Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৯ (২)

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৯ (২)

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৯ (২)
সোহানা ইসলাম

সবাই বাড়ির ভেতর ফিরে এসেছে। খান ম্যানশনের ড্রইংরুমে যে কোলাহল ছিল, বিয়ের আনন্দ আর হাসির ভিড়ে যে জমজমাট পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, বিদায়ের পরে সেটুকুই হঠাৎ যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
জেসমিন বেগমের চোখ এখনো লাল। ফারিয়া বেগমের গলা ভারী—মেয়েদের বিয়ে মানেই তো বুকের এক টুকরো দূরে পাঠানো।
ফারিয়া বেগম মনমরা কণ্ঠে বললেন,
__“আরমান, জাহেদ… তোমরা তোমাদের বউদের নিয়ে রুমে যাও।”
জেসমিন বেগমকে সাথে নিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে চলে গেলেন তিনি।মেয়ের বিদায়ই যেন মায়েদের মন ভেঙে দিয়েছে।
মারজিয়া বেগম জেরিন আর জোহানকে সামলাচ্ছেন। জেরিনের চোখও টলটল করছে।
জেরিন কাঁদতে কাঁদতে বলছে—

__“আপু চলে গেলো… আর আমাদের সাথে ঘুমাবে না?”
জোহান তো কান্না থামাতেই পারছে না। মারজিয়া বেগম স্নেহে ভরা সেই দৃশ্য দেখে সবার মন ভারী হয়ে ওঠে।
কথাটা শেষ হতেই ফিহা ছটফট করতে লাগল। ওর চোখে পানি, মন খারাপ, শরীর ক্লান্ত—সব মিলিয়ে ওর পা যেন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
ঠিক তখন জাহেদ এগিয়ে এসে বলল
—“চলো, আমি নিয়ে যাই।”
ফিহা প্রথমে না করলো।
__“না, হাঁটতে পারবো।”
কিন্তু দুই কদম হাঁটতেই ওর পা কেঁপে গেল।জাহেদ সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিলো।
__“জিদ করো না, জান। আজ থেকে তোমার ভালো মন্দের দায়িত্ব আমার।”
ফিহা তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ—জিনিয়ার বিদায়ের কষ্টে মনটা নরম, চোখ ভেজা। আবার লজ্জা পায় কারণ এখানে ওর বড় বাসুর বসে আছে। আর লোকটা তাকে জান, জান বলছে।আরমান আর জারার দিকে তাকিয়ে দেখে ওরা নিজেদের মতো ব্যস্ত।ফিহা শেষ পর্যন্ত কিছু না বলে সে জাহেদের কাঁধে মাথা রাখলো।
জাহেদ আলতো করে তার হাত ধরলো। ধীরে, যত্ন করে।একেকটা সিঁড়ি যেন সে ফিহার ব্যথা বুঝে বুঝে পা ফেলছে।ফিহা অসহায় কণ্ঠে বলল

—“মা–বাবা নেই পাশে… একা লাগছে খুব।জিনিয়া আপুও একা হয়ে যাবে।”
জাহেদের বুক কেঁপে গেল।
__“একা বলো না, জান। আমি আছি তো। পুরো জীবন তোমার পাশে থাকবো,তোমায় আগলে রাখব ইনশাআল্লাহ ।”
ফিহা আর ধরে রাখতে পারলো না—চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো। জাহেদ তখন আর থামলো না। সে হালকা করে ফিহাকে বুকে তুলে নিলো।
__“জাহেদ খান ! বড় ভাইয়া দেখবে!”
__“দেখুক।ভাইয়া কিছু মনে করবে না।আর আজ তোমার চোখের পানি আমি সামলাবো। ওটাই আমার মান।”
ফিহা তার বুকে মুখ লুকিয়ে রাখলো।জাহেদ তাকে কোলে নিয়ে রুম পর্যন্ত চলে গেলো—ধীরে, যত্ন করে, একবারও হাত কাঁপাতেও দিলো না।
আরমান দেখল, জারা সোফায় নিশ্চুপ বসে আছে।
চোখের নিচে কাজল ছড়িয়ে কালি পড়েছে, টলটল করে পানি।জিনিয়ার বিদায় দেখে তার মনটাও খারাপ হয়ে গেছে।আরমান তার পাশে গিয়ে বসে। জারা তাকায়—চোখ ভেজা, ঠোঁট কাঁপছে।
একটুও দেরি না করে আরমান ওকে বুকে টেনে নেয়।
জারা তার বুকের উপর মুখ রেখে ফুপিয়ে ওঠে।

__“চলো, ফ্রেশ হয়ে নিবে লক্ষী বউ ।” নরম কণ্ঠে বলে আরমান।
জারা কিছু বলে না। শুধু মাথা নেড়ে সায় দেয়।
আরমান তাকে কোলে তুলে নিল—লক্ষ্মী মেয়েটাকে সে আজ একটুও হাঁটতে দিতে চায় না। ধীরে ধীরে নিয়ে এল তাদের রুমে।আর রুমে ঢুকতেই জারা স্থির হয়ে গেল।
রুমটা যেন ফুলের সমুদ্র।বেডের চারপাশ, মেঝে, টেবিল, পর্দা—সবখানে লাল গোলাপের জমকালো সাজ। মৃদু লাইট, হালকা সুগন্ধ, নরম গোলাপের পাপড়িতে পুরো ঘরটা মোড়ানো।জারা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে। আরমান ওর প্রতিক্রিয়া দেখে হেসে বলে,
__“আমার লক্ষী বউয়ের পছন্দ গোলাপ। তাই অল্প কিছু । লোক এসে বিকেলে সাজিয়ে গেছে। আমার রানী সাহেবার জন্য।”
জারার গাল লাল হয়ে যায়—লজ্জায়, ভালোবাসায়, আবেগে।আরমান তাকে বেডে বসিয়ে দেয়, কপালে আলতো চুমু খায়।জারা চোখ নামিয়ে ফেলে—হৃদপিণ্ড ধুকপুক করছে।
__“ আমি এসব বারি গহনা খুলে দেই, তুমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও সোনা। ”
বলে আরমান আলতো করে তার গলার হার খুলতে থাকে।জারা নিঃশ্বাস আটকে বসে আছে।তার হাত কাঁপছে—আজ তার জীবনের সবচেয়ে নতুন অধ্যায়।

