প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩২
বন্যা সিকদার
ভোরের স্নিগ্ধ নরম আলোয় চোখ-মুখ কুঁচকে নিলো মৌ। জানালার পর্দা গলে আসা সূর্যের তীক্ষ্ণ রশ্মি সরাসরি তার বন্ধ চোখের পাতায় এসে পড়ায় চরম বিরক্তি নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল সে। কিন্তু তাতেও কোনো লাভের লাভ হলো না‚ রুমের অন্য কোণ থেকেও আলোর তীব্র আভা তার চোখে এসে বিঁধছে। মৌ অবশেষে তীব্র বিরক্তি আর আলসেমি নিয়ে ধড়ফড় করে আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসল। মাথাটা বড্ড ঝিমঝিম করছে তার। গতকাল রাত জেগে একটানা পড়ার ধকল যে এই অবাধ্য শরীরটা নিতে পারছে না‚ তা বেশ ভালোই টের পাচ্ছে সে। হঠাৎই মাথার ভেতর ‘পরীক্ষা’ শব্দটা আসতেই এক প্রকার তড়িৎ গতিতে লাফিয়ে উঠল মৌ। ধক করে ওঠা বুক নিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই তার আত্মারাম খাঁচা হওয়ার উপক্রম হলো।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক নয়টা বেজে গেছে অথচ তার পরীক্ষা শুরু হতে আর মাত্র এক ঘণ্টা বাকি‚ অর্থাৎ ঠিক দশটায়! মৌ পাশ ফিরে তাকাল কিন্তু পুরো বিছানায় উজান’কে কোথাও খুঁজে পেল না। একরাশ তীব্র অভিমান আর ক্ষোভ এসে জমা হলো মৌ’য়ের ছোট্ট বুকটায়। মনে মনে ভাবল‚ মানলো উজান তাকে মনে-প্রাণে বউ বলে স্বীকার করে না‚ তাই বলে এত বড় একটা পরীক্ষার দিন একটু ডেকেও দেওয়া গেল না? মানুষটা এতটাও নিঠুর কীভাবে হতে পারে।
মৌ আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে তড়িঘড়ি করে খাট থেকে নামতে গেল। কিন্তু তাড়াহুড়োর চোটে গায়ের কমফোর্টারটা তার পায়ের সাথে পেঁচিয়ে গেল। ব্যালেন্স হারাতেই বেড থেকে তার পা ফস্কে গেল এবং সে সরাসরি শক্ত মেঝের দিকে পড়ে যেতে লাগল। নিশ্চিত যন্ত্রণার ভয়ে মৌ চোখ দুটো শক্ত করে বুজে নিল।
কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে মেঝেতে আবিষ্কার করার বদলে মৌ টের পেল সে শূন্যে ভাসছে। আর তার অতি পরিচিত‚ মাদকতাময় পারফিউমের মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে এসে লাগতেই মৌ পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। সামনেই উজান তার শক্ত দুই বাহু দিয়ে তাকে পাজা কোলে তুলে ধরে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে।
উজানে’র সেই তপ্ত ও রাগী চাউনি দেখেই মৌ চট করে নিজের চোখ নামিয়ে নিল। উজান অত্যন্ত যত্ন সহকারে তাকে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। কিন্তু মৌ সেখানে এক সেকেন্ডও বসল না‚ উজানে’র স্পর্শ থেকে বাঁচতে সে এক ছুটে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে ধড়াম করে দরজা আটকে দিল। আচমকা ঘটে যাওয়া এই হুটহাট কাণ্ডে উজান কপাল কুঁচকে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। এই মেয়েটা যে কখন কী করে‚ তার কোনো আগামাথা উজান চৌধুরী আজ পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারল না। ওদিকে ওয়াশরুমে ঢুকে মৌ আর পেছনের দিকে তাকাল না। সে খুব দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিজের কলেজের ড্রেসটা পরে রুমের ভেতর হাজির হলো। সময় একদম নেই। সে দ্রুত ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোনোমতে নিজের চুলগুলো বাঁধার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু আফসোস‚ সে কবে নিজ হাতে চুল বেঁধেছে তা তার নিজেরই মনে নেই। সবসময় শাশুড়ি আম্মা নয়তো উজানই তার চুল বেঁধে দেয়। কিন্তু আজ সে উজান চৌধুরীর কাছে সে ভুলেও যাবে না‚ ওনার কোনো সাহায্য সে আজ জীবন গেলেও নেবে না!
