রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৭
সোহানা ইসলাম
রাত এগারোটা ছুঁই ছুঁই। ঘরজুড়ে নীরবতা।
জোহান চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানা থেকে নেমে আসে। বাবা-মার মাঝখানে শোয়া আরামদায়ক না — জায়গা কম, বারবার কাঁধে চাপ লাগে। ওর ছোট্ট মন ঠিক করে, আজ সে যাবে তার বোনুর কাছে। সেখানে বিছানাটা বড়, বোনু গল্পও বলে ঘুম পাড়ায়।
টিপটিপ পায়ে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে জোহান।অন্ধকারে পায়ের শব্দ পর্যন্ত শোনা যায়।বোনুর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ও।ধীরে ধীরে নক করে—“বোনু, দরজা খুলো, আমি ঘুমাবো।”
ঘরের ভেতর তখন জারা মলম লাগাচ্ছিল হাঁটুর ওপর। একটু আগেই পড়ে গিয়ে চামড়া ছিলে গেছে। ব্যথার চোটে মুখটা কুঁচকে আছে, কিন্তু কোনোভাবে সামলে নিচ্ছে।
হঠাৎ ছোট ভাইয়ের ডাক শুনে সে চমকে ওঠে।
মাথায় চিন্তার ভাঁজ পড়ে—“এখন যদি ও আমাকে দেখে ফেলে, তাহলে তো বাবা-মাকে বলবে!”
জারার মাথা ঘুরে যায় এই ভাবনায়।
এদিকে জোহান আবার নক করে,
__“বোনু, দরজা খুলো না?”
জারা তাড়াতাড়ি উঠে জামাটা ঠিক করে নেয়, মলমটা টেবিলের নিচে সরিয়ে রাখে। তারপর দরজা খুলে দেয়।
জোহান ঘুম ঘুম চোখে ঘরে ঢোকে।চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানায় বসে পড়ে।জারার দিকে তেমন মনোযোগ দেয় না।
জারা মৃদু গলায় বলে,
___“এতো রাতে আমার রুমে কেন এলি?”
জোহান হাত থেকে চোখ সরিয়ে তাকায় বোনের দিকে।তারপর এক মুহূর্ত স্থির হয়ে যায়।
চোখে যেন আলো পড়ে
—“বোনু, এটা তুমি?”
জারা হাসে,জোহানের মাথায় এক টোকা মেরে বলে,
__“হ্যাঁ রে, আমি ছাড়া আর কে হবে?”
জোহান অবাক দৃষ্টিতে বলে,
__“তোমাকে তো আজ একদম রানীর মতো লাগছে!”
জারা হাসে—এই ছোট ভাইয়ের সরলতা ওর মন হালকা করে দেয়। কিন্তু পরের কথায় হাসিটা মিলিয়ে যায়।জোহান বলে,
___“তুমি এতো রাতে সেজেছো কেনো?”
কথাটা জোরে বলে ফেলে সে।জারা তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে ওর মুখ চেপে ধরে
—“চুপ, চুপ কর ভাই! আব্বু-আম্মু জেগে যাবে।”
জোহান ফিসফিস করে বলে,
__“এই ড্রেসটা অনেক দামি মনে হচ্ছে। কোথা থেকে পেলে?”
জারা এক মুহূর্ত চুপ থাকে।চোখ নিচু হয়ে আসে।
লজ্জায় মুখে কোনো শব্দ আসে না।
জোহান একটু থেমে তাকায় বোনের মুখের দিকে।
ওর ছোট্ট মস্তিষ্কে হিসাব মেলাতে বেশি সময় লাগে না।মনে মনে ভাবে, “বোনু নিশ্চয় দুলাভাইয়ের জন্য সেজেছে।”
ঠিক তখনই ঘরের নীরবতা ভেঙে দেয় ফোনের শব্দ। ভাইব্রেশন — ঘরজুড়ে টুং টুং আওয়াজ।
জারা তড়িঘড়ি ফোন হাতে নেয়। স্ক্রিনে নাম জ্বলজ্বল করছে — “স্বামীজান💙 calling…”
জারা স্থির হয়ে যায়। মুখে কোনো ভাব নেই, শুধু চোখে আতঙ্কের ছাপ। ছোট ভাইয়ের সামনে ধরা খাওয়া—এটা যে কল্পনারও বাইরে!
