আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৭
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘আমার পরিচয়ই তো রেজাউল হকের বড়ো মেয়ে। তাহলে তাকে কী করে ভুলে যাব, বাবা?’ উদ্ধতভাষী হতে চেয়েও শেষ মুহূর্তে হৃতমানই শোনাল দীধিতির কণ্ঠ। কিন্তু ওর চোখের দৃপ্ত ভাষা জাকির শেখ ঠিকই পড়ে নিলেন৷ একটু হাসলেন ওর মুখে চেয়ে। ‘বিয়ের পর তোমার সে পরিচয়ে কে চিনছে? মেয়েদের আজীবন পরিচয় বহন করতে হয় শ্বশুরবাড়ির পরিচয়ই। আর যদি বলো তোমার শেকড়ই রেজা হক। তাহলে সেটা তুমি বলতেই পারো নিজের প্রকৃত পরিচয় না জানার কারণে, অ্যাজ আ কনসোলেশন।’
জীবনের সব থেকে বড়ো অপূর্ণতা এখানেই। সঠিক জন্ম পরিচয় না জানার লজ্জাজনক, কষ্টদায়ক যে অনুভূতি, দীধিতির সেই কষ্টের ভার কেউ-ই নিতে পারবে না কোনোদিন। চোখ জোড়া ওর জ্বলে উঠছে কান্নার ঢেউয়ে। কিন্তু সেই ঢেউকে ভেসে আসতে দিলো না সে। শীতল গলাতে বলল, ‘আমি জাইমার এজেন্ট হয়ে এসেছি। এমন ব্লেম দেওয়াটা কি আমাকে অপমান করা হলো না, বাবা?’
-‘অপমানজনক কাজটা তুমি করার জন্য যদি আসতে পারো আমার পরিবারে, তা আমি অকপটে বললে সেটা তুমিই আমাকে বাধ্য করলে না?’
-‘আর যদি বলি আপনার দেওয়া এই দোষটা সম্পূর্ণই মিথ্যা?’
মিথ্যাবাদী অপবাদ দেওয়াই জাকির শেখ চটে গেলেন কিছুটা, ‘নিজেকে শেয়ানা ভাবছ না কি এখনও? দীর্ঘদিন তোমাকে রিচ করতে পারছে না জাইমা। সে ভয় পেয়েছে আমি তোমাকে কিছু করে বসলাম না তো? তাই ধূর্ত শেয়ালকে গুহা থেকে বেরিয়ে আসতেই হলো৷ আমাকে কল করে থ্রেট দিচ্ছে সে, তোমার কিছু হলে সে নাকি শেখ বাড়ির ছেলেকে এমনভাবে মারবে যে, তার শরীরের ছিন্নভিন্ন অংশও মিলবে না। কত বড়ো দুঃসাহস বাস্টার্ডটার!’ শেষে বিড়বিড় করে আরও খিস্তি করে উঠলেন তিনি জাইমার উদ্দেশ্যে।
দীধিতি খুব বেশিই চিন্তিত হয়ে পড়ল এখন। জাইমাকে সন্ত্রাসী বলছেন জাকির শেখ। কিন্তু তা তো বহু আগের কথা। এখনও কেন তিনি এ অপবাদ দিচ্ছেন তাকে? আবার জাইমার দেশে আসার কথাও বলছেন তিনি। এসব কি সব সত্য? কিন্তু জাইমা যে কখনই দেশে আসতে পারবে না। সে পথই বন্ধ করে রেখেছেন জাকির শেখ। তাহলে কীভাবে দেশে আসলেন তিনি? একমাত্র অবৈধ পন্থা ছাড়া আর তো কোনো পথ থাকার কথা না৷ আর ওর সঙ্গে কেনই বা জাইমা যোগাযোগ করতে পারছেন না? সে নিজের নতুন নাম্বার অনেক আগেই তাকে মেইল করেছিল৷ তারপরও কী জন্য ওকে পাচ্ছেন না? এটাই বা কী করে সম্ভব? মনে হচ্ছে ওর চোখের আড়ালে অনেক কিছুই হচ্ছে ওকে কেন্দ্র করে। যেটা এতদিনে ও টের পায়নি৷ আগামীতেও হয়তো পেত না, আজ যদি জাকির শেখ না আসতেন৷ আর বহুদিন ধরেই এটাও সন্দেহ হচ্ছে, জাইমা মানুষটিও ওকে কিছু ব্যাপারে অন্ধকারে রেখেছেন৷
তখন আরেকবার গর্জন সুরে বললেন জাকির, ‘রেজার মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর মৃত্যু তার জন্য অপেক্ষা করছে, বুঝলে? যদি আমার বাড়ির একটা ছেলের গায়ে যদি সামান্য আচও লাগে। তাই বলছি, জাইমার সঙ্গে ভুল করেও যোগাযোগ কোরো না। তার পরিণাম যা হবে, তোমাকেও কিছুটা ভুগতে হতে পারে।’ প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে কথার ইতিন টেনে দীধিতিকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই প্রশ্নবিদ্ধ করল তখন তাকে দীধিতি, ‘আমার বাবার মৃত্যুর পেছনে আপনি দায়ী নন তো, বাবা? আপনিই তাকে খুন করেছেন? অথবা করিয়েছেন?’
