রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৬
সোহানা ইসলাম
জাহেদ কে এইভাবে দৌড়াতে দেখে ভয় পেয়ে যায় প্রতিটি মানুষ। জিনিয়া ভয় পেয়ে বলে,
—“রোহান ভাই! ওকে দেখেুন! কিছু করে ফেলবে না তো?”
রোহান বলতে বলতে রাশেদকে নিয়ে দৌড়ায়,
—“এই ছেলে আজকে আমাদের শেষ করে দেবে!”
জাহেদ নিজের রুমে ঢুকেই ড্রয়ার, আলমারি, বেডের নিচে—যেন কিছু একটা খুঁজতে শুরু করে।এই দেখে রোহান হাফাতে হাফাতে বলে,
—“এই! কি করছিস তুই?”
রাশেদ বলে,
—“দেখুন তো… রশি খুঁজতেছে নাকি!”
দু’জনেই ভয় আর টেনশনে রুমের ভিতরে ঢোকে।
রোহান আর রাশেদ দুইজন মিলে জাহেদ কে বাদা দেওয়ার চেষ্টা করে। বার বার হাত ধরে বসাতে চায়।জাহেদ তাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
—“চুপ!একটা জিনিস খুঁজতেছি।বিরক্ত করো না।”
দু’জন একে অপরের দিকে তাকায়।এমন সময় জাহেদ হঠাৎ বিজয়ী ভঙ্গিতে বলে,
—“পেয়ে গেছি !”
আলমারি থেকে একটা সাউন্ড বক্স টেনে বের করে। রোহান হাঁ করে তাকায়।রাশেদ কপালে চাপড় মেরে বলে,
—“বাঁচলাম… আত্মহত্যার জিনিস বের করে নি!”
পরের মুহূর্তে—ধমধমধম!সাউন্ড বক্সে গান বাজতে শুরু করে—“
~~তুমি তলে তলে টেম্পু চালাও
আমি করলে হরতাল
শুধু ডাইনে বামে ঘোরাও দেইখা
তিতা হইলো প্রেমের ঝাল
আরে ফুলকলি রে ফুলকলি
Fool বানাইয়া কই গেলি
উরাধুরা দুঃখের আঁচর ঝিকিমিকি জ্বলে
চোখেতে ধুলা দিয়া বড়লোক করলা বিয়া
এই জ্বালা তো মিটাবো আমি
ডিজে গানের বেজ দিয়া…আর বলবো
আইজ আমার গার্লফ্রেন্ডের বিয়া~~~
গানের তালে জাহেদ গান গায়
__“ আমি খাইতে যামু বিয়া, কাচের পিরিচ নিয়া!…”
জাহেদ সাউন্ড বক্স কাঁধে তুলে নাচ শুরু করে দেয়।দুই জন হা করে তাকিয়ে আছে।
রোহান বলে,
—“এই ছেলে বিয়ে ভাঙবি না, এখন নাচার সময় না!”
জাহেদ কাঁধে সাউন্ড বক্স নিয়ে হেলেদুলে নাচতে নাচতে বলে
__“ আরে বিয়ে ভাঙতে যাব কেন ? আমার খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে! ”
রাশেদ বলে,
—“না… এইটা পাগলামির ডেঞ্জার লেভেল ছাড়িয়েছে!”
কিন্তু জাহেদ তো আর থামে না—রোহান আর রাশেদের হাত টেনে বলে,
—“চলো চলো! সবাই মিলে নাচ! আজকে আমার গার্লফ্রেন্ডের বিয়া! বিয়া খাইতে যামু কাচের পিরিচ নিয়া..!”
দু’জনকে জোর করে নাচায়—তারপর তিনজন মিলে হৈচৈ করতে করতে নিচে নামে।ড্রইং রুম—সবাই স্তব্ধ ওর নাচ দেখে। জাহেদের পরনে কালো শর্টস, সাদা টি–শার্ট, আর কাঁধে সাউন্ডবক্স—
নিচে নেমেই সে গলা ছেড়ে গান ধরে
—“আজ আমার গার্লফ্রেন্ডের বিয়া—হেইই ইয়া!”
ড্রইং রুমে জেসমিন বেগম,মারিজায় বেগম, ফারিয়া বেগম সবাই এক এক করে উপস্থিত হয়।
বাড়ির দুই কর্তারা বাড়িতে নেই। অফিসে চলে গেছে। আনিছুর রহমান কে নিয়ে গেছে সাথে করে। একা একা বাড়িতে বসে কি করবে তাই। সামনে ছেলের মেয়ের বিয়ে তাই ওনারা চাচ্ছেন না আরমানদের উপর কাজের চাপ পরুক।
জারা, জিনিয়া, ছায়মা,জাহির —সবাই দৌড়ে আসে। সবাইয়ের মুখের একটাই এক্সপ্রেশন—
__“এটা কি দেখছি আমরা?”
ফারিয়া বেগম বলেন,
—“সকাল সকাল নাটক শুরু করলি?”
জেসমিন বেগম বিস্মিত হয়ে বলেন,
—“আরমান বাবা দেখ তো, ওর কি হইছে? এমন ছাগলের মতো করছে কেন?”
রোহান মাথা চুলকে বলে,
—“আম্মু, আপনার ছেলে ছেকা খাইয়া বেকা হইছে।”
জেসমিন বেগম বোঝার চেষ্টা করে বলে,
—“কি খেয়েছে? বেকা মানে কি?”
রোহান আর রাশেদ হাসি চেপে মরে। এমন সময় জোহান দৌড়ে এসে যোগ দেয় জাহেদের সাথে—
—“ভাইয়া! চলো.. চলো আমিও নাচবো তোমার সাথে ! আজ আমার গার্লফ্রেন্ডের বিয়া ! আমরা খেতে যাবো কাচের পিরিচ দিয়া…!”সে-ও নাচ শুরু করে দেয়।
জাহেদ বলে
__“ তোর গার্লফ্রেন্ড না.. আমার গার্লফ্রেন্ড! ”
__“ ওও….সরি ভাইয়া! ” দুই পাগলের কান্ড সবাই হা করে দেখছে। কেমন হেলেদুলে নাচ করছে।
সবাই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। জারা মুখে হাত দিয়ে বলে,
—“হায় আল্লাহ! এদের কেউ থামাও.. ফিহার কাছে যেতে হবে !”
জাহেদ কাঁধে সাউন্ড বক্স নিয়ে নাচতে নাচতে বলে
__“ ভাবি তাড়াতাড়ি চলো! ”
মিম রাশেদের দিকে তাকিয়ে আছে। বোঝাতে চাইছে জাহেদের কি হয়েছে। এই খবর শুনে পাগল হয়ে গেলো নাকি। ছায়মা জারা’র সাথে একপাশে দাড়িয়ে আছে। জাহেদ নাচতে নাচতে বাড়ির বাইরে চলে যায়। রোহান, রাশেদ, জিনিয়া আর মিম পর পিছন পিছন যায়।
জারা আরমানের দিকে তাকিয়ে বলে
__“ আমরা যাবো না?”
__“ হুমম! যাবো! ”
জারা ছায়মার হাত ধরে বলে
__“ তাহলে আসুন! আমরা যাচ্ছি! ”
আরমান জারা’র দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে
__“ তুমি এই ভাবে যাবে?”
জারা নিজের দিকে তাকায়। পরনে তার মিষ্টি রঙের থ্রি-পিস। নতুন এটা। তাহলে এই ভাবে গেলে কি হবে?
