Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ২৯

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ২৯

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ২৯
বন্যা সিকদার

​দীর্ঘ সাত বছর পর নিজের মাতৃভূমিতে পা রাখতে চলেছে রোহান তালুকদার। গুনে গুনে সাত-সাতটি বছর সে প্রবাসে কাটিয়েছে। নিজের প্রাণের প্রেয়সী’কে চিরতরে নিজের করে পাওয়ার আশায়‚ জীবনের সবচেয়ে শখের বয়সে সে দূর প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিল। অথচ সে দূরতম কল্পনাতেও জানে না‚ তার সেই ‘প্রিয় প্রেয়সী’ এখন অন্য কারো ঘরনী‚ অন্য কারো অর্ধাঙ্গিনী! ​রোহান প্রথমে নিজের বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করে‚ তারপর নিজের শৈশব কেটে যাওয়া গ্রামের চারদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। এই ধুলোবালি মাখা গ্রামেই তার পুরো শৈশব-কৈশোর কেটেছে।

এয়ারপোর্ট থেকে তাকে পিকআপ করতে গিয়েছিল তার কিছু বন্ধু। সে যে আজ হঠাৎ দেশে ফিরছে‚ এই খবরটা শুধু সাব্বিরই জানত। প্রেয়সী’কে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই তার এভাবে চুপিচুপি আসা। ​তার সেই আজন্ম কাঙ্ক্ষিত প্রেয়সী আর কেউ নয়‚ চৌধুরী বাড়ির মেজো বউ উজান চৌধুরীর ওয়াইফ তাসফিয়া মৌ! অথচ এই মেয়েটাকেই রোহান নিজের যৌবনের প্রথম প্রহর থেকে পাগলের মতো ভালোবাসত।
রোহান যখন চব্বিশ বছর পেরিয়ে যৌবনের পঁচিশ কোঠায় পা রেখেছিল‚ ঠিক সেই দিন তার চাচাতো বোন তাসফিয়া মৌ লাল টুকটুকে বউ সেজে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তখন মেয়েটির বয়স ছিল মাত্র আট বছর। সে তখন ভালোবাসার ‘ভ’ কিংবা বিয়ের ‘ব’-ও বুঝত না। কিন্তু রোহান তখন থেকেই তাকে ‘আমার বউ‚ আমার বউ’ বলে চারপাশ পাগল করে তুলত। প্রথম প্রথম মৌ বিরক্ত না হলেও‚ যখন থেকে সে বুঝতে শুরু করল ভালোবাসা কী আর বিয়ে কী তখন থেকেই সে রোহান’কে এড়িয়ে চলা শুরু করল। মৌ’য়ের কাছে রোহান বড়জোড় একজন ভাইয়ের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না।

কিন্তু রোহানে’র গল্পটা ছিল ভিন্ন। মেয়েটা বয়সে অনেক ছোট হলেও‚ তার প্রতি এক অদ্ভুত, গভীর অনুভূতি জন্মেছিল রোহানে’র মনে। এরপর থেকে দিন যত গেছে মেয়েটার প্রতি তার আসক্তি ও দুর্বলতা ততই বেড়েছে। বাড়ির সবাই রোহানে’র এই পাগলামির কথা জানত‚ তবে সবাই ভাবত এটা বুঝি নিছক মজার ছলে বলা কোনো কথা। অথচ এই ছেলেটি দীর্ঘ নয়টি বছর ধরে মনে-প্রাণে শুধু মৌ’কে নিজের করে পেতে চেয়েছে; তাকে নিজের ঘরণী করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সে বুকে লালন করে এসেছে। যে ছেলেটি ছিল ছন্ন ছাড়া বেপরোয়া‚ সে শুধু মাএ প্রেয়সী’কে নিজের করে পাওয়ার জন্য অচেনা দেশে পারি জমায়।
​রোহান তালুকদার বাড়ির মেইন গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল। বিশাল বড় রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি তাদের। বাড়িটা মূলত পৈতৃক‚ অনেক বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দালান। রোহান আর দু-কদম এগিয়ে যেতেই উঠানে দেখতে পেল তার দাদী রোকেয়া বেগম রোদে দেওয়া আচারের বৈয়াম নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকছেন। আর ঠিক তখনই ওনার কানের কাছে এক চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

