Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৮

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৮

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৮
মেহজাবিন নাদিয়া

কালো মার্সিডিজ গাড়িটি যখন ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা ধরে ধীরলয়ে এগিয়ে চলছিল, তখন তার ভেতরের পরিবেশটা ছিল সীসার মতো ভারী আর থমথমে। পেছনের সিটে জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন আরিশান মৃধা। তাঁর সুগঠিত, পৌরুষদীপ্ত চেহারায় এখন কেবলই জমাটবদ্ধ গম্ভীরতা আর কঠোরতার প্রলেপ। চোখের চশমাটা খুলে পাশে রেখে দিয়েছেন। অনমনীয় চোয়ালটা বিরক্তিতে ক্ষণে ক্ষণে শক্ত হয়ে উঠছে।

ঠিক পাশেই, সিটের এক কোণায় নিজেকে যথাসম্ভব গুটিয়ে বসে আড়চোখে ওনাকে দেখছিল জেবা। এতক্ষণ থানায় যে চরম অধিকারবোধ আর সগর্বে ‘হানি’ বলে ডাকার চপল দাপট ও দেখিয়েছিল, গাড়ির এই নিচ্ছিদ্র নিস্তব্ধতায় সেই সাহসের বেলুন এক নিমেষে ফুটো হয়ে গেছে। মনে মনে টের পাচ্ছিল জেবা, এই মানুষটার ধৈর্যের সীমারেখাটা আজ সে পার করে ফেলেছে। কত বড় বোকামি করে ফেলেছে, তা এখন তার হাড়মাস অব্দি টের পাচ্ছে জেবা। আরিশান মৃধার এই হিমশীতল মৌনতা যেকোনো চিৎকারের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর, অনেক বেশি সংহারক।
বাতাসের এই ভারী চাপ সহ্য করতে না পেরে জেবা ওড়নার খুঁটটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিল। আরিশান মৃধার রাগ ভাঙানোর জন্য মনে মনে বেশ কয়েকটি অনুনয়সূচক বাক্য সাজিয়ে, অত্যন্ত নরম আর কম্পিত গলায় ডাকল সে,

_“সরি… আসলে আমি আপনাকে থানায় ওভাবে বলতে চাইনি। পরিস্থিতি এমন ছিল যে…”
কথাটা শেষ করার সুযোগ পেল না সে। আরিশান মৃধা হাত উঁচিয়ে তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া তখনও জানালার বাইরে নিবদ্ধ, জেবার দিকে একবার তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করলেন না। অত্যন্ত শীতল আর ধারালো গলায় বললেন,
_“স্টপ ইট, জেবা। keep your mouth shut !”
জেবা দমে গেল ক্ষণিকের জন্য। কিন্তু স্বভাবজাত জেদ আর চপলতা তার মজ্জায়; সে তো সহজে দমবার পাত্রী নয়।আরিশান মৃধার তীব্র অবহেলা,তীরের মতো এসে লাগছে তার গায়ে।
অন্যদিকে, আরিশান মৃধা নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। তাঁর মতো একজন নিয়মতান্ত্রিক, গম্ভীর ব্যক্তিত্বের মানুষের ছক-কাটা জীবনে এই মেয়েটা ঝড়ের মতো এসে সবকিছু ওলটপালট করে দিচ্ছে। তাঁর রাগ মূলত এই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায়।
গাড়িতে আবার সেই পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। আরিশান মৃধা চোখ বন্ধ করে তাঁর উত্তপ্ত স্নায়ুগুলোকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। ঠিক তখনই জেবা আবার ওনাকে ডেকে উঠল। এবার তার কণ্ঠস্বরটা আরও বেশি আকুল,

_“শুনছেন…?”
জেবার মুখ থেকে নিঃসৃত এই একটা মাত্র শব্দ—সাময়িক সময়ের জন্য আরিশান মৃধার বুকের ভেতর কেমন এক উত্তাল-পাত্তাল কাণ্ড ঘটিয়ে দিল। ওনার মনে হলো, ওনার এত বছরের গড়ে তোলা শক্ত পাথরের দেওয়ালটা যেন এক ফুঁৎকারে সামান্য কেঁপে উঠছে। আরিশান মৃধা নিজের এই আকস্মিক ভেতরের পরিবর্তন দেখে ভীষণ বিরক্ত হলেন। নিজের ওপরই ওনার চরম রাগ হতে লাগল। একটা সামান্য মেয়ে, বয়সে যে ওনার নিজের ছেলের চেয়েও ছোট, সে ওনাকে বারবার এভাবে প্রভাবিত করছে! অথচ উনি চাইলেও জেবাকে শক্ত করে কিছু বলতে পারছেন না, ওনার পুরুষালী মন সায় দিচ্ছে না। ভেতরের এই অবাধ্য দ্বিধাদ্বন্দ্ব ওনাকে আরও বেশি খিটখিটে করে তুলছিল।
জেবা ওনার কোনো বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া না পেয়ে এবার একটুখানি এগিয়ে এসে বলল,