জোহান ইতিমধ্যে সব বুঝে গেছে।চুপচাপ বোনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
__“দুলাভাইয়ের কল?”
জারা কিছু বলে না।মোবাইলটা বুকের কাছে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
জোহান মুচকি হেসে বলে,
___“দাও দেখি।”
জারা কিছু বলতে না বলতেই ওর হাত থেকে মোবাইল নিয়ে ফেলে জোহান।একটুও ভাবল না—রিসিভ বাটনে চাপ দিলো।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল আরমানের মুখ।আরমান কথা বলার আগেই জোহান ঠোঁটে দুষ্টু হাসি নিয়ে বলে ওঠে,
___“দুলাভাই, এসব কিন্তু ঠিক না।”
ফোনের ওপাশে মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা।
আরমানের গলায় কোনো শব্দ নেই, কেবল নিঃশ্বাসের আওয়াজ।কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে বলে,
___“এই পটল আমার বউ কোথায়?”
কি সুন্দর করে ডাক দিলো দুলাভাই বলে আর, তাকে পটল বলছে? রাগ হয় জোহানের।
__“ তোমার বউ আমার পেন্টের পকেটে!”
__“ ইয়ার্কি মারছিস আমার সাথে? তাড়াতাড়ি বল আমার বউ কই? ”
__“ আমাদের সম্পর্কটা তো ঐ রকমই দুলাভাই! “
__” আমার বউ কে মোবাইল দে শালা পটলের বাচ্চা!
আরমানের কথা শুনে তবদা খেয়ে যায় জারা।কীভাবে ওর ছোট ভাইকে জিঙ্গেস করছে বউ কোথায়?জারা তখন ঘেমে গেছে।মুখে অনুতাপ, লজ্জা আর অস্বস্তির মিশেল। হাত বাড়িয়ে ভাইয়ের কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে নেয় ধীরে ধীরে। চোখে একটা চাহনি—অনুরোধ, ক্ষমা, ভালোবাসা সব একসাথে।
জোহান মৃদু হাসে।কিছু না বলে গিয়ে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে।বলল শুধু একটাই কথা,
__“তুমি চিন্তা করো না, আমি কাউকে বলবো না।”
জারা স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকে। ফোনের ওপাশে তখনও আরমানের নিঃশব্দ উপস্থিতি।
জারা ধীরে ধীরে বলে,
__“আপনি কল করেছে কেনো?।”
আরমান শুধু বলে,
“বাইরে এসো। আমি তোমাদের বাড়ির সামনে দাড়িয়ে আছি।”
ফোনের স্ক্রিন নিভে যায়।ঘরটা আবার শান্ত হয়ে যায়, কিন্তু সেই শান্তির মধ্যে কোথাও একটা উষ্ণতা থেকে যায়।ভাইয়ের সরল বোঝাপড়া, বোনের লজ্জা, আর এক সম্পর্কের নিরব ভালোবাসা।
__“ ভাইয়া অপেক্ষা করছে, তুমি যাও। আর হ্যাঁ, পিছনের দরজা দিয়ে যাবে!” বললো জোহান।
জারা’র ভয়ে হাত পা শুকিয়ে আসছে।ওর বাবা তো রাতে একবার হলেও রুমে এসে ওকে দেখে যাই। যদি তখন ধরা পরে যায়?
__“ আব্বু আম্মু জেগে গেলে বিপদ হয়ে যাবে?”
__” আরে বোনু, চিন্তা করো না। তুমি যাও আমি সামলে নিব সব। ”
জারা জানে ওর ভাই খুব বুদ্ধিমান।ও যখন বলেছে সামলে দিবে তাহলে অবশ্যই পারবে।
জোহান জারাকে পিছনের দরজা দিয়ে বের করে দিয়ে এসে জোহান চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে।
আর জারা পরনের জামা টা সামলে নিয়ে চুপচাপ চলে আসে বাড়ির ভিতর থেকে । বাতাসে হালকা শব্দ হয়, মনে হয় যেন রাতও তাদের গল্পটা শুনে ফেলেছে।
জারা বহু কষ্টে তার বারি জামাটা সামলে বাড়ির সামনের কাঁচা রাস্তায় পা রাখল। রাতের আকাশ নরম আলোয় মোড়ানো, দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে আরমান—ওর কালো বাইকটার পাশে হেলান দিয়ে। মুখে ধোঁয়ার ধোঁয়া উড়ছে, চোখের কোণে ক্লান্তি আর অপেক্ষার ছায়া।
জারা নরম গলায় ডাকে,
—“স্বামীজান…”
শব্দটা যেন রাতের নিস্তব্ধতা কেটে ঢুকে যায় সরাসরি আরমানের হৃদয়ে। ওর শরীর কেঁপে ওঠে, হাতের সিগারেটটা মাটিতে ফেলে দেয়।
মুহূর্তেই এগিয়ে এসে জারাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।
—“বউ, তখন কী হয়েছিল? পড়ে গেলে কীভাবে? ব্যথা পেয়েছো না তো?”
এক নিশ্বাসে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে আরমান।
জারার মুখে কোনো কথা আসছে না, শুধু হাসছে মৃদু করে।
তারপর মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,
—“চুপ করুন! এতো বারি জামাটা আনতে কে বলেছে। আমি এটা পরে ঠিকভাবে হাঁটতে পারি না, শুধু পড়ে যাই।”
আরমান হেসে ফেলে।ওর চোখে দুষ্টুমি আর স্নেহের মিশেল।
—“আমার বউ এখনো একটা জামা সামলাতে পারে না, আর আমায় সামলাবে কীভাবে?”