__“এখন লেহেঙ্গা খুলে ফ্রেশ হয়ে নাও, লক্ষ্মী বউ। সুতি কাপড় পরবে, তাহলে আরাম পাবে।”
আরমান মিষ্টি গলায় বলে।
জারা সামান্য অভিমান করে বলে,
__“মন চাচ্ছে না।”
আরমান মুচকি হেসে বলে,
__“তাহলে আমি খুলে দেই?”
জারা লজ্জায় তার বুকে মৃদু কিল মারে।
__“আপনি একেবারে যা-তা..! ”
আরমান জারা’র হাত ধরে ফেলে।ওর দিকে ঝুঁকে এসে বলে
__“ লজ্জা পাচ্ছো বউ? ”
জারা আরও নুয়ে পড়ে। জারাকে ছেড়ে দিয়ে
আরমান আলমারি থেকে বড় একটা ব্যাগ বের করে ওর হাতে দিল।
__“এটা… কী?”জারা অবাক।
__“তোমার হোক ।”আরমান শান্ত স্বরে বলে।
ব্যাগটা খুব ভারী। জারা বুঝতেই পারে ভেতরে রয়েছে তার কাবিননামার নগদ বিশ লাখ টাকা। জারা ব্যাগটা আরমানের হাতেই ফিরিয়ে দিয়ে হেসে বলে,
__“এগুলো দিয়ে আমি এখন কি করব?আপনার কাছে রেখে দিন বরং।”
আরমান হাসলো

—“তোমার হোক তুমি গ্রহণ করলে আমি খুশি হবো সোনা বউ ।”
তাদের মাঝে কিছুক্ষণ নতুন স্বপ্নের কথা আলোচনা হয়—আগামী দিনের পরিকল্পনা, ভ্রমণ, একসাথে থাকা, সংসারের ছোটখাটো গল্প।জারা এবার আরমানের সাথে বারান্দায় যায়। রাতের নরম হাওয়া, আকাশে টুকটুকি তারা, আর দুইজন মানুষের নিঃশব্দ ঘনিষ্ঠতা—দৃশ্যটা নিজেই রোমান্টিক।
আরমান জারার কানে মুখ নিয়ে বলে,
__“আজ আদর দিব নাকি ঘুমাবে লক্ষী বউ ?”
জারা লজ্জায় কিছুই বলে না।শুধু চোখ নামিয়ে ফেলে। আরমান তার গলায় নাক ঘষে, কোমর জড়িয়ে ধরে—জারা নিশ্বাস আটকে ফেলে।
__“স্বামীজান…”নরম গলায় বলে জারা।
আরমান জারা’র কোমড় জরিয়ে ধরে বলে
__“ বলো লক্ষী বউ!”
__“ আমাকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাবেন?”
আরমান সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেললো।
__“না। বাইরে খুব ঠান্ডা। এখন কোনোভাবেই না।”
জারা থম মেরে থাকলো।
__“আপনি শুধু না বলেন। দূর ভালো লাগে না। ”
আরমান বুঝলো জারা অভিমান করেছে।সে এসে জারার চিবুক তুলে বললো

—“ বিয়ে করলাম, লাল টুকটুক বউ হলো, গোলাপ দিয়ে ঘর সাজালাম, বাসর করব, বউকে আদর করব, বউ তার স্বামীজানের সাথে ভালোবাসা বিনিময় করবে, একটু ইটিস পিটিস করবে, তা না করে বউ আমার বাচ্চাদের মতো জেদ ধরে বসে আছে!এই ঠান্ডার মধ্যে ঘুরতে নিয়ে যেতে? কী কপাল আমার ?”
জারা গাল ফুলিয়ে বলে
__“আপনার মাথায় সবসময় এসব ঘুরে ফাজিল লোক? ”
আরমান জারাকে নিজের দিকে আরও টেনে নেয়।আরমানের বুকের সাথে জারা’র পিঠ গেলে আছে।
__“ আমার মাথায় কী ঘুরে বউ?”
__“ এখন যা বললেন! ”
__“ কী বলেছি?”
জারা’র এবার বেজায় চটে যায়।আরমান কে নিজের কাছ থেকে ছাড়িয়ে বলে
__“ আমাকে নিয়ে যাবেন কী না সেটা বলুন? ”
আরমান জারা’র দুগাল নিজের হাতের তালুতে নিয়ে বলে
__“ রেগে যাচ্ছো কেন লক্ষী বউ? কাল নিয়ে যাব, এখন রুম চলো তোমার সাথে একটু ইটিস পিটিস করি?”
জারা এবার রাগে গজগজ করতে করতে উঁচু কন্ঠে বলে
__“ নিয়ে যাবেন না আপনি? হ্যাঁ, নিয়ে যাবেন না? থাক যাব না আমি। সরুন সামনে থেকে। ” বলেই আরমানের কাছ থেকে সরে রুমে চলে আসতে চায়।আরমান তাড়াতাড়ি করে বউকে আবার ধরে ফেলে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে

__“ লক্ষী বউ,রাগ করে না সোনা … তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে। তুমি যদি সত্যিই যেতে চাও—আমি নিয়ে যাবো তো। কিন্তু এতো রাগ দেখিও না সোনা। আমি ভয় পাই তো।”
জারা মুখ ঘুরিয়ে রাখলো।
__“তাহলে নিয়ে চলুন।”
__“ঠিক আছে। কিন্তু আগে ফ্রেশ হও।”
__“না।”
__“ বউ…” একটু জোরেই ধমক দিলো আরমান। আবার সাথে সাথে আরমান ওর পিঠে নাক ঘষলো, কোমর জড়িয়ে ধরলো।আরমান গভীর স্বরে হেসে বলে,
__“ফ্রেশ হয়ে নাও লক্ষী বউ! আর গরম কাপড় গায়ে জড়িয়ে নাও। আমি বাইক বের করছি।”
জারা তৎক্ষণাৎ বাধা দেয়,
__“না! এইভাবেই যাবো।”
আরমান জারাকে রাগ দেখিয়ে বলে
__“হাফ ইঞ্চির বাচ্চা! এবার বারাবাড়ি করছো কিন্তু? লেহেঙ্গা পরে বাইকে উঠতে পারবে? শুধু শুধু বিপদ ডেকে এনো না? ”
জারা নাক ফুলিয়ে বলে
__“ ঠিক আছে যাচ্ছি!একদম ধমক দিবেন না বলে দিলাম! ” বলে আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়। যাওয়ার আগে আরমানকে মুখ ভেংচি কাটতে ভুলে না।
আরমান হাসে তার রানী সাহেবার বাচ্চামি দেখে।
আরমান আর কিছু বলে না—বউ রেগে যাবে তো। শুধু মুচকি হাসলো। তারপর বাইকের চাবি নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। যাওয়ার আগে বলে যায় তাড়াতাড়ি আসতে।

