Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭১
সোহানা ইসলাম

রাত ৯টা বাজতেই রাশেদের চোখ কেঁপে ওঠে। যেন কেউ তার ঘুম কেড়ে নিল। ধীরে ধীরে চোখ খুলে প্রথম যেটা দেখে—তার মাথার কাছে বসে কান্নাভেজা চোখে তাকিয়ে থাকা তার স্ত্রী,মিম।
মিমকে দেখেই সাথে সাথে রাশেদের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠে। মিমের ঠোঁটের কোনে হাসি ফিরে আসে রাশেদের দৃষ্টি দেখে। মিম আরও শক্ত করে রাশেদের হাত ধরে।
রাশেদ নরম গলায় বলে
__ “বউ… তুমি এত সুন্দর লাগছো যে চোখ খুলতেই প্রেমে পড়ে গেলাম আবার। মাথা কেমন করছে? ”
মিম এত লজ্জা পায় যে চোখ নামিয়ে নেয়। পাশে বসা ফারিয়া বেগম মুখ টিপে হাসেন। পাশেই ফারিয়া বেগম আর আরিফ খান বসা ছিলো। রাশেদের কান্ড দেখে তিনি রুম থেকে বের হয়ে যান। ফারিয়া বেগম বিরক্ত হয়ে বলেন

__“এই বাঁদর ছেলে, জ্ঞান ফিরেই প্রেম শুরু!”
রাশেদ হঠাৎ উঠে বসে থাকে, সে এতো সময় তাদের খেয়াল করে নি। রাশেদ হাসি দিয়ে বলে
__“বড় আম্মু তুমি এ এখানে? ” তারপর মিমের হাত ধরে কাছে টেনে নেয়।
ফারিয়া বেগম বলেন
__“বউকে দেখে বেহুশ হয়ে পেরে ছিলি। রুমে এনে সেবা করলাম। আর এখন বলছিস আমি কেনো এখানে? ”
রাশেদ তাড়াতাড়ি করে মাথা ঝাকিয়ে বলে
__“ না.. না বড় আম্মু! আমি সেই ভাবে বলতে চাই নি?”
__“থাক..থাক..আমি বোঝে ছি! ” বলেই তিনি উঠে দাঁড়ায়। চলে যাবে বলে পা বারায় রুমের বাইরে।
ফারিয়া বেগম কে চলে যেতে দেখেই রাশেদ মিমকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে টুপ টুপ করে কয়েক টা চুমু খায়। মিম দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। যদি বড় মা দেখে ফেলে। তাহলে লজ্জায় পরতে হবে তাকে।রাশেদ মিমের গলায় মুখ গুঁজে বলে
__ “কী রূপ তোমার জান? জ্ঞান না হারালে ড্রইং রুমেই কিছু একটা…..! ”
মিম ফোঁৎ ফোঁৎ করে বলে, লজ্জায় গলা কাঁপে
— “আপনাকে… আমি… ভালো ভেবেছিলাম। কিন্তু আপনি দিন দিন লুচু হয়ে যাচ্ছেন রাজ বাবু।”
রাশেদ এবার পুরোটা হাসি আটকে রাখতে পারে না।গায়ের বেজা শার্ট খুলে ফেলে। উদাম গায়ে মিমকে জড়িয়ে ধরে বলে

— “কাল রাতে যেটুকু ভালোবাসা দিয়েছি, মনে হয় কম হয়েছে। আজকে আরেকটু বাড়িয়ে দিই? ”
মিম চমকে উঠে, রাশেদকে ঠেলে দিয়ে বলে
—“আহ! চুপ করেন! কেউ দেখবে!”
ফারিয়া বেগম কী মনে করে যেনো আবার রুমে আসেন। এসেই এসব দেখে ভ্রু কুঁচকে বলেন
__ “এই বাদর! আমি আছি এখানে। আর বৌকে নিয়ে রোমাঞ্চ চালাচ্ছিস! লজ্জা করে না?”
রাশেদ হকচকিয়ে যায়, তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে বসে। মিম লাল হয়ে মাথা নিচু করে ফেলে।
__“তোদের জন্য খাবার পাঠাচ্ছি। তবে রোমাঞ্চ কম, ভাত বেশি খাবি।”
রাশেদ আড় চোখে মিমের দিকে তাকিয়ে বলে
__“ভাত না খেলে চলে না বড় আম্মু? ”
__“তাহলে সারারাত না খেয়ে থাকবি?” বললেন ফারিয়া বেগম।
রাশেদ আবার তাকায় মিমের দিকে। মিম মাথা নিচু করে এখনো বসে আছে। মেয়েটা কে দেখে বোঝা যাচ্ছে ভালোই লজ্জা পেয়েছে। রাশেদ ফারিয়া বেগম কে বলে

__“ রুমে আমার জন্য খাবার আছে বড় আম্মু! ” মিম হকচকিয়ে উঠে। দৃষ্টি তার রাশেদের দিকে। ফারিয়া বেগম ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন
__“তোর খাবার আছে বলে কি হয়েছে। মিম খাবে।”
রাশেদ সাথে সাথে বলে
__“ওর খাবার ও আছে! ”
মিম তো এবার বেজায় চটে যায়। কম্বলের নিচ দিয়ে রাশেদের পায়ে চিমটি কাটে খুব জোরে। রাশেদ উ্হ্হহহহ করে উঠে। ফারিয়া বেগম রাশেদের কথার মানে কিছুই বোঝে নি। তিনি মনে করেন ঘরে হয় তো কোনো শুকনো খাবার আছে। তাই তিনি বলেন
__“ আজে বাজে জিনিস খেতে হবে না। আমি খাবার পাঠাচ্ছি। ”বলে রুম থেকে বেরিয়ে যান।
ফারিয়া বেগম রুম থেকে চলে যেতেই রাশেদ আবার মিমকে জড়িয়ে ধরে। কানে কানে ফিসফিস করে বলে
__“ এমন সাজ কিসের জন্য জান ? রোগী হওয়ার জন্য নাকি রোগী বানানোর জন্য? ”
মিম তো লজ্জায় হাসফাস করতে থাকে। ঠিক তখনই
রুমের দরজা থেকে উঁকি দিয়ে রোহান দুই চোখ বড় করে দেখে, মুখে দুষ্টু হাসি।

__ “ কি ভাই, জ্ঞান ফিরতে না ফিরতেই রোমান্স শুরু?”
রাশেদ বালিশ ছুঁড়ে মারতে গেলে রোহান হাসতে হাসতে পালায়
—“ভালো আছো দেখি! এনার্জি থাকলে কাজ চালিয়ে যাও!”
মিম বালিশ মুখে চাপা দিয়ে লজ্জায় অর্ধেক মরেই গেল। সাথে আছে রাশেদের পাগল করা স্পর্শ। দরজা খুলা রেখেই এমন করছে। মিম বার বার করে বলে রুমের দরজা লাগিয়ে আসতে কিন্তু রাশেদ মিমকে সুযোগই দিচ্ছে না।
এদিকে জাহেদের পাশে বসে আছে ফিহা, তার হাত ধরে বসে। পাশে জেসমিন বেগম, জিনিয়া, আর আসিফ খান।রুমে সবার মন ভারী। হঠাৎ জাহেদ চোখ খুলে তাকায়। তার দৃষ্টি সোজা ফিহার চোখে গিয়ে ঠেকে।
__“ফিহা! মেরি জান…!”
বলেই চিৎকার করে উঠে আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই জাহেদ ফিহাকে টেনে নেয় নিজের কাছে, কম্বলের ভেতরে জড়িয়ে ধরে। ফিহা চমকে উঠে
__ “আআআহ! কি করছেন! ছেড়ে দিন!”
ফিহা চিৎকার করে ওঠে। জেসমিন বেগম তো চেয়ারে বসা অবস্থায় উঠে দাঁড়ালেন। জাহেদ ঠোঁটের কোনে হাসি রেখে বলে