__“ হুমম! এটা তো ভালোই, খারাপ না!”
আরমান জারাকে বলে
__“ বোরকা পরে মুখ ডেকে এসো ফাস্ট! ”
__“ গাড়ি করেই তো যাবো, এই ভাবে গেলে কি হবে? ”
__“ কি হবে যানি না! কিন্তু পরে আসতে বলেছি!যাও!”
জারা মুখ খুলে আবার কিছু বলতে নিবে তার আগেই মারজিয়া বেগম শক্ত কন্ঠে বলেন
__“ জারা! জামাই কি বলছে? যা এক্ষুনি! ”
কালকে ঘটনা নিয়ে মেয়ের উপর বেজায় চটে আছেন তিনি। এখন আবার মুখে মুখে কাথা বলছে জামাইয়ের । তাই তিনি ধমক দিয়েছেন। জারা আর কিছু না বলে দৌড়ে উপরে যায়। বোরকা হিজাব পরে তাড়াতাড়ি নামে।
এর মাঝে আরমান জেসমিন বেগম কে ফিহা কে, জাহেদ কেন এমন করছে, তারা কোথায় যাচ্ছে এবং ফিহার সাথে জাহেদের কি সম্পর্ক তা সব খুলে বলে। এসব শুনে তাদের মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের ছেলেমেয়ে এতো দূর এগিয়ে গেছে ভাবা যায়। তিনি মনে মনে ভাবেন জারা,মিম যেমন নম্রভদ্র তাহলে নিশ্চয় ফিহাও তেমনই হবে।আর ছেলের পছন্দ যেখানে তারা বলে আর কী করবেন। ছেলে সংসার করবে।
জারা নিচে নামতেই আরমান ওর হাত ধরে বলে
—“চলো, দেখি কী হচ্ছে বাইরে।”
আরমান যাওয়ার আগে জাহির কে বলে আসতে। আর জারা তো ছায়মাকে সাথে করে নিয়েই যায়।
ওরা বাইরে এসে দেখে রোহান রা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেছে গেটের বাইরে মাএ। আরমান ওর মার্সিডিস বের করে। জারা আরমানের সাথে সামনে বসে। ছায়মা পিছনে বসে, জাহির আর কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে ছায়মার সাথে পিছনে বসে।সবাই গাড়িতে উঠে পরতেই আরমান গাড়ি স্টার্ট দেয় ।
এদিকে জাহেদ সামনের সিটে বসে সুর করে গাইছে। সাউন্ড বক্স গাড়ির জানালা দিয়ে বের করে ধরে রেখেছে। গান চলছে—রাস্তায় মানুষ তাকিয়ে থাকে। কষ্টে সবার মন খারাপ আর জাহেদ খুশিতে গদগদ।
জাহেদ হঠাৎ বলে,
—“রোহান ভাই! হঠাৎ করে ফিহার কাতার থেকে বাতার এলো কোথা থেকে ?”
রোহান সাথে সাথে জবাব দেয়,
—“সুন্দরী রমণীর গন্ধে! বাতার সব সময় গন্ধ শুঁকে আসে ভাই!”
গাড়িতে সবাই একেকটা হাসি চেপে মরছে। কিন্তু রোহানের কথায় জিনিয়া খেপে গেছে।
__“ আপনার তো বেশ অভিজ্ঞতা? তা আপনি কয়জন রমণীর গন্ধ শুঁকেছেন? ”
জিনিয়ার প্রশ্ন শুনে রোহানের মুখ ভোঁতা হয়ে যায়। সে জাস্ট এমনি কথাটা বলেছে আর এই মেয়ে কিসব ভেবে বসে আছে। একেই বলে মেয়ে জাত।
__“ কথায় কথায় পেচ ধরতে শিখতে চাও তো মেয়ে মানুষের কাছে যাও বা*ল..! ”
রোহান কিছুটা রেগে আছে জিনিয়ার সাথে। কাল কল তুলেনি বলে। জিনিয়া কথা বললে শুধু হুমম!হা! উওর দেয়। জিনিয়া আর কিছু বলে না মুখ গুমোট করে বসে থাকে।
মিম ফিসফিস করে রাশেদকে বলে,
—“এখনই না থামাইলে পাগলখানায় ভর্তি করতে হবে।”
রাশেদ হেসে বলে,
—“ওকে থামানো যাবে না। এইটা তার ব্রোকেন হার্ট ফেজ।”
কিন্তু জিনিয়া রাগে ফুঁসছে। তার ভাই এমন ভাবলেস হয় কীভাবে? রাগে গজগজ করতে করতে বলে
__“ ভাইয়া তোমার কি একটু খারাপ লাগছে না ফিহার বিয়ের কথা শুনে? ”
জাহেদ সাথে সাথে জবাব দেয়
__“ না লাগছে না খারাপ! ”
রাশেদ বলে
__“ আপনার কাছ থেকে এটা আশা করি নি? ”
মিমের চোখে জল চিকচিক করছে। না জানি ওর বান্ধবী এখন কি অবস্থায় আছে।আবার এদিকে জাহেদের গা ছাড়া ভাব। দেখে মনে হচ্ছে ফিহার বিয়েতে সে মহা খুশি।
রোহান এবার সিরিয়াস ভাবে বলে
__“ অন্যথায় ফিহার বিয়ে হয়ে গেলে বাঁচতে পারবে তো? ”
জাহেদ জবাব দেয় না। জিনিয়া রাগে জাহেদ চুলে টান দিয়ে বলে
__“ ছিঃ একে ভাই বলতে লজ্জা করছে আমার। ”
জাহেদ হাসে। সে বোঝতে পারছে তার এই খামখেয়ালির জন্য সবাই ওর ওপরে চটে আছে। জিনিয়ার কাছ থেকে চুল ছাড়াতে ছাড়াতে বলে
__“ পেত্নী আমার চুল ছাড়! ব্যথা করছে!”
জিনিয়া জাহেদের চুল ছেড়ে দেয়। সে আর জোহানের টেকনিক ইউজ করেছে।মিম বলে
__“ আমার জানুর বিয়ের কথা শুনে আপনি যখন এতোই খুশি তাহলে যাচ্ছেন কেনো ভাইয়া?”
জাহেদ সহসা উত্তর দেয়
__“ বিয়ে করতে! ”
জাহেদের কথায় সবাই স্তম্ভ হয়ে যায়। কি বললো জাহেদ? বিয়ে করতে মানে? জিনিয়া অবাক হয়ে বলে
__“ কি বললে ভাইয়া!”
জাহেদ এবার পুরোপুরি ভাবে মুখ খুলে
__“ আরে ভাই আমার বিয়ে আমি যাবো না! ”
__“ মানে? ফিহার তো অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে!” বললো রোহান
__“ তাহলে আমি তুমি, তোমরা কেন এখন ফিহা দের বাড়িতে যাচ্ছি? ” বলল জাহেদ
রাশেদ ভাবুক হয়ে বলে
__“ তা তো জানি না! কিন্তু আমরা তো আপনার পিছন পিছন যাচ্ছি! ”
__“ ফিহার বাবা বিয়ে ঠিক করে ভালো কাজ করছে। এখন আমি গিয়ে শুধু বিয়ে করব! ভালো না আইডিয়া টা বলো?”
জাহেদের কথা কেউ কিছু বোঝলো না। সবাই শুধু একে অপরের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে আছে। জাহেদ সবাই সমস্যা দূর করতে বলে
__“ আরে আমি বিয়ে করব বলেই এতো খুশি। ফিহা আমার গার্লফ্রেন্ড, ওর বিয়ে..! কিন্তু আমার সাথে হবে। এমনিতেই বাড়িতে বললে দুই তিন বছর পরে করাবে। তার থেকে ভালো না,এই ভাবেই করে ফেলি। আমি গিয়ে ফিহার বাবাকে টুপ করে দুইটা চুমু খাবো ভাবচ্ছি।”
এবার বোঝলো সবাই জাহেদ কেন এতো খুশি? এই ছেলে কতো দূর পর্যন্ত ভেবে ফেলেছে। আর সেই খুশিতেই এই ভাবে নাচ করছে। সবাই একসাথে বলে উঠে
_“ তার মানে তুমি ফিহাকে বিয়ে করতে
যাচ্ছো? ”
__“ গার্লফ্রেন্ড আমার তাহলে বিয়েও তো আমিই করব তাই না! ”
জাহেদের কথা শুনে সবাই খুশিতে আত্মহারা। এখন সবার জানে পানি এসেছে।এখন শুধু তাড়াতাড়ি ফিহাদের বাড়ি পৌঁছাতে হবে।
ফিহাদের বাড়ির সামনে তখন হাঁসফাঁস অবস্থা। প্রতিবেশী , চেয়ারম্যানের লোকজন—সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে। ভেতরে বিয়ের সাজ–সাজ ভাব, কিন্তু কারো মুখেই সেই সুখ নেই। ফিহা বসে আছে তার মায়ের পাশে—সাদা মুখ, চোখে লালচে রং, ঠোঁট শুকিয়ে আছে।
চেয়ারম্যানের মানুষজন বারবার এসে বলছে
—“খালা, মেয়ে রেডি করেন। চেয়ারম্যান সাহেব আইতাছে।”
কিন্তু ফিহার মা ও এখন নীরউপায়। তিনি কান্নাভেজা গলায় বলেন,
__“তুমি যাও আমি মাইয়ারে তৈরি…” কথা শেষ করতে পারেন না।
নীলা পাশে দাঁড়িয়ে বোনের হাত ধরে আছে। ওর ছোট্ট মুখটাও কেমন অস্থির—কিছু একটা ভুল হচ্ছে, সে বোঝেও।
এদিকে বাইরে—“আরমান খান এসেছে !”
রহিমের গুন্ডা–চেলারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ দূর থেকে একটা গাড়ি দেখা যেতেই তারা বলে ওঠে—
—“ভাই! আরমান খান আসছে !”
এক মুহূর্তে সব বদলে যায়। চেলারা কেউ টাল খেয়ে পড়ে, কেউ দৌড়ে ভেতরে যায়। সবাই হুমড়ি খেয়ে দৌড়ে গিয়ে রহিমকে খবর দেয়।
রহিম তখন চেয়ার থেকে উঠেই যায়। মুখ শুকিয়ে গেছে—তার শরীর থরথর করছে।
—“আরমান খান? খবর পেলো কীভাবে ?”