এদিকে ফিহা আর জাহেদ এর রুমে চলছে অন্য রকম যুদ্ধ। জাহেদ গহনা খুলতে গিয়ে ফিহার চুলে এতটাই জট লাগিয়ে ফেলেছে যে মেয়েটা ব্যথায় কুঁকড়ে গেছে।
__“জাহেদ খানের বাচ্চা! আপনি কোনো কামের না! সব সময় গোলমাল করেন!”ফিহা গজগজ করছে রাগে।
জাহেদ ও ফিহার চুলের জট খুলতে খুলতে বলে
__“ মাথায় এই বা*ল কে বলেছে পরতে? তাই তো এমন জট লেগেছে?এখানে আমার কী দোষ? ”
ফিহা জাহেদের থেকে চুল ছাড়িয়ে বলে
__“ আমি কী বলেছি, আপনি এই বা*ল খুলে দিন?নাকি আপনি এসেছেন নেকামি করতে?”
জাহেদ আবার ফিহার সামনে এসে বলে
__“ স্ত্রীদের কা*প*ড় গহনা খুলে দেওয়া স্বামীদের হোক! ”
__“ তাহলে নিজের হোক ঠিক মতো পালন করছেন না কেনো? উল্টো আমাকে ব্যথা দিচ্ছেন?”
জাহেদ মাথা চুলকায়
—“আমি… আমি চেষ্টা করছিলাম জান।”
__“কী চেষ্টা? আমার মাথা ব্যথা করে ফেলেছেন!”
ফিহা কান্না ধরে রাখে।
জাহেদ এবার সত্যিই অপরাধবোধে ভেঙে যায়।সে হাঁটু গেড়ে বসে ফিহার কাছে

—“সরী জান। আমি বুঝতে পারিনি।”
ফিহা তার কথা শুনে একটু নরম হয়ে যায়। অবশেষে দু’জন মিলে সময় নিয়ে চুলের জট খুলে ফেলে।
তারপর ফ্রেশ হয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে। নামাজ পড়ার কথা জেসমিন বেগম বলে দিয়েছিলেন।
ফিহা জায়নামাজে বসে আছে। ঘরটা নিবু নিবু আলো , কিন্তু তার চোখের ভেতর যেন সবকিছু অন্ধকার অন্ধকার লাগছে। আজ তার বিয়ে— জীবনের সবচেয়ে বড় দিন। অথচ তার মা-বাবা কেউই নেই পাশে। এই একাকীত্ব তাকে ভেতর থেকে হাহাকার করিয়ে তুলছে।
জায়নামাজের ওপর রাখা হাতদুটো কাঁপছে, চোখের পানি পড়ে নুড়িগুলো ভিজে যাচ্ছে। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলে উঠল,
__”মা… বাবা… তোমরা থাকলে আজ কত সুন্দর হতো…”
এক মুহূর্ত পরেই কান্না আর ধরে রাখতে পারল না। মাথা নিচু করে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল— ঠিক যেন দীর্ঘদিন আগলে রাখা ব্যথা আজ ফেটে বেরিয়ে এলো।
কিছু দূর থেকে জাহেদ দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। সে মাএ নামাজ শেষ করে উঠে আলামরির সামনে যায়। সে জানত আজকের দিনে ফিহা সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়বে। কিন্তু এমনভাবে কাঁদতে দেখলে তার নিজের বুকটাও মোচড় দিয়ে উঠলো।
ধীরে ধীরে কাছে এসে হাঁটু গেড়ে ফিহার পাশে বসল।
নরম গলায় ডাকল—

__” ফিহা…জান ”
ফিহা মাথা তুলল না, বরং আরো জোরে কাঁদতে লাগল। জাহেদ দ্বিধা না করে আলতো করে ওর কাঁধে হাত রাখল।
__”এই… জান..আমাকে একটু দেখতে দাও।”
ফিহা হঠাৎ তার বুকে ঢলে পড়ে গেল, যেন এতদিন অব্যক্ত সব কষ্ট বের হয়ে আসছে। জাহেদ স্থির হয়ে তার কাঁধে মাথা রেখে থাকা মেয়েটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।তার বুকের সঙ্গে চেপে থাকা ফিহা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
—”আমি আজ একদম একা… কেউ নেই আমার…”
জাহেদ ওর মাথায় হাত রেখে ধীরে বলল,
__”একা কেন হবে জান ? তুমি কি আমাকে কিছুই মনে করো না? আমি তোমার স্বামী, তোমার সারাজীবনের সাথী!”
ফিহার কান্না থামার মতো নয়।
__”মা-বাবা ছাড়া নিজেকে খুব একা লাগছে জাহেদ খান …”
জাহেদ গভীর শ্বাস নিয়ে ফিহাকে আরও কাছে টেনে নিল।তার গলা ভারী হয়ে যায়,
__”আজ থেকে তুমি একা নও। যতদিন বাঁচবো, আমি আছি তোমার পাশে। আর আমার আম্মু কী তোমায় কম ভালোবাসে?”
ফিহা চোখ মুছতে মুছতে ফিসফিস করে বলল,
__”আম্মুর উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই। আম্মু অনেক ভালো? আর আপনি আমার পাশে সবসময় থাকবেন তো জাহেদ খান?”
জাহেদ তার মাথার ওপর ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

__”হ্যাঁ, ফিহা। তুমি আমার স্ত্রী । তোমাকে এক বিন্দুও কষ্ট পেতে দেব না।”
ফিহা তার বুকে মুখ লুকিয়ে কান্না করে।জাহেদ হাত বুলিয়ে শান্ত করে।ফিহার আজ অনেক কষ্ট হচ্ছে। জাহেদ ফিহার কান্না সহ্য করতে পারছে না। ফিহা কান্না করতে করতে বলে
__“ নীলা, মা, বাবা কে খুব মনে পরছে জানেন। খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার মা তার মেয়ের জীবনের সব চেয়ে
ভালো সময় পাশে থাকতে পারলো না। জাহেদ খান, আমার মা বাবার কথা খুব মনে পরছে। ”
জাহেদ সেটা দেখে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো
—“আমার পরি… কাঁদে না জান।”
ফিহা জাহেদের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে থাকলো—“আজ আমার জীবনের এত বড় দিন… বাবা-মা পাশে নেই…কতো টা কষ্ট হচ্ছে আমার বলে বুঝাতে পারব না। ”
জাহেদ ফিহাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
__“আমি আছি। আমি সবসময় আছি তোমার সাথে । তুমি শুধু আমার তাকাও জান। আর তোমাকে নিয়ে যাবো তোমার মা বাবার কাছে ।”
ফিহা জাহেদের বুক ধরেই কান্না করলো আর বললো—“আপনার ওপর রাগ করি… আবার আপনিই আমাকে শান্ত করছেন…”
__“এটা আমার কাজ, জান। তুমি রাগ করবে আর আমি তোমার রাগ সহ্য করব।”জাহেদ আলতো চুমু দিলো তার কপালে।
ফিহা আবার কাঁদলো— তবে এবার সেই কান্নায় ভরসার স্পর্শ।জাহেদের বুক আরও শক্ত হয়ে উঠল, যেন প্রতিটা যন্ত্রণাকে সে নিজের মাঝে টেনে নিতে চায়। দুজন চুপচাপ বসে রইল— একে অপরের কাছে, একে অপরের শক্ত হয়ে।এখন থেকে তাদের জীবন আর একলা নয়—দুজনের ব্যথাই দুজনের ভরসা হয়ে উঠবে।