ঘাড় ফিরিয়ে দাঁড়ালেন জাকির, ‘তোমাকে একটু আগেই না বললাম রেজাকে ভুলে যেতে?’
-‘আমিও বোধ হয় বলেছি, তিনি আমার বাবা।’
অপ্রতিরোধ্য জেদ উপলব্ধি করলেন জাকির ওর কণ্ঠে। সেই তীব্র জেদের অভিব্যক্তি চোখে-মুখেও প্রকাশ পেলো দীধিতির। তা কিছুক্ষণ দেখে এবার জাকির নিজেও জিদ্দি গলায় বললেন, ‘করলেই বা কী করবে তুমি?’
-‘একজন সমাজসেবক, সৎ রাজনৈতিক নেতা কি খুন করার শপথ বাক্যও পাঠ করে নেন? আইনকে অমান্য করার অধিকার তাকে দেওয়া হয়?’
-‘সমাজকে নিরাপদ রাখতেই ওরকম দু’চারটা বাস্টার্ড নির্মূল করার প্রয়োজনও আছে।’
বাবার আসনে থাকা মৃত মানুষটির নামে এমন ধিক্কার, এত বড়ো কটুক্তি সহ্য হলো না দীধিতির। তবুও কণ্ঠে কোমলতা ধরেই জিজ্ঞেস করল সে, ‘তাহলে আমি আমার বাবার হত্যাকারীর মুখোমুখিই আজ, তাই না বাবা?’
এ প্রশ্নের অন্তর্নিহিত আরও একটি বাক্য হলো, জাকির শেখের খুনী সত্তার উন্মোচন এবার দীধিতি করবেই তবে। তা বুঝে নিতে অতিরিক্ত আর কোনো কথা শোনার প্রয়োজন হলো না জাকির শেখের৷ তিনি হেসে জানতে চাইলেন, ‘এরপর? আমাকে কীভাবে ট্রিট করতে চাও তাহলে?’
এতটুকু অনুতপ্তবোধের ছায়া নেই জাকির শেখের দৃষ্টিতে৷ বরং সেখানে ভীষণ আত্মতৃপ্তি দেখতে পাচ্ছে দীধিতি। বুকের মধ্যে দাবিয়ে রাখা ক্রোধের অনল চিৎকার করছে ওর।
-‘আপনার এমন খুনের ইতিহাস নাওফিল কি কখনও গ্রহণ করতে পারবে, বাবা? কোনো সন্তান কি মানতে পারে তার বাবার হাতে কোনো মানুষ প্রাণ খুইয়েছে? তার ওপর আপনার ছেলের সঙ্গে আপনার মনের দূরত্বের কথা তো রয়েই গেল।’
-‘আমার ছেলের সঙ্গে আমার মনের দূরত্ব কতটুকু তা তোমাকে মাপতে বলিনি আমি৷ আমার মনে হয় আমার ছেলেও বলেনি৷ এটা একান্তই আমাদের বিষয়৷ তুমি যদি আমাকে এই হুমকি দিতে চাও, নাওফিলকে এ ব্যাপারে জানিয়ে দিয়ে তার সঙ্গে আমার দূরত্ব আরও বাড়াবে, তাহলে আমি তোমাকে উৎসাহ দিচ্ছি৷ চেষ্টা করে দেখো। আর এই চেষ্টার পরিণাম তোমার জন্য কী হতে পারে, সেটাও ভেবো কিন্তু।’
-‘অপরাধকে আপনি অপরাধই মনে করছেন না। কিন্তু আমার বিশ্বাস, নাওফিল জানলে আপনার এই অপরাধ মেনে নেবে না। আপনি সবার কাছে তো ভালো নেতা। এই জনসাধারণও কোনোদিন যদি আপনার খুনী রূপটা জানতে পারে। সেদিন আপনার এই সম্মান, অহমিকা থাকবে না, বাবা।’
জাকির আবারও হাসলেন, ‘আমি তোমাকে পূর্ণ সায় দিচ্ছি জানানোর। সুযোগও দেওয়া হবে৷ তুমি শুধু নাওফিলকে বিশ্বাস করিয়ে দেখাও৷ আর যদি জনসাধারণকেও জানাতে পারো। সেটাও করে দেখাও, মা।’
-‘তা কি আপনি মন থেকে মানতে পারবেন?’