চেয়ারম্যান হতভম্ব। তারা জানতো ফিহাকে আরমান চিনে।এবং রহিমও জানে ফিহা জারা’র বান্ধবী। ওকে বাচাতে নিশ্চয় আসবে।কিন্তু তারা তো এসব খবর রটায়নি। সে তো ভেবেছিল বিয়ে চুপচাপ হয়ে যাবে। কিন্তু আরমান খান এর মতো ক্ষমতাধর লোক হঠাৎ এলে বড় বিপদ।তাকে যে অবস্থা করে ছেড়ে ছিলো এই আরমান খান আর তার ভাই’রা।
চেয়ারম্যান দাঁত চেপে বলে,
—“শান্ত হও। আমি আছি।”
রহিম মাথা নাড়ে—কিন্তু ভয় লুকাতে পারে না।
আরমানদের গাড়ি থামে। তার পাশে জারা। আরমান জারার হাত ধরে রাখে। ছায়মা আর জাহির ও নেমে পরে।
তারপর অন্য গাড়ির দরজা খোলার সাথে সাথে প্রথম বের হয় জাহেদ। গায়ে সাদা টি–শার্ট, কাঁধে সাউন্ডবক্স।
তারপর আরমান এগিয়ে যায় বাড়ির ভিতরে। ঠান্ডা মুখ, চোখে মৃদু হাসি—কিন্তু সেই হাসির নিচে লুকানো আছে ভয়ংকর এক দৃঢ়তা। রোহান রাশেদ,একে একে সবাই নেমে দাঁড়ায়।
রহিম দরজার আড়াল থেকে ওদের দেখে মনে মনে বলে
—“মরলাম! আজকে তো মাইর খাইব!”
আরমান চোখ তুলে রহিমের দিকে তাকায়।
কথা বলেনি—শুধু একটা ঠান্ডা হাসি দিল।
সেই হাসিতেই রহিমের ভয় আরও বাড়ে।
ফিহাদের বাড়িতে পৌঁছানো মাত্রই জাহেদ সাউন্ড বক্স পুরো ভলিউমে বাড়িয়ে দেয়—তারপর গান বাজাতে বাজাতেই ভিতরে ঢুকে পড়ে।পেছনে রোহান, রাশেদ, জিনিয়া—সবাই। জাহেদ কে সাউন্ড বক্স বন্ধ করতে রোহান বলে,
—“সাউন্ড বক্স বন্ধ কর, আমাদের ব্যান্ডপার্টি ভাববে !”
জাহেদ রোহানের কথায় তাড়াতাড়ি সাউন্ড বক্স বন্ধ করে বলে
__“ ওও সরি! এক্ষুণি বন্ধ করছি!”
আরমান হাতে হালকা ইশারা করলেই রহিমের চেলারা পিছন ফিরে দৌড় দেয়।এরা বুঝে গেছে—আজকে তাদের ভাইয়ের বিয়ে নয়… বিচার হবে।সেবার তো নেংটা করে নাচিয়ে ছিল এবার না যানি কী করে?
চেয়ারম্যানের সাথে আরমানের আজ প্রথম মুখোমুখি। এই গ্রামে এতো অনেক দিন ছিলো কিন্তু চেয়ারম্যান এর সাথে আরমানের দেখা হয় নি। এমনকি তার ছেলে নেংটা অবস্থায় ছাড়ার পরও কোনো প্রতি উওর আসেনি। চুপ ছিলো চেয়ারম্যান তখন। আরমান বোঝে গেছে চেয়ারম্যান সময়ের অপেক্ষায় ছিলো। কিন্তু সেই সময় আর আরমান দিবে না।আরমান শান্ত গলায় বলে,
—“চেয়ারম্যান সাহেব, আপনার ইজ্জত হারা ছেলেকে বিয়ে করাচ্ছেন? কই আমি তো দাওয়াত পাইনি।”
চেয়ারম্যান গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
—“এটা আমাদের পারিবারিক ব্যাপার। আপনাদের নাক গলানোর দরকার ছিল না খান সাহেব।”
আরমানের ঠোঁট বাঁকা হয়ে ওঠে।
—“ওই মেয়েটার জীবনে আপনি যা করছেন… সেটা আর ‘পারিবারিক’ না। অপরাধ।”
চেয়ারম্যান একটু রাগ দেখাতে চাইল,
—“দেখেন খান সাহেব, এটা আমার আর ওর ব্যপার, এখানে আপনি শুধু শুধু আসবেন না।” কথাটা চেয়ারম্যান ফিহার বাবার দিকে আঙুল দিয়ে বলে।
আরমান কড়া চোখে তাকায়।
—“আপনাদের ব্যপার? মানুষ বিক্রির রেট ঠিক করেন আর টাকা বলেন? মেয়ের বাবা কই?”
চেয়ারম্যান কথা হারিয়ে ফেলে।এদিকে রোহান সামনে এসে দাঁড়ায়। হাসতে হাসতে বলে,
—“চেয়ারম্যান সাহেব,আপনার ছেলের টুন*টুনি ছোট তা কি আপনি যানেন?”
জাহির দাড়িয়ে দাড়িয়ে হাসছে। এরা পারেও বটে। জাহির হাসতে হাসতে বলে
__“ আপনি জানেন কীভাবে? ”
__“ আরে তোমার বোনকে বিয়ে করতে গিয়েছিলো সে, তখন আরমান রহিম কে পনেরো টা ক্যামেরার সামনে নেংটা করে নাচিয়েছে। তখন দেখেছি! ”
জাহির তাকিয়ে থাকে রহিমের দিকে। তার বোনকে বিয়ে করতে গিয়েছিলো। কই সে তো কিছু যানে না এসবের আর মা বাবাও তাকে কিছু বলেছি।
__“ এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই! আমার বন্ধু তোমার বোনকে অনেক আগেই পটিছে হাফ ইঞ্চি মেয়ে বলে। আর মার খেয়েছে অনেক।” বললো রোহান। রোহানের এতো বাজে কথা বিরক্ত লাগছে আরমানের কাছে। কাজের কাজ না করে বকবক করছে।
__“ চুপ কর রোহান! ”
রোহান থামে না বরং বলে
__“ আগে ছেলের টুন*টুনি বড় করার ঔষধ খাওয়ান চেয়ারম্যান সাহেব। তারপর ছেলেকে বিয়ে করিয়েন। ” বলেই হেসে কুকিকুকি সে। সাথে রাশেদ, জাহির আর জাহেদ।চেয়ারম্যান থতমত খায়।কেউ তাকে এভাবে কথা বলে না—কখনোই না। রহিম মাথা নিচু করে ফেলে।
জারা, মিম, জিনিয়া, ছায়মা—ফিহার কাছে ছুটে যায়।বাইরে উত্তেজনা বাড়তেই মেয়েদের দল ঘরের ভেতরে ছুটে যায় আরমানের ইশারায়।জারা ফিহাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে বলে—
—“ফিহা জানু! তুই এসব কিছু সহ্য করছিস কেন?”
মিমও কেঁদে কেদে বলে,
—“এতদিন কেন কিছু বললি না আমাদের? আমাদের তো ডাকলি না?”
ফিহা কাঁদতে পারছে না—গলা আটকে আছে।
মেয়েটা কত কষ্টে আছে—সবাই দেখতে পাচ্ছে।
জিনিয়া চুপচাপ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
ছায়মা বলে—
—“তোমাকে আমরা বাঁচাতে আসছি ফিহা। ভয় পেয়েও না।”
ফিহার মা চোখ মুছে বলেন,
—“আমি কিছুই করতে পারি নাই । আমার মেয়ের সুখ দিতে পারলাম না…”
জারা তাঁর হাত ধরে শান্ত করে।
—“আন্টি, আমরা আছি। কিছু হবে না।”
আরমানের সামনে দাঁড়াতে ফিহার বাবা ভয় পাচ্ছে।তিনি ভাবতেই পারেন নি তার মেয়ের জন্য এতো বড় ঘরের মানুষ আসবো বাঁচাইতে । তিনি আগেই চেয়ারম্যানের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছিলেন। আরমান নিচু গলায় বলেন—
—“একটা কথা জিজ্ঞেস করি। টাকার জন্য মেয়েরে বিক্রি করছেন? যে ছেলের চরিত্র গ্রামের সবাই জানে?”
ফিহার বাবা মাথা নিচু করে।
—“আমি… ভুল করছি… কিন্তু…”
আরমান বাধা দিয়ে বলে,
—“কিন্তু–টা বাদ দেন। বাপ হয়ে মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা আপনাদের ঠিক না।”
রোহান যোগ করে—
—“এই রহিমের ভন্ড বাপ–বেটারা মেয়ে রাখার মতো মানুষ না দেখেই বোঝা যায় ?”
