Home কাছে আসার মৌসুম কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৮

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৮

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৮
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

রায়ানের ধুম জ্বর এসেছে। গা পুড়ে যাওয়ার অবস্থা। সে রাতেই ওকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হলো সবার। সাথে নাজেহাল হয়ে পড়ল গোটা বাড়ি।
সাইফুল রেহণূমা, তনিমা সবাই মিলে সার্থকে বকছেন। আদরের নাতির গায়ে এমন ভাবে হাত তুলল,একেবারে ভয়ে জ্বর উঠে গেছে! এমন জল্লাদের মতো মারে কেউ?
শওকত সরাসরি কিছু না বলতে পারলেও আকার-ইঙ্গিতে গজগজ করছেন। তবে,সার্থ এসব কানে নিচ্ছে না। ছেলে বেডে পড়ে আছে,ভেতরটা তো সব থেকে ওর বেশি জ্বলছে। তারওপর নিরন্তর কাঁদছে তুশি। কান্নায় শব্দ নেই,ফোঁপাচ্ছে তাও। না,ওর প্রতি অভিযোগ করে নয়। একবার বলেওনি কেন মারল,কী.. কিছুই বলেনি। ছেলে অসুস্থ থাকলে মায়েদের যেমন লাগে? অমনই ছটফট করছে সে।

ইতু উপুর হয়ে বাবার ঘাড়ে গাল মিলিয়ে শুয়ে আছে । পরনে এখন একটা ছোট হাতাকাটা ফ্রক। ঝুটি বাঁধা নেই। কোকড়া চুল অগোছালো হয়ে কপাল ঢেকে আছে। ওকে সব সময় তুশি পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখে। গোসল থেকে খাওয়া সব করিয়ে দেয়। ইউশার মাথা ঘামাতে হয় না। সেই তুশির এখন কিছুতে খেয়াল নেই।
অয়ন ওকে নিয়ে করিডোরে হাঁটাহাঁটি করছে। ইতুর জ্ঞান ফিরেছিল অল্পতে। ভয়ে অজ্ঞান হয়েছিল বাচ্চাটা। কিন্তু চোখ খোলার পর থেকে কথাবার্তা বলেনি। এক ঢোকে এক মগ পানি খেলো, তারপর চুপ হয়ে রইল এক দম। বিবর্ণ ক্ষুদ্র চেহারা দেখে পরিষ্কার, ভয় পেয়েছে প্রচণ্ড।
আগুনের তাপে কাঁধের ওপরে ছ্যাকা লেগেছে,লাল হয়েছে। জ্বলছেও কিছুটা। ভালো করে পুড়ে যাওয়ার আগেই রায়ান হাত দিয়ে দিয়ে আগুন নিভিয়ে দিয়েছিল। ডাক্তাররা সেখানে ওষুধ দিয়েছেন।
অয়ন হাঁটতে হাঁটতেই দেখল সার্থ কেবিন থেকে বের হয়েছে। উদ্বেগ নিয়ে কাছে এগিয়ে গেল ও। জিজ্ঞেস করল,

“ জ্ঞান ফিরেছে?”
চোখ নিচে রেখে দুপাশে মাথা নাড়ল সার্থ। অয়ন বলল,
“ এভাবে মারার কী দরকার ছিল? বাচ্চা মানুষ! কতই বা বোঝে?”
“ আগুন লাগলে কেউ পুড়বে,এটুকু বোঝার মতো বয়স ওর হয়েছে অয়ন।”
“ তুমি কি করে জানলে ও আগুন লাগিয়েছে? ও বলেছে তোমায়?”
সার্থর উত্তরের আগেই তুশি কেবিনের দোর থেকে মাথা বের করল। অস্থির কণ্ঠে চ্যাঁচাল,
“ শুনছেন,বাবুর জ্ঞান ফিরেছে।”
তড়াক করে উঠে, ছুটে এলো সকলে। রায়ানের কেবিনে দুজনের বেশি এলাউ করছিল না। তাই গোটা পরিবার অপেক্ষায় ছিল এতক্ষণ। এমনকি বুড়িয়ে যাওয়া হাসনাও বাড়িতে বসে থাকতে পারেননি। রায়ানের প্রতি তার যে প্রচণ্ড মায়া। লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে এলেন তিনিও। যদিও আজকাল শরীর চলে না,তেমন স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না।
সার্থ কেবিনে এসে দেখল রায়ান চোখ মেলেনি। মাথা আর ঠোঁট দুটো নড়ছে কেবল। ও কাছে যায় না। তবে পরিষ্কার শুনতে পায় , রায়ন বিড়বিড় করছিল,

