Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ৮

মেজর কারদার পর্ব ৮

মেজর কারদার পর্ব ৮
ফিনারা ঝুমুর

কারদার বাড়ির সদর দরজায় তখন এক বিদায়ের সানাই বাজছে। প্রথমে বাসে করেই সবার খুলনা যাওয়ার কথা থাকলেও, মেঘের বড় ভাই নোমান শেষ মুহূর্তে বড় একটা আরামদায়ক মাইক্রোবাস ভাড়া করে দিয়েছে। দূরপাল্লার জার্নিতে মা-বাবার যেন কোনো কষ্ট না হয়, মূলত সেই চিন্তাতেই এই ব্যবস্থা। তবে নোমান নিজে ওদের সাথে যেতে পারছে না। সে পেশায় ডাক্তার, আর একটু আগে হসপিটাল থেকে একটা ইমার্জেন্সি কল আসায় ব্যাগ গুছিয়ে সে তড়িঘড়ি করেই ডিউটিতে ছুটে গেছে। কী এক ক্রিটিক্যাল অপারেশন নাকি এসেছে, তাই বোন আর বাবা-মাকে বিদায় জানানোর ফুরসতটুকুও তার ভাগ্যে জোটেনি।
​কারদার বাড়ির বিশাল মেইন গেইট গলে একে একে আবু সাত্তার, আলেয়া বানু আর অভ্র বেরিয়ে এসে গাড়ির দিকে এগোতে লাগলেন।​পিংকি বেগম আলেয়া বানুর হাত দুটো শক্ত করে ধরে ছলছল চোখে বললেন,

“আবার আসবি তো আপা? এভাবে এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছিস, বাড়িটা পুরো ফাঁকা লাগছে।”
আলেয়া বানু পিংকির হাতে আলতো চাপ দিয়ে সান্ত্বনার সুরে বললেন,
“আসবো রে আসবো। তোরা এত মায়া বাড়ালে কি থাকা যায়? সুযোগ পেলেই আবার ছুটে আসবো।”
​ওদিকে গাড়ির দরজার কাছে মেঘকে দুই পাশ থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে কিঞ্জা আর মিথিলা। বাগানের কাদায় পড়ে ভূত সেজে গেলেও, মেঘ এখন একদম ফ্রেশ হয়ে হালকা বেগুনি রঙের একটা সুতি সালোয়ার-কামিজ পরে এসেছে। চুলে আলগা খোঁপা, মুখখানা একদম মায়াবী।​মিথিলা মেঘের গাল টেনে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আবার আসবি তো আমাদের কাছে? খুলনা যেয়ে নতুন ফ্রেন্ড বানিয়ে আমাদের এই ঢাকার বোনদের ভুলে যাবি না তো, মেঘ?”
মেঘ ওদের এমন ব্যাকুলতা দেখে মন খুলে হাসল। কিঞ্জা আর মিথিলা বয়সে ওর চেয়ে বড় হলেও এই কদিনে ওরা একদম সমবয়সী বন্ধুদের মতোই মিশেছে ওর সাথে। মেঘ ওদের জড়িয়ে ধরে বলল,
“একদম ভুলব না! নিশ্চয়ই আসবো। আর শুধু আমি কেন, তোমরাও কিন্তু সময় করে আমাদের খুলনার বাসায় আসবে। অনেক মজা করব আমরা!”

​একে একে সবাই মাইক্রোবাসে উঠে বসল। অভ্র সামনের সিটে আর মেঘ মা-বাবার সাথে পেছনের সিটে গিয়ে জায়গা নিল। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিতেই মেঘ জানলা দিয়ে মাথা আর হাত বের করে চিল-চিৎকার দিয়ে বাকিদের টাটা দিতে লাগল। গাড়িটা ধীরগতিতে কারদার বাড়ির গলি পেরিয়ে মেইন রোডের দিকে এগিয়ে চলল।
​গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই বাড়ির অন্য মেহমান ও বড়রা এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্দরের দিকে পা বাড়ালেন। কিন্তু একজন চট করে ভেতরে গেল না। সে এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে মেঘের ওই জানলা দিয়ে হাত নাড়ার দৃশ্যটাই গিলছিল।
​সে আর কেউ নয়, স্বয়ং শীর্ষ! মেঘ চলে যাচ্ছে আর সে কারদার বাড়িতে বসে আঙুল চুষবে—তা তো হতেই পারে না! মেঘের গাড়িটা হাইওয়ের দিকে মোড় নিতেই শীর্ষ আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে গ্যারেজ থেকে তার চরম প্রিয় ও অতি পারফেক্টিভ কালো কুচকুচে Bugatti ব্র্যান্ডের সুপারবোটিক হাই-পারফরম্যান্স বাইকটা স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের এক তীব্র গর্জন তুলে, চোখে সানগ্লাস এঁটে সে চোখের পলকে কারদার বাড়ির গেইট গলিয়ে রাজপুত্রের মতো বেরিয়ে পড়ল।

