Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৫

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৫

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৫
ইসরাত জাহান দ্যুতি

শেষ কিছুদিন যাবৎ দীধিতি নাওফিলের ঘরে ফেরার অপেক্ষা করে না। আলো নিভিয়ে বিছানার এক কোন ফাঁকা রেখে শুয়ে পড়ে। কিন্তু আজ ঘরে এসে নাওফিল আলো নেভানো পেলেও বিছানাতে দীধিতিকে পেলো না৷ ভাবল, হয়ত ব্যালকনি কিংবা বাথরুমে আছে৷ খুঁজে দেখার আর ইচ্ছা হলো না আজ। গা থেকে টি শার্টটা খুলে খোলা গায়েই বিছানাতে শুয়ে পড়ল নীরবে।
হঠাৎ করেই মনে পড়ছে ভীষণ বাবা-মায়ের কথা৷ মানুষ দুটোর মুখটা হৃদ নয়নেও ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে ওর৷ মনে করতে হলে ছবি দেখার প্রয়োজন। কিন্তু নাওফিল আজ অবধি জায়িন আর আয়মানের কোনো ছবি দেখতে চায়নি, কাছেও রাখেনি৷ ইন্টারনেট ঘাটলেই মিলে যাবে মানুষদুটোর পাশাপাশি ছবি। কিন্তু সে ছবির উপরেই কোটেশন থাকে “দ্য মিস্ট্রিয়াস হোয়েল কাপল অফ দ্য অস্ট্রেলিয়ান মাফিয়া অরগ্যানিজেশন।” আর এ কারণেই নাওফিল কখনও মায়ের ছবি দেখার ইচ্ছা হলেও সে ইচ্ছা গিলে ফেলে। মায়ের ছবি দেখা হয় না বলে বাবার ছবিও আর দেখা হয় না৷ দেখার সাহসটাও হয় না নাওফিলের৷ যদি কষ্টগুলো বুক ফেটে বেরিয়ে আসে? সেই কষ্টে যদি চোখদুটোও ভিজে ওঠে? নাওফিল চায় না তার এক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জনের জন্য বাবা-মায়ের রুহ কষ্ট পাক। বেঁচে থাকতে যে তাদের পাপের সীমা ছিল না! এজন্যই না জানে কত কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে মানুষদুটোর!

সারা পৃথিবীর কাছে জায়িন আয়মান নিখোঁজ হলেও নাওফিল বিশ্বাস করে তারা বেঁচে নেই। এমনটা ভাবার উপযুক্ত কারণও আছে৷ শেষবার যখন বাবা লুকিয়ে দেশে এসেছিল ওকে নিয়ে যেতে, এরপর আরও ক’বার সে চেষ্টা করেছিল জাকিরের সঙ্গে কথা বলে ওকে মায়ের কোলে ফেরত নেওয়ার জন্য। কিন্তু জাকির শেখ তার এক বাক্যেই অনড় ছিলেন। জায়িন এবং আয়মান দুজনকেই আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। ক’বছর হলেও সাজা ভোগ করতেই হবে তাদের। তারপর তাদেরকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করা হবে৷ কিন্তু তারা দুজন কেউ-ই এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি৷ এরপর হঠাৎ করেই জাকির শেখের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল জায়িনের৷ পাগলের মতো কিছুদির পরপরই অস্ট্রেলিয়া ছুটতেন তখন জাকির৷ শত চেষ্টা করেও খোঁজ পাননি আর প্রাণের ছোটো ভাইটার৷ তখন জায়িনের ঘনিষ্ঠ চার বন্ধুদেরও কেমন একটা গা ছাড়াভাব নিয়ে থাকতে দেখেছেন জাকির৷ এই চারজনের সহায়তাতেই জায়িন অধিকাংশ কাজ করে থাকত৷ অথচ এরা কেউ-ই তখন কোনোরূপ হদিস দিতে পারেনি জায়িনের৷ ওদের আচরণ দেখে জাকির বিশ্বাস করতে বাধ্য হন, জায়িন আর আয়মান ফেরারি হওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই এদের কোনো হাত ছিল৷ নয়ত শির উঁচিয়ে মাফিয়া সাম্রাজ্যে চলাফেরা করা সব থেকে ধীমান আর সাহসী দম্পতি হঠাৎ করে কীভাবে হারিয়ে যেতে পারে? আর বেঁচেই যদি থাকত তারা, তবে এতগুলো বছর তাদের একমাত্র সন্তানের সঙ্গে দেখা না করে, কথা না বলে কি থাকতে পারত? বেঁচে থাকলে কি একবারও তাদের কোনোরকমই খোঁজ পাওয়া যেত না? নিশ্চয়ই যেত, যদি আজ তারা জীবিত থাকত। বাবা-মায়ের এই হারিয়ে যাওয়াটার দায় দীর্ঘ অনেক বছর নাওফিল জাকিরকেই দিয়ে গেছে। তিনি অতীতে এত কঠোর না হলে আজ নিশ্চয়ই তারা ওর কাছে আসত… এমন কর্পূরের মতো উবে যেত না।

কিন্তু শেষবার অস্ট্রেলিয়া গেলে হঠাৎ করেই নাওফিলের মন থেকে এই অযৌক্তিক, অমূলক ভাবনাগুলো আপনাই দূর হলো। তবে হঠাৎ করে বললে ভুল হবে। বলা উচিত, রুমান ওকে গুলিবিদ্ধ করার পর হাসপাতালে নেওয়ার পথে ওর মাথার কাছে বসে জাকির শেখের গগনবিদারী চিৎকার, কান্নাকাটির চিত্রটা এই মানুষটিকে নিয়ে শুরু থেকে পুনরায় ভাবতে বাধ্য করেছিল। অস্ট্রেলিয়া যাবার পর মনির সাথে সব কিছু নিয়ে কথা হলেও কখনও জাকিরকে নিয়ে কথা বলতে চাইত না সে। কিন্তু সেবার এই ব্যক্তিকে নিয়েই বারবার আলোচনা করেছে সে জেরিনের সাথে। ছোটো ভাই হঠাৎ করে হারিয়ে যাবার পর তার জন্যও কি জাকির ছটফট করতেন? না কি ভাইয়ের প্রতি ঘৃণা ছিল বলে খুশিই হয়েছিলেন? সেসবের যথাযথ উত্তর মিলেছিল যখন জেরিন জানালেন, জায়িনের সন্ধান পাওয়ার জন্য নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা আর অর্থের ব্যবহার করেছিলেন জাকির। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া তো ছোটোখাটো একটা বাংলাদেশ নয়। তার ওই তুচ্ছ ক্ষমতা আর অর্থ তাই কোনো কাজেই আসেনি।
মন খারাপের মাঝেও নাওফিল আনমনে অপেক্ষা করছিল দীধিতির জন্য৷ ঘড়ির কাটা বারোটায় পড়লে ছোট্ট আওয়াজে ঘড়িটা টুংটাং করে উঠল যখন, চোখের ওপর হাতটা সরিয়ে পাশ ফিরে দেখল বউটা এখনও ফিরেনি। বিরক্ত লাগল ওর৷ কিশোরী মেয়েছেলের মতো দুই দিন পরপরই এমন ন্যাকামি অভিমান কি দীধিতির সঙ্গে যায়? না উঠে পারল না নাওফিল৷ ব্যালকনিতে এলো আগে৷ এসেই পেয়ে গেল বউকে৷ কার্পেটে চুপচাপ বসে আছে বুকের মাঝে পাঠ্য বই ধরে৷ হয়ত পড়ছিল। এখন চোখ বুজে দেওয়ালে মাথা হেলে দিয়ে বসে আছে।

