অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৪
রুপা
রাত্রির নিবিড় অন্ধকার ভেদ করে এক স্নিগ্ধ আলো ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে ধরণীর বুকে। চারিপাশে বয়ে চলেছে এক মনোহর, হিমেল বাতাস—যার পরশে জুড়িয়ে যায় প্রাণ। সেই মৃদু সমীরণের সাথে সুর মিলিয়ে প্রকৃতিতে শুরু হয়েছে পাখিদের কলকাকলি, যা মর্ত্যের যেকোনো শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতকেও অনায়াসে হার মানায়।
ধীরে ধীরে ঊষার সেই আবছা মায়া কেটে যাচ্ছে। পূর্ব দিগন্তের কোল ঘেঁষে উঁকি দিচ্ছেন দিবাকর। তাঁর সেই নবীন, কাঁচা সোনার মতো রোদ পৃথিবীকে এক মায়াবী হলুদ আলোড়নে জড়িয়ে নিয়েছে। আলো আর ছায়ার সেই সন্ধিক্ষণে পুরো বিশ্ব যেন এক শান্ত, স্নিগ্ধ রূপকথার রাজ্যে রূপ নিয়েছে।
সকালের মিষ্টি রোদের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে পর্দা ভেদ করে রুমে ঢুকে পড়েছে; যা পুরো রুম জুড়ে এক হলদে মায়াবী, মনোরম পরিবেশ তৈরি করেছে। রোদের তীব্র ঝলকানি পুষ্পর মুখে পড়তেই কপালে ভাঁজ পড়ল। সে পিটপিট করে তার আঁখিজুগল খুলে উঠে বসল। কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল সে কোথায় আছে। নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করে চমকে উঠল পুষ্প! মাথাটা বড্ড ভার হয়ে আছে। সে নিজের মাথায় হাত দিতে গিয়ে ‘আহ্’ করে উঠল। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল চামড়া পুড়ে গেছে; মলম লাগিয়ে দিলেও পুরোপুরি ঠিক হতে বেশ সময় লাগবে।
পুষ্পর এবার মনে পড়তে লাগল একে একে কালকের সব ঘটনা। নিজের মায়ের শেষ ওড়নাটা পুড়ে গেছে, সেটা মনে পড়তেই আঁখিজুগল আবার ভিজে উঠল; অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। তবে পুষ্প নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সে জানে, কাঁদলেও আর তার মায়ের স্মৃতি ফিরে আসবে না, কেউ এনে দিতে পারবে না; উল্টো আরও ঝামেলা বাড়বে, যা সে কোনোভাবেই চায় না। সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে নিল। রুমে চোখ বুলিয়ে দেখল পুরো রুম খালি, আর্য কোথাও নেই।
তবে আজকে পুষ্প আর কোনো আগ্রহ দেখাল না। সে নিজেকে সামলে নিয়ে খাট থেকে নেমে এল। পোড়া হাতের কারণে বিছানা গোছাতে পারবে না সে, এখন কী করবে? সরকার সাহেব কোথায় ছিলেন রাতে? সে রাতে বিছানায় ছিল, সেটা যদি উনি জানতে পারেন তাহলে আবার তাকে মারবেন না তো? উনি তো ওনার জিনিসে হাত দেওয়া বা পুষ্পর ছোঁয়া একদম পছন্দ করেন না, তাহলে এখন কী হবে?