_“শুনুন না… আপনি কি এখনো আমার ওপর অনেক রেগে আছেন? রেগে থাকলে খুব সরি। আর কখনো এমন করব না, সত্যি বলছি।”
আরিশান মৃধা এবার নিজের রাগের বাঁধ ধরে রাখতে পারলেন না। উনি ঝট করে জেবার দিকে ঘুরে বসলেন এবং তাঁর স্বভাবসুলভ চড়া, গমগমে গলায় ধমকে উঠলেন,
_“তোমার প্রবলেমটা কী জেবা, হ্যাঁ? একটা অপরাধ করে এসেছ—লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালিয়ে এক্সিডেন্ট করেছো! তার ওপর থানায় গিয়ে ওমন ফালতু নাটক করলে! তোমার কি ন্যূনতম কোনো কমন সেন্স নেই? কোন সাহসে তুমি ওসব সস্তা শব্দ আমার জন্য ব্যবহার করো? লিমিট ক্রস করবে না একদম!”
আরিশান মৃধার এই আকস্মিক তীব্র ধমকে জেবা পুরোপুরি কেঁপে উঠল। ওনার চোখের সেই জ্বলন্ত, রাগী চাউনি দেখে এক নিমেষে জেবার বুকের ভেতরটা ভয়ে শুকিয়ে গেল। চোখের পাতা দুটো নোনা জলে ছলছল করে উঠল। আর একটা শব্দও মুখ থেকে বের করল না সে। ঝট করে উল্টো দিকে ঘুরে, জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে সিটের সাথে লেপ্টে বসল। নিজের মুখটা ওড়না দিয়ে একটু আড়াল করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল-যেন আরিশান মৃধা কোনোভাবেই তার এই দুর্বলতা দেখতে না পান।

গাড়িটা আস্তে আস্তে নিজের গতিতে ঢাকার ব্যস্ত, জনাকীর্ণ রাস্তা ধরে ছুটে চলছে। জেবা জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে কান্না চাপার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু তার কাঁধের মৃদু কম্পনই স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল সে কতটা আঘাত পেয়েছে। আরিশান মৃধা আড়চোখে ওদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার মনে এক অদ্ভুত, নামহীন অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করল। ওনার মনে হলো, মেয়েটার সঙ্গে বোধহয় একটু বেশিই কড়া ব্যবহার করে ফেলেছেন। শত হলেও, ও একটা অবুঝ মেয়ে; হয়তো ওনার প্রতি একটা অনধিকার অধিকারবোধ থেকেই ওমনটা করে ফেলেছে। নিজের অজান্তেই জেবার এই আড়ালে বসে কাঁদাটা ওনার সহ্য হচ্ছিল না। ওনার বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল।