— “তুমি এত সুন্দর… তোমার দিকে তাকালে তো আমার জ্ঞান থাকার কথা না। জ্ঞান হারিয়ে ও শুধু তোমাকে দেখছিলাম! ইসসস! কী বৌ দিলাম আল্লাহ! পুরাই ১০০…১০০!”
ফিহা তাড়াহুড়ো করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়, লজ্জায় কাপছে।
__ “আপনার মাথা খারাপ নাকি? সবাই আছে!”
জিনিয়ার গাল ভেঙে হাসি দিয়ে বলে
__“ভাইয়া রিলাক্স! আমরা সবাই আছি তো এখানে ।”
ছেলের এমন উদভ্রান্ত আচরণ দেখে আসিফ খান নিজেই লজ্জায় পরে যান। দৃষ্টি সংযত রেখে রুম থেকে বের হয়ে আসে। দরজা পার হতেই রোহানের সাথে ধাক্কা লাগে। আসিফ খান রোহানের দিকে রেগে তাকিয়ে আছেন।রোহান ওর শশুড়ের দৃষ্টি দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে
__“ এমন অসম্ভব দৃষ্টিতে আমরা দিকে তাকিয়ে আছেন কেনো শশুড় আব্বা? ”
আসিফ খান আরও রেগে যান। এই ছেলে ভালো হওয়ার নয়।হতাশ হশে একটা শ্বাস ফেলেন তিনি।বিরক্ত হয়ে বলেন

__“জায়গা দিয়ে দাঁড়াও! আমি যাবো!”
রোহান শশুড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। আসিফ খান এখনো কপাল কুঁচকে আছন। তিনি এসব বিষয় নিয়ে খুব বিরক্ত। রোহান মনে মনে ফন্দি আঁটে। শশুড় কে আরও রাগানোর জন্য। দু’হাত পিছনে নিয়ে সুর ধরে বলে
~~ পরের জায়গা পরের জমি
ঘর বানাইয়া আমি রই
আমি কী সেই ঘরের মালিক নই..শশুড় আব্বা! ”
__“ ইয়ার্কি করছো আমার সাথে? ”
__“ থুরা…থুরা..শশুড় আব্বা..! ”
শেষের শশুড় আব্বা একটু টান দিয়ে বলে রোহান। ঠোঁটে তার শয়তানি হাসি। শশুড়ের মুখ দেখে মনে হচ্ছে তার কাজ কমপ্লিট। শশুড় রেগে বুম হয়ে গেছে। আসিফ খান রোহানকে না দেখার মতো করে চলেন যান, রাগে গজগজ করতে করতে। যাওয়ার সময়
“ নির্লজ্জ বলতে ভুলেন না। রোহান হাসে। শশুড়কে রাগাতে তার বেশ লাগে। হাসতে হাসতে জাহেদের রুমে ঢিকে।
জেসমিন বেগম রাগে বললেন

—“ বেয়াদব ছেলে! এখানে মা দাড়িয়ে আছে, আর সে বৌ নিয়ে ছাগলামি করছে। লজ্জা শরমের বালাই নেই!”
জাহেদ দাঁড়ানোর চেষ্টা করে হাসিমুখে বলে
—“আম্মু, দোষ আমার না। দোষ তোমার আর তোমার পুত্রবধূর। এত সুন্দর করে সাজিয়ে আমার চোখের সামনে রাখলে কেন!”
ফিহা চুপ হয়ে যায়, মাথা নিচু। কান লাল।জেসমিন বেগম রাগ দেখিয়ে বলেন
—“চুপ করে শুয়ে থাক। না হলে খাটের সাথে বেঁধে রাখবো।”
জাহেদ মুখ বাঁকায়
—“বাঁধলেও সমস্যা নেই। শুধু বউকে পাশে রাখবে।”
জিনিয়া তো পেটে ব্যথা করে হাসতে হাসতে জানালা খোলে। ঠিক তখন দরজা খুলে রোহান ঢোকে।
__“ওহহ! এদিকে ও প্রেমিকের জ্ঞান ফেরেছে, ওদিকে নতুন সিনেমা চলছে?”
জাহেদ বালিশ ছুঁড়ে
—“বের হও সবাই !আমার বউ কে দেখতে দাও, বিরক্ত করো না!”
রোহান জিনিয়ার হাত ধরে হাসতে হাসতে বলে—“চলো চাঁদ সুন্দরী , পাগল সাথে থাকা নিরাপদ না।”
তারা বের হয়ে যায়। জেসমিন বেগমও রাগ মুখে বের হয়ে যান। ফিহা তখনো লজ্জায় ধরা।

রাত এগারোটার ঘরে পুরো বাড়িটা কেমন যেন থমথমে, কিন্তু অস্থির এক অপেক্ষা ভাসছে সবার চোখেমুখে। রুমে নরম আলো জ্বলছে, বিছানায় শুয়ে আছে আরমান। চোখ বন্ধ, মুখে হালকা শ্বাসের ওঠানামা… পাশে বসে আছে জারা, দু’হাত চেপে ধরে রেখেছে আরমানের হাত। তার চোখ লাল, ভ্রু কুঁচকে আছে, যেন এক পলকে ভেঙে পড়বে। চুলের ভেজা গোছা কানে আটকে আছে, অল্প উদ্বিগ্নতায় মুখটা আরও ফ্যাকাশে হয়ে দেখা যাচ্ছে।
তার পাশে বসে আনিছুর রহমান, আর মারজিয়া বেগম। ফারিয়া বেগম মাত্র নিচে গেছেন খাবার নিয়ে আসতে—কোনো মা-ই তো বৌমাকে না খাইয়ে রাখবেন না, ছেলের অবস্থা যাই হোক।
জারা বারবার আরমানের মুখের দিকে তাকাচ্ছে জারা ফিসফিস করে বলে“দয়া করে জাগুন স্বামীজান… আমি ভয় পাচ্ছি, স্বামীজান…”
মারজিয়া বেগম তার মাথায় হাত রেখে আদর করলেন।

__ “চিন্তা করিস না মা,ওর কিচ্ছু হইবে না।”
তবুও মনকে শান্ত করা যাচ্ছে না জারার। যত রাত বাড়ে, ভয়টা যেন আরও তীক্ষ্ণ হয়।জারা চুপচাপ শুধু তাকিয়ে আছে আরমানের মুখের দিকে। নিঃশ্বাসে টান লেগে আছে যেন। দু’মিনিট পরপর চোখে পানি এসে জমে ওঠে। হাতটা বুকে চেপে ধরা—যেন শক্ত করে ধরলে কিছু হয়ে যাবে না।
হঠাৎ… “শশুড় আব্বা গো..!”
হঠাৎ অন্ধকার চিরে ভেসে উঠলো আরমানের ভয়ানক চিৎকার
—“ওওও..শশুড় আব্বা…আপনি কোথায়!”
হঠাৎ অপ্রত্যাশিত! আরমান শুয়ে থাকা অবস্থাতেই হঠাৎ করে উঠে চিৎকার দিয়ে বলে
—“শশুড় আব্বাаaaaа…!”
ঘরে থাকা তিনজন স্থির থাকা মানে ছাই! জারা সরে গিয়ে প্রায় পিছনে পড়ে যায়। আনিছুর রহমানও কেঁপে উঠে। মারজিয়া বেগমের হাতে থাকা পানির গ্লাস ছিটকে পড়ে মেঝেতে।
বিছানায় হঠাৎ উঠে বসে আরমান। তার চোখ আধখোলা, কিন্তু মুখে এমন হাসি যেন চাঁদ দেখেছে!
সে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে আনিছুর রহমানের কাছে।
দুই হাতে টাক মাথায় হাত বুলিয়ে, টুপ টুপ করে কয়েকটা চুমু দিলো!
আরমান উঠে বসতে না বসতেই গলা ঠিক করে তাঁর শশুড়ের টাক মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়

