Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫১
ইসরাত জাহান দ্যুতি

আজ-কাল নাওফিল দীধিতির সংসারটা বিখ্যাত সেই সব বাংলা সিরিয়ালগুলোর মতো হয়ে গেছে কিছুটা। যেখানে দেখা যায় সকালটা শুরুই হয় প্রত্যেকের ড্রয়িংরুমে। এবং বাড়ির প্রতিটা সদস্যদের নানান কথাবার্তা বা তিনটি এপিসোডের পুরোটা কাহিনিই চলে ওই ড্রয়িংরুমে। নাওফিল আর দীধিতির সংসারের সকালটা যদিও একটু ভিন্ন।

ফজরের নামাজ শেষ করে আজ আর বাইরে দৌড়তে যেতে ইচ্ছা হয়নি নাওফিলের। ওই সময় ফের ঘুমিয়ে পড়ার জন্যই আজ তার ঘুম ভাঙতে বেশ দেরি হলো। এ সময় দীধিতিকে ঘরে পাওয়া যাবে না স্বাভাবিক। এতক্ষণে সে রসুইঘরে থাকলে সেখানে রুনারও থাকার কথা। এবং সেই সাথে দুজনের মধ্যে কোনো না কোনো ঝামেলাও বাঁধার কথা। রুনাকে শেখ বাড়ির নারী সদস্যরা আশকারা দিতে দিতে এতটাই মাথায় তুলেছে যে, আজ যদি দেখা যায় দীধিতিকে সে বড়ো ছোটো কথা শোনাচ্ছে এখানে এসেও। তবে সেটা মোটেও অবাক করার মতো কোনো ঘটনা হবে না৷ কেবল এর পরিণাম বেশ করুণভাবেই ভুগতে হবে তাকে নাওফিলের কাছে৷
এসব ভাবতে ভাবতেই ফ্রেশ হয়ে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নিচে এলো নাওফিল। কিরণকে দেখা গেল সোফাতে বসে পড়াশোনা করতে। কিন্তু রুনা আসার আগ পর্যন্ত মেয়েটা নিজের ঘর থেকে বেরই হতো না বেলা নয়টা বা সাড়ে নয়টার আগে৷ নাওফিল মনে মনে হাসল ব্যাপারটায়। দীধিতি আর সে আপন বোন না হলেও স্বভাবে দুজনের মধ্যে বেশ মিল। রুনাকে চোখে চোখে রাখতেই যে কিরণ এখন বেশিরভাগ সময় নিচে কাটায়, তা বোধ হয় স্বয়ং রুনাও ধরতে পারে৷ এখন দেখার পালা এ বাড়ির কর্ত্রী কী করছে।

-‘কী খবর, কিরণ? পড়াশোনা ঠিকঠাক হচ্ছে তো?’ ওর পাশে বসতে বসতেই জিজ্ঞেস করল নাওফিল। নজর রান্নাঘরের দিকে। কিন্তু নজরে পড়ল না দীধিতিকে।
-‘আপনি বসছেন কেন ভাইয়া? খাবার টেবিলে চলেন। ওখানে বসেই কথা বলব।’
-‘নাশতা রেডি?’
-‘রেডি মানে? আজকে তো এলাহি আয়োজন।’
-‘হঠাৎ এলাহি আয়োজন নাশতাতে?’ কপট বিস্মিত হয়ে বলার প্রচেষ্টা নাওফিলের।
-‘হুঁ, চলেন। গেলেই বুঝবেন।’

