Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৮০

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৮০

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৮০
সোহানা ইসলাম

~~ তিন বছর পর ~~
“ আরহাম.. এই আরহাম! কোথায় গেলি বাবা ?”
জারা আরহামকে ডাকতে ডাকতে নিজের রুম থেকে বের হয়। হাতে আরহামের ছোট ছোট কাপড় আর সাদা রঙের তোয়ালে। ছেলেটা এখন বেশ দুষ্টু হয়ে উঠেছে। একটা কথাও শোনে না। নাওয়া-খাওয়া সব বাদ দিয়ে ছোট ছোট পা দিয়ে পুরো খান বাড়ি চক্কর কাটাই যেন তার একমাত্র কাজ। কখনো দোতলার বারান্দা, কখনো সিঁড়ির ধাপ, আবার কখনো ড্রইং রুমের সোফার চারপাশে ঘুরে বেড়ায় সে। জারা হাঁপাতে হাঁপাতে ডাক দেয়, কিন্তু আরহামের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বাবার কথা ছাড়া আর কারো কথা শুনতে যেনো একেবারে নারাজ সে।
জারার ছেলের নাম আরহাম নিশান খান। আর মাত্র দুই দিন পর, ১১ জুলাই, তার বয়স হবে তিন বছর। এই অল্প বয়সেই সে পুরো বাড়ির সবচেয়ে আদরের মানুষ। বাড়ির সবাই তাকে মাথায় তুলে রাখে। দাদা-দাদী, চাচা-ফুফু, কাজের লোক—কেউই তার দুষ্টুমিতে বিরক্ত হয় না। বরং সবাই হাসতে হাসতে বলে, “এই তো বাড়ির প্রাণ।” আরহাম দেখতে একদম বাবার মতো হয়েছে—চোখের চাউনি, কপালের ভাঁজ,এমনকি হাঁটার ভঙ্গিটাও আরমানের ছায়া।যেনো একেবারে বাবার কার্বনকপি সে।
জারা ছেলেকে ডাকতে ডাকতে নিচে নামে। ড্রইংরুমে তখন সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছে। আরহামের জন্মদিন নিয়ে প্ল্যান করছে । চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, সঙ্গে হালকা হাসাহাসি। জারা এসে সবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

__“ আরহামকে দেখেছো কেউ ?”
সবাই একে একে মাথা নাড়ে—দেখেনি। জারা বিরক্ত হয়ে বলে,
__“বাপ আর ছেলে মিলে কোথায় চলে গেলো হঠাৎ করে!”
আরিফ খান চা খেতে খেতে শান্ত গলায় বলেন, __“আরে, চলে আসবে। এতো চিন্তা করার কিছু নেই।”
জারা একটু গম্ভীর হয়ে বলে,
__ “আব্বু, তোমার নাতির গোসলের সময় হয়ে গেছে। পরে করালে আবার ঠান্ডা লাগবে।”
জাহেদ, রোহান আর রাশেদ—তিনজনই একসাথে তাকে আশ্বস্ত করে, চিন্তা না করতে।আরমানের সাথে আছে মানে সেব আছে। কারণ ছেলে ওর প্রান । জারাও শেষমেশ ওদের পাশে বসে পড়ে। গল্পের মাঝে ঢুকে যায়, হাসাহাসি করে সময় কাটাতে থাকে।
জারা এখন পুরোপুরি সংসারি হয়ে উঠেছে। আগের মতো আর বসে বসে দিন কাটে না। ফারিয়া বেগম আর মিমদের হাতে হাতে কাজ করে দেয় সে। আর ছেলের দেখবাল তো আছেই! যদিও ফারিয়া বেগম বারবার বারণ করেন—বাড়ির বউয়ের এত কাজ করার দরকার নেই—তবু জারা জোর করেই কাজ করে। আর এখন আরও একটা দায়িত্ব জারা আর মিম পালন করে। ফিহার দেখবাল করে তারা। এই সংসারের প্রতিটি কোণে তার ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে ভালো লাগে তার।