পুষ্পর এত শত ভাবনার মাঝেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল আর্য। পরনে সাদা টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার, গলায় ঝোলানো টাওয়াল। চোখ দুটো এখনো টকটকে লাল হয়ে আছে। আর্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল পুষ্পকে। কাল রাতের এত এত কথা আর্যর মনে আছে কি না কে জানে! তার মাঝে সে সবের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; সে যেন ফিরে এসেছে আবার নিজের আগের সেই কঠোর রূপে! পুষ্প সেদিকে তাকিয়ে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। তার হাত দুটোয় প্রচুর ব্যথা, তাই নিজে নিজে কিছুই করতে পারবে না। সে অনেক কষ্টে নিজের ওড়নাটা ঠিক করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আর্য পুষ্পর চলে যাওয়ার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কিছু না বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে রেডি হতে গেল। আজকে প্রতিদিনের মতো আর তার কাপড় খাটের ওপর সুন্দর করে ভাঁজ করা নেই। সেটা দেখে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা খালি অনুভূতি হলো আর্যর; তবে সেটা নিজের কাছে স্বীকার করল না সে। সে তো এটাই চেয়েছিল—যাতে মেয়েটা তার থেকে দূরে থাকে, তার কোনো জিনিসে যেন হাত না দেয়; এখন তো সেভাবেই হচ্ছে! মুখে স্বীকার না করলেও আর্যর অবচেতন মন খুব করে নিজের বিপক্ষেই বিদ্রোহ করতে চাইছে, যা আর্য হতে দিচ্ছে না।
আর্য রেডি হয়ে নিচে যাবে, ঠিক তার আগেই রুমে প্রবেশ করলেন শেহনাজ সরকার!
আর্য সকালে নিজের রুমে মাকে দেখে চমকে উঠলেও বাইরে তা প্রকাশ করল না। শেহনাজ সরকার আর্যর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—
– “পুষ্পর মায়ের ওড়না কেন পুড়িয়েছ?”
মায়ের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে গেল আর্যর। তার যতদূর মনে পড়ে, সে জ্বালিয়েছিল ওই মেয়েটার নিজের কাপড়। সে-ও এবার গম্ভীর গলায় বলল—
– “আমি ওর মায়ের কাপড় পুড়াইনি, ওর কাপড় পুড়িয়েছি!”
– “আর্য, তুমি খুব ভালো করে জানো মিথ্যা আমার একদম পছন্দ নয়!”
– “আশ্চর্য! আমি মিথ্যা কেন বলব?”
– “তুমি কি বলতে চাইছ তুমি পুষ্পর মায়ের ওড়না পুড়াওনি? সেই ওড়না বাঁচাতে গিয়ে পুষ্পর হাত পুড়েনি?”
মায়ের কথা শুনে আর্য চুপ করে রইল। সেটা দেখে শেহনাজ সরকার আবারও বললেন—
– “শুধু ওই ওড়নাটাই ছিল পুষ্পর কাছে ওর মায়ের শেষ স্মৃতি হিসেবে। যেদিন ওকে আমি এই বাড়িতে এনেছিলাম, সেদিন ওকে ওর চাচার বাড়ির কিছু নিতে বারণ করেছিলাম। কিন্তু ও শুধু ওই ওড়নাটা নিয়েছিল সাথে; ওটা ছিল ওর মায়ের একমাত্র শেষ স্মৃতি! আর তুমি সেটাই পুড়িয়ে ফেললে? আজকে আমার নিজেকে বড্ড ব্যর্থ মনে হচ্ছে আর্য, তোমাকে মানুষ করতে পারিনি আমি। কীভাবে পারলে একটা অনাথ মেয়ের কাছ থেকে তার মায়ের শেষ স্মৃতিটাকে এভাবে পুড়িয়ে কেড়ে নিতে?”
মায়ের বলা কথাগুলো শুনে আর্যর চোখের সামনে ভেসে উঠল কাল দুপুরের সেই দৃশ্য—পুষ্পর নিজের খালি হাতে আগুন নেভানোর অবুঝ চেষ্টা, আর্য তাকে সরাতে চেয়েও সরাতে পারেনি! হঠাৎ পুষ্পর সেই অনুভূতিশূন্য, শীতল কণ্ঠে তাকে জিজ্ঞেস করা—‘কেন পোড়ালেন, সরকার সাহেব?’ সবকিছু মনে পড়তেই আর্যর ভেতরে এক তীব্র অনুশোচনা আর অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করল। সে তো জানত না ওটা ওর মায়ের শেষ স্মৃতি ছিল!