মৌ নিজেই জোর করে চিরুনি চালাতে গিয়ে নিজের অজান্তেই চুল আরও বেশি জটিল করে ফেলল‚ উল্টো গোড়া থেকে চুল ছিঁড়ে তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। খানিকটা দূর থেকে পড়ার টেবিলের চেয়ারে বসে উজান এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিল আর মনে মনে মিটিমিটি হাসছিল। সে হাতের ফোনটা একপাশে রেখে ধীর পায়ে মৌ’য়ের পেছনে এসে দাঁড়াল। মৌ’য়ের হাত থেকে চিরুনিটা কেড়ে নিয়ে সে পরম মায়ায় তার চুল আঁচড়ে দিতে শুরু করল। মৌ ওমনি নিজেকে ছাড়িয়ে দূরে সরে যেতে চাইল কিন্তু উজান এক টানে তাকে নিজের আরও কাছে এনে কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে আওরাল‚
“দিস ইজ টু মাচ পিচ্চি। একটুও নড়বে না বলছি। দিন দিন বড্ড বেশি ফাজিল আর অবাধ্য হয়ে যাচ্ছ তুমি। কাল জাস্ট পড়াশোনার জন্য দুটো বেতের বাড়ি দিয়েছি কি দিইনি তার জন্য কাল থেকে কথা বলা তো দূর‚ আমার দিকে পাত্তাই দিচ্ছে না কেউ। আমি তো আর অন্য মদখোর স্বামীদের মতো নেশাটেশা করে ইচ্ছেমতো বউ পেটাই না। তাহলে এমন বিহেভিয়ার কেন? হোয়াই?
মৌ শক্ত হয়ে মাথা নিচু করে রইল। তার এই থমথমে‚ বিষণ্ণ মুখখানা দেখে উজানে’র ভেতরে ভেতরে বড্ড হাসি পাচ্ছিল। সে নিজের ঠোঁটের কোণের হাসিকে আর চেপে রাখতে না পেরে হুট করে ফিক করে হেসে উঠল। উজানে’র মুখে এই অসময়ের হাসি দেখে মৌ ওমনি চোখ রাঙিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে ঝামটা দিয়ে বলল‚
”আমি কি আপনাকে বলেছি আমার চুল বেঁধে দিতে‚ হ্যাঁ? বলিনি তো। তাহলে কেন এসেছেন এখানে দয়া দেখাতে? আর শুনুন প্রফেসর সাহেব‚ আমি আপনার কোনো বউ-টউ নই‚ সেই জন্য আমার গায়ে হাত তোলার বা শাসন করার আপনার কোনো রাইট নেই। আমার যা ইচ্ছে আমি করব‚ তাতে আপনার কী? আমাকেও ভালোবাসার মানুষের বড্ড অভাব পড়েছে‚ তাই না? জাস্ট একটা ‘হাই’ দিলে হাজারটা ছেলের লাইন লেগে যাবে আমার পেছনে। আর উনি এসেছেন আমার সাথে ঢং করতে‚ হুহ। দেখি সামনে থেকে সরুন‚ আমার পরীক্ষা দিতে লেট হয়ে যাচ্ছে।
মৌ’য়ের মুখ থেকে অন্য ছেলেদের লাইনের কথা শুনতেই হুট করে বিদ্যুৎ গতিতে উজানে’র পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় মৌ’য়ের কোমর চেপে ধরে নিজের চওড়া‚ শক্ত বুকের সাথে তাকে একদম পিষে মিশিয়ে নিল। সকাল সকাল মেয়েটির মুখ থেকে এমন ত্যাঁড়ো আর আলগা উত্তর শুনতে ওনার বিন্দুমাত্র ভালো লাগছিল না। কিন্তু উজান রাগ করতে গিয়েও পারল না‚ কারণ সে খুব ভালো করেই জানে কাল রাতে মেয়েটার মনে সে গভীর আঘাত করেছে‚ তাই এই অভিমানটুকু তার প্রাপ্য।
মৌ উজানে’র এই অনাকাঙ্ক্ষিত শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আপ্রাণ ছটফট করতে লাগল কিন্তু একজন সিআইডি অফিসারের শক্তির কাছে তার এই ছটফটানি সম্পূর্ণ বৃথা গেল। মৌ এবার নিজের রাগ আর অভিমান ধরে রাখতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
”ছাড়ুন আমাকে। আপনাকে স্পর্শ আমার অসহ্য লাগছে।