-‘এখানে বসে ঘুমানোর কী মানে?’ বিরক্তির সঙ্গে মৃদু উষ্মাও প্রকাশ পেল নাওফিলের কণ্ঠে।
চোখজোড়া মেলল দীধিতি চকিতে। অমনি নাওফিলের বিরক্তিতে কুঞ্চিত কপাল মসৃণ হলো। লালপদ্ম রঙা টলমলে চোখজোড়াতে দৃষ্টি থমকে গেছে নাওফিলের৷ খুব সহজে কান্নাকাটি করার মতো বউ তো ওর নয়! নিজের মনঃকষ্ট চাদরে ঢেকে দেওয়ার মতো আড়াল করে দীধিতির মুখোমুখি বসল৷ দু’হাঁটু উঁচু করে বসা দীধিতি৷ সে হাঁটুর ওপর রাখা তার হাতটা ধরে মোলায়েম কণ্ঠে শুধাল নাওফিল, ‘কেন কাঁদছ, সোনা? আমি কি অপরাধ বেশিই করে ফেলেছি?’
দুঃখের সময় আপনজনের আদর আরও বেশি আহ্লাদী করে তোলে৷ দীধিতিরও হলো তাই৷ ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলতে গিয়েও সংযত করল বাধভাঙা আবেগ, ব্যথা৷ ঠোঁট চেপে ধরে ঘনঘন মাথা নেড়ে ভেজা গলায় বলল, ‘সেরকম কিছু না৷’

-‘তাহলে কী?’
-‘তাহলে কিছুই না। হঠাৎ আম্মুর কথা মনে পড়ে তাই একটু কান্না পাচ্ছিল। কতদিন দূরে আছি আম্মুর থেকে!’ ভেজা কণ্ঠটাই হঠাৎ করে আবার রূঢ় হয়ে উঠল দীধিতির। ‘তোমার আমাকে নিয়ে না ভাবলেও চলবে৷ আমি পড়ব আরও কিছুক্ষণ। তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো।’
বিনা তর্কেই নাওফিল দাড়িয়ে পড়ল। তা দেখে দীধিতির কষ্ট লাগলেও নির্বিকারভাবে বইয়ের পাতা উলটাতে থাকল সে৷ কিন্তু নাওফিল শুধু বিদায়ই নিলো না৷ যাওয়ার পথে ব্যালকনির আলোটাও নিভিয়ে দিয়ে গেল। দীধিতির খেপে উঠতেও সময় লাগল না। ‘এত বদমাশ কেন তুমি?’ চেঁচিয়ে উঠে ঘরে এলো। দেখল গায়ে টি শার্ট চড়িয়েছে নাওফিল। গাড়ির চাবি, ফোন আর ওয়ালেটটাও পকেটে পুরতে দেখে একটু বিচলিত দেখাল দীধিতিকে। তবে তা বুঝতে না দিয়ে ঝাঁঝালো গলায় শুধাল, ‘এই রাত বারোটায় কোথায় যাওয়া হবে?’
নাওফিল তখন ফোনে কিছু টাইপ করছিল। টাইপ শেষে দীধিতির দিকে বিকারশূন্য চোখর এক পলক তাকিয়ে কাকে যেন আবার ফোন করে বসল। ভ্রু কুচকে ওর কার্যকলাপ দেখছে শুধু দীধিতি। ফোনের ওপাশের ব্যক্তি কল রিসিভ করেছে। তাকে আদেশ গলায় বাইরে বের হওয়ার কথা বলে নাওফিল ফোন কেটে আপাদমস্তক দীধিতিকে দেখে হঠাৎ। ‘চলো। রাতের আঁধারে কোনো সমস্যা হবে না।’ বলেই বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে উত্তরের অপেক্ষা না করে।

দীধিতি হতবুদ্ধি হয়ে দাড়িয়ে ওর প্রস্থান দেখে৷ দরজার বাইরে থেকে তখন আরেকবার নাওফিল বের হতে বলার কথা বলে তাকে। কথামতো বেরিয়ে এসে নাওফিলকে পিছু করতে করতে বলে, ‘বলা নেই কওয়া নেই হুট করেই চলো বলে যাচ্ছি কোথায় সেটা বলতে পারছ না?’
নাওফিল একটু দাড়িয়ে দীধিতির কাছে এসে ওর হাতটা মুঠোয় ধরে আবার চুপচাপ চলতে চলতে বেরিয়ে এলো বাসা থেকে। এলিভেটরে ঢুকে আরও দু’বার জিজ্ঞেস করল দীধিতি, কোথায় যাচ্ছে তারা৷ কিন্তু বরাবরের মতোই জবাবশূন্য নাওফিল।

একইভাবে দীধিতির হাত ধরে পার্কিং লট থেকে গাড়িতে চেপে বসল নাওফিল। গেটে থাকা সিকিউরিটি দুজন তখন ঝিমাচ্ছিল। গাড়ির হর্ন পেয়ে ধড়ফড়িয়ে দাড়িয়ে পড়ে দুজন। দেখে বাড়ির মালিকের গাড়ি বের হচ্ছে। তাই কোনো জিজ্ঞাসাবাদের ধারে কাছেও না গিয়ে জলদি গেট খুলে দিলো৷ দীধিতি খেয়াল করল না বেশ দূরেই সাদা কালো গাড়ি করে আরেকটা গাড়ি আসছে তাদের দিকেই৷ নাওফিল ঠিকই খেয়াল করল৷ মনে মনে জাকির শেখের প্রশংসা করতেও ভুলল না। ছেলের নিরাপত্তার জন্য বেছে বেছে সব থেকে কর্মঠ, দায়িত্ব আর সময়-জ্ঞান সম্পন্ন দুজন দেহরক্ষী নিয়োগ দিয়েছেন। যার প্রমাণ নাওফিল শুরু থেকেই পেয়ে আসছে।
এবার নাওফিল ইচ্ছামতো গতিবেগের সাথে গাড়ি চালাতে শুরু। নিশি রাতে ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালানোর মজাটা বহুদিন নেওয়া হয় না৷ বন্ধুরা সবাই-ই আজ-কাল নিজেদের জীবনে ব্যস্ত। নিজেও পুরোদস্তুর সংসারী হয়ে পড়েছে৷ তাই বলে সমস্ত শখ, আহ্লাদ, আনন্দ বাদ পড়বে না কি? নাহ, জীবনের ধারা বদলালে নিজেকেও সেই বদলানো পরিবেশের সাথেই মানিয়ে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করতে হবে। বিয়ের পর বউটাকে নিয়েও বাইরে কোথাও বিশেষভাবে সময় কাটানোর সুযোগ পায়নি সে। বউটাও হয়েছে তেমন। সব কিছু নিয়ে রাগ, অভিমান, মুখ ভার করে থাকতে পারলেও এই যে তাকে নিয়ে কখনও বাইরে আজ অবধি ঘোরাফেরা করেনি নাওফিল— তা নিয়ে অভিযোগ, অভিমান করে না কখনও। আজ নিজের মনটাও বিষণ্ন ছিল বলেই বাইরে ঘোরার কথা মনে হলো।