শেষমেশ নিজের ভেতরের সমস্ত যুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে, আরিশান মৃধা অবিশ্বাস্য কাজ করে বসলেন। উনি বসা থেকে একটু ঝুঁকে জেবার দিকে এগিয়ে গেলেন। নিজের দুই হাত বাড়িয়ে জেবার অশ্রুসিক্ত মুখটা অত্যন্ত আলতো করে ধরে ওনার দিকে ঘুরিয়ে আনলেন। জেবার গাল বেয়ে তখনো নোনা জল গড়িয়ে পড়ছিল, ডাগর চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। আরিশান মৃধা ওনার বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে পরম মমতায় জেবার চোখের পানিগুলো মুছে দিলেন। ওনার গলার স্বর এবার একদম মোলায়েম, যেখানে রাগের লেশমাত্র নেই
_“আই অ্যাম সরি… ওভাবে ধমক দেওয়াটা আমার ঠিক হয়নি। এবার কান্না অফ করো।”
আরিশান মৃধা নিজের এই অভূতপূর্ব ব্যবহারে নিজেই ভেতরে ভেতরে চরম বিস্মিত হলেন। এই ‘সরি’ শব্দটা ওনার জীবনের আভিধানিক শব্দভাণ্ডারে নেই বললেই চলে। পুরো দেশের আইন আর শাসনকে যিনি নিজের ইশারায় চালান, আজ তিনিই সামান্য একটা মেয়ের চোখের জলের সামনে নত হতে বাধ্য হলেন।
জেবা ওনার হাতের উষ্ণ স্পর্শ পেয়ে চোখের জল মোছার মাঝেই একটু নাক টেনে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। যেন আরিশান মৃধার কাছ থেকে এই ক্ষমা প্রার্থনা সে একেবারেই প্রত্যাশা করেনি। এই কঠিন লোকটা আজ তার চোখের পানি মুছে দিচ্ছে? আর সরি বলছে? জেবার মনে হলো সে কোনো রঙিন স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু চোখের পানি তবু থামল না মেয়েটার; বরং আরিশান মৃধার হাতের পরম আশ্রয়ের উষ্ণতা পেয়ে কান্নাটা আরও জোরালো হয়ে উঠল। এ কান্না কষ্টে নয়, এ কান্না কেবলই অভিমানে।এতক্ষণ ধরে লোকটা অবহেলা আর দূরত্ব বজায় রেখেছিল, যা তার বুকের ভেতর পাথরের মতো জমে ছিল, সব যেন এখন গলে জল হয়ে ঝরতে লাগল।

ঠিক তখনই গাড়িটা একটা লোকজ মেলার কাছাকাছি রাস্তায় এসে তীব্র যানজটে আটকে গেল। মেলা উপলক্ষে আশেপাশে প্রচণ্ড মানুষের ভিড়, হকারদের হাকডাক, আর রঙিন বেলুন ও মাটির খেলনার দোকানে চারপাশ ছেয়ে আছে। আরিশান মৃধা জানালার বাইরে এই বিশাল জ্যাম আর মানুষের হুড়োহুড়ি দেখে চরম বিরক্ত হয়ে মুখ দিয়ে একটা ‘চ’ শব্দ উচ্চারণ করলেন। ওনার এমনিতেই মেজাজ বিক্ষিপ্ত, তার ওপর এই অন্তহীন জ্যাম।
জেবা নিজেও জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। আর তাকানোর সাথে সাথেই তার ভেতরের মেঘলা আকাশ এক নিমেষে রোদে ঝলমল করে উঠল। সে সমস্ত কান্না ভুলে খুশিতে একদম চঞ্চল হয়ে উঠল। আরিশান মৃধার কোটের হাতাটা টেনে ধরে বাচ্চাদের মতো আবদার করে বসল,
_“ওহ গড! মেলা! শুনুন না, প্লিজ আমাকে ওই মেলায় নিয়ে চলুন! অনেক দিন মেলায় যাই না। প্লিজ, প্লিজ!”

আরিশান মৃধা জেবার এই অভাবনীয় ও ক্ষণস্থায়ী ‘মুড সুইং’ দেখে তাজ্জব বনে গেলেন। মেয়েটার মাত্র এক মিনিট আগেই তো, চোখ জলে ভাসছিল, আর এখন মেলায় যাওয়ার জন্য নাচছে! উনি চোখ বড় বড় করে জেবাকে দেখেন। এরপর আবার একটা কড়া ধমকের সুরে বললেন,
_“তুমি কি পাগল হয়েছ জেবা? দেখেছ বাইরে কত মানুষ? আর আমি কে, সেটা তোমার খেয়াল আছে? আমি এই মেলায় নামলে কী অবস্থা হবে, ধারণা আছে তোমার?”
জেবা ওনার কথা শুনে বাচ্চাদের মতো মুখ কালো করে,ঠোঁট ফুলিয়ে আবার ওপাশে মুখ লুকিয়ে বসল। ওনার দিকে আর তাকানোর প্রয়োজনই বোধ করল না সে। জেবাকে এভাবে আবার মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখে আরিশান মৃধার মনটা কেমন জানি আবার খচখচ করে উঠল। জেবার ওই মলিন, বিষণ্ণ মুখটা ওনার কেন জানি সহ্য হলো না। উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে একটা কালো মাস্ক বের করে মুখে পরে নিলেন-যেন ওনাকে সহজে কেউ চিনে ফেলতে না পারে। চোখের চশমাটাও ঠিক করে নিলেন।এরপর ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