​তার মেঘমালা ঢাকার হাইওয়ে ধরে খুলনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর মেজর শীর্ষ তার সেই ব্ল্যাক ডেভিল বাইক নিয়ে মেঘেদের গাড়ির ঠিক পেছনে পেছনে এক অদৃশ্য ও দূরপাল্লার প্রহরীর মতো পিছু নিল।
মেঘ একদম জানতেও পারল না যে, তার জন্য কোনো এক পাগল প্রেমিক আজ হাইওয়ের বুকে পাগলা ঘোড়ার মতো তার গাড়ির পিছু পিছু ছুটছে। বয়সে যে তার থেকে গুণে গুণে পুরো চৌদ্দ বছরের বড়—বাংলাদেশ আর্মির সেই রাশভারী, কঠোর মেজর শীর্ষ! সে কিনা আজ নিজের সব গাম্ভীর্য বিসর্জন দিয়ে নিজের হাঁটুর বয়সী এক সপ্তাদশীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে! আচ্ছা, শীর্ষ কি মেঘকে আগে থেকেই মনে মনে ভালোবাসত, নাকি এই অল্প কদিনের চঞ্চলতা আর হট পিক ফানের জটলা থেকেই ইদানীং এই তীব্র অনুভূতির তৈরি? মেজরের মনের সেই গোপন খবর বোঝা বড্ড মুশকিল বইকি!
​মেঘেদের মাইক্রোবাসের পেছনে নিজের ব্ল্যাক ডেভিল বুগাডি বাইকটা ঝড়ের গতিতে ছুটিয়ে যেতে যেতে শীর্ষর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মরিয়া হাসি ফুটে উঠল। সে হাইওয়ের সাঁ সাঁ বাতাসের বুকে বেশ জোরেই ব্যক্ত করে ফেলল তার মনের কিছু তীব্র, অব্যক্ত অনুভূতি,

“আজ তোকে যেতে দিচ্ছি। ঠিক বিশ দিনের মাথায়
তোকে আমার ঘরে এনে তুলবো, প্রাণপাখি। এনেই
তোকে সিক্ত করবো আমার প্রেমের বর্ষণে।”
মাথায় ফুল-ফেস হেলমেট পরা থাকার কারণে যদিও তার এই তপ্ত কথাগুলো বারবার হেলমেটের ভেতরের কাঁচেই বাড়ি খেয়ে ফিরে এল, হাইওয়ের উন্মুক্ত বাতাসে অতটা ছড়াতে পারল না। কিন্তু মেজরের এই রাজকীয় প্রেমের সাক্ষী হয়ে রইল ঢাকা-খুলনা হাইওয়ের দুই পাশের বিস্তীর্ণ প্রকৃতি আর দুপুরের তপ্ত আকাশ।

​ওদিকে চলন্ত গাড়ির পেছনের সিটে বসে জানলার কাঁচের সাথে নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে উদাস হয়ে চেয়ে আছে মেঘ। তার চোখের সামনে বারবার ভাসছে এই কদিনের কাটানো সব ছেঁড়া ছেঁড়া স্মৃতি। কিন্তু সেসব স্মৃতির ভিড়ে কোনো এক অযাচিত, অদ্ভুত কারণে মেঘের মনের পর্দায় হুট করেই ভেসে উঠল শীর্ষর সেই গম্ভীর চেহারাটা! সুইমিংপুলের পাশে একহাতে পুশ-আপ করা সেই সুঠাম কামানো শরীর, কাদার গর্তে তার গালের সাথে নিজের গাল ঘষে দেওয়ার সেই তীব্র পুরুষালী আদল আর ড্রেসিংটেবিলের আয়নার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া!

মেজর কারদার পর্ব ৭

​স্মৃতিটা মনে আসতেই মেঘের ভেতরের মনটা কেমন যেন এক অজানা ব্যাকুলতায় অশান্ত হয়ে উঠল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হলো, যার আসল মানে বা অনুভূতিটা এই সতেরো বছরের অবুঝ মেয়েটা নিজেই কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না!

মেজর কারদার পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here