তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১২
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা অনেকটাই নার্ভাস যে স্নিগ্ধ সৌরভকে কল দিয়ে কি বলবে। আর এদিকে স্নিগ্ধ মনে সাহস নিয়ে সৌরভকে কল দিলো। ভালো যখন বেসেছে সেক্ষেত্রে সবাইকে মানানোর দায়িত্বও ওরই। সব কিছু ভুলে সৌরভের সাথে কথা বলবে। ও বলতে না চাইলেও বলবে। ভেবেও নিয়েছে যেমন করে একটা মেয়েকে পটানো লাগে তেমন করে সৌরভকেও পটাবে। রাগ দেখালেও হেসে হেসে কথা বলবে।
সৌরভ আননোন নাম্বার থেকে আসা কলটা রিসিভ করলো না। ফোনটা রেখে শুয়ে পড়লো। মিনিট দুই পরে স্নিগ্ধ আবার কল দিলো। সৌরভ রিসিভ করে বলল,
“কে?”
“আমি স্নিগ্ধ।”
সৌরভ কপাল কুঁচকে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বলো!”
স্নিগ্ধ বলল,
“প্রাণেশার থেকে শুনলাম আপনি নাকি লন্ডনে চলে যাচ্ছেন?”
“হুমম।”
স্নিগ্ধ নরম গলায় বলল,
“ভাইয়া যাওয়াটা কি খুব দরকার? না গেলে হতো না। প্লিজ যাবেন না। হয়তো ভাবতে পারেন প্রাণেশা হয়তো আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে এসব। আমি যা বলছি নিজে থেকেই বলছি। ও শুধু বলল ভাইয়া চলে যাচ্ছে। আমি তখনই ওর থেকে নাম্বারটা নিয়ে আপনাকে কল দিলাম।”
সৌরভ চুপ করে আছে। স্নিগ্ধ পরপর বলল,
“ভাইয়া অনেক আগে থেকে আপনার বোনকে ভালোবাসি। আমার বাড়ির সবাই পছন্দ করে ওকে। আমি ওকে ছেড়ে যাবো না। ওকে সারাজীবন আপনাদের মতো করে আগলে রাখবো। আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো তবুও আমাদের আলাদা করবেন না।”
সৌরভ ভাবছিলো ছেলেটা যদি খারাপ হতো তাহলে হয়তো এভাবে কল দিতো না। আর এভাবে বলতোও না। ছেলেটা ভালো বলেই বলছে।
স্নিগ্ধ কথাগুলো বলে মিনিট দুই চুপ থেকে নিচু গলায় আওড়ালো,
“ভাইয়া আপনি এখনও রেগে আছেন আমার উপরে? কথা বলবেন না?”
সৌরভ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“বলছিই তো।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“ভাইয়া আমি আপনার কাছে রিকোয়েস্ট করছি। প্লিজ চলে যাবেন না। প্রাণেশার জন্য হলেও।”
সৌরভ বাকা হাসলো। ও তো কোনোকালেই লন্ডনে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। শুধু তখন প্রাণেশার মন বুঝতে এমন বলেছে। এখন গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বেশ যাবো না।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“থ্যাংকইউ ভাইয়া। এই শুনে প্রাণেশা খুব খুশি হবে।”
এদিকে হামিমের যেনো গা পিত্তি জ্বলে উঠছে। যখন থেকে শুনেছে যে প্রাণেশার স্নিগ্ধর বিয়ে হবে। ও কেবল মরিয়া হয়ে উঠছে প্রাণেশাকে পাওয়ার জন্য,একটু কথা বলার যান। কোনো কিছু না ভেবে কল দিলো প্রাণেশাকে। প্রাণেশা ফোনটা রুমে রেখে ড্রইং রুমে টিভি দেখছে। ওর ঘরের সামনে দিয়ে নিচে আসছিলো সৌরভ। কল আসার শব্দে সৌরভ রুমে ঢুকে ফোনটা হাতে নিয়ে যখন দেখলো হামিমের নাম্বার। ও তৎক্ষণাৎ নাম্বারটা ব্লক করে দিলো।
হামিম আবারও কল দিলে বুঝতে পারে নাম্বারটা ব্লক দিয়ে দিয়েছে। ও রাগে হুংকার দিয়ে উঠে বলল,
“সৌরভ, স্নিগ্ধ তোদের আমি ছাড়বো না। যেখানে পাবো সেখানেই মারবো তোদের।”
সকাল সকাল খান বাড়িতে সব আয়োজন করা হচ্ছে। আজ প্রাণেশাকে দেখতে আসবে আর আংটি পড়িয়ে দিয়ে যাবে। ড্রাইভার বাজার করে এনেছে, আর রোকেয়া বেগম সেগুলো গুছিয়ে রান্না-বান্না শুরু করে দিয়েছেন। এই বাড়িতে কোনো মেয়ে মানুষ নেই, সেই সব কাজ করেন। তার কাছেই আরশাদ খান সব দায়িত্ব দিয়েছেন।
সৌরভ ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে এলো। রোকেয়া বেগম কফি এনে দিয়ে গেলেন। প্রাণেশা উপরে থেকে নামতে নামতে সৌরভকে দেখে খুব খুশি হলো। রাতে স্নিগ্ধ বলেছিলো সৌরভ আর লন্ডনে চলে যাবে না। অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় আর প্রাণেশা সৌরভকে কিছু বলতে পারেনি।
প্রাণেশা সৌরভের কাছে এসে বসে বলল,
“ভাইয়া তুমি নাকি লন্ডনে যাবে না?”