এর মধ্যেই শোনা গেল শেহনাজ সরকারের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর—
– “আমি তোমাকে আর কিছু বলতেও চাই না, বুঝাতেও চাই না। যে নিজের ভালো নিজে বোঝে না, তাকে আমি আর কী বোঝাব? তোমার হঠাৎ পাল্টে যাওয়ার কারণ জানতে চেয়েছিলাম, জানাওনি। ভেবেছিলাম বিয়ে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে, তাই তোমার সাথে বিয়ে দিয়ে পুষ্পকে একটা সুন্দর জীবন দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি কি আর জানতাম, যেই মালিকে ফুল আগলে রাখার দায়িত্ব দিয়েছি, সেই মালীই ফুলটাকে কাঁটায় জর্জরিত করে পিশে ফেলতে চাইছে! আমি তোমার কাছে শেষবারের মতো জানতে চাই—পুষ্পকে বউ হিসেবে মেনে নিয়ে সংসার করবে, নাকি করবে না? যদি তোমার উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমি তোমাদের দুজনের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করব!”
‘ডিভোর্স’ শব্দটা শোনা মাত্রই বুকের কোথাও যেন খুব শক্ত করে বিঁধল আর্যর! মায়ের একের পর এক কথা শুনে নিজের মনে পুষে রাখা এতদিনকার ধারণার ওপর সন্দেহ জাগতে শুরু করল তার। সে কি তবে আসলেই ভুল করছে? আর্যকে চুপ করে থাকতে দেখে শেহনাজ সরকার কড়া কণ্ঠে বললেন—
– “সাত দিন সময় দিলাম তোমাকে। এই সাত দিনে তোমার ফাইনাল সিদ্ধান্ত জানাবে আমাকে।”
কথাগুলো বলে যেভাবে এসেছিলেন, সেভাবেই গটগট করে চলে গেলেন তিনি। এদিকে আর্য পাথরের মতো থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। সে তো এতদিন এটাই চেয়েছিল—মেয়েটার থেকে মুক্তি! সে তো প্রতিজ্ঞা করেছিল নিজের জীবনে কোনো মেয়েকে আসতে দেবে না, এরা কেউ বিশ্বাস বা ভালোবাসার যোগ্য নয়। কিন্তু আজকে যখন তার মা নিজে তাকে সেই মুক্তির পথ বাড়িয়ে দিলেন, তখন সে মুখের ওপর বলতে পারল না কেন যে—‘হ্যাঁ, আমি ডিভোর্স চাই, মুক্তি চাই’? কেন বলতে পারছে না? যেন কেউ তার গলাটা শক্ত করে চেপে ধরেছে!
আর্য আর কিছুই ভাবতে পারছে না। এই মেয়েটা সব গোলমেলে করে দিচ্ছে! সে চায় না কাউকে নিজের জীবনে জড়াতে, সে পারবে না কাউকে ভালোবাসতে। সে দেখেছে ভালোবাসা কীভাবে রূপ বদলায়, কী ভয়ানক তার পরিণতি! সে নিজেই তো তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। না, না… সব ঠিক আছে, ওই মেয়ের সাথে ডিভোর্স হওয়াই ঠিক আছে। এতে ওই মেয়েটাও ভালো থাকবে, আর সে নিজেও শান্তিতে থাকবে। এসব ভাবনার মাঝেই আবার রুমে প্রবেশ করে পুষ্প। সিমরান তাকে ফ্রেশ করিয়ে দিয়েছে। এখন তাকে ওষুধ খেয়ে খাবার খেতে হবে। শেহনাজ সরকার আজকে পুষ্পকে কলেজে যেতে বারণ করেছেন, পুষ্পও তাতে দ্বিমত করেনি।
পুষ্পকে দেখামাত্র আর্য নিজের ভাবনা ঝেড়ে ফেলে আলমারির কাছে গিয়ে কিছু একটা খোঁজার ভান করতে লাগল। আসলে সে কিছুই খুঁজছে না, সে শুধু আড়চোখে পুষ্পর হাবভাব অবলোকন করছে। কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র নজর দিল না পুষ্প। সে এগিয়ে গিয়ে খাটের পাশের টেবিল থেকে খালি পেটের ওষুধটা বের করতে চাইল; কিন্তু হাতের তীব্র যন্ত্রণার কারণে ওষুধের পাতাটা খুলতে পারল না। বেশি চেষ্টা করায় উল্টো ক্ষতে চাপ লেগে খুব ক্ষীণ স্বরে ‘আহ্’ করে উঠল পুষ্প। শব্দটা খুবই ক্ষীণ হলেও আর্যর কর্ণগোচর হলো ঠিকই! হবে না-ই বা কেন, তার সম্পূর্ণ মনোযোগ তো পেছনের ওই রমণীর দিকেই নিবদ্ধ ছিল। সে প্রায় দৌড়ে এসে পুষ্পর হাত থেকে ওষুধের প্যাকেটটা কেড়ে নিয়ে ধমকে উঠল—
– “স্টুপিড! আমাকে কি চোখে পড়ছে না? আমাকে দিলে কি আমি ওষুধটা খুলে দিতাম না?”
