Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম শেষ পর্ব

হৃদয় রাঙানো প্রেম শেষ পর্ব

হৃদয় রাঙানো প্রেম শেষ পর্ব
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

কাইফার বাবা ডাকা ও মক্কায় যাওয়ার খবর নিমিষেই ইকরা অব্দি চলে যায়। ইকরা এখন এ বাড়িতে চাইলেও আসতে পারেনা। সেই যে কাইফা হওয়ার পর এসে এক মাস থেকে গিয়েছিল। এরপর আর আসতে পারেনি। কেননা এখানে আসলেই উবায়দুল্লাহ অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ছেলেকে সামলাতে গিয়ে সে নিজেও অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। আর সবটুকু ধকল যায় উমরের উপর দিয়ে। ঘরে স্ত্রী সন্তান অসুস্থ্য থাকলে কোন স্বামীরই বা ভালো লাগে? তাই সে ইকরাকে আসতে দেয়না। সাথে ফরিদা বেগম তো আছেনই। নাতির উপর সামান্য আঁচ টাও সহ্য হয়না তার। অগত্যা প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা বলেই বাবার বাড়ির সদস্যকে দেখার আয়েশ মেটায় রমণী। ভিডিও কল দিয়ে একবার হলেও কাইফাকে দেখে সে। কাইফা ও ফুপি পাগল। ফুপিকে মোবাইলের স্ক্রিনে দেখলেই তার কি খুশি! আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। হুমায়রা ওর সামনে মোবাইল ধরে রেখেছে আর সে ফুপির সাথে হাসছে, ক্ষণে ক্ষণে হাত নাড়িয়ে নিজের নিজের উচ্ছ্বাস বুঝাচ্ছে।

“ বাবা, মা সবই তো ডাকলে এখন ফুপি ডাকবে কবে আম্মু? তোমার ফুপি যে তোমার মিষ্টি কণ্ঠে ডাক শোনার জন্য উতলা হয়ে আছে। ”
“ ডাকবে ডাকবে এইতো কথা শিখছে।সামনে সবাইকেই ডাকতে শিখবে। ”
“ সবার আগে ফুপি ডাক শিখাবি বলে দিলাম। তোকে না আগেই বললাম সারাক্ষন ওটাই জপবি ওর সামনে তাহলেই বলে ফেলবে একসময়। ”
বান্ধবীর কথায় হাসে হুমায়রা। জবাবে বলে,
“ জপি তো, অনেকবারই তো বললাম ফুপি বলতে। বলতে পারেনা চুপ করে থাকে। আচ্ছা দাঁড়া এখনি বলছি। ”
“ কাইফা বলতো- ফুপিমনি। ”
ডাক শুনে শিশুটি মায়ের দিক তাকায়। পরপর ফের ফুপির দিক নজর দেয়। মুখ দিয়ে কিছু বলতে সক্ষম হয়না। হুমায়রা পুনরায় ইকরাকে দেখিয়ে বলে-

“ আম্মু দেখো এটা তোমার একমাত্র ফুপিমনি। ফুপিকে ডাকো তুমি। বলো- ফুপিমনি…”
“ মনি…. ”
হুট করেই এটুকু উচ্চারণ বেরিয়ে আসে শিশুটির মুখ দিয়ে। সাথে সাথেই ইকরার ওপাশ থেকে খুশিতে চিৎকার করে ওঠে,
“ ওরে আমার আম্মু টারে! কি সুন্দর সুন্দর করে ডাকল ফুপিকে। ইশ আমার যে কি খুশি লাগছে! মন চাচ্ছে উড়ে এসে আমার কলিজা ফুপি টাকে কোলে নিতে। ”
ফুপির হাসি দেখে কোনোকিছু না বুঝেই হাত পা নাড়িয়ে শব্দ করে হাসে কাইফা।
“ এসে পড় তাড়াতাড়ি। আর উবায়দুল্লাহ কোথায়? ”
হুমায়রার প্রশ্নে স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে খানেক এদিক সেদিক চোখ বুলায় ইকরা। এরপর অতিষ্ট গলায় বলে,
“ কে জানে ও কোথায়? নিচে বোধ হয়। এই ছেলে একটু শান্ত হয়ে বসে না। এতো টইটই আর দুষ্টুমি করে সারাদিন। কি যে করে সারাটাদিন আল্লাহ মালুম! আমার কথা তো কানেই নেয়না। উনার কথাই যা একটু শুনে। ”

