অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৮
রুপা
আর্য রুমে এসে দেখে পুষ্প রুমে নেই, এতে আর্য ভীষণ বিরক্ত হয়। সে বুঝতে পারছে না কার ওপর বিরক্ত হচ্ছে—পুষ্পর ওপর নাকি নিজের ওপর! তার কেন এরকম অস্বস্তি হচ্ছে? ওই মেয়েটা যার সাথেই হাসুক, তাতে আমার কী! নাহ নাহ, আমাকে এসব শেষ করতে হবে, সে এসবে জড়াতে চায় না। আর্য নিজের মাথার চুল খামচে ধরল। তার নিজের ওপর বিরক্ত লাগছে, রাগ উঠছে।
হঠাৎ আর্যর কানে আসে মেয়েলি মিষ্টি কণ্ঠস্বর, ঠিক যেন কোকিলের গলা। আর্য কণ্ঠ অনুসরণ করে বারান্দার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজায় দাঁড়ায়। চোখ স্থির হয় সাদা মেঝেতে বসা ষোড়শী কন্যার ওপর! হিজাব খুলে গলায় ঝুলিয়ে রেখেছে, চুলগুলো মেসি বান করা, কয়েকটি ছোট চুল মুখের ওপর এসে পড়েছে। পা ভাঁজ করে মেঝেতে বসে কোলের ওপর সাদা তুলতুল আর তুলিকে নিয়েছে, সাদা গাউন মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। পুষ্প খরগোশ দুটোকে গাজর খাওয়াচ্ছে আর হেসে বলছে—
– “জানিস, আজকে প্রথমবার নৌকায় চড়েছি! প্রথমে আমার ভয় করছিল, কিন্তু সিমরান আপু আর আহনাফ ভাইয়া দুজনে আমাকে সাহস দিয়েছে অনেক কিছু দেখিয়ে। সিমরান আপু আমাকে ধরে রেখেছিল যেন পড়ে না যাই। আস্তে আস্তে আমার ভয় কেটে গিয়েছিল, তারপর আমার অনেক ভালো লাগছিল। ভাইয়া ফুচকা, ঝালমুড়ি, আইসক্রিম খাইয়েছে আমাকে। আজকে অনেক মজা করেছি আমি। আহনাফ ভাইয়া আমাকে অনেক কিছু দেখিয়েছে।”
হাসিমুখে পুষ্পর একেকটা কথা শুনে আর্যর রাগ যেন বাড়ছে, কমছে না। এই মেয়ে তার সামনে ভয়ে দাঁড়াতে পারে না, আর আহনাফের সাথে ঘুরতে গিয়েছে! আমার সামনে ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানে না, আর সবার সাথে বাইরে থেকে ঘুরে আসে—সব এই মেয়ের নাটক! সে এবার পুষ্পর একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ তুলে তাকায় পুষ্প। আর্যকে দেখেই রমণীর মুখে ভীতির ছায়া নেমে আসে, যা চোখ এড়ায় না আর্যর। এতে যেন আর্য আরও ক্ষিপ্ত হলো। সে এবার হাঁটু গেড়ে বসল একদম পুষ্পর নিকটে। এতে পিছিয়ে যেতে চায় পুষ্প, কিন্তু আর্য হতে দিল না। এক থাবায় পুষ্পর কাঁধ চেপে ধরে একদম নিজের কাছে নিয়ে আসে। আর্যর গরম নিঃশ্বাস পুষ্পর মুখে আছড়ে পড়ছে। আর্যকে নিজের এত কাছে দেখে পুষ্পর হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, ভয়ে বুক দুরুদুরু কাঁপছে। এর মধ্যে শোনা যায় আর্যর গম্ভীর ঠান্ডা কণ্ঠস্বর—
– “এই মেয়ে, তোমার সমস্যা কী? কতবার বলেছি আমার চোখের সামনে আসবে না, কথা কানে যায় না কেন? আমি তোমাকে বলেছি আমার থেকে দূরে থাকতে, আর তুমি আরও বেশি আমার কাছে আসছ? হোয়াই, ড্যামইট?”