-‘তুমি করে দেখাতে পারলেই আমি মেনে নেব। কথা দিলাম যাও, তোমার বাবার খুনের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে আত্মসমর্পণ করব পুলিশের কাছে।’ বলেই তিনি হাসিটা এবার প্রশস্ত করলেন মুখে। ‘আমাকে প্রকাশ করতে গিয়ে নাওফিলকে না হারাতে হয়, সে খেয়ালও রেখো।’
সব কিছু ছাপিয়ে দীধিতির জীবনে দুটো সত্য, দুটো জেদ। প্রথমটি, নাওফিলকে কোনো কিছুর বিনিময়েই দীধিতি ছাড়তে পারবে না৷ আর দ্বিতীয় সত্য, পালক বাবা মানুষটির হত্যাকারীকেও সে ছেড়ে দেবে না। আর জাকির শেখের মতো সাধারণ মানুষের ভক্তি
ধুলোবালিতে ঠাঁসা মেঝের মধ্যে ইয়াসিফের অচেতন দেহটা কোলে নিয়ে বসে ফ্লোরেন্স দীর্ঘ বিশ মিনিট ধরে অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে। সন্ধ্যার পর হঠাই বাড়ির মালিক আসে৷ তখন থেকেই বেডরুমে মাভিশার সঙ্গে অসহ্য খোশগল্প ধরেছে সে। পেটমোটা ওই বদমাশ ব্যক্তিটি বিদায় না হওয়া পর্যন্ত মাভিশাও বাসার বাইরে গিয়ে ইয়াসিফের জন্য জরুরিভাবে স্যালাইন, মেডিসিন কিনে আনতে পারছে না। ফ্লোরেন্সকেও এদিকে ততক্ষণ নোংরা বদ্ধ ঘরটাতে বসে থাকতে হচ্ছে ইয়াসিফকে নিয়ে।
আধ ঘণ্টা আগেই ফ্লোরেন্সের মুষ্ট্যাঘাতে আহত হয়ে জ্ঞান হারায় ইয়াসিফ। পায়ের গুলিবিদ্ধ জায়গাটির জন্যই আরও বেকায়দা অবস্থা হয়েছে ওর৷ ঠিকমতো ওষুধ সেবন করা হয়নি এ ক’দিনে৷ যার জন্য সেখানের ক্ষত সেড়ে ওঠেনি পুরোপুরি। তার ওপরই আবার ফ্লোরেন্সের নির্দয় টর্চার, ঠিক মতো খেতে না পারা। সব মিলিয়ে খুবই খারাপ অবস্থা ইয়াসিফের৷ জরুরি ভিত্তিতে ওকে এখন হাসপাতাল নেওয়া দরকার। কিন্তু তা আবার ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে ঘরেতে মাভিশাকেই চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করতে হবে এখন৷
তখনের থাপ্পড়টার জন্য ফ্লোরেন্স এখনও বেজায় রেগে ইয়াসিফের ওপর৷ দাঁতের মাঝে জিহ্বা পড়ে কেটে গেছে তার জিহ্বার এক কোনে। আজকে থেকে খাওয়া-দাওয়াতে তারও কষ্ট হবে৷
