Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ২৮

আবির ভাই পর্ব ২৮

আবির ভাই পর্ব ২৮
উর্মিলা মজুমদার

পরদিন। রোদটা বেশ কড়া হয়ে উঠেছে। খান বাড়ির গেটে আজ সকাল থেকেই মোটামুটি ভীড়। মানুষের আসা-যাওয়া শুরু হয়েছে। ফুল আসছে স্তূপ করে, সেই ফুলে সাজানো হচ্ছে ড্রয়িং রুম। আজ রাতে এই বাড়িতে একটা এলাহি কারবার হবে পার্টি। উৎসব-উৎসব ভাব। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। কেউ কেউ প্ল্যান করছে রোদটা একটু কমলেই মার্কেটের দিকে ছুটবে।
​আবিরের ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে। গায়ে কালো রঙের একটা গেঞ্জি, পরনে ট্রাউজার। শরীরটা এখন আর আগের মতো রূঢ় লাগছে না, জ্বরটা বোধহয় পিছু হটেছে। সে মনে মনে একটা ছক কষল। আজ রাতের ঝামেলাটা চুকিয়ে ফেলতে পারলেই কাল নিজের ফ্ল্যাটে চম্পট দেবে। এই বাড়ি তার আর ভালো লাগছে না।
​বিছানা ছেড়ে উঠে সে কাউকে ফোন করল। খপ করে জানতে চাইল তার লাভ বার্ড পাখিগুলোর খবর। ঠিকঠাক মতো দানা-পানি পাচ্ছে তো ওরা? যত্নআত্তিতে কোনো কমতি হচ্ছে না তো? ফোন রেখে সে রুম থেকে বেরোতে যাবে, এমন সময় একটা শব্দ তার কানে খট করে বিঁধল। বাড়ির হট্টগোলের মধ্যেও শব্দটা আলাদা করে চেনা যাচ্ছে। গান বাজছে।

​শব্দটা আসছে অরু’র ঘর থেকে। আবির ভাই ভ্রু কুঁচকে সেদিকে পা বাড়াল। অরু’র ঘরের দরজার কাছে আসতেই তার বুকটা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল।
​ভেতরে মেঘ নাচছে।
​তার পরনে গত রাতের সেই বাসন্তী রঙের সালোয়ার-কামিজ। ওড়নাটা কোমরে শক্ত করে প্যাঁচানো। এক মাথা লম্বা চুল বেশ কায়দা করে খোঁপা করা থাকলেও অবাধ্য কিছু চুল কপালে এসে লুটিয়ে পড়ছে। অরু নিচে সাউন্ড সিস্টেমের সামনে বসে আছে হাসি মুখে। বোধহয় রাতের পার্টির রিহার্সাল চলছে।
​আবির ভাই দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। পকেটে হাত। তার ভেতরটা হঠাৎ খুব অস্থির হয়ে উঠল। মেঘ সবার সামনে নাচবে আর আবির দর্শক হয়ে বসে থাকবে? অসম্ভব। মেঘের নাচ দেখার অধিকার শুধু তার। সে ছাড়া আর কেউ এই দৃশ্য দেখার যোগ্যতা রাখে না।
​ঘরের ভেতর গানের সুর চড়ছে। মেঘ তালের সাথে শরীর দোলাচ্ছে। গানের কলিগুলো এমন—
​”আপনা রূপ রং সাজাউঁ
মেহেন্দি হাথো মে লাগাউঁ
পায়েল কঙ্গন ভি মাঙ্গাউঁ
ফির নের ভরন মে জাউঁ
ঘুঙ্ঘাট কান্না সা কাঢু না কাসার ঘালুঙ্গি
৫২ গজ কা দামান পহর মাতক চলুঙ্গি…”

