রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৩
সোহানা ইসলাম
রাতটা জমজমাট—মোটরহর্নের শব্দ, দোকানিদের হাসি আর পথজিবির কোলাহল। “রিভারভিউ ডাইনার”-এর বাইরে দাঁড়িয়ে তারা দুজন; মিসরার আলোয় জারার চুলে সোনালি ঝিলিক, আরমান পাশেই—হাতে হেলমেট, চোখে অদ্ভুত এক নিবিড়তা। খাবার শেষ, হাসি-কাটা কথা শেষ—বাইকে উঠবার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
জারা পাশের ছোট দোকানের সামনে বাইকে উঠে বসে আছে। মানচিত্রের মত অচেনা একজন লোক একটু প্রায়োগিকভাবে তার দিকে তাকাতে থাকে। শুরুতে জারা দেখেও মুচকি হাসে।কিন্তু নিকাপ পড়ার কারণে বোঝা যায় না—ভিড়, প্রত্যক্ষ মানুষের ছড়াছড়ি—সবকিছুতেই সে অনড়। কিন্তু লোকটার দৃষ্টি বদলভাবে গভীর হয়ে আসতেই জারার ঘাড়টা কনকনে কাঁপে; কোনো অস্বস্তির ছোঁয়া আসে। লোকটা একটানা তাকিয়ে আছে—কিছু বলতে না পারা নির্লজ্জ তাকানো।
আরমান সেটাই প্রথম বুঝতে পেরে নিজের ভিতরের এক ভিন্ন অনুভূতি টের পায়। ভালোবাসা তার রগগুলোতে উঠে আসে—এটা কোনো সাধারণ উপদ্রব নয়। এই লোকটা যেভাবে তার স্ত্রীকে দেখছে, সেই দৃষ্টিই আজ আর অন্য কোনো মানুষের চোখে পড়ে। আরমান কোন কথা না বলেই সামনে থেকে ধীরে এগিয়ে আসে। লোকটা তাকে দেখে হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, কিন্তু তবু কণ্ঠে কোনো অনুঘটক শব্দ নেই—মাত্র মৃদু অস্বস্তি এক নিমিষে ছড়িয়ে পড়ে।
আরমানের কণ্ঠে তীব্রতা নেই, বরং ঢেউ ওঠা শান্তিকেই ঘিরে আছে। তার গলা এমন—নরম, কিন্তু অচেনা দৃঢ়তায় ঘিরে আছে:
__ “ভদ্রভাবে বলছি—আপনি আমার বউয়ের দিকে যেভাবে তাকাচ্ছেন, সেটা আমার কাছে ঠিক লাগে না। অনুগ্রহ করে, আপনার দৃষ্টি সরিয়ে নিন, না হলে দেখার জন্য আপনার মূল্যহীন চোখ দুটু আর থাকবে না। ”
লোকটা, যে অদ্ভুতভাবে আগে চুপচাপ ছিল, এখন হকচকিয়ে করে ধীরে ধীরে মাথা নামায়। আরমানের ভেতরের সেই পোড়ানো আগুন ভাঙতে চায় না; সে কোনো ভঙ্গিতে অশোভনতা দেখায় না, শুধু বলেছে—একটা স্পষ্ট নিয়ম। জনতার ভিড়ে বহু চোখ তাদের দিকে তাকালেও কেউ কেউ বুঝতে পারে এখানে কোনো পরিস্থিতি গম্ভীর হয়ে ওঠার উপক্রম ছিল।
আরমান কেবল্ হাসলো না—তার চোখে মৃদু মায়া মেশা গম্ভীরতা। সে কাছে এসে হেলমেট খুলে জারার কপালে হালকা চুমু দিলো, মিশে দেওয়া উষ্ণ একটা শব্দ ছুঁড়ে বলল,
__ “ভয় করিস না—আমি আছি তো লক্ষী বউ।”
আরমান কাঁধ একটু নওঁড়ায়—এখানে কোনো নাটক নেই, স্রেফ এক অটল প্রতিজ্ঞা।
আরমানের চোখে—যে আগুন আগেই জ্বলছিল—ঠিক তখন আরও কিছুটা তীব্রতা জেগে উঠল। সে লোকটা সরে গেল, তবে রেশ রয়ে গেল। জনতার কোলাহল আবারও তাদের চারপাশে ডানা মেলল; তারা দুজন একে অপরের দিকে ফিরে দাঁড়ালো। হঠাৎ করে লোকটা কোথা থেকে যেনো এসে জারা’র হাত ধরে ফেলে।
জারা ভয় পেয়ে আরমানের শার্ট ধরে ফেলে।এবার আরমানের অনেক রাগ উঠে যায়। এই জানোয়ারের বাচ্চা তার ফুল কে স্পর্শ করছে।জারাকে লোকটার কাছ থেকে ছাড়িয়ে আরমান ঘুষি মারে লোকটার নাকে। হুট করে লোকটার আর আরমানের মাঝে হাতাহাতি শুরু হয়।জারা ভয় পেয়ে যায়। আরমানকে আটকাতে বলক
__“ এখান থেকে চলোন স্বামীজান!”
আরমান বলল, কণ্ঠে কড়া শান্তি রেখে।
__“বাইকে উঠে বস ।”
জারা হাঁটু ভেঙে দাঁড়িয়ে থেকে তার দিকে এক মুহূর্ত দেখে—চোখে সে খারাপটি দেখেছে, স্বর থেকে ঝরেছে।
__ “না আপনি আসুন আমার সাথে ,” সে বলল, কণ্ঠটা কাঁপছিল
__“ বউ তুই সর সামনে থেকে! ”
—“আমি বলছিলাম ওনাকে ছাড়ুন। আপনি তো ওনার মতোই করেছেন। ছাড়ুন ।”
আরমান কাঁধ একটু তুলে দিল।চিৎকার করে বলে
___ “তোর দিকে কেউ খারাপভাবে তাকালে আমি চুপ বসে থাকতে পারি না মানজারা।একে আমি আজ খুন করে ফেলব।”
তার কথাটা শোনার সময়েই জারা শক্ত হয়ে উঠল। মুখে লাজুক এক ঝলক, গলায় ভেসে উঠল এক রাগিনিটা—রাগ কিন্তু প্রেমেরই ছিল। সে এক মুহূর্ত ভাবলেই চলল, তারপর অচেনা তাড়নায় আঙুলে ঠেস দিয়ে দিল—ঠাসস করে—আরমানের গালে একটা চিলতে থাপ্পড়! ভিড়ের মাঝেও শব্দটা পাথরের মতো খাঁকাশ করে উঠল।
সবাই চুপ। আরমান প্রথমে আচমকা থমকে গেল, তারপর তার মুখে অদ্ভুত এক ধোলাইয়ের রঙ নেমে এলো—অবাক লাগানো, নির্ধারিত, কিছুটা লজ্জাও।
___ “মানজারা!” ওর কণ্ঠে কেঁপে ওঠা কোনো বন্দী শব্দ ছিল, কিন্তু সে স্থির ছিল—চুপ।
জারা ধাক্কা খেয়ে উঠে দাঁড়াল, কাঁধে হালকা আগুন।
___“বাইকের কাছে যা, আর একবার মারপিট করলে পিঠের ছাল তুলে নিব।” জারা বলল, কণ্ঠ শক্ত তার।
__“ কি বললি বউ তুই?”
__“ বাইকের কাছে যাবি, নাকি দিবো
ইচ্ছে মতো? ”
জারা’র দমকে আরমান থামে না বরং আবার লোকটার দিকে তেড়ে যায়। লোকটা মার খেয়ে হ্যাং আউট হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। জারা,আবার বলে আরমানকে
—“আমি বলছি না থামতে । বলছি না—ওকে ছাড়ার জন্য । এখানে মাস্তানী করতে এসেছি ।”
আরমান একদম থামল না। ওর ভেতরে কোনো কুয়াশা ছিল—ভালোবাসা আর রাগের মিশেল, দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ, আর সে নিজের হাতে তা সামলাতে পারছিল না।
___“ওই লোকটা তোর দিকে… তোর দিকে খারাপ ভাবে… ?” ওর কণ্ঠ কাঁপল, চোখে আগুন আবার সোজা আগুন।
__” চুপ….!”
__“ আমি ওকে…!”
__“ এখন কিন্তু আমি তোকে খুন করে ফেলব ! ”
আরমান বোঝে যায় বউ রেগে গেছে, তাই মিনমিন করে বলে,
__“আর করব না লক্ষী বউ! শান্ত হও সোনা !”
জারা কে থামাতে বললেই আরমান লোকটার দিকে আঙ্গুল তাক করে আরও জোরে বলল
—“ জানোয়ারের বাচ্চা তোকে দেখে নিব! শুধু বউ টা শান্ত হোক আগে! ”
এবার জারা আবার ঠাস করে থাপ্পড় দিল, পুরনো বাল্যকালের মতো সরল হয়ে যায় আরমান।
__“ কি কপাল আমার? রাস্তা ঘাটেও এখন বউয়ের হাতে মার খেতে হয়! ”
ভিড়ের আলোয় সে নিজেকে ক্ষুদ্র কিন্তু দৃঢ় মনে করল—নিজের ন্যায় প্রতিষ্ঠার ছোট্ট কটেজ। কেউ কিছু বলে না।
তবে এই থাপ্পড়গুলো আরমানকে চঞ্চল করে তুলল না; বরং ওর ভেতর থেকে অন্য রকম একটা সঙ্গত প্রতিক্রিয়া উঠল—দায়বোধ, হৃত্ত্ব। সে এক ঝটনায় এগিয়ে গিয়ে জারার হাতে জোর করে ধরে ফেললো—হাত ধরে টানার আগে, হাতটাকে নিজের বাম হাতে আঁকড়ে রাখতেই তাতে কাঁচের ধারার মতো কিছু লাগল—তিব্র ব্যথা। জারা চমকে উঠল। হাত থেকে লালচে স্রোত ঝরে পড়ল কাগজের ওপর যেন ছটা লাল কালি।
রক্তটা খুব বেশি নয়—কিন্তু যথেষ্ট ছিল দেখা যায়, জীবনটা ছোটলোকের অনুধাবনে। আরমানের চোখে সেই রক্তটা ভাসাতেই ভর করে একটি বিচলিত, ভীতশূন্য শব্দ বেরিয়ে এল জারা’র মুখ থেকে
—“আহ!”