ফিহার এখন প্রেগন্যান্সির তিন মাস চলছে। বাচ্চা নেওয়ার ব্যাপারে একসময় জাহেদের সঙ্গে তার বেশ যুদ্ধই হয়েছিল। সবাই যখন একে একে বাবা-মা হয়ে যাচ্ছে, জাহেদের মনেও তাগিদ ছিল। তারাও বেবি নিবে। কিন্তু ফিহা খুব ভয় পেতো? ফিহা বেবি চায়নি এমন না—সে শুধু খুব ভয় পেত। সেই ভয় কাটাতে জাহেদ ধৈর্য ধরে পাশে থেকেছে। এখন ফিহা আগের চেয়ে হাজার গুণ বেশি খুশি। মাতৃত্ব যেন তার সব ভয় জয় করে নিয়েছে।
এমন সময় সদর দরজা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঢোকে রিয়াত আর নূর। রিয়াত এখন বড় হয়ে গেছে। স্পষ্ট ভাষী সে। হাঁটা চলা বা কথা বলতে এখন আর কোনো সমস্যা হয় না। ছোট বেলায় দুষ্টু হলেও এখন বেশ দায়িত্ববান সে । রিয়াত খুব সাবধানে নূরকে ধরে বাড়ির ভিতরে এনেছে, যেন হোঁচট না খায়। এই দৃশ্য দেখে ড্রইংরুমে থাকা সবার চোখ জুড়িয়ে যায়। রোহান হেসে বলে ওঠে,

__ “জামাই এখন থেকেই আমার মেয়ের দায়িত্ব নেওয়া বুঝে গেছে।”
রাশেদ গর্বের সাথে যোগ করে,
__ “ছেলেটা কার, দেখতে হবে না?”
রোহানও কম যায় না। সে মজা করে বলে,
__ “মেয়ের জামাইকে ট্রেনিং কে দিচ্ছে, সেটাও তো দেখতে হবে তাই না।”
সবাই হেসে উঠে তাদের কথায়। আসলে ছোটবেলা থেকেই রোহান রিয়াতকে বলে এসেছে—নূর তার বউ, আর বউকে সবসময় আগলে রাখতে হয়। বাচ্চা মানুষ হলেও রিয়াত কথাগুলো মন থেকে মেনে নিয়েছে। বউ মানে কী, তা না বুঝেও নূরকে সে নিজের মতো করে আগলে রাখে। কারো সঙ্গে খেলতে দিতে চায় না। সবসময় নূরকে নিজের ছায়ায় রাখে।
নূর যদি তাদের বাড়ি চলে যায়, রিয়াতের কান্নায় ঘর কেঁপে ওঠে। সেই কান্না থামতে এক সপ্তাহও লেগে যায় কখনো কখনো। নূরের কথা মনে পড়লেই তার চোখ ভিজে ওঠে। এই বয়সেই এমন আবেগ দেখে বড়রাও অবাক হয়।

জারা এই দৃশ্য দেখে নরম হাসি দেয়। সে ভাবতে থাকে—এই বাড়ির প্রতিটা শিশু যেন একেকটা ভালোবাসার গল্প। আরহাম দুষ্টু, নূর শান্ত, রিয়াত দায়িত্বশীল—সবাই মিলেই এই পরিবারের আনন্দ।
রিয়াত এসে মায়ের পাশে নূরকে খুব যত্ন করে বসিয়ে দেয়। তারপর নিজেও সোফার এক কোণে গুটিশুটি মেরে বসে পড়ে। ছোট্ট বুকটা ভরে ওঠে দায়িত্ব নেওয়ার গর্বে। জিনিয়া মুচকি হেসে রিয়াতের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। লক্ষ্মী বাবার মতো শান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকা ছেলেটা তার হাতের ছোঁয়ায় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রিয়াত হেসে ওঠে, সেই হাসিতে শিশুসুলভ নিষ্পাপ আনন্দ।
জারা এই দৃশ্যটা দেখে নরম হয়ে আসে। সে এগিয়ে গিয়ে রিয়াতের গাল টেনে দেয়। আদর আর খুনসুটির মিশেলে তার কণ্ঠে মায়ের মতো মমতা। জানতে চায় আরহামকে দেখেছে কি না।

__“ রিয়াত বাবু! ভাই কে দেখেছো তুমি? ”
রিয়াত নির্দ্বিধায় জানিয়ে দেয়,
__“ ভাই কাকাইয়ের সাথে সুইমিং পুলে গোসল করছে কাকিয়া।”
এই একটা কথাতেই যেন পুরো ঘর থমকে যায়। যারা বসে ছিল, সবাই একসাথে উঠে দাঁড়ায়। হাসি,গল্প, আর হালকা শব্দে ভরা ড্রইংরুম মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। জারা প্রথমে যেন বুঝতেই পারে না। তারপর কথাটার মানে তার মাথায় ঢুকতেই বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। সুইমিং পুল? তার এইটুকু ছেলেকে নিয়ে?লোকটার কি মাথা গেছে নাকি? জারার চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে যায়। শরীরের ভেতর দিয়ে হঠাৎ করে এক ঝাঁক শীতল স্রোত বয়ে যায়। এতটুকু বাচ্চা, তিন বছরও হয়নি ঠিকমতো, আর তাকে সুইমিং পুলে নামানো হয়েছে?