—“এই টাক মাথাটা কত ভাগ্যবান লাগে শশুড় আব্বা! আমার জন্য আপনি যে পরী জন্ম দিয়েছেন— আমি চুম্মা দিলে কম হয়! আর আমার মতো মেয়ের জামাই পেয়ে আপনি কী বলেন? চুম্মা নিবেন? না দিবেন?দিলেও বিন না কারণ আমাকে শুধু আমার বউ চুম্মা দিব।”
বলেই টুপ টুপ করে অগুণিত চুমু লাগিয়ে দিলো মাথায়!জারা, মারজিয়া বেগম—দুইজনই মুখ হাঁ করে তাকিয়ে আছে। জারা আর মারজিয়া বেগম দম বন্ধ হয়ে গেলো।আনিছুর রহমানের চোখ বড় বড়, মুখ লাল। জারা মাথায় হাত দিয়ে বলে
__ “এটা কি সত্যি? নাহ কি দুঃস্বপ্ন?”
এদিকে আনিছুর রহমান সম্পূর্ণ রেগে গিয়ে হাত ঝাড়া দিলেন।
__ “বেয়াদব! আমারে চুমু মারার জিনিস মনে হইছে? ওঠ, ওঠ! ছাড়ো আমাকে!”
আরমান কিন্তু বসেই আছে, যেন কিছুই হয়নি।
আরমান হাসতে হাসতে বলে

__“কেনো শশুড় আব্বা, রাগ করেন কেন? জামাই যখন এতো ফিট —চুম্মায় ট্যাক্স লাগে নাকি?”
মারজিয়া বেগম মুখ ঢেকে হাসছেন, কিন্তু লুকোতে পারছেন না।
__ “হাইরে! ছেলে জ্ঞান হারিয়ে মাথা নষ্ট করে ফেলেছে?”
জারা একদম থ বনে।জারা মনে মনে বলে: লোকটা কি পাগল হয়ে গেল?
আরমান এবার জারার দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভাবে চোখ বড় বড় করে বলে
__ “ বউ তুই আমার সাথে বেইমানী করেছিস।আমি তোকে বলছিলাম ব্লক পরতে.. আর তুই লাল পরে আমাকে কবরে পাঠানোর প্ল্যান করলি? কেন? আমার হার্টের বেগ বাড়ানোর জন্য? বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট করাইতে চাইতেছিস?যদি আমার ইন্জ্ঞিন নষ্ট হয়ে যেতো সবার সামনে?”
জারা লজ্জায় গলা বুজে গেল।তাড়াতাড়ি এসে আরমানের মুখ চেপে ধরে। শশুড় শাশুড়ীর সামনে কেমন লাগাম ছাড়া কথা বলছে। আরমান জারাকে ছাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। জারা আরমানের কোলে। ছটপট করছে উঠার জন্য। বাপ মার সামনে এসব কী করছে লোকটা।লজ্জা পাচ্ছ তো আবার অনেক রাগ হচ্ছে।
আনিছুর রহমান বিরক্তির চূড়ায় উঠে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।

__“এ ছেলের সাথে বিশ্বাস নাই। কখন এসে চুমু দিতে থাকে কে জানে? তার কাছ থেকে দূরে থাকাই ভালো ।”
মারজিয়া বেগমও চলে গেলেন, কিন্তু হেসেই।
__“তোরা দুইজন থাক তাহলে ।”
রুমে শুধু আরমান আর জারা।এক মুহূর্তে পরিবেশ শান্ত। জারা নিচে তাকিয়ে আছে।
__ “আপনার লজ্জা কী পানির সাথে বেসে গেছে? ”
আরমান কপাল কুঁচকে বলে
__“ কেনো?”
__“আপনি আব্বুর সাথে এমন করলেন কেনো?আর এতো লাগাম ছাড়া কথা কে বলে? ”
আরমান দুহাত উচু করে হাই তুলে বলে

__“আমি বলি!এখন কাছে আসো! তোমার চিকস কোমড় বের হয়ে আছে ডেকে দেই!”
আরমানের কথা শুনে জারা তাড়াতাড়ি করে নিজের কোমড়ের দিকে তাকায়। দেখে শাড়ি সরে গিয়ে পেট দেখা যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি শাড়ি টেনে ডেকে নেয় জারা। বড় বড় চোখ করে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলে
__“ডেকে দেওয়ার জন্য ডাকছেন না-কি খুলার জন্য? অসম্ভব লোক? ”
আরমান বাঁকা চোখে জারা’র দিকে তাকায়। ঠোঁটে তার দুষ্ট হাসি। খপ করে জারার হাত ধরে নিজের বুকে আগলে নেয়। জারা থ মেরে যায়।আরমান জারার কোমড় পেচিয়ে ধরে বলে
__“খুলার কথা ভুলে গিয়েছিলাম তুমি মনে করিয়ে দিয়েছো।এখন তুমি বলো আমার কি করা উচিত? ”
জারা আরমানের বুকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরে আসতে আসতে বেল
__“ কিছু করতে হাবে না বাজে লোক। মাথায় সব সময় আজেবাজে চিন্তা! ”
জারা দূরে সরে এসে মাথা নিচু করে রাখে। কোনো কথা বলে না। আরমান হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া জারা’র দিকে তাকায়।
__“কী হয়েছে লক্ষী বউ? মুখটা এমন লাগছে কেনো?চোখ লাল? কান্না করেছিলে?”
জারা তবুও উত্তর দেয় না। চোখ তার ধীরে ধীরে লাল হয়ে আসচ্ছে। হয়তো কান্না থামানোর চেষ্টা। আরমান বিছানা থেকে উঠে এসে জারা’র সামনে দাঁড়ায়।ওর দুগাল নিজের হাতের মাঝে নিয়ে জারা’র ঠোঁটে চুমু খায় আলতু করে।

__“কী হয়েছে বউ? ”
আরমানের এমন নরম সুরে জারা আবেগে ভেসে ওঠে। ছলছল চোখে তাকিয়ে বলে
__“আপনার পরে দেখে ভয় পেয়েছিলাম খুব স্বামীজান… আমি ভেবেছি… কিছু হয়ে গেছে।”
আরমান ধীরে ধীরে তার চিবুকটা তুলে তাকাতে বাধ্য করল।আরমান গভীর গলায় বলে
__ “ভয়ের থেকে বড় ভয় হচ্ছে তুমি লাল শাড়িতে লক্ষী বউ … আমার জ্ঞান হারাইছে, আমি না বউ?”
জারা লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল।
__“এত টিজ করবেন না… আমি সত্যি ভয় পেয়েছি।”
আরমান তার হাত নিজের বুকে রাখল।
___“এখনো ভীত? ঠিক আছে, আসো ভয় নামাই দেই—আসো.. বুকে আসো আমার লক্ষী বউ ।”
জারা আগে সরতে চাইল।

