Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩১

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩১

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩১
বন্যা সিকদার

​রাত তখন অনেকটাই গভীর। মৌ গুটিসুটি মেরে বিছানার এক কোণে লেপ্টে শুয়ে আছে। উজান পেছন থেকে মৌ’কে নিজের বুকের কাছে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করতেই মৌ বারবার তার থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। মানুষটার প্রতি তার এখন আকাশসম অভিমান! সামান্য পড়তে না চাওয়ার কারণে লোকটা তাকে গুনে গুনে পাঁচটি বেতের আঘাত করল? তাহলে এখন আবার কেন তাকে নিজের বুকে টেনে নিতে চাইছে? আঘাত করার সময় যার হাত একবারের জন্যও কাঁপেনি‚ মৌ কেন এখন সেই পাষাণ মানুষটার কাছে যাবে? ​উজান আবারও মৌ’য়ের হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। মৌ সঙ্গে সঙ্গে এক ঝামটা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। কিন্তু উজানও নাছোড়বান্দা! সে জোর করে মৌ’য়ের পা দুটো নিজের বুকের ওপর টেনে নিল কিন্তু মৌ এবারও নিজের পা ঝটকা মেরে সরিয়ে নিল। উজান এতে অবাক হলো না; সে উল্টো মৌ’য়ের হাত ধরে নিজের দিকে এক তীব্র টান দিল‚ মৌ তবুও অনড় থেকে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে রইল। ​এবার উজান নিজের ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে ফেলল। সে এক ঝটকায় মৌ’য়ের শরীরের ওপর নিজের চওড়া শরীরের খানিকটা ভর ছেড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের মুখের রঙ পাল্টে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই উজান মৌ’য়ের গলায় নিজের মুখ গুঁজে দিল।

​“ওহুঁ! একদম ছটফট করবে না নয়তো হিতে বিপরীত হবে। আর এই সামান্য কারনে কেউ এভাবে অভিমান করে থাকে‚ হ্যাঁ?
​মৌ তবুও তার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে ছটফট করতে লাগল। সে একরাশ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল‚ “যারা ভালোবাসার মূল্য বোঝে না‚ তাদের কাছে অপরের কষ্টটা সবসময়ই ‘সামান্য’ মনে হয়। আর আমি তো বলিনি যে আমি অভিমান করে আছি! আপনি তো নিজেই চান আমি আপনার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলি‚ তাহলে এখন আবার কেন জোর করে কাছে টেনে নিচ্ছেন? আমি খুব ভালো করেই জানি আপনি আর আকাশের চাঁদ‚ দুটোই আমার চাওয়ার একবারে বাইরে।
​মৌ’য়ের মুখের কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল উজান। মেয়েটার মধ্যে হুট করে কেমন যেন একটা ম্যাচিউরিটি দেখা যাচ্ছে! কত গুছিয়ে কথা বলতে শিখে গেছে সে‚ নিজের ভেতরের তীব্র কষ্টটাকেও আড়াল করতে শিখেছে। তার এই আচরণ দেখে উজান মনে মনে মৃদু হাসল। সে মৌ’য়ের অশ্রুসজল চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর সুরে আওড়াল‚