তখন তাওসিফও নামল উপর থেকে। ওদের সঙ্গেই এসে বসল খাবার টেবিলে। আজ সত্যিই টেবিল ভর্তি খাবার-দাবার। তাওসিফ ফোনের মাঝে ডুবে আছে বিধায় খেয়াল করল না। চট্টগ্রাম সৈকত সংলগ্ন ওদের হোটেলটা থেকে আজ খুব সকালবেলা ম্যানেজারের কল এসেছিল ওর কাছে৷ তার সাথে কথা বলে জানতে পারল, ইয়াসিফ গতরাতে বেশ আহত হয়ে এসেছে সেখানে। এ কথা ম্যানেজারকে বাড়িতে বলতে নিষেধও করেছে সে। কিন্তু ম্যানেজার বেশ চিন্তিত হয়। তাই সকাল হলে ইয়াসিফের কথা অমান্য করে সে তাওসিফকে জানিয়ে দেয়। এবং এটাও জানায় যে, সে রাতেই ইয়াসিফকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে সে বিপদমুক্ত, ঘুমাচ্ছে সুইটে। দুজন মেয়েও আছে তার সাথে৷ তারাই আহত অবস্থাতে সাহায্য করে এনেছিল গতরাতে। যাদের মাঝে একজন ডাক্তার। সেই দেখাশোনা করছে ইয়াসিফকে। যার জন্য সেই দুই মেয়ের থাকার জন্যও ব্যবস্থা করেছে ইয়াসিফ নিজের সুইটেই। ইয়াসিফ জাগলে কথা বলিয়ে দেওয়া হবে তাওসিফের সঙ্গে৷ এ আস্থা দিয়ে ফোন রাখে ম্যানেজার৷ তাওসিফ তাই এখন ভাবছে, চট্টগ্রাম এখনই রওনা দেবে কি না সে। কিন্তু এদিকে অফিসে কাজের চাপ প্রচুর৷ হুট করেই চলে গেলে অনেক ঝামেলা হয়ে যাবে৷ তখন আবার বাসায়ও জানাতে হবে ইয়াসিফের কথাটা। যদিও এমন আহত বহুবারই হয়েছে ইয়াসিফ৷ আর তা শুনে প্রতিবারই মা আর দাদীর অবস্থাও হয় দেখার মতো। ইয়াসিফকে রেখে তখন তাদের দুজনকেই সামলাতে হয় সবার। এ আবার আরেক ঝামেলা। তাই ভাবল তাওসিফ, নাশতা শেষ করে নাওফিলের সঙ্গে কথাবার্তা বলবে এ বিষয়ে৷

খাবারের পদ দেখেই চোখ ছানাবড়া হওয়ার জোগাড়। ‘মানুষ পাঁচজন মাত্র আমরা। তাই বলে আট থেকে দশ আইটেমের খাবার তৈরি করতে হবে? এই স্মরণ, কোথায় তুমি?’ বিরক্ত স্বরে ডেকে উঠল নাওফিল।
তাওসিফও অবাক, ‘আজকে কি বিশেষ টিশেষ দিন না কি? এত নাশতা হঠাৎ?’
কেবল কিরণ ঠোঁট চেপে খালি হাসে। নাওফিলের ডাক দীধিতির কর্ণকুহরে না পৌঁছলেও রুনা হাতে এক বাটি ফ্রুট সালাদ নিয়ে দ্রুত রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে৷ নাওফিলের প্লেটের কাছে বাটিটা রেখে ক্লান্ত চেহারাতেই প্রফুল্ল এক হাসি জড়িয়ে বলে, ‘তাওসিফ স্যার আর আপনার সব পছন্দের নাশতা বানিয়েছি আজকে৷ তাই একটু দেরি হয়ে গেল।’
-‘আমাদের দুজনের পছন্দের মেনুতে খুব একটা ভিন্নতা নেই। এই নয়, দশ রকম ভারী ভারী ভোজ যদি সকালে বসেই করি। তাহলে দুপুরে কেন রাতেও খেতে হবে না।’ তাওসিফ বলল।
রুনা তখন অভিযোগ সুরে জবাব দিলো, ‘আমার দোষ নেই, স্যার৷ স্মরণ ম্যামকে নিষেধ করেছিলাম বহুবার। কিন্তু সে আমার কথা কানেই তুলল না। আমি সব তৈরি করার পরও তিনি আলাদা করে ব্রেকফাস্ট তৈরি করলেন।’