“ ছোটবেলা এমন দুষ্টুমি করেই। ”
“ হুম। ”
কথার মাঝেই হঠাৎ নিচ থেকে উবায়দুল্লাহর চিৎকার ভেসে আসে। ছেলের কান্না কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ইকরা ফোন কাটতে উদ্যত হয়ে পড়ে। ব্যস্ত গলায় জানায়,
“ আচ্ছা সখি এখন রাখি। উবায়দুল্লাহ কাঁদছে আবার কোথাও ব্যথা পেল নাকি কে জানে। ”
“ আচ্ছা রাখ, আল্লাহ হাফেজ। ”
“ আল্লাহ হাফেজ। ”

উবায়দুল্লাহ চেয়ার থেকে পড়ে মাথা ফুলিয়ে ফেলেছে। সে উঠতে পারে ঠিকই কিন্তু নামতে পারেনা। একা একা নামতে গিয়েই পড়ে গেছে। পরেই পুরো বাড়ি মাথায় তুলে দিয়েছে এক চিৎকার। ইকরা তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে ছেলেকে কোলে নেয়। ততক্ষণে বাড়ির সবাই ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হয়ে গিয়েছেন। ফরিদা বেগম এসেই আর্তনাদ করে উঠলেন,
“ একি…! চেয়ার থেকে পড়ল কীভাবে ও? তুমি কোথায় ছিলে? ”
ইকরা ছেলের মাথা ঢলছে ব্যস্ত হাতে। এর মাঝেই শ্বাশুড়ির কথার জবাব দিল,
“ আমি তো ঘরেই ছিলাম আম্মাজান। ”
“ তুমি ঘরে থাকতে ছেলেটা পড়ে যায় কীভাবে? মনযোগ কোথায় থাকে তোমার। ”
“ আহ! এখন এসব বলার সময়? যাও গিয়ে বরফ এনে মাথায় দাও ওর। ”
স্ত্রীর উদ্দেশ্যে ধমকে বললেন উসমান মোল্লা। ভদ্রমহিলা থেমে গেলেন। হনহন করে গিয়ে ফ্রিজ থেকে বরফ আনলেন। উবায়দুল্লাহ তখনও কেঁদে যাচ্ছে। তিনি এসেই নাতিকে নিজের কোলে তুলে নিলেন,
“ দেখি দাও, আমার কাছে দাও আমার নাতিকে। ”
ইকরা শব্দহীন, ফরিদা বেগম সযত্নে নাতির মাথায় বরফ ঢলে দিতে লাগলেন। এক পর্যায়ে কান্না কিছুটা থামল উবায়দুল্লাহর। তবে ফরিদা বেগমের মুখ তখনো চলমান। স্বামীর প্রস্থান হতেই ইকরাকে এক নাগাড়ে কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

“ আম্মুর কোনো দোষ নেই তো দাদিজান। আমিই আম্মুকে না ডেকে নিজে নিজে নামতে চেয়েছিলাম। ”
“ তুমি চুপ থাকো, তোমায় ডাকতে হবে কেন ও চোখে চোখে রাখতে পারে ন.. । ”
“ কি হয়েছে? ”
অকস্মাৎ পেছন থেকে ছেলের গমগমে স্বর ভেসে আসতেই থেমে গেলেন ভদ্রমহিলা। উমর মাত্রই মসজিদ থেকে আসর নামাজের ইমামতি করে এসেছে। এতক্ষণ বাড়িতে ছিল না সে। ইকরা এবার স্বামীর পানে তাকায়। মেয়েটার চোখ মুখ খানেক লালিত। এমনিতেই ছেলের ব্যথায় নিজের বুক পুড়ছে উপরে শ্বাশুড়ির কথায় কান্না এসে যাবে যাবে ভাব। তবে নিজের অশ্রু আটকে চুপ করে বসে রইল সে। প্রস্তুত হলো উমরের থেকেও কথা শোনার। নিশ্চই ছেলে আঘাত পেয়েছে বলে লোকটাও তাকে বকবে? উমর নিঃশব্দে এগিয়ে আসে। গমগমে স্বরে শুধায়,

