Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ১০

মেজর কারদার পর্ব ১০

মেজর কারদার পর্ব ১০
ফিনারা ঝুমুর

কপালে সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা অসুস্থ কিঞ্জাকে সাবধানে ধরে ধরে কারদার বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ভেতরে নিয়ে এল নিশাত। নিজের এই শারীরিক অসুস্থতা, রক্তপাত কিংবা কপালের তীব্র দপদপানি নিয়ে কিঞ্জার বিন্দুমাত্র কোনো ধ্যান বা ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সমস্ত চেতনা, সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান তখন মগ্ন হয়ে আছে কল্পনার জগতে চিরস্থায়ী বাসা বেঁধে ফেলা সেই কৃষ্ণকালো চোখের পুরুষ প্রহর ইবনাতকে ঘিরে।
​বর্তমান ঢাকাইয়া রাজনীতির অন্ধকার ও আলো—উভয় জগতের সাথেই জড়িয়ে আছে এই প্রহর ইবনাতের নাম। বাংলাদেশ আর্মির রিটায়ার্ড ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ.খ.ম তোফাজ্জল হায়দারের বড় পুত্র সে। ঢাকার রাজপথে তাকে নিয়ে চর্চা কিংবা গুঞ্জন হয় না, এমন একটা দিনও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বর্তমানে ঢাকার বুকে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা আর আলোচনার মূলে থাকেন এই প্রহর ইবনাত। বিশেষ করে ঢাকার ৬ ও ৭ নং আসন জুড়েই যেন তার একচ্ছত্র আধিপত্য ও রাজত্ব চলে।

​সমালোচনার তুঙ্গে থাকে তার একেকটা ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ড। রাজপথে মাস্তানি করা, বিরোধী দলের ডেরায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া, কিংবা ক্ষমতার দাপটে দিনে-দুপুরে কাউকে না কাউকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া এসবই যেন তার নিত্যদিনের সাধারণ ব্যাপার। তবে, তার রাজনৈতিক জীবনের বাইরেও টক অব দ্য টাউন হয়ে থাকে তার ব্যক্তিগত জীবনের এক অদ্ভুত স্বভাব। লোকমুখে জোর গুঞ্জন শোনা যায়, প্রহর ইবনাতের একমাত্র এলার্জি আর সবচেয়ে ঘৃণ্য বস্তু নাকি নারী জাতি! কোনো এক রহস্যময় কারণে সে নারীদের ছায়াও মাড়ায় না। কিন্তু এর পেছনের আসল কারণ আজ অবধি কেউ জানে না।

​প্রহরকে নিয়ে এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই নিশাতের হাত ধরে কারদার বাড়ির অন্দরে প্রবেশ করল কিঞ্জা। ড্রইং রুমে পা রাখতেই ওরা দেখতে পেল, সোফায় হেলান দিয়ে বসে বেশ আরাম করে রুপোর বাটা থেকে পান বানিয়ে খাচ্ছেন তাদের দাদি জোবায়েদা খাতুন। তিনি মূলত কদিন আগেই পবিত্র হজ্জ পালন করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, যার কারণে মেজো ভাই নিরবের বিয়েতে তিনি সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেননি। মাত্র গতকালই ঢাকা ফিরেছেন তিনি।
​হঠাৎ কিঞ্জাকে এই রক্তাক্ত অবস্থায়, কপালে ব্যান্ডেজ নিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেখে বয়স্কা এই জোবায়েদা খাতুন জিব কেটে হৈ হৈ করে এক মস্ত চিল-চিৎকার জুড়ে দিলেন। হাতের পানের বাটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ডাকলেন,