কিরণ যেন এই কথাটা শোনারই অপেক্ষায় ছিল। খপ করে শিকারের ঘাড় কামড়ে ধরার মতো অমনি রুনাকে চেপে ধরল কথার তুবড়িতেই, ‘এই বাড়ির কর্ত্রী কে? আপনি না কি আপু? তাহলে আপনি কেন আপুর বারণ না শুনে নিজের মতো নিজে একটার পর একটা রান্না করেই গেলেন? যেখানে আপু সেই ভোরবেলা নামাজ শেষ করে এসেই রান্নাঘরে ঢুকেছিল নিজে নাশতা বানাবে বলে। এখন আবার আপুর ওপর দোষ চাপাচ্ছেন!’
নাওফিল কোলের ওপর হাত গুটিয়ে, অধর কামড়ে, ভ্রুজোড়া উঁচিয়ে এই বিস্ময়কর ঘটনাটা নিয়ে অবাক পাহাড়ের চূড়ায় বসে রইল নীরবে। ব্যাপারটা কী হয়েছে তা না প্রত্যক্ষভাবে না দেখতে পেলেও কল্পনাতে ঠিকই দেখে নিলো, তার সরল শান্ত চেহারার অথচ শাণিত ব্যক্তিত্বের বউ আজকে ভোরবেলাতেই রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিল। যাতে করে রুনা আজ সুযোগ না পায় সেখানে ঢোকার। কিন্তু তাও কাজ হয়নি৷ রুনাও সে সময়ই নিশ্চয়ই রান্নাঘরে এসে হাজির হয় আর দীধিতির উপর দিয়েই মাতব্বরি করে সে নিজের মতে রান্না করে নেয়। দীধিতিকে অমান্য করে এই বাড়াবাড়ি আচরণের জন্য কী কী যে ভুগতে হবে এই মেয়েকে, তা যদি জানত সে! কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতটা বাড়াবাড়ি কি শুধুই নিজের দাপট দেখানোর জন্য? না কি আরও কোনো কারণ আছে? ভাবল নাওফিল।
রুনা কিরণের জ্বলন্ত চোখে চোখ রেখেই কঠিন গলায় বলল তখনই, ‘আমাকে তিনবেলা রান্নার দায়িত্ব নেওয়ার জন্যই এখানে আনা হয়েছে। তাহলে আমি রান্না করব না কেন?’

-‘তাই বলে আপনি বাড়ির কর্ত্রীর অবাধ্য হওয়ার সাহস দেখাবেন?’ কিরণ আরও জ্বলে উঠে চেঁচাল। তাওসিফ ওর পাশেই বসা ছিল৷ ‘রিল্যাক্স কিরণ৷ সকাল সকাল এত হাইপার হলে সারাদিন আর পড়াতেই মন লাগবে না তোমার। খাওয়া শুরু করো তো।’ টেবিলে রাখা ওর হাতটার ওপর হাত রেখে চোখের ইশারাতেও শান্ত হতে বলল সে।
নাওফিল আপাতত চুপচাপ সব দেখে গেল। দীধিতির সন্ধান জানতে চাইবে কিরণের কাছে, এমন মুহূর্তেই উপর থেকে তাকে নেমে আসতে দেখল সবাই। কিরণের ঘরে গিয়ে শুয়েছিল সে। রুনার দুঃসাহসিক অবাধ্য কার্যকলাপে তার সঙ্গে একচোট বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হতে হয়েছিল তাকে। রান্না শেষ করে তারপর থেকেই বিক্ষিপ্ত মন মেজাজ নিয়ে আছে সে৷ নাওফিলের সঙ্গে গতরাতে দেহের খোরাকে সায় দিলেও মনে অভিমান অভিযোগের এক চিলতেও নিশ্চিহ্ন হয়নি৷ উপরন্তু রুনার আস্পর্ধাজনক আচরণ! সবকিছু মিলিয়ে দীধিতি অস্বাভাবিক মর্মপীড়া আর রাগে ক্ষোভে নাওফিলের মুখপানেও তাকাতে চাইল না।
কিরণের পাশে এসে বসল সরাসরি। উপস্থিত প্রত্যেকেই তার চেহারার গনগনে ভাবটা টের পেলো৷ ‘নাশতা শুরু করো সবাই। বসে আছ কেন হাত কোলে নিয়ে?’ শান্ত গলাতেই বলল দীধিতি। বলে খাবারের প্লেটটা টেনে নিয়ে নিজের প্লেটেই আগে খাবার তুলে নিলো৷ কিরণও আর বসে থাকল না৷ অবশ্যই বোনের রান্না খাবারই খাবে সে। নাওফিল আর তাওসিফই কি বাদ যাবে? না, এমনিতেও তারা রুনার হাতের অমৃত হলেও মুখে নেবে না তা।