​“আমি কখন বললাম যে তুমি আমার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলবে‚ হুম? আমি চাইলেও তুমি আমার বুকে থাকবে‚ আর আমি না চাইলেও তুমি আমার বুকেই থাকবে বুঝতে পেরেছো?
​”তাসফিয়া মৌ ভালোবাসার ক্ষেত্রে নির্লজ্জ হতে পারে প্রফেসর সাহেব‚ তবে তার আত্মসম্মান বলতেও একটা জিনিস আছে! আমি শুধু দূরত্ব বজায় রাখব না; এই পরীক্ষাটা শেষ হলেই আমি সারাজীবনের জন্য আমার নিজের বাড়িতে চলে যাব।
যদি কখনো আপনার মনে হয় এই অবাধ্য মেয়েটাকে আপনার সত্যি প্রয়োজন‚ সেদিন আপনি নিজে গিয়ে আমাকে নিয়ে আসবেন। আমি অপেক্ষা করব‚ আমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব। আমি আপনার কাছে ভালোবাসা চেয়েছি কিন্তু কোনো ভিক্ষা নয়! তাসফিয়া মৌ ভালোবাসার জন্য সবকিছু বিলিয়ে দিতে পারে‚ তবে কখনো কারো কাছে হাত পাতবে না। আপনার যদি মনে হয় আমাকে ছাড়া আপনি সারাজীবন অন্য কাউকে নিয়ে খুব সুখে থাকবেন‚ তবে আপনার জন্য অগ্রিম শুভকামনা রইল। আমি কখনোই আপনার পথের বাধা হয়ে দাঁড়াবো না; তবে জেনে রাখবেন। আমার জীবন থেকে বিচ্ছেদ নামে আপনার কোনোদিনও মুক্তি নেই!

​উজান অপলক দৃষ্টিতে মৌ’য়ের অশ্রুঝরা কণ্ঠের এই কঠিন বাক্যগুলো শুনল। মেয়েটার বাইরের চঞ্চল রূপটা দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না যে তার ভেতরে কতটা তীব্র হাহাকার লুকিয়ে আছে! মেয়েটা তার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করবে কিন্তু তাকে কখনো মুক্তি দেবে না। মৌ’য়ের এই শুকিয়ে যাওয়া মলিন মুখটা দেখে উজানে’র নিজের বুকের ভেতরটাও এক তীব্র হাহাকারে কেঁপে উঠল। অতঃপর সে দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। ​সে এক তীব্র চাহনি দিয়ে বলে‚
“ভুল বললেন মিসেস চৌধুরী! আপনি এখন আর শুধু তাসফিয়া মৌ নন‚ আপনি হলেন মিসেস উজান চৌধুরী। আর আপনার এই অদ্ভুত ম্যাচিউরিটি উজান চৌধুরী শুনতে চায় না; আপনি আমার কাছে আগের মতোই অবাধ্য থাকবেন। আর আপনি চাইলেই কি আমি আপনাকে আমার জীবন থেকে চলে যেতে দেব? আমি মুখে মানি আর না মানি‚ আপনি আমার ওয়াইফি। আমার পারমিশন ছাড়া আপনি একা এক পা-ও ঘরের বাইরে দিতে পারবেন না জাস্ট মাইন্ড ইট!

​”তাসফিয়া মৌ কখনো কারো কড়া কথার ধার ধারে না। তার নিজের মন যা বলে‚ সে সবসময় তাই করে। আমি যখন বলেছি আমি চলে যাব‚ তার মানে চলেই যাব!
​এই বলেই মৌ নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে উজান’কে নিজের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল এবং বেড থেকে নেমে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও এই মানুষটার কাছে থাকতে পারছে না। বুকের ভেতর বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। নিজের চোখের অনবরত ঝরতে থাকা অশ্রু লোকটার থেকে লুকানোর জন্যই সে ঘর ছেড়ে চলে গেল। ​উজান এবার আর মৌ’য়ের পিছু নিল না। মেয়েটাকে এই মুহূর্তে কিছুটা টাইম দেওয়া উচিত বলে সে মনে করল। তাছাড়া সে ভালো করেই জানে‚ মৌ এখন রাগ করে সোজা মৌসুমি চৌধুরী কিংবা তুবা ভাবির রুমে যাবে। আর এই মুহূর্তে তার অভিমান ভাঙানোর একমাত্র ও মোক্ষম ওষুধ ওরাই।

​মৌ করিডোর দিয়ে খানিকটা পথ এগিয়ে গিয়ে বারবার আশায় বুক বেঁধে পেছনের দিকে তাকাল। কিন্তু না‚ উজান তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পেছনে আসেনি। এতে মৌ’য়ের মনের ভেতরের ক্ষতটা আরও দ্বিগুণ হয়ে জমা হলো। সে ভেবেছিল হয়তো মানুষটা তাকে পেছন থেকে এসে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে; একটু হলেও হয়তো তার জন্য মানুষটার মনে ভালোবাসা কাজ করবে। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারল‚ এসবই ছিল তার একতরফা রঙিন কল্পনা।