জারা মাথা নিচু করে ফেলে। চোখে দুষ্টুমি থকলেত আরমানের কণ্ঠে চিন্তার ছোঁয়া।
—“পড়ে গেছো মানে নিশ্চয় ব্যথা পেয়েছো। কোথায় লেগেছে? দেখাও দেখি।”
জারা ভয় আর লজ্জায় একাকার।চোখ নামিয়ে বলে,
—“হাঁটুতে একটু কেটেছে…”
আরমানের চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তার চোখে এই মেয়ে যেন পুরো পৃথিবী। আরমান জারা’র সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলে
__“ কই দেখি! ”
জারা তাড়াতাড়ি করে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে বলে
__ “ বেশি লাগেনি আমার।আপনি উঠে পরুন। ”
আরমান ধীরে ধীরে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।জারা’কে বুকে কাছে টেনি নিয়ে বলে
—“এই সাজ, এই সৌন্দর্য , এই মুখ,এই গোলাপি ঠোঁট … সব শুধু আমার জন্য? আল্লাহ এতো সৌন্দরি বউ কোথায় লোকাই আমি?”
জারা কিছু বলে না, ঠোঁটে মৃদু হাসি। ততক্ষণে আরমান ঝুঁকে জারাকে কোলে তুলে নেয়।
অপ্রত্যাশিত ঘটনায় চমকে ওঠে জারা।
—“এই কি করছেন? নামিয়ে দিন, আমাকে!”
কিন্তু আরমান কিছুই শোনে না।চুপচাপ ওকে নিয়ে বাইকের পাশে আসে। এক দমে জারাকে বাইকে বসিয়ে দেয়।রাতের বাতাসে ওদের দুজনের নিঃশ্বাস মিশে যায়। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না।
আরমান জারার চুলে হাত চালিয়ে দেয়।
—“চুলগুলো খোলা কেন? বেঁধে আসো নি কেন?”
—“সময় পাইনি,” জারা ছোট গলায় বলে।
আরমান আলতো করে ওর কপালের চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দেয়।জারার গাল লাল হয়ে ওঠে। ওর আঙুলগুলো বাইকের সিটে নরমভাবে ঘুরছে, যেন নিজের লজ্জা লুকাতে ব্যস্ত।
আরমান জারা’র কানে কানে ফিসফিস করে মৃদু স্বরে বলে,
—“খুব সুন্দর লাগছে তোমায়। মন চাচ্ছে টুপ করে খেয়ে ফেলি? ”
জারা যেনো লজ্জায় আরও গুঁটিয়ে যায়। মিনমিন৷ করে নিচু গলায় বলে,
—“আমি তাহলে এখন যাই?”
চলে যাওয়ার কথা শুনে আরমান জারাকে একটা দমক দেয়।আরমান গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—“আমার কল ধরনি—তার শাস্তি কে নিবে ?”
জারার বুক ধড়ফড় করতে থাকে।গলা শুকিয়ে আসে।
—“কি… কী শাস্তি?”
আরমান উত্তর না দিয়ে বাইক স্টার্ট দেয়।
—“চলো,শাস্তি দেওয়ার জন্য নিয়ে যাই।”
জারা অবাক চোখে তাকায়,
—“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
—“তোমাকে শাস্তি দিতে লক্ষী বউ।”
বাইক ছুটে চলে কাঁচা রাস্তায়, বাতাসে উড়ে যায় জারার ওড়না।জারা পিছন থেকে আরমানকে জড়িয়ে ধরে,চোখ বুজে নেয় বুকের কাছে।
রাতের ঠান্ডা হাওয়া, চাঁদের আলো, আর বাইকের শব্দ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। জারা এক হাতে আরমানকে ধরে, অন্য হাতে ওর পিঠে আলতো করে আঁকিবুঁকি কাটে।
আরমান হেসে বলে,
—“কি হয়েছে লক্ষী বউ? এমন করছো কেনো?”
জারা মৃদু গলায় বলে,
—“স্বামীজান, একটা আবদার রাখবেন?”
আরমানের ঠোঁটে মিষ্টি হাসি।
—“আপনি আমার রানী সাহেবা। আমি আপনার আদেশের গোলাম। আপনি আমাকে আদেশ করবেন, অনুরোধ নয়! লক্ষী বউ। বলুন, কী চান?”
জারা ধীরে বলে,
—“আমি বাইক চালানো শিখতে চাই…শেখাবেন?”