পেঁয়াজ, ফুলকপি আর গাজর কুচির পুর দিয়ে বানানো পরোটার পাত্রটা থেকে তাওসিফও চারটা পরোটা তুলে নিলো প্লেটে৷ তা দেখে রুনার মনটা কিঞ্চিৎ খারাপ হলেও সে আশাবাদী নাওফিল তার রান্না খাবে। তাকে খুব বেশি অপছন্দ হলেও নাওফিল কখনও তার রান্নাকে অবজ্ঞা করেনি৷ বরং খাওয়ার সময় নাওফিলের চেহারায় তৃপ্তির আভা দেখত সে। তাছাড়া এখন তো দীধিতি আর নাওফিলের সম্পর্কটাও ভালো যাচ্ছে না৷ যার প্রমাণ সকালবেলাতেই দিয়েছে দীধিতি কিরণের ঘরে ঢুকে। তাই একটু বেশিই আশাবাদী সে।
দীধিতির ফোলো চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে রুনা যখন মিটিমিটি বিদ্রুপপূর্ণ হাসছিল, তখনই ছোট্ট একটা নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেল৷ পরোটার পাত্রতে নাওফিল হাতটা বাড়াতেই দীধিতি তার চেয়েও দ্রুত গতিতে পাত্রটা ছিনিয়ে নিলো তার সামনে থেকে, ‘আমি তিনজনের মতো বানিয়েছি। কিরণ, মিহাদ ভাইয়া আর আমার জন্য। তারা আমার রান্নাতেই স্যাটিসফাইড। অযথা এক বোঝা খাবার বানিয়ে শুধু শুধু চোখের সামনে দেখতে ভালো লাগে না৷ তুমি আমার সবজি ভাজি আর পরোটা বাদে অন্যগুলো ট্রাই করো প্লিজ। নয়ত খাবারগুলো পড়েই থাকবে কিংবা বাইরের মানুষকে খাওয়াতে হবে।’

-‘হুঁ, দেখছিস না হাতে গোনা চারটা আছে পরোটা? তুই এদিকে হাত বাড়াস কেন? ওগুলো খা। তোর সামনে যা রাখা। আর রুনা, তুমি দাড়িয়ে আছ কেন? বসে পড়ো বসে পড়ো।’ তাওসিফের তাড়া দেওয়ার অপেক্ষাতেই যেন ছিল রুনা। এমন অভিব্যক্তি নিয়ে বসতে দেরি করল না সে৷
কিরণ আর রুনাই আড়চোখে বারবার লক্ষ করছে নাওফিলের চেহারার ভাবগতি। বাকি দুজন নির্বিকার হয়ে খেয়ে চলেছে৷ তবে তাওসিফের কপালে চিন্তার রেখা।
রুনা নাওফিলকে জিজ্ঞেস করল তখন, ‘আপনার প্লেটে কী তুলে দেবো, স্যার? রুটি, ঝাল ঝাল মুরগির মাংস আর ডিমের অমলেট তো আপনার পছন্দ। এটা আগে খেয়ে দেখবেন। না কি ওটস? খিচুড়িও করেছি৷ আর ওই যে আপনার হাতের বাঁয়েই ফ্রুট সালাদ। প্রোটিন সেকও তৈরি… ‘

-‘থামো রুনা৷ কোনোদিন দেখেছ আমি এক সঙ্গে সকালের নাশতায় রুটি, খিচুড়ি, মাংস, ওটস, প্রোটিন সেক, ফ্রুট সালাদ খেয়েছি? তুমি বোধ হয় ভুলে গেছ আমি একেকদিনে একেকরকম খাবার খেয়েছি। প্রতিদিন এক সঙ্গে সব গিলিনি। এত কিছু কেন রেডি করেছ? খামোখা খাবারের অপচয়!’ কঠিন বিরক্ত প্রকাশ করে নাওফিল আচমকা দীধিতির প্লেট টেনে নিয়ে পরোটা, ভাজি খেতে আরম্ভ করল৷ রুনার কান্না কান্না মুখপানে কারও তাকানোরই ইচ্ছা হলো না৷ কিরণ মুচকি হাসতে হাসতে দুলাভাইকে দেখতে গিয়ে গলায় খাবার আটকাল তার। তাওসিফই আগে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো, সেই সাথে সাবধানও করল, ‘খাওয়ার মাঝে এদিক-ওদিকে না তাকিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দেবে।’
দীধিতি কিন্তু কোনোরকম প্রতিক্রিয়াই দেখাল না৷ এঁটো হাতটা কোলে নামিয়ে পানির গ্লাস মুখে তুললেই নাওফিল থামাল। মুখের সামনে টুকরো পরোটা তুলে ধরে বলল, ‘আজকে থেকে আমরা সুন্নাত আদায় করব এক প্লেটে খেয়ে।’ বাধ সাধল না দীধিতি। চুপচাপ মুখে নিলো খাবার।