__“ না… কেউ এসে পরবে, দরজা আধখোলা ।”
আরমান পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে
— “আসুক। আজকে আমি তোমার ভয় নামিয়ে তারপর ছাড়ব সোনা..!”
জারা দুই পা পিছিয়ে গিয়ে বলে
__“বিশ্বাস করুন আমি ভয় পাইনি স্বামীজান! ”
আরমান জারাকে আবারও নিজের কাছে এনে বসুকে সাথে মিশে নিয়ে বলে
_“তার মানে আমার অবস্থা দেখে তুমি ভয় পাও নি?”
জারা পরলো এবার মহা বিপদে। আরমানের বুকের সাথে মিশে কাচুমাচু করছে। আরমান এক হাত দিয়ে ওর চুল সরিয়ে গালে, ঘাড়ে স্পর্শ করে। জারা শিউরে ওঠে।জারা মৃদু গলায়
__“ছাড়ুন… প্লিজ…”
__ “ না। যতক্ষণ না তুমি বলো তুমি আমাকে হারাবার ভয় পেয়েছো, ততক্ষণ ছাড়া পাবে না।।”
জারা চোখ নামিয়ে ফুপিয়ে ওঠে
— “হ্যাঁ! ভয় পেয়েছি। আপনি পরে যাওয়া দেখে আমার রুহু অব্দি কেঁপে ওঠেছিলো।কলিজায় কামড় লাগে.. আমি ভাবছিলাম, আমি হারিয়ে ফেললাম আপনাকে…”
আরমান তার কাঁধে মাথা রাখে, নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়—আরমান গম্ভীর, নরম গলায় বলে

__ “তখন কি মনে হচ্ছিল?”
__ “আপনি ছাড়া আমি কিছু না… আপনার সাথে আমার নিশ্বাস বাধা স্বামীজান। আপনার কিছু হলে আমার নিশ্বাস এক সেকেন্ড ও থাকবে না।”
আরমান তার চোখের জল মুছিয়ে দেয়
— “তো, এখন কি করব জানো? লাল শাড়ির জন্য তোমার শাস্তি আছে।”
জারা অবাক হয়ে বলে—“কি শাস্তি?”
আরমান তার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বলে
—“এইটা।”
বলে ঠোঁট আকড়ে ধরে নেয়। জারা কয়েকবার উমম উমম করে ছাড়াতে চাইলেও শক্ত করে আটকে রাখল। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শ্বাস কাঁপছে, দু’হাত আরমানের কাঁধে।ঠিক তখন—ঠক ঠক ঠক!!!
দরজায় নক! দুজনে লাফ দিয়ে সরে যায়!
ফারিয়া বেগম বাইরে থেকে বলেন

__“জারা মা, খাবার এনেছি, দরজা খোলা থাকলে ঢুকতাম!”
জারা পুরো লাল হয়ে গেছে। আরমান ঠোঁট কামড়াচ্ছে—আর ফিসফিস করছে__ “ কী টাইমিং আম্মুর! একটু পরে আসলে কী হতো? হায় বা*লে ভাগ্য…”
জারা লজ্জা-মায়া সব নিয়ে তাকাল
— “চুপ করুন।”
দরজা খুলতেই ফারিয়া বেগম ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে—
ফারিয়া বেগম হাসিমুখে, তবে সন্দেহ নিয়ে বলেন
__“কী হয়েছে? দরজা এত দেরি করে খুললি কেন?”
জারা হকচকিয়ে উঠে,
— “না… মানে… আমি পানি খাচ্ছিলাম—তাই”
আরমান মাঝেই বলে উঠল
—“আমরা দু’জনই জাতীয় আলোচনা করছিলাম।”
ফারিয়া বেগম ভুরু তুললেন
—“জাতীয় আলোচনা? মানে…”
__“ হ্যাঁ! আমি আর মানজারা মিলে কীভাবে দেশের একটা জাতি বারানো যায় সেটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম..!”
আরমানের কথা শুনে জারা শাড়ির আচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। ফারিয়া বেগম বোঝলেন ছেলের কথা। কতক্ষণ তাকিয়ে থাকে ছেলের মুখের দিকে তবুও বোঝতে পারে না।

__“শুধু আলোচনা..? ”
আরমান মাথা চুলকে বলে
__“ না প্যাক্টুকাল করছিলাম, কিন্তু তুমি এসে বাঁধা দিলে আম্মু..! ”
আরমান আরও বলতে চাইছিলো। কিন্তু তিনি এবার ছেলের কথার মানে বোঝে যায়। তাউ কথা শেষ না করে তিনি ট্রে এগিয়ে দিয়ে বললেন
—“জারা, আগে খেয়ে নে, পরে তোরা যত আলোচনা করার কর।”
বলেই বের হয়ে দরজা বন্ধ করলেন, কিন্তু মুখের কোণে টিপে রাখা হাসি লুকাতে পারলেন না।
জারা আরমানকে কড়া চোখে দেখল
— “আপনার দৌরাত্ম্য দেখেছেন?মন চায় আপনার মুখ বেধে রাখি।কি সব কথা বার্তা? ”
আরমান দরজার কাছে গিয়ে আগে দরজা বন্ধ করে। তারপর জারা’র কাছে এসে ওর কোমড় জরিয়ে ধরে বলে
__“মুখ বেধে কি হবে?যেখানে মন শুধু তোমার আকাশে উড়ে..! ”
জারা আরমানকে ঠেলে দিয়ে বলে
__“নাটক বাদ দিয়ে খাবার খান। কাজে আসবে।!”
__“তোমার হাতেই খাব।”
__ “আনুসঙ্গিক শর্ত নাই?”
আরমান চোখ টিপে বলে

__“শর্ত আছে—একটা চুমু।”
জারা চপ্পল দিয়ে মেরে বসবে এমন চোখে তাকাল
—“খাইবেন নাকি রোজা রাখবেন?”
আরমান দু’হাত জোড় করে বলে
—“লক্ষী বউ, খাওয়াও।”
জারা হেসে ফেলল। অবশেষে সে আরমানকে খাওয়াতে লাগল—প্রত্যেকটা লুখমায় যেন তার ভয় গলে গিয়ে ভালবাসা হয়ে উঠছে।
বাইরে চাঁদ উঠেছে, কিন্তু রুমের আলোয় দুজনের মুখ লাল হয়ে আছে—ভয় থেকে, লজ্জা থেকে, আর… ভালবাসা থেকে।খাওয়া শেষ। পুরা রুমে খাবারের মিষ্টি গন্ধ ভাসছে, আর সেই সাথে জারার গায়ে ভেসে বেড়াচ্ছে আতরের হালকা সুবাস। আরমান বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে, চোখ আধো বন্ধ, ঠোঁটে আধো হাসি। জারা প্লেটগুলো এক হাতে তুলে নেয়।
__“আমি এগুলো নিচে রেখে আসছি। আপনি শুয়ে থাকুন।”
__ “আমি তোমার ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকছি।”
জারা কিছু না বলে বের হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে। এসে দেখল—আরমান যেন কোথাও ডুবে আছে। বেডের এক কোণায় বসে, চাদর গাঢ় করে জড়িয়ে, নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
জারা চুলের খোঁপা টাইট করতে করতে নরম স্বরে বলে

— “কি দেখছেন? শুয়ে পড়ুন, আমি লাইট অফ করে আসছি।”
কিন্তু আরমানের দৃষ্টি অন্যদিকে, সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকে—জারার সরু কোমর, শাড়ির নিচে চিকন লাইন, হাঁটার সাথে সাথে হালকা নাচছে। জারা বুঝতেই পারে না, তার পিঠের নিচের অংশ, কোমর, পেট—সব শাড়ির সাথে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। জারা আবার বলে
—“কি হলো? শুয়ে পড়ুন না!”
আরমান হঠাৎ নাটকীয়ভাবে হাত তুলে উঁচু স্বরে বলে
~~“তুমি দিও নাগো বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া
আমি বন্ধ ঘরে অন্ধকারে যাবো মরিয়া…
জারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে,জারা প্রথমে বোঝেনি, পরে বুঝে নিজের হাসি আটকে রাখতে কষ্ট হয়। লোকটা বালিশ দিয়ে মুখ চাপা দিয়ে গেয়ে যাচ্ছে, যেন তাকে কেউ রেকর্ড করছে। আর তার ইজ্জত হরন করবে কেউ।
আরমান একফোঁটা চোখ বের করে দেখে, জারা শুনছে কি না। জারা মুখ ঘুরিয়ে রাখে, যেন শুনছে না। সে ভেবে নেয়—”বউ হয়তো খুশি হয়নি?”— তাই এবার আরও নাটকীয় সুরে গাইতে শুরু করে