সৌরভ ঠান্ডা মেজাজে কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
“হুমম।”
প্রাণেশা খুশিতে আত্মহারা হয়ে ভাইয়ের গালে হাত রেখে বলল,
“আমার লক্ষী ভাই।”
সৌরভ অবাক চোখে প্রাণেশার মুখপানে তাকিয়ে রইলো। প্রাণেশা হেসে বলল,
“যাক যাচ্ছো না অনেক খুশি হয়েছি।”
রোকেয়া বেগম কিচেন থেকে বললেন,
“যাক তাহলে প্রাণেশা মামনির বিয়েটা হচ্ছে। অবশেষে মানলে সৌরভ।”
সৌরভ প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে মুখ বাকিয়ে বলল,
“যদি দেখি বিয়ের পরে কথা কাটাকাটি হয়েছে বা তোকে কিছু বলেছে তখন কিন্তু আমাকে বলতে পারবি না যে, ভাইয়া ছেলেটা এমন, তেমন। তোর বাপকে গিয়ে বলবি।”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“তুমি দেখো এমন কিছুই হবে না। তোমার ভুল ধারণা ভেঙে যাবে ভাইয়া।”
সৌরভ শ্বাস ছেড়ে তাকিয়ে রইলো।
দুপুরের পরে,
ড্রইং রুমে আরশাদ খান, সাঈদ রেজা চৌধুরী, রাজিয়া বেগম, স্নিগ্ধ ,সিয়াম আর সুবহারা বসে আছে। সাথে সাঈদ রেজা চৌধুরীর ছোট ভাই ওসমান রেজা চৌধুরীও এসেছে। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব আগেই শেষ দেওয়া হয়েছে।
সৌরভ বাহিরে থেকে ফিরে এসে শাওয়ার নিয়ে বের হলো। কালো টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়ে চুল শুকিয়ে রেডি হয়ে বের হলো। সামনেই প্রাণেশার রুমটা আধখোলা দেখে তাকালো। প্রাণেশা লাল রঙের শাড়ি পড়েছে। সুন্দর করে সেজেছেও। বোনকে দেখে নিজের অজান্তেই হেসে ভাবতে লাগলো, সেদিন মনে হয় ছোট্ট একটা মেয়ে ছিলি আর আজ শাড়ি পড়ে পাত্রপক্ষের সামনে যাবি।
সৌরভ শ্বাস ছেড়ে চলে এলো। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই সাঈদ রেজা চৌধুরী সৌরভকে বললেন,
“এসো সৌরভ। তোমার অপেক্ষাই করছিলাম।”
সৌরভ হালকা হেসে আরশাদ খানের পাশে বসলো। গম্ভীর হয়ে দৃষ্টি নিচের দিকে নিলো। আর এদিকে সুবহা ওর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি প্রাণেশার কাছে যাই।”
আরশাদ খান হেসে বললেন,
“যাও, বলতে হবে কেনো?”
সুবহা ধীর পায়ে উপরে এসে প্রাণেশার রুমে এলো। এসে দেখলো রোকেয়া বেগমও সেখানে। এরপরে সুবহা প্রাণেশাকে নিয়ে বের হলো। প্রাণেশা সিঁড়ি দিয়ে নামছে যেনো মনে হচ্ছে একটা পরী নামছে এতো সুন্দর লাগছে। স্নিগ্ধ মনে মনে বলল, “মাশাআল্লাহ। কি সুন্দর লাগছে। এই বউ যে এখন রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে সাথে নিয়ে যাই।”
প্রাণেশাকে সবার সামনে বসিয়ে পাশেই দাড়ালো সুবহা। আরশাদ খান সাঈদ রেজা চৌধুরীকে বললেন,
“ভাই কিছু জিজ্ঞাসা করার হলে করেন।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী হাসছেন। এরপরে বললেন,
“কিচ্ছু জিজ্ঞাসা করার নেই। মেয়ে রান্না না পারলেও সমস্যা নেই এমন কি কোনো কাজ না জানলেও আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমরা তো বউ বউ বানিয়ে রাখবো না, ধরুন ও সময় আরেকটা মেয়েই।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর দিকে তাকাতেই স্নিগ্ধ চোখ মারলো। সাথে সাথে আবার ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বসে রইলো।
বড়রা কথা বলার সময় প্রাণেশা চলে এসেছে। সাথে স্নিগ্ধ, সুবহা, সিয়ামও এসেছে। ওরা চারজনে ছাদে চলে এসেছে। সুবহা, সিয়ামকে নিয়ে একটু দূরে দাড়ালো যাতে ওরা দুজনে কথা বলতে পারে।
স্নিগ্ধ কথা কি বলবে। প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে থেকেই কুল পাচ্ছে না। এতো সুন্দর করে সেজেছে যে চোখ ফেরানো মুশকিল। প্রাণেশা হাত কচলাতে কচলাতে বলেই দিলো,
“ওভাবে কি দেখছেন?”