_“গাড়িটা সাইডে চাপিয়ে রাখো। আমরা আসছি।”
ড্রাইভার আকাশ থেকে পড়লেও মুখে কিছু বলল না। আরিশান মৃধা জেবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন,
_“চলো। তবে বেশি সময় থাকা যাবে না।”
জেবা যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না! সে এক লাফে গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ল। খুশিতে তার চোখ-মুখ চকচক করছে। আরিশান মৃধা ওনার দীর্ঘ, সুঠাম অবয়ব নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে স্বভাবসুলভ ধীর পায়ে জেবার পেছনে পেছনে মেলায় প্রবেশ করলেন।
মেলায় ঢুকতেই জেবা যেন খাঁচামুক্ত এক চঞ্চল পাখি! সে বাচ্চাদের মতো এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগল। কখনো কাঁচের চুরির দোকানে গিয়ে হাত বাড়াচ্ছে, কখনো মাটির পুতুল নেড়েচেড়ে দেখছে। আরিশান মৃধা তার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলেন। আশেপাশে প্রচণ্ড ভিড়, মানুষ একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ছে। জেবা আরিশান মৃধার উপস্থিতি তোয়াক্কা না করে নিজের খেয়ালে ঘুরছিল, যার কারণে অনেক মানুষের সঙ্গে ভুলবশত তার শরীর ধাক্কাও লাগছিল।

এসব দৃশ্য দেখে আরিশান মৃধার ভেতরের পুরুষটি দপ করে জ্বলে উঠল। ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল,উনি আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে দ্রুত পা চালিয়ে জেবার একদম পিঠ ঘেঁষে গিয়ে দাঁড়ালেন।
জেবা তখন একটা ফুচকার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আচমকা সে টের পেল, আরিশান মৃধা ওনার বিশাল, চওড়া শরীরটা নিয়ে একদম তার পিঠের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়েছেন। শুধু তাই নয়, উনি জেবার দুপাশে নিজের দুহাত এমনভাবে প্রসারিত করে রাখলেন, যেন একটা অদৃশ্য, দুর্ভেদ্য দেওয়ালের মতো তাকে আগলে রেখেছেন। ওনার সুঠাম দেহের সেই আবেষ্টনীতে জেবা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেল। ওনার শরীরের চেরি পারফিউমের সুবাস আর পুরুষালী উষ্ণতা জেবার পুরো পিঠে এসে আছড়ে লাগছিল।

আরিশান মৃধা জেবাকে ওভাবে নিজের দুই হাতের ঘেরাটোপে বন্দি রেখেই, ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন-যাতে বাইরের কোনো পুরুষ ভুল করেও জেবাকে স্পর্শ করতে না পারে। জেবা ওনার এই প্রতিরক্ষামূলক,আচরণে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের গতি দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে আলতো করে ওপরের দিকে তাকিয়ে আরিশান মৃধার মাস্ক পরা গম্ভীর চোখের দিকে তাকাল। ওনার চোখ দুটো তখনও চারপাশের ভিড়ের দিকে কড়া, শিকারী নজর রাখছিল। জেবার ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু এই চঞ্চল পাখির মন বেশিক্ষণ এক জায়গায় স্থির থাকার নয়। একটু সামনে যেতেই তার চোখ আটকে গেল একটি কাঁচের চুরির দোকানে। নানা রঙের, নানা ঢঙের রেশমি আর কাঁচের চুরি থরে থরে সাজানো রয়েছে সেখানে। রোদের আলোয় সেই চুরিগুলো যেন এক মায়াবী আলো ঠিকরে বের করছে।
জেবা এক ঝটকায় আরিশান মৃধার হাতের ঘেরাটোপ থেকে বের হয়ে চুরির দোকানটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার দুই চোখ তখন চকচক করছে। একটি গাঢ় লাল আর সোনালি কারুকাজ করা কাঁচের চুরির গোছা হাতে নিয়ে সে নিজের ফর্সা কবজিতে জড়িয়ে দেখতে লাগল।
দোকানের ওপাশে বসা ছিল এক তরুণ দোকানদার, বয়স মেরেকেটে বাইশ-তেইশ। জেবার মতো এমন এক পরমা সুন্দরী, চঞ্চল তরুণীকে নিজের দোকানের সামনে দেখে ছেলেটির চোখ যেন পলক ফেলতে ভুলে গেল। জেবা যখন নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে চুরির সৌন্দর্য উপভোগ করছিল, তখন ছেলেটি মুগ্ধ নয়নে জেবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে স্পষ্ট ফুটে উঠল ভালোলাগা আর আকর্ষণের এক তীব্র চাউনি।
ছেলেটি জেবার দিকে একটু এগিয়ে এসে বলল,