জারা সুন্দর করে কালো বোরকা পরে আয়নার সামনে শেষবার নিজের হিজাবটা ঠিক করে। হাতে ধরে আছে আরমানের জন্য আনা ধূসর জ্যাকেটটা। বাইরে শীতের কুয়াশা, ঠান্ডা হাওয়া। কিন্তু আজকে আরমানের সাথে বের হওয়ার উত্তেজনা ঠান্ডাকেও হার মানিয়েছে তার।
বাড়ির দরজা খুলে বাইরে আসতেই দেখতে পেল— আরমান বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুয়াশার মাঝে হেডলাইটের আলোয় আরমানকে যেন আরও আকর্ষণীয় লাগছে। জারাকে দেখে ওর চোখে আলাদা এক হাসি ফুটে উঠল।
জারা এগিয়ে গিয়ে জ্যাকেটটা বাড়িয়ে বলল,
__”এটা পরে নিন। খুব ঠান্ডা।”
আরমান জ্যাকেট হাতে নিয়ে তাকায় জারার দিকে— সেই পরিচিত দুষ্টুমি ভরা চোখে।
__”বউ আমার কতো খেয়াল রাখে! কিন্তু আফসোস…”হালকা গলায় বলে,
__”যেটা আমি চাই, সেটাই করতে দেয় না।”
জারা কপাল কুঁচকে রাগী গলায় বলে,

__”আপনি বাজে কথা বন্ধ করবেন? নাকি আমি একাই চলে যাব?”
আরমান হেসে ফেলে, সেই হাসি দেখে জারার রাগ আরও বেড়ে যায়।
__”আচ্ছা, আচ্ছা… আর বলবো না। বাইকে উঠো। আর আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে— এটা বাদ দিতে পারো না বউ।”
জারার ঠোঁট নড়ে উঠল কিছু বলতে, কিন্তু মুখে না বলে নীরবে বাইকে উঠে বসলো। হাত দুটো দিয়ে আলতো করে আরমানকে জড়িয়ে ধরতে যায়, কিন্তু আরমান নিজেই তার হাত ধরে কোমরের কাছে টেনে রাখল।
__”এভাবে না। ঠিক করে ধরো। তুমি না ধরলে ঠান্ডা বেশি লাগবে লক্ষী বউ! ”
জারা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিয়ে এবার সত্যিই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আরমান বাইক স্টার্ট দিতেই হালকা ঝাঁকুনিতে জারা আরো কাছে ঘেঁষে এলো।
আরমান নিচু গলায় বলল,
__”এই… এতটা কাছে থাকলে আমার বাইক চালানোর মনই থাকবে না। অন্য কিছু করতে মন চাইবে সোনা!”
জারা হালকা শাসিয়ে বলল,

__”মন থাকুক বা না থাকুক, আজকে আমাকে নিয়ে ঘুরতেই হবে।”
গেট দিয়ে বাইক বের হয়ে গেল। রাস্তায় তীব্র ঠান্ডা বাতাস কাটতে কাটতে আরমান মাঝে মাঝে মাথা একটু ঘুরিয়ে জারার মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছিল।জারা বলে উঠল,
__”বিপদ করবেন না। সামনে তাকান!”
আরমান মিটিমিটি হেসে বলে,
__”তুমি পাশে থাকলে আমার চোখ নিজে থেকেই তোমার দিকেই যায়। কী করবো?”
জারা লজ্জায় চুপ করে গেল। তার হাত আরও শক্ত করে আরমানের কোমরে চেপে ধরল। গ্লাভসের ওপর দিয়েও সেই স্পর্শ আরমানের শরীর কেঁপে উঠল।
আরমান মৃদু গলায় বলল
—”তোমার হাতের স্পর্শটা জানো… আমার এখন কিছু মিছু করতে মন চাচ্ছে। চলো বাড়ি চলে যাই। মন বরে তোমায় আদর করি।”
জারা আরমানের কোমড়ে চিমটি কেটে বলে
__“ বাজে কথা বন্ধ করে বাইক চালান।”
বাইকের গতি বাড়তে লাগল। কুয়াশার মাঝে জারার মাথার ওড়না পিছনে নাচতে লাগলো। আরমান তার বাম হাতে জারার হাতটাকে এক মুহূর্তের জন্য চেপে ধরল

—”কেমন লাগছে? খুব ঠান্ডা লাগছে বউ?”
জারা মাথা নেড়ে বলল,
__”আপনি থাকলে ঠান্ডা লাগবে কেন?”
আরমানের বুক ভরে গেল।
__”এত সাহসী কথা আজকাল কোথাথেকে বলো?”
জারা ঠাট্টা করে বলল,
__”বউরা এভাবেই বলে।”
একটু চুপ থেকে জারা তার গালটা আরমানের পিঠের সাথে ছুঁইয়ে দিলো। সেই স্পর্শে আরমানের শরীর শিহরিত হলো।
__”জারা… তুমি যদি এভাবে করো, আমি সত্যি বাইক থামিয়ে দিব। তারপর রাস্তায়…! ”
জারা হেসে বলল,
__”থামান না-হয়। দেখি কি করেন।”
আরমান গম্ভীর গলায় বলল,
__”থামালে কিন্তু নামিয়ে চুমু খাব রাস্তার মাঝে ।”
জারা গলা আটকে বলল,
__”আপনি খুব বাজে স্বামীজান!”
আরমান হাসল—
__”তোমারই বাজে স্বামীজান।”
এই ছোট ছোট কথা, স্পর্শ, ঠান্ডা বাতাস, লজ্জা আর ভালোবাসা মিশে মুহূর্তটা আরও উষ্ণ হয়ে উঠল। বাইক এগোতেই থাকলো— আর তাদের দুজনের হৃদয়ও আরও কাছে সরে এলো।