মাথার ভেতর হাজারটা ভয় একসাথে চেপে বসে। পানি গভীর হলে কী হবে, কেউ খেয়াল না রাখলে কী হবে—এইসব চিন্তায় মুহূর্তেই তার মাথা গরম হয়ে যায়। রাগে জারার ঠোঁট শক্ত হয়ে আসে। সে আর এক সেকেন্ডও দেরি করে না। হাতে থাকা আরহামের কাপড় আর তোয়ালে সোফার ওপর ছুঁড়ে রেখে মাথার ওড়নাটা শক্ত করে টেনে নেয়। চোখেমুখে একরাশ উৎকণ্ঠা আর রাগ নিয়ে সে দ্রুত পায়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যায়। রাগ হচ্ছে খুব নির্বোধ লোকটার উপর।
জারার আচমকা এমন প্রতিক্রিয়ায় সবাই একটু হতভম্ব হয়ে পড়ে। কিন্তু দেরি করার সুযোগ নেই। একে একে সবাই তার পেছনে বেরিয়ে আসে। ফারিয়া বেগমের মুখেও চিন্তার ছাপ, জেসমিন বেগম দ্রুত পা বাড়ান। আরিফ খান আর আসিফ খান এবং রাশেদ’রাও আর বসে থাকেন না। বাড়ির উঠোন পেরিয়ে সবাই সুইমিং পুলের দিকেই এগোতে থাকে।
জারার বুক ধুকধুক করে। প্রতিটা কদমে তার মাথার ভেতর শুধু আরহামের মুখটা ভেসে উঠছে। ছোট্ট শরীরটা পানিতে ঠিক আছে তো? ঠান্ডা লাগেনি তো? তাকে ঠিকভাবে আগলে রেখেছে তো? সুইমিং পুলের কাছে পৌঁছানোর আগেই পানির শব্দ কানে আসে। সেই শব্দে জারার বুক আরও কেঁপে ওঠে। মায়ের মন যে কতটা ভয় পেতে পারে, সেই মুহূর্তে জারা নিজেই বুঝতে পারে। পেছনে সবাই থাকলেও, সামনে এগিয়ে যাওয়া প্রতিটি পা যেন সে একাই ফেলছে—ভয়ে, ভালোবাসায় আর সন্তানের জন্য অজানা আশঙ্কায় ভরা এক মায়ের মতো।

জারা সুইমিং পুলের কাছে পৌঁছে যা দেখে, তাতে এক মুহূর্তের জন্য তার রাগ আর ভয় দুটোই একসাথে মাথায় উঠে যায়। নীল পানির ভেতর আরমান দাঁড়িয়ে আছে, কাঁধের ওপর বসে আছে ছোট্ট আরহাম। বাবার কাঁধ শক্ত করে ধরে সে পানিতে হাত-পা ছুড়ে ছুড়ে খেলছে। পানির ছিটা উঠছে চারপাশে, আর সেই ছিটের মাঝেই আরহামের খিলখিল হাসি। নিষ্পাপ, নির্ভেজাল, আনন্দে ভরা এক হাসি। আরমানও কম নয়—ছেলেকে নিয়ে এমনভাবে দুলছে, যেন ওটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ। ছেলে জোরে খিলখিল করে হাসলে আরমান আরও জোরে দুল দেয়। আরহাম ও হেসে উঠে প্রতি বার।
এই দৃশ্যটা দেখেই জারার বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দেয় আবার শান্তিও পায়। চোখ জুড়িয়ে যায় বাবা আর ছেলের দৃশ্য দেখে । একদিকে সন্তানের হাসি, অন্যদিকে মায়ের ভয় আর স্বামীজানের উপর রাগ। এইটুকু বাচ্চাকে নিয়ে সুইমিং পুলে নামা—এটা কি কোনো কম কথা! মুহূর্তেই তার রাগটা ভয়কে ছাপিয়ে যায়।
জারা চারপাশে তাকায়। বাগানের এক কোণে রাখা একটা চিকন কিন্তু শক্ত লাঠি চোখে পড়ে। সে এক ঝটকায় সেটা তুলে নেয়। পা বাড়িয়ে সুইমিং পুলের কিনারায় দাঁড়ায়। চোখ দুটো জ্বলছে, কণ্ঠে জমে থাকা রাগ আর চিন্তা মিলেমিশে একাকার। লাঠিটা সামান্য উঁচু করে সে বলে ওঠে,