​“কৈ গো বড় বউ! কৈ গো ছুডু বউ! তাড়াতাড়ি দৌড়াইয়া আসো, দেইক্ষা যাও হাকলে! মোর নাতিনডার এই কী অবস্থা অইছে রে বাবা? মোর এমন চান্দের লাহান ফর্সা নাতিনডারে কোন হা*লার পুতে মারছে?”
​বৃদ্ধা মহিলা নিজের বাতের ব্যথা আর হাঁটুর কষ্ট এক নিমেষে ভুলে গিয়ে ত্রস্ত পায়ে ছুটে এলেন এবং জড়িয়ে ধরলেন কিঞ্জাকে। নিজের কাঁপতে থাকা বুড়ো বুকে নাতনিকে শক্ত করে আগলে ধরে একের পর এক স্নেহের চুমু খেতে লাগলেন তার পুরো আননে । জোবায়েদা খাতুনের আহাজারি দেখে মনে হচ্ছিল, কপালের এই আঘাতটা কিঞ্জা নয়, স্বয়ং তিনিই পেয়েছেন।
​এদিকে, শাশুড়ির এমন আকস্মিক ও বুকফাটা আহাজারি শুনে রান্নাঘর থেকে হাতের খুন্তি-কড়াই ফেলে ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে এলেন দুই জা—শিউলি বেগম আর পিংকি বেগম। কিঞ্জাকে শাশুড়ির বুকে ওভাবে নেতিয়ে থাকতে দেখে এবং মেয়ের কপালে ধবধবে সাদা ব্যান্ডেজ দেখে শিউলি বেগমের পায়ের নিচের জমিনটা যেন এক পলকে কেঁপে উঠল। তার বুকটা ধড়াস করে উঠল।
​“কী সর্বনাশ! আমার কিঞ্জার এই অবস্থা কী করে হলো রে?”
অত্যন্ত জিজ্ঞাসুক আর ভয়ার্ত চোখে নিশাতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন শিউলি বেগম।​নিশাত অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু হয়ে উত্তর দিল,

“আসলে আন্টি, হয়েছে কি—”
​নিশাত আর কোনো কিছু গোপন না করে ক্যাম্পাস চত্বরের সেই মুহসীন হলের মারামারি, হুট করে ককটেলের বিস্ফোরণ আর কাঠের টুকরো ছিটকে এসে কিঞ্জার কপালে লাগার সমস্ত ঘটনা এক এক করে খুলে বলল। তবে, বুদ্ধিমানের মতো প্রহর ইবনাতকে বলা কিঞ্জার সেই রোমান্টিক ও দুঃসাহসিক ডায়ালগগুলোর একটা শব্দও সে পরিবারের সামনে উচ্চারণ করল না। নিজের প্রিয় সখী ওই গ্যাং লিডার প্রহরকে কতটা পাগলের মতো চায় তা নিশাত খুব ভালো করেই জানে, কিন্তু কারদার পরিবারের সামনে এই নাম নেওয়া যাবে না। কারণ, কারদার পরিবার শুরু থেকেই নোংরা রাজনীতি আর মাস্তানি এক্কেবারে অপছন্দ করেন।

​নিশাতের মুখ থেকে মুহসীন হলের সেই কোপাকুপি আর ককটেল বাজির কথাগুলো শুনে শিউলি বেগম, পিংকি বেগম আর দাদি জোবায়েদা খাতুন যেন তীব্রভাবে চমকে উঠলেন। ঘটনা শুনে সবাই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। শিউলি বেগম আর নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না; তিনি কিঞ্জাকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। শত হোক, শিউলি যে ওর গর্ভধারিণী মা। মেয়ের শরীরে সামান্য আঁচ লাগা মানে মায়ের কলিজা ফালাফালা হয়ে যাওয়া। মেয়েরাই তো মায়ের আসল অঙ্গ, মায়ের আত্মসম্মান, তাদের জীবনের সমস্ত ব্যথা-বেদনা আর সুখের অনুভূতি—সবকিছুই তো এই কন্যাসন্তানেই শুরু আর কন্যাসন্তানেই শেষ!

কলেজ ছুটি হয়েছে মিনিট দুয়েক হলো। ছুটির ঘণ্টা বাজতেই কাঁধে ভারী কলেজ ব্যাগটা ঝুলিয়ে মুক্ত আকাশে ডানা মেলা উড়ন্ত পাখির ন্যায় একপ্রকার উড়ে উড়েই কলেজ মাঠের দিকে চলে গেল মেঘ। আজ সকালে মাঠের এক কোণে ফোটা লাল টকটকে গোলাপ আর সুবাস ছড়ানো বেলি ফুলগুলো দেখে নিজের কানের পিঠে গোঁজার জন্য বড্ড মন কেমন করছিল ওর। আজ তাই সুযোগ পেতেই ফুলগুলো ছিঁড়তে যাচ্ছে আমাদের এই চঞ্চল ম্যাডাম।​কিন্তু মাঠের এক-তৃতীয়াংশে পা রেখেছে কি রাখেনি, অমনি পেছন থেকে বেশ চড়া গলায় ওকে ডেকে উঠল কেউ,