অনেকটা সময় পর নাওফিল মুখ খুলল, ‘আমাদের জমির প্লট কেনা হয়েছে। সেখানে যাচ্ছি।’
-‘এই রাতের বেলা আমাকে তোমাদের জমির প্লট দেখানোর ইচ্ছা হলো কী জন্য?’ মেজাজ বিচ্ছিরিরকম খারাপ হয়ে গেছে দীধিতির।
নাওফিল মুচকি হাসল৷ বলতে গিয়েও বলল না তারা দিয়াবাড়ি ছুটছে কাশবনে হারাতে। আর সেদিকেই প্লটও কেনা হয়েছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে৷ তাই মজা করে সেটার কথাই বলল সে।

সবে একটু গা ভাসিয়ে দিয়েছিল তাওসিফ বিছানায়। ফোনে মেসেজের শব্দ বেজে উঠতেই চোখদুটো খুলে গেল৷ এত রাতে সিম কোম্পানি থেকে মেসেজ আসতে পারে কি? এয়ারটেলের ক্ষেত্রে অবশ্য অসম্ভব না৷ তাও জরুরি হতে পারে ভেবে ফোনটা হাতে নিয়ে লক স্ক্রিন থেকেই দেখে নিলে মেসেজটা৷ নাওফিলের বার্তা এসেছে। বউকে নিয়ে এই রাত করে সে ঘুরতে বেরিয়েছে৷ রুনার ক্লাসটা তাই তাকে একাই নিতে বলে গেল৷ এর কারণটা তাওসিফের জানা। যত যা-ই হোক, মেয়েলোকের গায়ে হাত তোলার কথা চিন্তা করতে পারে না নাওফিল৷ রুনার মতো মেয়েকে দাঁত কামড়ে সহ্য করাটা বেশ কঠিন ব্যাপারই ওর জন্য৷ আর একটু পর রুনার পেট থেকে কথা বের করতে হলে উত্তম-মধ্যমও জরুরি হতে পারে৷ তাই সেটার দায়িত্ব নাওফিল তাওসিফের কাঁধে গছিয়ে পালাল বউকে নিয়ে।

চোখে-মুখে পানি দিয়ে ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা করে তাওসিফ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পকেটে পুরে বের হলো ঘর থেকে। নিচে এসে রুনার দরজায় ঠকঠক করল ক’বার। কোনো সাড়াশব্দ নেই৷ মরার মতো ঘুমাচ্ছে নাকি হতচ্ছাড়িটা? ‘এই রুনা! শুনছ?’ ফিসফিসিয়ে ডেকে উঠল তাওসিফ কড়া নাড়তে নাড়তে। সে সময়ই দরজাটা খুলল রুনা। ঘুম চোখে দেখতে পেলো কালো পোলো টি শার্ট পরে সুন্দর কমনীয় চেহারার এক যুবক মুচকি হাসছে তার সামনে দাড়িয়ে৷ চোখ ডলে নিয়ে ভালো করে তাকাল৷ একি! এ যুবক তো তাওসিফ স্যার! অমন মিটিমিটি হাসছে কেন দাড়িয়ে? ‘স্যার, আপনি এত রাতে? কোনো দরকার?’ ঘুম উবে গেছে রুনার৷ দ্বিধাজড়িত গলায় জিজ্ঞেস করল তাওসিফকে৷ কিন্তু আশ্চর্য হলো রুনা৷ একইভাবেই তাওসিফ মিটিমিটি হাসছে তার দিকে চেয়ে৷ আর চাহনিও কেমন অদ্ভুত লাগছে যেন। একটু দুষ্টু দুষ্টু চাউনি। কী দেখে অমন করে হাসছে সে? ভাবতে গিয়ে নিজের দিকে একবার দৃষ্টি ফেরাল৷ এ বাবা! তার গায়ে ওড়না নেই! তাওসিফের দিকে ঝট করে আবার তাকাল তখন৷ এবং নিশ্চিত হলো, তাওসিফ তাকে এমনভাবে দেখেই দুষ্টু দুষ্টু হাসছে৷ প্রথমে বেশ আড়ষ্ট হয়ে পড়ল রুনা। ‘য়্যু আর সো অ্যাটাক্টিভ, রুনা।’ তাওসিফের মুখে এমন স্তুতি শুনে রুনা অবাক হলেও পরবর্তীতে লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিলো৷

-‘বাসায় এসে তখন শুনলাম তোমাকে মেরেছে নাকি স্মরণ। কেটে ফেলেছে মুখটা৷ তাই দেখতে এলাম। আসলে আরও আগেই আসতাম৷ কিন্তু… যাকগে! তোমার ঘুমের ডিস্টার্ব করলাম বোধ হয়।’
-‘না না , কোনো সমস্যা নেই। আমি একটুও বিরক্ত হইনি।’
মন খারাপ সুরে তাওসিফ আফসোস করে উঠল, ‘ইস কতখানি কেটেছে কে জানে! কাজটা স্মরণ মোটেও ঠিক করেনি। জাদ খুব বকেছে ওকে জানো?’
-‘তাই?’ চোখে-মুখে প্রাণোচ্ছল খুশি খেলে গেল রুনার।
-‘হুঁ৷ ঠিকই করেছে। বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। আমি তোমার রান্না খুব একটা পছন্দ না করলেও তোমাকে তো আর অপছন্দ করি না৷ তাই তোমার সঙ্গে এই অন্যায়টা আমি মানতে পারিনি।’
-‘থ্যাঙ্ক য়্যু, স্যার। স্মরণ ম্যাম শুধু শুধু আমাকে সন্দেহ করে এভাবে মারল! আমার মুখটা কি আর ঠিক হবে? আমার কত বড়ো একটা সর্বনাশ করল ম্যাম!’ বলতে বলতেই চোখে পানি চলে এলো রুনার। তা দেখে তাওসিফ দ্রুত এগিয়ে এসে সান্ত্বনার হাত রাখল ওর মাথায়। ‘কিচ্ছু হবে না, রুনা। আমরা আছি না? তুমি আমাদের বাড়িতে সেই কত ছোটো থেকে আছ! আমাদের সব থেকে বিশ্বস্ত মানুষ। তোমার ক্ষতি নিশ্চয়ই আমরা চেয়ে দেখব না? তাই তুমি একদম চিন্তা কোরো না। তোমার ট্রিটমেন্টের দায়ভার আমার যাও।’
প্রথমবারের থেকেও আরও বেশি অবাক হলো রুনা, তাওসিফের সহানুভূতিশীল আচরণে৷ অবশ্য শেখ বাড়িতে সব থেকে শান্ত স্বভাবের মানুষ সে তাওসিফকেই দেখেছে। তাই বিশ্বাস হতে চাইল, তাওসিফ মানুষটাও সরল গোছের বটে।