​দু-চোখ বেয়ে নোনতা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল মৌ’য়ের। সে আজ পরিষ্কার বুঝে গেছে যে মানুষটা তার নিজের নয়‚ সে আর কখনো তার পিছু নেবে না। তাছাড়া উজান নিজেই তো বলেছিল যে তার জীবনে ভালোবাসার অন্য কোনো মানুষ রয়েছে‚ যাকে সে অসম্ভব ভালোবাসে! এমনকি সেই রহস্যময়ী নারীর জন্য উজান নিজের ক্যাবিনেটে লুকিয়ে রেখে দিয়েছে শত শত গিফট। সেই মেয়েটা যদি মৌ নিজে হতো‚ তবে উজান অন্তত একটা বারের জন্য হলেও তাকে বলত; কিন্তু সে কোনোদিন বলেনি। উল্টো মৌ অনেকবার দেখেছে উজান ফোনের স্ক্রিনে কারো একটা ছবির দিকে তাকিয়ে রোজ একা একাই হাসে‚ গভীর ভালোবাসায় চুমু খায়! এমনকি সেই মেয়েটার ছবি উজান নিজের ফোনের ওয়ালপেপারেও দিয়ে রেখেছে। আজকাল ফোনের পাসওয়ার্ডও চেঞ্জ করে ফেলেছে সে; আগের মতো মৌ’কে আর ওনার ফোন ঘাঁটতে দেয় না। প্রতিটি কথায় শুধু শাসন আর কড়াকড়ি। ​এসব অবহেলা আর মানসিক কষ্ট মৌ আর নিতে পারছে না‚ তাই সে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার এই কঠিন পথটাই বেছে নিয়েছে।
সে খুব ভালো করেই বুঝে গিয়েছে যে থাকতে চায় না‚ তাকে জোর করে ধরে রাখা যায় না। তাই সে এবার মানুষটাকে মুক্ত আকাশে উড়তে দেবে; লোকটা যদি সত্যিই তার ভাগ্যে থাকে‚ তবে একদিন ঠিকই নিজের নীড়ে ফিরে আসবে।

​মৌ রাগ করে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রায় আধ ঘণ্টা কেটে গেছে। ঘড়ির কাঁটা তখন জানান দিচ্ছে রাত প্রায় আড়াইটা। এতক্ষণে উজানে’র মনের ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা স্তিমিত হলো। সে বিছানা থেকে নেমে রুম থেকে বেরিয়ে গেল মৌ’য়ের খোঁজে। সে ভাবল মেয়েটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে নিজের শাশুড়ির বুকে মাথা গুজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। উজান ধীর পায়ে নিচে নেমে এসে প্রথমে নিজের মায়ের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু অবাক কাণ্ড! রুমের দরজাটা ভেতর থেকে শক্ত করে আটকানো। মৌ যদি মায়ের কাছে আসতো‚ তবে দরজা কোনোদিনই ভেতর থেকে বন্ধ থাকত না; কারণ মৌসুমি চৌধুরী মৌ’য়ের জন্য নিজের রুমের দরজা সবসময় খোলাই রাখেন।