এই অসুস্থ দেহেই ছেলেটার হাত যেভাবে চলে! ফ্লোরেন্স ভাবছে তাই, ওকে ছেড়ে দেওয়ার পর এতগুলো দিনের অত্যাচারের শোধটা তাহলে কী ভয়ানকবভাবেই না নিতে চাইবে সে। তাই ততদিনে ফ্লোরেন্স এই দেশই ছেড়ে দেবে। তাকে হাতের নাগালে তাকে আর পেলে তো! ভাবতে ভাবতে ইয়াসিফের সরু নাকটাতে মৃদুভাবে আবারও একটা ঘুষি বসাল সে৷ তখনই মনে হলো ইয়াসিফ শ্বাস ফেলছে না। আকস্মিক বুক কেঁপে উঠল ফ্লোরেন্সের। নাকের কাছে আঙুলটা ছোঁয়াল সে ফের। সত্যিই শ্বাস ফেলছে না ইয়াসিফ৷ ভয়ার্ত স্বরে মাভিশাকে ডাকতে গিয়েও থেমে গেল বাড়ির মালিকের কথা মনে করে৷ ইয়াসিফের গায়ের তাপমাত্রা চেক করল দ্রুত। অস্বাভাবিক গরম ওর শরীর। জ্বর বেড়েছে ছেলেটার। কিন্তু শ্বাস চলছে না দেখে আপাতত প্রাথমিক চিকিৎসার কথায় স্মরণে এলো ফ্লোরেন্সের। ঘাবড়ানো চলবে না৷ ইয়াসিফের গায়ের টি শার্টটা খুলে ফেলল জলদি৷ কৃত্রিম শ্বাস দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইয়াসিফের ঠোঁটের ফাঁকে অনেকক্ষণ শ্বাস দিতে থাকল। মিনিটখানিক পার হওয়ার আগেই ইয়াসিফ শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিকও হলো। ‘এই, তুমি ঠিক আছ? শুনতে পাচ্ছ আমাকে?’ ওকে ডাকতে আরম্ভ করল ফ্লোরেন্স চিন্তিত সুরে।
স্তিমিত চোখদুটো মেলল ইয়াসিফ৷ আর ঠিক সে সময়ই মাভিশা দরজাটা খুলে তাড়াহুড়ো করে ঢুকল ঘরে। ‘ও ঠিক আছে তো?’
-‘জলদি ওর ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করো, ম্যাভি। অনেক জ্বর। জ্ঞানও হারিয়েছিল। আর শ্বাসও চলছিল না। ওকে ঘরে নিতে হবে।’ কাতর শোনালো ফ্লোরেন্সের গলা।
মাভিশা রেগে উঠল, ‘তোমার জন্য এই দশা ওর। খুব খারাপ করেছি তুমি ওর সঙ্গে।’
ফ্লোরেন্স ইয়াসিফের শুকনো, পাণ্ডুবর্ণ মুখপানে তাকাল আহত চোখে। নিজেকে সত্যিই অমানুষ লাগছে তার৷ ইয়াসিফকে দেখলেই যে পারে না রাগটা ঠেকাতে!
দুজন মিলে খুব কষ্টে ইয়াসিফকে তুললেও পাশের ঘরে নিতে গিয়ে ফ্লোরেন্সের কষ্টটা বেশিই হলো। সমস্ত ভার তার শরীরেই ছিল ইয়াসিফের। বিছানাতে শুয়িয়ে রেখেই মাভিশা দ্রুত চলে গেল বাইরে৷ পেশাতে সে আজ ডাক্তার না হলে সর্বনাশই হয়ে যেত।
খেতে বসে নাওফিল আড়চোখে মেঘমেদুরে ঢাকা দীধিতির মুখটা দেখছে বারবার৷ অনেকবার বলার পরও তাকে খেতে বসাতে পারেনি। জাকির শেখও বললেন, ‘স্মরণ, তুমি বোসো আমাদের সাথে। আমরা তুলে নিতে পারব।’
মানা করতে যাবে দীধিতি আবারও, তখন তাওসিফও বলল, ‘তুমি মাত্রই জ্বর থেকে উঠলে। এত ছোটাছুটি করতে হবে না তো। বসো আমাদের সঙ্গে।’
কিরণও খেতে খেতে লক্ষ করছে বোনকে৷ দীধিতির গতিবিধি সেও অনেকটা বোঝে৷ তার মনে হচ্ছে, জাকির শেখের উপস্থিতিই ওকে বিরক্ত করছে৷ কিন্তু এমন করার কারণ কী?