-‘ঠেলায় পড়লে সুন্নাতের কথা মনে পড়ে!’ ইয়াসিফকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত তাওসিফ। তবুও ছোটো ভাইয়ের রং তামাশা দেখে টিপ্পনী কাটা ছাড়ল না। আর তার এ কথা শুনে কিরণ খাবার মুখে নিয়ে আবারও হেসে ফেলল। তাওসিফও চোখ গরম করে তাকাতে ভুলল না।
খাওয়া শেষে দীধিতি আর রুনা ছাড়া সবাই যার যার ঘরে চলে গেল৷ তবে নাওফিল যেতে যেতে দীধিতিকে ঘরে আসতে বলল। টেবিলের সব গোছগাছ করতে করতে দীধিতি খেয়াল করল রুনার চোখের কোনে জল জমেছে৷ তা বেদনার না কি ক্রোধের তা কে জানে! ঐশী বেশ অনেকদিন শ্বশুর শাশুড়ির সাথে থাকছে, হঠাৎ করে শাশুড়ি অসুস্থ হয়ে পড়ায়৷ তাই রুমানও এ ফ্ল্যাটে যাতায়াত কমই করছে। যে জন্য খাবারগুলো গতদিনের মতো আজও গেটের সিকিউরিটি গার্ডদের দিয়ে দেবে দীধিতি। এটুকু সে বুঝে গেছে, গতকালও কেউ রুনার রান্না খায়নি। এবং আগামীতেও খাবে না। নাওফিল কেবল শোধ তুলতেই এই মেয়েকে ডেকেছে। তার জন্যই দাবিয়ে রাখা রাগটা দীধিতির ক্ষণে ক্ষণে আরও বেড়ে চলেছে। কেননা শোধ তোলার বা তাকে কষ্ট দেওয়ার আরও তো বহু পন্থা ছিল।

-‘তুমি ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট করো, রুনা। আমি সব পরিষ্কার করছি। সেই ভোর বেলা থেকে রান্নাঘরে পড়েছিলে৷ ক্লান্ত দেহে খাওয়া শেষে নিশ্চয়ই একটু আরাম করতে ইচ্ছা হচ্ছে?’ মিষ্টি হেসে বলল দীধিতি।
রুনা ক্ষোভ চোখে যখন তাকাল দীধিতির দিকে, তখন তার ক্ষোভিত চেহারা কেমন ম্লান হয়ে পড়ল হঠাৎ। দীধিতির পরনের জামাটার বড়ো গলা। ওড়নাটা সরে যেতেই ওর সুডৌল বুকের বিভাজনের ওপরে গতরাতে হওয়া আসঙ্গের চিহ্নটা জ্বলজ্বল করছে৷ স্পষ্ট করে বলারও প্রয়োজন নেই এ চিহ্নের হেতু কে। দীধিতির ঠোঁটের কোনে সে সময় লক্ষিত হলো সদম্ভ তেরছা হাসি।বুঝতে অসু্বিধা হলো না রুনার, অন্তরঙ্গতার এ চিহ্ন উন্মুক্ত হয়েছে দীধিতির ইচ্ছাতেই।

বাসাটা একদমই ফাঁকা হয়ে যায় দুপুরের সময়। কিরণ কোচিংয়ের জন্য আগে দুপুরের পর বের হত। কিন্তু কিছুদিন কোচিং-এর নতুন বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডি করতে একটু আগেভাগেই বেরিয়ে পড়ে। দীধিতিরও ভার্সিটি গেলেই সময় কাটে। তামান্না প্রায়ই আসতে বলে। কিন্তু কেন যেন পড়াশোনার প্রতি এখন আর মন বসে না। জাকির শেখ যেদিন এলেন সেদিনের পর আরও বেশি অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে সে। উদাসীন হয়ে পড়েছিল স্বামী, সংসার, নিজের প্রতিও৷ দুশ্চিন্তায় দুশ্চিন্তায় ঘুম হারা হয়ে পড়েছিল। নাওফিলের প্রতি অবর্ণনীয় ভালোবাসা বিয়ের আগে এতটাও প্রখর ছিল না, যতটা এখন গাঢ় হয়েছে৷ কীভাবে রাজনীতির ময়দান থেকে ওকে সরিয়ে আনবে, সে চিন্তাতেই স্বয়ং সেই মানুষটাকে উপেক্ষা করে বসেছিল। তবে তার থেকে বেশি অভিমানেই৷ কিন্তু নীরব অভিমান বা রাগ জমিয়ে ক্ষতি ছাড়া ফায়দা নেই। তাই তো ঠান্ডা মাথায় ভাবনা চিন্তা আরম্ভ করেছে দীধিতি। সেই শীতল ভাবনায় তার প্রথম লক্ষ রুনাকে এ বাড়িছাড়া করা।