আর্যর বলা কথাগুলো শুনে পুষ্প কী বলবে বুঝতে পারছে না। সে তো ভয়ে মুখ মেলতে পারছে না, কথা বলবে কী করে! গলা রুদ্ধ হয়ে গেছে। এদিকে পুষ্পকে চুপ করে থাকতে দেখে আর্য হাতের চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়, এতে যেন আর্যর ধরে রাখা জায়গাটা দেবে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে নখ গেঁথে যাচ্ছে। ব্যথায় পুষ্পর আঁখিজুগল ভিজে উঠল। টলমলে হরিণী চোখে আর্যর দৃষ্টি যেতেই আর্য থমকে যায়। মেয়েটা আবার কেন কাঁদছে? সে কি এখন এই মেয়েকে মেরেছে? কাঁদার মতো কী বলেছে, শুধু তো জিজ্ঞেস করছে! এতে কাঁদতে হবে কেন?
পুষ্প এবার ব্যথায় নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে। শব্দ করে কাঁদে না, প্রতি রাতে গুমরে কাঁদতে কাঁদতে শব্দ করে কাঁদা হয়তো ভুলেই যাচ্ছে। আর্য পুষ্পকে নীরবে কাঁদতে দেখে থমকে গেল। কেন জানি না, তার খুব অস্থির লাগছে মেয়েটার চোখের পানি দেখে! আর্য আর নিতে পারল না, ধমকে উঠল—
– “এই মেয়ে, কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে মেরেছি?”
আর্যর ধমকে পুষ্পর কোলে থাকা খরগোশ দুটোও চমকে উঠল, দৌড়ে কোল থেকে নেমে গেল। পুষ্প ভয়ে ভয়ে দুই দিকে মাথা নেড়ে বোঝাল—মারেনি।
– “তাহলে কাঁদছ কেন, ড্যামইট? কান্না বন্ধ করো।”
পুষ্প তাড়াহুড়ো করে নিজের চোখের জল মুছে নিল, চোখের জল আটকানোর চেষ্টা করতে লাগল।
ইভান অনেকক্ষণ আহনাফের সাথে গল্প করে, এর মধ্যে নিচে নেমে এলেন শেহনাজ সরকার। ইভানকে দেখামাত্রই তিনি কাজের লোকদের নাস্তা রেডি করতে বলেন। ইভান আর আর্য বাড়িতে প্রবেশ করতেই মাগরিবের আজান দিয়ে দেয়। শেহনাজ সরকার আর জেনিফার সরকার নামাজ আদায় করে নিচে নামতেই ইভানকে দেখতে পান।
ইভান শেহনাজ সরকারটিকে দেখে সালাম দেয়, শেহনাজ সরকারও সালামের জবাব দিয়ে টুকটাক কুশল বিনিময় করেন। এর মধ্যে কাজের মেয়ে নাস্তা নিয়ে এলো। শেহনাজ সরকার ইভানকে খেতে বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন, যেখানে জেনিফার সরকারও গেছেন। দুজন মিলে রাতের রান্নার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন।
সিমরান ওপরে সিঁড়ির পাশে পিলারের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখছে ইভানকে। সিমরান ফ্রেশ হয়ে কাপড় পাল্টে এখন সুতির মধ্যে কলাপাতা রঙের থ্রি-পিস পরেছে, যেটা তাকে বেশ মানিয়েছে। তার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বাড়ছে ইভানকে দেখার পর থেকে। ওপরে রুমে যাওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে, আর একটু দেখলে ভালো হতো! তাই সে কাপড় পাল্টে এসে উঁকি দিয়ে দেখছে ইভানকে।
সিমরান নিজের মনে মনে ভাবছে— ‘সে কি সত্যি প্রেমে পড়ে গেল লোকটার? নাকি শুধু দেখতে ভালো লাগছে? কীভাবে বুঝব প্রেমে পড়েছি নাকি শুধু চোখের দেখা ভালো লাগছে?’