“ কি হয়েছে ওর? ”
“ চেয়ার থেকে পড়ে দেখ ছেলেটার মাথার কি অবস্থা হয়েছে। আর তোর বউ কিনা ঘরেই ছিল। ”
“ এর জন্যই আপনি ইকরাকে কথা শুনাচ্ছেন ? ”
“ কথা শুনাব না তো কি করব? ছেলেটা কে একটু চোখে চোখেও রাখতে পারে না ও! ”
“ আপনি কোথায় ছিলেন? ”
ছেলের প্রশ্নে খানেক ভরকে যান ভদ্রমহিলা। সময় নিয়ে থেমে থেমে বলেন,
“ আমি ঘরেই ছিলাম কেন? ”
“ তাহলে আপনি কেন ওকে পড়া থেকে বাঁচাতে পারলেন না। ”
“ তুমি কি আমার সাথে ওর তুলনা করছো? ও মা হয় ও সবার মতো চললে হবে নাকি! ”
“ হুম ঠিক বলেছেন ও মা হয়। সুতরাং সন্তানের কিছু হলেও কষ্টটা সবচেয়ে বেশি ওরই লাগবে। তো এখানে ওকে বকাঝকা করার টপিক টা আসে কোথা থেকে! ”
“ ঘাট হয়েছে আমার! আর বকব তোমার বউকে। তোমাদের ছেলে তোমরা যেভাবে ইচ্ছে লালন পালন করো আমি আর কিছু বলব। ”
উবায়দুল্লাহ কে ইকরার কোলে বসিয়ে দিলেন ফরিদা বেগম।পরপর গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করলেন। মায়ের কান্ড দেখে ফুস করে শ্বাস ছাড়ে উমর। কাঁধ ঝুঁকিয়ে ছেলেকে নিজের কোলে নেয়। মোলায়েম কণ্ঠে শুধায়,

“ কোথায় ব্যথা পেয়েছ? ”
“ এখানে। ”
আঘাতপ্রাপ্ত স্থান টুকু দেখিয়ে জবাব দিল উবায়দুল্লাহ। উমর প্রথমে স্নেহের হাত বুলায় ফোলা জায়গাটায়। পরক্ষণেই চুমু খেয়ে বলে,
“ এসব কিছুনা সোনা আব্বু, একটু পরই ভালো হয়ে যাবে। ”
কথাটুকু বলে নিচে বসে থাকা স্ত্রীর দিকে তাকায় উমর। ইকরাকে তখনো হা হয়ে বসে থাকতে দেখে বলে,
“ তুমি কি এভাবে বসেই থাকবে? ”
ইকরার যেন ধ্যান ভাঙে। মুগ্ধতার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে সে। তৎক্ষনাৎ নিজেকে ধাতস্ত করে উত্তর করে,
“ না, এখানে কেন বসে থাকব আমি। ”
“ তাহলে চলুন। ”
হাত বাড়িয়ে বলে উমর। পৃষ্ঠে ভেসে আসে ইকরার দ্বিধান্বিত স্বর,
“ কোথায়..? ”
“ না বললে যাওয়া যাবে না? ”
“ কে বলল যাওয়া যাবে না? ইমাম সাহেব যেদিকে তার ইকরা বিবি চোখ বন্ধ করেও নির্দ্বিধায় সেদিকে যেতে পারবে। ”
উমরের হাতটা শক্ত করে ধরে বলে উঠে ইকরা। উমর হাসে অতঃপর কক্ষের দিকে যেতে যেতে বলে,
“ আপাতত চোখ খোলা রেখেই কক্ষে চলুন। বাকিটা জীবন নাহয় ওভাবেই চোখ বন্ধ করে নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দেয়া যাবে। ”