নাওফিলই হয়ত করবে এক সময়। কিন্তু সকলের আড়ালে এই মেয়ে প্রতিটা মুহূর্তে চোখের ভাষাতেই যে নীরব চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে তাকে, যে দুঃসাহস দেখিয়েছে তারই সংসারে দাড়িয়ে, তার যোগ্য জবাবসমেত বিদায় না দিলে হয়? তার ওপর আজ আবার নাওফিল বাসা থেকে বেরিয়ে ঘণ্টা একটা যেতে না যেতেই রুনাকে হঠাৎ কল করে সে। কয়েক সেকেন্ড কথা বলে তারা। ছাদে ছিল তখন রুনা আর কিরণ দুজনই৷ কিরণই এসে তা জানিয়ে গেছে দীধিতিকে। দুপুরে কিরণ বেরিয়ে পড়ার পরই রুনার কাছে আবারও কল করে নাওফিল৷ কয়েক সেকেন্ডর সাধারণ কথাবার্তা। সে সময়টাতে দীধিতি নিজেই উপস্থিত ছিল। গেস্টরুমের বাথরুমে একটা টি শার্ট ছিল। টি শার্টটা কার তা জিজ্ঞেস করতে ডেকেছিল রুনা দীধিতিকে। সেটা দেখতেই দীধিতি তার সঙ্গে বাথরুমে ঢুকেছিল। টিশার্টটা ছিল কিরণের। নিয়ে ফিরে আসার সময়ই হঠাৎ নাওফিলের ফোনটা এসেছিল তখন রুনার কাছে। এবং দেখেছিল রুনার আনন্দে ঝলমল মুখটা৷ নাওফিলের থেকে এই প্রথমবার আন্তরিকতা পেলো কি না! দীধিতিকে দেখিয়ে দেখিয়ে গুনগুন করে গানও গেয়ে বেড়াচ্ছিল সারা ড্রয়িংরুমে কাজ করতে করতে। এসবের হিসাব না আদায় করে ছাড়া যায় না কি?

দুপুরবেলা দীধিতি বেশিরভাগই নিজের ঘরে ব্যস্ত থাকে। রুনা আসার পর থেকে যখনই সুযোগ পায় তখনই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে, ফোনে কার সঙ্গে যেন রোজ অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে দীধিতি। শুনতে চেষ্টা করেছে সে কথাগুলো। কিন্তু বেলকনির স্বচ্ছ থাই গ্লাসের এপারে দাড়িয়ে ঘরের ভেতরটা দেখা গেলেও কথা আর শোনা যায় না। যার জন্য সব সময়ই হতাশ হয়ে ফিরে যায় সে। আজও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
বেলকনির দরজার ওপাশ থেকে রুনার মাথাটা সরে যেতেই দীধিতি ফোনটা কান থেকে নামিয়ে সেদিকে তাকাল৷ আজ সে কোনো কথা বলেনি৷ বরং কথা বলার ভান ধরে এতটা সময় কানে ফোন চেপে দাড়িয়ে ছিল। রুনা জানে না, তার এই আড়িপাতা নোংরা স্বভাব সম্পর্কে দীধিতি প্রথমদিনই অবগত হয়েছে৷ এবং সেই সাথে এটাও খেয়াল করেছে, নাওফিল ঘরের বাইরে থাকলেও প্রতি মিনিটে মিনিটে নিজের বউকে নজরহারা করে না সে। অর্থাৎ নিজেদের ঘরেও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাতে দু’বার ভাবেনি৷ তাই তো রোজ ঘরে ফিরেই দীধিতির ফোনটা নিঃশঙ্কোচে হাতে তুলে নিতো নাওফিল। অবশ্য যখন দীধিতি ঘরে থাকত না৷ কিন্তু সেটাও দীধিতি একদিন দেখে নিয়েছিল৷ কিছু বলেনি সে। কারণ, চোরের মতোই কাজবাজ করছে সে। তাই চোরের গলা উঁচু হওয়াও সমীচীন নয়। তবে নাওফিল এমন শোবার ঘরে গোপন ক্যামেরা লাগানোর কাজটা সদ্য করেনি। ঢাকা আসার পূর্বেই সব করেছিল। তবে বউকে এভাবে চোখে চোখে রাখার কাজটা সম্প্রতিই করছে সে৷ বিশেষ করে দীপ্তর দুর্ঘটনাটার পর থেকে। কেবল দীধিতিই তা জানতে দেরি করেছে।