​“বড় বউ! তোমার সোয়ামী এসেছে বরণ করবে না আমায়?
​রোকেয়া বেগম চমকে উঠলেন। তিনি স্পষ্ট শুনতে পেলেন তালুকদার বাড়ির বড় নাতির চেনা গলা! নাতি-নাতনিদের মধ্যে এই রোহান তার ভীষণ প্রিয়। পেছনে ফিরে রোহান’কে দেখা মাত্রই বৃদ্ধার বুকটা হু হু করে উঠল। হাতের আচারের বৈয়ামটা কোনো রকমে এক পাশে রেখে তিনি প্রায় দৌড়ে এলেন রোহানে’র কাছে। ছেলেটাকে অনেকগুলো বছর দেখেননি কিন্তু তার চেহারার দিকে তাকিয়ে চিনতে ওনার বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হলো না। রোহান নিজের দাদীকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল। রোকেয়া বেগম খুশিতে ও আবেগে কেঁদে দিলেন। রোহান কোনোভাবেই ওনাকে শান্ত করতে পারছে না। ​সে মুচকি হেসে বলে‚ “এই বুড়ি কান্না করছো কেন হ্যাঁ? এমন করলে কিন্তু আমি আবার প্লেনে চড়ে চলে যাব।
​কথাটা শোনামাত্রই রোকেয়া বেগম নাতির হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলেন‚

“আর কোথাও যাস না রে এই বুড়িটাকে ছেড়ে দাদাভাই! মরার আগে তোদের সবাইকে নিয়ে একসাথে থাকতে চাই।
​দাদীর কথা শুনে কিছুটা অভিমান হলো রোহানে’র। সে মন খারাপ করে আওড়ায়‚ “আবার ওই মরার কথা শুরু করে দিলে তো? আমার আসাই ভুল হয়েছে। আমি এখনই চলে যাচ্ছি।
​”দাদাভাই আমার সোনা দাদাভাই আর বলবো না ঘরে চল। তোকে দেখলে বাড়ির সবাই যে কত খুশি হবে দেখিস!
​রোহান মুচকি হাসল। সে মনে মনে তার ‘ফুল’ অর্থাৎ মৌ’কে নিয়ে বড্ড এক্সাইটেড হয়ে আছে। মেয়েটা তাকে প্রথম দেখায় চিনতে পারবে তো? তাকে দেখে খুশি হবে নাকি আগের সেই পিচ্চিকালের মতো দূরে দূরে পালিয়ে বেড়াবে? এই ভাবনার মাঝেই রোহান চঞ্চল গলায় বলে উঠল‚
“দাদী আমার ফুল কোথায়? ফুল কি আমার অপেক্ষায় দিন গুনছে?
​এই বলেই রোহান দাদীর হাত ছেড়ে এক দৌড়ে বাসার ভেতরে ঢুকে পড়ল। আর রোকেয়া বেগম ঠিক সেখানেই পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এতগুলো বছর ধরে মনে মনে যে ঝড়টার ভয় তিনি পেয়েছিলেন‚ আজ সেই ভয়ংকর ঝড় ঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে! কী হতে চলেছে সামনে? রোকেয়া বেগমও নিজের চোখের জল মুছে তড়িঘড়ি করে রোহানে’র পিছু নিলেন। ​রোহান বাড়ির ভেতরে ঢুকেই চারপাশ মাথায় তুলে হাঁকডাক শুরু করে দিল।

​“ফুল এই ফুল‚ দেখে যা তোর রোহান ভাই এসেছে রে। তোর জন্য বিদেশ থেকে কত গিফট নিয়ে এসেছি। তোকে বউ করে ঘরে তোলার জন্য যা যা লাগবে সব এনেছি আমি। অনেক টাকা রোজগার করে এনেছি। আয় না ফুল‚ কোথায় তুই?
​ততক্ষণে ড্রয়িংরুমে বাড়ির সবাই এসে হাজির হলো। মৌ’য়ের বাবা-মা‚ ছোট চাচা-চাচি‚ চাচাতো বোন এবং মৌয়ে’র ছোট্ট ভাইও সেখানে এলো। রোহান’কে অক্ষত শরীরে এত বছর পর ফিরে দেখে সবাই ভীষণ খুশি হলেন। রোহান এক এক করে সকলের সাথে পরম মায়ায় কুশল বিনিময় করল। অতঃপর সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে একছুটে মৌ’য়ের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। পেছন থেকে মৌ’য়ের বাবা ডাকলেন কিন্তু সে কিছুই শুনতে পেল না। ​মৌ’য়ের রুমে গিয়ে যখন তাকে কোথাও পাওয়া গেল না‚ তখন রোহান আবারও ড্রয়িংরুমে ফিরে এলো এবং উদগ্রীব কণ্ঠে প্রশ্ন করল।