-‘ইয়ে বলছিলাম আমাকে একটু সময় দেবে, রুনা? ঘুমটা আসছে না আজ কেন যেন। ট্যারেসে যাবে আমার সঙ্গে?’ বলার মাঝে তাওসিফ বারবার রুনার শরীরে দৃষ্টি রাখছিল। ঠোঁটে আবার সেই মিটিমিটি হাসি। রুনা সহজেই বুঝতে পারল তাওসিফের ইশারা এবং আবেদন। তৃতীয়বারের মতো তাই অবাক হলো সে। এই মুহূর্তে ইয়াসিফ যদি দাড়িয়ে এমন আবদার করত, তাহলেও মানা যেত। যদিও ইয়াসিফ বাড়ির কোনো সার্ভেন্টের ধারে কাছেও ঘেঁষে না৷ এমনকি তার মুখোমুখি কখনও দাড়ায়নি সে। ওই ছেলের চোখে চোখ পড়লেই বুক কেঁপে ওঠে রুনার৷ কেমন শিকারী নজর লাগে। মনে হয় চোখে চেয়েই মনের ভেতরটা দেখে নিতে পারে সে। কিন্তু আজ তাওসিফের এমন স্বভাব সম্পর্কে জেনে অবাক না হয়ে পারল না। তবে বুঝতে পারল, শেখ বাড়িতে হয়ত আজকের মতো সুযোগ কখনও পায়নি বলেই তাওসিফ নিজের স্বরূপ প্রকাশ করতে পারেনি।
রুনা ক্লাস এইট থেকে শেখ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। সেই তখন থেকেই নাওফিলের প্রতি দুর্বলতা জন্মেছিল তার। কিন্তু শেখ বাড়ির কোনো ছেলের দিকেই যে হাত বাড়ানোর যোগ্যতা নেই। তাই মনকে সামলে নিতে চেয়েছিল সে৷ কিন্তু তা পারেনি বিশেষ একজনের উষ্কানিতেই। আজও মনেমনে তাই সে নাওফিলকে স্বামীর মতো আপন ভেবে ওকে নিয়ে কল্পনার রাজ্যেই সংসার করে। অবশ্য শারীরিক, মানসিক, উভয় চাহিদা পূরণের জন্য হলেও প্রণয় সম্পর্কে জড়িয়েছিল সে দু’জনের সাথে। খুব বেশিদিন সে সম্পর্কের সময়কাল গড়াতে দেয়নি সে৷ এতে ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কিন্তু আজ রাতে এমন এক দুর্লভ মানব তার দোরে এসে দাড়িয়ে তাকে পেতে চাইছে, এ যে তার সৌভাগ্য। তা সে পায়ে ঠেলে দেওয়ার বোকামো করবে না নিশ্চয়! আজ স্থান, কাল, পাত্র সবই তার অনুকূলে। কোনোভাবে শেখ পরিবারের বংশধর এই গর্ভে ধারণ করতে পারলে আর কাজের লোকের পরিচয়ে অপমান হতে হবে না কারও আছে৷ বরং সেদিন স্মরণকেই পায়ের নিচে ফেলে পিষতে পারবে সে। লাজুক মুখ করে বলল তাওসিফকে, ‘আপনি এগোন, স্যার। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।’
খুব খুশি হলো তাওসিফ, ‘আচ্ছা৷ অপেক্ষা করব।’
ঘরের দরজা আটকে দিয়ে রুনা ছুটল বাথরুমে৷ তাওসিফ মাথা দুলাতে দুলাতে নীরবে হাসল। বিদ্রুপত্মাক হাসি। হাসতে হাসতে পেছন ফিরতেই চমকে উঠল সে। সামনে কিরণ বুকে হাত বেঁধে তীক্ষ্ণ চাউনিতে দাড়িয়ে আছে তার মুখোমুখি। ‘তুমি কেন এখানে? না ঘুমিয়ে কী করছ?’
-‘ঘুমাইনি বলেই আজ স্বচক্ষে দেখতে পেলাম আপনার নোংরা ঘটনা৷ ছিঃ ছিঃ ছিঃ! আপনি এরকম চরিত্রের, ভাইয়া? তাও কিনা বাসার মেইডের সঙ্গে? এত নিম্ন রুচি আপনার! ছিহ্! আর আমি আপনাকেই কিনা আইডল ভাবতে শুরু করেছিলাম?’

-‘তাই নাকি?’ থতমত চেহারা তাওসিফের। বিপদে পড়ল সে। কীভাবে সামলাবে এখন কিরণকে? এর মাঝে যদি রুনাও বেরিয়ে আসে! নাহ, এখনই রুনাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না তার নাটক। কিরণকেই সরাতে হবে।
মুখ বিকৃতি করে বলল কিরণ, ‘আপনি দেখতে শুনতে তো খারাপ না। তাহলে দুনিয়াতে আর কোনো মেয়ে পাননি না কি? করবেনই যখন অন্তত রুচিসম্মত কারও সঙ্গে করতেন। শেষমেশ ওই শয়তানির সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করার ইচ্ছা হলো?’
কিরণের দিকে তেড়ে গেল তাওসিফ। ‘তা কি তোমার সঙ্গে করব?’ ধমকে বসল। রেগেমেগে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে সে। এইটুকু মেয়ে কী সব অপবাদ দিয়ে অপমান করে যাচ্ছে! সাহস কত বড়ো!
কিরণ আকাশ থেকে পড়ার মতো অভিব্যক্তিতে চাইল৷ লজ্জাও পেলো ভীষণ। তবু চুপ রইল না৷ হতাশ সুরে বলল, ‘বিশ্বাস পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিচ্ছে আল্লাহ৷ ভালো মানুষ ভেবে আর কাউকে বিশ্বাস করার জো নেই।’
-‘কে করতে বলেছে তোমাকে বিশ্বাস? ছোটো মানুষ, অথচ কথার সাইজ লম্বা লম্বা৷ যাও যাও ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো আর না হয় পড়তে বসো৷ আর যেন রাতের বেলা টো টো করে বেড়াতে না দেখি!
চেতে উঠে কিরণ হুমকি দিলো, ‘আমি কাল সকালেই ভাইয়া আর আপুকে সব বলে দেবো।’