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু দূর থেকে কুকুরের ডাকে মাঝে মাঝে ভাঙছে নীরবতা। মিম রাশেদ কে নিয়ে হালকা আলোয় মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফিহা দের বাড়িতে যায়।ফিহার রুমের জানালার পাশে এসে দেখে ফিহা পড়ছে।মিম ফিসফিস করে বলে,
—“ ফিহা,একবার বাইরে আয়।”
ফিহা একটু অবাক হয়ে তাকায় মিমের দিকে। এতো রাতে মিম এখনে কি করছে। আর ওকে বা কেন বাইরে যেতে বলছে,
—“এতো রাতে কোথায়?“
রাশেদ মিমের পিছন থেকে বের হয়ে বলে
— “জাহেদ স্যার অপেক্ষা করছে তোমার জন্য বোন! ”
জাহেদের নাম শুনেই ফিহা চুপ করে যায়। চোখে একটা মৃদু কষ্টের ছাপ পড়ে। অনেক দিন ধরে ঠিক মতো কথা হয় না তাদের। আগে প্রতিদিনের সকালটা শুরু হতো জাহেদের ‘গুড মর্নিং’ দিয়ে, এখন সেটাও হারিয়ে গেছে।
মিম জানে, এই অভিমানটা কথার নয়—মনের।
___“ জানু আয় না! দুই মিনিটের জন্য! ”
__“ প্লিজ বোন আসো! জাহেদ স্যার অপেক্ষা করছে তোমার জন্য! ”
ফিহার আর কিছু বলে না। চুপ করে পরার টেবিল থেকে উঠে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে ঘর থেকে। আসারা আগে একবার ভালো করে দেখা আসে কেউ জেগে আছে কি না। ফিহা বের হয়ে আসলে মিম চুপচাপ ফিহার হাত ধরে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসে।
মিমদের বাড়ির কোণে একটা পুরনো অশ্বত্থ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে জাহেদ। হালকা বাতাসে ওর চুলগুলো উড়ছে, মুখে অনুতপ্ত একটা ভাব। ফিহাকে দেখেই তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
—“ ফিহা…”—জাহেদ আস্তে বলে।
কিন্তু ফিহা তাকায় না। ঠোঁট কামড়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। মিম ইশারা করে
__“ তোরা কথা বল”, বলে সরে যায় একটু দূরে মিম আর রাশেদ ।
জাহেদ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
— “তুমি এখনো রাগ করেছো?”
—“ না, আমি কারো উপর রাগ করি না…” —ফিহার গলায় জমে থাকা অভিমান ঝরে পড়ে।
জাহেদ মাথা নিচু করে বলে,
—“ আমি জানি, আমি তোমাকে এই কয় দিন অনেক অবহেলা করেছি। কিন্তু তোমার সাথে কথা না বলে থাকা আমার পক্ষেও সহজ ছিল না।
ফিহা কেঁদে ফেলে। চোখ থেকে টুপটুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পরে।
— “ আপনি একটা বারও ভাবেন নি আমি কেমন আছি? আমি তো প্রতিদিন আপনার মেসেজের অপেক্ষা করেছি…”
জাহেদ এগিয়ে এসে ওর হাত ধরে।
—“ আমি ভুল করেছি, ফিহা। প্রমিজ করছি, এখন থেকে রোজ কথা বলব। শুধু কথা না, দেখা করব, সময় দেব। পরীক্ষার সময়ও তোমাকে আমি নিয়ে যাবো। ”
ফিহা মুখ ফিরিয়ে নেয়।
—“ আপনি বললে আমি বিশ্বাস করব কিভাবে? আগেও তো এমন বলেছেন…”
হঠাৎ জাহেদ নিচু হয়ে পড়ে কানে ধরে ওঠবস শুরু করে।
—“ সরি, সত্যি সরি, আর কখনো এমন হবে না। তুমি চাইলে এখনই দশবার উঠবস করব। ”
এই দৃশ্য দেখে ফিহার চোখের জল হাসিতে পরিণত হয়।
—“ থামুন, পাগল হয়ে গেছেন! এমন করে কে ক্ষমা চায়?”
জাহেদ দাঁড়িয়ে বলে,
—“ তুমি হাসলে, এটাই তো চাই আমি।”
ফিহা মৃদু গলায় বলে,
—“ আপনি যদি আবার এমন করেন, আমি সত্যি আর কথা বলব না।
—“না, এমনটা আর কখনো হবে না জান। ”
জাহেদ এগিয়ে এসে ফিহার কপালে একটা আলতো চুমু খায়। বাতাসে হালকা স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। ফিহা চোখ বুজে নেয়—সব অভিমান গলে গিয়ে মনে হয় শুধু শান্তি রয়ে গেছে।
দূরে দাঁড়িয়ে মিম হেসে রাশেদকে বলে,
—চলুন, এখন বাড়ি যাই আমার, রাত অনেক হয়েছে।ওরা কথা বলুক। ”
ফিহা লজ্জা পেয়ে চুপ করে হাঁটতে শুরু করে ওর বাড়ির দিকে। আর জাহেদ ধীরে ধীরে পাশে হাঁটে, যেন এক নতুন শুরু তাদের দুজনের জন্য।
রাত তখন প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই। চাঁদের আলোয় নদীর পাড় ঝিলমিল করছে, হালকা বাতাস বইছে মাঠের বুক ছুঁয়ে। সেই নরম আলোয় দাঁড়িয়ে আছে আরমানের কালো বাইকটা—মৃদু বাতাসে তার সাইড-মিররটা নড়ছে ধীরে ধীরে। ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে জারা জেদে টগবগ করছে। ওর চোখে একরাশ উচ্ছ্বাস আর একটু ভয় মেশানো ঝিলিক।
আরমান ধীর পায়ে বাইকের পাশে এসে দাঁড়াল। জারার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,
—“তুমি বলছো বাইক চালাবে? একটা জামা সামলাতে পারো না, আবার বাইক?“
জারা ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
—“ আমার হাইট নিয়ে খুঁটা দিচ্ছেন?”