হঠাৎ আর্যর এমন কর্কশ ধমকে দমে গেল ভীতু রমণী। আর্যর ব্যবহারটা ইদানীং তার কাছে বড্ড অদ্ভুত লাগছে, প্রচণ্ড অদ্ভুত! লোকটা নিজে মুখে তাকে দূরে থাকতে বলে, অথচ এখন নিজেই গায়ে পড়ে কাছে আসছে; আবার একটু পরেই হয়তো নিজে থেকেই দূর-দূর ছাই করবে! কেন এমন করে লোকটা? পুষ্পকে চুপ করে থাকতে দেখে আর্য আবারও ধমকে উঠল—
– “স্টুপিড, চুপ করে আছো কেন?”
পুষ্প তবুও কিছু বলল না। এই পরিস্থিতিতে চুপ থাকাই সে শ্রেয় মনে করল। সে আর আর্যর হাত থেকে ওষুধের প্যাকেটটা নিলও না; অভিমানে মাথা নিচু করে আবার রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেল। সেদিকে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল আর্য। মেয়েটা তাকে এভাবে উপেক্ষা করছে? কিন্তু এতে তার ভেতরে এমন অস্থির লাগছে কেন? কেন সহ্য হচ্ছে না এই অবহেলা? আর্যর মাথায় বিনা কারণেই তীব্র রাগ চড়ে বসল।
সারাদিন অফিস শেষ করে রাতে বাড়ি ফিরেছে আর্য। রুমে ঢুকে কাউকে না দেখে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তার সারাদিন কেটেছে বড্ড অশান্ত আর অস্তির সে রাগের মাথায় পুষ্পর মায়ের শেষ স্মৃতি পুড়িয়ে ফেলেছে সেটা নিয়ে সারাদিন অনুশোচনায় অপরাধবোধে দগ্ধ হয়েছে। তাকে মেয়েটার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। সে যতই মেয়েদের ঘৃণা করুক তার কোনো অধিকার নেই একটা মেয়ের কাছ থেকে তার মায়ের শেষ স্মৃতি কেড়ে নেওয়ার কিন্তু তার রাগের কারণে সেটাই হয়েছে। এর মধ্যেই কাজের মেয়ে এসে তাকে ঠান্ডা শরবত দিয়ে গেল। কিন্তু পুষ্পর জায়গায় কাজের মেয়েকে দেখে মোটেও ভালো লাগল না আর্যর। তবুও মনকে বোঝাল—হাত পুড়ে গেছে ওই মেয়ের, তাই হয়তো নিচে আছে। সে শুধু কাজের মেয়েটিকে গম্ভীর গলায় বলল পুষ্পকে ডেকে দিতে।
তারপর সে নিজে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর গোসল সেরে বের হয়ে এল আর্য। পরনে ক্যাজুয়াল আরামদায়ক ছাই রঙা টি-শার্ট আর সাদা ট্রাউজার। টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। রুমে এখনো পুষ্পকে না দেখে রাগটা চড়চড় করে মাথায় উঠে গেল তার, তবুও নিজের রাগ সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল সে। কেন অযথা এত রাগ উঠছে তার? এই আচরণে আর্য নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত! সে তো মনে মনে চায় মেয়েটা তার থেকে দূরে থাকুক, কিন্তু এই যে এখন মেয়েটা সত্যিই দূরে আছে—তা-ও তার ভেতরে এত ক্ষোভ আর অশান্তি কেন হচ্ছে? তার সাথে এমনটা কেন হচ্ছে?