*রাতে কাইফাকে মাঝখানে শুইয়ে রেখে তার দুপাশে শুয়ে আছে কৃশান ও হুমায়রা। ঘুম ঘুম চোখে মেয়েকে খাওয়াচ্ছিল হুমায়রা। এর মাঝেই হঠাৎ করে জননীর বুকে দাঁত বসিয়ে দিল কাইফা। হুমায়রা আর্তনাদ করে উঠল তৎক্ষনাৎ। ব্যথায় ককিয়ে ধাক্কা মেরে মেয়েকে নিজের থেকে সরাল। ধমকে বলল,
“ কাইফা ছাড়ো…..! ”
চিৎকার শুনে সাথে সাথেই ছেড়ে দিল কাইফা। পরপর সুদীর্ঘ পল্লব ঝাপটে জননীর দিক তাকাল। ওমনিই ফের ধমকে উঠল হুমায়রা,
“ একটা দিব ধরে একদম। দুষ্টু মেয়ে সরো যাও, আজকে আর খাওয়া নেই তোমার।”
বলেই শিশুটিকে নিজের থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা চালাল। কাইফা কিছুক্ষণ চুপটি করে রইল। ফ্যালফ্যাল চাহনি নিক্ষেপ করে মুখে শাহাদাত আঙুল পুরে দিল।
“ আবার মুখে আঙুল দেয়! ”
“ বপ….! ”
সবগুলো আঙুল গুটিয়ে শুধু শাহাদাত আঙুলটা চুপ করানোর ভঙ্গিতে ঠোঁটের মাঝ বরাবর রেখে শব্দটুকু উচ্চারণ করল কাইফা। হুমায়রা কেবল মুখের ভিতর থেকে থেকে ওর আঙুলটা সরাতেই নিচ্ছিল। এর মাঝেই মেয়ের কাণ্ডে হতবিহ্বল হয়ে গেল রমণী। হতভম্ব চিত্তে তাকাল স্বামীর পানে। কৃশানেরও একই দশা, মেয়েকে এভাবে বকার কারণে মাত্রই হুমায়রার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে নিচ্ছিল সে মাঝপথেই মেয়ের কাণ্ডে চুপ মেরে যায়। স্ত্রীর সাথে চোখাচোখি হতেই দুজনে শব্দ করে হেসে উঠে। কিছুক্ষণ খিলখিল করে হেসে নেয় হুমায়রা। পরপর মুখ কালো করে প্রতিউত্তর করে,

“ তুমি বপ! ”
কাইফার চোখ টলমলে, মায়ের এইটুকুনে ধমকেই অশ্রুর বর্ষণ নেমেছে সেথায়। সে কি চোখের পানি মেয়ের ! পলক ফেলার আগেই গাল বেয়ে জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ল। কাইফা এবার বাবার দিকে ঘুরে। অশ্রুসিক্ত গলায় ডাকে,
“ বাবা। ”
“ বলো বাবা, আম্মু বকা দিয়েছে? ”
পৃষ্ঠে মাকে পেছন দিয়ে বাবার বুকের কাছে গিয়ে গুটিসুটি মেরে শোয় কাইফা। কৃশান তার আহ্লাদির উদ্দেশ্যে আহ্লাদি কণ্ঠে বলে,
“ বাবা তোমার আম্মুকে মেরে দিব ওকে? আমার বাবাটা কে বকাঝকা করা! এতবড় অন্যায়? ”
কাইফা ছোট ছোট হাতে বাবার চওড়া বুক জড়িয়ে ধরার চেষ্টা চালায়, তবে হাত দ্বারা কুলাতে পারেনা। কৃশান নিজেই মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। মেয়েটা একেবারে শান্ত হয়ে শুয়ে রয় সেথায়। ভুল করেও মায়ের দিক ফিরেনা। হুমায়রা মেয়ের অভিমানী সত্তাটাকে কিছুক্ষণ মনযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে। পরপর মনে পড়ে এখনো নামাজ পড়া হয়নি তার। তৎক্ষনাৎ এশার নামাজ আদায় করতে চলে যায় সে। ফিরে এসে দেখে মেয়ে তার বাবার বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। হুমায়রার এগিয়ে এসে ওকে নিজের কাছে আনতে চায়। তবে কাইফা একেবারে শক্ত করে কৃশানকে ধরে রাখায় আনতে সক্ষম হয়না। কৃশান বলে,

“ ঘুমাক এভাবেই। ”
“ আপনার মেয়ের কি অভিমান দেখেছেন? ”
“ অভিমান তো থাকবেই? আমার একমাত্র আহ্লাদি রাজকন্যা যে এটা। ”
মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে বলে কৃশান। পরপর তার বাঁ বাহু বাড়িয়ে দিয়ে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলে,
“ তুমিও এখানে শুয়ে পড়। ”
হুমায়রা দ্বিরুক্তি করেনা। ফটাফট শুয়ে পড়ে স্বামীর বাহুতে। অতঃপর ওভাবেই পেরিয়ে যায় আরো একটি রাত।