__“ বাপ আর ছেলে কি আজ পানি থেকে উঠবে না?”
কথাটা শুনে পানির ভেতরে থাকা দুজনই চমকে ওঠে। আরমানের মুখের হাসিটা মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়। আরহাম মায়ের কণ্ঠ চিনতে পেরে হঠাৎ থমকে যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। মায়ের হাতে লাঠি দেখে তার ছোট্ট মুখটা ভয়ে কুঁচকে যায়।
আরহামের গায়ে কোনো কাপড় নেই। পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট শরীরটা কাঁপছে, হয়তো ঠান্ডায়, না হয় মায়ের ভয়ে। আরমান শুধু একটা শর্ট পরে আছে। বাবা-ছেলে দুজনেই যেন ধরা পড়ে যাওয়া দুষ্টু বাচ্চা—চোখ নামিয়ে কাচুমাচু হয়ে পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে আরহাম হুট করে বাবার চুল খামচে ধরে।
__“ পাপা! আম্মু মাববে..?”
ছোট্ট হাতের টানেই আরমানের মাথার চামড়া যেন উঠে আসতে চায়। ব্যথা পেলেও আরমান একটা শব্দও করে না। দাঁত চেপে সহ্য করে নেয়। এই মুহূর্তে তার সামনে একটাই ভয়—জারা। আরমান ছেলেকল ফিসফাস করে বলে,

__“চুপ করে থাকলে আম্মু কিছু বলবে না! ”
এর মধ্যেই একে একে সবাই এসে হাজির হয় সুইমিং পুলের পাশে। ফারিয়া বেগমের মুখে বিরক্তি আর দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। জেসমিন বেগম তো এসেই হাত দুটো কোমড়ে রেখে দাঁড়িয়ে পড়েন। আরিফ খান আর আসিফ খান —সবাই যেন একসাথে বিচারক হয়ে গেছে। ফারিয়া বেগমের চোখ ছেলের দিকে পড়তেই গলা ভারী হয়ে আসে। নানি হিসেবে আরহাম যে তার প্রাণ, তা আলাদা করে বলার কিছু নেই। ফারিয়া বেগম ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন,
__“ এইটুকু বাচ্চাকে নিয়ে পুলে নেমেছিস কেন?মাথায় কি কিছু আছে তোর? নিশানের যদি ঠান্ডা লাগে? তোর এক দিন কি আমার এক দিন ?”
জেসমিন বেগমও ছাড়েন না।

__“ বাচ্চার ঠান্ডা লাগলে কী হবে ভেবেছিস আরমান? খেলতে নিয়ে গেলেই তো হয়, পুলে গোসলের দরকার কী। ওর মা ওকে খুঁজে না পেয়ে নাজেহাল অবস্থা !”
আরিফ খান একটু কড়া গলায় বলেন,
__“ আরমান, তুই কি ভুলে গেছিস নিশানের বয়স কত? আর ওর মতো কি তুই ছোট হয়ে গেছিস ?”
চারদিক থেকে বকুনি আসতে থাকায় আরমান আরও গুটিশুটি হয়ে যায়। মাথা নিচু করে ছেলেকে বুকে টেনে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন সে-ই সবচেয়ে বড় অপরাধী। বাড়ির সবাই আদর করে আরহামকে “নিশান” বলে ডাকে। নানির কাছে, দাদুর কাছে সে নিশানই। কিন্তু বাবা আর মায়ের মুখে সে শুধু আরহাম। এই মুহূর্তে অবশ্য নাম নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। বাবাকে সবাই মিলে এতো বকছে শুনে আরহাম সবার দিকে তার ছোট আঙুল তাক করে বলে,