নতুন বউকে সঙ্গে নিয়ে রোহান যখন বাড়ির প্রধান দরজায় ঢোকে, ঘরজুড়ে সবাই তখনো আনন্দে সরগরম।রোহানদের বেশি আত্নীয়সজন নেই।শুধু কয়েকজন বাড়ির মেইড। জিনিয়া মাথা নিচু করে রোহানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতদুটো কাঁপছে, বুকটা ঢিপঢিপ করছে— সবকিছুই তো নতুন, অচেনা। কিন্তু রোহানের পরিবার দেখে তার মনে একটু সাহস ফিরে আসে।
রোহানের বাবা, এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ালেন। সাদা দাড়িতে হালকা হাসি। তিনি হাত তুলে দোয়া করলেন—
__“এই মেয়েটাই এখন থেকে এই বাড়ির আলোক।তুমি তো জানো রোহানের মা নেই।এই বাড়ির সব দায়িত্ব আজ থেকে তোমার হাতে মা। সবসময় সুখে থাকো, আল্লাহ তোমাদের দু’জনকে শান্তি দিক।”
তার কথায় জিনিয়ার গলা ধরে আসে। এত বড় দায়িত্ব, এত বিশ্বাস— সে কি পারবে? কিন্তু বাবার মতো মানুষটির চোখে বিশ্বাস দেখে সে সম্মতি জানিয়ে মাথা নিচু করে। রোহান পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার বুকটা গর্বে ভরে যায়— এই মেয়েটাই তার স্ত্রী।সবাই সরে গেলে রোহান জিনিয়ার হাত ধরে বলে,

__“চলো, তোমাকে আমাদের রুমটা দেখাই।”
জিনিয়া চুপচাপ পিছনে হাঁটে। সে কখনো এ ঘরে এসেছে— তবে সেটা ছিলো ছোটবেলার স্মৃতি। আজ অন্য অনুভূতি। আজ এই ঘরই তার নতুন পৃথিবী।
রোহান দরজা খুলতেই জিনিয়া থমকে দাঁড়ায়। ঘরটা যেনো ফুলে ফুলে সাজানো এক ছোট্ট বাগান। বেডের চারদিকে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে আছে। নরম আলো, মিষ্টি গন্ধ… যেনো পুরো ঘরটা শুধু তাদের দু’জনকে স্বাগত জানাচ্ছে।জিনিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন হালকা কেঁপে ওঠে।সে কিছুটা থেমে নরম গলায় বলল
—“রোহান ভাই…”
কথাটি মুখ থেকে বের হতেই রোহান স্থির হয়ে যায়।
তার মুখের ভাব বদলে যায়।চোখে বিরক্তি— একদম অপ্রত্যাশিত।
__“কি বললা? রোহান ভাই?”
জিনিয়া বুঝে ওঠার আগেই রোহান একটু রাগী স্বরে বলে—
__“আজ আমাদের বিয়ে হয়েছে।একটু পর তোমার আমার বাসর। আর তুমি আমাকে ভাই ডাকছো? মাথা ঠিক আছে?”
জিনিয়া ভড়কে যায়।সে তো ভুলে ডাকেই ফেলেছে— ছোটবেলা থেকে অভ্যাস ছিলো। কিন্তু রোহান যে এতটা খারাপভাবে নেবে, সেটা সে ভাবতেই পারেনি।
পরক্ষণেই রোহান আরও কঠিন স্বরে বলে—

__“এসব কি তোমার ওই কুটনা বাবা শিখিয়ে দিয়েছে?”
এই কথা শোনার সাথে সাথেই জিনিয়ার চোখ ছলছল করে ওঠে।তার বাবা সবকিছু… তার সম্মান…রোহানের মুখে এমন কথা!জিনিয়া ফুঁপিয়ে বলে—
__“ভুল হয়ে গেছে… তাই বলে আপনি আমার বাবাকে নিয়ে এমন বলবেন?”
রোহান কিছুক্ষণ চুপ থাকে।তার রাগের আগুনেই বুঝি কথাটা মুখ ফসকে বের হয়ে গিয়েছে। জিনিয়া মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করছে।
রোহান বুঝে যায়—সে গণ্ডগোল করে ফেলেছে।ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করে সে জিনিয়ার দিকে এগিয়ে যায়।তার গলার স্বর নরম—
__“এইদিকে তাকাও, চাদঁ সুন্দরী…”
জিনিয়া তাকায় না।রোহান এসে তার গালের দু’পাশে হাত রেখে নিচু হয়ে বলে—
__“আমার চাঁদ সুন্দরী কি রাগ করেছে?”
জিনিয়া কিছু বলে না, শুধু মাথা নিচু করে।রোহান মৃদু হাসল।তার মুঠোয় থাকা গালদুটোটা খুব কোমল, তার চোখের কোণে জমে থাকা পানিও যেন তাকে ছুঁয়ে যায়।
__“শোনো…”
তার কণ্ঠ আরো নরম হয়,

___“ আমি তোমার ভাই নই। আমি তোমার স্বামী। আজ থেকেই তুমি আমার সবকিছু ।কিন্তু তুমি আমাকে ভাই বলেছো।আমি খুব রাগ করেছি… তাই রাগ ভেঙে দাও… চাঁদ সুন্দরী …”
জিনিয়া উঁকি দিয়ে তাকায়। সেই চোখে লজ্জা, রাগ, অভিমান— সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য।রোহান আর দেরি না করে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়।
জিনিয়ার শরীর হালকা কেঁপে ওঠে। তার বুক ধুকধুক করছে। এ অনুভূতি একদম নতুন— অথচ এত চেনা, এত আপন।রোহান তার হাত ধরে কাছে টেনে নেয়।
জিনিয়ার বুক রোহানের বুকের সঙ্গে মিশে যায়।
তাদের দু’জনের শ্বাস যেন একই ছন্দে বাজছে।
রোহান জিনিয়ার থুতনিটা আলতো করে তুলে ধরে।
জিনিয়ার চোখের পানিটা রোহানের আঙুলের গায়ে লাগে।রোহানের গলা ভারী হয়ে ওঠে।
— “আমাকে ভাই বললে আমি সহ্য করতে পারব না। আজ থেকে আমি শুধু তোমার স্বামী। আর তুমি… তুমি আমার সবকিছু।”
এই কথাটা জিনিয়ার গায়ে যেন উষ্ণ বাতাসের মতো লাগে।তার নিশ্বাস দ্রুত হয়ে যায়।রোহানের দৃষ্টি জিনিয়ার ঠোঁট থেকে তার চোখে ওঠে— এতটাই গভীর, এতটাই দাবিদার, যেন শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না।রোহান আস্তে হাত বাড়িয়ে জিনিয়ার কানের পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া চুল সরিয়ে দেয়।জিনিয়া হালকা কেঁপে ওঠে।তার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে— এমন স্পর্শ সে কখনও পায়নি, আর এ স্পর্শের তাপ যেন বুকের গভীর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
রোহান জিনিয়ার কাঁধে দু’হাত রাখে। জিনিয়া তাকাতে পারে না, মাথা নিচু করে ফেলেছে।তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে।রোহান থেমে যায়।মৃদু হেসে বলে—