উজান মৌ’য়ের চোখের দিকে নিজের ধারালো দৃষ্টি স্থির করে খুব ধীর কণ্ঠে শুধাল‚ “মাত্র এক রাতেই কি আপনার সব গভীর ভালোবাসা শেষ হয়ে গেল‚ ম্যাডাম? এই কি আপনার সেই চিরকালের জন্য আঁকড়ে ধরে রাখার ভালোবাসা?
মৌ নিজের চোখ দুটো নিচের দিকে নামিয়ে একরাশ বিষণ্ণতা আর তাচ্ছিল্য মেশানো মুখে উত্তর দিল। “আমি দুনিয়ার কাউকেই ভালোবাসি না। ছাড়ুন আমাকে।
মৌ’য়ের মুখ থেকে এই ‘কাউকেই ভালোবাসি না’ কথাটি শুনে উজানে’র ভেতরের পুরুষালি অহংকারটা চট করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে মৌ’য়ের কোমর থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বেশ কঠিন ও গম্ভীর গলায় বলল‚
“আচ্ছা‚ যান। ছেড়ে দিলাম আপনাকে।
এই বলেই উজান আর এক মুহূর্ত রুমে না দাঁড়িয়ে গটগট করে কক্ষ ত্যাগ করল। মৌ স্তব্ধ হয়ে উজানে’র চলে যাওয়ার দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা এতটা নির্বোধ কীভাবে হতে পারে? একটা মেয়ে যে শুধু নিজের ভেতরের তীব্র অভিমান থেকে এই সামান্য কথাটা বলেছে‚ তা লোকটা নিজের মুখের ভাষা দিয়ে বিশ্বাস করে ওভাবে চলে গেল? মৌ একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোনোমতে নিজের চোখটা মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। তারপর পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্কেল‚ কলম আর বোর্ড নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে এলো। নিচে নেমে সে ড্রয়িংরুমে থাকা বাড়ির সব বড়দের দোয়া নিল। তারপর ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরে’র হাত শক্ত করে ধরে একপ্রকার টানতে টানতে বাড়ির বাইরে চলে গেল। যাওয়ার সময় সে ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা উজানে’র দিকে একবার ফিরেও তাকাল না।
উজান ডাইনিং টেবিলে প্লেটের সামনে বসে থাকলেও মৌ’য়ের এই অবহেলা আর উপেক্ষা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। প্লেটের খাবার মুখে তোলার রুচিটুকুও তার হারিয়ে গেল। সে-ও খাবার না খেয়ে চেয়ার ছেড়ে এক ঝটকায় উঠে নিজের বাইকের চাবি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। মৌ’য়ের এই এভয়েড করাটা তার পুরুষ হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে‚ বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। কিন্তু সে যে একজন শক্ত মনের পুরুষ‚ তাই নিজের ভেতরের এই তীব্র হাহাকার মুখে প্রকাশ করা তার বারণ।
টানা দেড় ঘণ্টা ধরে পরীক্ষার খাতায় হিজিবিজি কাটল মৌ। কিন্তু এই দীর্ঘ নব্বই মিনিটের একটি সেকেন্ডের জন্যও উজান চৌধুরী তার সাথে দেখা করতে আসেনি। উজানে’র দেখা পাওয়ার আশায় মৌ কয়েকবার মিথ্যা বলে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়েছিল কিন্তু পুরো করিডোর খুঁজেও ফলাফল শূন্যই রইল। লোকটা সত্যি তাকে একটুও দেখতে আসেনি। পরীক্ষা শেষ হতে তখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি। মৌ আর ক্লাসরুমে টিকতে পারল না‚ খাতা জমা দিয়ে সে সোজা কলেজ ক্যাম্পাসের এক কোণে থাকা বিশাল বকুল গাছটার নিচে এসে বসল। বাকি পরীক্ষাগুলো দেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আর তার ভেতর অবশিষ্ট নেই। মেহের তখনও হলের ভেতর একমনে লিখে যাচ্ছে কিন্তু মৌ’য়ের মন কোনোভাবেই টিকছিল না। সে ছলছল চোখে কলেজের চারপাশের চত্বরে বারবার পরখ করল কিন্তু কোথাও উজানে’র সেই পরিচিত দীর্ঘ অবয়বের অস্তিত্ব মিলল না।