~~তুমি দিও নাগো বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া
আমি বন্ধ ঘরে অন্ধকারে যাবো মরিয়া…
জারা এবার থামতে পারে না, হাসতে হাসতে হাত দিয়ে মুখ চেপে রাখে। কিন্তু সে হাসলেই তো আরমানের সাহস বেড়ে যায়! বালিশ সরিয়ে এক লাফে একটু দূরে সরে গিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে বসে যদিও কিছুই বলা হলো না, শুধু মুখভঙ্গি আর হাত নেড়ে অভিনয়। ভয়ে পিছনে যাওয়ার ভান, লজ্জায় চোখ ঢাকার ভান, আবার লুকিয়ে দেখে নেওয়া—সবই চলছে।
হঠাৎ আবার নিজের বুক চেপে ধরে, যেন হৃদয় কাঁপছে—অভিনয়টা এতটাই সিরিয়াস যে মনে হয় সত্যি ভয় পেয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে বালিশে মুখ লুকিয়ে পড়ে, যেন লজ্জা পেয়ে মারা গেছে।
জারা আর সহ্য করতে পারে না। হেসেই গড়িয়ে পড়ে। শাড়ির আঁচল মুখে দিয়ে হাসি আটকাতে চেষ্টা করে।শাড়ির আঁচল ঘুরাতে ঘুরাতে আরমানের দিকে এগিয়ে আসে। আরমান জারাকে এগিয়ে আসতে দেখে বলে

__“একদম আমার কাছে আসবে না। আমার শরীর শুধু আমার লক্ষী বউয়ের, আর কারো না। ”
জারা এসে বিছানায় বসে পরে। বেড কেঁপে ওঠে তার হাসিতে। আরমান সেটা দেখে আরও ভয় পাওয়ার ভান করে বেডের কোণায় গিয়ে বসে, দুই হাত দিয়ে কাঁধ জড়িয়ে ঠান্ডায় কাঁপা অভিনয়।
জারা এবার হাত বাড়িয়ে তার আঙুলে আলতো ছোঁয়া লাগালেই, আরমান লাফ দিয়ে পিছিয়ে যায়—যেন কারেন্ট খেয়েছে!
নীরবতা, নাটক, হাসি—সব মিলিয়ে এ দু’জনের রাত হয়ে ওঠে সবচেয়ে মজার, সবচেয়ে মিষ্টি। কোনো বাড়াবাড়ি নেই, কোনো কথার প্রয়োজন নেই—শুধু হাসি আর লজ্জা, একটু ভয় আর গানের নরম সুরে ভরা।জারা হাসতে হাসতে বলে
__ “অরে বাবা, এত নাটক! আপনারে নাটক ঘরের চেয়ারম্যান বানাই দিতে হবে।”
হাসতে হাসতে সে আরমানের দিকে হাঁটে। আরমান ভান করে ভয় পাচ্ছে। আরমান পিছিয়ে গিয়ে বলে
__“না না! এত সুন্দরী রমনী কাছে আসলে আমার হার্ট জোরে বাজবে!”
__ “সুন্দরী রমনী! আমি?”
__ “নয় তো কি! পাশের বাসার মুন্নি?”
এইবার জারা বালিশ ছুঁড়ে মারতে যায়।

__ “আপনি মজা নিচ্ছেন? ফাজিল লোক ”
আরমান হাসতে হাসতে বালিশ ধরে ফেলে
__“মজা নয়, সত্যি। তুমি আসলেই বিপজ্জনক।”
জারা চোখ টিপে হাসতে হাসতে বলে
~~তুমি ভয় কেন পাও
প্রাণ সজনী আমায় দেখিয়া
তোমায় প্রেম সোহাগে রাখব
আমার বুকে জড়ায়া..!”
দুজনেই এই কথার পর এমনভাবে হাসে যে বিছানায় গড়াগড়ি খেতে থাকে। হাসির মাঝে হঠাৎ আরমান জারা’র হাত ধরে টেনে নেয়। টুপ… টুপ… করে জারার গালের দুই পাশে চুমু দেয় পাঞ্চাশ ষাটের এর মতো। জারা লজ্জায় আধা চোখ নামিয়ে ফেলে, তবু হাসি থামে না।
জারা লজ্জা পায় কিন্তু ঠোঁটের কোন থেকে হাসি সরে না।
__ “এইভাবে কেউ কিস দেয়?”
__ “তুমি হাসলে কন্ট্রোল থাকে না রানী সাহেবা! ”
জারা চোখ নামিয়ে শাড়ি ঠিক করতে থাকে। কিন্তু আরমান এবার কোমরে হাত রাখল—আঁট করে। কোমর এমনিতেই চিকন, শাড়ির নিচে আরমানের আঙুলের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। জারার শরীরে কাঁপুনি দৌড়াল।
জারা চোখ মুখ কুঁচকে বলে

__“এইটা কি ধরার ধরন?”
আরমান খুঁটিনাটি হাসি দিয়ে বলে
__ “তোমার কোমর যদি এমন সুন্দর হয়, ধরব না তো কি? ছুটিতে পাঠাবো?”
জারা তার হাত সরাতে চাইল
—“আপনি চুপ করেন। লজ্জায় দিবেন না।”
__ “হুমম? লজ্জা লাগতেছে? তাহলে আমার ডায়াগনোসিস ঠিক—তুমি আজ লাল-লাল ফুসকুড়ি দিবা।”
__ “ফুসকুড়ি আবার কি?”
আরমান কোমরে হাত আরও শক্ত করে দরে।জারা র মুখে ফু দিয়ে বলে
__ “লজ্জার ফুসকুড়ি—গাল লাল, চোখ লাল, ঠোঁট কামড়ানো…”
আরমানের বলার সাথে সাথে জারা ঠোঁট কামড়েই ফেলল! আরমান ফিসফিস করে
— “দেখলে? শুরু হইছে।”
জারা এবার বালিশ দিয়ে তাকে মারতে গেল
— “আপনার এত বাজে কথা বলেন কীভাবে ! শান্তভাবে থাকতে পারেন না!”
আরমান বালিশ ধরে বলে

__ “শান্ত? তোমার পাশে? অসম্ভব!”
এইবার সে জারার হাত নিজের হাতে জাপটে ধরে টেনে একেবারে কাছে বসিয়ে নিল। জারা সরে যেতে চাইলেও আরমান কোমর জড়িয়ে রাখল। মাথা একদম কানের কাছে নিয়ে বলে
— “জারা, তুমি কি জানো? আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কি?”
__“না। কি?”
__ “তোমার এই গোলাপি ঠোঁট, কোমর। চিকন। শাড়িতে দেখলে মনে হয় জড়াইয়া ঘুমাই।”
জারা চোখ বন্ধ করে, একটা শ্বাস নিয়ে বলে
— “এত টিজ করলে আমি অন্য রুমে চলে যাবো
কিন্তু ।”
__ “রাগ করে না বউ! রাগ করলে যামো কি হবে? ঠোঁট ফুলে যাবে। আমি তো সেইটা পছন্দ করি আরও বেশি।”
জারা চোখ বড় বড় করে— “আপনি একদম অসভ্য!”
আরমান হাসি দিয়ে বলে
__ “সিভিলাইজড রোমান্টিক বলো।”
জারা ধীরে ধীরে তার পাশে মাথা রেখে বলে