আরমান কাঁপা কণ্ঠে বলল,
__“বউ তোর তো হাত থেকে —?”
জারা একটু থরথর করে কাঁপল; কোনো কষ্ট, হঠাৎ হলেও নিজের দেওয়ানের মতোই ঝিমকে উঠল।
__ “তুই কেন গেলি?”
তার কণ্ঠে অসমাপ্ত একটা বাক্য থেমে গেল। সে হাতটা টেনে নিল—দুটি আঙুলের মাঝ থেকে লাল রক্ত ঝরছিল, কিন্তু সে হাসতে চেষ্টা করল—হাঁচকি মিশানো।
__ “বাদা দিচ্ছিলাম তো—কেন এভাবে আবার তেড়ে গেলেন?” সে বলল, কণ্ঠ জবুথবু।
আরমান এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ সে বুজলো তার এই পাগলামির জন্য আবার তার লক্ষী বউটা ব্যথা পেয়েছে। বাম হাতের কাটা স্থান থেকে রক্ত বের হতে দেখে আরমান অনুসুচনা নিয়ে বলে
___“ আমি দুঃখিত, লক্ষী বউ। আমার জন্য তুমি আবার ব্যথা পেলে।সরি সোনা।আর তেমার কথা অমান্য করব না। ”আরমানের চোখ ছলছল হয়ে আসে।
জারা কাঁধ চেপে ধরে একটু দূরে সরে গেল—নিচে আঙ্গুল দিয়ে রক্তটা নেভানোর চেষ্টা করল, হাতের মোচড় ঘাড়ে তুলল। নীরবতা দুজনকে আলিঙ্গন করে নিল। জনতার দৃষ্টি তাদের দিকে, কেউ কেউ ওদের দিকে ফিসফিস করে—কী যে ঘটেছিল তা বুঝে উঠছে।
আরমান কাঁদছেননি; সে শুধু কাঁপছিল—মনে হচ্ছিলো হাজারটা কথা, কিন্তু সবগুলোই গলার কাছে আটকে আছে। হঠাৎ সে জাল করে একটুখানি হাসি করল—মনে হলো হাসিটা ভাঙ্গা বৃত্ত। ওর কণ্ঠে ভেসে উঠল,
__“আমি বোকা—তুই আমাকে মারলি, আমি থামিনি । আমাকে আর দুইটা থাপ্পড় দিতি বউ।”
তার হাতে একটা অনিশ্চিততা, একটা লজ্জা—কিন্তু সে আবার বলল,
__“ব্যথা করছে বউ?”
__“ থাপ্পড় গুলো জোরে লেগেছে স্বামীজান ? ”
__“ যেই হাত? এই নরম হাত দিয়ে একটা পোকাও মরবে না। সেখানে থাপ্পড় জোরে লাগবি কি করে? ”
আরমানের কথায় জারা হাসে। জারা’র হাসির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। জারা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখে আরমানও হাসে।
__“ হাসছেন কেনো স্বামীজান?”
__“ হাসচ্ছি, কারণ আমার চোখের সামনে যে আমার লক্ষী বউ টা হাসচ্ছে। তার হাসিতে আমার শান্তি! ”
লজ্জা পেয়ে যায় জারা। আরমানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জারা নিশ্বাস ফেলল। ভিড়ের গুঞ্জনের মধ্যেও তার কণ্ঠ একটা কঠিন নির্দেশ হয়ে উঠল।জারা আরমানের হাত ধরে বাইকের কাছে নিয়ে আসে।
—“এমন টা আর কখনো করবেন না! ”
আরমান শব্দহীনভাবে মাথা নীচু করল। লোকটি—যাকে তিনি ঠেকিয়েছিলেন—দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, পরিস্থিতি শান্ত। দোকানদার আশেপাশে হেঁটে এসে একটি কাপ পানি আর ব্যান্ডেজ দিয়ে দিল। আরমান জারার হাত ধীরে ধীরে হাত ওয়াশ করল, ব্যান্ডেজটা বাঁধতে লাগল। আরমানের হাত তখনও কাঁপছিল, কিন্তু কোনো কথাই বলতে পারছিল না।
কয়েক মিনিট থেমে দুজনেই মানুষটা—কতক্ষণেই যেনো স্বাভাবিক মুখ ফিরিয়ে নিল। তারপর আরমান মনে করিয়ে দিল—ভেতর থেকে কষ্ট এসে খেলো। সে কন্ঠ কমিয়ে বলল,
__“আর করব না বউ?”
জারা মোটা নিশ্বাস নিয়ে কর্ণপাত করল,
__“ এমন টা দ্বিতীয় বার করলে খবর খারাপ করে ছাড়ব, মনে রাখবেন।”
তার কণ্ঠে রাগ ছিল, কিন্তু চোখে ছিল গভীর ভালোবাসা—এক রকম উষ্ণ পদে বেঁধে থাকা ব্যথা।
__“ মনে থাকবে রানী সাহেবা আমার! ”
আরমান চুপচাপ হাত বাড়িয়ে তার কাছে একটি ছোট্ট প্যাকেট বের করল—হাত কাঁপছিল, কিন্তু চাহনিতে অদ্ভুত এক আশঙ্কা মিশে।
___ “নিন রানী সাহেবা এটা আপনার জন্য! ,” আরমান বলল।
জারার চোখ কৌতূহলে ফুলে উঠল; ব্যান্ডেজ করে রাখার জন্য তার হাতে আরমান হালকা করে ধরিয়ে দিল।
জারা হতভম্ব হয়ে প্যাকেটটা নিল। ভিতরে ছিল—একটি খাঁপা কাগজে মোড়ানো ডায়েরি আর একটি পাতলা, নিচু গোল্ডেন-টিপ পেন। ডায়েরিটা তার চোখে পড়ে যেন একরাশ নিঃশব্দ স্মৃতি; পেনটা—হল রকমের রকম। জারা ধীরে ধীরে উরুস্নেহে প্যাকেট খুলল।
___“এটা?”
সে প্রশ্ন করল—কণ্ঠে কৌতূহল, কিন্তু চোখে কোনো সন্দেহ-সমেত। আরমান একটি দীর্ঘশ্বাস নিল—তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল
—“হ্যাঁ। আমি যখন কাজে ব্যস্ত থাকব তখন, তোমার ইচ্ছে, শখ, আবদারগুলো এটায় লিখে রাখবে, যাতে করে বাড়ি ফিরে এসে বউয়ের আবদার গুলো দেখে মন চাঙ্গা হয়ে যায় ।”
জারার চোখে জল জমতে গেল—একটা অদ্ভুত গন্তব্যে পৌঁছে গেছে মনে হলো; পুরনো স্মৃতি, নতুন সংযোগ; এই আরামদায়ক অনুভূতি যেনো হঠাৎ বুক ভরে উঠলো।
__“ আমার আপনার কাছে আমার চাওয়ার কিছু নেই স্বামীজান। আমি শুধু আপনার কাছে আপনাকেই চাই, দিবেন?”
আরমান কাঁধ টানল। তারপর সে হেসে বলতে পারল না; চোখে স্নিগ্ধতা, গলা কুঁচকে উঠল
—“দিব না। কারণ আমি চাই তুমি আমাকে নিজের কাছে রেখে দাও রোজ খাটিয়ে ।”
জারা ডায়েরিটা খুঁটে দেখল—কাগজগুলো মসৃণ, সামান্য পশমঘেরা কভার। পেনটা হাত নিলে ওরও হাতে আলাদা এক গাঢ় অনুভব এল; পেনের স্পর্শে যেনো আরমানের হাতের তাপ লাগে। জারা চুপচাপ বসে রইল, ডায়েরিটা বুকের কাছে টেনে।
ভিড় আস্তে আস্তে তাদের থেকে দূরে সরে গেল। বাইকের শব্দ, শহরের কোলাহল—সব ফিরে এল, তবে দুজনের মধ্যে একটা নতুন নীরবতা থিতিয়ে গেল—বহু কথার পরে একটা শান্ত অবিমৃশ্য।
আরমান ধীরে ধীরে জারার কপালে হালকা চুমু দিল—নরম, ক্ষমা চাওয়ার মতো, প্রতিজ্ঞা জমানোর মতো। সে বলল,
___“এবার থেকে—আমি আগে ভাবব; তারপর করব।”
আরমান কাঁধ নেড়ে বোঝাল। বাইকের হ্যান্ডেলে হাত দিল। তারা উঠল, আর রাতের বাতাসে দুজনের মধ্যে সমঝোতার কোলাহল মিশে গেল—রাগের তীব্রতা ক্ষীণ হয়ে আসল, আর প্রতিশ্রুতি উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
বাইক ছুটতে লাগল—রাস্তায় লাইটগুলো ঝলমলে, দোকানের আলো ঝরঝরে। ভিড়ের মাঝেই তারা এক শক্ত ছায়ার মত এগোচ্ছিল—একা নয়, একসাথে। আরমান মাঝে মাঝে জারার ধাক্কায় বুকে কেঁপে উঠে—না রাগে, বরং গা-ভরে এক প্রহরীসমেত প্রেমিকসুলভ আত্মবিশ্বাসে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি দৃষ্টিতে জারা স্পষ্টতই বোঝে—এই মানুষটি শুধুই তার জন্য।
আরমান জারা’কে সামনে বসিয়ে বাইক চালাচ্ছে। জারা আরমানকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে আছে। আরমান জারাকে বলে
__“ আজ বাড়ির ভিতরে ঢুকার পর আর সারাজীবন বের হতে পারবে না বউ।”
আরমানের এমন অদ্ভুত কথা শুনে জারার ভ্রু কুঁচকে যায়।
__“ মানে?”
__“ বোরকা পরিয়ে এনেছি তোমায় তারপরও এতো কিছু হলো তাই আর বাড়ি থেকে বের হতে দিব না! ”
একটু ধীরে এগোতে গিয়ে জারা হঠাৎ বলে,
___“আপনি এত কড়া হলে আমি শেষ ?”
আরমান কান্তভরে হাসলো
—“কড়া না, সরল।আমার কিন্তু ছয় দফা দাবি মানতে হবে বউ। ”
__“ যেমন! ”
—“ ১/তুই আমার, আমি তোর।
২/ আমার চোখ তোর দিকে যাবে। সাথে আমিও তোর দিকে যাবো।
৩/তোর চোখও আমার দিকে আসবে, সাথে তুইও আমার কাছে আসবি।
৪/ আমার যখন তখন বউ লাগবে কোনো বাহানাবাজী চলবে না কিন্তু জান।”
৫/আমার সাথে আঠার মতো চব্বিশ ঘণ্টা থাকতে হবে বোঝেছেন ম্যাডাম?”