-‘আচ্ছা! আমি তো খুব ভয় পেয়ে গেলাম! প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও!’ ন্যাকা কান্নাকাটি স্বরে ব্যঙ্গ করে বলল তাওসিফ। ‘আবারও বলছি, কিরণ৷ ছোটো মানুষ বড়োদের ব্যাপারে সব সময় নাক গলাবে না৷ পড়াশোনা করতে এসেছ৷ ফোকাস অনলি পড়াশোনাকে রাখবে। তা না, খালি ফাঁকিবাজ। পড়াশোনার ঠিক নেই! এইটুকু বয়সে পেকে ফেটেফুটে যাচ্ছে সে৷ হয় প্রেম না হয় গোয়েন্দাগিরি! যাও ঘরে যাও!’ শেষে আবার ধমকাল তাওসিফ।
এমন করে তো শাসন কখনও দীধিতিও করেনি কিরণকে৷ তাওসিফ অবশ্য রেগে থাকলে এমন কড়া স্বরেই কথা বলে। কিন্তু আজকের ব্যবহার অপ্রত্যাশিত এবং বেশিই রূঢ় ছিল কিরণের জন্য৷ অল্প বয়স, গায়ে টগবগে রক্ত৷ তাই কষ্ট হজম করে নিলেও কিরণ অপমানটা সইতে পারল না৷ তর্জনী আঙুল তাওসিফের মুখের ওপর তুলে বলল, ‘মানুষ ছোটো হলেও চরিত্রহীন আর চরিত্রবান মানুষদের বিচার করার এতটুকু ম্যাচিওরিটি তো আছে৷ আর জীবনেও আমি আপনাকে সম্মান করব না।’ আর দাড়াল না তারপর৷ হনহনিয়ে উপরে চলে যেতে থাকল৷
কথা বলার মুহূর্তে তাওসিফ স্পষ্ট কিরণের চোখে পানি দেখেছিল৷ ভেজা সেই চোখ দেখেই তাওসিফের রাগ শীতল হয়ে যায়, নিঃশ্বাসও আটকে গেছিল বোধ হয়। প্রথমবার কোনো মেয়ের ভেজা চোখ হৃৎস্পন্দনও এক পলের জন্য থমকে দিয়েছিল ওর৷ কিরণ ওর কথাই কষ্ট পেয়ে কেঁদে ফেলল! এই উপলব্ধিটা ওকে কেমন যেন টেনে নিয়ে যেতে চাইছে ওই আবেগী মেয়েটার ঘরে৷ পরাস্ত ভঙ্গিতে তার সামনে দাড়িয়ে হতে চাইছে অনুতপ্ত।

আজ এক নাম না জানা কোনো পাখি
ডাক দিলো ঠোঁটে নিয়ে খড়কুটো,
আজ এলো কোন অজানা বিকেল
গান দিলো গোধূলী এক দু মুঠো
তুমি যাবে কি ? বলো যাবে কি ?
দেখো ডাকছে ডাকলো কেউ,
তুমি পাবে কি ? পা পাবে কি ?
সামনে বেপরোয়া ঢেউ ..
এই একটা গানই সারা পথ শুনতে শুনতে নাওফিল, দীধিতি এসে পৌঁছল দিয়াবাড়ি৷ আকাশটা পূর্ণিমার আলোয় ঝকঝকে আর কাশবনে উত্তাল হাওয়া। হঠাৎ করে বেরিয়ে পড়ে খু্ব একটা ভুল করেনি ওরা৷
গাড়ি থেকে নেমে দাড়াতেই এবার দীধিতির চোখে পড়ল তাদের গাড়ি থেকে দূরে দাড়ানো আরেকটা কালো গাড়ি৷ আতঙ্ক চোখে নাওফিলের দিকে তাকাল৷ কিন্তু সে নির্লিপ্ত চোখে গাড়িটা দেখে রাস্তার মাঝে হাঁটতে আরম্ভ করেছে। দীধিতি পাশাপাশি চলতে চলতে বলল, ‘আমাদের সঙ্গে এসেই দাড়াল গাড়িটা।’

-‘ওরা ওদের ডিউটি পালন করছে।’
আসল ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হলো না দীধিতির। ‘হঠাৎ বাইরে নিয়ে এলে কেন এত রাত করে?’
নাওফিল বসার মতো একটা জায়গা খুঁজে দীধিতিকে নিয়ে কাশবনের মুখোমুখি বসল, রাস্তার কোনায় ঘাসের ওপর। তারপর হুট করেই দীধিতির কোলে মাথা পেতে শুয়ে পড়ল৷ আকাশপানে মুখ করে মৃদুস্বরে বলে চলল, ‘আমি তোমার মনের মতো নই, স্মরণ৷ তা আমি শুরু থেকেই জানি৷ তুমি বাস্তবজ্ঞান পরিপূর্ণ হলেও যখন রোমান্টিক, ফ্যান্টাসি নভেল পড়ো তখন হঠাৎ করেই অবুঝ হয়ে যাও। এক্সপেক্ট করো ওখানের হিরো চরিত্রের মতো আমার মাঝেও রোমান্টিক, কেয়ারিং, পজেসিভ ভাবমূর্তি। হয়ত তোমাকে স্যাটিসফাইড করতে আমি মাঝেমধ্যে নিজের বৈশিষ্ট্যের বাইরে গিয়ে এক আধটু তেমন হই বা হতে পারি। কিন্তু আদতে আমি তো এমন নই। যেমন ধরো, তুমি অভিমান করে থাকলে তোমাকে মানানোর জন্য হুট করেই রোমান্টিকভাবে তোমাকে কোলে তুলে নিতে পারি না, জোর করে ঠোঁটে চুমু খেতে খেতে রাগ ভাঙাতে পারি না। কিংবা রান্নাঘরে তোমার সঙ্গে দাড়িয়ে সেই রোমান্টিকভাবে দুষ্টুমি বা প্রেম খুনসুটি করতে পারি না। মূলত এমন ব্যক্তিত্বের না আমি। এরপরও আমি অনেকবার এমনভাবেই নিজেকে তোমার সামনে এনেছি৷ কারণ, কখনও যেন তুমি আমার প্রতি অনাগ্রহী না হও, আমাকে বোরিং না লাগে৷ প্রয়োজনে আমি আগামীতেও তোমাকে স্যাটিসফাইড করতে এমনই হব বারবার। তবুও আমার প্রতি তোমার অনুভূতিশূন্যতা দেখতে পারব না। কিন্তু স্মরণ, পাশাপাশি তোমাকে এটাও মানতে হবে যে, আমার ব্যক্তিরূপটা আসলে সাদামাটা।