এক তীব্র ও অভিমানী রাগ এসে ভর করল মৌ’য়ের মাথায়। সে এক প্রকার রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আর কারও জন্য অপেক্ষা না করে একাই কলেজ গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। কিন্তু গেটের বাইরে পা রাখতেই সামনের দৃশ্য দেখে তার দুই ভ্রু কুঁচকে গেল। সে দেখল—ইফাত গেটের পাশে একটা ওয়াটার বোতল আর ছাতা হাতে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে মেহেরে’র জন্য অপেক্ষা করছে। রোদের মধ্যে ইফাত’কে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৌ’য়ের ভেতরের রাগটা যেন আরও চড়া হয়ে উঠল। সে দাঁড়িয়ে আছে তার কোনো প্রব্লেম নেই কিন্তু উজান কেন তার জন্য দাঁড়ায়নি এটাই কথা। সে তড়িঘড়ি করে ইফাতে’র সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং এক ঝটকায় ইফাতে’র হাত থেকে পানির বোতলটা ছিনিয়ে নিয়ে গরগর করে বলে উঠল।
”দেবো না আমি তোমার কাছে আমার জানের টুকরো মেহুকে বিয়ে। তুমি একদম ভালো ছেলে নও‚’হাজারটা মেয়ের সাথে সারাদিন কথা বলো। একটা খারাপ ছেলে তুমি। আমি আমার মেহুকে অন্য কোনো ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দেবো‚তোমার মতো লম্পটের হাতে দেবোই না।
ইফাত মৌ’য়ের এমন আকস্মিক আক্রমণে প্রথমে থতমত খেলেও পরক্ষণেই মৃদু হাসল। মৌ’য়ের এই ত্যাঁড়োমুখো রাগ দেখার পর তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে উজানে’র ওপর রাগ করেই ভাবিজান আজ এভাবে ফেটে পড়ছেন। ইফাত মুখ খোলার আগেই মৌ আবার দাঁতে দাঁত চেপে বলতে লাগল‚ “কী ভেবেছ তোমরা পুরুষ মানুষেরা হ্যাঁ? মনে করেছ আমরা মেয়েরা পায়ের জুতো? আমি আজই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি‚ আর আমার মেহুও ওই বাড়িতে এক সেকেন্ড থাকবে না! তোমার ওই পাষাণ ভাইকে গিয়ে এখনই পরিষ্কার বলে দিও‚ আমি উজান চৌধুরীকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি এমনকি একটা পরীক্ষাও আর দেবো না! আমি আজ‚ এখনই নিজের বাপের বাড়ি চলে যাব সারাজীবনের জন্য। ওনার বড্ড ইগো তাই না? নষ্ট পুরুষ একটা। এত কিউট একটা মেয়েকে বউ হিসেবে পেয়েও ওনার মনে বিন্দুমাত্র খুশি নেই। আমি অলরেডি আব্বুকে ফোন দিয়ে দিয়েছি‚ আব্বু গাড়ি নিয়ে রাস্তায় চলে এসেছে। আমি আজই বিদায় হবো‚ এই খচ্চর মানুষদের সাথে আর এক মুহূর্তও থাকব না।