জারা এক গাল হেসে বলে
__“ আচ্ছা স্যার! তারপর? ”
৬/ আমৃত্যু পর্যন্ত এই আরমানের হাফ ইঞ্চি বউ হয়ে থাকতে হবে। ”
কথাগুলো একনিশ্বাসে বলে থামে আরমান। ফের আবার বলে
__“ পরবে তো লক্ষী বউ? ”
জারা চোখ বুজে কাঁপা হাসি দিল
—“আপনার আদেশ মাথা পেতে নিলাম স্বামীজান।”
বাইকের রাইডটা শান্ত ছিল বউকে বুকে নিয়ে , কিন্তু ভিতর থেকে একটা মৃদু সুর ছিল।প্রতিশ্রুতির, রক্ষার, এবং একান্তের। ফণি বাতাসে জারার ওর কপালে ঘন ঘন কপূরের হালকা আঙুল স্পর্শ করে—আরমান ঠোঁটের কোণে ওই হালকা হাসিটা রাখে।
জারা জানে—এ আজকের রাত আরমানের জন্য একটা ঘোষণা ছিল না; এটা ছিল প্রতিজ্ঞার পুনরাবৃত্তি। তার চোখে ভর করে এল এক আলোকিত সান্ত্বনা—যেন এই শহর, এই ভিড়, এই রাত সব মিলিয়ে তাদেরই হয়ে গেল। আরমান বসল পাশে, তার হাত জারা’র কাঁধে, চোখে আগের মতোই এক একাগ্রতা—ভালোবাসার অধিকার, যত্নের অঙ্গীকার।
রাত্রি তাদের পথ ধরল ময়মনসিংহের দিকে—কোলাহল পিছে ফেলেই এগোলো তারা, দুজন ছাড়া আর কেউ ছিল না।
মাইল কাটা পথে ডায়েরিটা জারার কোলে ছিল—সেখানে প্রথম পাতায় ওর হাত খালি লেখা পড়ল,
___“ আজকে আমার লক্ষী বউ আমাকে রক্ষা করলো, মাঝেমাঝে যে আমার কতোটা ভয় করে বুঝি না—তবু সে আমার,আমার বউ, আমার লক্ষী বউ, আমার প্রাণ, আমার একমাএ চাঁদ ।’ প্রথম পৃষ্ঠা পড়ে জারা হাসলো, আরমানও।
শহরের আলো পেছনে ফিকে হয়ে এসেছিল; সামনে মাইলের পথ, এবং তাদের দু’জন—একান্তে, কড়া প্রতিশ্রুতিতে, ডায়েরিটি হাতে নিয়ে—শুরু করল নতুন অধ্যায়। আরমান জারাকে এক হাতে বুকে আগলে হঠাৎ করে গান ধরে
~~~~মন চায় শুধু সেই কথা বলতে
মন চায় শুধু একসাথে চলতে
মন চায় শুধু সারাদিন দেখতে তোমাকে~~~~
জারা অবাক হয়ে আরমানের গান শুনছে। আরমানযে গান গাইতে পারে এটা যানা ছিলো না। কি সুন্দর কন্ঠ তার স্বামীজানের।জারা আরমানের বুকে নাক ঘষে আরাম করে বসে। তারপর আরমানের সাথে তাল মিলিয়ে জারাও সুর ধরে বলে
~~~~আজ মন চায় কাছাকাছি এসে
শুধু তুমি আমি পাশাপাশি বসে
আজ মন চায় বলি
হেসে হেসে তোমাকে~~~~
~~~~এ মনের যত আশা
সপ্ন আর ভালোবাসা
বলতে চাই তোমায় নিয়ে
কেন আজ কাছে আশা
ভালোবাসি ভালোবাসি
শুধু তোমাকে………~~~~~
শহরের গলিচায় ঢুকলে রাস্তার আলো আর মিউজিক দুটোই তাদের স্বরলিপি হয়ে ওঠে।
ভিড় ঠেলে তারা হাইওয়ে ধরে। বড় বড় ট্রাক, বাস চলছে রাস্তায়। নিরব না শুধু রাতের অন্ধকারে শান্ত হয়ে আছে চারিপাশ। হঠাৎ করে জারার চোখ পরে একটা গাড়িতে। তড়িঘড়ি করে বলে
__“ স্বামীজান…স্বামীজান দেখুন কি! ”
আরমান বাইকের স্টিয়ারিং এ হাত দিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে।
__“ কী দেখবো বউ?”
__“ আরে দেখুন না!সাদা, সাদা! ”
আরমান জারা’র ইশারা লক্ষ করে তাকিয়ে দেখে বয়লার মুরগির গাড়ি। আরমানের মুখ চুপসে গেলো। এটা কোনো দেখার জিনিস?
__“ বয়লার মুরগি দেখার জিনিস, পাগল!
__“ আরে আপনি বোঝাতে পারছেন না! সাদা সাদা.. ছিলো? ”
__“ কি ছিলো?”
জারা এবার নাম ভুলে যায়। কি যেনো নাম এগুলোর। আরমান ওকে দিয়ে ছিলো?
__“ আরে কি যেনো নাম ছিলো?”
__“ হুমমম! কি নাম ছিলো?”
__“ আরে আপনি দিয়ে ছিলেন না.. সাদা সাদা! ”
আরমান হয়তো বোঝলো জারা সাদা সাদা কি বলতে চাইছে। জারা খরগোশের কথা বলতে চাইছে। কিন্তু মুখ দিয়ে নাম টাই বের করতে পারছে না। আরমানের হাসি পায়।
__“ তুমি কী খরগোশের কথা বলছো বউ?”
__“ হ্যাঁ.. হ্যাঁ..এটাই! মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল না। ”
আরমান এবার হেসেই ফেলে জারার কান্ড দেখে। একটা শব্দ মুখ থেকে বের করতে কতো কিছু।
__“ এখন বলো কি হইছে? ”
জারা মন খারাপ করে বলে
__“ এগুলো তো বাড়িতে আছে। না খেতে পেয়ে মরে যাবে!”
__“ আচ্ছা মন খারাপ করতে হবে না বউ। খরগোশ গুলো আনিয়ে দিব! ”
__“ সত্যি? ”
__“ না মিথ্যা! ”
জারা আরমানের বুকে কামড় মেরে দেয়।
__“ শয়তান লোক! ”
আরমান লাফিয়ে উঠে। কামড় আর চিমটি খুব ভয় পায়। সহ্য করতে পারে না। আরমান জারাকে শক্ত কন্ঠে বলে
__“ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সব গুলো দাঁত একসঙ্গে ভাঙ্গবো তোর! ”
জারা আরমানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে
__“ আমার দাতঁ না থাকলে আপনারই সমস্যা হবে ! সবাই বলবে আরমানের বউয়ের দাঁত নেই।”
__“ সুন্দর! ”
__“ কী? ”
__“ তোমার মুখে আমার নাম! ”
__ “ দূর!”
আরমান জারা’র লজ্জা পেতে দেখে হেসেই ফেলে। তারা রাতের কোলাহল দূরে ঠেলে দিয়ে খান মহলের সামনে এসে দাঁড়ায়। রাত এখন প্রায় একটার কাছাকাছি। আরমান জারাকে নামিয়ে দিয়ে বাইকটা গ্যারাজে পার্ক করতে যায়।
রাতটা তখন নিঝুম, চারপাশ নিস্তব্ধ। শহরের আলো ফুরিয়ে এসে গা ছুঁয়ে নিচ্ছে শুধু শীতল বাতাসে। বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ হতেই গেটের পাশে নিঃশব্দে রাতের ফিসফাস শোনা গেল। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা ছুঁয়েছে।
আরমান কলিং বেল টিপতেই ভেতর থেকে দরজার কপাট খুলে গেল এক নিমিষে।
দাঁড়িয়ে আছেন ফারিয়া বেগম—চোখে ঘুমের ছাপ নেই, মুখে একরাশ ক্লান্তি আর মায়া মেশানো উদ্বেগ। সারাদিনের পথচলার পরও তিনি ঘুমাননি। ছেলের বউয়ের চিন্তায়, মনের মধ্যে হাজার প্রশ্নের ঢেউ।
দরজা খুলে তিনি কোনো কথা না বলেই জারাকে নিজের পাশে টেনে নিলেন।
__“আয় মা, ভেতরে আয়।”
জারার চোখে এক মুহূর্তে আলো ফুটে উঠল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ফারিয়া বেগমের দিকে। ভাবেনি, এই রাত অবধি কেউ ওদের জন্য জেগে থাকবে।
আরমান পেছনে দাঁড়িয়ে মুখে মেকি রাগের ছায়া এনে বলল,
___“বাহ! এখন তো মাও তার ছেলেকে ভুলে গেছে, ছেলের বউ মা কে পেয়ে, মনে হচ্ছে এখন সেই বাড়ির রাজরানী।আমি কেউ না ।”
ফারিয়া বেগম একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে চাপা হাসি আনলেন,
__“আপনি কে? এত রাতে বাড়িতে ঢুকলেন কীভাবে?”
আরমানের মুখ ঝুলে গেল, যেন চুরি ধরা পড়েছে।
__“আম্মু! আমাকে চেনো না?”
ফারিয়া বেগম মুখ গম্ভীর রাখলেন,
__“না, আমি কাউকে চিনিনা। আমি এখন শুধু আমার ছেলের বউকেই চিনি।”
জারা এতক্ষণ চুপ করে ছিল, কিন্তু এই কথায় হাসিটা চেপে রাখতে পারল না। হাসিটা শুনে আরমান আরও মিইয়ে গেল,
___“বাহ, আম্মু, ছেলের বউয়ের পক্ষ নিচ্ছো!”
ফারিয়া এবার মুচকি হেসে বললেন,
__“ মুখে কুলু এটে রুমে যা পাজি ছেলে , আমি আগে ওকে ফ্রেশ হতে দিই।”
তিনি জারার হাত ধরে সোফায় বসালেন, গ্লাসে পানি এনে দিলেন নিজ হাতে। জারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ফারিয়া বেগমের দিকে—একজন মা, যিনি রাত জেগে ছেলের বউয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন, চোখে ঘুম নেই, মুখে মায়া ছড়িয়ে আছে। একজন নারী, যিনি সহজে ভালোবাসা বিলিয়ে দেন, বিনিময়ে কিছু চান না।
