আরাফের রুম পার করার সময় মন বললো একটু চেয়ে দেখ,,নুবা বুকে পাথর রেখে সরে গেলো,, আরহামের রুমের সামনে যেএ টোকা দিলো আরাহাম ভিতরে আসতে বললো
নুবা আয়ারকে নিয়ে ভিতরে গেলো,, সুন্দর করে তাকে শুইয়ে দিয়ে চলে আসতে নিলো তখনি বরাবরের মতো আরহাম বাঁধা দিয়ে বললো
_ওষুধ আর খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করো না তুমি,,,কাল থেকে মেয়ের আমার পেট ভরছে না,,ঘুমের ভিতরে মুখ নাড়ে,, কান্না করে,,
নুবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_ হয়তোবা,,তবে খেয়াল রাখবো,,,
_ হুম,,, খাওয়া দাওয়া ভালো মতো করো,,,
নুবা উত্তর না দিয়ে রুম থেকে বেড় হয়ে আসলো,,,
পরপর আরাফের রুম পার করার সময় বাইরে থেকে ফিসফিস শব্দ শুনা গেলো,,,নুবা চলে যেতে চাইলেও তার পা থমকে গেলো,,
ভিতর থেকে তাদের সুখোময় সময়ের কিছু শব্দ ভেসে আসছে,,নুবা না চাইলেও তার বুক ভারি হয়ে আসলো,এই আপত্তিকর শব্দ গুলো তিরের মতো বুকে যেএ বিধলো তার, ওখানে আর না দাঁড়িয়ে এক দৌড়ে ছাদের দিকে চলে গেলো,,,
ইশিতা উত্তেজিত কন্ঠে বললো
_ তুমি এতো বিচলিত হচ্ছো কেন,, আস্তে আমি পালিয়ে যাচ্ছি না,,,
আরফ ইশিতার গলায় নাক ঘষে বললো
_ তুমি এতো hot কি করবো,, নিজেকে সামলাতে পারছি না,,,
_ হইছে,,কুল আছি আমি সারা রাত পড়ে আছে নিয়ন্ত্রণ রাখো,,এতো বেপরোয়া হলে হবে
ছাদে কেউ নেই,,সবাই এখন লিভিং রুমে,,,কেউ বা বাগানের আশে পাশে প্রেম করছে যেমন আরশি আর রিহান,,তবে ছাদে তালা দেওয়া থাকায় কেউ আসেনি,,চাবি দরজার পাশের টপের নিচে রাখা হয় এটা বাড়ির মানুষ ব্যতিত হয়তোবা কেউ জানে না তাই কেউ আসেনি,,,,,
নুবা ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।চাঁদের ম্লান আলো যেন আজ তার বুকের জমে থাকা কষ্টগুলো আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে।যে মানুষটাকে একদিন নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছিল, আজ তারই বাসর রাত।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই নুবার চোখ দুটো অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে উঠল।শীতল রাতের বাতাস বারবার তার চুল উড়িয়ে দিলেও বুকের ভেতরের জ্বালা একটুও কমল না।চারপাশে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও তার পৃথিবীটা যেন আজ একটু বেশি নিঃসঙ্গ, একটু বেশি শূন্য লাগছে।আকাশের অসংখ্য তারার মাঝে হারিয়ে গিয়ে সে শুধু নিজের ভাঙা অনুভূতিগুলোকে সামলানোর চেষ্টা করে গেল।সে পারলো না আরাফের মিথ্যা ভালোবাসাসে ঘৃনা করতে,,
হ্যাঁ সে আরাফকে ঘৃনা করে তবে তার সুন্দর অতীতকে না,, মিথ্যা হলেও তো অনেক সুখ পেয়েছে,,ভালো থেকেছে,,,থাকুক কিছু মিথ্যা সত্য হয়ে,,
নুবা আকাশ পানে তাকিয়ে মুচকি হেসে গুনগুন করে গেয়ে উঠলো,,
_বুকের ভেতর ফুটছে যেন মাছের কানকোর লাল, এত নরম, শাড়ির সুতো বুনছে যেন সেই লালের কঙ্কাল, বিপদ বড়।
কথার ওপর কেবল কথা সিলিং ছুতে চায়, নিজের মুখের আয়না আদল লাগছে অসহায়
তুমি অন্য কারোর ছন্দে বেঁধো গান তুমি-অন্য কারোর ছন্দে বেঁধো গান।
তুমি যাকে ভালবাসো স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো, তার জীবনে ঝড়।
নীরব উন্মাদনা পর্ব ৩০
তুমি যাকে ভালবাসো স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো, তার জীবনে ঝড়। তোমার কথার শব্দদূষণ তোমার গলার স্বর, আমার দরজায় খিল দিয়েছি আমার দারুন জ্বর,
তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর।
নুবা আস্তে করেই ওখানে রেলিং পিঠ লাগিয়ে বসে পড়লো,,পরপর বিরবির করে দুই কলি গেয়ে উঠলো
_ তুমি অন্য কারো সঙ্গে বেঁধে ঘর,,,