“ পাপা,সরি পাপা!’’
সার্থ মূহুর্তে ঘুরে গেল। ঠোঁট কামড়ে সামলাল নিজেকে। বাড়ির নারীরা সবাই রায়ানকে নিয়ে ব্যস্ত,উদ্বীগ্ন। ইতু বাবার কাঁধে শুয়েই চেয়ে রইল ওদিকে। রায়ান চোখ মেলে তাকাল। জ্বরে মুখটা নীল!
ঝাপসা ঝাপ্সা দেখতে পেলো সবাইকে। ছোট শব্দে ডাকল,
“ মাম্মাম…”
তুশি ধড়ফড়িয়ে ঝুঁকে ছেলের মাথা বুকে মিশিয়ে ধরল। ভেজা চোখে বলল,
“ এইত মাম্মাম এখানে বাবা। এখানে আমি।”
সাইফুল ভারি রুষ্ট হয়ে সার্থর হাত টেনে নিজের দিকে ফেরালেন। রেগেমেগে বললেন,
“ দ্যাখ,কী অবস্থা করেছিস দ্যাখ! মার তো ছোটোবেলায় তুইও কম খাসনি,তাই বলে কোনোদিন এমন অবস্থা হয়েছিল?”
“ আমি ওর মতো কিছু করিনি।”
অয়ন টের পেলো ইতু নড়ছে। এই এতক্ষণ পর একটু নড়ছে মেয়েটা। ঘাড় সোজা করতেই জিজ্ঞেস করল,
“ নামবে?”

ঘাড় নাড়ল ইতু। কোল থেকে নিচে নামাল অয়ন। মেয়েটা নামল,তবে দাঁড়িয়ে রইল ওখানেই। ওর এক মাত্র খেলার সাথী রায়ান,সাজুগুজুর সাথী তুশি! দুজনের কেউ ঠিক নেই আজ। তুশিকেও এভাবে কাঁদতে দেখেনি কখনো। না রায়ানকে এমন মুমূর্ষু দেখেছে। ইতুর মুখটা কালো হয়ে থাকে। রায়ান তক্ষুনি তাকায়। ইতুর পানসে চেহারায় ভেতরটা কেমন করে ওঠে তার।
তুশি মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ দেখেছ রায়ান,তুমি ওর শাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছ তাও ও তোমাকে দেখতে এসেছে। অথচ তুমি ওর সাথে কত রুড হয়ে যাও।”
রায়ান কথা বলল না। চুপ করে রইল। ইতু তখনই বলল,
“ লায়ান ভাই পুলিয়ে দেয়নি। এমনি এমনি পুলেছে।”
চমকে চাইল সার্থ। তার চেয়েও বেশি চমকাল অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা রায়ান। সবাই এক চোট সবার মুখ দেখার পর প্রশ্ন করল সার্থই,

“ রায়ান তোমার গায়ে আগুন দেয়নি?”
ইতু মাথা নাড়ল দুপাশে। তনিমা বললেন,
“ তাহলে কি মোমবাতিটা কাত হয়ে পড়ে গেছিল দিদি ভাই?”
ওপর নিচে মাথা নাড়ল ইতু।
ইউশা উদ্বেলিত হয়ে বলল,
“ আমি বলেছিলাম না,রায়ান এতটাও বাচ্চামো করবে না। মেজো ভাইয়া শুধু শুধু মারলে ওকে!’’
সার্থ তুশির দিকে তাকায়। তুশিও চেয়ে থাকে। দুজনে এরপর চেয়ে দেখে ছেলের মুখটা। রায়ানের চোখেমুখে বিস্ময়,কিছুটা হতভম্ব ভাব! এতেই যা বোঝার বুঝে যায় ওরা। শত হোক বাবা-মা তো! তবে এতটুকু বাচ্চা যে রায়ান ভাইকে বাঁচাতে মিথ্যে কথা বলল,সার্থ ফোস করে শ্বাস ফেলল তাতে। দু পা এগিয়ে এসে ইতুকে কোলে তুলে বেরিয়ে গেল বাইরে। রায়ান তখনো চেয়ে রইল। অবাক হয়ে,নিষ্পলক চোখে। শওকত ছেলের উদ্দেশ্যে আরো কিছুসময় বকাঝকা করলেন। পারছিলেন না সার্থকে টেনে দুটো চড় দিতে। তার নাতির গায়ে হাত! কতজন কত আফসোস করল নির্দোষ রায়ানের মার খাওয়া নিয়ে।
তুশি খুব আস্তে আস্তে বলল,