মৌ ইফাতে’র কোনো কথা শোনার বা বোঝার চেষ্টা করল না। এমনকি চৌধুরী বাড়ি থেকে তাদের নেওয়ার জন্য যে গাড়িটা এসেছিল‚ মৌ সেদিকে ফিরেও তাকাল না। সে গটগট করে হেঁটে সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। মৌ’কে ওভাবে হনহন করে চলে যেতে দেখে ইফাতে’র কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে পকেট থেকে ফোন বের করে সোজা উজান’কে কল দিল।
ওদিকে কাঙ্ক্ষিত নম্বরটিতে রিং হতেই উজান ফোনটা রিসিভ করল। কিন্তু উজান হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে ইফাতের কর্কশ ও চড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“শালা জলদি বাসায় আয় বলছি‚ নয়তো তোর বউ আজ চিরতরে বাপের বাড়ি চলে যাবে। একবার যদি বউ হাতছাড়া হয়ে যায়‚ তখন তোর ওই সিআইডি-র ইনভেস্টিগেশনের মাথায় গুলি মারিস।
“হোয়াটটটটটট? আমার বউ চলে যাবে বললেই হলো নাকি? আমি কি বউ’কে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিয়ে করেছি?
উজান খানিকটা আতঙ্কিত ও উচ্চস্বরে কথাটা বলল। আসলে সে একটা নতুন ইনভেস্টিগেশন করতে ঢাকা থেকে কিছুটা দূরের এক হাইওয়েতে এসেছে‚ সেই জন্যই আজ সকালে কলেজের প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করেই সে তড়িঘড়ি করে স্পটের দিকে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু এখন ইফাতে’র মুখে এই আকস্মিক খবর শুনে তার নিজের আত্মাই যেন খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম হলো। ইফাত ওপাশ থেকে উজানে’র ওপর আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
“শালা ভণ্ড একদম চুপ কর তুই। বউ’কে যদি এতই ভালোবাসিস‚ তবে সেটা নিজের মুখে স্বীকার করতে এতো কাহিনী কেন? ভাবি মাত্রই আমাকে বলে গেল‚ তার বাবা নাকি অলরেডি আমাদের বাসার অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে। আর বড় বাবাই ও নাকি ভাবিকে নিজের বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার পক্ষে। যেখানে তার নিজের কোনো সম্মান নেই‚ ভাবি নাকি সেখানে আর থাকবে না। এমনকি সামনের একটা পরীক্ষাও দেবে না। শালা বউ’য়ের পরীক্ষার জন্য এতদিন এত নাটক করলি‚ এবার হাত থেকে বউটা চলে গেলে বুঝবি যৌবনের ঠেলা কাকে বলে। আমি এখানে দিনরাত এক করে পুলকন্যা’কে নিজের ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছি। আর এই শাউ*য়্যার নাতি ঘরে এক অপ্সরা বউ থাকতেও নজর দেয় না। ছেহ্‚ রাখ ফোন।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩১
এই বলেই ইফাত রাগের কারনে খট করে ফোনের লাইনটা কেটে দিল। ওদিকে চলন্ত গাড়ির ভেতর ফোনের ওপাশে উজানে’র পুরো গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো। মৌ মেয়েটা যে পরিমাণ ত্যাঁড়ো আর জেদি‚ তাকে দিয়ে কোনো কিছু অসম্ভব নয়। সে আজই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারে‚ এটা উজান খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু ঢাকার এই জ্যাম আর এত দূর পথ পাড়ি দিয়ে সে কীভাবে মাঝরাস্তা থেকে এত দ্রুত মৌ’য়ের কাছে পৌঁছাবে? এই চিন্তাতেই প্রফেসরের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল।