চেয়ারম্যান দাঁত খিচিয়ে বলে—
—“ঠিক আছে, আমাদের মেয়ের দরকার নেই।আমার টাকা দিয়ে দিলে আমরা চলে যাব।”
আরমান হাসে।
—“টাকা? ওইটা সমস্যা না।”
তার ওয়ালেট থেকে কার্ড বের করে রোহানকে দেয়।
—“দিয়ে দে গরিব মানুষ, এখানে ডাবল আছে । এদের বিদায় হতে বল।”
রোহান আনন্দে বলে—
—“সর! ডাবল না, চাইলে ট্রিপল দিমু!”
চেয়ারম্যান এবং রহিম টাকা পেয়ে বিদায় নিল।আরমান তাকায় রহিমের দিকে। রহিম চোখ সরিয়ে নেয় ভয়ে। সে যানে আরমানের সাথে পেরে উঠবে না।রহিম শেষ মুহূর্তে আরমানের দিকে তাকায়—দৃষ্টি নিচু। মনে হচ্ছে বলতে চাইছে,
__“আমি ভুল করেছি… ক্ষমা করেন।”
__“ তোর ভুলের জন্য কিডনি হারিয়ে ফেলে ছিলাম শ্লা!” বললো রাশেদ
রোহান চিৎকার করে বলে
__“ মেশিন বড় করে বিয়ে করতে যাবি না হলে বিয়ের বউ তোর কপালে উষ্ঠা দিয়ে চলে যাবে। ”
আরমান রোহানের কাঁধে থাপ্পড় মেরে হাসে। জাহির তো পেটে হাত দিয়ে হাসছে। সব টেনশন কমে গেলে সবাই ভেতরে আসতে থাকে। ফিহা, ফিহার মা, নীলা—সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
ঠিক তখনই জাহেদ চেয়ারে বসে পা দোলায়।
কাঁধে সাউন্ডবক্স টা নিচে রেখে বলে—
—“আন্টি! আমরা তো বিয়ে খেতে আসছি। গার্লফ্রেন্ডের বিয়ায় কি রান্না করছেন?”
ফিহার মা তো হকচকিয়ে গেলেন। মুখ শুকিয়ে যায়।
—“আমি… মানে… রান্না করতে করি নাই বাবা…”
তার উচ্চারণও ঠিক মতো হয় না—নার্ভাস, ভয়, অসহায়তা। নীলা পাশ থেকে বলে,
—“মা রাইন্না করে নাই।ঘরে কিছু নাই।”
এটা শুনে জাহেদ থমকে যায়।তার মুখে এমন এক এক্সপ্রেশন—হাসি–কান্না–রাগ–অভিমান সব মেশানো। জাহেদ ফিহার দিকে তাকিয়ে বলে
__“ বা*লের কপাল আমার!”
রোহান হেসে বলে—
—“আসলেই তোর বা*লের কপাল। গার্লফ্রেন্ডের বিয়া খাইতে আইছিস, রান্না হয় নাই!”
__“ থাক দুঃখু পাবেন না! ” বললো রাশেদ
সবাই হাসাহাসি করে। কিন্তু ফিহা হাসতে পারে না। তার চোখ লাল—কিন্তু সে কান্না লুকিয়ে রেখেছে। জাহেদ ফিহার দিকে তাকায়। ফিহাও তাকায়—তারপর দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নেয়।
তার বুকটা ধক করে ওঠে। কতোদিন পর… এই মানুষটাকে দেখছে।
জাহেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—
—“কতো আশা করে আসছিলাম রে! বিয়া খাব। এসে–বসেই শুনি—রান্না হয় নাই! থাক ব্যপার না, আমিও কাচের পিরিচ নিয়া আসি নাই।”তারপর নিজেকে ইঙ্গিত করে বলে—
—“বা*লের কপাল আমার,সহজে কিছুই পাই না!”
সবাই আবার হাসে।কিন্তু সেই হাসির শব্দ ফিহার কানে কষ্টের মতো বাজে।তার মনে হয়— “জাহেদ এসেছে তাকে বাঁচাতে না…মজা দেখতে?তাহলে এত কষ্টে… এত অপেক্ষায়… কেন থাকলাম?”
তার চোখে জল জমে ওঠে—চুপচাপ ঘরের দিকে হাঁটতে থাকে। আরমান দূর থেকে সব দেখে।
সে হাসে না—চুপচাপ মাথা নেড়ে রোহানকে বলে
—“দেখলি? পাগলটার অভিনয় চালু আছে…মুখ বন্ধ করতে বল নাহলে কথা বলার জন্য মুখ থাকবে না। ”
রোহানও বলে—
—“জাহেদ চুপ কর এবার একটু বেশি করছিস তুই? ”
__“ আপনার এমন খামখেয়ালির কারণে মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে! ” বললো রাশেদ
জিনিয়া ওর ভাই কে বলে
__“ ভাইয়া যে কাজে এসেছো সে টা করো, এখন নাটক বাদ দাও!”
জাহেদ ফিহার দিকে তাকিয়ে বলে
__“ ওর মতো কটকটিকে আমি বিয়ে করব? এতো টাও পাগল আমি না। ”
শব্দগুলো যেন ঘরের ভিতর বিস্ফোরণ হলো।
ফিহা মুহূর্তেই থমকে গেল। তার মুখ শুকিয়ে গেল, চোখ দুটো বড় হয়ে উঠলো… তারপর ধীরে ধীরে চোখের কোণা ভিজে উঠলো।
সে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, কারও দিকে তাকানোর সাহস নেই।মনে মনে বলছে—“আমি কি কোনোদিন একটু সুখ পাবো না? পরিবার থেকেও না… আর যাকে ভালোবাসি, তার কাছ থেকেও না?”
জাহেদ ফিহাকে ভালোবাসে, সবাই জানে। কিন্তু আজ রাগে, অভিমানে, নিজের যন্ত্রণা ঢাকতে সে এতো কঠিন কথা বলে ফেললো। আর সেই কথায় ফিহার বুকটা যেন গুঁড়ো হয়ে গেল।
ফিহা তাকিয়ে থাকতে পারল না। মাথা নিচু করে দ্রুত চোখ মুছলো। ওর মা হতবাক। জারা, মিম, জিনিয়া, ছায়মা—সবাই নিস্তব্ধ।
— “আমি তো বলেনি আপনি আমাকে বিয়ে করুন? তাহলে কেন এই ভাবে বলছেন?” ফিহা ভাঙা গলায় বলল।
জাহেদ মনে মনে থেমে গেল। সে জানে সে ভুল বলেছে। কিন্তু রাগে নিজেকে সামলাতে পারছে না।
___“হ, বলছি! কারণ তুমি জানো না! আমি সারা জীবনের জন্য বউ করবো তোমাকে—এই কথা বলেছিলাম তো আমি , আর তুমি অন্য কারো সাথে ঢেং ঢেং করে বিয়া করে নিচ্ছিলে !”জাহেদ গর্জে উঠলো।
ফিহা কেঁপে উঠলো।
— “আমার যাকে ইচ্ছে তাকে বিয়ে করব, আপনার কী? আপনি তো আর আমাকে মনে রাখেন নি?”
জাহেদের গলা ভেঙে গেল।
— “তুমি যত সহজে আমাকে দোষ দাও, আমার জায়গাটা যদি একবার বুঝতে?”
ফিহা তেজী কন্ঠে বলে
__“ কি বোঝবো হ্যাঁ?”
এবার জাহেদ হাঁটা বন্ধ করল।সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। রাগের ভিতর তার ভালোবাসা, অভিমান, ভয়—সব কিছুর মিশ্রণ।
__“তুমি আমার সাথে হঠাৎ করে কথা বলা বন্ধ করে দিলে। কি অপরাধ ছিলো আমার? আমি নাকি দূরে গেলে তোমায় ভুলে যাই, এই কথা টা যদি আমি বলি?মোবাইল চুরি হয়ে গিয়ে ছিলো। মিমের ফোন থেকে কল করলাম তখন শেষ করে দিলে সব। সিরিয়াসলি নেই নি বিষয় টা। নতুন ফোন কিনে হাজার বার কল করেছি। মেসেজ দিয়েছি। কই উওর তো আসে নি। আর যখন খবর পেলাম তখন শুনি তোমার বিয়ে!”জাহেদ জোরে বলল।
— “আমি কি তোমার কিছু না?ভালোবেসে ছিলে নাকি সব নাটক ছিলো তোমার?”