​“মেঘালয়া–!”
​অচেনাও নয়, আবার খুব বেশি চেনাও নয়—এমন এক চেনা পুরুষালী কণ্ঠে নিজের নাম শুনে সহসাই পেছন ফিরে তাকাল সপ্তাদশী রমণী। বডিটা এক ঝটকায় ঘোরানোর সাথে সাথেই তার দীঘল কালো, হাঁটু ছাড়ানো বেণিতে গাঁথা চুলগুলোও পিঠের ওপর দোদুল্যমান দোলা দিয়ে উঠল।
​মেঘ দেখল, কিছুটা ঘামার্ত অবস্থায় ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে এই কলেজের সবচেয়ে মেধাবী ও কৃতি ছাত্র ‘মিসির হাওলাদার’। খাঁটি শ্যামবর্ণের ছেলেটি দেখতে সত্যিই খুব সুদর্শন, তীক্ষ্ণ চোখ দুটোয় চড়ে আছে একটা গোলাকৃতির চশমা। পরিধানে কলেজের চিরচেনা সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার। মেঘ বেশ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
​“কিছু বলবেন, মিসির ভাই?”
​ছেলেটিকে ‘মিসির ভাই’ বলার কারণ হলো, সে এবার উচ্চমাধ্যমিকের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। এই তো আগামীকালই কলেজে ওদের বিদায় অনুষ্ঠান বা ফেয়ারওয়েল। এর পরপরই ওদের ফাইনাল বোর্ড পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।​মেঘের প্রশ্ন শুনে মাথা ঝাঁকাল মিসির। মাথার অবাধ্য বাবরি চুলগুলো ঝাঁকুনির চোটে ওর ফর্সা কপালের ওপর এসে জায়গা করে নিল। সে চোখের চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে বলল,
“তোমাকে একটা জরুরি কথা বলার ছিল, মেঘালয়া।”
​“কী কথা?”

​মেঘের এমন জিজ্ঞাসু প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই, সবার চোখ ছানাবড়া করে দিয়ে মিসির সোজা মেঘের সামনে মাঠের ঘাসের ওপর এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল! তার দুই হাতে ধরা এক মস্ত বড় শুভ্র বেলি আর লাল গোলাপের চোখ ধাঁধানো ফ্লাওয়ার বুকে । সে মেঘের মায়াবী মুখের দিকে এক অপলক, সহাস্য নয়নে তাকিয়ে অত্যন্ত ধীর কিন্তু তীব্র অনুভূতিপূর্ণ গলায় আবৃত্তি করার মতো করে বলে উঠল,
“তোমার ওই ভাসা ভাসা নয়নে দেখেছিলুম নিনের সর্বনাশ। স্বপ্নে বুনেছি এক গৃহাবাস। যার কর্ত্রী হয়েছিলে তুমি আমার – মেঘালয়া। হবে কি আমার মনের রানী? এবার-ওপার দু’পারের জীবনসঙ্গিনী? ভালোবাসি তোমায় – আমার আরণ্যি!”
মিসিরের এমন ঘোর লাগা, আবেগ মাখানো প্রেমের কবিতা শুনে মাঠের চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়ানো কলেজের অন্য সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা একসাথে জোরে হাততালি দিয়ে উঠল। পুরো মাঠ যেন করতালিতে মুখরিত হয়ে গেল। সবাই এখন অধীর আগ্রহে চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে মেঘের উত্তর শোনার জন্য। কারণ, মিসির হাওলাদারের মতো কৃতি ছাত্র পুরো কলেজের সম্মুখে দাঁড়িয়ে তাকে প্রপোজ করেছে!
​মেঘ এত মানুষের সামনে এমন কাণ্ডে কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলেও, পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টুমিভরা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে এক হাত কোমরে রেখে, পুরান ঢাকার সেই নিজস্ব দেহাতি টোনে মিসিরকে মুখের ওপর রিজেক্ট করে দিয়ে বলল,