__“এখনো লজ্জা পাচ্ছ?”
জিনিয়ার মুখ আরও লাল হয়ে ওঠে।সে উত্তর না দিয়ে আরও মাথা নিচু করে।শাড়ির আঁচলটা বুকে শক্ত করে চেপে ধরে।
রোহান ধীরে ধীরে জিনিয়ার হাত ধরে।জিনিয়ার পুরো শরীরের ভেতর এক শিহরণ বয়ে যায়— ঠান্ডা গায়ে উত্তাপের মতো অনুভূতি।রোহানের আঙুল শক্ত হয়, যেন সে জিনিয়ার হাত ছেড়ে দিতে ভয় পাচ্ছে।
— “জিনিয়া… আজকের রাতটা শুধু আমাকে দিবে।তার বিনিময়ে এই আমি টাকে তোমার হাতে তুলে দিব।তুমি বিনামূল্যে ব্যবহার করবে।আমার কোনো বাধা নেই ।”
জিনিয়া কাঁপা গলায় বলে
—“আমি… ভয় পাচ্ছি ।”
রোহান জিনিয়ার হাত ঠোঁটে ছুঁইয়ে খুব নরম স্বরে বলে—“ভয় পেলে হবে বেইব? আজ অনেক কিছু করার বাকি আছে।তা করতে হবে। একটা ফুটফুটে বেবি আনতে হবে। প্লিজ… আমি আছি।”
এই কথার পর জিনিয়ার গলা বাঁধা পড়ে যায়।তার মনে হয়— এতদিন যাকে সে দূর থেকে দেখেছে, যাকে ভালোবেসে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে…আজ সেই মানুষটি তাকে নিজের বলে টেনে নিচ্ছে।
রোহান জিনিয়াকে নিজের দিকে টেনে নেয়।জিনিয়া রোহানের বুকে এসে থামে—তার শরীর জুড়ে যেন বিদ্যুৎ বয়ে যায়।জিনিয়ার নরম গায়ের গন্ধ রোহানের নিঃশ্বাসে মিশে যায়।রোহানের বুকের উষ্ণতা জিনিয়ার গালে লাগে।রোহান নিচু গলায় বলে—

__“একটু আগে তুমি আমাকে ভাই বললে… এখন?”
জিনিয়া হকচকিয়ে যায়।রোহানের বুকের ওপর মাথা রেখে ফিসফিস করে বলে,
__“আপনি… আমার স্বামী।”
রোহানের চোখ গরম হয়ে ওঠে কথাটা শুনে।এক মুহূর্ত সে জিনিয়ার কানের পাশ দিয়ে মুখ নামিয়ে এনে ফিসফিস করে বলে,
__“আবার বলো…”
জিনিয়া চোখ বন্ধ করে, কাঁপতে থাকা ঠোঁটে—
__“আমার… স্বামী…”
এবার রোহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।
সে দুহাতে জিনিয়ার কোমর টেনে খুব কাছে নিয়ে আসে।জিনিয়া লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলে—তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু সে পালায় না…বরং যেন চুপচাপ সেই স্পর্শে গলে যাচ্ছে।
রোহান জিনিয়ার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু রাখে—এমন চুমু যেটা শুধু ভালোবাসা নয়, মালিকানা, উষ্ণতা আর গভীর টান প্রকাশ করে।জিনিয়ার পুরো শরীর কেঁপে ওঠে।শ্বাস দ্রুত হয়।রোহান ধীরে বলে—
__“আজ তুমি আমার, আর আমিও শুধু তোমার…বাকি সব কিছু আল্লাহ হাফেজ! ”
জিনিয়া কিছু বলে না, শুধু তার বুকের ওপর হাত রাখে।রোহানের হৃদস্পন্দন দ্রুত—জিনিয়া অনুভব করে।রোহান আরও কাছে আসে, তার ঠোঁট জিনিয়ার কানের কাছে আসে…জিনিয়ার শ্বাস আটকে যায়—
তীব্র লজ্জায় সে রোহানের শার্ট মুঠো করে ধরে।
কিন্তু রোহান থেমে যায়।সে নরম হাসি দিয়ে বলে—

__“এখনো ভয় লাগছে?”
জিনিয়া খুব আস্তে মাথা নাড়ে।রোহান জিনিয়ার চিবুকে আঙুল ছুঁইয়ে বলে—
__“ঠিক আছে… আজ যে যতটুকু পারো, তোমার মতো করে থাকবে।আমি তোমাকে কখনোই জোর করবো না।তুমি লজ্জা পেলে আমি অপেক্ষা করবো… যতদিন লাগে। ঘুমিয়ে পরো।”
জিনিয়ার চোখে পানি চলে আসে।তার নিজের মানুষ… এমন কথা বলছে।সে রোহানের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলে,
__“আপনি আছেন তো… ভয় কেটে যাচ্ছে।”
রোহান চোখ বন্ধ করে জিনিয়াকে জড়িয়ে ধরে।
তার শরীরের উত্তাপ জিনিয়ার গায়ে মিশে যাচ্ছে—
দুজনেই কেঁপে উঠছে, কিন্তু সবকিছু হচ্ছে খুব ধীরে, কোমল, আর আবেগে ভরা।