​“সেজো আব্বু! আমার ফুল কই গো? আমার ফুল কি কলেজে গিয়েছে? বলুন না‚ আমার ফুল কোথায়? আমি আমার ফুলে’র জন্য কত জিনিস এনেছি! আপনিই তো বলেছিলেন না আমি প্রতিষ্ঠিত হলে‚ আমি অনেক টাকা রোজগার করে ফিরলে ফুল’কে আমার হাতে তুলে দেবেন?
​রোহান নিজের ট্রলি ব্যাগটা হুট করে খুলে সেখান থেকে অনেকগুলো টাকার বান্ডিল বের করল এবং পাগলের মতো হাসতে হাসতে বলতে লাগল‚ “এই দেখেন সেজো আব্বু! অনেক টাকা রোজগার করেছি আমি। এখন তো আপনার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিতে আর কোনো বাধা নেই তাই না? ওর জন্য কত গহনা এনেছি‚ বিয়ের বেনারসি শাড়ি এনেছি‚ এমনকি ওর সবচেয়ে প্রিয় চকলেটও এনেছি। বলুন না‚ আমার ফুল কোথায়?
​মৌ’য়ের বাবা নিজের চোখের জল আড়াল করে অত্যন্ত ভারী ও কঠিন স্বরে বললেন‚ “তোমার ফুলের বিয়ে হয়ে গিয়েছে রোহান! সে এখন অন্য কারো বউ। তাকে নিজের বউ বানানোর স্বপ্ন তুমি চিরতরে ভুলে যাও!
​কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো‚ তীব্র ঝড়ের বেগে এসে রোহানে’র বুকে আঘাত করল! সে স্তম্ভিত হয়ে খানিকটা পেছনের দিকে পিছিয়ে গেল। নিজের কানকে সে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তার ফুলে’র বিয়ে হয়ে গিয়েছে অথচ সে প্রেমিক হয়ে বিন্দুমাত্র জানতে পারল না? কিন্তু তাকে যে কথা দেওয়া হয়েছিল‚ সে অনেক টাকার মালিক হলে ফুল শুধু তারই হবে! এখন সেই প্রতিশ্রুতির কী হবে? ​হঠাৎই রোহান পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে এক বিকট চিৎকার দিয়ে উঠল।

​“আপনি মিথ্যা বলছেন সেজো আব্বু! আমার ফুলে’র বিয়ে হতেই পারে না। ফুল তো আমার বউ হবে‚ এই রোহান তালুকদারের বউ! আপনি তো আমায় নিজে মুখে কথা দিয়েছিলেন‚ আমি প্রতিষ্ঠিত হলে ফুল’কে আমার হাতে তুলে দেবেন, তাহলে সেই কথার আজ কী মূল্য রইল? আমি এত শত নিয়ম-কানুন জানি না। আমার ফুলকে চাই মানে এখনই চাই!
​রোহান রাগের কারনে সামনের কাঠের চেয়ারটায় সজোরে এক লাথি মেরে কথাগুলো একদমে বলে শেষ করল। তার দুটো চোখ তখন রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। অতিরিক্ত রাগের কারণে হাতের ও গলার শিরা-উপশিরাগুলো দপ দপ করে ফুলে উঠেছে। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সামনে যা পাচ্ছে‚ তাই ছুঁড়ে ছুঁড়ে মেঝেতে আছাড় মারছে। যার জন্য দীর্ঘ সাতটা বছর প্রবাসের মাটিতে এত কষ্ট করল‚ তাকেই যদি সে না পায় তবে কেন এত ত্যাগ?
​সে হন্যে হয়ে দৌড়ে মৌ’য়ের মায়ের কাছে এগিয়ে গেল। ওনার দু-বাহু শক্ত করে চেপে ধরে আকুল গলায় প্রতিধ্বনিত করে।