দুপুরের রোদটা মাখনরঙা রঙ ধারণ করল। খান বাড়িতে একটা সাজ সাজ রব পড়ে গেল। সবার গন্তব্য শপিং মল। আবির ভাইয়ের শরীরটা পুরোপুরি বাগ মানেনি, তাই বড়ো আম্মু সাফ জানিয়ে দিলেন তাকে বাড়িতেই থাকতে হবে। বড়ো আম্মুর হুকুম অমান্য করার সাধ্য এই বাড়িতে কারোর নেই। অমান্য করলেই বিপদ তিনি বাগান থেকে এক গাদা তিতকুটে তুলসী পাতা ছিঁড়ে নিয়ে আসবেন, তারপর সেই পাতার রস নিংড়ে জোর করে আবিরের মুখে ঢেলে দেবেন। সেই ভয়ানক তিতো স্বাদের চেয়ে চুপচাপ রুমে বসে থাকা ঢের ভালো।
​সাদিফ ভাই প্রেমা, অরু আর মেঘকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার শব্দ পাওয়া গেল, তারপর সব চুপচাপ। আবির ভাই ল্যাপটপ খুলে অফিসের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল।
সময় তার আপন গতিতে বইতে লাগল। জানালার ওপাশে রোদের তেজ কমল। আকাশের নীল রঙটা ফিকে হয়ে এল। ​সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই খান বাড়ির ভোল পাল্টে গেল। ড্রয়িং রুমটাকে সাজানো হয়েছে ‘ডার্ক থিম’-এ। ম্লান আলো। অতিথিরা আসতে শুরু করেছেন। ​ওদিকে ওপরতলার রুমে মেঘ নিজেকে তৈরি করছে। অরু তাকে সাহায্য করতে এসে জুটেছে। এই দুই মেয়ে যেন একে অপরের পরিপূরক। দুটো চঞ্চল বাঁদর। মেঘ শাওয়ার নিয়ে এসে আয়নার সামনে বসল। চুলগুলো ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিয়ে সামনের দিকের কয়েকটা গোছা সুন্দর করে কার্লি করে নিল। বাকি চুলগুলো পেছনে আলতো করে খোঁপা করা, আর কার্লি করা চুলগুলো কপালে আর গালে এসে অবাধ্যভাবে খেলা করছে।

​বিছানার ওপর ছড়ানো শপিং করে আনা প্যাকেটগুলো। সেখান থেকে মেঘ বেছে নিল টকটকে লাল রঙের একটা লম্বা গাউন। লাল রঙটা মেঘের গায়ের রঙের সাথে মিশে গেল। আয়নায় নিজেকে দেখে মেঘের নিজেরই হয়তো একটু চমক লাগল। আজ রাতে এই ডার্ক থিমে সাজানো ড্রয়িং রুমে লাল গাউন পরা মেঘ যখন নামবে, তখন পরিস্থিতিটা ঠিক কেমন হবে তা কেবল মহাপুরুষরাই বলতে পারেন। ঠোঁটে গাঢ় লাল রঙের লিপস্টিক, সাথে ডার্ক শেড। চোখে লেপটে দেওয়া কাজল আর গাঢ় আইলাইনার। সব মিলিয়ে মেঘকে যখন আয়নায় দেখা গেল, তখন মনে হলো কেউ একজন একটা দামি বারবি ডল সাজিয়ে বসিয়ে রেখেছেন। মেঘ নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ থমকে রইল। আয়নার ভেতরের মেয়েটা কি আসলেও সে?
​অরু দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মেঘকে দেখে সে নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ইশশ! আমি যদি আজ একটা ছেলে হতাম রে মেঘ, তাহলে নির্ঘাত আজকের রাতের জন্য ইমরান হাশমি হয়ে যেতাম!’

​অরুর কথা শুনে মেঘের খিলখিল হাসি থামতেই চায় না। হাসতে হাসতে সে বিষম খাওয়ার জোগাড়। মেঘ বলল, ‘তোর আর ছেলে হওয়া লাগবে না, তুই এমনিতেই একটা ফিমেল ইমরান হাশমি!’
​দুই বাঁদর মিলে হাসিতে রুম ফাটিয়ে ফেলল। এরপর মেঘ ফোন হাতে নিয়ে ভিডিও কল দিল গ্রামের বাড়িতে। ওপাশে ছোট আব্বু আর আম্মুর মুখ দেখা গেল। স্ক্রিনের ওপাশ থেকে তারা মেঘের এই সাজ দেখে সকলে মোহাচ্ছন্নতা হয়ে চেয়ে রইলেন।