__“ আমাল পাপা কে কিউ বকবে না? ”
ছোট্ট ছেলেদের কথা শুনে সবাই তো অবাক। বড় বড় চোখে আরহামের দিকে তাকায়। ছেলের কথ শুনে আরমানের গর্বে বুক ফুলে যায়। ছেলে কে কাধ থেকে নামিয়ে দু’গালে টুপ করে চুমু খায়। তারপর আবার কাধে বসে দেয় ভালো করে। জিনিয়া বলে,
__“ দেখেছো? বাবার জন্য কতো ভালোবাসা আমাদের নিশানের? সবাই কে না করছে ওর বাবা কে বকতে? ”
রোহান বলে,
__“ যার জন্য চুরি করলো সেই বলে চুর!”
আরহাম সাথে সাথে বলে উঠে,
__“চুলি করা ভালু না? তুমি জানো না? ”

আরহামের পাকা কথা শুনে সকলে হাসে। বিষয় টা জারা’র কাছে খুব ভালো লাগে। সন্তানই তো বাবা – মায়ের কষ্ট বুঝে। মা বাবার হয়ে কথা বলবে। সুখ দুঃখ বুঝবে। কিন্তু সে নরম হলে বাপ আর ছেলে মাথায় উঠে পরবে। তাই জারা লাঠিটা সামান্য এগিয়ে তাক করে বলে,
__“ বাপ আর ছেলে যদি ভালো চাও, তাহলে তাড়াতাড়ি পানি থেকে উঠে এসো।”
কণ্ঠে কোনো হাসি নেই। পুরোটা জুড়ে কড়া নির্দেশ। আরমান আর দেরি করে না। তড়িঘড়ি করে আরহামকে কাঁধ থেকে নামিয়ে কোলে নেয়। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে পানি থেকে উঠে আসে। পুলের ধারে রাখা তোয়ালে নিয়ে সে ছেলের শরীর মুছাতে শুরু করে। যত্নে, ধীরে ধীরে। আরহাম তখনো একটু ভীত। আড় চোখে বার বার মায়ের দিকে তাকাচ্ছে।
আরহাম দেখে ওর দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। তাই সে নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে। এই দৃশ্যটা দেখে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই হেসে ওঠে। শিশুসুলভ লাজুকতা যে কতটা মিষ্টি হতে পারে, সেটা ওই মুহূর্তে বোঝা যায়। আরিফ খান মজা করে বলে ওঠেন,

__“ দাদু ভাই, তোমার শরম তো দেখি পুরো পেকে গেছে! খতনা করাতে হবে? ”
আরহাম কথাটা পুরো বোঝে না। কিন্তু “দাদু” আর নিজের নাম শুনে সে চোখ বড় বড় করে তাকায়। তার পর বাবার দিকে ফিরে আদো আদো গলায় বলে,
__“ পাপা, দাদু চরম দেকে?”
তার ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে কথাটা শুনে সবাই হেসে গড়াগড়ি খায়। আরমান মুখ ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে,
__“ আব্বু, তুমি বুড় হয়ে এখন আমার ছেলের ইন্টেং মালের দিকে তাকাচ্ছ কেন? তোমার বুড় নজর সামলাও। না হলে আমার ছেলের মূল্যবান জিনিস কালো হয়ে যাবে। তারপর আর সুন্দরী বউ পাবে না সে !”
এই কথায় হাসির রোল পড়ে যায়। জারা লজ্জা মুখ ডেকেই ফেলে ওড়না দিয়ে। কি নির্লজ্জ লোক? বাবাকে কেউ এই ভাবে বলে ? আরিফ খান নিজেও হেসে ফেলেন।