সপ্তাহের মধ্যেই হুমায়রা দের ভিসার কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। আজকে তাদের ফ্লাইট। অবশেষে আজ নিজের বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নটুকু পূরণ হতে যাচ্ছে হুমায়রার। বিকেল চারটার দিকেই প্ল্যান ছাড়া হবে। সেই সুবাদে সকাল থেকে এই অব্দি প্রয়োজনীয় সবকিছু ঠিকঠাক নেয়া হয়েছে কিনা, বারবার চেক করে যাচ্ছে হুমায়রা। ইয়াসমিন বেগম ওকে সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তার এ সমন্ধে ভালো ধারণা আছে। বিয়ের কিছু বছর পরেই স্বামীর সাথে হজ পালন করতে গিয়েছিলেন তিনি। নাজমিন বেগমও গিয়েছিলেন। তাদের দুই জা এরই হজ পালন করা হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। এখন শুধু ছেলে মেয়েদের হজ দেখার পালা।
কাইফা দুপুরে খেয়েদেয়ে যে ঘুম দিয়েছে এখনো উঠার নাম নেই। এইদিকে রওনা দেয়ার সময় হয়ে আসছে। হুমায়রা তৈরি হতে হতে কৃশানকে বলে,
“ ওকে একটু ঘুম থেকে ওঠান না। ”
“ উঠাতে হবে না। এভাবেই নেয়া যাবে। ”
হুমায়রা মেয়ের দিক তাকাল। কাইফার মাথায় হিজাব বাধা। দুপুরে মায়ের সাথে নামাজ পড়তে বসেই হুমায়রার কে দিয়ে হিজাব টা বাধিয়েছিল সে। ওভাবেই ঘুমিয়ে গেছে। পরনে পা অব্দি একটা ক্রিম কালারের গোল জামা। এক কথায় বোরকা বললেই চলে। হুমায়রা আর কিছু বলল না। নিজের রেডি হওয়ায় মন দিল। রেডি হওয়া শেষ হতেই রওনা হলো তারা। কৃশান এক হাতে ঘুমন্ত মেয়েকে কাঁধে নিয়ে নিল। অপর হাতে ব্যাগপত্র নিয়ে গাড়ি অব্দি গেল।
ইয়াসমিন বেগম নাজমিন বেগমও পেছন পেছন আসলেন। গাড়িতে প্রয়োজনীয় ব্যাগগুলো রেখে মা চাচির নিকট এগিয়ে এলো কৃশান। হুমায়রা আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত। কৃশান এসেই ইয়াসমিন বেগম ও নাজমিন বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আম্মু, বড় আম্মু আসছি তবে। দোয়া করো। ”
“ সাবধানে থাকিস বাবা, মেয়েটাকে কোল থেকে ছাড়িস না কিন্তু। হুমায়রাকেও হাত ছাড়া করিস না। আর কোনো সমস্যা হলে তোর আব্বু, বড় আব্বু তো আছেনই ওখানে। ”
“ আচ্ছা আম্মু আসছি তবে, আল্লাহ হাফেজ। ”
“ আল্লাহ হাফেজ। ”
ইয়াসমিন বেগম ছেলের পথপানে তাকিয়ে রইলেন। ক্ষনিকের মধ্যেই ধোঁয়া উড়িয়ে গাড়িটা বাড়ির গেইট পেরিয়ে ছুটল নিজ গন্তব্যে। সেদিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন দুই জা। মনে মনে রবের নিকট প্রার্থনা করতে ভুললেন না।