আরমান হাসল, কিন্তু তাতে মজা কম, বিস্ময় বেশি। এই মেয়ে তো তার চেনা মানজারা না—এই মানজারা একরোখা, জেদি, নিজের মতো।
—“আমি তো হাইটের কথা বলিনি লক্ষী বউ, আমি বলেছিলাম ব্যথা পাবে তুমি।”
— “আপনি শেখাবেন নাকি? —জারা গলায় একটু কান্না মেশানো রাগ নিয়ে বলে।”
—“ না, শেখাব না।”
—“তাহলে আমি একাই শিখব!”
জারা বলে ফেলে, তারপর ঠোঁট কামড়ে নেয়। এত সাহস ওর হয় কীভাবে? আরমান নিরবে তাকিয়ে থাকে, চোখে বিরক্তি নয়, বরং এক অদ্ভুত কোমলতা।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে হেঁটে যায় কয়েক পা দূরে, পকেট থেকে সিগারেট বের করে জ্বালাতে যায়, কিন্তু জারা তখনই কাছে এসে দাঁড়ায় আরমানের সামনে। ওড়না টা বুকের ওপর ক্রস করে, চোখে সরল অথচ দুষ্টু এক দৃঢ়তা।
—“ নিচু হন।”
—“কি বললে?”
—“ নিচু হন, একটু নিচু।”
আরমান কপাল কুঁচকে জারার দিকে তাকায়। এই মেয়েটা এখন কী হয়েছে আবার? তারপরও নিচু হয়, কৌতূহল নিয়ে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, জারা এক পা এগিয়ে আসে, আর কোনো কথা না বলে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় আরমানের ঠোঁটে—একটা টুপ শব্দে জমে যায় সময়।
আরমানের চোখ বড় হয়ে যায়। পরের মুহূর্তেই সে জারার কোমর জড়িয়ে ধরে টেনে নেয় কাছে। বাতাস যেন হঠাৎ থেমে যায়। নদীর কলকল ধ্বনি মিলিয়ে যায় দূরে। তার স্পর্শে জারা যেন কেঁপে ওঠে, তারপর ছটফট করে বলে,
—“ছাড়ুন, স্বামীজান!”
কিন্তু সে জানে, এখন যে খাঁচায় পড়েছে তা সোনার—তবুও বাঘের মতোই ভয়ংকর। অনেক কষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
—“ এতো শক্ত করে কেন ধরেছেন ।”
___“ তুমি নিজে এসেছো! ”
আরমান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে কোনো হাসি নেই, শুধু গভীর প্রশান্তি। সেই অচেনা প্রশান্তিতে জারা আবার হারিয়ে যায় কিছুটা।
জারা একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায়, চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, ওর চোখে এক চিলতে দুষ্টু হাসি। নিজেকে স্বাভাবিক করে আবার ফিরে আসে আরমানের কাছে। এবার আর আরমানকে নিচু হওয়ার কথা বলতে হয় না।জারাকে কাছে আসতে দেখে আরমান নিজেই কোমড় বাঁকা করে নিচু হয়ে থাকে। জারা আরমানের গলা জরিয়ে ধরে বলে
—“ একটা ঠান্ডা চুমু দিলাম। এখন বাইক চালানো শেখান আমাকে।”
আরমানের ঠোঁটে এবার প্রশস্ত হাসি। একদম ধীরে ধীরে জারার দিকে এগিয়ে আসে। দু’হাত দিয়ে জারার কোমর ধরে কোলে তুলে নেয়। জারা চমকে ওঠে, কিন্তু প্রতিবাদ করার আগেই আরমান বলে,
—“ আমার বউ ঘুষ দেওয়ার জন্য সেরা ‘ রে!”
জারা গাল ফুলিয়ে বলে,
—“ আমি ঘুষ দেইনি, আবদার করেছি।”
—“একই কথা, আমার রানী সাহেবা।”
আরমান বাইকের সামনে এসে ওকে নামিয়ে বসায়। নিজে পেছনে দাঁড়িয়ে দুই হাতে ওর হাত ধরে। বাইকের হ্যান্ডেল ধরা অবস্থায় বলে,
— “ এইভাবে ধরো। ভারসাম্য রাখতে হবে। পা নিচে রাখো এখনো, স্টার্ট দিও না।”
জারা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, মাথা নেড়ে বলল,
—“ এতো সহজ?”