রাত তখন খুব বেশি হয়নি—রাস্তার দু’পাশে দোকান-পাট এখনও খোলা, বাতিগুলো ঝিমঝিম করে জ্বলছে। শীতের বাতাসটা একটু তীব্র হলেও শহরে এক অদ্ভুত আরাম আছে। জারা আরমানের বাইকের পেছনে বসে শক্ত করে জড়িয়ে আছে—একদিকে ঠান্ডা, আরেক দিকে আরমানের উষ্ণতা, দুটো মিলে তার শরীরে অন্যরকম অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
আরমান বাইক পার্ক করে বলল,
—“ চলো, আমার বউ ফুচকা খাবে না?
জারা চোখ বড় করে বলল,
—“ হ্যাঁ, খাবো! কিন্তু আপনার মতলব ঠিক লাগছে না আমার? ”
আরমান বাইকের চাবি খুলতে খুলতে বলে
__“ থাক সন্দেহ হলে খেতে হবে না। ”
জারা তাড়াতাড়ি এসে আরমানের কনুই জড়িয়ে ধরে বলে

__“রাগ করে স্বামীজান।আমি তো মজা করছি, চলুন আমরা ফুচকা খাই।”
ফুচকার স্টলটার সামনে উজ্জ্বল লাইট জ্বলছে। লাইটের আলোয় জারার চোখ আরও চকচক করছে। আরমান তাকিয়েই হালকা হাসলো—”এই মেয়েটা কেন এত সুন্দর?” তার মনে প্রশ্ন আসে প্রতিবারই।
জারা ফুচকার প্লেট নিয়ে খেতে শুরু করতেই আরমান ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
—“ কি দেখছেন? ”জারা চোখ ছোট করে জিজ্ঞেস করে।
—“তোমাকে!” আরমান উত্তর দেয়।
জারা মুখ ফোলায়,
—“ ফুচকা খাতে দিন, বিরক্ত করেন কেন?”
আরমান হেসে বলে,
—“ ঠিক আছে, খাও। আর কি কি যা চাও বলো, এখনই এনে দিচ্ছি।”
জারা খেতে খেতে বলে,
—“ আপনার যা হচ্ছে করে দিন। আমি কেনো বলে দিবো।”
শব্দটা শুনেই আরমান উঠে যায়। কাছেই এক দোকান থেকে সুন্দর সাদা এবং লাল গোলাপ ফুলের গাজরা কিনে নিয়ে আসে। জারার হাতে পরিয়ে দিয়ে বলে,
—“ হয়ে গেলো, রাণীর রাজকীয় সাজ। পছন্দ হয়েছে? ”
জারা নরম গলায় বলে,

—“ আপনি না… খুব ভালো। কিন্তু মাঝে মাঝে..? ”
আরমান চোখ ছোট ছোট করে তাকায় জারার দিকে। জারা আরমানের দৃষ্টি দেখে দাঁত বের করে হাসি দেয়।কথা ঘুরাতে বলে
__“ আমার স্বামীজান খুব ভালো, এটাই বলতে চাচ্ছিলাম! ”
__“তাই? ”
জারা ফুচকা খাওয়া বাদ দিয়ে স্থির হয়ে বসে।মুখ গোল করে শ্বাস ফেলে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলে
__“ ০০% সত্যি! ”
আরমান এটা শুনার পর জারা’কে নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলে
__“দিন দিন খুব পাঁজি হয়ে যাচ্ছো? ”
জারা আরমানের বুকে আলতো হাতে স্পর্শ করে বলে
__“ আপনি লাই দিয়ে দিয়ে পাঁজি বানিয়েছেন। আমার কী দোষ? ”
এই কথায় আরমানের বুকটা কেমন যেন নরম হয়ে যায়। বউয়ের গোলুমুলো ফেইস দেখে আরমান আর কিছু বলে না। তার পর ফুচকা খাওয়া শেষে দুজনে এক সাথে চা খায়। টঙ দোকানের আলোয় জারার মুখ আরও কোমল লাগে। চা হাতে দাঁড়িয়েই জারা হঠাৎ আরমানের বাহুতে একটা হালকা চাপ দেয়।

—“ কী হয়েছে? ”আরমান জিজ্ঞেস করে।
জারা দুষ্টু চোখে তাকিয়ে বলে,
—“ কিছু না। আপনাকে পরীক্ষা করলাম দৃষ্টি কোন দিকে?”
আরমান শ্বাস টেনে হেসে বলে,
—“ একদিন ভীষণ শাস্তি দেবো কিন্তু বউ?”
__“আপনার শাস্তি মাথা পেতে দিলাম? ”
আরমান জারা’র হাতে ধরে বলে
__“তাহলে চলো বাড়ি যাই!গিয়ে ফুলে সাজানো বিছানা টা দুজন মিলে নষ্ট করে ফেলি!”
জারা হকচকিয়ে উঠে। এই লোকটাকে নিয়ে সে কি করবে?সবসময় মাথায় বাজে চিন্তা। জারা আরমানের কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে বলে
__“ পাগল নাকি আপনি? আমার এখনো ঘুরা শেষ হয়নি!”
__“তাহলে ঘুরা শেষ হলে করবে?”

__“ যানি না! ” বলে জারা নদীর ঘাটের দিকে চলে যেতে থাকে।আরমান বাধ্য স্বামীর মতো বউয়ের পিছনে যায়। কি আর করার? বউ যে ভাবে চায় সেই ভাবে সব হবে!
তারপর তারা নদীর পাশে যায়। শান্ত পানি, বাতাস, আর হালকা কুয়াশার মতো শীত—সব মিলিয়ে জায়গাটা আরও রোমান্টিক। জারা আরমানের হাতটা শক্ত করে ধরে হাঁটতে থাকে। মাঝে মাঝে আরমান দুষ্টুমি করে জারার স্কার্ফ টেনে দেয়, আবার কখনো নিজের ওড়না উড়িয়ে আরমানের মুখে লাগিয়ে বলে,
—উফ, জানি না কে এমন বাতাস দিয়েছে, সব উড়ায়!
আরমান কিছুই বলে না, শুধু মিটিমিটি হাসে। সে জানে জারা দুষ্টুমি করছে কারণ তার কাছে নিরাপদ লাগে। এই বিশ্বাসই তাকে পাগল করে দেয়।
আরও কিছুক্ষণ দুজনে ঘুরাঘুরি করে তার পর তারা বাড়ির দিকে ফেরে।
রুমে ঢুকেই জারা বোরকা খুলে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে যায়। জারা বের হয়ে আসলে আরমান সরাসরি শাওয়ার নিয়ে বের হয়, চুলের ডগায় এখনও পানি ঝরছে। জারা একটু অবাক হয়ে তাকায়,