“মা ও মা‚ তুমি বলো না আমার ফুলে’র বিয়ে হয়নি! আমি তো তোমায় নিজের মা বলে ডাকি‚ তুমি অন্তত আমাকে এমন মিথ্যা বলবে না। বলো না মা‚ আমার ফুল এখনো আমারই আছে?
​মৌ’য়ের মা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার মুখ দিয়ে টু শব্দটিও বের হলো না। রোহানে’র এই পাগলামি ও রুদ্রমূর্তি দেখে মৌ’য়ের বাবা আবারও গম্ভীর কণ্ঠে বললেন‚ “রোহান পাগলামি কোরো না। যা হয়ে গিয়েছে তা আর কোনোদিনও ঠিক হবে না। নিজেকে সামলাও তুমি!
​রোহান ছলছল নয়নে নিজের সেজো আব্বুর দিকে তাকাল। লোকটা কত সহজে কথাগুলো বলে দিল। অথচ এই রূঢ় সত্যটা হজম করতে গিয়ে যেন রোহানে’র নিজের জান বেরিয়ে যাচ্ছে। রোহান এবার ঠিকই বুঝতে পারছে‚ এই জন্যই সাব্বির এতদিন ফোনে তার কথা এড়িয়ে চলত; বারবার সে ফুল’কে ভিডিও কলে দেখতে চাইলে তার দাদী নানা ছুতোয় কথা ঘুরিয়ে দিতেন! ​রোহান এবার নিজের বৃদ্ধা দাদীর কাছে এগিয়ে গিয়ে ওনার মুখটা নিজের দু-হাতে চেপে ধরে তীব্র আর্তনাদ করে চিৎকার দিয়ে উঠল।
​“দাদী ও দাদী! তোমরা কীভাবে পারলে আমার ফুল’কে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দিতে? তোমাদের কি একটা পলকের জন্যও এই এতিম ছেলের মুখটা ভেসে উঠল না? আমি কীভাবে বাঁচব আমার ফুল’কে ছাড়া? ফুল’কে যে আমার চাই-ই চাই। আমার ফুল’কে আমার কাছে এনে দাও না দাদী! দোহাই মাবুদের‚ আমার ফুল’কে এনে দাও! আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না‚ দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।

​রোকেয়া বেগমের দু-চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। মা-বাবাহারা নাতির এই অবর্ণনীয় কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারছেন না। ছেলেটা ছোট থেকে কখনো কোনো কিছুর আবদার করেনি‚ সে শুধু মৌ’কে বউ বানাতে চেয়েছিল কিন্তু বিধির লিখন বোধহয় অন্যরকম ছিল। রোকেয়া বেগমের চার ছেলে এক মেয়ে। রোহানে’র বাবা ছিলেন সবার বড়‚ আর মেহেরের বাবা ছিলেন দ্বিতীয়। এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় রোহানে’র বাবা-মা এবং মেহেরে’র বাবা-মা সবাই একসাথে মারা যান। সেদিন এক দিনে চার-চারটি লাশ চোখের সামনে দেখেও রোকেয়া বেগম ভেঙে পড়েননি‚ অথচ আজ এই অনাথ ছেলেটার বুকফাটা কান্না দেখে তার নিজেরই হৃদপিণ্ড যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। ​মৌ’য়ের বিয়ের সময় তিনি সেজো ছেলেকে বারবার বারণ করেছিলেন কিন্তু মৌ’য়ের বাবা উজানে’র বাবার কথা ফেলতে পারেননি।