— “না, কিন্তু তোমার জন্য সবকিছু সহজ।”
আরমানের কণ্ঠে এমন মায়া, এমন উষ্ণতা যে জারা তাকাতে পারে না। রাতের হাওয়া গায়ে লাগে, চুলগুলো উড়ছে, চাঁদের আলোয় জারা যেন অন্য এক জগতে।
আরমান ধীরে ধীরে তার হাতটা ঘুরিয়ে দেয় হ্যান্ডেলের ওপর, স্টার্ট দেয় বাইক। গর্জন শুনে জারা চমকে ওঠে, কিন্তু পরক্ষণেই হাসে। সেই হাসিতে ভয়, লজ্জা আর শিশুসুলভ উত্তেজনার মিশ্রণ।
—“ চলবে বউ ? ”আরমান ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।
—“ চলবে স্বামীজান !”
বাইক ধীরে ধীরে গতি নেয়। জারা সামনের দিকে হেলে থাকে, আরমানের হাত ওর হাতের ওপর। হালকা কাঁপুনি, হালকা ভয়, কিন্তু সেই সঙ্গে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস। মনে হয়, এ যেন কোনো স্বপ্নের রাত, যেখানে পৃথিবীতে কেবল তারা দু’জন—আর এক টুকরো চাঁদ।
বাইক ঘুরে যায় মাঠের ভেতর দিয়ে। বাতাসে ভেসে আসে নদীর গন্ধ। জারা হেসে বলে,
—“ দেখলেন তো, আমি পারছি!”
—“তুমি পারবেই, কারণ তুমি আমার লক্ষী বউ।”
জারা পিছনে তাকায় না, কিন্তু ওর চোখে জল জমে যায়। এই মানুষটাকে ভালোবাসা যায় না? এই মানুষটাকে না ভালোবেসে থাকা যায়?
বাইক ধীরে থামে নদীর ধারে। আরমান ইঞ্জিন বন্ধ করে, দু’হাত দিয়ে জারার কাঁধে রাখে।
—“ আজ থেকে বাইক চালানো শেখা শুরু। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—”
—“ কি কথা?”
—“ যদি পড়ে যাও, ব্যথা কিন্তু আমার লাগবে।”
জারা মৃদু হেসে বলে,
— “তাহলে আমি কখনোই পড়ব না, স্বামীজান।”
চাঁদের আলোয় তাদের মুখ দুটো এক হয়ে যায়। দূর থেকে হালকা ঢেউয়ের শব্দ ভেসে আসে। আর সেই রাতটা থেকে জারা শুধু বাইক নয়—ভালোবাসার ভারসাম্য রাখাও শিখে নেয়।
রাত গভীর। ঘড়ির কাঁটা তখন দুটো ছুঁইছুঁই। আনিছুর রহমানের হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। বিছানায় হাত বাড়িয়ে দেখেন, পাশে ছোট ছেলে জোহান নেই। কপালে ভাঁজ পড়ে যায় তাঁর।
ধীরে ধীরে উঠে বসেন, চোখ মুছে দরজার দিকে হাঁটেন। ঘরে হালকা আলো জ্বলছে। এই কয়েকদিনে এক অদ্ভুত অভ্যাস গড়ে উঠেছে—রাতে একবার হলেও মেয়ের রুমে গিয়ে দেখে আসেন, ঘুমিয়েছে কিনা।
পা টিপে টিপে জারার দরজার সামনে এসে দাঁড়ান। দরজাটা ঠেলে দেখেন, ভিতর থেকে বন্ধ। খানিক থেমে ডাক দেন নিচু গলায়,
—“ জারা… আম্মু, ঘুমিয়েছো?”
ভিতর থেকে কোনো সাড়া আসে না। কেবল হালকা ফ্যানের শব্দ। আবার ডাক দেন একটু জোরে,
—“ জারা?তোমার রুমে জোহান ?”
রুমের ভেতরে শুয়ে আছে জোহান। বাবার গলা শুনে ওর ঘুম ভেঙে গেছে, কিন্তু কিছু বলে না। চুপচাপ কম্বল টেনে নেয় মুখের উপর। সারা দিলেই ভিতরে আসতে চাইবে।তার থেকে ভালো চুপ করে শুয়ে থাকা।
আনিছুর রহমান কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে নিজেই বলেন,
— “ ঘুমাচ্ছে মনে হয়…দুই ভাই বোন ।”
ফিরে যান নিজের ঘরে। ঘরে ঢুকে বালিশটা ঠিক করেন, পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রীকে দেখে একবার মৃদু হাসেন। এই নারী তার জীবনের পূর্ণতার চাবি কাঠি। তার ঘরণী। তার তিন সন্তানের জননী। তিনি স্ত্রীর কপালে চুমু খান।
বালিশে মাথা দিয়ে চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে, ঘর আবার নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়।
রাত ঘনিয়ে এসেছে। নদীর জল টলমল করছে, তার উপরে চাঁদের আলো ঝিকমিক করছে ছোট ছোট সোনার টুকরোর মতো। বাতাসে ভেসে আসছে কাশফুলের গন্ধ, কোথাও দূরে একটা পাখি হালকা ডাকে— যেনো এই রাতটাকে আরও নিস্তব্ধ করে তুলছে।
আরমান নদীর পাড়ে বসে আছে, তার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে জারা। চারদিক শান্ত, কেবল নদীর ঢেউয়ের হালকা শব্দে বাতাসে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। জারার চোখ আধখোলা, তার মুখে একটুকরো নরম হাসি। আরমানের আঙুলগুলো আলতো করে জারার চুলে ভিলি কাটছে— ধীরে ধীরে, ভালোবাসার ছোঁয়ায়।
জারা হঠাৎ চুপচাপ আরমানের হাতে চোখ রাখে। ওর হাতে একটা গোল্ডেন কালারের বেস লাইট, সূর্যের আলোয় ন্যায় ঝলমল করে উঠছে। জারা মৃদু গলায় বলে,
—“ এইটা দিবেন আমাকে?”