__“ খিদে পেয়েছে আম্মু? ”
আরমান পাশে দাঁড়িয়ে মুখ গোমরা করে বলল,
__“আম্মু, আমার কিন্তু খেয়ে এসেছি।”
ফারিয়া বেগম তৎক্ষণাৎ জারার দিকে তাকালেন,
__“সত্যি মা? খেয়ে এসেছিস তোরা?”
জারা একটু হাসি মুখে মাথা নেড়ে বলল,
__“হ্যাঁ আম্মু, খেয়েছি।”
__“তাহলে ভালো,” বলে ফারিয়া বেগম দাঁড়িয়ে পড়লেন,
__ “চল, ফ্রেশ হয়ে নিবি।”
জারা একটু ইতস্তত করে বলল,
__“আম্মু, আমি নিজেই পারব। শুধু রুম টা যদি…”
ফারিয়া বেগম হাসলেন,
___“না মা, তোর হাতে ব্যথা! আমি আছি না তোর সাথে? চল।”
আরমান এবার ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
__“আম্মু, ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?”
__“ওকে ফ্রেশ করাতে,” উত্তর দিলেন শান্ত স্বরে।
__“ফ্রেশ করিয়ে আমার রুমে কফি পাঠিয়ে দিও,”
আরমান আবার বলে উঠল,
__“সাথে আমার বউটাকেও।”
ফারিয়া বেগম এক ঝটকায় ছেলের দিকে তাকালেন—চোখে কঠিন গাম্ভীর্য।
___“আগামী এক সপ্তাহ ওর আশেপাশেও ঘেঁষবি না তুই।”
আরমান হাঁ করে তাকিয়ে রইল,
___“কি! আম্মু! নিজের বউয়ের সাথে ঘুমাতেও পারব না?”
ফারিয়া বেগম মুখে একরাশ শান্তি রেখে বললেন,
__“ নির্লজ্জ ছেলে! তোর বাবা বলেছে না এক সপ্তাহ পর তোদের বিয়ে। তাহলে এতো তারা কিসের ।”
__“ কিন্তু…! ”
__“ রুমে যা নাহলে চাপকে সিধে করে দিব। ”
আরমান হাল ছেড়ে বলল,
__“ঠিক আছে, পরাজিত হলাম। আমি গেলাম রুমে।”
ফারিয়া বেগম মৃদু হেসে বললেন,
__“এই তো ভালো ছেলে আমার।”
আরমান গজগজ করতে করতে নিজের রুমে চলে গেল। পেছনে দরজা বন্ধ হতেই ফারিয়া বেগম জারার দিকে মমতা ভরা দৃষ্টিতে তাকালেন।
__“চল মা, আগে ফ্রেশ হয়ে নিই।”
বাথরুমে যেতে যেতে দু’জনের মধ্যে ধীরে ধীরে কথা জমে উঠল। জারা প্রথমে অপ্রস্তুত ছিল, কিন্তু ফারিয়া বেগম এমনভাবে কথা বলতে লাগলেন যেন মেয়ের মতো।
__“তুই জানিস মা,” ফারিয়া বেগম বললেন,
__“আরমান ছোটবেলায় ঠিক তোর মতোই ছিল।কিন্তু এখন একরোখা জেদি, তবু ভীষণ মায়াবি। ও রেগে গেলে মুখে কথাও বের হয় না, কিন্তু মন থেকে ভালোবাসে খুব।”
জারা মৃদু হাসল,
__ “আমি বুঝেছি আম্মু। ও অনেক ভালো, কিন্তু একটু পাগল।”
ফারিয়া বেগম হেসে উঠলেন,
__“এই পাগলামিই তো ভালোবাসার রঙধনু তোর জন্য ।”
জারা মাথা নিচু করে বলল,
__“আম্মু, আমি জানতাম না আপনি এত সহজে আমাকে গ্রহণ করবেন। ভয় লাগছিল।”
ফারিয়া বেগম জারার চিবুকে হাত রেখে বললেন,
__“ভয় পাওয়ার কিছু নেই মা। তুই এখন আমার মেয়ের মতো। আমাকে আম্মু বলবি, ঠিক আছে?”
জারা প্রথমে কিছু বলতে পারল না। গলা ভারী হয়ে গেল।অবশেষে নরম গলায় বলল,
__“ঠিক আছে… আম্মু।”
এই একটা শব্দ শুনে ফারিয়া বেগমের চোখে জল এসে গেল।
___“এই ডাকটাই তো চেয়েছিলাম মা।”
তিনি আলতো করে জারার চুলগুলো কানে গুঁজে দিলেন, তারপর নিজের হাতে ওর মুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন।
___“এই তো, এখন আমার বউমা একেবারে রাজকন্যা হয়ে গেছে।”
হাসতে হাসতে ফারিয়া বেগম আলমারির ড্রয়ার খুলে নতুন একটা শাড়ি বের করলেন—
__“এইটা তোকে আমি দেব ভাবছিলাম। কিন্তু দেরি হয়ে গেল।”
জারা শাড়িটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তাকাল,
__“এটা তো একদম নতুন!”
__“হ্যাঁ, আমি নিজে বেছে এনেছি। ভাবছিলাম, আমার ছেলের বউ একদিন তো আসবেই। সেই দিনের জন্য রেখে দিয়েছিলাম।”
জারার চোখে জল চিকচিক করে উঠল।
___“আপনি সত্যিই দারুণ মানুষ, আম্মু।”
ফারিয়া বেগম মৃদু হাসলেন,
__“আর তুইও দারুণ মেয়ে। এখন চল, ঘুমিয়ে পড়ি। অনেক ক্লান্ত তুই।”
জারা মাথা নেড়ে বলল,
__“হ্যাঁ আম্মু।”
ফারিয়া বেগম জারাকে নিজের হাতে বিছানায় শুইয়ে দিলেন।চুলে হাত বুলিয়ে বললেন,
___“যে ঘরে ভালোবাসা থাকে, সেখানে ভয় থাকে না মা। তুই এখন এখানেই নিরাপদ।”
জারা আধো ঘুমে চোখ বন্ধ করতে করতে বলল,
__“আম্মু, আপনি থাকলে আমি কোনোদিন একা হব না। কারণ আপনি আমার দ্বিতীয় মা!”
ফারিয়া বেগম চুপ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ, জারার নিঃশ্বাসের শব্দ ধীরে ধীরে নিয়মিত হতে লাগল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটলেন, তারপর একবার ফিরে তাকালেন—
বিছানায় জারা শান্ত মুখে ঘুমিয়ে আছে, ঠোঁটে হালকা হাসি।
ফারিয়া বেগম নিজেই মনে মনে বললেন,
__“এটাই তো চাইছিলাম—আমার ছেলের জীবনে একটু শান্তি।”
তিনি ধীরে ধীরে দরজা টেনে বন্ধ করে দিলেন।
রাতের বাতাস জানালার ফাঁক গলে এসে ঘরটাকে আরও কোমল করে তুলল।
আরমান নিজের রুমে একা বসে কফির কাপ হাতে, মুখে হালকা হাসি। চুপ করে ফিসফিস করে বলল,
__“বউটাকে দেখি না কখন থেকে। বাড়িতে এসেছি সেই বিশ মিনিট হবে। আম্মু আমার বউ নিয়ে কই গেলো আবার? ”
বাইরে রাত আরও গভীর হল,কিন্তু সেই ঘরের ভেতর, ভালোবাসার উষ্ণতা ঠিকই টিকে রইল। একবার ভাবে জারা’র কাছে যাবে কিন্তু কী মনে করে যেনো আবার নিজের রুমে বসে থাকে। ফোন ও দিতে পারছে না। কারণ জারা’র কাছে এখন মোবাইল নেই। কাল এটা নতুন ফোন কিনতে হবে বউয়ের জন্য। জারা’র প্রয়োজনীয় আর কী কী লাগবে এসব ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পরে আরমান।
সকালটা বেশ শান্ত। রাতের দেরি করে ঘুমের পর সবাই একটু দেরিতে উঠছে আজ। বাড়ির ভেতর যেন নিঃশব্দ আর আরাম মেশানো একটা সকাল। আরিফ খান আর আসিফ খান সকাল সকালই অফিসে চলে গেছেন। ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে নয়টা বাজে।
ফারিয়া বেগম রান্নাঘরে, সকালের নাস্তার তদারকি করছেন। রান্নাঘর থেকে ছড়িয়ে আসছে সুগন্ধ — হালকা পরোটা আর ডিমের গন্ধে বাড়িটা ভরে গেছে। বসার ঘর এখনো একটু ফাঁকা, শুধু সিঁড়ি বেয়ে মাঝেমধ্যে কারো হাঁটার শব্দ শোনা যায়।
বিয়ের আগে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে থাকা নিয়ে মারজিয়া বেগম আর আনিছুর রহমান খানিকটা অস্বস্তিতে আছেন। যদিও ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম বারবার বলছেন,
__“ আপা, দয়া করে এভাবে অস্বস্তি বোধ করবেন না। এখন এই ঘরটাও আপনাদেরই ঘর।”
তবুও একটা ভদ্র দূরত্ব টের পাওয়া যায় — মেয়ের শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ, নতুন মুখ, নতুন নিয়ম—সব মিলিয়ে এক ধরনের চাপা সংকোচ।
ফারিয়া বেগম নিজে চা বানিয়ে আনেন, হাসি মুখে বলেন,
___“এ বাড়িতে আত্মীয় আর অতিথির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আপনাদের দুজনকেই পরিবারের অংশ হিসেবেই চাই।”
তাঁর আচরণে এমন আন্তরিকতা যে, ধীরে ধীরে মারজিয়া বেগমও হেসে ফেলেন। আনিছুর রহমান খানিকটা চুপচাপ ছিলেন, কিন্তু তিনিও আস্তে করে বলেন,
____“আপনার মতো মানুষের জন্যই হয়তো সম্পর্কগুলো টিকে থাকে।”
উপরে নিজের ঘরে তখন রাশেদ ঘুম থেকে উঠছে। পাশ ফিরে দেখে — মিম শান্ত ঘুমে। তার মুখে এক মিষ্টি প্রশান্তির হাসি। রাশেদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর আলতো করে মিমের কপালে একটা চুমু খায়। হাসে নিঃশব্দে, তারপর ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে যায়।
নিচে এসে দেখে ড্রইংরুমে ইতিমধ্যে ভীড় জমে গেছে — রোহান, জোহান, জাহির আর জাহেদ চারজন মিলে আড্ডা দিচ্ছে। রোহান কফির কাপ হাতে বসে, হাসতে হাসতে বলে,