“ ইতু কত লক্ষ্মী মেয়ে তাই না?”
রায়ান নিস্পন্দ চোখ তুলে মায়ের মেদুর মুখে ফেলল। আরো আস্তে ভেঙে ভেঙে বলল,
“ আমি বুঝতে পারিনি মাম্মাম। আমি তো মজা করছিলাম।”
“ আর করবে এরকম?”
“ নো মাম্মাম।”
“ ইতুকে সরি বলে দিও?”
রায়ান মাথা নাড়ল দুদিকে।
মনে মনে বলল,
“ ফোকলাদাঁতিটা আমাকে বাঁচিয়ে দিলো?
আমি আর তোকে কক্ষণো মারব না,ইতু। কক্ষণো করব না এমন!’’

সেই ঘটনার কিছু দিন কেটেছে। সৈয়দ বাড়ি আবার স্বাভাবিক হয়েছে এখন। রায়ান,ইতু একইরকম খেলছে আবার। ইতু এখনো এসব মান-অভিমান বোঝে না।
সে লায়ান ভাই, লায়ান ভাই করে বেড়ায়। তবে রায়ান খেয়াল করল,ইদানীং মিন্তু খুব মুখ ভার করে রাখে। আগের মতো ভাগ্নে,ভাগ্নেও করছে না। ওকে পিঠে ঝুলিয়ে খেলতেও যাচ্ছে না। কথাও বলছে কম!
রায়ান বাবা-মায়ের ঘর ছেড়ে শুতে এলো রাত বারোটার দিকে। পরনে টিশার্ট,থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। চুলটা ঠেলতে ঠেলতে ভেতরে ঢুকে দেখল,মিন্তু ফোনে কিছু করছে। হয়ত বা কল দিচ্ছে কাউকে। সে ধরেনি দেখে রেগেমেগে ছুড়ে মারল। আর ফোন এসে পড়ল রায়ানের পায়ের ওপর। ব্যথায় পা একটা তুলে পাপা পাপা করে চ্যাঁচ্যাল ছেলেটা। মিন্তু পেছন ঘুরে ওকে দেখেই জিভ কাটে। ছুটে আসে ত্রস্ত। মুখ চেপে ধরে এক ঝটকায় বস্তা তোলার মত উঁচু করে বিছানায় এনে বসায়।
কণ্ঠ চেপে বলে,

“ আস্তে ভাগ্নে আস্তে। তোমার নানু শুনলে আমায় জ-বাই করে ফেলবে।”
“ তুমি ফোন ভাঙছো কেন মামু?”
মিন্তু ওর পায়ের আঙুল ডলে দিচ্ছিল। থামল হাতটা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ কী আর বলব দুঃখের কথা! বড়ো হও বলব তখন।”
“ না,এখন ফোন ভেঙেছ এখনই বলো।”
“ এখন বলা যাবে না। এখন তুমি ছোট কুটি বাচ্চা।”
রায়ান বলল,
“ না বললে নিচে গিয়ে সবাইকে বলে দেব পায়ে ব্যথা দিয়েছ। বলব,ইচ্ছে করে মেরেছ আমায়।”
“ কীহ? শালার…আমার ভাগ্নে আমার মতোই দুই নম্বর হয়েছ।”
“ বলো না মামু, আমি কাউকে বলব না গড প্রমিস!”
গলার মাংস খামচে দেখাল রায়ান। মিন্তু উঠে ওর পাশে বসল। মন খারাপ করে বলল,
“ তোমার জন্যে একটা মামি ঠিক করেছিলাম বুঝলে ভাগ্নে। কিন্তু মামিটা আমার খাঁচা ফেলে ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল। এতদিন ফোন ধরতো না,আজ ব্লকই করে দিয়েছে।”
রায়ান আশ্চর্য হয়েছে এমন ভাবে বলল,