_“আপু, আপনাকে এই চুরিগুলোতে দারুণ মানিয়েছে! একদম নায়িকা কারিনা কাপুরের মতো লাগছে।এই লালটা যেন আপনার জন্যই তৈরি হয়েছে!”
দোকানদারের এই অতিরিক্ত প্রশংসা জেবার বেশ ভালো লাগল।মনে মনে এক ধরণের চপল আনন্দ পেল। নিজের রূপের এই প্রশংসা আরিশান মৃধার সামনে হওয়ায় তার ভেতরের চঞ্চলতা আরও বেড়ে গেল। সে চুরির গোছা পরা হাতটা আরিশান মৃধার চোখের সামনে তুলে ধরল। মাথাটা একটু কাত করে, ওনার দিকে ফিরে বলল,

_“আমাকে এই চুরিগুলো পরে কেমন লাগতেছে? বলুন না?”
আরিশান মৃধা এতক্ষণ ধরে ওই তরুণ দোকানদারের লোলুপ চাউনি আর অতিরিক্ত মাখামাখি করার চেষ্টা লক্ষ করছিলেন।ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, চোখের মণি দুটো ছোট হয়ে আসছিলো। উনি মুহূর্তের জন্য ওই দোকানদার ছেলেটার দিকে এমন এক খুনে আর গরম চোখে তাকালেন যে ছেলেটির মুখের হাসিমাখা অবয়ব নিমেষেই ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মনে হলো, আরিশান মৃধা ওনার চাউনি দিয়েই ছেলেটাকে ভস্ম করে দেবেন।
এরপর আরিশান মৃধা ঝট করে জেবার দিকে ফিরলেন। ওনার কণ্ঠস্বরে জমে বরফ। অত্যন্ত রুক্ষ সুরে বলে উঠলেন,

_“একদম বাঁদরের তিন নম্বর বাচ্চার মতো দেখাচ্ছে। এসব জিনিস খোল হাত থেকে!”
জেবার মুখের চঞ্চল হাসিটা এক সেকেন্ডে মিলিয়ে গেল। কারিনা কাপুরের উপমা থেকে সরাসরি ‘বাঁদরের তিন নম্বর বাচ্চা’-এই চরম অপমান সে আশা করেনি। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আরিশান মৃধা আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিলেন না। ওনার দীর্ঘ অবয়ব নিয়ে জেবার একদম মুখোমুখি হলেন। জেবা কিছু বুঝে ওঠার আগেই উনি জেবার নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় নিলেন এবং অত্যন্ত রুক্ষভাবে, প্রায় জোর করেই জেবার হাত থেকে কাঁচের চুরিগুলো এক এক করে খুলে দোকানের কাউন্টারে প্রায় ছুড়ে মারলেন। ওনার এই আকস্মিক রাগে জেবা স্তব্ধ হয়ে গেল।
চুরিগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়ে আরিশান মৃধা পকেট থেকে একটা ৫০০ টাকার নোট বের করে কাউন্টারে ফেলে দিলেন।এরপর কোনো দিকে না তাকিয়েই জেবার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে মেলা থেকে বাইরের দিকে হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন। ওনার হাঁটার গতি এত বেশি ছিল যে জেবা ওনার সাথে তাল মেলাতে পারছিল না, প্রায় হোঁচট খেতে খেতে ওনার পেছনে টেনে হিঁচড়ে যেতে লাগল।
মেলা থেকে বের হয়ে গাড়ির দিকে যাওয়ার পথে জেবা নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে ক্ষুব্ধ গলায় প্রশ্ন করল,