__“এই জাহেদ, তোর খবর কী রে? ফিহার সাথে কথা হয় হয়েছে পরে?”
জাহেদ চোখ না তুলে শান্তভাবে বলে,
___“কথা হয় না।”
রোহান রাগী ভাব নিয়ে বলে,
___“ এখন ও যদি অন্য কাউকে বিয়ে করে নেয় তাহলে বলিস না আবার ভাগ্য খারাপ।”
জাহেদ আপেল কেটে খেতে খেতে মুখে হালকা দুষ্টু হাসি নিয়ে বলে,
__“হারাম সম্পর্ক বাদ দিয়ে হালাল পথে আনতেছি ভাই। বুঝলে?”
রাশেদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
__“মানে?”
জাহেদ ঠাণ্ডা স্বরে বলে,
__“বুঝলে বোঝপাতা, না বুঝলে তেজপাত।”
জাহির হেসে বলে
__“ ও তোমাদের সাথে ভণ্ডামি করছে!”
__“ জীবনে একটু ভন্ডামি না থাকলে মজা আসে না। ”বলল জাহেদ
এই উত্তরে রোহান থমকে যায়, তারপর বলেই ফেলে,
___“এই ছেলেটার কথাবার্তার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই!”
সবাই হেসে ওঠে। জোহান বলে,
___“আমাদের জাহেদ ভাই হলো দার্শনিক। প্রেমে পড়ে দার্শনিক হয়ে গেছে।”
জাহেদ চোখ ছোট করে বলে,
__“প্রেমে না, অভিজ্ঞতায়।”
সবাই হেসে খুন। এমন সময় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে আরমান।
আরমানের মুখে একটু ঘুমঘুম ভাব, কিন্তু চোখে ঝলক — মনে হয় বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গায়ে হালকা কালো টি-শার্ট, চুল একটু এলোমেলো। হাতে বাইকের চাবি ঘুরাচ্ছে।
রাশেদ সাথে সাথেই বলে,
___“স্যার….স্যার গো…শুনুন?”
আরমান ভ্রু কুঁচকে বলে,
___“তুই যেভাবে আমাকে ডাকিস, আমার বউও এভাবে ডাকে না।”
সবাই একসাথে হেসে ফেলে। রাশেদের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়,
__“আচ্ছা ভাইয়া, আমি কিছুই বলব না আর ।”
রোহান মজা করে বলে,
__“তোর বউকে কি ‘স্যার’ ডাকা শেখাবো?”
আরমান চশমা চোখে দিয়ে বলে,
__“শেখালে মাইর খাবি। এখন চুপ করে থাক।”
সবাই আবার হাসে।আরমান এবার জোহানের দিকে তাকায়,
___“চল শালাবাবু, তোকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি।”
জোহান অবাক হয়ে বলে,
___“কোথায় যাবো ভাইয়া?”
আরমান হেসে বলে,
___“তোর বোনের জন্য একটা ফোন কিনব।”
এই কথাতেই জাহেদ লাফিয়ে ওঠে,
___“ভাইয়া, আমার জন্যও একটা কিনে এনো। আমার ফোনটা চুরি হয়ে গেছে।”
জাহির মুখ টিপে হেসে বলে,
__“চোর বোকা ছিল, তাই ফোন নিয়েছে। যদি চালাক হতো, তাহলে তোমাকে ধরে পুরোই মুক্তিপণ চাইতো।”
রোহান বলে,
__“বাহ, কথাটা একদম ঠিক।”
জাহেদ মজা করে বলে,
__“তোমরাও আমার সিকিউরিটি হয়ে থেকো, না হলে আমার মতো হ্যান্ডু কে তো ওরা অপহরণ করবেই।”
সবাই হেসে খুন। আরমান উঠে দাঁড়ায়, বাইকের চাবিটা ঘুরিয়ে বলে,
__“চল জোহান, দেরি করিস না।”
জোহান বলল,
__“একটা কথা ভাইয়া—আপু জানে?”
আরমান হেসে বলে,
___“না, আমি এখন ফোন কিনে এনে চমক দেব।”
রোহান হাসি মুখে বলে,
___“চমক না ভাই, ঝামেলা হবে!”
আরমান বলে,
___“ঝামেলা না, ভালোবাসা।”
বাইরে তখন উজ্জ্বল রোদ। গেটের পাশে বাইকটা দাঁড়ানো। জোহান হেলমেট হাতে দাঁড়িয়ে, মুখে উচ্ছ্বাসের হাসি। ভেতর থেকে ফারিয়া বেগম বেরিয়ে এসে বলেন,
___“কোথায় যাচ্ছো তোমরা?”
আরমান বিনয়ের সঙ্গে বলে,
___“আম্মু, একটা ছোট কাজ আছে। একটু বাইরে যাচ্ছি।”
__“সাবধানে যেও। দুপুরে যেন দেরি না হয়,” — ফারিয়া বেগম বলেন।
___“ঠিক আছে আম্মু,” বলে আরমান বাইকে চড়ে বসে।
জোহান হেলমেট পরে বলে,
___“ভাইয়া, রাস্তায় যদি জ্যাম পড়ে?”
আরমান বলে,
__“বউয়ের জন্য কিছু আনতে গেলে কোনো বাধাই বাধা মনে হয় না।”
জোহান হেসে বলে,
___“তাহলে তো তুমি এখন উচ্চ লেভেলের প্রেমিক!”
__“ প্রেমিক না ভাই, স্বামী। মানজারার স্বামীজানের পাওয়ারটা আলাদা।”
বাইক স্টার্ট হয়, এক ঝলকে রাস্তায় মিশে যায় তারা। ভেতরে ড্রইংরুমে এখনো হাসির রোল। রোহান বলল,
__“এই ছেলে এতো বউ পাগল কবে হলো?”
জাহেদ বলে,
__“যেদিন থেকে জারা ভাবিকে হারাতে বসেছিল।”
রাশেদ একচুমুকে বলে,
__“ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, ওভাবে হারানো যায় না।”
এই হাসির মধ্যেই বাড়িটা ভরে ওঠে এক অদ্ভুত উষ্ণতায়—কেউ নিজের ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে ভাবছে, কেউ নিজের ভুল বুঝছে, কেউ আবার নতুন করে বন্ধুত্ব গড়ছে।
আর বাইরে রোদের মধ্যে আরমানের বাইক ছুটে চলেছে—হাওয়ার সাথে মিশে আছে বউয়ের জন্য একটুখানি ভালোবাসা, যত্ন আর একচিলতে পাগলামি।
ঘড়ির কাঁটা তখন এগারোটা ছুঁইছুঁই। শোবার ঘরে হালকা সূর্যের আলো ঢুকে পড়েছে পর্দার ফাঁক দিয়ে। মানজারা ধীরে ধীরে চোখ মেলে, কিছুক্ষণ বালিশে মাথা রেখে স্থির হয়ে বসে থাকে। সারারাত অনেক ক্লান্তিতে ঘুমিয়েছে, কিন্তু এখনো শরীরে সেই মিষ্টি ক্লান্তির ছোঁয়া রয়ে গেছে।
হঠাৎ দরজায় টোকা। জেসমিন বেগম আর জিনিয়া দুজনেই ঢুকে পড়ে হাতে বড় বড় কয়েকটা প্যাকেট নিয়ে।
__“এই দেখ, এগুলো সব তোর জন্য,” জেসমিন বেগম হাসতে হাসতে বলে।
__“আমার জন্য?”—জারা অবাক হয়ে প্যাকেটগুলোর দিকে তাকায়।
___“হ্যাঁ রে মা, তোর চাচা শশুর আর আমি মিলে কিনে ছিলাম হাসপাতালে থেকে আসার সময় । চুরিদার, থ্রিপিস—সবই আছে। এগুলো পরে কমফোর্ট ফিল করবি,শাড়ির পরার দরকার নেই ।”
জিনিয়া খিলখিল করে হাসে,
__“চল, ভাবি, আমি তোমাকে তৈরি করে দেই।”
জেসমিন বেগম সস্নেহে বলেন,
___“তোর শাশুড়ি নিচে নাস্তা সাজিয়ে রেখেছে, তৈরি হয়ে চলে আয়।”
জারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
কিছুক্ষণ পর জিনিয়া জারাকে তৈরি করে নিয়ে আসে নিচে। নিচে এসে দেখে পুরো পরিবার ড্রইং রুমে জমে গল্প করছে। হাসির রোল পড়ে গেছে চারদিকে। ফারিয়া বেগম জারাকে দেখেই হাত বাড়িয়ে বলেন,
___“আয় মা, আমার পাশে বস।”
জারা গিয়ে তার পাশে বসে। এক ঝলক মারজিয়া বেগমের দিকে তাকায়—মা মেয়ের চোখে চোখে একটা বোঝাপড়া। মারজিয়া বেগম বুঝে যান, মেয়ে এই বাড়িতে একদম ভালো আছে।
ফারিয়া বেগম আদর করে জারা’র কপালে হাত রাখেন,
___“ঘুম ঠিকমতো হয়েছে তো মা?”
জারা হেসে মাথা নাড়ে,
__ “হ্যাঁ, আম্মু।”
এই ‘আম্মু’ শব্দে ফারিয়া বেগমের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি রান্নাঘর থেকে নিজের হাতে খাবার নিয়ে আসেন—পরোটা, ডিম, সবজি আর একগ্লাস জুস।
___“এই নে মা, হা কর, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
জারা এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়, মনে হয় যেন মা’ই খাইয়ে দিচ্ছে। এদিকে জেরিন গাল ফুলিয়ে বলে
__ “বড় আম্মু, তুমি তো আমাকে একদম ভুলে গেছো।”
ফারিয়া বেগম হাসলেন,
__“বেশি করে এনেছি! এই নে, আয়.. আয়।”
জেরিন দৌড়ে আসে, জিনিয়ার সাথে যোগ দেয় জাহেদও,
__“আমাকেও দাও বড় আম্মু, আমি তো ক্ষুধায় মরছি।”
রোহান পাশে বসে গম্ভীর গলায় বলে,
__ “আমাকে কেউ চোখে দেখে না, আমি না থাকলেই যেন সব চলে।”
জেসমিন বেগম ওদিকে এসে বলেন,
___“কে বলেছে চোখে দেখি না? আমার ছেলেকে না খাইয়ে আমি কীভাবে থাকি?”তারপর রাশেদ আর রোহানের সামনে প্লেট সাজিয়ে দেন, মাঝে মাঝে মিমের মুখে এক চামচ খাবার তুলে দেন।
জাহির দূর থেকে সব দেখছে—মুখে হালকা হাসি। এমন উষ্ণ, ভালোবাসায় ভরা পরিবার সে খুব কমই দেখেছে।
খাওয়া শেষ হলে সবাই আবার গল্পে মেতে ওঠে। রোহানের হাসি, জাহেদের ঠাট্টা, জিনিয়ার নালিশ—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন এক উৎসবের ঘর। শুধু ছায়মা নেই সেখানে।
কিছুক্ষণ পর সিঁড়ি বেয়ে ছায়মা নামে। গায়ে হালকা নীল পোশাক, চুল খোলা। নিচে এসে বলে,