আরমান হেসে তাকায়, তার চোখে খুনসুটি ভরা আলো।
—“ এইটা পুরোনো, নতুন কিনে দেব তোমায়, ঠিক তোমার হাতের মতো করে।”
জারা মুখ বাঁকায়,
—“ নতুন লাগবে না, আমি এইটাই চাই।”
আরমান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে জারার মুখে। ওর জেদি চেহারায় এমন কিছু আছে, যা দেখে না করতে পারে না। শেষমেশ হালকা নিঃশ্বাস ফেলে নিজের হাত থেকে বেস লাইটটা খুলে জারার হাতে পরিয়ে দেয়। কিন্তু মুহূর্তেই সেটা হাত থেকে খসে পড়ে মাটিতে।
আরমান হেসে ওঠে—
—“ দেখলে, তোমার হাতে মানায় না। হাতটা এত চিকন যে এটাই নিজের থেকে পালিয়ে গেল।”
জারা মুখ ফুলিয়ে নেয়, যেনো ছোট বাচ্চা রাগ করেছে।
—“ তবুও আমি এইটাই রাখব।”
আরমান ওর দিকে তাকিয়ে বলে,
—“ আমি তোমার হাতের মাপ মতো গোল্ড দিয়ে গড়িয়ে দেব। তখন এটা চিরদিন থাকবে তোমার হাতে।”
জারা কোনো উত্তর দেয় না, শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। হালকা বাতাসে ওর চুল উড়ছে, মুখের পাশে এসে পড়ছে বারবার। আরমান ওর কপাল থেকে একটা চুল সরিয়ে দেয়। সময় থেমে যায় যেনো— দুজনেই নীরবে বসে থাকে অনেকক্ষণ।
হঠাৎ জারা নরম গলায় বলে,
—“ চলুন, আমরা কিছু খেলি?”
আরমান চমকে তাকায়, তার মুখে রহস্যময় হাসি। ঠোঁট কামড়ে বলে,
—“ নটি বউ, কি খেলার কথা বলছো তুমি ?”
জারা ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
—“ কানা মাছি খেলব।”
আরমানের মুখ ভোঁতা হয়ে যায়। সে কি না কি ভেবেছিলো।এই বোঝি বউ আবার চুমু খেলো তাকে। আরমান মাথা নাড়ে,
— “না, এসব খেলা মেয়েরা খেলে। আমি না।”
জারা আরমানের হাত টেনে বলে,
— “ না না, আপনি খেলবেন। আপনি ধরবেন, আমি পালাবো।”
আরমান চোখ ঘুরিয়ে বলে,
—“ তোমাকে তো ধরতেই পারবো না, এত ছোট মানুষ তুমি।”
জারা রাগে ফুসে উঠে দাঁড়ায়। রাগের মধ্যেও তার মুখে এক অদ্ভুত মিষ্টি ভাব। সে নিজের মতো করে রুমালটা নেয়, আরমানের পকেট থেকে টেনে আনে।
—“ চোখে বাঁধতে হবে এটা দিয়ে।”
আরমান অবাক হয়ে তাকায়,
— “ আমার মতো লম্বা ছেলের চোখে তুমি কীভাবে বাঁধবে?”
জারা হাসে,
—“ তাহলে নিচু হন।”
__“ বউ তোমার জন্য একদিন আমার কোমড়টা ভেঙে যাবে? ”
জারা আরমানের বুকে কিল মারে। আরমান হাসতে হাসতে নিচু হয়, কোমর বাঁকা করে। জারা রুমালটা হাতে নিয়ে ওর চোখে আলতো করে বাঁধে। ওর আঙুলের ছোঁয়ায় আরমানের গা শিরশির করে ওঠে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না।
খেলা শুরু হয়। জারা বলে,
— “ধরুন এখন!”
আরমান হাত বাড়িয়ে একদিকে হাঁটে, জারা চুপিচুপি পিছিয়ে যায়। মাঝে মাঝে পায়ের শব্দে আরমানের দিক ঘুরে যায়, কিন্তু জারাকে ধরতে পারে না। ওরা দুজন হাসতে হাসতে নদীর পাড়ের ঘাসে গড়িয়ে পড়ছে।
কিছুক্ষণ পর জারা চুপচাপ হয়ে যায়। সে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে গিয়ে বাইকের পিছনে লুকিয়ে পড়ে। বাতাসে ওর চুল উড়ছে, মুখে দুষ্টু হাসি।
আরমান কিছুক্ষণ ডাকে—
—“ বউ… কই গেলে? তোমার শরীরের ঘ্রাণ পাচ্ছি না কেনো?”