_“আরে ছাড়ুন! কী করছেন কী আপনি? ওভাবে চুরিগুলো খুলে নিয়ে এলেন কেন? আরে আমি কিছু জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কী উত্তর দিবেন? সমস্যাটা কী আপনার?”
আরিশান মৃধা জেবার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। ওনার চোখ সোজা সামনের দিকে, মুখাবয়ব পাথরের মতো শক্ত।উনি নিজেও নিজের এই আচরণের কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ওনার ভেতরের এক অদ্ভুত, অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা নিজেকে গ্রাস করছিল। উনি নিজেই বুঝতে পারছিলেন না যে,এই হাঁটুর বয়সী মেয়েটাকে নিয়ে উনি এতোটা তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় কেন ভুগছেন! কেন সামান্য দোকানের ছেলেটা ওর দিকে তাকানোটা ওনার বুকে তীরের মতো বিঁধল? এই অনুভূতির সাথে উনি পরিচিত নন,আর এটাই ওনাকে আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলছিল।
জেবা ওনাকে আবার কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পাওয়ার আগেই,গাড়িটার কাছে চলে এলো দুজনে। আরিশান মৃধা নিজেই গাড়ির পেছনের দরজাটা সজোরে খুলে জেবাকে প্রায় জোর করে ভেতরে বসিয়ে দিলেন। জেবা সিটে আছড়ে পড়ার মতো করে বসল। এরপর আরিশান মৃধাও ধপ করে ওর পাশে বসে ড্রাইভারকে অত্যন্ত কড়া গলায় নির্দেশ দিলেন,

_“গাড়ি চালাও। জলদি।”
গাড়ি চলতে শুরু করতেই ভেতরের পরিবেশ আবার ওলটপালট হয়ে গেল। এবার জেবার মনে আর কোনো ভয় বা অনুশোচনা রইল না, বরং আরিশান মৃধার এই আচরণে ওর মনে তীব্র ক্ষোভ আর বিরক্তি তৈরি হলো। জেবা রাগে আর অভিমানে ওনার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে সিটের অন্য কোণায় গিয়ে বসল।বুকের ভেতরটা ওর ক্ষোভে তোলপাড় হচ্ছিল। সে মনে মনে ভেবেই নিল, লোকটা আসলে ওকে সহ্যই করতে পারে না। এই জোর করে হওয়া বিয়েটাকে সে কোনোদিন মন থেকে মানবে না,সে কারণেই হয়তো ওর সামান্যতম আনন্দ,পছন্দের জিনিসগুলোকে ওনি এভাবে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।জেবার খুশি বোধয় সহ্য করতে পারে না এই লোক।
জেবা নিজের ভেতরের ক্ষোভটাকে এবার চেপে না রেখে।আরিশান মৃধার দিকে তপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল,

_“আমায় ওখান থেকে ওভাবে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসার কারণটা কী, বলবেন কি? আমি মেলায় একটু আনন্দ করছিলাম, একটা জিনিস পছন্দ হয়েছিল, সেটাতেও আপনার এত হিংসা? এত বড় মানুষ আপনি, অথচ মনটা এত ছোট!”
আরিশান মৃধা এতোক্ষণ চোখ বন্ধ করে নিজের উত্তেজিত নার্ভগুলোকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। জেবার এই অন্যায্য অভিযোগ শুনে তিনি জেবার দিকে তাকালেন। গলার স্বর এবার ধমকের চড়া সুর ছেড়ে এক গম্ভীর রূপ নিল। অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন,
_“হিংসা? তুমি আসলেই একটা আস্ত নির্বোধ, জেবা। তোমার দুনিয়া সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই। মেলায় ওই ছেলেটার দৃষ্টি তোমার প্রতি কেমন ছিল, খেয়াল করেছ? ওটা কোনো ভালো দৃষ্টি ছিল না। এসব লোকাল মেলায় তোমার মতো একটা যুবতী মেয়েকে একা পেলে নানা কু-নজরে পড়তে হয়। আমি যা করেছি, তোমার সুরক্ষার জন্যই করেছি।”
উনি একটু থামলেন, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য আবার বললেন,

_“আমি তোমাকে নিজের মেয়ের মতো জাস্ট আগলে রাখতে এসব করেছি। একজন বাবার মতো খারাপ নজর থেকে তোমাকে বাঁচানোর দায়িত্ব আমার। এর বাইরে অন্য কিছু ভাবার কোনো অবকাশ নেই।”
ব্যাস! এই ‘বাবার মতো’ শব্দটা জেবার কানের পর্দায় এসে যেন তপ্ত সিসার মতো লাগল। স্বামীর মুখে বারবার এই অভিভাবকসুলভ, পিতৃসুলভ পরিচয় জেবার নারীত্বে আর তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত করল। জেবা ভেতরে ভেতরে এত বেশি রেগে গেল যে নিজের ওপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল।চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরতে লাগল। সে আরিশান মৃধার দিকে আরও একটু এগিয়ে এসে, ওনার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ আর বিষাক্ত গলায় বলে উঠল,

