Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ১১

মেজর কারদার পর্ব ১১

মেজর কারদার পর্ব ১১
ফিনারা ঝুমুর

গোধূলির পূর্বক্ষণ। আকাশে পেঁজা তুলোর মতো উড়ে চলেছে শুভ্র আর ধূসর রঙা মেঘমালা। সেই মেঘের ক্ষুদ্রাংশগুলো একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে আকাশের বুকে তৈরি করছে একেক ধরনের অদ্ভুত আকৃতি। জ্যৈষ্ঠ মাস প্রায় শেষের দিকে। আষাঢ় তার বৃষ্টিভেজা রূপ নিয়ে শুরু শুরু করছে কি করেনি প্রকৃতির বুকে এমন এক ছমছমে ভাব।
​রান্নাঘরে সন্ধ্যার স্ন্যাক্স বানাতে ব্যস্ত আলেয়া বানু। মেঘ চুপিচুপি যেয়ে পেছন থেকে মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল এবং তার ঘামার্ত কাঁধের ওপর নিজের থুতনিটা রাখল। অত্যন্ত আদুরে গলায় জিজ্ঞাসা করল,

​“মা, কী বানাচ্ছো?”
​আলেয়া বানু মেয়ের দিকে ঘাড় না বাঁকিয়েই কড়াইয়ে হাতা নাড়তে নাড়তে বললেন,
​“পিঠা বানাচ্ছি। অনেকে একে ডিম পিঠা বলেই ডাকে।”
​মায়ের কথা শুনে মেঘের মায়াবী শ্যামলা মুখখানা এক নিমেষে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে গেল। এই পিঠা ওর ভীষণ প্রিয়। আলেয়া বানুকে আরও জোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদ করতে করতে বলেই ফেলল,
​“ও মা! থ্যাঙ্কু, থ্যাঙ্কু–”
​কথাটা বলেই নিজের পরনের স্কার্টটা দুই হাত দিয়ে ধরে নাচতে নাচতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। মেয়ের ওভাবে আনন্দ করতে করতে যাওয়ার পানে চেয়ে আলেয়া বানু ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসলেন। নিজের মনেই বললেন,
​“পাগলী একটা–”

​পায়ের পায়েল নাচিয়ে নাচিয়ে ছন্দে ছন্দে সদর দরজা দিয়ে বাড়ির বাইরে বের হলো মেঘ। উদ্দেশ্য—ননীদের গাছ থেকে কাঁচা-পাকা আম আর কাঁঠাল চুরি করা। নিজের বাড়ির ফটক পেরিয়ে কাঁচা রাস্তায় নামতেই তার মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল রাস্তার ওপারের বাড়ির কর্ত্রী সফুরার সাথে। মাঝবয়সী স্থূলকায় গড়নের এই মহিলা দেখতে বেশ কালো বর্ণের। আজম উদ্দিনের আদুরে বউ সফুরা বিবি।
​মেঘকে ওভাবে ধৈধৈ করে নাচতে নাচতে চলতে দেখে সফুরা বিবি মাঝরাস্তাতেই ওকে থামালেন,
​“এই মেয়ে শুনো!”
​এমনিতেই এই অপছন্দের মহিলাকে সহ্য হয় না মেঘের, তার ওপর সামনে দেখে আড়ালে নিজের নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল সে। বিড়বিড় করে ওনাকে নিয়ে মনে মনে অনেক গালমন্দও করে নিল।​মহিলা সামনে এসে পান চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞাসা করলেন,
“ও মাইয়া, তুমি কিসে পড়ো?”