রুনাকে হুটহাট রুফটপে যেতে দেখা যায়৷ প্রথমদিন সেটা নিয়ে মাথা না ঘামালেও মেয়েটার সন্দেহজনক চাল-চলন দীধিতিকে আজ তার পিছু পিছু ছাদে আসতে বাধ্য করেছে। ট্যারেসের দিকটাতে অবশ্য পাওয়া গেল না রুনাকে৷ তাকে সেখানে দাড়ানো দেখল, যেখানে জাকির শেখের সাথে দাড়িয়ে কথা বলেছিল দীধিতি। মনোযোগ সহকারে মেয়েটা ফোনে টাইপিং করছে কিছু একটা। ‘এই দুপুরবেলা রোদের মধ্যে এখানে দাড়িয়ে কেন? ট্যারেসে গিয়ে বসলেই তো পারো।’ ভীষণ চমকে উঠল রুনা, দীধিতির আকস্মিক আগমনে। তা দেখে দীধিতি সেই সকালবেলার মতো মিষ্টি হাসল। সে হাসি দেখে রুনা অসহ্য লাগল, চোখ ফিরিয়ে নিলো। ‘বসতে আসিনি। হাঁটাহাঁটি করতে এসেছি।’

-‘আচ্ছা আচ্ছা। আমিও এলাম হাঁটাহাঁটি করতে৷ রোদের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করা হয় না বহুদিন।’ বলতে বলতে কার্নিশে উঠে বসল দীধিতি।
রুনার ইচ্ছা করল তখনই দীধিতিকে এক ধাক্কায় নিচে ফেলে দিতে৷ করতও তাই, যদি আদেশ থাকত। মারতে সে ভয় পায় না।
-‘কী হলো? তুমি কি বিরক্ত হলে আমি আসাতে?’
-‘না না, বিরক্ত হচ্ছি না তো।’ মেকি হাসার চেষ্টা করল রুনা।
-‘যাক, ভালো লাগল৷ আমি তো ভাবলাম তোমার নাওফিলের স্যারের বউ হিসেবে তোমারও আমাকে পছন্দ হয়নি।’
মোক্ষম জবাব দেওয়ার সুযোগ পেল রুনা এবার। ‘আসলে নাওফিল স্যারের যেরকম স্ট্যাটাস, সেদিক থেকে ধরলে আপনি তো ডিজার্ভ করেন না স্যারকে। প্লিজ কিছু মনে করবেন না আমার কথাই৷ আমি কেবল অ্যাকচুয়াল দিকটা ভেবে বলেছি।’

-‘আমি কোনো শিল্পপতির সন্তান নই বলে?’ রুনার তিক্ত কথাটা হৃদয়ে লাগলেও মুখ হাসি হাসিই রাখল দীধিতি।
রুনা বলল, ‘আপনি বোধ হয় আমার কথাটা বুঝতে পারেননি। শেখ পরিবার বিত্তবানদেরকেই শুধু প্রায়োরিটি দেয় না। বংশমর্যাদা তাদের কাছে ফার্স্ট প্রায়োরিটি৷ সেখানে মেয়ে বা ছেলের পরিবার মিডলক্লাস হোক৷ সেটা ব্যাপার না।’
থমকাল দীধিতি, ‘আমার বংশমর্যাদা নেই বলছ?’
রুনা হাসে এবার, বিদ্রুপাত্মক হাসি। ‘আপনার বাবাকে না কি মসজিদের মাঝে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন মাহতাব স্যার৷ সেখান থেকেই বাড়িতে এনে কাজের লোক হিসেবে আশ্রয় দিয়েছিলেন৷ তারপর পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন। মাহতাব স্যারের ইচ্ছাতে একটা মর্যাদাসম্পন্ন চাকরি জুটেছিল তার। কিন্তু বড়ো একটা রহস্য না কি আছে আপনার জন্ম পরিচয় নিয়ে? কী সেই রহস্য, ম্যাম?’
অর্থাৎ রুনা দীধিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেই এ বাসায় এসেছে৷ কিন্তু কে জানাল তাকে সব? জাকির শেখ? তবে কি জাকির শেখের হয়ে এই মেয়ে তাকে নজরে রাখতে এসেছে? কার্নিশ থেকে নেমে পড়ল দীধিতি। রোদে তাপে ফর্সা মুখটা গোলাপী লাল হয়ে উঠেছে। রাশভারী কণ্ঠে রুনাকে জেরা করল, ‘কতটা জানো আমার ব্যাপারে তুমি?’