শেষমেশ সকলের অনুরোধের পর দীধিতি নাওফিলের পাশের চেয়ারটাতে বসল। তখনই বললেন জাকির, ‘আমি এখানে এসেছি আজ একটাই কারণে৷ তোমাদের গাজীপুর ফেরা উচিত। মা আর আব্বা তোমাদের জন্য খুব অপেক্ষায় আছেন। বাড়ির সকলেই চাইছে তোমরা তাদের সঙ্গে সেখানেই থাকো। তাছাড়া নাওফিলের ভালো ইমেজ তৈরির জন্যও গাজীপুরে থাকাটা জরুরি।’
তাওসিফও সহমত প্রকাশ করল, ‘দাদী সত্যিই কান্নাকাটি করেন ফোনে। জাদ ঠিকমতো তার সঙ্গে কথাও বলে না। এসব কারণে খুব কষ্ট পাচ্ছেন দাদী। অনেক দিনই তো হলো দূরে থাকা। এবার আমাদের সবার এক সঙ্গে থাকা দরকার। শেষ বয়সে ওই বৃদ্ধ মানুষদু’টো নাতি-নাতনিদের থেকে কষ্ট পাচ্ছেন, এটা আসলে ঠিক করছি না আমরা।’
জাকির নাওফিলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, ছেলের অভিমত জানার আশায়৷ এদিকে নাওফিল দীধিতির জন্য চিন্তিত বেশি৷ দাদী তার বউয়ের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছেন, তা ও বাড়ি থেকে তাওসিফের মা-ই জানিয়েছিলেন কিছু দিন আগে৷ এ কারণে নাওফিলও কষ্ট পেয়েছে বলেই দাদীর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছে৷ কিন্তু এর থেকেও বড়ো সমস্যা, ঘরের শত্রুকে সে চিনতে পারেনি এখনও। যাকে না চিনতে পারলে তাদের দুজনের ক্ষতির আশঙ্কা বেড়েই যাবে প্রতিদিন। দীধিতিও মাত্র সবে সুস্থ হচ্ছে৷ আরও সময় প্রয়োজন ওর সম্পূর্ণ সুস্থ হতে৷ এ অবস্থায় সেখানে ফিরে যাওয়া মানে স্বেচ্ছায় নিজেদের বলি দেওয়ার সমতুল্য। এদিকে ওখানে ফেরাটাও সত্যিই জরুরি। কী করা উচিত এই মুহূর্তে! তা সে ভেবেই পাচ্ছে না। জাকির জিজ্ঞেস করে উঠলেন এরই মাঝে, ‘কিছু বলছ না কেন, নাওফিল? তুমি কি ফিরতে রাজি না?’
ওখানে না গেলে ঘরশত্রুকেও চিহ্নিত করা যাবে না। তাই ঝুঁকি নিয়ে হলেও যাওয়াটা অবশ্যই প্রয়োজন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে জানাল, ‘নিশ্চয়ই যাব৷ কিন্তু একটু দেরি হবে। স্মরণের পরীক্ষা সামনে৷ ভার্সিটি যাওয়া আসাটা গাজীপুর থেকে দূর হবে অনেকটা। তাই পরীক্ষাটা শেষ হোক ওর। আবার কিরণকেও একা ফেলে যাওয়া সম্ভব নয়। আমার শাশুড়ি আমাদের কাছে পাঠিয়েছে ওকে। মেডিকেল কোচিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওকে আমাদের কাছেই রাখব৷ দু-তিন মাস সময় প্রয়োজন।’
নাওফিলের এ মতামতে জাকিরকে সন্তুষ্ট দেখাল না। যদিও সেটা তিনি প্রকাশ না করলেও সবাই-ই বুঝল৷ তিনি বাধ্য হয়ে সায় দিলেন ছেলেকে।
ট্যারেসে বসে নাওফিল দীধিতির তখনের মুখটাই বারবার মনে করছে৷ তাকে খুব বিষণ্ন, বিরক্তও লাগছিল। জাকিরের সঙ্গেও তাকে মেকি হাসি মুখে নিয়ে কথা বলতে খেয়াল করেছে সে। যেন অখুশি সে জাকির শেখের উপস্থিতিতে। তা স্পষ্টই বুঝেছে নাওফিল। কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা নয়৷ কিছুদিন আগেও দীধিতি ওকে বুঝিয়েছে, যেন বাবার সঙ্গে আর সে দুর্ব্যবহার না করে। তাকে কষ্ট না দেয়৷ কখন কে মারা যায় তা তো বলা যায় না। মৃত্যুর আগে কারও মনে যেন এই ব্যাপারটি নিয়ে আফসোস, হতাশা, কষ্ট না থেকে যায়। আজকে সেই মেয়েটির চোখে মুখে আঁধার ঘনিয়ে ছিল। সে বাসায় ফেরার আগে দুজনের মধ্যে কি কোনো ঝামেলা হয়েছিল?