__“ আরে বাবা, মজা করছি। এত সিরিয়াস হোস না। আমার দাদু ভাইয়ের মূল্যবান জিনিস কালো হয়ে গেলে ক্রিম এনে দিব আমি। টাকা কম পেরেছে বুঝি। বেদেশি ব্রেন্ড ক্রিম এনে দিব। ”
আরহাম বাবার কণ্ঠের সুর বুঝতে পারে না, কিন্তু সবাই হাসছে দেখে আরহামও খিলখিল করে হেসে ওঠে। আরমান কে সকলে দমকে বাড়িতে ভিতরে চলে যায় ফিহা কে। রিয়াত ও নূরকে নিয়ে রাশেদ দাড়িয়ে আছে এক পাশে। এখানে শুধু ওরা একই কজনই আছে।
আরমান গোলাপি রঙের ছোট্ট একটা তোয়ালে তুলে নেয়। তোয়ালেটা এমনিতেই আরহামের খুব পছন্দ—কারণ এটা নরম, আর তাতে ছোট ছোট কার্টুন আঁকা। সে আদর করে ছেলের কোমরের চারপাশে তোয়ালে টা পেঁচিয়ে দেয়। এক মুহূর্তেই আরহামের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যেন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এখন আর কেউ তার “শরম” দেখতে পারবে না—এই ভেবেই আরহাম মহা খুশি।
সে নিজের কোমরের তোয়ালেটা একবার হাত দিয়ে চেপে ধরে, আবার বাবার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসে। বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সে আজ বড় কোনো যুদ্ধ জিতে গেছে।
কিন্তু এই শান্তি বেশিক্ষণ টেকে না। রোহান আর জাহেদ দুইজনেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ছোট্ট আরহাম মানেই বাড়ির সবার বিনোদনের প্যাকেট। দুইজন চোখাচোখি করে এক দুষ্টু হাসি দেয়। তারপর একসাথে আরহামের দিকে এগিয়ে আসে। রোহান হেসে বলে,

__“ ওই নিশান, দেখি তো তোয়ালেটা ঠিকমতো বাঁধা আছে নাকি!”
জাহেদ সঙ্গে সঙ্গে যোগ করে,
__“ আরে না না, ঢিলা হয়ে গেছে মনে হয়। একটু টান দেই!”
আরহাম প্রথমে বুঝতেই পারে না কী হচ্ছে। কিন্তু যখন দেখে দুইজন তার তোয়ালের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, তখনই তার চোখ বড় হয়ে যায়। ছোট্ট মুখটা ভয়ে কুঁচকে ওঠে। সে চিৎকার করে বলে ওঠে,
__“ একদুম দলবে না! একদুম না! চবাই চলম দিকে পেলবে তো? ”
তার ভাঙা ভাঙা কথা, কাঁপা কাঁপা গলা—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা এমন মজার যে চারপাশে থাকা অনেকেই হেসে ফেলতে বাধ্য হয়। কিন্তু রোহান আর জাহেদ থামে না। তারা মজা করতেই থাকে। একজন ডান দিক থেকে, আরেকজন বাঁ দিক থেকে ঘুরে ঘুরে তোয়ালের দিকে হাত বাড়ায়।
আরহাম নিজের “ইজ্জত” বাঁচাতে দৌড়ানো শুরু করে। কখনো বাবার পায়ের কাছে লুকায়, কখনো আবার মায়ের দিকে ছুটে আসে। ছোট ছোট পা, কিন্তু প্রাণপণ দৌড়। তোয়ালেটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে সে। মুখে আতঙ্ক, চোখে জল চিকচিক করছে।

__“ পাপা! পাপা! বাচাও.! চরম দেকে কালি! কিউ দলবে না আমায় ! পাপা..পাপা..!”
কাঁপা গলায় সে বাবাকে ডাকতে থাকে। আরমান প্রথমে হাসছিল। ছেলের এই ভয় আর দৌড়াদৌড়ি দেখে তার হাসি থামানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু যখন দেখে আরহাম সত্যিই ভয় পাচ্ছে, তখন সে আর হাসতে পারে না। রোহান আর জাহেদ কে বলে,
__“ আমার ছেলের পিছনে না লেগে দুইগরু বাড়ির ভিতরে যা..!”
আরমানের কথা ওরা কেউ কানে তুলে না। জাহেদ হাসতে হাসতে বলে,
__“আরে পালাচ্ছে কেন নিশান বাবু ? আমরা তো শুধু চেক করবো!”
সুইমিং পুলের কাছে সোফা সেট ছিলো। আরহাম দৌড়ে টেবিলের নিচে চলে যায়। আরহাম টেবিলের নিচ থেকেই কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
__“একদুম আসবা না! আমি বড় মানুষ!”