-‘আমি কী জানব, ম্যাম? আপনার শ্বশুর বাড়িতে আপনাকে নিয়ে যা বলতে শুনেছি তাই-ই বললাম। আমি সার্ভেন্ট মানুষই বলা চলে৷ এসব বড়ো বড়ো ব্যাপার কি আর আমার জানার কথা?’ তখনও রুনার মুখ থেকে পূর্বের হাসিটা মুছেনি।
দীধিতি সামলাল নিজেকে। মাথা গরম করলে মেয়েটা আরও বেশি রাগানোর সুযোগ পাবে। হুটহাট রেগে যায় বোকারা। আর সে বোকার মতো কিছু করতে চাইছে না এই মুহূর্তে। সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এলো, ‘হেঁয়ালিটা এবার বাদ দিই আমরা, কেমন? আচ্ছা আমি না হই অযোগ্য নাওফিলের পাশে। তুমি নিজেকে কীভাবে ওর পাশে ভাবো? আমার বাবা এক কালে কাজের লোক ছিলেন৷ আমি নই যদিও৷ কিন্তু সেখানে তুমিই ডিরেক্ট কাজের লোক শেখ বাড়ির। নিজেকে ও বাড়ির বউ ভাবার স্বপ্নটা কেমন করে দেখেছিলে তাহলে? না কি ওর সঙ্গে শোয়ার সুযোগটুকু হলেই চলত শুধু? কোনটা চেয়েছিলে বলো তো?’

-‘এই!’ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে ধমকে উঠল রুনা।
দীধিতি রুনার সুন্দর মুখটার ক্ষিপ্রতা দেখে স্পষ্ট বুঝল, এই দুঃসাহসিকতাপূর্ণ মেয়ের পেছনে কিছু বড়ো বড়ো মানুষের নির্ভরতা রয়েছে। তার জন্যই একটা সামান্য মেইড হয়েও এমন আস্পর্ধা দেখানোর সাহস পায়। কিন্তু সে বা তারা যে বা যারাই হোক, আজ আর রুনাকে কেউ রক্ষা পারবে না৷
অভাবনীয় আক্রমণটা দীধিতি করেই বসল৷ খপ করে রুনার গলাটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর ঠেলতে ঠেলতে একদম কার্নিশের ওপর তাকে শুয়িয়ে কোমরে গুজে আনা ছুরিটা বের করল। সেটা রুনার চোখ ছুঁইছুঁই করে ধরে হিংস্র কণ্ঠে বলল, ‘একজন চোর যেমন আরেকজন চোরকে চিনতে পারে। তেমন একজন খুনি সত্তার মানুষও আরেক খুনি সত্তাকে চিনে ফেলে। তুই কি চিনিসনি আমাকে দেখে?

আমি তো তোর চোখে চেয়ে তা ধরে ফেলেছি। আমার ভেতরে একটা খুনি আত্মা বসবাস করে৷ আমার স্বার্থের প্রয়োজনে যদি খুন করারও প্রয়োজন পড়ে কখনও, আমি তা করতে এক সেকেন্ডও সময় নেব না৷ আমার এই নিষ্ঠুর আত্মার অস্তিত্ব আমি ধরার আগেই আমার স্বামীর কাছে ধরা পড়েছে, জানিস? তাই তো তোকে আমার কাছে একা রেখে গিয়ে আজ নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না আমার পাগল স্বামীটা। তুই যখন যখন এই সারা বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার বাইরে ছিলি তখনই আতঙ্কিত হয়ে ফোন করেছে তোকে পাগলটা। কিছু করে বসেছি কিনা তোকে, এই ভেবে। অথচ তুই বোকা কিনা ভেবেছিলি তোর প্রতি ইন্ট্রেস্টেড নাওফিল শেখ?

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫০ (২)

আমি স্মরণ স্বেচ্ছায় না ওকে ত্যাগ করলে ওর ধারে কাছে কোনো নারীই কোনোদিন আসতে পারবে না। নিজে হাতে সেই নারীকে তোর মতো করে শেষ করতে না পারলেও অন্য উপায়ে হলেও তাকে বিনাশ করবই আমি।’ বলেই ছুরিটা গেঁথে দিতে গেল রুনার চোখে৷ ভয়ে রুনা চিৎকার করতে চাইল, পারল না গলা চেপে ধরায়। মাথাটা একটুখানি কাত করতে পারল শুধু বাঁচার চেষ্টায়। তাই ছুরির আঘাত চোয়ালের শেষ প্রান্ত ঘেঁষে তার কানের নিচে পর্যন্ত কাটল। এবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। ধীরে ধীরে চোখদু’টো প্রায় বুজেই আসলো।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here