কোনো সাড়া আসে না। সে আরও জোরে ডাকে,
—“ মানজারা! লক্ষী বউ, সাড়া দাও।
নীরবতা।
আরমানের মুখ থেকে হাসিটা মিলিয়ে যায়। চোখের রুমাল খুলে ফেলে, চারদিকে তাকায়। নদীর ধারে বাতাস বইছে, কিন্তু কোথাও জারা নেই। হঠাৎ তার বুকের ভিতর কেমন এক শূন্যতা কাজ করে। চোখ বড় হয়ে যায়, মুখ শুকিয়ে যায়।
সে পাগলের মতো চারদিকে ছুটে বেড়ায়,
—“ বউ… বউ… কোথায় তুই?”
কোনো উত্তর নেই। কেবল দূরের নদীতে কুলুকুলু শব্দ। আরমানের গলা কেঁপে ওঠে। শরীর থেকে সব শক্তি যেনো চলে যায়। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মাটিতে। মুখ ঢেকে কেঁদে ওঠে,
—“ লক্ষী বউ … আমার সোনা বউ, একবার ডাক দে শুধু…”
বাইকের পিছনে বসে থাকা জারা একটাও উওর দেয় না।
আরমান চিৎকার করে ডাকতে থাকে
__“ বউ কোথায় তুই? প্লিজ বের হয়ে আয়। তোর সাড়া না পেয়ে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসচ্ছে। ”
আরমানের চোখে পানি। বুকে ব্যথা। কেউ যেনো ওর কাছ থেকে ওর নিজের প্রানটা কেড়ে নিয়েছে।
__“ বউ প্লিজ বের হয়ে আয় সোনা। আমি আর পারছি না। কষ্ট হচ্ছে খুব। বুকে ব্যথা করছে। ”
জারা শুনতে পাচ্ছিলো সব। মজা করতে গিয়ে বুঝতে পারেনি, ওর এই চুপ থাকা আরমানকে কেমন কষ্ট দিচ্ছে। হঠাৎ ওর বুক কেঁপে ওঠে অপরাধবোধে। ধীরে ধীরে বাইকের পেছন থেকে বেরিয়ে আসে।
আরমান তখনো মাথা নিচু করে বসে আছে, কাঁধ কাঁপছে। জারা এসে ওর কাঁধে আলতো করে হাত রাখে,
— “ স্বামীজান…”
আরমান স্থির হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকায় জারার দিকে। চোখ ভরা পানি, কণ্ঠ ভারী। জারা নিচু হয়ে বসে, তার চোখেও পানি জমে এসেছে।
— “ আমি তো মজা করছিলাম… ভয় পেয়েছিলেন নাকি?”
আরমান কিছু বলে না, শুধু জারাকে বুকে টেনে নেয়। শক্ত করে ধরে রাখে যেনো তাকে হারানোর ভয় এখনও বুকের ভিতরে বাজছে।
জারা চুপচাপ মাথা রাখে আরমানের বুকে, শুনতে পায় ওর বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ।
রাতের আকাশে তখন চাঁদ নেমে এসেছে একদম উপরে। নদীর ঢেউ তীরে এসে লাগছে। দুজনের নিঃশ্বাস মিশে গেছে বাতাসে।
আরমানের ঠোঁট থেকে ধীরে ধীরে বের হয় একটাই শব্দ—
—“ আমার বউ… আমার জীবন তুই। আর এমন ভয় দেখাবি না কখনো আমায়, মরে যাবো তোকে ছাড়া।”
ভয়ের আর স্বস্তির মিশ্র একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ে ওর চোখে। মুহূর্তের মধ্যে সব রাগ, ভয়, আতঙ্ক গলে গিয়ে শুধু একটাই জিনিস থাকে—ভালোবাসা। সে দু’হাত বাড়িয়ে জারাকে জড়িয়ে নেয়। নিঃশব্দে বলে ওঠে—‘তুমি হারিয়ে যেও না আর।’ জারা কোনো কথা বলে না, শুধু আরমানের বুকে মুখ লুকিয়ে থাকে। বাতাসে মিশে থাকে নদীর গন্ধ, তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ, আর একরাশ নীরব ভালোবাসা।”
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৬
__“ সরি স্বামীজান, মজা করতে গিয়ে আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি!”
আরমান জারা’র দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েকে আর কিছুক্ষণ না দেখলে তার প্রান টাই বের হয়ে যেতো। আরমান জারা’র কপালে চুমু এঁকে দেয়।
জারা আলতো করে হাসে, চোখের পানি মুছে নেয়। আরমানের বুকে মাথা রেখে বলে
__“ আমি যদি কখনো আপনাকে ছেড়ে চলে যাই? ”