স্পেশালিটি বলতে আমার মাঝে কিছু নেই তোমার নভেলের হিরোদের মতো। ওসব ওই নভেলেই সম্ভব। এই যে আমি তুমি কখনও মুখে একে অপরকে ভালোবাসি উচ্চারণ করে স্বীকৃতি না দিলেও আমরা জানি যে, ভালোবাসা এক অপরের প্রতি আছে বলেই শত ঝামেলাকে ফেলে এসে এক সঙ্গে হতে পেরেছি আজ। আমি নিজের মনে কখনও আঁকিনি বা ভাবিনি আমার বউ কেমন দেখতে হবে, কেমন আচার আচরণের হবে৷ প্রথম প্রথম শুধু ভাবতাম সে যেমনই হোক দেখতে বা বৈশিষ্টে। শুধু তার মাঝে যেন দুঃসাহসী সত্তাটা থাকে৷ কেন এমন চাইতাম তা তো তুমি জানোই। এখন কিন্তু আমার মধ্যে যে ভাবনাটা হয় তা হলো আমি আমার বউ আর বাচ্চা নিয়ে সারাজীবন সুখে দুঃখে কাটাব। রাজনীতিতে প্রবেশ করতে চাইছি দাদা বা আব্বুর প্রেশারে পড়ে না। নিজেকে প্রমাণ করতে। আমার বাবা-মা যারা মাফিয়া, সন্ত্রাসী নামে পরিচিত৷ তাদের সন্তান হয়ে আমি ছোটোবেলা থেকেই কাছের, দূরের সকল মানুষের থেকে একটা মানসিক আঘাত পেতে পেতে বড়ো হয়েছি। আমার বাবা মা দেশদ্রোহী, ক্রিমিনাল বলেই যে আমিও তাই হব! সবার এই কথাটাকে ভুল প্রমাণিত করার জন্য হলেও আমার রাজনীতিতে জড়ানোটা প্রয়োজন৷ যে দেশের ক্ষতির কারণ ছিল আমার বাবা-মা৷ সেই দেশের সেবা করার সুযোগটা আমি পেতে চাই৷ আমার রক্তে কোনো দোষ নেই, সন্ত্রাসী বাবা-মায়ের সন্তান সন্ত্রাসীই হয় না৷ তা আমি সবাইকে জানাতে চাই, স্মরণ। আর আমার এই লক্ষ্যে তোমাকে পাশে প্রয়োজন। নয়ত আমি পারব না৷ কিছুই করতে পারব না আমি।’

-‘তুমি তো আমাকে এতটা খোলামেলাভাবে কখনও কিছু বলোনি৷ আমি মাঝেমধ্যে অবুঝের মতো করি, মানছি। কিন্তু সংসার আর স্বামীকে সামলানোর আর আগলে রাখার মানসিকতা যে আমার নেই, তা ভুল । তুমি জানোই না তুমি আমার কাছে কতটা স্পেশাল৷ আমি তোমার মতো একজনকে পেয়ে নিজেকে কতটা সৌভাগ্যবতী ভাবি, কতটা গর্ববোধ করি, তা কখনও তোমাকে বলা হয়নি। আমি তো তোমাকে রাজপুত্র মনে করি। আর নিজেকে তুচ্ছ এক প্রজা। আমি যখন তোমার ভার্সিটিতে যেতাম কতবার তোমার নজরে পড়তে তোমার আশেপাশে হেঁটেছি, সামনে দিয়ে চলেছি৷ তুমি কিন্তু ভুল করেও আমার দিকে চোখ তুলে তাকাওনি৷ কিংবা দেখার মতো করে দেখোনি৷ শুধু আমি কেন, তোমার নজরে পড়তে কত মেয়েই ঘুরঘুর করত তোমার চারপাশে। যদি না নানান পরিকল্পনা আর কৌশলের দ্বারা তোমার কাছাকাছি আসতাম। তুমি আমাকে কোনোদিন চিনতেই না, চেনার প্রয়োজনও মনে করতে না। তোমাকে পাওয়াটা তাই আমার বড়ো ভাগ্যই। তাই প্রশ্নই আসে না তোমার প্রতি কখনও আমি অনাগ্রহী হয়ে পড়ব৷ ভয় তো আমি পাই যে, তোমাকে যদি কোনো কারণে হারিয়ে ফেলি! আমি কী নিয়ে থাকব এই এত বড়ো দুনিয়াতে?

তোমার পাশে, তোমাকে আগলে রাখার জন্য গোটা একটা পরিবার আছে। আমার তো তুমি আর এক আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই৷ তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে আমার টিকে থাকাটা কতটা কষ্টকর হবে! তা যখনই ভাবি আমার দম বন্ধ লাগে৷ আমি কেমন জীবনসঙ্গী চাইতাম, তা কিন্তু তুমি বিয়ের পর জানতে পেরেছ৷ অথচ যখন আমি তোমার প্রেমে পড়ি, তখন কিন্তু শুধু তোমার বৈশিষ্ট্যকে চিনেই প্রেমে পড়েছি। তোমার ব্যক্তিত্ব সামান্য জেনে ওই সামান্য ব্যক্তিত্বতেই মজেছি৷ বলতে দ্বিধা নেই, তোমার বাহ্যিক সৌন্দর্যও আমাকে আকর্ষণ করেছে। কিন্তু তার মানে আবার এই না যে, তোমার সুন্দরতাই আমাকে এখনও ধরে রেখেছে। এটা স্বাভাবিক একটা সত্য। একটা মানুষকে আগে চিনি বা পছন্দ করি আমরা তার চেহারার মাধ্যমে। তারপর না মিশতে মিশতে গোটা তাকেই পছন্দ বা অপছন্দ করি। আমি যখন কল্পনার দুনিয়াতে ভাসি, তখন কিন্তু আমার উপন্যাসের হিরোকে ভেবে ভেসে বেড়াই না। আমার সমস্ত ভাবনাতে তুমিই থাকো, নাওফিল। আমি তোমার স্বরূপকেও ভালোবাসি, আমার জন্য ধারণা করা তোমার মেকি রূপকেও। আমি তোমার লক্ষ্য সম্পর্কে এমন করে জানতে পারিনি আগে৷ নয়ত কখনই বিরুদ্ধাচারণ করতাম না৷ তুমি সত্যবাদী আর সৎ থেকো রাজনীতিতে। তাহলেই আমি সব সময় তোমার পাশে থাকব।’

শেষ অনুরোধটাই নাওফিলের বিবেকে পাথর নিক্ষেপ করল যেন৷ কাঙ্ক্ষিত গতি পেতে বা টিকিয়ে রাখতে রাজনীতির অভ্যন্তরে যে কত বর্বরতা আর ষড়যন্ত্র চলে! তা মেনে নিয়েই যে তাকেও আগে গদিটা পেতে হবে৷ তা আর বলার সাহস হলো না নাওফিলের।
-‘আমার আজ খুব খারাপ লাগছিল আমার প্রকৃত জন্মদাত্রীর কথা ভেবে। আমাকে রুনা যখন ইনডিরেক্ট বেজন্মা বলল, তখন রাগে জ্ঞান হারালেও পরে উপলব্ধি করেছি৷ আমি তো সত্যিই জানি না আমার জন্ম পরিচয়। হতেও তো পারি বেজন্মা। যার গর্ভে এসেছিলাম আমি, সে তো দশটা মাস আমাকে নিজের মাঝে ধারণ করে পৃথিবীর সবথেকে অসহনীয় ব্যথা সয়ে জন্ম দিয়েছিল৷ সেই মানুষ আমাকে ত্যাগ করতে কি একটুও মায়া অনুভব করেনি?’ বলতে গিয়ে কান্নায় ধরে এলো দীধিতির গলা। নাওফিল উঠে বসে ওকে বুকের কাছে জাপটে ধরল। ‘এজন্য কাঁদছিলে তখন? তাহলে মিথ্যা বললে কেন?’
-‘মিথ্যাও বলিনি। আম্মুর কথাও মনে পড়ছিল। ফর্মালিটি করে হলেও সে যে আমাকে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে দাবি করেছে কাকুর কাছে। সেটাই আমার কাছে অনেক বড়ো প্রাপ্তি ছিল আজ।’ নাক টেনে, চোখের পানি মুছে নিতে নিতে বলল দীধিতি।