—“এত রাতে শাওয়ার?”
আরমান হাসে,
—“বউকে কাছে পাবো… তো শাওয়ার না করে কি আসা যায়?”
জারা লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
—“ আমি কিন্তু ঘুমাবো।”
জারা বিছানার দিকে যেতে গেলেই আরমান দ্রুত পেছন থেকে কোমর জড়িয়ে ধরে। গায়ের গরম নিঃশ্বাস জারার কানের কাছে লেগে যায়। পুরো শরীরটা হালকা কেঁপে ওঠে জারার।
আরমান খুব নরম, কিন্তু গভীর কণ্ঠে বলে,
—“বউ… এখনো কিছুই পাবো না আমি?”
জারা লজ্জায় ছোট্ট স্বরে বলে,
—“ কি চান?”
আরমান জারার কানের পিছনে মুখ নিয়ে গিয়ে আস্তে করে একটা চুমু খায়। জারা চোখ বন্ধ করে ফেলে।
আরমান ফিসফিস করে,
—“ আধর চাই। খুব… খুব প্রেম আসছে তোমার ওপর। ”
জারা হেসে বলে,

—“আপনি শাওয়ার নিয়েছেন। এখন ঘুমান আর আমিও ঘুমাবো।”
সে বিছানার দিকে এগোতেই আরমান তার কোমর আবার ধরে টেনে নেয়।
—“ আমি আবার শাওয়ার নেবো। কোনো সমস্যা নেই। তুমি কোথাও যেতে পারবে না।”
বলে আরমান জারাকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দেয়। জারা প্রথমে ছটফট করে,
—“ ছাড়ুন!”
কিন্তু আরমান তার গাল দুটো ধরে রাখে।
—“ চুপ। আজ তোমার সাথে একটু রাগ, একটু আদর, একটু দুষ্টুমি করতে মন চাইছে। আমি তখন তোমার সব কথা শুনেছি, এখন তুমি আমার কথা শুনবে!”
জারা গাল ফুলিয়ে বলে
__“আপনার মনে এই ছিলো?”
আরমান টুপ করে জারার ঠোঁটে চুমু দিয়ে বলে
__“আমার মনে আর কী কী আছে, চলো তোমায় দেখাই বউ!”
জারা তাকায়—এমন গভীর চোখ সে প্রতিদিন দেখে, তবুও প্রতিবারই নতুন লাগে। আরমান খুব ধীরে তার গলার থেকে উড়নটা সরিয়ে নেয়। জারা মুখ নিচু করে ফেলে—লজ্জায় শরীর গরম হতে শুরু করে।
আরমান জারাকে নিজের বুকের সাথে টেনে নেয়।
জারা প্রথমে আঁতকে উঠলেও পরে আস্তে আস্তে আরমানের বুকে মাথা রাখে।তার নিঃশ্বাস জারার গালে লেগে শরীর কেঁপে ওঠে।

—“ তুমি কি জানো…” —আরমান বলে,
—“যখন তুমি কাছে আসো… আমার মাথা ঠিক থাকে না।”
জারা চোখ বন্ধ করে,
—“ পাগল আপনি ?”
জারা বলতেই আরমান হেসে তার থুতনিটা তুলে ধরে।
—“ না! তোমার প্রেমিক স্বামীজান।”
জারা কিছু বলতে যায়, কিন্তু তার ঠোঁটের খুব কাছে আরমান ঝুঁকে আসে। জারা নিঃশ্বাস আটকে ফেলে। বুকে ধুকপুকানি বেড়ে যায়।আরমান ধীরে জারার ঠোঁটে একটা নরম, ছোট্ট চুমু এঁকে দেয়।
জারা নিজে থেকেই চোখ বন্ধ করে ফেলে। আরমান থামে না। তার আঙুল জারার চুলে চলে যায়, তারপর গাল বেয়ে নেমে আসে। জারা কেঁপে ওঠে।
—“ আপনি… ”—জারা বলতে পারে না, শ্বাস টেনে নেয়।
আরমান তার কপালে, গালে, চোখের কোণে একের পর এক নরম চুমু রাখে।তারপর জারার ঠোঁট আবার দখলে নেয়—ধীরে, গভীরভাবে, আবেগ নিয়ে… কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো অসভ্যতা নেই। শুধু দমবন্ধ করা প্রেম।
জারা প্রথমে লজ্জায় হাত দিয়ে আরমানকে সরাতে চায়,কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর নিজের হাতই গিয়ে আরমানের পিটে চলে যায়। অনুভূতি তাকে জড়িয়ে ধরে।আরমান ফিসফিস করে বলে,

—“এভাবে ধরো না… পাগল হয়ে যাবো।”
জারা লজ্জায় মুখ লাল করে ফেলে।শরীরের প্রতিটা কোণে আরমানের স্পর্শে কাঁপন বইতে থাকে।তার গলা, তার কাঁধ, তার হাত—সব যেন আলাদা করে অনুভব করছে।
আরমান জারার কপালে মাথা ঠেকিয়ে বলে,
—“তুমি জানো না… তোমাকে পেয়ে আমি কতটা বদলে গেছি।”
জারা হালকা গলায় বলে,
—“ আজকে না করলে হয় না…?”
আরমান হাসে,
—“ না হয় না! টাকা দিয়ে বাসর ঘর সাজিয়েছি।বিফলে যেতে দিব না আমি। যতক্ষণ একটা ফুল অক্ষত থাকবে ততক্ষণ তুমি রেহায় পাবে না। কান্না করলেও না সোনা। তোমার লজ্জা দেখলেই আমার ইচ্ছে করে আরও কাছে যেতে।”
জারা তার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলে।আরমান তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।তার হৃদস্পন্দন জারার কানে স্পষ্ট শোনা যায়।ধীরে ধীরে দুজনের নিঃশ্বাস মিশে যায়।কম শব্দ, কম কথা—শুধু আবেগ, উষ্ণতা, বিশ্বাস আর প্রেমের ঘনত্ব। জারা নিঃশব্দে বলে,

—“আ আ পনি পাগল করে দিচ্ছেন! ”
আরমান জারাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
—“ পাগল হয়ে যাও বউ। আমি তোমায় আবার ঠিক করে নিব!”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৯

ঘরটা নরম আলোয় ভরা, জানালার বাইরে হালকা শীতের বাতাস, আর তাদের দুজনের শরীরে জমে থাকা দিনের সব ভালোবাসা—সব মিলে রাতটা হয়ে ওঠে আরও গভীর, আরও উষ্ণ, আরও আপন।
এভাবে তাদের সুন্দর মূহুর্ত রাত ধীরে ধীরে গড়িয়ে যায়—কোনো সীমা ছাড়ানো দৃশ্য নয়, শুধু দুজন মানুষের একে অপরকে পাওয়া, অনুভব করা, আর ভালোবাসার নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here