স্নিগ্ধ মোলায়েল কণ্ঠে বলল,
“আমার প্রাণ, আমার জান, আমার জীবন, আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম।”
এই শুনে প্রাণেশা হেসে উঠল। স্নিগ্ধ নেশালো কণ্ঠে বলল,
“উফ হেসো না বুকে এসে লাগে।”
প্রাণেশা ঘাড়টা কাত করে বলল,
“সারাজীবন এভাবেই ভালোবাসবেন তো? নাহলে কিন্তু বিয়ে করবো না।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার হাত ধরে বলল,
“তোমায় ভালোবাসার কোনো ব্যাখ্যা জানা নেই। শুধু জানি, মন থেকে ভালোবাসি আর ভালোবেসে যাবো আজীবন।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর বুকে হালকা করে মাথা ঠেকালো। স্নিগ্ধ প্রাণেশার মাথায় হাত রেখে মুচকি হেসে প্রাণেশাকে বলল,
“আমার ভালোবাসা তোমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী প্রাণেশাকে আংটি পড়িয়ে দিয়ে গেলো। আরশাদ খান সৌরভের সাথে আলোচনা করে বিয়ের ডেট ফোনে জানিয়ে দিবেন।
রাত তখন ১০ টার উর্ধে।
হামিম প্রাণেশার জন্য প্রায় উন্মাদ। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। আজকে যেই জায়গায় স্নিগ্ধ আছে সেখানে ওর থাকার কথা ছিলো। ও এই মুহূর্তে সৌরভকেই কল দিলো। কল রিসিভ হতেই হামিম বলল,
“শুনলাম তোর বোনের বিয়ে নাকি স্নিগ্ধর সাথে হবে?”
“হুমম।”
“তু্ই ওকে মেনে নিয়েছিস?”
“হ্যা নিয়েছি।”
হামিম রাগী কণ্ঠে বলল,
“কেনো রে আমি কি স্নিগ্ধর থেকে খারাপ? বিয়েটা তো আমার সাথেও হতে পারতো।”
সৌরভ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,
“দেখ, এক বিষয় নিয়ে বারবার কথা বলবি না। তোর ফ্যামিলির সাথে বিয়ের কথা হলেই যে বিয়ে হয়ে যেতো এমন কথা ছিলো না। আমরা কথা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তার আগেই প্রাণেশা ওর পছন্দ করা ছেলের কথা বলেছে। সেখানেই বিয়ে করবে।”
হামিম জোরে বলে উঠল,
“আর আমি যে ওকে ভালোবাসি সেটা? তোকে
আবারও বলছি প্রাণেশা আর স্নিগ্ধর বিয়েটা ভেঙে দে।”
সৌরভ শক্ত গলায় বলল,
“দেবো না।”
“বন্ধু এমন করিস না। আমি বাঁচতে পারবো না।”
“এসব বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না।”
হামিম রেগে গিয়ে বলল,
“তু্ই না পারলে নিজেরটা নিজেই নিয়ে নিবো। আর তোর বোনের বিয়ে তো আমি হতেই দিবো না। এমনকি আজ থেকে ভুলেও গেলাম তু্ই আমার বন্ধু।”
সৌরভ দাঁত চেপে তপ্ত স্বরে বলল,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১১
“এতে আমার বিন্দু মাত্রও আফসোস নেই। আর তুই ভালো করে জানিস আমি কেমন। তোর ছায়াও যেনো এই বাড়ির ত্রি-সীমানায় না দেখি। তু্ই আমার বন্ধু ছিলি অনেক সম্মান করেছি আজ যখন বন্ধুকে ভুলে যাওয়ার কথা বললি এরপরে শুনে রাখ, তু্ই যেমন ব্যবহার করবি তার কর্মফলও তেমন পাবি।”
বলে কল কেটে দিয়ে নাম্বারটা ব্লক করে দিলো। হামিম রাগে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে বসে রইলো। এরপরে রাগে ফুসতে ফুসতে কল দিলো স্নিগ্ধকে।