_“ভালো হয়েছে! ওরা আমার দিকে তাকাবে, আমার প্রশংসা করবে, তাতে আপনার এত মাথাব্যথা কেন, হ্যাঁ? বয়সটা আমার এমন যে, এই বয়সে অন্যকে নিজের রূপে আকৃষ্ট করার মজাই আলাদা! আমিও ঠিক সেটাই করছিলাম। দেখলেন না, ওই ছেলেটার দৃষ্টিতে আমার জন্য কতখানি আকর্ষণ আর মুগ্ধতা দেখা যাচ্ছিল? আপনার যদি অতই বাবার মতো দায়িত্ব দেখানোর শখ থাকে, তবে নিজের মেয়ের ওপর দেখান, আমার ওপর নয়!”
জেবার মুখ থেকে বের হওয়া কথাগুলো শুনে,আরিশান মৃধা একদম চুপ হয়ে গেলেন। ওনাকে চুপ থাকতে দেখে জেবার ভিতরে রাগের মাত্ৰা আরো দিগুন হারে বৃদ্ধি পেল। তবে সে তা বাহিরে প্রকাশ করলো না।উল্টো মুখে কুলুপ এটে অন্যপাশে মুখ ফিরিয়ে বসে রইল।আরিশান মৃধা আড়চোখে একবার জেবার রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখশ্রীটাকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করলেন। এরপর আবার দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে আসে।
গাড়ি গুলশানের ভেতরে ঢুকার পর,একটা শপিং কমপ্লেক্স পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলো তখন।আরিশান মৃধা পিছন থেকে হঠাৎ করেই
ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,

_“গাড়ি থামাও! স্টপ দ্য কার রাইট নাও!”
ড্রাইভার ওনার কথায় তৎক্ষণাৎ ব্রেক কষল। গাড়িটি ঝাঁকুনি দিয়ে রাস্তার পাশে একটা বিশাল, নামীদামী শপের ঠিক সামনে এসে থামল।আরিশান মৃধা জেবার দিকে একবারো না তাকিয়েই। ওনার পকেট থেকে সেই কালো মাস্কটা আবার বের করে মুখে পরে নিলেন। চোখের চশমাটা ঠিক করে গাড়ি থেকে নামলেন। উনি দীর্ঘ কদমে সেই শপের ভেতরে ঢুকে গেলেন।
জেবা গাড়ির ভেতরে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার বুকটা কেমন করে যেন ওঠানামা করছে। জানালার কাচ দিয়ে শপের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিশান মৃধার এই আকস্মিক মতিগতির কোনো লক্ষণই ঠিক করে বুঝতে পারছিল না জেবা। এই মানুষটা কখন কী করে, তার আচরণ কোন দিকে মোড় নেয়, তা বোঝার সাধ্য যেন এই দুনিয়ায় কারও নেই। জেবা মনে মনে এক ধরণের অস্থিরতা অনুভব করতে লাগল।
মিনিট দশেক পর,শপের দরজা ঠেলে আরিশান মৃধা বের হয়ে এলেন।ওনার হাতে একটি লাল ব্যাগ।কিসের ব্যাগ তা বুঝতে পারছেনা জেবা।উনি এসে দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে আবার জেবার পাশে ধপ করে বসে পড়লেন। ওনার শরীর থেকে আসা চেরি পারফিউমের গন্ধ আবার গাড়ির ভেতরের বাতাসকে ভারী করে তুলল।

জেবা কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই, আরিশান মৃধা ওনার শক্ত হাত দুটো বাড়িয়ে জেবার দুটো নরম হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিলেন। ওনার হাতের স্পর্শে এক তীব্র উষ্ণতা ছিল, যা জেবার ভিতরটায় এক অশান্ত ঝড়ের রুপ নিচ্ছে।জেবা চমকে উঠে হাতটা টানার চেষ্টা করল, কিন্তু আরিশান মৃধার সেই লৌহকঠিন গ্রিপ থেকে হাত ছাড়ানো অসম্ভব ছিল।
উনি ব্যাগ থেকে একটি ছোট বাক্স বের করলেন। তার ভেতর থেকে ঝকঝকে, নিখুঁত কারুকাজ করা দুটো নিরেট সোনার চুড়ি বের করে আনলেন। জেবা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আরিশান মৃধা কোনো কথা না বলে, অত্যন্ত যত্ন করে দৃঢ়তার সাথে জেবার ডান হাতে এবং বাম হাতে সেই সোনার চুড়ি দুটো পরিয়ে দিলেন। চুড়ি পরা শেষ করে ওনার আঙুলগুলো জেবার কবজিতে এক মুহূর্তের জন্য চেপে রইল,
জেবা ঘটনায় এতটাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল যে তার মুখ থেকে কোনো কথাই বের হচ্ছিল না। সে অবশ হয়ে ওনার কাণ্ড দেখছিল। আরিশান মৃধা ব্যাগ থেকে আরেকটি মখমলের বাক্স বের করলেন। তার ভেতর থেকে একজোড়া অত্যন্ত ভারী আর চমৎকার ডিজাইনের সোনার কানের দুল বের করে আনলেন। ওনার চোখ তখনো গম্ভীর, শীতল। উনি দুল দুটো জেবার চোখের সামনে ধরে অত্যন্ত নিচু, কিন্তু ধারালো গলায় বললেন,
_“এগুলো এক্ষুনি নিজের কানে পরো।”