সফুরার এমন আকস্মিক ও অদ্ভুত প্রশ্নে মেঘের মাথার মেজাজ যেন এক লাফে সপ্তমে চড়ল। সে নিজের স্বভাবসুলভ ঝাঁঝালো গলায় সোজা মুখ ভেঙচে বলেই ফেলল,
“এই থালা-বাটির উপর চিটপটাং হয়ে পড়ি!”
​মেঘের এমন কড়া আর ঝাঁঝালো উত্তর শুনে এক মুহূর্তে থমতমে খেয়ে গেলেন সফুরা বিবি। ওনার সেই কালো মুখটা রাগে যেন আরও বেশি কালো হয়ে গেল। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
“আমি বলতে চাইছিলাম — তুমি কোন কেলাসে
পড়ো?”
মেঘ এবার কোমরে দুই হাত দিয়ে আরও চড়াও গলায় উত্তর দিল,
“তে আপনে ভালো করে বলবেন না, যে মা তুমি কোন ক্লাসে পড়ো। তাহলে আমি বলে দিতাম!”
সফুরা বিবি কিছুটা দমে গিয়ে বললেন,
“কোন কেলাসে পড়ো, মা তুমি?”
“ক্লাস এলেভেনে পড়ি–”
সফুরা বিবি ইংরেজি তেমন একটা জানেন না। তাই ‘এলেভেন’ শব্দের অর্থ বা মর্ম না বুঝে আবার হা করে প্রশ্ন করলেন,

“হ্যাঁ, কি ভেন?”
মেঘ এবার ওনার কথায় চরম বিরক্ত হলো। মুখ বাঁকিয়ে চ্যাঁত করে বলল
“আই এ পড়ি– আই এ।”
এবার যেন তিনি বুঝতে পারলেন যে সাত্তার মাস্টারের মেয়ে এবার কলেজে উঠেছে। তাই বেশ গদগদ হয়ে দাঁত বের করে জিজ্ঞাসা করলেন
“ওহ, আই এ। তা মা, তুমি বিয়া করসুনি?”
এবার মেঘের ধৈর্যের আর সহ্যের সীমার বাঁধ এক্কেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে নিজের বাজখাই গলা উঁচিয়ে চড়া সুরে উত্তর দিল,
“আফনের জামাইরে করতাম। দিবেননি, আর লগে হেতুনের বিয়া? হাসা কইতাসি, সতীন ওইয়া আই আফনেরে একটুও মাইত্তাম ন। খালি ঘরতনে বাই কইরা দিইয়াম–”

মেঘের এমন মারাত্মক আর জবরদস্ত কথা শুনে সফুরা বিবির পিলে চমকে উঠল। বলে কী এই ছুড়ি! তার ওমন চান্দের লাহান জামাইয়ের সাথে এই শ্যামলা কালীন মেয়ে নাকি বিয়া বসবে? আর বিয়া বসে ওনাকে সতীন বানিয়ে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেবে? কথাটা শুনেই ওনার মেজাজ ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গিয়েও মেঘের সেই রক্তচক্ষু আর রাগী নজর দেখে তিনি মনে মনে বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। ওনার বুকটা দুরুদুরু কাঁপতে লাগল।​তিনি দুই হাত গালে ঠেকিয়ে বলতে লাগলেন,
“ওরে আল্লাহ রে! সাত্তার মাষ্টুরের মাইয়া এত্তেন খারাইপ চইত্তের (খারাপ চরিত্রের) ক্যানে রে? এই মাইয়া যদি আমার ঘরে আইসে, তবে মোর সাজানো সংসারখান এক্কেরে চিবাইয়া খাইয়া লাইবো গো–!”
​সফুরা বিবি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিলেন না, মানে মানে ওখান থেকে হনহন করে কেটে পড়লেন তিনি। মেঘ ওনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে, পায়ের কাছে থাকা একটা ইটের কণা ওনার উদ্দেশ্যেই ‘ফিক্কা’ মেরে নিজের মনেই গজগজ করতে করতে চলে গেল ননীদের বিশাল আম আর কাঁঠাল বাগানের দিকে। এবার শান্তিমতো গাছ থেকে আম-কাঁঠাল চুরি করে নিজের পেটে চালান করবে ও।