— “একটা কথা বলি?”
আরমান চুলে আদর করে বলে
__“বলো।”
__ “আজ যখন পরে গেলেন আপনি… তখন আমি কান্না না করে যদি দোয়া করতাম, আপনার জ্ঞান যেনো না ফিরে তাহলে ভালো হতো। ”
আরমান হাত থামিয়ে দিয়ে বলে
__“ তার মানে তুমি আমার মরে যাওয়ার চিন্তা করছিলে..?”
আরমানের কথা শুনে জারা বুক কেঁপে ওঠে। চিনচিন ব্যথা শুরু হয় বুকের মাঝে। সে তো মজাট ছলে কথাটা বলেছে।আর লোকটা কি কথা বলছে।জারা আরমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে
__“ আপনার মরে যাওয়ার কথা চিন্তা করার আগে আল্লাহ আমায় তার কাছে নিয়ে নিক! আমিন.!
আরমান তাকে বুকে শক্ত করে ধরে
—“ মানজারা! এসব বলে না। তুমি বেঁচে আছো বলেই আমি বেঁচে আছি।”
তারা কিছুক্ষণ একে অপরের নীরবতায় থাকে। ঘরের আলো কমে, চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে বিছানায় পড়ে। জারা ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ে, আরমান তার হাত ধরে রাখে।
জারা চোখ বন্ধ করে বলে

__ “এখন লাইট অফ করবেন?”
__ “না।”
__ “কেন?”
আরমান ধীরে ধীরে জারার মুখের দিকে তাকায়। একটু চুপ করে, যেনো তার চোখ দিয়ে কিছু বলা দরকার। তারপর নরম গলায় বলে—
___“তোমাকে দেখা যেনো কখনো শেষ না হয় মানজারা… সত্যি, চোখের সামনে এমন একটা মানুষ থাকলে বারবার তাকাতে ইচ্ছে করে। তুমি হাসো, আমি দেখি… তুমি চুপ থাকো, তবুও তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে। যেনো তোমার ভেতরে লুকানো আরেকটা পৃথিবী আছে, আর আমি দিন–রাত ধরে শুধু সেটা খুঁজে যেতে চাই।”
জারা একটু অবাক হয়, নিজের শাড়ির ঠিক করতে থাকা হাত থেমে যায়। আরমান মৃদু হাসে, এগিয়ে এসে বলে—

__“জীবনে কত মুখ দেখেছি, কত মানুষ পাশ দিয়ে গেছে… কিন্তু কাউকে দেখে বুকের ভেতর এমন ঝড় উঠেনি কখনো।যা তোমাকে দেখে হয়েছিল। তোমাকে দেখে মনে হয়, আমার দুনিয়া এতদিন অসম্পূর্ণ ছিলো। তোমাকে দেখেই সম্পূর্ণ হলো।”
তার চোখে এক ধরনের অদ্ভুত কোমল আলো। যেনো কথাগুলো শুধু মুখে নয়, হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসছে। জারা কিছু বলতে পারে না, শুধু তাকিয়ে থাকে। আরমান আবার হাসে—
__“তুমি পাশে থাকলে আমি বাঁচতে পারি। আর তোমাকে দেখে বেঁচে ওঠার এই অনুভূতি… এটা যেনো চিরকাল থাকুক। তোমাকে দেখা… কখনো যেনো শেষ না হয়, মানজারা। কখনো না।”
জারা আর কিছু বলতে পারে না। শুধু তার হাতটা চাপা দিয়ে শুয়ে থাকে। আরমান মুখে হাসি নিয়ে তাকিয়ে থাকে—এই রাত, এই প্রেম, এই লজ্জা—সব মিলিয়ে তার পৃথিবী হয়ে গেছে জারা।রাতটা ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যায়। কিন্তু তাদের হৃদয়ে আজ অনেক শব্দ—ভালবাসার, হাসির, টিজের, আর কোমলের…

সকালের রোদটা আজ যেনো বাড়ির উঠোনেও ঠিকমতো আলো দিতে চাইছে না। ইসলামপুর গ্রামের দিকে যাওয়ার জন্য জারা–র বাবা-মা প্রস্তুত। অথচ বাড়িটার প্রতিটি মানুষ আজ ভারী হয়ে আছে। যেনো আনন্দের সেই বিয়েটা শেষ হতেই ঘরে হঠাৎ নিস্তব্ধ কষ্ট নেমে এসেছে।
জারা দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখছিলো। ছোট একটা চা–টেবিলে বসে আনিছুর রহমান কাগজপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। মারজিয়া বেগম তাঁর চাদর ঠিক করছেন। ঘর থেকে ঘরে হাঁটছেন যেনো কিছু ভুলে গেছেন কিনা যাচাই করতে। জারা বারবার তার চোখ মুছছে, কিন্তু চোখ ভেজা থেকে যাচ্ছে। আজ ওদের চলে যাওয়ার দিন বলে কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না।

জাহির ব্যাগগুলো গাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে। জোহান চুপচাপ আরমানের কোলে বসে আছে। স্বভাবসিদ্ধ চঞ্চলতা আজ কোথাও নেই। ছেলেটা ঠোঁট কামড়ে বসে আছে, যেনো তার ছোট্ট মনে হঠাৎ অনেক বড় একটা শূন্যতা তৈরি হয়ে গেছে।
ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম, ফিহা, মিম, জিনিয়া—সকলের মুখে ম্লান বিষণ্ণতা। বাড়িতে যে প্রাণের হুল্লোড় গত কয়েকদিন ধরে চলছিলো, আজ যেনো তা নেই। সবাই নিঃশব্দ।
জারা ধীরে ধীরে গিয়ে বাবার পাশে বসে, তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরে। সেই স্পর্শে জারা ফুঁপিয়ে ওঠে।
— “আব্বু… এখনই চলে যাবে?”
আনিছুর রহমান মেয়ের মাথায় হাত রেখে স্নেহভরা স্বরে বলেন—
— “মা, সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না। এখন না বের হলে রাত হয়ে যাবে। তাই দেরি করলে কষ্ট হবে।”
জারার বুকটা ভারী হয়ে ওঠে। তার কান্নার শব্দ ছোট্ট বাচ্চার মতন বেরিয়ে আসে। সে বাবার কাঁধে মুখ লুকিয়ে দেয়। মুহূর্তেই মারজিয়া বেগম এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করে।

— “চুপ,… আর কান্না না। আমরা আবার আসব। এমন করে ধরে ধরে কান্না করলে কেউ যেতে পারবে নাকি?”
জারা শোনে, কিন্তু কান্না থামাতে পারে না। তার ভেজা গলা কাঁপতে থাকে—
— “তোমরা চলে গেলে আমি… আমি খুব একা হয়ে যাবো আম্মু…”
মা মেয়ের গালে হাত রেখে ছোট্ট করে হাসেন।
— “তুই আর একা? তোর স্বামী আছে, তার পরিবার আছে। তুই তো এখন অন্য একটা ঘরের নিজের মানুষ, বুঝলি?”
এ কথায় জারা মাথা নিচু করে দেয়। যেনো নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে। মিম এসে জারার পাশে বসে তার হাত চেপে ধরে।
— “জানু, কাঁদিস না প্লিজ। আমরা আছি, না?”
ফিহা, জিনিয়া এসে তাকে ঘিরে বসে, কেউ মুখ গোমড়া করে, কেউ জারাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু চোখে সবারই পানি।
এদিকে জাহির শেষ ব্যাগটা গাড়িতে রেখে ফিরে আসে। তার চেহারার সেই কৌতুকপূর্ণ হাসি নেই। আজ ভাই হিসেবে তার হৃদয়ও ভারী। বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে সে সোজা জারার দিকে তাকায়—