“দুঃখিত, মিসির ভাই। মুই বিয়াইত্তা। আইজ বাদে কাইল মোর বাইচ্চা অইবো। এই দেহেন, মুই চার মাইসসা পোয়াতি মানু। মোরে আফনে প্রেম প্রস্তাবদিসেন হুনলে, মোর জামাই আফনেরে গাইড়া থুইবোবাঁশ বাগানে। আফনেই লাইজ্ঞা মোর মেলা দুক্ষু লাগতাসে।মাগার কিতা করতাম? মুই যে বিয়াইত্তা।
আর ছ’ডা মাস আগে আইলেইন মুই আন্নের প্রেম প্রস্তাব মাইন্না নিতাম। ওহন মুই পাইত্তাম না।”
মেঘের মুখে নিজের ‘চার মাসের পোয়াতি’ হওয়ার এমন আজব আর কাল্পনিক উত্তর শুনে মিসিরের মুখে কোনো বেদনার কালো ছাপ দেখা গেল না। উল্টো এক চিলতে মুচকি হাসি দেখা গেল তার ঠোঁটের কোণে। সে যেন আগে থেকেই খুব ভালো করে জানত, এই চঞ্চল আর ঠোঁটকাটা মেঘালয়া এমনই কোনো অদ্ভুত উত্তর দিয়ে পরিস্থিতি হালকা করবে। তাই সে সবরকম প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে।
​সে হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থা থেকেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমি যে এক্কেবারে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলছ, তা আমি খুব ভালো করেই জানি মেঘালয়া। তোমার ব্যাপারে সব খোঁজখবরই নিয়ে তবেই আমি আজ এখানে এসেছি। তবে চিন্তা করো না, তোমায় আমি কোনো জোর করব না। কিন্তু, আমি আজীবন তোমার জন্য অপেক্ষা করবকারণ তুমিই আমার জীবনের প্রথম প্রেম, প্রথম অনুভূতি আর প্রথম ভালোবাসা।”
​মিসির সামান্য থামল। নিজের হাতের সেই সুদৃশ্য ফুলের বুকেটটার দিকে ইশারা করে ম্লান গলায় বলল,

“ফুলের বুকেটা অন্তত নিলে আমার খুব ভালো লাগত।”
​মেঘ এবার নিজের মুখের সেই চঞ্চল হাসিটা এক নিমেষে মুছে ফেলে বড্ড সিরিয়াস আর গম্ভীর গলায় বলল,
“প্রস্তাব যখন আমি একবার সোজাসুজি ফিরিয়ে দিয়েছি মিসির ভাই, তখন এই ফ্লাওয়ার বুকে নিয়ে আপনার মনে অহেতুক নতুন আশা জাগানো বড্ড অনুচিত হবে। তাছাড়া, অন্য কোনো পরপুরুষের দেওয়া কোনো কিছুই আমি হাত পেতে নিই না। আর হ্যাঁ—আমার জন্য অপেক্ষা করে নিজের মূল্যবান জীবনটা নষ্ট না করে জীবনে এগিয়ে যান। আমি আপনার নয়, এই দুনিয়ার আর কোনো পুরুষেরই কোনোদিন হব না! পুরুষদের এই তথাকথিত ভালোবাসাকে আমি মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। আমার কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই, ব্যাস!”
​মেঘের এমন কঠিন আর বরফশীতল কথা শুনে মাঠের কোলাহল এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে গেল। মেঘ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, ফুলগুলো না নিয়েই ত্রস্ত পায়ে মাঠ পেরিয়ে কলেজ গেইটের দিকে হেঁটে চলে গেল। তার পিছু পিছু দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল ওর তিন বান্ধবী—ফাতিহা, রাইসা আর তানিয়া। চারজন রমণীর মুখই এখন থমথমে।​তবে, মেঘের এই সরাসরি প্রত্যাখ্যান বা ‘পোয়াতি’ হওয়ার বানাওট গল্পে মাঠের কেউ যতটা না অবাক হয়েছে, তার চেয়েও শত গুণ বেশি মেঘের শেষের ওই মারাত্মক তিনটি লাইন মিসির হাওলাদারের হৃদয়ে এক বিশাল প্রশ্নের দোলা দিয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল মেঘের চলে যাওয়ার পথের দিকে। কেন এই সতেরো বছরের মেয়েটা পুরুষজাতির ভালোবাসাকে এতটা ঘৃণা করে? এর পেছনে কোন অতীত লুকিয়ে আছে?