​রাত দশটা। নিচে উৎসবের দামামা বেজে উঠেছে। ড্রয়িং রুম থেকে আসছে উচ্চকিত সংগীত। মেঘ কিন্তু নিজের রুম থেকে বেরোল না। তার ভেতরে জড়তা কাজ করছে। এমন পার্টিতে আগে কখনো সে পা রাখেনি। অচেনা সব মানুষের ভিড়ে নিজেকে বড় একা লাগে। অরু এর মধ্যে কয়েকবার নিচে গিয়ে টহল দিয়ে এসেছে, কিন্তু মেঘ ঠাঁই বসে রইল নিজের রুমে।
​এদিকে আবিরও তৈরি। শরীরটা এখনো পুরোপুরি বশ মানেনি, তবুও সে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে পরিপাটি করে। ধবধবে সাদা একটা শার্ট ইন করে তার ওপর চাপিয়ে নিয়েছে কুচকুচে কালো ব্লেজার। গলায় টাই। মাথার চুলগুলো নিখুঁত আর্মি কাটে ছাঁটা। গালে কয়েক দিনের না কাটা খোঁচা খোঁচা চাপ দাড়ি। কবজিতে চিকচিক করছে ব্ল্যাক রোলেক্স ঘড়ি। সবশেষে শরীরে মেখে নিল ‘শিসেইড দ্য গিন্জা’ পারফিউম। ​আবির নিচে নেমে আসতেই বড় আব্বু উৎসাহ নিয়ে তাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। অতিথিদের ভিড়ে মিরাকেও দেখা গেল।
বিজনেস পার্টনারের মেয়ে হিসেবে মিরার উপস্থিতিটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু তার চোখের চাউনি আবিরের দিকেই বারবার নিবদ্ধ হচ্ছে। ​পুরো ড্রয়িং রুম এখন কানায় কানায় পূর্ণ। চারপাশে মানুষের গিজগিজে ভিড়। এর মধ্যেই একটা ফিসফিসানি ভেসে আসছে। মীরা আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা আড়ালে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, “ঐ যে সাদা শার্ট পরা ছেলেটা, দেখেছিস? কী অসম্ভব হেন্ডসাম!”

​প্রেমা আপুর খালাতো-মামাতো বোনেরা আর বন্ধুরা যেন আজ চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছে। সবার স্থির দৃষ্টি আবির ভাইয়ের দিকে। আবির অবশ্য এসব নিয়ে খুব একটা ভাবছে বলে মনে হলো না। রায়হান এগিয়ে এসে আবির ভাইকে একটা জোরেশোরে হাগ দিল। তারপর চওড়া হাসি হেসে বলল, “কেমন আছিস ইয়ার? তোকে তো আজ চিনতেই পারছি না!”
​আবির ভাই হাসিমুখে উত্তর দিতে চাইলেন, কিন্তু শব্দটা আর গলা দিয়ে বেরোল না। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখ আটকে গেল বিশাল সিঁড়িটার দিকে। অরু এক হাতে কাউকে আগলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। সেই হাত ধরে যে নেমে আসছে, তাকে দেখে মনে হলো স্বর্গের কোনো অপ্সরী ভুল করে এই মর্ত্যের ড্রয়িং রুমে পা রেখেছে। মেঘ আজ মেঘ নয়। শরতের এক টুকরো শুভ্র জ্যোৎস্না বললে ভুল হবে না।
​আবির ভাইয়ের হাতের আঙুলগুলো অবশ হয়ে এল। তিনি অজান্তেই রেলিংটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। এই শীত শীত সন্ধ্যায় একজন মানুষের কপালে ঘাম দেখা দেওয়াটা বেশ রহস্যময় ব্যাপার। জ্বর বেড়ে গেলো নয়তো? রায়হান একটু অবাক হয়ে আবির ভাইয়ের কাঁধ স্পর্শ করল, “এই ভাই, কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ লাগছে?”

​আবির ভাই কোনো জবাব দিলেন না। তার প্রিয়তমা নারীটি আজ এত বেশি সুন্দর যে, মানুষের চোখে সয় না। তিনি হঠাৎ যেন এক ঘোরগ্রস্ত মানুষের মতো নিজের পরনের কালো ব্লেজারটা খুলে ফেললেন। কোনো কথা না বলে সেটা রায়হানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেলেন সিঁড়ির দিকে।
​মেঘের সামনে গিয়ে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। মেঘ তখনো ঘোরের মধ্যে। তার দুহাত কাঁপছে। বুকটা ঢিপঢিপ করছে। চারপাশে মীরারা আছে, আত্মীয়স্বজনরা আছে। সবার মুখে একটাই বিস্ময়ভরা গুঞ্জন। মেঘ এক মুহূর্ত ইতস্তত করল। পরক্ষণেই মীরাকে চোখে পরল। তারপর দ্রুত লয়ে নিজের হাতটা সপে দিল আবির ভাইয়ের হাতের তালুতে।