ইভান বারবার উঁকি দিচ্ছে উপরের দিকে, হয়তো কারো অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এর মধ্যে নিচে নেমে এলো পুষ্প। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল শেহনাজ সরকার কোথায় আছেন। পুষ্প খেয়াল করছে সোফায় বসা ইভান তার দিকে তাকিয়ে আছে অদ্ভুত এক ঘোর লাগা দৃষ্টিতে। শেহনাজ সরকার রান্নাঘরে আছেন বুঝতে পেরে সেদিকে পা বাড়ায় পুষ্প। কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বাঁধল বিপত্তি! পা বেজে পড়ে যেতে নিলে—
– “মায়াবীনি সাবধানে!”
ইভানের মুখে মায়াবীনি শব্দটা এতোই ক্ষীণ ছিল যে পাশে বসা আহনাফও শুনতে পায়নি। ইভান দৌড়ে এসে পুষ্পকে আগলে নিয়ে ধরে ফেলে। পুষ্প তো ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে আছে, হয়তো অপেক্ষা করছে পড়ে গিয়ে কোমর ভাঙার! কিন্তু ব্যথা পায়নি সেটা বুঝতে পেরে পিটপিট করে চোখ খুলে দেখে সে পড়েনি।
– “তুমি ঠিক আছ?”
অপরিচিত কণ্ঠ শুনে পুষ্প দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সরে দাঁড়ায়। সে সৌজন্যতা বজায় রেখে মিনমিন করে বলল—
– “জি, ঠিক আছি। ধন্যবাদ আপনাকে!”
এর মধ্যে আহনাফ এসে পুষ্পকে জিজ্ঞেস করে—
– “পুষ্প, ঠিক আছিস?”
– “হুম, আমি ঠিক আছি। উনি বাঁচিয়ে নিয়েছেন!” ইভানের দিকে তাকিয়ে বলল সে। আহনাফ আর কিছু না বলে সিঁড়ির দিকে আর্যকে আসতে দেখে পুষ্পকে যেতে বলে ওপরে চলে গেল।
আর্য এতক্ষণ সবকিছু দেখেছে! সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পুষ্পর চলে যাওয়ার দিকে। সে রীতিমতো বিরক্ত নিজের ওপর, নাকি ওই মেয়ের ওপর—বুঝতে পারছে না। এই মেয়ে তার সামনে থাকলেও বিরক্ত লাগে, আবার সামনে না থাকলেও বিরক্ত লাগে; কী হচ্ছেটা কী তার সাথে! সব মিলিয়ে সে নিজের ওপর প্রচুর বিরক্ত। আর্যকে দেখামাত্র ইভান এসে তাকে টেনে সোফায় বসিয়ে বলল—
– “শালা, তুই বলিসনি কেন এটা তোর বোন?”
– “ওই মেয়েকে আমি বোন মানি না!” আর্য কিছুটা চিৎকার করে বলে উঠল! আর্য আরও বিরক্ত হয়। সে মেয়েটাকে নিজের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে, আর এরা একেকজন তাকে বারবার মেয়েটার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে!”
ইভান কিছু মনে করল না। সে ভাবল এখানেও মেয়েজাতিকে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে তার বন্ধুর। সে মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলল—
– “বোন মানতেও হবে না। তুই একেবারে ভাবি ডাকিস, আমার সাথে বিয়ে হওয়ার পর।”
– “কিছু বললি?” আর্যর কথায় ইভান বলল—
– “কই, কিছু না!”