কিঞ্জা চুপচাপ বসে ছিল ঘরের বিশাল জানালার পাশে। তার দুই নয়ন বেয়ে হাপুস নয়নে জল গড়িয়ে পড়ছে, পলকহীন চোখে সে চেয়ে আছে বাইরের সুনসান সড়কটার পানে। মন যেন চাতক পাখির মতো খুঁজছে কোনো এক কাঙ্ক্ষিত মানুষকে। ঠিক তখনই, দূর সড়কের মোড়ে চেনা সেই বলিষ্ঠ অবয়ব আর কাঙ্ক্ষিত মানবকে দেখামাত্রই কিঞ্জার হৃদস্পন্দন যেন এক ধাক্কায় চলকে উঠল। বুকের ভেতর আনন্দের এক তীব্র হিল্লোল বয়ে গেল।
​সে আর এক মুহূর্তও সেখানে বসে থাকতে পারল না। চোখের পানি মুছে ত্রস্ত পায়ে একপ্রকার দৌড়েই বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। সারা বাড়ি যেন মুহূর্তে মুখরিত হয়ে উঠল কিঞ্জার পায়ে পরা সোনার নূপুরের মিষ্টি রিনিঝিনি শব্দে। নূপুরের প্রতিটি ঘুঙুর যেন এক একটি রোমান্টিক ছন্দে নেচে নেচে কিঞ্জার ব্যাকুল মনের জানান দিচ্ছিল।

​ঘর ছেড়ে লম্বা করিডোর পেরিয়ে, পেছনের বাগান ধরে মূল ফটকের কাছাকাছি আসতেই হুট করে থমকে দাঁড়িয়ে গেল কিঞ্জা। তার ভেতরের সমস্ত উৎসাহ আর উন্মাদনা এক সেকেন্ডে রূপ নিল এক অজানা ভয়ে। সে কিছুটা ভীত ও চকিত চোখে দেখল—ওর ঠিক সামনেই সিংহমূর্তিতে দাঁড়িয়ে আছে ওর নিজের আপন বড় ভাই মেজর শীর্ষ! তবে শীর্ষ তাকে দেখেনি, সে পিছনমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কড়া নজর ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির ওপর।​ফটকের একদম কাছে আসতেই কিঞ্জার কানে এসে বাজল শীর্ষর সেই চিরচেনা গম্ভীর ও তীক্ষ্ণ কণ্ঠের আওয়াজ,

মেজর কারদার পর্ব ৯

​“আসন্ন এমপি প্রহর ইবনাতের মনে আছে এই অধম শীর্ষর কথা? আমি তো ভাবলাম প্রমোশন আর ক্ষমতার দাপটে শীর্ষ নামে যে এই দুনিয়ায় কেউ একজন রয়েছে, তাকে বুঝি ভুলেই গেছেন মাননীয় মহাশয়!”
​শীর্ষর এমন বাঁকা চোখে ভ্রু নাচানো আর খোঁচাপূর্ণ কথা শুনে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরের সেই চেনা সুদর্শন শ্যামা গালে এক চিলতে চওড়া ও নিখাদ ভালোবাসার হাসি ফুটে উঠল। সে রাজনীতির সমস্ত গাম্ভীর্য আর দেমাগ একপাশে সরিয়ে রেখে, এক ঝটকায় এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল তার খুব কাছের, এই বাল্যকালের প্রাণের বন্ধুটিকে।​শীর্ষর চওড়া পিঠে হাত রেখে হাসতে হাসতে প্রহর অত্যন্ত আবেগঘন গলায় বলে উঠল,
​“তোকে কি করে ভুলি বল শীর্ষ? এই পুরো দুনিয়ায় তুই ছাড়া এই প্রহর ইবনাতকে এত গভীরভাবে আর কে চেনে রে?”

মেজর কারদার পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here