“ মামি! কিন্তু গেল কেন?”
“ অন্য খাঁচা পেয়েছে তাই গিয়েছে। এত ডিটেইলসে বলা যাবে না। মনটা ভালো না।”
রায়ানের ঠোঁট উলটে এলো। পাপার পর ওর সব থেকে প্রিয় এই মামু। তার এই বিষণ্ণ মুখটা মানা যায়!
মিন্তু দুইহাঁটুতে ঝুঁকে ছিল একটু। রায়ান বসল গালে হাত দিয়ে। মিন্তুই হঠাৎ বলল,
“ কিছু ভালো লাগছে না। জিন্দেগী জুয়েল হয়ে গেল! আগেই ভালো ছিলাম।
কেন গেলাম মারা খেতে?”
“ মারা খাওয়া যায় মামু? সেটা কি টেস্টি?”
মিন্তু জিভ কাটল। বাচ্চাদের সামনে এসব বকাঝকা দেয়া যাবে না। শিখে ফেলবে। রায়ান পিঠে হাত রেখে বলল
“ মামু, এত দুঃখ পেও না। মাম্মামকে বলে তোমাকে আরেকটা মামি এনে দেব।”
মিন্তু হাসল এবার। ওর কাঁধে হাত রেখে বুকে এনে বলল,
“ জীবনের সব থেকে কষ্টের কাজ কী জানো ভাগ্নে? নিজের জন্যে মেয়ে খোঁজা। কোন পাখির কয়টা ডানা,কোন আকাশে উড়তে ভালোবাসে এসব প্রথমেই তো বোঝা যায় না। ভালো করে বুঝতে বুঝতেই সে উড়ে যায়।
ধুর,কপাল তোমার বাপ-চাচাদের! সব কাজিন বিয়ে করে বিন্দাস আছে। রেডিমেড পাত্রী ঘরেই। আর আমার! হাহ, কচুপোড়া জীবন। আমারো যদি একটা কাজিন থাকতো,আমিও তো বিয়ে করতে পারতাম। তখন এসব ছখিনাদের পাত্তা দেয়ার সময় ছিল বলো ভাগ্নে?”
রায়ান আগের চেয়েও বেশি তাজ্জব হলো বৈকি। কপাল কুঁচকে বলল,

“ কাজিন থাকলেই বিয়ে করা যায়?”
মিন্তুর ক্লান্ত লাগছিল কথা বলতে। রায়ানকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে বলল
“ বাকি কথা কাল হবে। এখন ঘুমাও।”
রায়ান শুলো,চোখও বুজল। তবে মস্তিষ্ক সজাগ করে ভাবল,
“ ইতুও তো আমার কাজিন। তাহলে কি আমিও ওকে বিয়ে করব?”
পরপরই রায়ানের চোখের পর্দায় ভাসল ইতুর পোকা দাঁতের হাসি। নাকে সর্দিও থাকে। একবার তো ওর টিশার্টেই মুছে দিয়েছিল!
সঙ্গে সঙ্গে নাকমুখ খিচে বলল,
“ ইই না…ফোঁকলাদাঁতিকে বিয়ে করব না। আমি তো আমার মাম্মামের মতো সুন্দর মেয়ে বিয়ে করে ফেলব। হাহাহাহায়া…”
হাসিটা শোনা গেল৷ মিন্তু কড়া গলায় বলল,
“ উম ভাগ্নে,ঘুমাতে বলেছি!’’
তৎপর ওদিকে কাত হয়ে শুলো রায়ান। ব্যস্ত ভাবে জানাল,
“ ঘুমাচ্ছি,ঘুমাচ্ছি!”