এই “বড় মানুষ” কথাটা শুনে রোহান আর জাহেদ হেসে কুটিকুটি। দূরে দাড়িয়ে থাকা রাশেদও। তারা দু’জন দু’দিক থেকে টেবিলের নিচে উঁকি দেয়। আরহাম আবার পালায়—এইবার সোফার পেছনে।
সে হঠাৎ করে একেবারে সিরিয়াস মুখ করে আঙুল তুলে বলে,
__“আমি কিন্তু এবার কুব রাগ করচি। আম্মুকে বলবো। আম্মু বাতাও.. তাতাই চরম দেকে ।”
তারপর নিজেই আবার হেসে ফেলে, কারণ সে জানে এই দুই কাকা তাকে কিছুই করবে না। জারা ছেলের কান্ড দেখে হাসে। হাসতে হাসতে বলে,
__“ আম্মু এখন আর আরহাম কে বাঁচাবে না। আরহাম যদি আম্মুর কথা শুনতো তাহলে এখন আম্মু বাঁচাতো! ”
আরহাম মুখ ফুলিয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। অভিমান করছে। গাল দুটু ফুলিয়ে রাশেদের দিকে দৌড়ে যেতে যেতে বলে,

__“ আম্মু কুতা শুনবো তো। বাতাও! ”
ঠিক তখনই হঠাৎ একটা দৃশ্য সবাইকে চমকে দেয়।
রিয়াত, যে এতক্ষণ একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, সে হঠাৎ ছোট ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। নিজের ছোট্ট শরীরটা ছড়িয়ে দিয়ে আরহামের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। দুই হাত ছড়িয়ে সে ঘোষণা করে,
__“ আমার ভাইকে কেউ ধরবে না!”
তার কণ্ঠে কোনো হাসি নেই। একেবারে সিরিয়াস, দায়িত্বশীল। যেন সে আজ কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ছোট ভাইকে রক্ষা করতে এসেছে। এই দৃশ্য দেখে সুইমিং পুল—সব জায়গা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। রোহান আর জাহেদও অবাক হয়ে যায়। মজার ছলে করা কাজটা যে এত দূর যাবে, তারা নিজেরাও ভাবেনি। রাশেদ মুগ্ধ হয়ে বলে ওঠে,
__“ দেখেছো? ছোট হলেও দায়িত্বটা ঠিকই বুঝে।”
জারা মুখে হাসি টেনে বলে,

__“ আল্লাহ, এরা কী সুন্দর করে আগলে রাখে একে অন্যকে।”
রিয়াত তখনো নড়েনি। সে পেছনে তাকিয়ে দেখে আরহাম ঠিক আছে কিনা। আরহাম বড় ভাইয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে। দুই হাত দিয়ে তোয়ালেটা শক্ত করে ধরে রেখেছে। চোখে এখনো ভয়, কিন্তু তার সাথে মিশে গেছে একরাশ ভরসা। সে ফিসফিস করে ডাকে,
__“ নিয়াত ভাই…”
রিয়াত মাথা একটু নিচু করে বলে,
__“ ভয় নাই। আমি আছি।”
এই কথাটা জারার বুকে গিয়ে সোজা লাগে। এতক্ষণ সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু এখন তার চোখ দুটো শক্ত হয়ে আসে। সে রাগী দৃষ্টিতে সোজা আরমানের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে কোনো চিৎকার নেই, কিন্তু আগুন আছে। আরমান সেই দৃষ্টি দেখেই বুঝে যায়—বিপদ। জারা আর কিছু বলে না। শুধু হাতের লাঠিটা ধীরে করে নিচে নামিয়ে মাটিতে রেখে দেয়। তারপর শান্ত কিন্তু শক্ত গলায় বলে,

__“ ছেলেকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ভিতরে আসুন। ওকে
কাপড় পরাতে হবে। এই ভাবে থাকলে ঠান্ডা গেলে যাবে?”
কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা যে কেউ আর কথা বলার সাহস পায় না। আরমান মুহূর্তেই সিরিয়াস হয়ে যায়। বউয়ের এই স্বর সে খুব ভালো চেনে। এটা সেই স্বর, যেটার পরে কোনো যুক্তি চলে না। সে সঙ্গে সঙ্গে রোহান আর জাহেদের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলে,
__“এইসব মজা বন্ধ কর! আমার ছেলে ভয় পেয়েছে।”
রোহান আর জাহেদ একসাথে হাত তুলে বলে,
__“ আচ্ছা আচ্ছা, আর করবো না।”
আরমান এগিয়ে গিয়ে আরহামকে কোলে তুলে নেয়। আরহাম তখনো একটু কাঁপছে। কিন্তু বাবার কোলে উঠতেই সে একটু শান্ত হয়। ছোট্ট মাথাটা বাবার বুকে গুঁজে দেয়। আরমান ছেলের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে ধীরে ধীরে বাড়ির ভিতরের দিকে হাঁটতে শুরু করে। আরহাম বাবার কাঁধে মাথা রেখে রোহান আর জাহেদেের দিকে তাকিয়ে বলে,