তারপর সে মনে মনে ভাবতে লাগল— ‘এখন যদি আর্যকে বলে তার বোনকে সে পছন্দ করে, তাহলে আবার শুরু করবে—মেয়েরা ভালোবাসতে জানে না, লোভী। তার জন্য যদি তার মায়াবিনীর ওপর রাগ দেখায় আর্য? তার চেয়ে বরং আরও কিছুদিন যাক। সে তার মায়াবিনীকে নিজের মনের কথা জানাক, তারপর বোঝা যাবে।’
শেহনাজ সরকারের জোরাজুরিতে ইভান রাতের খাবার খেয়ে তারপর চলে গেছে। কিন্তু বেশ কায়দা করে পুষ্প কোন কলেজে পড়ে, সেটা জেনে গেছে। শেহনাজ সরকার পুষ্পর সাথেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ইভানের, কিন্তু নিজের ভাইয়ের মেয়ে হিসেবে, আর্যর স্ত্রী হিসেবে নয়। এতে সবাই বেশ অবাক হয়, তবুও কিছু বলে না।
আর্যও বেশ অবাক হয় যে মা সবসময় চায় পুষ্পকে যেন আর্য বউ হিসেবে মেনে নেয়, সবসময় বউ বউ করে, সে আজ বোন বানিয়ে দিল! কত সুন্দর বলে দিল— “আমার ভাইয়ের মেয়ে, আর্যর মামাতো বোন।” কিন্তু কথাটা শুনে কেন যেন আর্যর মোটেও ভালো লাগল না। সে খাবার টেবিল ছেড়ে নিজের রুমে চলে যায়।
আর্য চলে যাওয়ায় কেউ কিছু মনে করল না, সবাই জানে সে এরকম। কিন্তু পুষ্প আর খেতে পারল না। সে প্লেটে হাত নেড়ে নেড়ে বসে থাকে, সেটা শেহনাজ সরকার খেয়াল করে পুষ্পর খেতে ইচ্ছে না করলে উঠে যেতে বলেন। পুষ্প যেন এই বলার অপেক্ষাতেই ছিল, হাত ধুয়ে উঠে চলে যায়। পুষ্পর চলে যাওয়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ইভান। এরপর খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ইভান চলে যায়, বাকিরাও সব গুছগাছ করে ঘুমাতে চলে যায়।
পুষ্প রুমে এসে দেখে আর্য নেই। বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখে সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। সেটা দেখে পুষ্প বিড়বিড় করে বলল—
– “পাগলেও নিজের ভালো বোঝে, তাহলে সরকার সাহেব কেন বুঝতে পারেন না? মদ-সিগারেট এগুলো নিজের শরীরের ক্ষতি করে!”
তবে মুখ ফুটে বলার সাহস নেই পুষ্পর। পরক্ষণে পুষ্পর মনে পড়ে বারান্দায় তো তার তুলতুল আর তুলি আছে, তাদেরও যদি ক্ষতি হয়ে যায়! তাই সে চুপিচুপি গিয়ে খরগোশ দুটোকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরতেই কানে আসে আর্যর কণ্ঠস্বর—
– “মেয়ে, তুমি বড্ড স্বার্থপর! নিকোটিনের ধোঁয়া যে টানছে তার ক্ষতি হবে জেনেও থামাচ্ছ না, অথচ সেই নিকোটিনের ধোঁয়ায় ওই প্রাণী দুটোর ক্ষতি হবে বলে চুপিচুপি নিয়ে যাচ্ছ! তোমরা মেয়েরা এত স্বার্থপর কেন, হোয়াই?”
আর্যর কথা শুনে পুষ্প কী বলবে বুঝতে পারছে না। আর্যর আচমকা বলায় পুষ্পর বুক রীতিমতো কাঁপছে ভয়ে। এখন আর্যর কথা শুনে ভয় কিছুটা কেটে গেলেও পুরোপুরি যায় না। তবুও সে আর্যর কথার বিপরীতে মিনমিন করে বলল—
– “আ… আপনাকে বললেই কি আপনি ছেড়ে দেবেন? উল্টো না হয় আমাকে মারবেন, নয়তো বকবেন!”
পুষ্পর কথা শুনে আর্য ঝড়ের বেগে এসে পুষ্পর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে বলল—
– “এক্স্যাক্টলি, ঠিক ধরেছ! তাই চুপচাপ থাকবে, আমার থেকে দূরে থাকবে। ভুলেও আমার আশেপাশে আসবে না, গট ইট?”
আর্য সন্ধ্যার বেলাতেও পুষ্পর কাঁধ চেপে ধরায় নখ দেবে গিয়েছিল। এখন একই জায়গায় আর্য আবার চেপে ধরায় পুষ্প ক্ষীণ স্বরে আর্তনাদ করে উঠল—
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৭
– “আহ্!”
পুষ্পর আহ্ শব্দটা শুনে আর্য উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল—
– “কী হয়েছে? আর ইউ হার্ট?”
পুষ্পর আঁখিজুগল ভিজে উঠল। সেদিকে তাকিয়ে আর্য আবার বলল—
– “স্টুপিড, কী হয়েছে বলছ না কেন?”