​ড্রয়িং রুমের আলো হঠাৎ করে অনেকখানি কমে এল। কিছুক্ষণ পরেই ড্যান্স পারফরমেন্স শুরু হবে। এই মুহূর্তটার জন্য যদি তাকে অনন্তকাল অপেক্ষা করতে হতো, তাহলেও কোনো ক্ষতি ছিল না। অরু একক নৃত্য করছে। তূর্য ছেলেটা একপাশে স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে। ওর চোখের পলক পড়ছে না। হুমায়ূন আহমেদের জগতে কোনো কোনো পুরুষ মানুষের চাহনি এমন হয় যেন তারা এই জগতের কেউ না, ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী গভীর বিস্ময় নিয়ে মর্ত্যের রূপ দেখছে। ​ঠিক তখনই মাইক্রোফোনে মেঘের নাম ঘোষিত হলো।
মেঘ একা মঞ্চে পা রাখল। কিন্তু জগতটা তো একা চলার জায়গা নয়, বিশেষ করে যখন আশেপাশে আবির ভাইয়ের মতো কেউ থাকে। মেঘ নাচের প্রথম মুদ্রাটা ধরার আগেই আবির ভাই এগিয়ে এলেন। তিনি খুব কায়দা করে গলার টাইটা একটু আলগা করে নিলেন। মানুষ যখন বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন অবচেতন মনেই গলার টাই কিংবা জামার কলারটা একটু ঢিলে করে দেয়।
​রায়হান ডিজে প্লেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে একটা অর্থপূর্ণ হাসি দিল। মুহূর্তেই গানের তাল বদলে গেল। বাজতে শুরু করল—

Mahi aja re mahi aja re
Tujme he kuch aisi subase
Jiske Khatir me tha jagasa
Aaa tu mere khub saja ja
​আবির ভাই মেঘের হাতটা ধরলেন, অন্য হাতটা পরম অধিকারে মেঘের কোমরে। মেঘের শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু আবির ভাইয়ের হাতের বাঁধন লোহার জঞ্জাল হয়ে অবরুদ্ধ। ​আবির ভাই মেঘকে নিজের খুব কাছে টেনে নিলেন। মেঘের তপ্ত নিঃশ্বাস আবির ভাইয়ের কাঁধে আছড়ে পড়ছে। অন্ধকার ড্রয়িং রুমে কেউ কারো মুখের অভিব্যক্তি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না, শুধু বোঝা যাচ্ছে দুটো ছায়া একে অপরের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ হাততালি দিচ্ছে, আবার কেউ কেউ হয়তো ঈর্ষায় মনে মনে নিজেদের নখ কামড়াচ্ছে। সেখানে এক আগন্তুকও দাঁড়িয়ে আছে।
​আবির ভাই মেঘের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “তুই শুধু আমার সামনে নাচবি। তোর এই সবটুকু সৌন্দর্য। সবই আমার জন্য। তুই যে একান্তই আমার শখের নারী, মিসেস খান!”
​কথাটা শেষ করেই আবির ভাই হুট করে একটা পাগলামি করে বসলেন। নাচের স্টেপের ফাঁকেই তিনি মেঘের ঘাড়ে একটা আলতো কামড় বসিয়ে দিলেন। এটা কোনো সাধারণ কামড় নয়, যেন কোনো বুনো মালিক তার প্রিয় অধিকারটার ওপর নিজের মোহর মেরে দিল।