— “চলো, আম্মু এখন বের হতে হবে।”
এই ডাকেই যেনো আবার কান্নার ঢেউ থেমে থাকা চোখে ফিরে আসে। জারা উঠে দাঁড়ায়, কাঁপতে কাঁপতে বাইরে আসে। সবাই গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। জারা এবার ভাইয়ের দিকে তাকায়, চোখের জল লুকাতে সে মাথা নিচু করে ফেলে। জাহির এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। সে একটা চাপা হাসি এনে নরম স্বরে বলে—
— “আমার বুড়ি এখন আর বুড়ি না… এখন সংসার—ঘরবাড়ি সব আছে তার।”
জারার কান্না বেড়ে যায়। ভাইয়ের কথা শেষ হতে চায় না—
— “এতদিন আমাদের ঘর তুই পূর্ণ করেছিলি। এখন আরমান ভাইয়ের বাড়ি পূর্ণ কর। ওর মা–বাবা যেমন আমাদের বাবা–মা, তুইও এখানে সবার। কষ্ট হলে ফোন দিবি… শুধু কান্না কর‍বি না। কান্না করলে আম্মু টেনশন করবে।”
তার চোখ দুটোও লাল হয়ে ওঠে। সে চোখে পানি আটকে বলে—

— “আরমান ভাই, আমার বোন কিন্তু অনেক আদরের। দয়া করে ওকে দেখে রাখবেন। ও রেগে গেলে একটু মাথা গরম থাকবে, কিন্তু… ভেতরে খুব নরম।”
আরমান একটু হালকা হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
— “সে আমার দায়িত্ব, আমরাই রাখব তাকে। তুমি নিশ্চিন্তে যাও।”
জাহির আর কিছু বলতে পারে না। শুধু জারার মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হাতটা আস্তে করে সরিয়ে গাড়িতে উঠে বসে।ঠিক তখন পেছন থেকে রোহানের ডাক—
— “এই ব্যাটা! আমাদের কথা ভুলে যেও না…”
জাহির জানালা নামায়। রোহান মুখে হাসি লাগাতে চেষ্টা করে, কিন্তু চোখে কেমন ভেজা জলচাপা কষ্ট।
রাশেদ দুই হাত কোমরে রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে—
— “বুঝলে, আবার আসতে হবে কিন্তু। এবার তো আমাদের বাড়িতে যাও নি। আবার আসলে জোর করে হলেও নিয়ে যাব।”
জাহির হাসে, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা চেপে আসে।
জাহেদ দুই হাত জোড় করে বলে—

— “জাহির ভাই, এতো ভাগোড়ার মতো যাচ্ছো ক্যান? আর দুই দিন থেকে গেলে কী হতো!”
ফারিয়া বেগম হাত তুলে বলেন
— “ যাএা পথে বাঁধা দেয় না জাহেদ। ওদের যেতে দে।”
মা, বাবা,জোহান, জাহির—চারজনই গাড়িতে বসলে জারা আবার দৌড়ে গিয়ে বাবার হাত ধরে।
— “আব্বু, প্লিজ সাবধানে যাবে।বাড়ি গিয়ে ফোল দিবে।”
আনিছুর রহমান তার চোখ মুছিয়ে মুখে মায়াবী হাসি এনে বলেন—
— “ আচ্ছা মা! তুই এখানে সুখে থাক, এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় জিনিস।”
গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে শুরু করলে, জারা আর থাকতে পারে না। উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করে। তার কান্না শুনে জোহানও কাঁদতে শুরু করে। বুড়ো, ছোট্ট, সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ে। গাড়ি গেটের বাইরে চলে যায়।
জারা সেই গেটের দিকে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ না গাড়িটা চোখের সামনে ছোট একটা বিন্দু হয়ে অদৃশ্য হয়। তার শরীর কাঁপছে। ফাটল ধরা গলার শব্দে সে শুধু বলে—

— “ওরা চলে গেলো…”
সাথে সাথে আরমান এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখে, আর অন্য হাতে তার কান্না ভেজা মুখটা তুলে।
— “তুমি শক্ত হও মানজারা। তোমার মা–বাবা চায়, তুমি এই ঘরে হাসি খুশি থাকো।”
জারা কিছুই বলতে পারে না। শুধু মাথা নেড়ে কান্না থামাতে চেষ্টা করে। জিনিয়া এসে জারার হাত নিজের হাতে নেয়, আর মিম হালকা স্বরে বলে—
— “চলো, আমরা একটু রুমে যাই। ওরা তো আবার আসবে।”
ফিহা হাসার চেষ্টা করে—
— “তুই যদি এই ভাবে কান্না করিস, তাহলে রুমইটা ভেসেই যাবে তোর চোখের পানি দিয়ে ।”
জারা একটু হেসে ফেলে, কান্নার মাঝেও। সবাই তাকে ঘিরে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের দিকে হাঁটে। শোকের মধ্যে এক ধরনের ভালোবাসার উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে।
আরমান চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখে। তার মনে আজ স্পষ্ট হয়—এই মেয়েকে শুধু স্বামী হিসেবে নয়, এক শক্তির মতো পাশে থাকতে হবে। যেভাবে আজ সে পরিবার হারানোর অনুভূতি করছে, পরদিন আনন্দও সেখানেই খুঁজে নেবে।

আরমান মনে মনে বলে—“এই ঘরকে আজ থেকে আরও নিজের বাড়ি মনে করো, মানজারা। তোমার হাসি দিয়ে এই ঘর ভরে ওঠুক… এমনটাই চাই।”
গাড়িটা আস্তে আস্তে গেট পার হয়ে দূরে চলে যেতে থাকে। চোখের আড়ালে যখন বাড়িটা ছোট হয়ে যেতে থাকে, জাহিরের বুক ফাঁকা হয়ে ওঠে। হঠাৎ মনে পড়ে—ছায়মা। সেই মেয়েটা, যাকে সে কখনো ঠিক করে কিছু বলতে পারেনি। সব সময় দূরে ঠেলে দিয়েছে পাষানের মতো। যে তাকে বার বার মনের কথা গুলো সব স্পষ্ট ভাবে বলে ছিলো। আর সে তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। নিজের মনে পাথড় বেঁধে রাখে। নিয়ে অনুভূতি গুলো প্রকাশ করে না।সে হয়তো এখন জানেই না—জাহির আজ এই ময়মনসিংহ শহর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
গাড়ির কাঁচের পাশে মাথা ঠেকিয়ে সে আকাশের দিকে তাকায়। গাছগুলো পাশ দিয়ে পেছনে চলে যাচ্ছে, রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলো একে একে অদৃশ্য হচ্ছে, কিন্তু স্মৃতিগুলো যেনো এক জেদি হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
ছায়মা কি জানে?জাহির আজ চলে যাচ্ছে? সে কি আদৌ কখনো তার চলে যাওয়াকে গুরুত্ব দেবে?হয় তো না। জাহির ওকে যে পরিমাণ কষ্ট দিয়েছে। তার পর মনে হয় না তাকে আর মনে রাখবে মেয়ে টা। আর জাহির তো তাই চায়।মনে মনে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
দৃষ্টি জোড়ে ধরা পড়ে—একটা স্মৃতি। সেদিন সে ছায়মাকে চড় মেরে বলেছিলো ওর মুখ যেনো আর না দেখায়। ছায়মাও রাগ করে বলেছিলো —