__“ভাইয়া, আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসবে?”
সবাই চুপ হয়ে যায়। জিনিয়া অবাক হয়ে বলে, __“এই ছায়মা, এখনি যাবি? ভাইয়ার বিয়ের প্রস্তুতি চলছে, পরেই যা না।”
জেরিন ছায়মার কাছে গিয়ে বলে
__“ আপু তুমি যেও না! ”
ছায়মা নিচু গলায় বলে,
__“মনটা ভালো লাগছে না রে। একটু বাড়ি যাই, বৃহস্পতিবার আবার আসব।”
জাহির তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। দুজনের চোখের ভাষা কেউ বুঝতে পারে না। ফারিয়া বেগম অবশ্য ছায়মাকে যেতে দিতে রাজি হন না,
__“কোথাও যাবি না , থেকে যা। তোকে ছাড়া ঘরটা ফাঁকা লাগে।”
ফারিয়া বেগম এর অনেক জোরাজোরিতে ছায়মা হেসে সম্মতি জানায়।
জারা তখনও ভাবছে—আরমান কোথায় গেল? সকাল থেকে একবারও চোখে পড়েনি ওকে। মনে মনে বলে, “এই লোকটা আবার কী করছে কে জানে!”
সময় গড়িয়ে এখন দুপুর দুইটা। বাইরে হালকা রোদ, আঙিনার গাছে গাছে পাখির ডাক। ঠিক তখনই গেটের কলিং বেল বাজে।
__“আসছে ওরা!”—রোহান বলে উঠলো।
আরমান জাহেদের দিকে একটা নতুন ফোন এগিয়ে দেয়।জেরিন আরমানকে জড়িয়ে ধরে বলে
__“ ভাইয়া আমার জন্য কিছু আনো নি!”
আরমান জেরিনের জন্য সুন্দর একটা জামা কিনে আনে। ছোট বোন খুব আদরের। জেরিন জামা টা নিয়ে খুশিতে লাফিয়ে উঠে।
আরমান তারপর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
__“মানজারা! মানজারা!”
জারা ঘর থেকে বের হয়ে আসে,
__ “আসছি!”
আরমানের মুখে একরাশ রহস্যময় হাসি
__ “চলো, একটা জিনিস দেখাতে নিয়ে যাব।”
সে জারার হাত ধরে গার্ডেনের দিকে নিয়ে যায়। সবাই কৌতূহল নিয়ে পেছনে পেছনে যায়।
বাগানে গিয়ে জারা একদম হতবাক! পুরো বাগানজুড়ে সাদা সাদা খরগোশ লাফিয়ে বেড়াচ্ছে! ছোট্ট ছোট্ট পায়ের ছাপ ঘাসে ছড়িয়ে আছে, কোথাও দুধসাদা তুলার মতো লোম মাটিতে লেগে আছে।
__“এগুলো…?”—জারা অবাক হয়ে বলে।
আরমান হেসে উত্তর দেয়,
__“সব তোমার জন্য বউ।”
জারা দৌড়ে গিয়ে একটাকে কোলে তুলে নেয়।
জারা জেরিনের কে বলে
__“ বুলবুল পাখি দেখো কি সুন্দর? ”
__“ সাদা পরী এগুলো ঠিক তোমার মতো দেখতে! ”বলেই খিলখিল করে হেসে উঠে।
জারার লোকে খরগোশটা কুঁকড়ে যায়, আর জারা হেসে বলে, _
__“ওহ্! কত সুন্দর স্বামীজান!”
বাড়ির সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। জাহেদ এগিয়ে এসে বলে,
__“ভাইয়া, কয়টা এনেছো?”
__“বিশ জোড়া,”—গর্বিতভাবে বলে আরমান।
জেসমিন বেগম অবাক,
___“এতগুলো একসাথে?”
আরমান মাথা নেড়ে বলে
___ “ওর হাসিটা ফেরানোর জন্য সব কিছু করতে পারি।”
ফারিয়া বেগম মুচকি হেসে বলেন,
__ “এইভাবেই সবসময় বউয়ের খেয়াল রাখবি, বোঝলি ।”
এরপর গুরুজনেরা বাড়ির ভিতরে চলে যান, তরুণ প্রজন্ম রয়ে যায় বাগানে। জারা খরগোশগুলোকে খাবার দিচ্ছে, পাশে জিনিয়া আর ছায়মা আর জেরিন। মিম এক হাতে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছে। রোহান আর জাহির মাটিতে বসে খরগোশগুলোর জন্য পাতার টুকরো ছিঁড়ে দিচ্ছে।
ছায়মা হালকা হাসিতে মেতে আছে, কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে জাহিরের দিকে। জাহিরও একপলক তাকিয়ে আবার অন্যদিকে চেয়ে নেয়।
রোহান হেসে বলে,
__ “একদম খরগোশের খামার মনে হচ্ছে !”
রাশেদ বাইরে এসে বলেন,
__“তোমরা সবাই দাঁড়াও, একটা ফ্যামিলি ছবি তুলে দিই।”
সবাই একসাথে দাঁড়ায়—ফারিয়া বেগম মাঝখানে, এক পাশে জারা ও আরমান, অন্য পাশে রোহান-মিম, জিনিয়া, ছায়মা, জাহির, জাহেদ আর জেরিন সবাই।
আরমান ফোনটা জাহিরের হাতে দেয়,
__ “আমার আর মানজারা র সুন্দর করে কয় একটা ছবি তুলে দাও!”
জাহির হেসে বলে,
__“ঠিক আছে , হাসুন সবাই… থ্রি… টু… ওয়ান…”ক্লিক!
একটা নিখুঁত মুহূর্ত বন্দি হয়ে যায় ক্যামেরায়—যেন সুখের এক টুকরো সময়।
তারপর আবার হাসি-ঠাট্টা শুরু হয়। জারা একটা খরগোশ কোলে নিয়ে আরমানের পাশে দাঁড়ায়।
___“এগুলো তো অনেক যত্নের দরকার,” জারা বলে।
__“জানি,”
__“ আমি তো একসাথে এতোগুলার দেখ বাল করতে পারব না! ”
আরমান ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলে,
__“বউ তুমি আমার যত্ন নিও, আমি ওদের নেব।”
জারা লজ্জায় নিচে তাকায়।
রোহান আর জিনিয়া তখনও খরগোশের পেছনে ছুটছে। হঠাৎ একখানা খরগোশ জিনিয়ার হাত ফসকে গিয়ে ছায়মার পায়ের কাছে চলে যায়। ছায়মা কুঁকড়ে বসে খরগোশটাকে আদর করে। জাহিরের চোখে অদ্ভুত এক কোমলতা ফুটে ওঠে।
সেই দৃশ্যটা জাহিরের মোবাইলে ধরা পড়ে—একদম নিখুঁত মুহূর্ত, যেন একটা চুপচাপ গল্প বলছে দুজনের মধ্যে।
সন্ধ্যা নামতে নামতে খরগোশের বাগান আলোয় ভরে ওঠে। ফারিয়া বেগম বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেন,
__“এমন শান্তি অনেকদিন পর দেখছি। এই বাড়িতে যেন সবসময় এমন হাসি থাকে।”
জারা খরগোশটাকে কোলে নিয়ে বলে,
___“আম্মু, নাম রাখি তো ওদের?”
__“অবশ্যই মা,”—হেসে বলেন ফারিয়া বেগম।মারজিয়া বেগম আর আনিছুর রহমান দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেমেয়েদের আনন্দ দেখছেন। তার মেয়েকে এই বাড়িতে সবাই রানী বানিয়ে রেখেছে।ফারিয়া বেগম বলেন
___“তুই যা নাম রাখবি তাই ভালো লাগবে।”
আরমান পাশে বসে বলে,
__“চল্লিশ টা আছে এখানে, নাম রাখলে মনে থাকবে না!তাই নাম রাখার দরকার নেই ।”
জারা মুচকি হেসে বলে,
__ “ঠিক আছে।”
রোহান আবার বলে,
__“ আরমান এখন তাহলে এরকম একটা খরগোশ তোরা দু’জন মিলে ডাউনলোড দিয়ে ফেলেন। ”
সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ে। জারা লজ্জা পেয়ে যায়। জিনিয়া এসে রোহানের বাহুতে চড় বসিয়ে দেয়।
__“ আগে দ্বিতীয় বার বিয়ে করে নেই তারপর! ”
আরমান জারা’র দিকে তাকায় তারপর ফিসফিস করে বলে
__ “ আমাকে এমন তুলতুলে একটা খরগোশ গিফট করবি তো বউ?”
আরমানের কথাগুলো জারা’র কানে সুরসুরি মতো লাগে। লজ্জায় মাথা নুইয়ে পড়ে।
__“ কি হলো বউ দিবি না? ”
__“ আপনি যা বলবেন! ”
দিন বাড়তে থাকে, হাসির রোল থেমে থেমে বয়ে চলে পুরো বাড়ি জুড়ে। আরমান জারার দিকে তাকিয়ে বলে,