কৃশানরা সৌদির মাটিতে পা রাখে ঐদিন মধ্যরাতে(বাংলাদেশের)। সেখানে তখন রাত দশটা বা এগারোটা। তারা এসেই ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে। পরপর মেয়েকে নিয়ে হুমায়রা ঘুমিয়ে পড়ে আর কৃশান যায় বাপ- চাচাদের সাথে দেখা করতে। দেখা করে এসে সেও ঘুমিয়ে পড়ে। ঐ রাতে আর কোথাও যাওয়া হয়না। মক্কার উদ্দেশ্যে যাওয়া হয় এর পরদিন। সব বিধি বিধান মেনে সেদিনই তারা পা রাখে আল্লাহর পবিত্র ঘরে।
উত্তপ্ত, ধূসর আর রুক্ষ আরবের পাথুরে পাহাড়গুলোর মাঝে কাবা যেন এক নিথর, শান্ত কৃষ্ণ-সমুদ্র। কাবার চারপাশের শ্বেতশুভ্র মার্বেল পাথরের চত্বরটিকে (মাতাফ) মনে হয় সেই সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ। সাদা ইহরাম পরা লাখো মানুষ যখন সেই কৃষ্ণ-কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে, তখন যেন মনে হয় এ এক অদ্ভুত মহাজাগতিক দৃশ্য, যেন একটি কৃষ্ণগহ্বরকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি নক্ষত্র তাদের কক্ষপথে ঘুরে চলেছে। সেখানে কোনো রাজা নেই, কোনো ফকির নেই; সবাই যেন এক বিশাল সমুদ্রের ছোট ছোট জলবিন্দু, যারা নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়েছে সেই পরম একের মাঝে।

হুমায়রা মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে থাকে পবিত্র ঘরটার দিক।মেয়েটার বুক শিহরিত হয়। মন আনচান করে কালো কাপড়ে মোড়ানো ঘরটিকে একটু ছুঁতে। মানুষজনদের সংখ্যা কমে আসতেই কৃশান ওকে একেবারে কাবার নিকটে নিয়ে যায়। হুমায়রা কাঁপা হাতে ছুঁয় তার আল্লাহর ঘর। মেয়েটার চোখে পানি আসে। অত্যধিক সুখের পানি। অবশেষে মক্কা তাওয়াফ করতে পেরেছে সে। নিজ ছুঁতে পেরেছে আল্লাহর পবিত্র ঘর। বাবা-মাকে অনুসরণ করে কাইফাও ছোট্ট হস্ত যুগল দ্বারা স্পর্শ করে পবিত্র ঘরটি। মুখে হাসি ফুটে তৎক্ষনাৎ। পরক্ষণেই মায়ের চোখে পানি দেখে শিশুটির মুখ কালো হয়ে যায়। এক পল বাবার দিক চায় সে। কৃশান তখনো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের ঘরটির দিকে। ওর ভিতরে যে কি রকম অনুভুতি হচ্ছে সেটা বুঝা মুশকিল। বাবার মনযোগ না পেয়ে কাইফা নিজেই হাত বাড়িয়ে মায়ের কোলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। হাত বাড়িয়ে মায়ের হিজাব টেনে ধরে। হুমায়রা ফিরে চায়। বিলম্বহীন কোলে নেয় মেয়েকে। কাইফা কোলে এসেই প্রথমে চিকন চিকন আঙ্গুল গুলো দিয়ে মায়ের চোখে স্থান পাওয়া অশ্রুকণা দের সরাতে চায়। অগুছালো হাতে মুছে দেয় মায়ের চোখ। পরপর আদুরে গলায় ডাকে,

“ মা, ”
হুমায়রা মেয়ের ছোট্ট মুখটা নজর বন্দি করে। কিয়ৎক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে চুমু খায় মেয়ের মুখে। হেসে বলে,
“ মা কাঁদছি না সোনা। ”
জননীর মুখে হাসি দেখতেই ঠোঁট প্রসারিত হয় শিশুটির। হেসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে সে। কৃশান ওদের দেখে মুগ্ধ নয়নে। অজান্তেই নিজের মুখেও হাসি ফুটে। পরপর কাইফাকে নিজের কোলে নিয়ে আসে। স্ত্রীর এক হাত শক্ত করে মুঠোয় পুরে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপে এগিয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহর রহমতে সব বিধি-বিধান ঠিকঠাক মতো মেনে ঐদিনই ওদের ওমরাহ সম্পন্ন হয়।