-‘আমি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, স্মরণ। তোমার ভালোর জন্য আমি যা কিছু গ্রহণ করতে প্রস্তুত, তেমন ত্যাগ করতেও প্রস্তুত। এমনকি যা কিছু করতেও প্রস্তুত। তাই দয়া করে আমার কাছে তোমার সামান্যতম কষ্টও লুকাবে না, কোনো কথাও আড়াল করবে না।’ আদেশ গলাতেই বলল নাওফিল। দীধিতি নত মুখে মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো৷ তারপর হঠাৎ ওকে জিজ্ঞেস করল নাওফিল, ‘তোমার আম্মুর জন্য সোহাইল কাকু বেস্ট , তাই না? আরও আগেই দুজন এক হলে তোমাদের দু বোনের কখনও বিপদে পড়তে হত না বোধ হয়।’
এমন কথাটা বলল নাওফিল কেবল এজন্যই, সোহাইল সম্পর্কে মূলত দীধিতির ভাবনা কেমন তা জানার জন্য৷ একটু রয়েসয়ে দীধিতি জবাব দিলো শুধু, ‘হয়ত।’
-‘হয়ত? হয়ত কেন বলছ? কাকু নাকি খুব কেয়ারিং তোমাদের দু বোনকে নিয়ে৷ খুব ভালোবাসেন তোমাদের৷ তেমনই তো বললেন সেদিন।’

দীধিতি উদাস মনে হাওয়ার তোড়ে দুলতে থাকা কাশফুলগুলো দেখতে দেখতে বলল, ‘আমার সামনে দাড়ানো পরিচিত মানুষটার মাঝে আমাকে নিয়ে তার কেমন অনুভূতি, তা আমি বুঝতে শিখেছি ক্লাস ফাইভ সিক্স থেকেই। আমার মনে হয় সেটা যে কোনো মানুষই বুঝতে পারে একটা বয়সে এলে৷ ছোটোবেলায় সোহাইল কাকুকে দেখতাম এ-বেলা ও-বেলা বাইকে করে বাসার সামনে এসে দাড়াতে৷ আম্মু বাসায় থাকলে আমাকে আর কিরণকে ডেকে এনে এত এত খাবার-দাবার দোকান থেকে এনে কিনে দিত। আর যদি ক’টা দিন আম্মুর দেখা না পেত তাহলে রুক্ষ মেজাজে আমাকে জিজ্ঞেস করত আম্মু কখন বাসা থেকে বের হয়েছে, কখন ফিরেছে। বড়ো হতে থাকলাম যখন, তখন একটু একটু পরিবর্তন হতে থাকল কাকুর আচার আচরণ৷ খুশিমনে বাসায় ঢুকলেও একটা সময় আম্মুর সঙ্গে তর্কবিতর্ক আরম্ভ করে দিতো৷ মানে সে যতবার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, ততবারই আম্মু আমার আর কিরণের দোহাই দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে৷ একবার কাকুকে বলতে শুনেছিলাম, আমাকে যেন ভালো কোনো এতিমখানাতে দিয়ে দেয়। সব খরচা দেবে সে। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি৷ খুব ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। যদি সত্যি আম্মু আমাকে একা কোথাও রেখে আসে! কারণ, আম্মুও খুব একটা সহজ ছিল না আমার সাথে৷ কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে আম্মু সেদিন অপমান করে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিল কাকুকে, শুধু আমাকে এতিমখানায় রেখে আসার কথাটা শুনে। সৌরভের সঙ্গে আমার ইন্সিডেন্টটা আমাকে উপলব্ধি করায় আরও বেশি করে, আম্মু আমাকে মন থেকে গ্রহণ করেও করতে পারে না আসলে। আবার ভালোবেসেও আবার বাসতে চায় না। এটা স্বাভাবিক ভাবি এখন। যেদিন জানতে পারলাম আমি আব্বুর প্রেমিকার সন্তান। আব্বু আমার সঠিক পরিচয়টাও দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি আম্মুকে৷ সেদিনই বুঝলাম, এটা কোন স্ত্রীই মেনে নিতে পারে না!’

-‘সৌরভ আর তোমার ইন্সিডেন্টের পর সোহাইল কাকু তোমাদের অনেক সাপোর্ট দিয়েছিল তো, তাই না?’ বেশ সাবধানে, কৌশলে প্রশ্নগুলো রাখছে নাওফিল।
দীধিতি প্রশ্নটা শুনে ঠোঁট চেপে একটু হাসল, ‘পুলিশ সুপার যখন তার দায়িত্বে ব্যর্থ হলো তখন সৌরভ আর সৌরভের বাবা প্রথমে কাকুকে বলল কেসটা পিবিআই এর আন্ডারে দিতে। কাকু ঠিক আছে বললেও তার মাঝে বিরক্তি আর অনাগ্রহ টের পেয়েছিলাম সবাই। তারপর একদিন সে আম্মুকে বলল, ঘটনাটা নিয়ে যত লোক জানাজানি হবে ততই সমস্যা হবে আমার জন্য। তারপর এটাও বলেছিল, সৌরভকে আর আমাকে একটা সম্পর্কে বেঁধে দিতে। কী একটা খোঁড়া লজিক দেখিয়েছিল, সৌরভ আর সৌরভের পরিবারের থেকে বেস্ট কেউ আমার জন্য হবে না। আর তাছাড়া ভবিষ্যতে ভালো পাত্রের সন্ধান পাওয়াও মুশকিল হতে পারে। অথচ তখন আমি, সৌরভ, দুজনই কতটুকু। আম্মু সেদিন আরও পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল, কাকু আমার এই ঝামেলাটা ঘাড়ে নিতে চাইছে না৷ ইনফ্যাক্ট আমাকেই পুরো বোঝা মনে করে সে। এটা নিয়ে সৌরভের বাবা-মায়ের সাথে আলোচনা করে আম্মু সিদ্ধান্ত নেয়, কাকুকে আর আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে টানবে না। তাই কেসটার আর কোনো সলিউশনও মেলেনি।