​ঠিক সেই মুহূর্তেই গান শেষ হয়ে গেল। পিনপতন নিস্তব্ধতা। মেঘের মনে হলো ওর পায়ের নিচের মেঝেটা সরে যাচ্ছে। ও প্রবল লজ্জায় আর একরাশ অসংজ্ঞায়িত অনুভূতিতে কুঁকড়ে গেল। তারপর মুহূর্তের মধ্যে লম্বা গাউনটা সামলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে ছুটল। পেছনে অরুও ছুটল ওকে সামলাতে।
​মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে যখন সময় থমকে দাঁড়ায়। আবির ভাই ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি। কোনো এক আগুন্তকঃ প্রেমিক হলে হয়তো এই দৃশ্য দেখে একটা উদাসীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত, “মায়া বড় বিষম বস্তু!”
রাত বাড়ছে। ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উম্মাদনা। মেঝো আব্বু আর মেঝো আম্মু খুব ঘটা করে কেক কাটলেন। গিফট আদান-প্রদান হলো। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে অতি গম্ভীর মানুষগুলোও কেমন যেন দাঁত বের করে হাসতে শুরু করে। একেই কি বলে সামাজিক সুখ?
​গুরুজনেরা বিদায় নিতেই আসর আসল রূপ ধারণ করল। যারা এতক্ষণ ভদ্রতার মুখোশ পরে বসে ছিলেন, তারা এখন সেই মুখোশ খুলে ড্রয়িংরুমে আছাড় মারছেন। কেউ কেউ রঙিন পানীয়র গ্লাসে চুমুক দিয়ে দুনিয়াটাকে উল্টো করে দেখার চেষ্টা করছেন। শুরু হয়েছে ওড়াধুরা নাচ।
​নাচিয়েদের তালিকায় কারা নেই? আবির ভাই, সাদিফ ভাই, তূর্য, জায়ান, রায়হান সবাই আছেন। তবে সব ছাপিয়ে আমার নজর কাড়ছেন আবির ভাই। মানুষটার শরীরের কলকব্জা ঠিক কোন উপাদানে তৈরি, কে জানে! গত দুদিন ধরে জ্বরে পড়ে ছিলেন, হাতে বিশ্রী একটা ইনফেকশন। অথচ এখন তার কাণ্ড দেখলে মনে হবে, এইমাত্র কোনো অলৌকিক টনিক খেয়ে এসেছেন। পরনের ব্লেজারটা কখন খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলেছেন তার খবর নেই।
​ব্যাকগ্রাউন্ডে বিকট শব্দে গান বাজছে—

​তেরে লিয়ে, ঝুমু দেওয়ানা বান কে তেরে লিয়ে… ওয়াদা হ্যায় মেরা ম্যায় হুঁ তেরে লিয়ে…
আবির ভাই ঘোরগ্রস্ত মানুষের মতো নাচছেন। জ্বরের ঘোরে মানুষ প্রলাপ বকে শুনেছি, কিন্তু জ্বরের ঘোরে এমন তাণ্ডব নৃত্য আগে দেখিনি। জগতের নিয়ম বড় অদ্ভুত।
​​পার্টি শেষ হলো এক সময়। কেউ বিদায় নিল, কেউ ধপাস করে লুটিয়ে পড়ল বিছানায়।​এদিকে মেঘের অবস্থা তন্দুর রুটির মতো। রাগে সে ফুলে ফেঁপে এমন হয়েছে যে, একটা পিন দিয়ে টোকা দিলে হয়তো বিকট শব্দে ফেটে যাবে। মেঘের রাগ হওয়াটা অযৌক্তিক নয়। যে মানুষটা তাকে নাচতে মানা করল, সে নিজেই অসুস্থ শরীর আর ড্রিঙ্কসের নেশায় পুরো ঘর মাথায় তুলল!

​মেঘ তার ঘাড়ের কাছে হাত দিল। উফ! ব্যথায় জান বেরিয়ে যাচ্ছে। আবির ভাই নাচের মাঝখানে মেঘের ঘাড় ধরে কী যেন একটা বলেছিল। গানের চোটে কথাগুলো মেঘের কানে পৌঁছায়নি। তবে ‘মিসেস খান’ বলে কী একটা ইশারা করেছিলেন, যা মেঘের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আন্দাজ করে নিয়েছে।
​হঠাৎ একটা দারুণ বুদ্ধি খেলে গেল মেঘের মাথায়। সে বিছানা থেকে তড়াক করে উঠে বসল। মেঘের হাতে এখন স্মার্টফোন। সেই ফোনে ক্যামেরা সচল ছিল যখন আবির ভাই মাতাল হয়ে নাচছিলেন।
​মেঘ ফোনের গ্যালারিটা চেক করল। হ্যাঁ, মোক্ষম কাজ হয়েছে। স্ক্রিনে আবির ভাইয়ের সেই ‘কীর্তি’ জীবন্ত হয়ে ধরা দিচ্ছে। মেঘ নিজের অজান্তেই হাসি দিল। একে ঠিক মিষ্টি হাসি বলা যায় না, বরং সিনেমার ভিলেনরা যখন মোক্ষম চাল দেয়, তখন তাদের মুখে এমন হাসি দেখা যায়।

আবির ভাই পর্ব ২৭

​মেঘ আপন মনেই ফিসফিস করে বলল, “এবার বাছাধন যাবে কোথায়? ইয়াহু! কাজের কাজ একটা হয়েছে বটে!”
​আবির ভাই জানেন না, আগামীর সকালটা তার জন্য খুব একটা সুখকর হবে না। মেঘ এখন কেবল একটা সুযোগের অপেক্ষায় আছে।

আবির ভাই পর্ব ২৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here