রজনীর নিস্তব্ধতা চিরে মসজিদে মসজিদে ধ্বনিত হলো আযানের মিষ্টি স্বর। জেগে উঠল পুরো শহর। নিয়োজিত হলো সৃষ্টিকর্তার বন্দেগী তে। আজ মসজিদে নববীতে ফজরের সালাত সম্পন্ন করেছে কৃশান। সালাত শেষে বাসায় ফিরে হুমায়রা কে বলল- বোরকা পড়ে রেডি হয়ে নিতে, হাঁটতে যাবে তারা। হুমায়রা বিলম্ব হীন তৈরি হওয়া শুরু করল। কাইফা কে রেডি করাল কৃশান। ঠিক মায়ের মতোই কালো বোরকা পড়িয়ে, মাথায় যত্ন করে কালো হিজাব পড়িয়ে দিল। অতঃপর রেডি হওয়া শেষ হতেই বরাবরের মতো এক হাতে মেয়েকে কোলে নিয়ে অপর হাতে স্ত্রীর হাত মুঠোয় পুরে বেরিয়ে পড়ল।
একেবারে মসজিদে নববীতে এসে থামল তারা। সেখানে তখন মানুষ জনের তেমন বালাই নেই। সালাত শেষে যে যার গন্তব্যে চলে গিয়েছে। কাইফা ফ্যালফ্যাল নয়নে চারপাশ পরখ করছে। এক পর্যায়ে বাবার কোল থেকে নামার জন্য মুচড়া মুচড়ি শুরু করে দিল সে। কৃশান বাঁধাহীন নামিয়ে দিল মেয়েকে। কাইফা গুটিগুটি পায়ে সামনে হাঁটা দিল। হুমায়রা, কৃশান দুদিক দিয়ে ওর দুহাতের আঙুলে ধরে রাখল। ওভাবেই প্রথমে নবীজীর রওজা মোবারক জিয়ারত করল ওরা। পরপর ঘুরে ঘুরে পুরো মসজিদ পরখ করতে লাগল। তিনজন মিলে বসল এক জায়গায়। এর মাঝেই কাইফা মিষ্টি স্বরে উচ্চারণ করল,

“ বাবা ”
“ বলো বাবা। ”
কৃশান মেয়েকে কোলে নেয়। কোনোরূপ কথাবার্তা হীন হুট করেই হুমায়রার কোলে শুয়ে পড়ে। মেয়েটা হতভম্ব হয়। চমকানো স্বরে বলে,
“ এটা কি করলেন? ”
কৃশান লাপাত্তা। বুকের ওপর মেয়েকে বসিয়ে তার সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হয়।
“ কাইফা বলোতো- বাবা আমি তোমাকে ভালোবাসি ”
কাইফা ফ্যালফ্যাল নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে বাবার দিক। কৃশান ফের আবদার ছুঁড়ে,
“ বলো- বাবা আমি তোমাকে ভালোবাসি। ”
“ বাবা বাসি!”
হুট করেই মাঝখানের সবকিছু বাদ দিয়ে সামন পিছন মিলিয়ে বলে উঠল কাইফা। মেয়ের কথায় শব্দ করে হেসে ফেলল ওরা দুজন। কৃশান বলল,

“ এইতো আমার বাবাটা বলে দিয়েছে। ”
“ বাবা ”
“ সারাক্ষন বাবাকেই ডাকো, মাকে ডাকার দরকার নেই। দুদিন পর বাবা মেয়ে দুজনে বোধ হয় আমাকে ভুলেই যাবে। ”
কৃশান চোখ তুলে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় স্ত্রীর পানে। সময় নিয়ে বলে,
“ ভুল করেও তোমাকে ভুলার সুযোগ নেই। ”
খানেক থেমে বলে,
“ তোমায় যতনে রেখেছি আমার হৃদ কোটরের ফ্রেমে,
আমি যে প্রতিদিন নিয়ম করে বাঁচি তোমারি
হৃদয় রাঙানো প্রেমে! ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৫০

“ পেম(প্রেম)? ”
শাহাদাত আঙ্গুল মুখে পুরে, ঠোঁট নেড়ে অস্পষ্ট বুলিতে শব্দখানা আওড়ায় কাইফা। পৃষ্ঠে কোলে থাকা বাবা- মেয়ে দুজনের কপালেই চুমু খায় হুমায়রা। অতঃপর বাতাসের সাথে ভেসে আসে তার রিনরিনে স্বর
“ হুম মা প্রেম, হৃদয় রাঙানো প্রেম। ”

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here