ব্যাগপত্র গুছিয়ে আবারও নিজের চিরচেনা কর্মস্থলে ফিরে যাচ্ছে শীর্ষ। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই হেডকোয়ার্টার থেকে একটা আর্জেন্ট কল এসেছে ওর ফোনে, ওকে দ্রুত কক্সবাজারের দিকে রওনা হতে হবে। ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওখানে নাকি বড়সড় কোনো আন্তর্জাতিক আততায়ীর হামলার সম্ভাবনা রয়েছে। শীর্ষকে সেখানে সশরীরে অবস্থান করে সৈন্যদের গাইড করতে হবে এবং পুরো অপারেশনের পথ দেখাতে হবে। শুধু তা-ই নয়, কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে ইদানীং প্রচুর পরিমাণে নারী পাচার হচ্ছে; সেই চক্রের মূল হোতাদের এবং পাচারের গোপন সূত্রটাও এবার ওকে খুঁজে বের করতে হবে।
​তাই পরিবারের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের সেই রাজকীয় ‘Prado’ জিপে চড়ে বসেছে ও। গাড়িটার সামনে ও পেছনে আর্মিদের চেনা লোগো এবং সিম্বল জ্বলজ্বল করছে।​শিউলি বেগম বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ মনে ছেলের এই হঠাৎ চলে যাওয়া দেখছেন। ধীরে ধীরে মেজরের গাড়িটা রাতের অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায়। গাড়ি চালাতে চালাতে চট্টগ্রাম ও ঢাকা মহাসড়কে আসতেই শীর্ষ নিজের ব্লুটুথ অন করে কল লাগাল তার দূর দেশের সেই চঞ্চল প্রেয়সীর মোবাইলে।

​যদিও এখন ঘড়ির কাঁটায় রাত ঠিক দশটা বাজে। ওর কাছে হেডকোয়ার্টার থেকে যাওয়ার জরুরি পয়গাম এসেছিল আজ সন্ধ্যা ছটায়। চার ঘণ্টার নোটিশে সবকিছু ফেলে ও বর্ডারের দিকে ছুটে চলেছে। এটাই যেন ডিফেন্সের অফিসারদের আসল জীবন। পরিবারের সাথে দুটো দিন শান্তিতে সময় কাটানোও যেন ওদের জন্য মস্ত বড় এক দায় হয়ে দাঁড়ায়! তাও দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের সুরক্ষায় তারা এই কঠিন জীবনটাকে সবসময় হাসি-মুখে মেনে নেয়।
​মেঘের নম্বরে কল দিতেই শীর্ষ দেখাল স্ক্রিনে লেখা উঠছে ‘বিজি’। এই মাঝরাতে মেয়েটা কার সাথে যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা বলছে!​বুকের ভেতর ঈর্ষার একটা মৃদু চিমটি লাগতেই লাইনটা কেটে দিল ও। ঠিক দুই মিনিট পর শীর্ষ আবারও ব্যাক-টু-ব্যাক কল দিলে এবার ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে সেই চিরচেনা গম্ভীর ও গমগমে গলায় মেঘ প্রশ্ন করল,

​“কে বলছেন?”
​কাঁপতে থাকা হাইওয়ের বুকেই গাড়ির ব্যাক-সিটে মাথাটা একটু এলিয়ে দিল শীর্ষ। তার দুই চোখে এতক্ষণের ক্লান্তির মাঝে এক পরম প্রশান্তির দোল লাগল। সারাদিনের এত ধকল আর টেনশনের পর অবশেষে তার রানীর কণ্ঠস্বরটা শুনতে পেল সে। নিজের গলাটা একটু খাদে নামিয়ে বলল,
​“তোমার একমাত্র আশিক, বাবুর মাম্মাহ!”
​মেঘ ওপাশে চরমভাবে চমকে উঠল। সে কান থেকে ফোনটা নামিয়ে ভালো করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল এক্কেবারে অচেনা একটা নম্বর, আর ওপাশের পুরুষালী গলাটাও তার চেনা গলার সাথে মিলছে না। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
​“কী ফালতু কথা বলছেন আপনি? আসল পরিচয় দিন। কে আপনি?”
​মেঘের এমন রাগ মাখানো প্রশ্ন শুনে শীর্ষ নিজের ঠোঁটের কোণে এক তীর্যক ও মাদকতাময় হাসি হাসল। বেশ আদুরে ও ফিসফিসানি স্বরে বলল,