___ “তোকে খুশি দেখতে আমার কত ভালো লাগে জানিস?”
জারা হেসে বলে,
___ “ভালোবাসি?”
__“আমি বাসি না! ”
এই বলে শিস বাজাতে বাজাতে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। যাওয়ার গার্ডদের বলে যায়। খরগোশ গুলো খাঁচায় রেখে খাবার দিতে। খরগোশগুলোর ফিসফাস শব্দ, সন্ধ্যার হালকা হাওয়া, আর ভালোবাসার মায়ায় ভরা এই গার্ডেন—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন এক রূপকথার মতো হয়ে ওঠে।
সময় গড়িয়ে দুই দিন পার হয়ে গেছে। খান মেহলে এখন বিয়ের হাওয়া। ঘরের এক প্রান্তে লাইটের কাজ চলছে, অন্য প্রান্তে সাজসজ্জার রিহার্সেল। আরমান আর জারা’র বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে ব্যস্ত সবাই। তবে এই কোলাহলের মাঝেও জারা’র মুখে এক অদ্ভুত নীরবতা।
ফিহার সাথে তার যোগাযোগ নেই অনেক দিন।
একসাথে কত হাসি, কত গোপন কথা, কত স্বপ্ন! এখন ফোন দিলেই বন্ধ। বিয়ের আয়োজনের ভিড়ে মন খারাপ করে জারা একা ঘরে বসে থাকে।
রাত তখন নয়টা। আরমান এখনো অফিসে, বলেছিল “আজ একটু দেরি হবে।” ঘরে একা বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে যায় জারা। মনটা ভারি হয়ে আসে, তাই ঠিক করে—জিনিয়া দের কাছে যাবে।
দরজার কাছে গিয়ে থামে—ভেতর থেকে কারো কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে দরজার বাইরে।কণ্ঠটা ছায়মার।
ছায়মা কাঁদতে কাঁদতে বলছে—
__“আমি ওকে ভালোবাসি, জানো জিনিয়া আপু… আমি আজ বিকেলেই বলেছি ওকে। কিন্তু জাহির ভাইয়া… ও সরাসরি না বলে দিল। বলল, ওর জীবনে আমার জন্য কোনো জায়গা নেই।”
ছায়মা’র গলা ভেঙে যাচ্ছে কান্নায়।
__“আমি ভাবছিলাম অন্তত একটু তো মায়া দেখাবে, কিন্তু না। ওর মুখে কোনো ভাবই ছিল না। যেন আমি কিছুই না।”
জারা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে, মন খারাপ করে শুনে যায় সব কথা।তার বুকের ভেতরেও হালকা একটা ব্যথা গেঁথে যায়। কোনো কথা না বলে সে সেখান থেকে সরে যায়। তার ভাইটার জন্য মেয়েটা কতো পাগল। কতো ভালোবাসে আর ওর ভাই মেয়ে টাকে কষ্ট দিচ্ছে।
চলে যায় মিমের রুমে। মিম জামাকাপড় ভাঁজ করছে, তাকিয়ে দেখে জারা দরজায়।
__“এই জানু, মুখটা এমন শুকনো কেন?”
জারা ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে।
__“মনটা খারাপ লাগছে মিম …”
__“কেন?”
__“ফিহার কথা খুব মনে পড়ছে। ফোন দিলাম, বন্ধ দেখাচ্ছে।”
মিম কাজ থামিয়ে পাশে বসে জারার কাঁধে হাত রাখে,
__“আমিও দিচ্ছি কিন্তু একই কথা বন্ধ , তুই মন খারাপ করিস না।”
জারা হালকা হেসে মাথা নাড়ে, কিন্তু চোখে জল চিকচিক করে ওঠে।
অন্যদিকে, এই সময়টায় জাহেদ নতুন ফোন নেওয়ার পর থেকে একটাই কাজ করছে—ফিহাকে কল দিচ্ছে। প্রতিবারই “সুইচড অফ।”
টেক্সট করছে—“ফিহা, একবার কথা বলবো?”
রিপ্লাই আসে না কোনোবারই।
বাইরে যতটা হাসিখুশি থাকে, ভেতরে সে একদম ভেঙে পড়েছে। রাতে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বারান্দায় দাঁড়ায়। চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন তারার ফাঁক দিয়ে ফিহার মুখ খুঁজে পায়। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে ওঠে, হালকা বাতাস তার চুল উড়িয়ে দেয়।
চোখ থেকে একটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে নিচে।
__“এই মেয়েটাকে যদি না পাই…”—মনে মনে বলে, ___“আমি সত্যি বাঁচতে পারবো না।” কেন এমন করছো কটকটি? আমার কথা কি তোমার মনে পরে না? খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোমায়। একা একা কথা গুলো বলে আর আনমেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে।
রাত এখন দশটা।গাড়ির হর্নে খান মেহলের নীরবতা ভাঙে। আরমান আর রাশেদ অফিস থেকে ফিরেছে।
জারা তখন ফারিয়া বেগমের ঘরে। ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম আর জারা বসে গল্প করছে—ফারিয়া বেগম বলছেন,
__ “বিয়ের দিনে আমি নিজে সাজাবো তোকে, ঠিক আছে?”
জারা লজ্জা পেয়ে হেসে মাথা নাড়ে। বাইরে গাড়ির শব্দ শুনেই ফারিয়া বেগম বলে ওঠেন,
__“এই তো আমার ছেলে এসেছে, যা মা, গিয়ে দেখ!”
জারা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। মুখে হালকা হাসি খেলে যায়। ধীরে ধীরে রুম থেকে বের হয়ে ড্রইং রুমে আসে।
আরমান ঢুকেই জারাকে দেখে একগাল হাসে।
হাতে বড় একটা টেডিবিয়ার আর এক ব্যাগ চকলেট।
__“এই নাও লক্ষী বউ , এটা তোমার জন্য।”
জারা অবাক হয়ে টেডিবিয়ারটা নেয়,
__“এতো সুন্দর আর এতো বড়!”
আরমান ওর কপালে আলতো চুমু দিয়ে বলে,
__“খেয়েছো?”
__“আম্মু খাইয়ে দিয়েছে।”
জারা একটু গর্ব নিয়ে বলে,
__“আমি এখানে আসার পর থেকে নিজের হাতে খাইনি,আম্মু খাইয়ে দেয়।”
আরমান মৃদু হেসে বলে,
__“আম্মু তোমাকে বেশি ভালোবাসে। তোমার যত্ন আমার চেয়েও বেশি নেয়।”
তারপর জারার মাথায় হাত রেখে বলে,
__“রুমে যাও, গিয়ে ঘুমিয়ে পরো বউ।”
এই বলে আরমান নিজের রুমে চলে যায়।
জারা টেডিবিয়ার বুকে জড়িয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। ওর চোখে ঝলমল করছে অদ্ভুত সুখের আলো।
এই সময় রাশেদ গাড়ি পার্ক করে বাড়িতে ঢোকে।
নিজের রুমে গিয়ে দেখে মিম বিছানা গোছাচ্ছে।
রাশেদ চুপিচুপি গিয়ে পেছন থেকে মিমকে জড়িয়ে ধরে।
__“এই, ছাড়েন.. ছাড়েন, কেউ দেখে ফেলবে,”—মিম হাসতে হাসতে বলে।
রাশেদ কানের কাছে মুখ এনে বলে,
__“তুমি তো এখন আমার স্ত্রী মিউ, দেখলে সমস্যা কী?”
মিমের মুখ লাল হয়ে যায়। দুজনের মাঝে কিছু মিষ্টি রোমান্টিক কথা, একটু ঠাট্টা-তামাশা, একটু দুষ্টুমি। রাশেদ বলে,
__“তোমার এই হাসি টা আমার সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দেয় ।”
মিম চোখে চোখ রেখে বলে,
__“ ফ্রেশ হয়ে আসুন!”
রাশেদ হাসে, তারপর বাথরুমে যায় ফ্রেশ হতে।
ফ্রেশ হয়ে এসে রাশেদ একটুখানি ভেবে নেয়—আজই বলবে ব্যাপারটা।সে যায় আরিফ খানের রুমে।দরজায় নক করে বলে,
__ “স্যার, একটু আসব?”
__“ রাশেদ,আয়।”
রাশেদ ইতস্তত করে রুমে যায়।
আরিফ খান রাশেদকে বলে
__“এতো রাতে কোনো সমস্যা হয়েছে?”
__“আসলে, আমি ভাবছিলাম মিমকে নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে চলে যাবো…”
আরিফ খান ভ্রু কুঁচকে তাকান,
__“কেন? কেউ কিছু বলেছে?”
__“না না, তেমন কিছু না। মানে, অনেক দিন হলো এখানে আছি তাই ভাবছিলাম—”
আরিফ খান মাঝ পথে কথা কেটে দেন,
__“খাওয়া দাওয়া করে ঘুমাতে যাও। দ্বিতীয়বার এমন কথা মুখে আনলে মুখ ফাটিয়ে দেব।”
রাশেদ চুপ করে যায়। মুখে কোনো কথা নেই।
উঠে দাঁড়ায়,আর কোনো কথা বলতে সাহস পায় না। রুম থেকে বের হয়ে আসে।সে বুঝে যায়, এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা সে বলতেই পারবে না।
অফিস থেকে ফেরার সময়ও আরমান কে বলেছিলো। কিন্তু আরমান তাকে সতর্ক করে বলেছিল,
__“এই বাড়ি ছাড়ার কথা চিন্তা করিস না। না হলে মিমকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিব।” তাই রাশেদ কিছু না বলে রুমে ফিরে যায়।
রাত এখন প্রায় বারোটা।পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, শুধু দূরে কোথাও ঘড়ির টিকটিক শব্দ। জারা রুমে বসে টেডিবিয়ারটা বুকে জড়িয়ে ভাবছে—
আরমান অফিস থেকে ফিরে কিছুই খায়নি।
“ওনার খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই,” মনে মনে বলে জারা।
চুপিচুপি রান্নাঘরে যায়, একটা ট্রেতে খাবার সাজায়—রাতে এই বাড়ির কেউই ভাত খায় না। তাই জারা রুটি, তরকারি আর এক গ্লাস পানি নেয়।ধীরে ধীরে পায়ের আওয়াজ না করে আরমানের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
দরজার ফাঁক দিয়ে হালকা আলো দেখা যাচ্ছে।
ভেতর থেকে আরমানের টাই খুলে রাখার শব্দ আসে।জারা দরজায় টোকা দেয়,
__“স্বামীজান জেগে আছেন?”
ভেতর থেকে আরমানের কণ্ঠ,
__“বউ এই সময় যে, কোনো দরকার ছিল ?”
জারা দরজা ঠেলে ঢোকে, হাতে ট্রে।
__“আপনি তো খাননি কিছু, তাই খাবার এনেছি।”
আরমান চুপচাপ তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। ওর শরীর টা ভালো লাগছে না। গা টা গরম গরম লাগছে। তাই অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে আছে।
__“খাবার নিয়ে যাও বউ, আমি খাব না।”
জারার কপালে চিন্তার রেখা। আরমান কেমন বিছানায় শরীর ছেড়ে দিয়ে শুয়ে আছে। গলাটাও কেমন যেনো লাগছে। জারা আরমানের দিকে এগিয়ে এসে বলে,
__“আপনার কি হইছে স্বামীজান?”
জারা দৌড়ে গিয়ে বিছানার পাশে বসে পড়ে।
তার কপালে হাত রাখতেই যেন বুক কেঁপে ওঠে—গা পুরো গরম!
— “হায় আল্লাহ, জ্বর!”