ফিহা চোখ মুছল।কোনো কথার উত্তর দেয় না। জিনিয়া, ছায়মা, মিম আর জারা ফিহাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা বার বার চোখ মুছে।
__“ আমি নাটক করি না, নতুন কাউকে পেলে ছেলেরা এমনিতেই ভুলে যায় আমাদের মতো গরীব ঘরের মেয়েদের । ”
ফিহার মা আর বোন কি বলবে, কী করবে বোঝতে পারছে না। শুধু তাদের কথা শুনে যাচ্ছে।
জাহেদ বুঝতে পারছে সে ওকে আঘাত দিয়েছে।
তবুও পুরুষ অহংকার তাকে থামতে দিচ্ছে না।
ফিহার চোখ মুছে শক্ত কন্ঠে বলে
__“ কাউকে লাগবে না আমার জীবনে। যে মানুষ আমাকে বোঝে না তাকে প্রয়োজন নেই। ”
ফিহার কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে জাহেদ।এই মেয়ে তাকে রিজেক্ট করছে।
__“ কেন প্রয়োজন নেই? নতুন কাউকে পেয়ে গেছো? ”
__“হ্যাঁ! পেয়ে গেছি!”
__“ আমাকে ছেড়ে তুমি অন্য কারোর সাথে প্রেম করছিলে? ”
__“ হ্যাঁ করছি, আরও করবো, একশবার করবো,আপনার কী?”
__“ কেন করবি কটকটির বাচ্চা?প্রতারনা করতে চেয়েছিলি আমার সাথে? ওই চরিএহীন রহিম কে ভালো লাগে? বিয়ে করবি? ” জাহেদ কথাটা চিৎকার করে বলে। ফিহা কেঁপে ওঠে কিন্তু দমে যায় না।
__“ আমি প্রেম করলে প্রতারক আর নিজে করলে সুপ্রিম কোর্টের বিচার! ”
এবার ঝগড়া শুরু হয়ে গেল—দু’জনেরই কথা একটার পর একটা তীরের মতো বেরোচ্ছে। অভিমান, অভিযোগ, রাগ—সব মিলিয়ে বাতাস ভারী। রোহান জাহির জাহেদকে শান্ত করার চেষ্টা করে। ছেলেটা অনেক রেগে গেছে।
হঠাৎ জাহেদ ঘুরে ফিহার পরিবারের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো
—“শুনোন সবাই! আমি ফিহাকে বউ করতে চাই। আমার বউ! আমার ঘরের মানুষ!আমার আম্মুর পুএবধূ !”
সবার মুখে দম আটকানো নীরবতা। ফিহা শুকনো গলায় বলল,
__“আমি বিয়ে করব না। আপনার সাথে তো নয়ই..অন্য কাউকে না।”
সবাই চমকে উঠলো।জাহেদ থতমে হয়ে বলে
—“কী?! তুমি বিয়া করবে না? মানে?”
ফিহা বলল,
_“আমি আর পারছি না। আপনি এক মুহূর্তে ভালোবাসেন, পরের মুহূর্তে অপমান করেন। আপনি আমার অনুভূতি বোঝো না।”
এবার ঘরের বাতাস যেন জমে গেল। জারাও হাঁপিয়ে উঠলো—ওদের এভাবে ঝগড়া দেখে দম আটকে আসছে। এদিকে আরমান পিছন থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। জাহেদের আচরণ, ফিহার কান্না—সব দেখে সে বিরক্ত হয়ে গেল।
আরমান গম্ভীর স্বরে বলল,
__“জাহেদ, তোকে আমি বিশ মিনিট সময় দিলাম। এই সময়ের মধ্যে ফিহাকে শান্ত করে, মানিয়ে, সুন্দরভাবে নিয়ে আয়। না হলে তোর খবর আছে।”
সবাই থমকে গেল। এই কথা শোনার পর জাহেদের মুখের ভাব পাল্টে গেল। সে ধীরে ধীরে ফিহার দিকে এগিয়ে গেল। চোখে অদ্ভুত এক জেদ, এক ভালোবাসা।হঠাৎ সে যেন ভিলেনের মতো হাসলো,ফিহাকে কাঁধে তুলে বলল
—“সময় লাগবে না। তুমি চলো।”
ফিহা চমকে উঠলো। জিনিয়া, মিম, ছায়মা, জারা, রোহান,রাশেদ আর জাহির—সবাই তাকিয়ে রইলো অবিশ্বাসে।রোহান ফিসফিস করে বলল,
__“এটা কি হলো ভাই? এই ছেলে তো…”
জাহির বলল,
__“আমি ভাবতেও পারি নাই…!”
__“ দেখতে হবে না কার ভাই!” বললো রাশেদ
আরমান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাঁকা হাসলো। তারপর আরমান জারার হাত ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে কোলে তুলে নেয়। এদের জন্য আজ বউটাকে সময় দিতে পারেনি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল বেচারী। জারা একটু লজ্জা পেলেও আরমানের বুকে মাথা রাখল।
জিনিয়া, ছায়মা, মিম—ফিহাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো ফিহাকে। কিন্তু ফিহা তবুও বলল,
__“আমি কোথাও যাব না। আমি বিয়ে করব না।”
জাহেদ ফিহাকে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ি লক করে ফেল। যাতে ফিহা বের হতে না পারে। ফিহার সাথে জাহেদও গাড়িতে বসে। তার সাথে বোঝাপড়া করতে হবে। অনেক হিসাব বাকি আছে।
রাশেদ শশুর-শাশুড়ির সাথে দেখা করতে গেল।তার সাথে বাকি সবাই। শুধু ফিহা আর জাহেদ ছাড়া। আরমান জারাকে একমুহূর্তের জন্য ছাড়েনি নিজের কাছ থেকে।আরমান জারা’র দিকে তাকিয়ে ভাবে-‘ বউ টা তার একটু বেশি ছোট হয়ে গেছে! এতো মানুষের সাথে হাঁটলে দেখাই যায় না!সাধে কী আর নাম দিয়েছে হাফ ইঞ্চি মেয়ে !’
ফিহার মা-বাবা ঘরের এক কোণে বসে আছে—অপরাধীর মতো। বাবা মাথা নিচু করে, লজ্জায় কাঁপছে। ফিহা মা জাহেদ কে বাদা দেয় নি। কারণ তিনি চান তার মেয়ে একটু সুখের মুখ দেখুক। সুখ যখন নিজে থেকে দরজা এসে দাঁড়ায় তখন কীভাবে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। ফিহার বাবাও কিছু বলার মতো মুখ নেই। তার সব ঋণ পরিসুদ করে দিয়েছে তারা। আর মেয়ের সাথে অনেক অবিচার করে তিনি। নীলা এখন ওর মায়ের শেষ ভরসা এখন। কতোই বয়স তার, বাবার জন্য কতো অভাব সহ্য করতে হয়েছে তাকে। ভালো মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।
এদিকে গাড়িতে ওঠার সময় আবার শুরু ঝামেলা ফিহা কিছুতেই জাহেদের সাথে যাবে না।মেয়েটার ভিতর ভয়, লজ্জা, অভিমান—সব ঘুরপাক খায়। জাহেদ বলে
—“তোমাকে বিয়ে করতে হবে না, আমি নিজেই করে নিবো।”
গাড়ির ভিতরে হুলুস্থুল অবস্থা—ফিহা চিৎকার করে বলছে,
__“ আমাকে নামিয়ে দিন!”
জাহেদ বলছে—
__“বসো, চুপচাপ বসো! আমার বউ হয়ে তারপর এমন ঝামেলা করো!”
জাহেদ ফিহার হাত চেপে ধরে। ফিহা মোচড়া মুচড়ি করে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য। খুব অভিমান জমেছে এই মানুষ টার উপর তার।
আরমানরা যখন মিমের বাড়ির সামনে থামাল, মিমের মা–বাবা দৌড়ে বের হয়ে এলেন। মেয়েকে এতদিন পর দেখে প্রথমে নিঃশ্বাস আটকে গেল, তারপর কাঁদতে কাঁদতে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
— “মা… আমার মেয়ে… কেমন আছিস তুই ?”
মিমের চোখ ভিজে গেল। রাশেদ এগিয়ে এসে চুপচাপ মিমের বাবা–মায়ের সাথে সালাম করল।
আরমানও এগিয়ে এসে সম্মান নিয়ে কথা বলল,
___“আন্টি, মিম এখন আমাদেরই ঘরের বউ, বোন হয় । আর কখনো কষ্ট পেতে দেব না,চিন্তা করবেন না ।”
মিমের বাবা–মা আনন্দে আবার চোখ মুছতে লাগলেন। আরমান কথার ফাঁকে প্রস্তাব দিলেন
—“আপনাদের সবাইকে আমাদের সাথে ময়মনসিংহে নিয়ে গেলে ভালো হয়। রাশেদ নিশ্চয় বলেছে কিছু? মিমের সাথেও কিছুদিন থাকবেন, আপনাদেরও স্বস্তি হবে।”
কিন্তু মিমের মা মাথা নিচু করে বললেন,
— “বাবা, আমাদের এ ঘর–বাড়ি, জমিজমা… আমরা খুব চাই, কিন্তু যেতে পারব না। বোঝই তো একা বাড়ি।গ্রামের মানুষ আর চেয়ারম্যান ওতপেতে থাকে সবসময়। ”
আরমান বুঝে মাথা নেড়ে বলল,
__“ঠিক আছে আন্টি, আপনারা ভালো থাকলেই হলো।”
এরই মধ্যে খবর না জানি কোথা দিয়ে ছড়াল—“আরমান খান মিমদের বাড়িতে এসেছে!”