আমাকে কেউ পুরো ঘটনা খুলে না বললেও কিরণ সব বলেছিল, কী কী হয়েছিল আমাদের সাথে। আমি সেসব শুনে ট্রমার মাঝে চলে গেছিলাম। আরও খারাপ কিছু হতে পারত আমার সাথে। যতটুকুই বা হয়েছে তাও যারা জেনে গেছে, তারাই সবখানে রটিয়ে বেড়াবে আরও কথা৷ তখন অবিশ্বাস্যভাবে আমাকে মানসিক সাপোর্টটা বেশি দিয়েছিল আম্মুই। আমি ক্লাস থ্রি থেকেই একা একা থাকতাম ঘরে। কিরণ একটু বড়ো হওয়ার পর বায়না ধরত আমার কাছে থাকার। তখন থেকে এক সঙ্গেই দু’বোন থাকতাম। কিন্তু ওই সময়ে আম্মু আমার আর কিরণের মাঝে এসে শুতো৷ নানারকম গল্প করত আমাদের সাথে। আমি স্বাভাবিক না হওয়া অবধি অনেকগুলো রাতে আম্মু থাকত আমার পাশে। সেই ক’টা রাত শ্রেষ্ঠ ছিল আমার জীবনে৷ আব্বু যদি আমার পরিচয়টা আম্মুর কাছেও অন্তত খোলাসা করে যেত, তাহলেও হয়ত আমাকে নিয়ে আম্মুর আচরণ এতটাও শীতল হত না।’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল শেষে দীধিতি।
নাওফিলও আবিষ্কার করতে সক্ষম হলো দীধিতির জীবনে বিপজ্জনক মানুষটা সোহাইলকে। সেই সাথে রেজার মৃত্যু রহস্যটারও বিশাল একটা সূত্র পেয়ে গেল। তবে এ মুহূর্তেই সেসব দীধিতিকে জানাতে চাইল না। প্রমাণ পাওয়াটা জরুরি৷ আর সেটা একমাত্র ইয়াসিফই পেতে পারে৷ অপেক্ষা করতে হবে ইয়াসিফের ফিরে আসার।

তবে সেই সাথে ঝুমুরকে নিয়েও কিছু দ্বিধা, সন্দেহ দূর হলো আর কিছু মজবুত হলো৷ যেটা মজবুত হয়েছে সেটা হলো, সোহাইল শেখের সঙ্গে অনেক আগেই একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এই মহিলার। খু্ব বেশিদিন সুদর্শন সোহাইলের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারেননি তিনি। কিন্তু নিজের বিবেকবোধ, দায়িত্ববোধ আর মমতাবোধকে আগে প্রাধান্য দিয়েছেন। সন্তানদের সুনিশ্চিত ভবিষ্যত গড়ে না দেওয়া পর্যন্ত নিজের স্বার্থ আর সুখকে বিসর্জন দিয়ে গেছেন তিনি। কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সোহাইল কিরণকে গ্রহণ করতে পারলেও দীধিতিকে কখনই করবে না। বাধ্য হয়ে করলেও এক সময় দীধিতির আশ্রয় হবে কোনো এক এতিমখানাতেই। যেটা ঝুমুর চাননি।
-‘চলো, বাসায় ফেরা যাক। অনেক রাত হলো।’ বলে দাড়িয়ে পড়ল দীধিতি। নাওফিলও উঠে পড়ে এগোতে থাকল ওকে নিয়ে গাড়ির দিকে। হঠাৎ করেই সে দীধিতিকে চমকে দিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে হাঁটতে হাঁটতে একদম গাড়িতে এনে বসিয়ে দিলো৷ ‘মাই গড! বিশাল হেভি হয়ে গেছ, স্মরণ। হিরোগিরি দেখাতে গিয়ে দু মিনিটেই আমার গ্যাস বেরিয়ে গেছে।’ গাড়ির দরজার কোনা ধরে নাটকীয় ঢঙে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল নাওফিল।
চোখা দৃষ্টিতে নাওফিলকে দেখে দীধিতি জবাব দিলো, ‘আমিও খেয়াল করেছি বুঝলে৷ লাস্ট মান্থ ধরে তোমাকে দেখতে লাগছে যেন বয়সটা বেড়ে গেছে হঠাৎ করে। চোয়াল দুটো শুকিয়ে একটু ঝুলেও পড়েছে মনে হচ্ছে। হালকা একটা ভুঁড়ির সন্ধানও মিলছে দেখো তোমার টি শার্টের ওপর থেকে। মাই গড! ওই তো ভুঁড়িটা ভেসে উঠেছে।’

নিমেষেই ঠাস করে গাড়ির দরজাটা লাগিয়ে দিলো নাওফিল। মনে হলো যেন দীধিতির কথা বন্ধ করতে ওর মুখের ওপর দরজাটা লাগাল৷ বড়ো বড়ো পা ফেলে গাড়ির অন্যপাশ এসে ভেতরে ঢুকে সিটবেল্টটা লাগাতে লাগাতে বলল, ‘ননসেন্স কথাবার্তা বলো কেন? আমার তোমার মাঝে মাত্র চার বছরের এইজ গ্যাপ। ভুলে গেছ বোধ হয়৷ আমার দাদাই যেখানে স্টিল স্ট্রং ম্যান৷ দাদীর চুলও মাত্র এক ভাগ পাক ধরেছে৷ সেখানে তাদের চাঁদের টুকরো নাতিকে তুমি বুড়ো বানাতে চাইছ! আর চারটা বছর গেলে তুমি আরও মুটিয়ে যাবে। আমি একই থাকব৷ তখন দেখা গেল তুমি আমার ওপর চড়ছ আর আমি…!’
-‘আর একটা ওয়ার্ড বলে আমাকে অপমান করতে চাইলে সত্যিই ওজন সত্তর কেজি বানাব বলে দিলাম!’
-‘হা হা হা! চোরের ওপর রাগ করে কলাপাতায় ভাত খাবে?’
-‘প্রয়োজনে খাবো৷ কারণ, আমার ঘরের চোরটাই আমার কলাপাতায় ভাত খাওয়া সহ্য করতে পারবে না।’
-‘নাহ! তাতে তোমার ঘরের চোরটার আরও সু্বিধা৷ সে তো এমনিতেও চায় না তার ঘরওয়ালী লোকসম্মুখে যাক, কেউ তার দিকে একবারের বদলে দু’বার ফিরে তাকাক৷ এতে চোরের সু্বিধায় হবে।’ হাসতে হাসতে বলল নাওফিল।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৪

-‘বেশ, ঘরের চোরটাকেই সন্তুষ্ট করি তাহলে৷ কাল থেকেই শরীরে মেদ বাড়ানোর চার্ট মেইনটেইন করতে আরম্ভ করব। কী বলো?’
-‘তা কী কী থাকবে তোমার চার্টে?’
-‘এ-বেলা ও-বেলা বাটার তো থাকবেই৷ সেই সাথে সব রকম মিষ্টি আর… ‘
নাওফিল হঠাৎ ড্রাইভিং থেকে নজর সরিয়ে এগিয়ে এলো দীধিতির কাছে। কানের কাছে ঠোঁট রেখে ছুঁইয়ে বলল, ‘এ-বেলা ও-বেলা বাটার আর মিষ্টি খাওয়ানোর দায়িত্বটা আমাকে দিয়ো, সোনা।’
মুচকি মুচকি হেসে উঠল দীধিতি। ‘আরে আগে সামনে খেয়াল রাখো না! পাঁজি।’ নাওফিলকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল দীধিতি। হাসতে থাকল নাওফিলও।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৬

তৃতীয় পরিচ্ছেদের অন্তিম পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here