ভাবনা চিন্তার মধ্যে তাওসিফ চলে এলো রুফটপে। নাওফিলের কাছে এসে বসতেই নাওফিল বলল, ‘আব্বু হঠাৎ করে আজ বাসায় চলে আসলো। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগছে না? ব্যস্ত বলে আমাকে মিটিংয়ে পাঠিয়ে হুট করে বাসায় এলো। তখন কী কথা হতে পারে স্মরণের সঙ্গে তার?’
-‘তুই রহস্য করে, জটিল করে ভাবছিস কেন বিষয়টা? আমি তো জানতাম বড়ো কাকু আসবে৷’
-‘তোকে কখন জানিয়েছিল সে?’
-‘বাসায় আসার ঘণ্টাখানিক আগে।’
তবুও নাওফিলের মনের ভেতরের খুঁতখুঁত ব্যাপারটা গেল না দীধিতির মুখটা মনে করে৷ ভাবল, বাসার সিসিটিভি ফুটেজগুলো একটু দেখে নেবে শোবার আগে।
-‘কী জন্য ছাদে আসতে বললি, সেটা বলিস না কেন?’
নাওফিল ফোন থেকে একটা ছবি বের করে ফোনটা তুলে দিলো তাওসিফের হাতে। ‘ওখানে যে প্রাইভেট ডিটেকটিভটা তাহলে কাজের? আমি তো ভেবেছিলাম ছেলেটা এ জনমে কোনো হদিস দিতে পারবে না।’
-‘ছবিতে স্যামুয়েলকে চিনেছিস?’
-‘হুঁ, নাম তো পাশেই লেখা।’
-‘তাকে ভালো করে একবার দ্যাখ৷’
নাওফিলের কথামতো স্যামুয়েলকে লক্ষ করল তাওসিফ। ঠিক দীধিতির মতোই গায়ের বর্ণ তার, চুল সোনালী, চোখজোড়াও নীল সমুদ্রের মতো যেন। লোকটা বেশ সুদর্শন, সৌষ্ঠবমণ্ডিত। তার যুবক বয়সের ছবি। পাশে বাকি তিন বন্ধুও রয়েছে তার৷ কিন্তু জায়িন নেই সেখানে। সাধারণত জায়িন দেশে থাকত বলেই ওই চারজন বন্ধুই ভ্যাকেশন কাটাতে এক হত। তাওসিফ মুখ খোলার আগেই নাওফিল বলে উঠল, ‘মুখের আকৃতি আর শারীরিক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের মিলই বলে দিচ্ছে আমাদের প্রশ্নের উত্তর। বাকিদের কারোই নীল চোখ নেই। শুধু কপারের চুলগুলো সোনালী কালোর মিশেলে।’
-‘তবুও কোনো সন্দেহ নেই স্যামুয়েলই স্মরণের বায়োলজিক্যাল ফাদার। এখন সে কোথায়? ছেলে-মেয়ে, বউ, গার্লফ্রেন্ড ক’টা?’
-‘অলিভার সবার যতটুকু তথ্য নিতে পেরেছে তা খুব বেশি যথেষ্ট না। স্যামুয়েলের বউ নেই। তবে দুটো ছেলে-মেয়ে আছে। আর গার্লফ্রেন্ডের অভাব নেই৷ মেয়েটা মায়ের সঙ্গে থাকে। ছেলেটা তার সঙ্গেই তার পেশাতে জড়িত। থাকে বেশিরভাগ সময়ই নিউইয়র্ক। কিন্তু মনিকে এখনও নজরবন্দি করে রেখেছে সে। সেটা মনিও বলেছিল আমাকে। এজন্যই তো দেশে আসতে পারে না মনি।’
-‘নজরবন্দি করে রাখার কারণটা কি এটা, সে বিশ্বাক করে স্মরণ জীবিত? আর অবশ্যই মনি স্মরণের হদিস জানে?’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৬ (২)
-‘লজিক তো তাই বলে।’
-‘তাহলে সে আর কোনো খোঁজ কেন নিচ্ছে না স্মরণের? বাংলাদেশে তো তাহলে স্মরণকে এতগুলো বছরে তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলার কথা।’
নাওফিল থুঁতনিতে আঙুল বুলাতে বুলাতে ভাবনায় মত্ত হলো। ‘আমারও একই প্রশ্ন। মনিকে নজরবন্দি করে রাখা মানেই স্যামুয়েল বিশ্বাস করে স্মরণের খোঁজ মনি জানে। কিন্তু তারপরও কেন সে আর বাংলাদেশ আসেনি? অবশ্যই কোনো কারণ আছে।’