— “আমার মুখটাও আর দেখবেন না! আপনি কতো টা কঠোড় তার থেকে বেশি কঠোড় আমি হবো ।”
তখন কথা শুনে জাহির শুধু নিজের উপর তাচ্ছিল্য হাসছিলো। কিন্তু আজ সেই কথাটা যেনো হাড়ের ভিতরে বিঁধে বসে আছে।আজ সে সত্যিকারের দূরত্বে যাচ্ছে।আর এই শহর—এই বাড়ি—এই মানুষগুলো—একদিন পিছনে রেখে দেওয়া স্মৃতি হয়ে যাবে।
রাস্তার মোড়ে গাড়ি যখন বাঁক নেয়, সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। যেনো অদ্ভুত ভারে বুকটা ভরে যাচ্ছে।
— “এই শহরটাই তো ছিলো আমাদের গল্প। আজ আমি গল্পটা রেখে যাচ্ছি, কিন্তু কেউ জানে না গল্পটা কতটা অসম্পূর্ণ। হয়তো এটাই ভালো। কিছু মানুষ গল্প হয়ে থাকুক। একেবারে শেষ না হতে দিয়ে… অসমাপ্তই থাকুক।”
চোখ খুলে সে আবার শহরের দিকে তাকায়।
এটা তার কাছে শুধু শহর নয়, একটা আড়াল করা সম্পর্ক, কিছু না বলা স্বীকারোক্তি, আর নিজের ভেতরে জমে থাকা গভীর নীরবতা।

সময়ের পাতাগুলো যেনো নিঃশব্দে উড়ে যায়, ঠিক কারো ঘুমের ভিতর থেকে জেগে ওঠার মতো। দেখতে দেখতে দিনগুলো যেমন নিজের মতোই বদলে যায়, তেমনি মানুষও বদলে নেয় নিজেকে। কারো জন্য সময় দাঁড়িয়ে থাকে না—সে চলে তার নিজের পথে। বাড়ির কোলাহল, হাসি–আনন্দ, কান্না–অভিমান সব সময়ের সাথে মিশে একদিন স্মৃতি হয়ে যায়।
জারা নতুন সংসারে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। প্রথম দিনগুলোতে যে অবিরাম কান্না আর মন খারাপ ছিলো, তা সময়ের সাথে যেনো ছোটো হয়ে কোথাও লুকিয়ে গেছে। ব্যস্ততা মানুষের কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। আরমান মাঝে মাঝেই হাসি–ঠাট্টা করে জারাকে ভুলিয়ে দিতে সাহায্য করেছে। পরিবারের সবাইও তাকে তাঁদের পরিবারের একজন বলে গ্রহণ করেছে সেই কবে।তবুও একটা..কিন্তু থেকে যায়।
একদিন সকালে আরমান নাস্তার টেবিলে এসে বসে বলে, জারা, ফিহা আর মিমের পড়াশোনার বিষয়টা সে ঠিক করে দিয়েছে। তাদের কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে আরমান।তারা শুধু এখন থেকে ক্লাস করবে মনে দিয়ে। কথা শুনে তিনজনের মুখেই নতুন উত্তেজনার ঝিলিক দেখা যায়। ফিহা লাফিয়ে উঠে বলে—

__“সত্যি? আমরা তিনজন একসাথে কলেজে যাবো?”
জারা হালকা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। সে ভাবে, এতসব নতুন পরিবেশে পড়াশোনা কি সে চালিয়ে যেতে পারবে? কিন্তু তার ভাবনা বোঝার মতো যেনো বাড়ির সবাই আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো। আরমানের মা হেসে তার মাথায় হাত রেখে বলে—
__“পড়ালেখা থামানো যাবে না মা । মেয়েরা সংসার সামলাবে, আবার পড়াশোনাও করবে। তোরা শুধু মন দিয়ে পড়, বাকি সব আমাদের দায়িত্ব।”
শাশুড়ির এই কথায় যেনো জারার বুকটা হালকা হয়ে যায়। সে হালকা হাসে। মনে হয়, সে সত্যিই সঠিক জায়গায় এসেছে।
পরের সপ্তাহেই তিনজন কলেজে ভর্তি হয়। প্রথম দিনের ক্লাসে নতুন পরিবেশ, নতুন মুখ, নতুন বইয়ের পাতার ছাপা গন্ধ—সব মিলিয়ে উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে দিনগুলো। তিনজন একসাথে হাঁটে, একসাথে হাসে, আবার মাঝে মাঝে ক্লাসে বসে গল্প করে। কিছু শিক্ষক তাঁদের খুব পছন্দ করে ফেলেন, হয়তো তাঁদের নিয়মিত মনোযোগ বা একসাথে থাকা দেখে।
ফিরে এসে জারা রান্নাঘরে ঢুকলেই শাশুড়ি বলেন

—“আচ্ছা, আগে নাস্তা কর আগে তিনজন।রান্না ঘরে কী? পড়াশোনা করা মেয়েদের খালি পেটে রাখা যায় না ?”
খুব যত্ন নিয়ে খাবার সাজিয়ে দেন তিনি। কখনো ফল কিছু করতে দেন না তাদের তিন জনকে।সব কিছু ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম সামলে নেয়।
দিতেন না, কখনো বলতেন
—“এসব আমরা করবো। তোরা শুধু পড়াশোনা কর।”

আরমান আর রাশেদ ও অফিসের কাজে মন দিয়েছে অনেক আগে। তাদের সাথে এখন থেকে জাহেদও অফিসে যায়। কাজ শিখে। তারও এখন ছোট সংসার আছে। দায়িত্ব নেওয়া শিখতে হবে। আরমান ওকে সুন্দর ভাবে সব বোঝিয়ে দেয়।
জিনিয়া মাঝে মাঝে খান বাড়িতে আসে। প্রতি সপ্তাহে দুই একবার আসা হয় তার। এখন তো তার ও একটা সংসার আছে। পড়াশোনা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। রোহান ওকে ফোল সাপোর্ট করে।
জারাদের কে দায়িত্ব থেকে মুক্ত রেখে বরং স্বপ্নের পথটা ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শাশুড়ির এই সমর্থন যেনো নতুন আলো দেয় তার জীবনে। সংসার আর পড়াশোনা একই সাথে সামলানোর চাপ থাকে, কিন্তু এর মাঝে এক ধরনের মায়া আর নিরাপত্তা ধীরে ধীরে জারাকে ঘরে বেঁধে ফেলেছে।আরমানও নিয়মিত খোঁজ নেয়—“আজ ক্লাস কেমন হলো? কোন বিষয়টা কঠিন লাগছে?”
জারা যখন পড়াশোনার কথা বলতে শুরু করত, তার চোখে উজ্জ্বল একটা আগ্রহ ফুটে উঠত। আরমান সেটাই দেখতে পছন্দ করত। সে মনে মনে ভাবত

—“মানজারা শুধু সংসারের মানুষ হবে না, সে তার স্বপ্নও পূরণ করবে,তা যাই হোক না কেনো।”
ফিহা আর মিমও জারার সাথে যেনো আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়।যদিও আগে থেকে তারা ঘনিষ্ঠ ছিলো। কিন্তু সংসার আর তিনজনের বন্ধুত্ব যেনো ক্লাসের বেঞ্চ থেকে বাড়ির রান্নাঘর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। একসাথে পড়া, হাসাহাসি, হোমওয়ার্ক, পরীক্ষার ভয়—সব মিলিয়ে জীবন নতুন গতি পেয়ে যায়।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭০

এভাবেই দেখতে দেখতে একটি মাস কেটে যায়। নতুন দিনের রুটিন, পুরোনো স্মৃতির আবেগ, একটু একটু করে সবকিছু জায়গা করে নেয়। কেউ বুঝতেই পারে না, সময় কখনো কারো জন্য বসে থাকে না। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতেই কেউ কেউ একে সুন্দর করে তুলতে পারে। জারার জীবনও ঠিক তেমনই ধীরে ধীরে সাজিয়ে নিচ্ছে নিজেকে—ভালোবাসা, দায়িত্ব আর নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্নে।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here