​মায়ের রুমে মৌ’কে না পেয়ে উজানে’র কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে মনে মনে ভাবল তাহলে কি মেয়েটা তুবা ভাবির রুমে গিয়ে উঠেছে? উজান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বড় ভাই আরিয়ানে’র রুমের সামনে গেল এবং ধাক্কা দিতে লাগলো। উজান ঘুমন্ত আরিয়ান’কে টেনে তুলল। কিন্তু পুরো রুম চোখ বুলিয়েও সে কোথাও মৌ’য়ের অস্তিত্ব খুঁজে পেল না। তুবা ভাবিও ঘুমে চোখ কচলাতে কচলাতে জানালেন যে মৌ এখানে আসেনি। ​তুবা’র মুখে এই কথাটি শোনামাত্রই মুহূর্তের মধ্যে উজানে’র মুখের সমস্ত রঙ পাল্টে গেল! এক তীব্র ও গভীর অজানা ভয় তার বুকের ভেতর জেঁকে বসল। গভীর রাতে একটা মেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে কোথায় যেতে পারে?
উজান পাগলের মতো প্রায় দৌড়ে বাড়ির প্রতিটি রুম‚ প্রতিটি কোণ‚ এমনকি কিচেন রুম পর্যন্ত খুঁজে শেষ করল; কিন্তু মৌ কোথাও নেই‚ যেন কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে সে! ​উজানে’র বুকটা এবার ভয়ে ধক করে উঠল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। হাত-পা যেন ক্রমশ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। হুট করেই তার মনে হলো মৌ মন খারাপ হলে প্রায়ই একটা জায়গায় যায়। উজান আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে বিদ্যুৎ গতিতে সিঁড়ি বেয়ে সোজা ছাদে চলে এলো।

​ছাদের দরজা ঠেলে বাইরে পা রাখতেই রাতের শীতল হাওয়া উজানে’র গায়ে এসে লাগল। আর ঠিক তখনই সামনে তাকিয়ে উজানে’র বুকের ভেতরের জমে থাকা ভয়টা এক নিমেষে শীতল শান্ত হয়ে গেল। সে দেখল ছাদের এক কোণে দোলনাটায় মৌ গুটিসুটি মেরে বসে আছে এবং দুলতে দুলতেই এক সময় ওখানেই ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া নোনতা জলের দাগগুলোর ওপর। হয়তো এই নিঝুম রাতে একা একা আকাশকে নিজের সব অভিযোগ জানাতে জানাতেই মেয়েটা ক্লান্ত হয়ে ওভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে।
​উজান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ঝড়ো গতিতে এগিয়ে গিয়ে মৌ’কে আলতো করে নিজের চওড়া বুকের সাথে চেপে ধরল। মৌ’য়ের পাতলা শরীরটাকে এক ঝটকায় নিজের পাঁজা কোলে তুলে নিল সে। আচমকা এই শূন্যে ভেসে ওঠার কারণে মৌ ঘুমের ঘোরেও চরম এক অজানা ভয়ে উজানে’র শার্টের কলারটা নিজের নখ দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরল। উজান পরম মায়ায় তার দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে লাগল।

​রুমে এসে উজান মৌ’কে অত্যন্ত যত্ন সহকারে‚ আলতো করে নরম বিছানার শুইয়ে দিল। তারপর সে নিজেও মৌ’য়ের সাথে সমস্ত দূরত্ব ঘুচিয়ে তার শরীরের বড্ড কাছাকাছি নেমে এলো। মৌ তখনো ঘুমের ঘোরে অচেতন‚ তবে বরের পরিচিত পুরুষালি গায়ের সুবাস পেতেই সে এবার অবচেতন মনেই উজানে’র বুকের সাথে একেবারে মিশে গেল। কিন্তু তার ভেতরের অবদমিত ক্ষোভটা যেন ঘুমের মধ্যেও শান্ত হয়নি। সে আচমকা মুখ বাড়িয়ে উজানে’র শক্ত হাতের ওপর দাঁত দিয়ে সজোরে এক কামড় বসিয়ে দিল! উজান ব্যথায় সামান্য একটু হাসল বটে‚ তবে মুখ ফুটে টু শব্দটিও করল না; বরং কামড় খাওয়া হাতটা দিয়ে মৌ’য়ের পিঠটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ​ঠিক তখনই‚ ঘুমের ঘোরেই মৌয়ের ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। এক তীব্র কান্নার দমক সামলে অত্যন্ত অস্পষ্ট ও ভাঙা স্বরে সে বিড়বিড় করে বলে উঠল।
​“আপনি অনেক পঁচা‚ অনেক নিষ্ঠুর প্রফেসর সাহেব! আমি আপনার সাথে আর এই রুমে থাকব না। এই পরীক্ষাটা শেষ হতে দিন‚ আমি অনেক দূরে চলে যাব অনেক দূরে। আপনি আমায় একটুও ভালোবাসলেন না। আমি শুধু খাতা-কলমে আপনার নামমাত্র বউ হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না! আমি আপনার সত্যিকারের মনের বউ হতে চাই। আপনি আমাকে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসবেন‚ সারাদিন আমাকে নানা ছুতোয় বড্ড জ্বালাতন করবেন…আমাকে সারাজীবন নিজের ‘বউ বউ’ বলে পাগলের মতো আমার পিছু পিছু ঘুরবে! কিন্তু আপনি তো আমায় কোনোদিন নিজের মুখে বউ বলেই স্বীকার করবেন না। আমি আর থাকব না এখানে একটুও না।