জারা দ্রুত ট্রে টেবিলে রেখে দেয়, তারপর পাশের ড্রয়ার থেকে পানি এনে কাপড়ে ভিজিয়ে আরমানের কপালে চাপ দেয়।আরমান ঘুমন্ত কণ্ঠে বলে,
— “বউ, আমি ভালো আছি, চিন্তা কোরো না।”
জারা একটু কেঁপে ওঠে, চোখে পানি চলে আসে।
— “ভালো আছেন মানে! গা জ্বলছে আপনার। একবার ডাকতেন আমি চলে আসতাম।”
আরমান আধখোলা চোখে তাকায়, কণ্ঠটা ভীষণ দুর্বল,
— “তুমি ঘুমাওনি কেনো?”
জারা গলা ধরে বলে,
— “আপনি আগে উঠোন খাবেন।”
আরমান মাথা নাড়ে,
— “খেতে মন চায় না।”
জারা এবার একটু কড়া গলায় বলে,
— “এখনই উঠে খাবেন। না খেলে ঔষধ দেব কি করে? ”
আরমান হালকা হাসে,
— “তুই এমন জেদি কেন বউ?”
জারা প্লেট এগিয়ে দেয়। একটু পারটায় তরকারি নিয়ে আরমানের মুখের সামনে ধরে বলে,
— “চুপচাপ মুখ খোলুন।”
আরমান প্রথমে না করলেও শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয়। ধীরে ধীরে খেতে শুরু করে। জারা ছোট ছোট করে পারটা আর তরকারি মিশিয়ে মুখে দেয়। একসময় খাবার শেষ হলে সে ঔষধ খাইয়ে পানি দেয়।
তারপর কপালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে,
— “কেমন লাগছে এখন?”
— “ তোকে দেখে শান্তি লাগছে এখন!” বলে চোখ বন্ধ করে আরমান।
কিন্তু তার শরীর কাঁপতে শুরু করে হঠাৎ । ঠান্ডা ঘাম পড়ছে কপালে। জারা ভয় পেয়ে আরমানের পায়ের কাছ থেকে কম্বল টেনে দেয় ওর শরীরে। তারপর বাথরুমে গিয়ে একটা বালতি ভর্তি পানি এনে কাপড় ভিজিয়ে মাথায় চাপ দেয়।
জারা ফিসফিস করে বলে,
— “আল্লাহ, আমার স্বামীজানকে ভালো করে দাও।”
হঠাৎ আরমান কাঁপতে কাঁপতে হাত বাড়িয়ে দেয়,
— “বউ… বউ..পাশে আয়…”
জারা থমকে যায়। ওর কণ্ঠে কেমন একটা অসহায়তা। চোখ খুলে তাকায়, দেখে আরমানের শরীর ঘামছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
— “আমি এখানে আছি স্বামীজান,” বলে ও বিছানার পাশে বসে হাত ধরে।
আরমান ওর হাত শক্ত করে ধরে বলে,
— “তুই চলে যাস না বউ, আমার খুব শীত করছে।”
জারা কম্বলটা আরেকটু টেনে দেয়, কিন্তু তবুও আরমানের শরীর কাঁপছে। জারা দ্বিধায় পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত নিজেও কম্বলের ভিতরে ঢুকে দুজনের গায়ে টেনে নেয়। ধীরে ধীরে বিছানার পাশে উঠে বসে, তারপর সাবধানে ওর পাশে গা এলিয়ে দেয়।
আরমান জ্বরের ঘোরে অজান্তেই ওর হাতটা টেনে নিজের বুকে রেখে দেয়। জারা প্রথমে একটু চমকে যায়, কিন্তু কিছু বলে না। শুধু চুপ করে থাকে।
আরমানের নিঃশ্বাসের শব্দ ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে। জারা ওর বুকের ওঠানামা দেখে বুঝতে পারে জ্বর একটু কমেছে। ওর মুখের পাশে চুলে হাত বুলিয়ে দেয়, মৃদু স্বরে বলে—
— “আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান স্বামীজান।”
আরমান আধো ঘুমে বলে,
— “বউ, তুই আছিস তো?”
— “হ্যাঁ, আমি আছি।”
— “তুই যাস না বউ।”
জারা চোখ বন্ধ করে, বুকের ভেতর অজানা এক কষ্ট জমে ওঠে। ওর মনে হয়, এই মানুষটার জন্য নিজের সবকিছু ছেড়ে দিতে পারবে।
রাত অনেক গড়িয়ে গেছে। জারা আরমানের হাত শক্ত করে ধরে আছে, যেন হাত ছাড়লেই ও হারিয়ে যাবে। একসময় আরমানের জ্বর ধীরে ধীরে কমে আসে। মুখে শান্ত একটা হাসি।
রাত প্রায় দুইটা বাজে। বাইরে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। শুধু হালকা বাতাসে জানালার পর্দা দুলছে। ঘরের ভেতর হালকা আলোয় জারা তাকিয়ে আছে বিছানায় শুয়ে থাকা আরমানের দিকে। তার কপাল ঘামে ভিজে গেছে। শরীর জ্বরে কাঁপছে।
জারা ধীরে ধীরে উঠে এসে আরমানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে । আরমানের মুখের ওপর এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দেয়। কপালে হাত রাখতেই গা গরমে জারা কেঁপে ওঠে। ভয়ে তার চোখে পানি চলে আসে। “স্বামীজান…” — কাঁপা কণ্ঠে ডাকে সে।
আরমান ধীরে চোখ খোলে, কষ্টভরা দৃষ্টি দিয়ে জারার দিকে তাকায়। ঠোঁট ফেটে গেছে, তবুও মৃদু হাসে।
– “তুই ঘুমাসনি এখনো বউ?”
জারা চোখ মুছে বলে,
__ “আপনার জ্বর অনেক বেশি… আমি ভয় পাচ্ছি।”
আরমান হাত তুলে জারার হাতটা নিজের হাতে নেয়।
– “আমি ভালো আছি, তুই এত চিন্তা করিস না… শুধু একটু পাশে থাক।”
জারা আর কিছু বলে না, চুপচাপ ওর পাশে বসে থাকে। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে শুধু আরমানের কাশির শব্দ। তারপর হঠাৎই সে ধীরে উঠে বসে, ক্লান্ত গলায় বলে,
– “বউ… জানিস, আমি অনেক ভাগ্যবান। তোকে পেয়েছি!”
জারা অবাক হয়ে তাকায়। আরমানের চোখে অদ্ভুত কোমলতা। জ্বরের ঘোরে ওর কথা গুলো আরও গভীর হয়ে ওঠে।
– “তোকে ছাড়া আমার কেমন শূন্য শূন্য লাগে বউ… তুই আমার শান্তি… আমার আরাম ।”
জারার বুক ভরে যায় অজানা অনুভূতিতে। সে আস্তে করে বলে,
__“কথা বলবেন না ঘুমান এখন ।”
কিন্তু আরমান থামে না। হাত বাড়িয়ে জারাকে নিজের আরও কাছে টেনে নেয়।
– “আর একটু কাছে আয়, খুব ঠান্ডা লাগছে।”
জারা প্রথমে চমকে ওঠে, তারপর ধীরে ধীরে ওর আরমান জারার বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে।
জারা ওর কপালে হাত বুলিয়ে দেয়, নরম কণ্ঠে বলে,
__ “সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আরমানের নিঃশ্বাস গরম, কাঁপছে শরীর। হঠাৎ জ্বরের ঘোরে সে ফিসফিস করে বলে,
– “তুই থাকলে সব ঠিক হয়, বউ… তোর গায়ের গন্ধে আমার শান্তি! মিষ্টি গন্ধ খুব ভালো লাগছে…”
এই কথাগুলো শুনে জারার বুকের ভেতর কেমন জানি মোচড় দেয়। অজান্তেই চোখ বেয়ে নেমে আসে জল। ও মাথা নিচু করে আরমানের বুকে হাত রাখে। দুজনের নিঃশ্বাস মিলেমিশে যায় নিস্তব্ধতায়।
আরমানের কণ্ঠ ফিসফিসে—
– “বউ, একটু কাছে আয়… তোকে খুব দরকার…”
জারা কিছু বলে না, শুধু চোখ বুজে শুয়ে থাকে। সময় থেমে যায় যেন। বাইরে হালকা বাতাস বয়ে যায়, পর্দা দুলে ওঠে। সেই নিঃশব্দ ঘরে জারার উপস্থিতি হয়ে ওঠে আরমানের একমাত্র শান্তি।
ধীরে ধীরে জ্বরের ঘোরে আরমানের হাত শক্ত হয়ে আসে, জারাকে আরও কাছে টানে, যেন ভয় হয়—সে আবার হারিয়ে না যায়। জারা ওর বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ফেলে। ওর নিঃশ্বাসের উষ্ণতা, জ্বরের ঘোরে বলা ভালোবাসার কথা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আবেগে ভরে ওঠে রাতটা। আরমানের স্পর্শ গুলো জারা সহ্য করতে পারে না। আরমানের ছোঁয়া গুলো আরও গভীর থেকে গভীর হতে থাকে। জারা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে
__“ স্বামীজান! আপনি অসুস্থ! ”
আরমান জারা’র কানে ফিসফিস করে বলে
_“ So what bow?”
জারা আরমানের কাছ থেকে উঠে আসতে চায়, কিন্তু আরমান জারাকে সেই সুযোগ দেয় না।
__“ মাঝ পথে কেন চলে যাচ্ছিস বউ? আর একটু..প্লিজ! ”
__“ প্লিজ আমি আর পারছি না স্বামীজান!”
__“ একটু সহ্য করে নেয় বউ! তারপর পর থেকে প্রতিদিন আমি….!”
আরমানের কথা মাজ পথে আটকে দেয় জারা। আরমানের পিঠে খামছে ধরে বলে
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬২
__“ নির্লজ্জ বেহায়া লোক! ওনার নাকি জ্বর?”
__“ আমি যাই নি তুই এসেছিস বউ! ”
জারা ভয়ে লজ্জায় একাকার। আরমানের স্পর্শ গুলো ওকে পাগল করে দিচ্ছে। কি ভয়ংকর অনুভূতি?
বাইরে তখন বৃষ্টি নামছে টুপটাপ। ঘরের ভেতর শুধু দুইজন মানুষ—একজন অসুস্থ, আর একজন ওর পাশে নিরব প্রহরী। এভাবেই তাদের ভালোবাসা নিঃশব্দে পূর্ণ হয়ে ওঠে—কোনো কথায় নয়, শুধু আরমানের মিষ্টি ছোঁয়া — আর শুধু অনুভবেই।