এই খবর পেয়ে রিম রীতিমতো দৌড়ে, সাজগুজ করে, খোঁপায় গাজরা গুঁজে, ঠোঁটে উজ্জ্বল লিপস্টিক মেখে হাজির হলো মিমদের বাড়িতে।
তার হাঁটার ভঙ্গিটা পরিষ্কার—আজ সে কাউকে ইমপ্রেস করতে এসেছে।
জারারা তখন মিমের ঘরে।জিনিয়া, ছায়মা আর জারা মিলে মিমকে কাজে সাহায্য করছে।
আরমান, রোহান, রাশেদ বারান্দায় চেয়ার টেনে বসে আছে। জাহির একটু আগে নিজের বাড়িতে গেছে। অনেক দিন ধরে বাড়িটা তালা দেওয়া তাই। কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না দেখতে।
ঠিক তখন—রিম এসে হাজির। বারান্দায় appena উঠতেই আরমান চোখ তুলে তাকাল।
পরিচিত মুখ।চোখ মুহূর্তেই কড়া হয়ে গেল।
এই মেয়ের জন্যই সে সেদিন জারাকে ভুল বুঝেছিল।ওর লক্ষী বউ কে মেরেছিলো। সেই দিনের রাগ, বিরক্তি মুহূর্তে ফিরে আসল তার চোখে।
রিম মিষ্টি হেসে রাশেদ কে বলল,
— “কেমন আছেন দুলাভাই? ”
রাশেদ সৌজন্যেতার সাথে জবাব দেয়। রিম তারপর আরমানের দিকে তাকিয়ে লাজুক মুখে বলে
__“আপনার সাথে একটু কথা ছিল।”
রোহান সামনে থেকে বলল,
__“যা বলার এখানেই বলেন।”
রিম ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— “না… মানে… আমি শুধু উনাকে বলতে চাই।”
রাশেদ হেসে বলল,
__“তাহলে বলার দরকার নাই। যা বলার এখানেই বলুন।”
রিম একটু ভেঙে গেল কিন্তু হাল ছাড়ল না।
সে আরমানের সামনে এসে দাঁড়াল।আরমান স্টোন ফেস।
— “আসলে… জারা আছে না… শুনেছি সে নাকি ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে।”
বাড়ির বারান্দার বাতাস যেন হঠাৎ জমে গেল।
রোহান আর রাশেদের চোখ বড় বড়—“এই মেয়েটা কি পাগল! কার সামনে কার নামে বাজে কথা বলছে?”
আরমানের চোখ এতটাই লাল হলো যেন যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হবে।রিম চালিয়ে গেলো
— “মেয়েটা খুব খারাপ ছিলো। আপনার জানা উচিত এসব। মানুষ বলাবলি করছে।”
আরমান দাঁত ভেঙে ফেলবে এমনভাবে চেপে ধরে বলল
—“তাই নাকি? তো আমি কী করব?”
রিম ছোট্ট একটা হাসি দিল।
— “মানে… আপনি তো ওকে লাইক করতেন। এখন তো আর ও নেই… যদি আমাকে একটু…”
হঠাৎ চুপ—কারণ রোহান আর রাশেদ দুজনই হা করে তাকিয়ে আছে।এই মেয়েটা কি মনে করে?
এটা কি নাটকের শুটিং?আরমান ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ হাসি এঁকে রোহান–রাশেদের দিকে তাকিয়ে বলল
—“একটা সুযোগ দিলে কেমন হয়?”
রোহান
—“হ্যাঁ হ্যাঁ! অবশ্যই! অবশ্যই!” (অভিনয়ের ওভারডোজ)
রাশেদ—
__“দিয়ে দেন স্যার ! দেন..দেন!” (হাসি চাপতে যাচ্ছিল)
রিম খুশিতে লাল হয়ে যাচ্ছে। অথচ সে জানে না
অতিমাত্রায় খুশি হওয়া মানুষ সাধারণত পরের মিনিটেই পেটায় পড়ে। আরমান জারাকে নরম সুরে ডাক দেয়।
ঠিক সেই সময়—একজন কালো বোরকাপরা মেয়ে ভেতর থেকে বের হলো।বোরকা পুরো মুখ ঢেকে রেখেছে। রিম চিনতেই পারল না।
মেয়েটা সোজা আরমানের পাশে দাঁড়িয়ে গেল।
আরমান নরম গলায় বলল,
__“লক্ষী বউ…”
বোরকাপরা মেয়েটা আরমানের কাছে এসে বলল,
__“জ্বি স্বামীজান?”
রিমের মুখের রং মুহূর্তে বদলে গেল।মেয়ে? বোরকা? “স্বামীজান”?মানে… আরমান কি বিয়ে করে ফেলেছে?রিমের পা দুর্বল হয়ে গেল।মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে।আরমান এবার রিমের দিকে তাকিয়ে বলল
—“জানো, আমাদের মাঝে কে দূরত্ব তৈরি করেছিলো লক্ষী বউ?”
জারা (বোরকার নিচে) অবাক স্বরে বলল,
__“কে?”
আরমান আঙুল তুলে দেখাল—
__“এই আবাল মহিলা।”
জারা চোখ কুঁচকে রিমকে দেখে বলল,
__“এই মেয়ে তো প্রথম দিন থেকেই স্বামীজানের আশেপাশে ঘুরছিলো! একদম সহ্য হয় না আমার একে। অন্যের স্বামীর উপর নজর দিতে লজ্জা করে না?”
রিম পেছনে সরতে চাইল আরমানের কাছ থেকে।এতোক্ষণ আরমানের কোলে এসে পরবে এমন ভাবে দাড়িয়ে ছিলো।সে বোঝে যায় আরমান জারাকেই বিয়ে করেছে।কিন্তু জারা এগিয়ে এসে দাঁতের ফাঁকে বলল
—“দূরে সরো। খুব বেশি কাছাকাছি আসলে মাটির নিচে পুতে রাখব। ওনি আমার ব্যক্তিগত পুরুষ। আমার স্বামীজান! বোঝেছো…নাকি আরও বলতে হবে? ”
রোহান মুখ ঢেকে হাসছে।রাশেদ চেয়ারে মাথা ঠেকিয়ে হাসি থামাচ্ছে।আরমান এবার মজা নিতে নিতে বলল
—“বউ, তোমার জন্য অফার আছে।”
জারা চোখ বড় করে—“কি অফার?”
—“এই আবাল মহিলাকে চড় মেরে গালে দাগ করতে পারলে আজকে আললিমিটেড ফুচকা খাওয়াবো।”
জারা সময় নষ্ট করল না।চপাস!একটা ধাঁ-ধাঁ চড়।
রিমের গালে পাঁচটা আঙুলের দাগ মুহূর্তেই ফুটে উঠল।
রোহান— “আলহামদুলিল্লাহ!”
রাশেদ— “আরো দিতে পারত!”
আরমান— চোখ বড় করে,
__“এই মেয়ে তো পুরোই এখন আমার আমার বউ লাগছে ! আরমান খানের বউ!সাব্বাস বউ সাব্বাস! ”
রিম অপমান–রাগ–কান্না নিয়ে দৌড়ে মিমদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। রিম চলে যেতেই জারা ঘুরে আরমানের দিকে তাকায়। দৃষ্টি দেখে আরমান ফিদা।জারা নরম কন্ঠে বলে
__“ স্বামীজান একটু নিচু হবেন? ”
আরমান তো মহাখুশি। তার বউ তাকে চুমু খাবে তাি নিচু হতে বলছে। আরমান রোহান আর রাশেদ কে বলে
__“ এই! তোরা দুইটায় চোখ বন্ধ কর। আমার লক্ষী বউ আমাকে চুমু খাবে। ”
রোহান আর রাশেদ তাড়াতাড়ি করে চোখে হাত দিয়ে ফেলে। কিন্তু আঙুলের ফাঁক দিয়ে সব দেখে। আরমান খুশি মনে জারা’র দিকে ঝুঁকে বলে
__“ দাও বউ! একটা চুমু দাও। এটা সারাদিন মিস করছিলাম! ”
জারা দুই হাত ঘষে ঠাস করে দিল একটা চড় আরমানের গালে । রোহান আর রাশেদ সব দেখে ফেলে। এরা দেখে তারা ফালিয়ে দুইপা পিছনে চলে যায়।
__“এই! আমাকে কেন মারলি হাফ ইঞ্চির বাচ্চা ? আমি তো কিছু করিনি!”বলল আরমান
জারা রাগে গজগজ করে
—“অন্যের কথা কানে নিয়ে আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। এটা গিফট।”চলে গেল ভেতরে জিনিয়া–ছায়মাদের কাছে।
রোহান আর রাশেদ হো হো করে হাসছে।
আরমান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাগে গজগজ করছে,
__“হাফ ইঞ্চির বাচ্চা আমাকে মারে কিভাবে!”
রোহান বলে
__“ এখন যে ভাবে মেরে গেলো, ঠিক সেই ভাবে!” বলে আবারও হাসতে থাকে।
__“ অন্যকে মার খাওয়াতে গিয়ে নিজেই বউয়ের হাতে মার খায়। ” হাসতে হাসতে বলে রাশেদ।
এই সময় জাহির মিমদের বাড়ি থেকে ফিরে এল।
সবাইকে একসাথে দেখে বলল
—“কি হইছে আমাকে ছাড়া ভাই? নাটক চলছিলো নাকি?”