পরদিন…বিকেল বেলা!
রায়ান মাঠে খেলতে গিয়েছিল। এই আবাসিক এলাকার সব বাচ্চারাই প্রতিদিন বিকেলে ক্রিকেট খেলে,ফুটবল নিয়ে বেরোয়। রায়ান ওর প্রিয় ব্যাট ছাড়া ব্যাটিং করতে পারে না। আবার এই ব্যাটে কারো হাত দেয়াও নিষেধ। মাঝেমধ্যে ম্যাকগাইভার হওয়া ছাড়াও রায়ানের আরেকটা শখ জাগে। ক্রিকেটর হওয়ার!
খেলা শেষ করে ঘেমেনেয়ে মাত্রই ফিরল ছেলেটা। কেচি গেইট দিয়ে ঢুকবে,হঠাৎ পেছনে কান্নার শব্দ শোনা গেল। চকিতে পিছু ঘুরল রায়ান। চমকে উঠল পরপরই। হাত পায়ে বালু,জামায় ধুলো মাখা ইতু টালমাটাল টালমাটাল কদমে হেঁটে হেঁটে আসছে। চুলে একটা ঝুটি আছে,আরেকটা নেই। কাঁদছে ভ্যা ভ্যা করে।
রায়ান আঁতকে উঠল। কাছে ছুটে গেল তড়িৎ।
“ কী রে,কী হয়েছে?”
ইতু কান্নায় কথা বলতে পারল না। হেচকি তুলতে তুলতে হাত লম্বা করে মুনদের বাসার দিকে দেখাল। মুন তার বন্ধু। পাশের বিল্ডিং! দুজন একই স্কুলে পড়ে। রায়ান কিছু বুঝতে না পেরে বলল,

“ মুন কিছু বলেছে? মেরেছে?”
ইতু কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু দেখায়।
রক্ত পড়ছে। রায়ানের মাথা অমনি গরম হয়ে গেল। ওর ফোকলাদাঁতির গায়ে হাত! কাঁধের ব্যাট মুঠোয় চেপে কিড়মিড় করে ছুটল সেদিকে।
ওইদিন সন্ধ্যেবেলাই বিচার বসল সৈয়দ নিবাসের বড়ো উঠোন জুড়ে। আসামী ছিল রায়ান। মুন ইতুকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল। ইতুর নতুন পুতুল নিয়ে ঝামেলা। মেয়েটা দেয়নি দেখে এসব। রায়ান গিয়েই মুনের মাথার চুল টেনে, গালে বসিয়ে দিলো চড়। মুনের ভাই ক্লাস এইটে পড়ে, দৌড়ে এলো বোনের কান্না শুনে। ধস্তাধস্তি শুরু হলো। এক পর্যায়ে হাতের ব্যাটটা দিয়ে ওর মাথায় এত্ত জোরে বাড়ি মারল রায়ান, গোটা কয়েক সেলাই পড়ল সেথায়।
বাচ্চার বাবা- মা নালিশ ঠুকার নাম করে রীতিমতো ঝগড়া বাঁধাতে এলেন। এই তল্লাটে শওকতের আলাদা সম্মান ছিল। সে আর্মির মেজর বলে কথা! সেই সম্মান বাড়ছিল সার্থর একেকটা সফলতার তোড়ে। আবার অন্য ছেলেও নামি-দামি ডাক্তার। সেই পরিবারের নাতির এরকম গুণ্ডামি যেন মেনে নেয়া যাচ্ছে না। শওকত যথাসম্ভব ওনাদের শান্ত করতে বললেন,
“চিকিৎসার খরচ তিনি বহন করবেন।’”