​“তোমার অবাধ্য মনে অলরেডি রাজ করা শুরু করে দেওয়া একমাত্র রাজা আমি, বাবুর মাম্মাহ!”
​মেঘ এবার ভীষণ রেগে গেল মাঝরাতে এমন অচেনা লোকের হেয়ালি পনা আর ফাজিলনমো শুনে। সে নিজের আঞ্চলিক টোনে চ্যাঁত করে কড়া গলায় বলে উঠল,
​“রঙ নাম্বারে কল দিয়ে পরনারীর সাথে এভাবে মজা লুটতে খুব ভালোই লাগে, তাই না? ঘরে কি মা-বোন নেই আপনার? রাস্তাঘাটের বখাটেরাই কেবল মেয়েদের এভাবে মাঝরাতে ফোন দিয়ে উত্ত্যক্ত করে!”
​“মা-বোন সবই আছে কুইন। শুধু একটা নিজের মনের মতো বউ নেই। এই মুহূর্তে একটা খাঁটি বউয়ের বড্ড অভাব ফিল করছি, মাই ব্ল্যাক ফ্লাওয়ার–”
​শীর্ষকে সে এখনও চিনতে পারেনি, তবে অচেনা কোনো পরপুরুষের মুখ থেকে নিজের প্রতি এমন অধিকার খাটানো ডায়ালগ শুনে মেঘ রাগে এক্কেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল। ওর মন চাচ্ছিল ফোনের ওপাশের লোকটাকে পুরান ঢাকার খাঁটি লোকাল গালিগালাজ দিয়ে একাকার করে দিতে, কিন্তু কেমন জানি একটা অদ্ভুত সংকোচে তা পারল না। সে রাগ সামলে নিয়ে ঝেঁঝে বলল,

​“বেশি বউয়ের অভাব ফিল করলে বাড়ির পাশের ওই বড় কলাগাছের সাথে শক্ত করে একটা দড়ি দে গা যা! গলায় ফাঁস লাগলে আর কোনোদিন অভাব ফিল করতে হবে না, ব্যাস!”
​বলেই আর এক সেকেন্ডও সুযোগ না দিয়ে ‘খট’ করে কলটা কেটে দিল ও। মেঘের এমন মুখের ওপর তপ্ত জবাব শুনে শীর্ষ গাড়ির ভেতরেই শব্দহীনভাবে আপনমনে হাসতে লাগল। তার এই শ্যামলা রাগিনীটা যে বেশ ভালোভাবেই রেগেছে, তা আর বুঝতে বাকি রইল না ওর। হাহ হাহ!
​তবে হাসির পরক্ষণেই, শীর্ষর ফর্সা কপালের রগগুলো রাগে ও উত্তেজনায় নীল হয়ে ফুলে উঠল। কোনো না কোনো গোপন সূত্রে আজ দুপুরের কলেজের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা অলরেডি মেজরের কানে এসে পৌঁছে গেছে। মেঘকে নাকি মিসির নামের এক কলেজপড়ুয়া ছেলে পুরো কলেজের সামনে হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করেছে! ছেলেটা নাকি গায়ের রঙে মেঘের মতোই শ্যামলা, কিন্তু দেখতে নাকি বেশ হ্যান্ডসাম আর সুদর্শন। আর ওদিকে শীর্ষ নিজে? সে তো ধবধবে ফর্সা, শ্বেত বর্ণের অধিকারী।

​আজ রাতে আর যাই হোক, এই হাইওয়ের অন্ধকার ওকে একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিলখুব দ্রুত, একদম চোখের পলকে এই চঞ্চল মেঘালয়াকে আইনসম্মতভাবে নিজের করে নিজের ডেরায় তুলতে হবে। যেভাবেই হোক, সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ খাটিয়ে মেজরের তকমা দিয়েই ওকে জয় করতে হবে।​স্ক্রিন অফ হওয়া ফোনটার দিকে তাকিয়ে শীর্ষ নিজের ধারালো চোয়াল শক্ত করে মনে মনে এক প্রতিজ্ঞার সুরে আওড়ে উঠল,

মেজর কারদার পর্ব ১০

​“তুমি শুধু আমারই রাগিনী, মেঘালয়া— শুধুই আমার! এই দুনিয়ার অন্য কোনো পুরুষের ছায়াও আমি তোমার ওপর পড়তে দেব না। খুব শীঘ্রই আমিই হব তোমার এই চঞ্চল দেহ আর অবাধ্য মন উভয়ের একমাত্র রাজা! একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে আজীবন রাজত্ব করব আমি তোমার ওপর!”

মেজর কারদার পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here