__“ হ্যাঁ! ” বললো রোহান “ তোমার বোন এখন আরমান কে ভিটামিন দিয়ে গেছে ঠাসসস করে! ”
সবার হেসে অস্থির। আরমান গালে হাত দিয়ে রাগে দাঁতে দাঁত চেপে আছে। বউটার দিন দিন সাহস বেরে যাচ্ছে। তাকে বিয়ের আগে ও মারতো আর এখনো মারে।
এদিকে জাহেদ আর ফিহা এক গাড়িতে বসে আছেই, কিন্তু তাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে—এরা যেনো বিয়ে করতে যাচ্ছে না, যুদ্ধ করতে যাচ্ছে।
জাহেদ আবার শুরু করলো,
— “তুমি আজকেই বলো, যাবে আমার সাথে নাকি যাবে না? ”
ফিহা চুপ থাকতে পারলো না, চোখে পানি টলমল,
— “আমি বিয়া করব না। আপনিই ত বললেন,এই ‘কটকটি’কে বিয়া করবা না! আমিও আর চাই না!”
জাহেদ তেল ঢেলে দিলো আগুনে,
— “রাগে বলছি বলে বুঝো না! তুমি ছাড়া আমি থাকতেই পারি?আমি কিন্তু আজকে বিয়া করাই ছাড়ব!”
ফিহার মুখ লাল,
— “আমারে বিয়া করে আপনার কী লাভ?”
— “লাভ! তুমি আমার নারী! অন্য কাউরে ভাবলেও রেগে যাই!” জাহেদ গর্জে উঠলে আবার দু’জনের তর্ক চরমে ওঠে।
মিম খাবার নিয়ে ডাকলো। সবাই খেয়ে নিল।তারপর একে একে গাড়িতে উঠল সবাই।মিমদের বাড়ি থেকে তারা সন্ধ্যার আজানের আগে আগে বের হয়। পিছনে মিমের মা–বাবা দোয়া করতে করতে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আরমান রা সবাই গাড়ির কাছে চলপ আসে। এসে দেখে ওরা দুইজন এখনো কথা-কাটাকাটি করছে। জিনিয়া আরমানদের গাড়িতে চলে যায়। এই গাড়িতে জায়গায় হবে না। রোহান আর রাশেদ সামনে বসে।গাড়ি স্টার্ট দেয়। কিন্তু তাদের ঝগড়া দেখে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করছে।রোহান বিরক্ত হয়ে বলে,
— “চুপ থাকো দু’জন! তোমাদের ঝগড়া দেখে ঝগড়াও আত্মহত্যা করে ফেলবে ।”
রাশেদ ড্রইভিং সিটে বসে।সেও কম যায় না,
— “আরেকবার যদি কেউ বলো বিয়া করবো না—গাড়ি থেকে নামাই দিমু।”
তাদের মাঝে এসে বসে মিম। যেনো আর ঝগড়া করতে না পারে। কিন্তু মাঝখানে বসা মিম একদম “তেজপাতা”— বাম পাশে ফিহার কান্না, ডান পাশে জাহেদের রাগ।মিম চোখ বন্ধ করে মনে মনে ভাবলো,
— “ইশ! একটা হেডফোন থাকলে বাঁচতাম।”
গাড়ির ভেতরে তীব্র উত্তেজনা চলছে, এদিকে আরমানদের গাড়িতে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য।
জারা সামনে জানলায় মাথা হেলিয়ে আরমানের পাশে বসে আছে। সামান্য হাসি ঠোঁটে, মনে শান্তি—কারণ আজকে সে প্রমাণ করেছে, স্বামীজানকে কেউ তার থেকে দূর করতে পারে না।
পেছনের সিটে বসেছে তিনজন—জাহির, মাঝখানে ছায়মা তার বাঁ পাশে জিনিয়া।
ছায়মা খুব চেষ্টা করে নিজের জায়গায় সোজা হয়ে বসতে চায়। কিন্তু গাড়ি একটু ব্রেক করলেই ধাক্কা খেয়ে জাহিদের কাঁধে লেগে যায়।সে প্রতি বারই দ্রুত সরতে চায়—
— “সরি… উফফ… আর লাগবে না।”
জাহির মোবাইলে চোখ রাখলেও কোথায় যেন মন স্থির নেই। ছায়মার গায়ের সুবাস বারবার নাকে এসে লাগে।কিন্তু সে নিজের মুখ গম্ভীর করে রাখে—যেনো কিছুই হয়নি।
জিনিয়া ওদিকে বসে ভীষণ চালাকির হাসি হাসছে। সে ইচ্ছে করে ছায়মাকে আরো একটু ঠেলে দেয়। ছায়মা আবার হেলতে হেলতে জাহিদের উপর পরে।
জাহির এবার ফোন থেকে চোখ সরিয়ে তাকালো।
তার গলা শুকনো হয়ে গেল।
— “ওই, ঠিকমতো বসো।”গলা রুক্ষ লাগলেও চোখ বলছে অন্য কথা।
ছায়মা নিচু গলায় বলে,
— “গাড়ি দুলতেছে… আমি কি করবো?”
জাহির চুপ করে থাকে, চোখ মোবাইলে, কিন্তু মন ছায়মার মাথার ওজন টের পাচ্ছে তার বুকে।
গাড়ি একটু পরেই মসৃণ পথে উঠলো, আর ছায়মার চোখ জড়িয়ে এল।মেয়েটা ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লো…মাথা নিঃশব্দে গড়িয়ে গেল জাহিদের বুকের ওপর।জাহিদের নিশ্বাস আটকে গেল।ঘাম জমলো কপালে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো
—“এটা কী হলো!”
জিনিয়া পাশ থেকে চোখ আধখোলা রেখে দারুণ মজা পাচ্ছে। ছায়মা তখন ঘুমের ঘোরে জাহিদের শার্ট আঁকড়ে ধরলো।জাহিদ একদম স্থির।হালকা গলা শুকিয়ে গেছে।পালানোর উপায় নেই।
ওদিকে অন্য গাড়িতে আবার তর্ক শেষ হয় না।
জাহেদ ফিহার দিকে আঙুল তুলে চিৎকার—
— “তুমি আমারে ঘাড় মটকাই দিতেও পারবা! কিন্তু বিয়া করাইতে পারবা না!”
ফিহা চোখ লাল করে বললো,
__“ না পারব না! ”
— “আমি তোমারে বউ না বানাইলে বাঁচবো না। বুঝলা? তুমি আমার, শুধু আমার!”
রোহান কুঁকড়ে গেল,
— “এই হায়রে প্রেম! ড্রামা শেষ হইলে আমাকে ডাকবা।”
রাশেদ বলে,
— “এত প্রেম থাকলে একটু চুমু-টুমু দিয়া শ্যাষ করো! আমরা বাঁচি!”
মিম গলা উঁচু করে বললো,
— “তোমরা দুইজন জায়গা বদলাও! আমি জানালার বাইরে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত।”
তাদের গাড়ির ঝগড়া থামার নাম নেই।
একসময় আরমানদের গাড়ি সামনে এসে দাঁড়ায়।
রোহান গাড়ি থেকে নেমে দেখে— ছায়মা জাহিদের বুকে ঘুমাচ্ছে,জাহিদ একদম অসহায় যেমন ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ভিলেন!রোহান মুখ চেপে হাসে,
— “ওরে বাবা! রোমান্টিক ট্রেন্ডিং নাম্বার ওয়ান!”
রাশেদও এসে দেখে অবস্থা,
— “ভাই, এটা কখন হইলো?”