জেবা তখন এক ঘোরের মাঝে ভাসছিল।ওনার এই অভাবনীয় রূপান্তর,ওর মস্তিষ্ককে যেন অবশ করে দিয়েছিল। আরিশান মৃধার কথাগুলো জেবার কানে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু সে হাত বাড়িয়ে দুল দুটো নেওয়ার মতো শারীরিক বা মানসিক অবস্থায় ছিল না।শুধু বড় বড় চোখ করে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল।
জেবার কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে আরিশান মৃধা নিজের ধৈর্যের সীমা হারিয়ে ফেললেন। উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেই এগিয়ে এলেন। নিজের চওড়া শরীরটা একটু ঝুঁকিয়ে জেবার একদম কাছে চলে এলেন। ওনার তপ্ত নিঃশ্বাস জেবার গালে এসে লাগছিল। উনি নিজের দক্ষ হাতে পরম সযত্নে জেবার কানের লতিতে সেই সোনার দুল জোড়া পরিয়ে দিলেন। দুল পরানোর সময় ওনার আঙুলের মৃদু স্পর্শ জেবার শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণের সৃষ্টি করল।
এরপর উনি ব্যাগ থেকে একটি অতি ক্ষুদ্র, উজ্জ্বল হিরের নোজপিন বের করলেন। জেবা এবার একটু নড়েচড়ে উঠে বলল,

_“আ-আমি নাক ফোটা করিনি…”
_“শাট আপ!”
আরিশান মৃধা ধমক দিয়ে উঠলেন।ওনার সেই ধমকে জেবা আবার সোজা হয়ে বসল। উনি জেবার নাকের পাশে হাত দিয়ে দেখলেন ওটা ক্লিপ-অন নোজপিন। উনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জেবার ফর্সা নাকে সেই হিরের নোজপিনটা পরিয়ে দিলেন। হিরের কুচিটা জেবার নাকে বসমাত্রই তার পুরো মুখাবয়ব এক স্বর্গীয় জ্যোতিতে ঝলমল করে উঠল।
সবশেষে, আরিশান মৃধা ব্যাগ থেকে একটি সরু কিন্তু আকর্ষণীয় সোনার চেইন বের করলেন, যার লকেটে একটি চমৎকার নকশা করা। উনি চেইনটা জেবার হাতের তালুতে রেখে অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন,
_“এটাও পরে নাও। এক্ষুনি।”

জেবা সম্পূর্ণ শকের মধ্যে থেকেই ঘোরের মাঝে অবশ পুতুলের মতো সে নিজের হাত বাড়িয়ে চেইনটা গলায় পরে নিল। তার কাছে পুরো বিষয়টা একটা অবাস্তব, অলৌকিক স্বপ্ন মনে হচ্ছিল।
আরিশান মৃধার কাজ শেষ হতেই উনি সোজা হয়ে বসলেন। নিজের মাস্কটা মুখ থেকে নামিয়ে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বললেন,
_“গাড়ি চালু করো। বাড়ি চলো।”
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। আরিশান মৃধা এবার জেবার দিকে ঘুরে বসলেন। অত্যন্ত ঠান্ডা আর হুঁশিয়ারি গলায় বললেন,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৭

_“ এগুলো খুলে ফেলার চিন্তা মাথায় আনলে,মার একটাও মাটিতে পড়বেনা।যাস্ট তোমার সেইফটির জন্য পড়তে বলেছি।আমি তোমার বাবার মতোই সেজন্য দ্বায়িত্ববোধ থেকে করছি। অন্য কোনো ভাবনা চিন্তা মাথায় আনবেনা আবার!

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here