রোহান মেঝেতে বসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। যে ছেলেটা বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরেও চোখের কোণে এক ফোঁটা অশ্রু দেখায়নি‚ সে আজ উন্মাদ পাগলের মতো কাঁদছে। হঠাৎই রোহান একের পর এক ঘুষি মারতে লাগল মেঝেতে। হাতের চামড়া ছিঁড়ে রক্ত ঝরছে‚ তবুও সে থামছে না। তার বন্ধুরা এসে শেষমেশ তাকে কোনোমতে আটকালো। রোহান মৌ’য়ের বাবার দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে আওড়াল‚ ​
“সেজো আব্বু আপনি কীভাবে আমার ফুল’কে অন্যের বউ হতে দিতে পারলেন‚ বলেন তো? আমি কি সত্যি ওর অযোগ্য ছিলাম? নাকি ওর বয়স আমার থেকে অনেকটা কম বলেই এই সিদ্ধান্ত? মানলাম ফুলের চেয়ে আমার বয়স দ্বিগুণের বেশি‚ তাই বলে কি আমার ভালোবাসা খাঁটি নয়? আমি কি আমার ফুল’কে সুখী রাখতে পারতাম না? নাকি আমি অনাথ বলে আপনারা মনে করলেন ফুল’কে অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়াই শ্রেয়?

​মৌ’য়ের বাবা অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলেন। এখন তিনি বুঝতে পারছেন‚ ছেলেটার ভালোবাসা নিছক পাগলামি ছিল না। কিন্তু বাবা হিসেবে মেয়ের সুখ চাওয়াও তো অপরাধ নয়। তিনি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন‚ “রোহান কাঁদো না বাবা। তোমাকে আমি তোমার ফুলের থেকেও সুন্দর মেয়ে এনে দেবো। তবুও…
​রোহান তখন হো হো করে হেসে উঠল। তার সেই বিকট হাসির শব্দে সবাই চাতক পাখির মতো তার দিকে তাকিয়ে রইল। “জানেন সেজো আব্বু‚ আমি আমার বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর আপনাদেরই বাবা-মা বলে ডেকেছি। অথচ আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে‚ নিজের বাবা-মায়ের মতো কেউ কাউকে অতটা ভালোবাসে না। আমার আপনার মেয়েকে চাই অথচ আপনি অন্য কাউকে খুঁজে দিতে চান! আপনাকে আমি বোঝাতেই পারব না যে‚ ফুলবিহীন রোহান তালুকদারের অস্তিত্বের কোনো মানে নেই।
​মৌ’য়ের মা ছলছল নয়নে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আজ ভীষণ অনুতপ্ত‚ মেয়ের ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে এই অনাথ ছেলেটার স্বপ্ন তিনি চুরমার করে দিয়েছেন। মৌ’য়ের বাবা আবারও কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন‚ “বাবা মাফ করে দিও আমাকে। আমি পারিনি আরিফুলের কথা ফেলতে। ও যে আমার মেয়েটাকে নিজের মেয়ে করে নিতে চেয়েছিল।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ২৮

​”সেজো আব্বু আমিও তো আপনার মেয়েকে আমার বউ করতে চেয়েছিলাম! আপনি তার কথা ফেলতে পারলেন না‚ অথচ আমাকে দেওয়া আপনার সেই পুরোনো কথাগুলো আপনি কত সহজে ভুলে গেলেন? আমি তো আপনার কাছে দামি কিছুই চাইনি। আমার ফুল’কে শুধু চেয়েছিলাম‚ কিন্তু আপনারা আমার ফুল’কেই আমার থেকে চিরতরে সরিয়ে দিলেন! আপনারা জানতেন ফুল’কে ছাড়া আমি বাঁচব না‚ তবুও কেন এমনটা করলেন?
​রোহান তড়িঘড়ি করে একটা লাগেজ খুলল। সেখান থেকে স্বর্ণের গহনা আর লাল টুকটুকে বিয়ের শাড়িটা বের করে সবার উদ্দেশ্যে বলল‚
“এই শাড়ি-গহনা পরিয়ে ফুল’কে আমার বউ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু আপনারা তা করতে দিলেন না। আজ আপনারা সবাই মিলে আমাকে এক জীবন্ত লাশ বানিয়ে ফেললেন! এর জন্য আমি কাউকে ক্ষমা করবো না‚ কাউকে না।
​রোহান আর সহ্য করতে পারছে না। কোনো রকমে উঠে দাঁড়িয়ে সে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। তার পিছু পিছু তার বন্ধুরাও ছুটে চলল। ছেলেটা আজ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে; তার পৃথিবীটা এখন এক বিশাল শূন্যতায় ঘেরা। তার ভেতরের সেই হাহাকার দেখার মতো কেউ যেন আজ আর নেই।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here