সে আর কিছু না ভেবে সোজা বারান্দায় চলে গেল। পকেট থেকে সিগারেট বের করে লাইটার জ্বালিয়ে নিকোটিনের ধোঁয়া ওড়াতে লাগল আকাশে। এই বিষাক্ত ধোঁয়ার মাধ্যমেই যেন সে নিজের ভেতরের চরম অস্থিরতা আর অব্যক্ত জ্বালা কমানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল।
শেহনাজ সরকার নিজের হাতে পুষ্পকে খাবার খাইয়ে, ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন; পরম যত্নে হাতে মলমও লাগিয়ে দিয়েছেন। সারাদিন পুষ্পর মন ভীষণ খারাপ ছিল। তার মায়ের একমাত্র শেষ ওড়নাটা পুড়ে গেছে, সেটা মনে পড়তেই বারবার বুক ঠেলে কান্না আসছিল তার। তবুও সে কাঁদেনি; আসলে কাঁদার সুযোগই দেননি শেহনাজ সরকার। সারাদিন পুষ্পর পাশে ছায়ার মতো লেগে ছিলেন তিনি। আজকে তিনি কোর্টেও যাননি; পুষ্পকে সারাদিন নিজের সাথে রেখেছেন। নিজের হাতে পুষ্পর মাথা আঁচড়ে দেওয়া থেকে শুরু করে খাবার খাইয়ে দেওয়া, ওষুধ খাইয়ে দেওয়া—সব তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করেছেন।
রাতের খাওয়া শেষ করে সিমরান আর আহনাফ অনেকক্ষণ গল্প করেছে পুষ্পর সাথে। সবই পুষ্পর মন ভালো রাখার চেষ্টা, আর তারা সেই চেষ্টায় সফলও হয়েছে। পুষ্প নিজের মন খারাপ সাময়িক ভুলে তাদের সাথে হেসে হেসে গল্প করেছে একটু হলেও। রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় এবার যে যার রুমে চলে গেল। পুষ্পও আস্তে ধীরে নিজের রুমের দিকে চলে আসে। রুমে ঢুকে দেখে আর্য সেখানে নেই। বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখল দরজাটা খোলা; হয়তো বারান্দায় দাঁড়িয়ে আবারও সিগারেট ফুঁকছে সে। রাতের খাবারের সময়ও পুরো খাবার শেষ না করেই টেবিল থেকে উঠে চলে এসেছিল আর্য!
পুষ্প আর ওসব নিয়ে কিছু না ভেবে সোজা সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। সারাদিনের সেই হাই জ্বর আর হাতের তীব্র যন্ত্রণার ক্লান্তি নিয়েই একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সে। আরও কিছুক্ষণ পর বারান্দা থেকে রুমে প্রবেশ করল আর্য। সোফায় পুষ্পকে ওভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল। পুষ্পর একদম সামনে এসে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসল আর্য। পুষ্পর কপালে আর গালে অবাধ্য কয়েকটি চুল লেপ্টে ছিল; আর্য একদম আলতো হাতে পরম মমতায় সেই চুলগুলো কানের পিঠে সরিয়ে দিল।
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৩
সে একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখতে লাগল পুষ্পর দিকে। ফর্সা, গোলগাল একটা মায়াবী মুখ! যে মুখে মিষ্টি হাসিটাই সবচেয়ে বেশি মানায়। অথচ তার আশেপাশে থাকলে মেয়েটার চেহারায় ভয়ের ছাপ ছাড়া আর কিছুই থাকে না, হাসি তো দূরের কথা! আর্যর মনে পড়ল, সে পুষ্পকে মাত্র এক-দুবার হাসতে দেখেছে—তা-ও দূর থেকে, যখন সে মেয়েটার ধারের কাছে ছিল না। নিজের করা সব অন্যায়ের কথা ভেবে আর্যর বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠল। সে পুষ্পর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে একদম ফিসফিস করে বলল—
– “আই অ্যাম সরি…।”