কিন্তু মুনের বাবা মা শান্ত হয় না। রায়ানকে গালমন্দ করে। ছেলেটা তখন নানুর পেছনে লুকিয়েছিল। মাম্মামকে ও আগেই ভয় পেত, ওইদিনের পর পাপাকেও ভয় লাগে। মুনের মা কিছুক্ষণ হড়বড় করলেন। তারপর দু পা এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ালেন তুশির। একদম আঙুল তুলে বললেন,
“ আপনি কেমন মা! আপনার বাচ্চাকে আপনি কি ভালো কিছু শেখাননি? আমার ছেলেটাকে ক্লিনিকে এডমিট করতে হয়েছে। আর দেখুন,মেয়ের গালে কীরকম হাতের ছাপ বসেছে দেখুন। এই ছেলে একটা জন্তু! এর জন্যে সভ্য সমাজ না। প্রায়ই শুনি মারপিট করে। কিছু বলেনও না।
এভাবে বাচ্চা পালা যায় না। এত লাই দিতে নেই বাচ্চাদের। মায়ের গুণে ছেলেমেয়ে হয়,বুঝলেন?”
তুশি মাথা নত করে রইল। আর এটাই বুকে বিঁধল সার্থর। সঙ্গে সঙ্গে তেড়েমেরে এসেই রায়ানের হাতের কব্জি খপ করে ধরে অন্তঃপুরের পথ ধরল সে। ভয় পেলো সবাই। রায়ানের মুখটা আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ভাবে,আবার মারবে পাপা! সেদিনের মারের দাগই ওর যায়নি ভালো করে। অয়ন তক্ষুনি পথরোধ করে দাঁড়াল।

“ কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ওকে?”
সার্থর চোয়াল শক্ত। কিছু বলল না।
অয়ন এসে হাতটা ছুটিয়ে রায়ানকে কাছে নিয়ে যায়। বলে,
“ ওকে পানিশমেন্ট দেবে? তাতে কী লাভ হবে?
কবার গায়ে হাত তুলবে ওর? বাচ্চাদের মেরে মেরে ঠিক করা যায় না।”
সার্থ সাথে সাথেই বলল,
“ সেজন্যেই মারব না। আমি ওকে বোর্ডিং স্কুলে দিয়ে দেব। বেশি আদর দিয়েছি,বাঁদড় হয়েছে। ভেবে দেখলাম, ও আসলেই এই বাড়িতে থাকার যোগ্য নয়!”
পিছু হতে এক গুচ্ছ আর্তনাদ শোনা গেল অমনি। বিদ্যুৎ এর মতো শক খেলেন তারা। রায়ানের চেহারা পাংশুটে হলো। ভয়ার্ত চোখে চাইল মায়ের দিকে। তুশি ছটফটিয়ে কিছু বলতে যায় ,এর পূর্বেই
সার্থ পেছন ফিরে মুনের বাবা-মাকে বলল,
“ আপনারা এখন আসুন। আমি আমার ছেলের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়েছি। যথাসাধ্য ক্ষতিপূরণও দিয়েছি, চাইলে আরো দেব। আমার ছেলে আর বাড়িতে থাকবে না, এরকম ঝামেলাও হবে না। তাই এ নিয়ে আর কথা বাড়ানোর দরকার নেই! সার্থ যেমন ভালোবাসতে জানে, প্রয়োজনে তেমন কঠোর হতেও জানে।”
ঘোষণা টুকু দিয়ে ফের ছেলেকে সঙ্গে করে ভেতরে চলে গেল সে। রায়ান পথিমধ্যে বারবার কাকতি-মিনতি করল,

“ পাপা, আমি আর এমন করব না।
ওরা ইতুকে মারল বলেই তো করলাম।
পাপা আমাকে বোর্ডিং-এ দিও না, পাপা।”
সার্থ হনহনিয়ে ওপরে উঠল। ছেলেকে ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিলো। চাবিটা পকেটে ভরে বলল,
“ আমি না ফেরা অবধি যেন গেইট খোলা না হয়!”
রায়ান ভেতর থেকে মরিয়া হয়ে দোর ধাক্কাল। কেঁদে কেঁদে ডাকল,

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৭

“ পাপা,পাপা?”
তুশি অস্থির,অসহায়। স্বামীর পেছনে ছুটল। উতলা হয়ে বলল,
“ শুনুন,আমার কথা শুনুন। রায়ানের আব্বু…”
সার্থ হাঁটা ধরল, বাড়ির বাইরের দিকে। মা,ছোটো মা,হাসনা থেকে শুরু করে প্রত্যেকে বোঝাল কত কী! শুনলোই না। বেরিয়ে গেল সব মাড়িয়ে। পাথুরে লোকটা তাহলে নিজের সত্তায় আবার ফিরে এলো কী?

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here