জাহিদের মুখে একটুও লজ্জা নেই, বরং রাগ দেখানোর চেষ্টা—
— “গাড়ি দুলছিল। জিনিয়া ঠেলছিল। দায় আমার না।”
জিনিয়া মুখ লুকিয়ে হাসে। আরমান সামনের সিট থেকে নামতেই দেখে—তার বউ জারাও বের হচ্ছে। তারপর ঘটনাটা দেখে দু’সেকেন্ড স্তব্ধ।সে তো এসব দেখার সময়ই পায়নি। তার বউকে দেখার চক্করে।
— “ছায়মা ঘুমায় আর তুমি বুকে ধইরা রাখো? মতলব কী?”
আরমানের চোখ মেকি রাগে ।
জাহিদ রেগে উঠে,
— “ভাই! আমি কি ঘুম পাড়াইছি? নিজেই ঘুমিয়ে আমার বুকে পড়ে গেছে!”
জারা মুচকি হেসে বলে,
— “ঠিক আছে ঠিক আছে, ছায়মা উঠে যাবে। এখন বাড়িতে যেতে হবে। ”
ছায়মা ঘুমের মাঝে জাহির কে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। জাহির লাফ দিয়ে সোজা হয়ে বসে—মুখ লাল হয়ে গেছে।তার দিকে সবাই কেমন করে তাকিয়ে আছে।
তারপর সবাই আলটপকা হাসতে হাসতে আবার গাড়িতে ওঠে। দুই গাড়ি পুনরায় রওনা দেয়।
জাহেদ ফিহার হাত ধরে শক্ত করে বসে আছে।
ফিহা রেগে আছে কিন্তু চোখের কোণে লুকানো ভয় আর ভালোবাসা দেখা যায়।
ছায়মা চুপচাপ জাহিরের বুকে ঘুমিয়ে আছে। জাহির চোখ চুরি করে তাকাচ্ছে বারবার ছায়মার দিকে। জিনিয়া হাসি চাপতে চাপতে সব দেখছে।
আরমান–জারা সামনে বসে, দু’জনের মাঝে হালকা অভিমান আর খুনসুটি চলছে। আরমান কে জারা চড় মারায় আরমান একটু রেগে আছে। কিন্তু জারা পাওা দিচ্ছে না। আরমান কে একটু পর পর মুখ বাঁকায়।খুঁচা মারে।
জিনিয়া আর জাহির পেছনে বসে দুই জনের রোমান্টিক–ঝগড়াটে অবস্থা দেখে মাথা ধরে হাসছে।
সারা রাস্তা আরমান জারার সাথে একটাও কথা বলেনি। মুখ শক্ত করে সামনে তাকিয়ে ড্রাইব করেছে। আর পাশে বসা জারা ঠিক তার উল্টো—বারবার কথা বলে, হাত ধরে টান দেয়, চোখের সামনে মুখ এনে হাসে, কখনো চুল ঠিক করে দেয়, কখনো ধাক্কা দিয়ে মনোযোগ টানতে চায়। গাড়ি কাঁপলে সে ইচ্ছে করে আরমানের গায়ে হেলে পড়ে, আবার সোজা হয়ে দুষ্টুমি ভরা হাসি দেয়। কিন্তু আরমান পুরো পথটাই অভিমান নিয়ে নিশ্চুপ। তার হাঁটুর ওপরে মাথা রাখার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি জারার, সে গম্ভীরভাবেই জানালার দিকে তাকিয়ে থেকেছে আর ফোকাস করে ড্রাইভ করতে।
পেছনের সিটে মিটমিট হাসাহাসি, সব মিলিয়ে গাড়ির ভেতরটা কখনো শান্ত হয়নি। ছায়মা ঘুমিয়ে জাহিদের কাঁধে পড়ে আছে, জিনিয়া চোখ বন্ধ করে ইচ্ছে মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে।
আর এদিকে মিম পাশের গাড়িতে তেজপাতা হয়ে বসে আছে ফিহা ও জাহেদের লাগাতার ঝগড়া সামলাতে সামলাতে। রোহান আর রাশেদ পারছে না।
সামনের সিটে এই নীরবতা ছিলো ভিন্ন। জারার সমস্ত চেষ্টা যেনো আরমানের চুপ করে থাকা ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে।
খান ম্যানশনে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বাজে তাদের। অন্ধকার আকাশের নিচে বাড়িটা আলোয় ঝলমল করছে, যেনো রাজকীয় কোনো প্রাসাদ। গাড়ি থামতেই বিশাল গেট খুলে যায়, ভেতরের প্রতিটি কোণ আলোয় ঝলমল করছে। সিকিউরিটি গার্ডরা সম্মান জানিয়ে মাথা নুইয়ে দেয়। পরিবেশটা এতটাই সুবিশাল আর ভয়ংকর নীরব ছিলো যে ফিহার বুক আরও কাঁপতে থাকে।
বাড়ির ভেতরে ঢোকার সময় পর্যন্ত ফিহা যেনো ঠিক বিশ্বাসই করতে পারে না, সে আসলেই এমন জায়গায় প্রবেশ করছে। চারপাশের চমকপ্রদ সাজসজ্জা তার চোখে যেনো লেগে থাকে। সাদা মার্বেল ফ্লোরে আলো প্রতিফলিত হয়ে আরও চমকাচ্ছে। করিডোরের দেয়ালে বড় বড় ছবির ফ্রেম, সোনালি কারুকাজ, বিশাল ঝাড়বাতির আলোর ঝিলিক তাকে আরও অস্থির করে তোলে। প্রতিটা কোণা এত নিখুঁত যে মনে হয় যেনো সিনেমার কোনো সেটে দাঁড়িয়ে আছে।
ড্রইং রুমে ঢুকতেই সে আরও থমকে যায়। বিশাল লিভিং রুমের মাঝখানে বড় গোল টেবিল, চারপাশে চামড়ার ভারী সোফাসেট। তার দিকে উঠোনজোড়া শক্ত দৃষ্টি—যেনো সবাই একই প্রশ্ন তাকিয়ে দিয়েছে। ফিহা থমকে দাঁড়িয়ে থাকে; তার পায়ের শব্দ পর্যন্ত শোনা যায় না।
রুমে বসে আছেন আসিফ খান, যিনি সবসময় সিংহের মতো ব্যক্তিত্ব নিয়ে চেয়ারে বসেন। তার পাশে আরিফ খান, জেসমিন বেগম—তাদের চোখে স্পষ্ট অবিশ্বাস আর কঠোরতা। ফারিয়া বেগমের ভুরু কুঁচকে আছে, মুখে অস্থিরতা। জারার বাবা-মা নীরবে চারপাশ পরখ করছেন, যেনো পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার অপেক্ষায়। পাশে জেরিন আর জোহান—তাদের চোখে মিশ্র বিস্ময় আর কৌতূহল।
ফিহা অনুভব করে প্রতিটি দৃষ্টি যেনো তাকে ভেদ করে দেখে যাচ্ছে। মনে হয় যেনো তার সমস্ত ভুল, সমস্ত অতীত, সমস্ত কষ্ট—একদম সামনে ছড়িয়ে আছে। তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে, আঙুল কেঁপে ওঠে। বুঝতে পারে না এই বাড়িতে তাকে গ্রহণ করবে কি না, নাকি আবারো অপছন্দের দৃষ্টিতে তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
জাহেদ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকলেও ফিহার ভয় কিছুতেই কমে না। এত বড় বাড়ি, এত ক্ষমতার মানুষ, এত ভারী পরিবেশ—তার ছোট শরীর যেনো আরো ছোট হয়ে আসে। মনে হয় একটা ভুল শ্বাস নিলেই যেনো সবাই তাকে দোষী বানিয়ে দেবে।
সবাই স্থির, কেউ কথা বলে না। শুধু চোখের চাপা চাপা রাগ আর প্রশ্ন যেনো ঘর ভরিয়ে রেখেছে।
ফিহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার গলা শুকিয়ে আসে। এই পরিবেশ, এই নীরবতা, এই দৃষ্টি—সব মিলিয়ে সে নিজেকে আরও অসহায় অনুভব করে।
একসময় সাহস করে মুখ তুলতেই দেখে—সবাই আগের থেকেও গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফিহা ভয় আর অস্থিরতায় শুকনো ঢোক গিলে নেয়।
আরমান তার পরিবারের মানুষের এমন রিয়েক্ট করতে দেখে বলে
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৫
__“ তোমরা সবাই ওর দিকে এই ভাবে তাকিয়ে আছো কেন?মেয়েটা ভয় পাচ্ছে তো। ”
আরিফ খান জারাকে নিজের কাছে ডাকেন। জারা শশুর আব্বুর ডাক শুনে সুর সুর করে আরমানের পাশ থেকে চলে আসে। আরিফ খান জারাকে নিজের পাশে বসান। মাথায় হাত ভুলিয়ে দেন।তার চুপচাপ জিজ্ঞেস করেন….!