​কথাগুলো শেষ করতেই মৌ ঘুমের ঘোরেই এবার ডুকরে কেঁদে উঠল। তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তাজা অশ্রু গড়িয়ে বালিশে মিশে গেল। ​উজান এক দৃষ্টিতে নিজের প্রেয়সী’র সেই চরম বিষণ্ণ ও মলিন মুখখানার দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা এক তীব্র অনুশোচনায় মোচড় দিয়ে উঠল।
ইসস! এই নিষ্পাপ‚ মিষ্টি মেয়েটাকে সে কতই না আঘাত করে চলেছে রোজ। এতটা কঠোরতা না দেখালে কি সত্যিই চলত না? উজান এক দীর্ঘ উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। ​সে আর নিজের ভেতরের ভালোবাসার জোয়ারকে আটকে রাখতে পারল না। সমস্ত নিয়ম‚ কানুন আর গাম্ভীর্যের দেয়াল ভেঙে উজান নিজের মুখখানা প্রেয়সী’র মুখের দিকে নামিয়ে আনল। তারপর এক নাগালে‚ পরম ব্যাকুলতায় গুনে গুনে প্রায় পাঁচশত চুম্বনে ভরিয়ে দিল মৌ’য়ের সারা মুখমণ্ডল! কপাল‚ চোখ‚ নাক‚ গাল কোথাও সে ছোঁয়া দিতে বাকি রাখল না। এতক্ষণের সব অবহেলা আর বেতের আঘাতের প্রায়শ্চিত্ত যেন সে এই গভীর চুম্বনের নদী দিয়ে করতে চাইল। ​উজানে’র সেই শীতল ও তীব্র ঠোঁটের ছোঁয়ায় ঘুমের ঘোরেও বারবার শিউরে শিউরে উঠতে লাগল মৌ।

অবশেষে উজান মৌ’য়ের কাঁপতে থাকা ওষ্ঠাধরে নিজের ঠোঁট দুটো গভীরভাবে স্থাপন করল। এক নিবিড় ও দীর্ঘ চুম্বনে মৌ’কে আবদ্ধ করে‚ তার ঠোঁটের কোণে মুখ রেখেই উজান অত্যন্ত ধীর ও মাদকতাময় স্বরে বিড়বিড় করে আওড়াল‚

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩০

​“আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি‚ জান! জাস্ট মাত্র কয়েকটা দিনের অপেক্ষা! তারপর এই উজান চৌধুরী অনলি ইয়োরস। এই উজান চৌধুরী তখন তার জীবনের সমস্ত গভীর ভালোবাসা দিয়ে রাঙিয়ে দেবে আপনাকে! আমার সেই ভালোবাসার পাগলামি আর তীব্রতায় আপনি নিজে একদিন অতিষ্ঠ হয়ে যাবেন‚ আমাকে দূরে ঠেলে দিতে চাইবেন; তবুও এই উজান চৌধুরীর বুক থেকে আপনার এক বিন্দুও ছাড় মিলবে না। বড্ড ভালোবাসি যে আপনাকে! আমার এই ছোট্ট‚ ত্যাঁড়োমুখো পিচ্চি বউ’টাকে উজান চৌধুরী নিজের জীবনের চেয়েও অনেক অনেক অনেক বেশি ভালোবাসে…!

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here