__“ তাতাই পুচা! ”
রোহান আর জাহেদ হাসে। জারা পেছন পেছন যায়। তার মুখে এখন আর রাগ নেই, আছে চিন্তা আর মায়া। ভিতরে ঢোকার সময় সে একবার পেছনে তাকায়। দেখে রিয়াত এখনো দাঁড়িয়ে আছে, চোখে গর্বের ঝিলিক। জারা মনে মনে ভাবে—এই বাড়িতে শুধু সম্পর্ক না, দায়িত্ববোধও কত সুন্দর করে বেড়ে উঠছে।
ভিতরে ঢুকে আরমান সোজা নিজের রুমের দিকে যায়। বিছানার ওপর আরহামকে বসিয়ে দেয়। তারপর আলমারি খুলে ছেলের কাপড় বের করতে থাকে। আরহাম তখন আর কাঁদছে না। সে বাবার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
__“ পাপা… আল..দলবে না তো?”
আরমান ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বলে,
__“ না পাপা। কেউ ধরবে না। পাপা আছি তো।”
জারা পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখে। তার চোখ ভিজে আসে। এই মানুষটা ছেলের সাথে থাকলে কতো বোকামি করে, কখনো নিজের ব্যক্তিত্ব ভুলে যায় ছেলেকে সময় দিতে গিয়ে —কিন্তু বাবার জায়গায় সে নিঃসন্দেহে নিখুঁত। দায়িত্ব আর ভালোবাসা তার কাছে কখনো কম হয় না। এই ছোট্ট ছেলেটা তার প্রাণ। জারা কেও দেয় না ওর সাথে উচু গলায় কথা বলতে। জারা ধীরে করে বলে,

__“ স্বামীজান! ওর বয়স এখনো অনেক ছোট। একটু সাবধান থাকতে হবে।”
আরমান মাথা নিচু করে বলে,
__“ ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না।”.
জারা আর কিছু বলে না। শুধু ছেলের চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। চুল গুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। আরহাম মায়ের দিকে তাকি ফুকলা দাঁতে হাসি দেয়। জারাও ছেলের সাথে হাসে।
__“ স্বামীজান! আরহামের চুল গুলো অনেক বড় হয়েছে। কাটাতে হবে? ”
আরমান কাপড় চেঞ্জ করতে করতে বলে,
__“ বিকেলে মা আর ছেলে রেডি থেকো। আরহামের চুল কাটিয়ে, তারপর তোমাদের নিয়ে ঘুরে আসবো? ”
ঘুরাঘুরির কথা শুনে জারা খুশিতে গদগদ হয়ে বলে,

__“আচ্ছা স্বামীজান। আমি আর আরহাম রেডি হয়ে থাকবো?”
আরমান ধীরে ধীরে আরহামের ছোট্ট হাত ধরে বলে,
__“পাপা, এখন গিয়ে ভাইয়াদের সাথে খেলো। পাপা এক্ষুনি আসচ্ছে।”
জারা হাসি ধরে ধরে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলে,
__“ না.. ও, এখন ঘুমাবে।”
আরহাম এক ঝটকায় লাফিয়ে উঠে, মাথা নেড়ে অস্বীকার করার ভঙ্গি করে বলে,
__“আমি গুমাব না!”
আরমান হাসতে হাসতে তার ছোট্ট কপাল চুমু দিয়ে বলে,
__“আচ্ছা, আমার পাপা ঘুমাবে না। পাপা এখন খেলবে।”
জারা সুরো চোখে তাকিয়ে থাকে স্বামীজানের দিকে, মুখে লাজুক হেসি। আরহামের উচ্ছলতা দেখে তার বুক ভরে আসে। ছেলেটি পাপার মুখের দিকে তাকিয়ে, ছোট্ট ঠোঁট টেনে চুমু দেয় এবং বলে,
__“ আমি দাই একুন পাপা?”
জারা অভিমান করে বলে,
__“আমাকে তো একজন চুমু দুলো না।”
আরহাম বড়দের মতো কপাল চেপে ধরে, নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে বলে,
__“আহা্! বুলে গেছি তো আম্মু, আতো তুমু দেই!”
আরমান আর জারা একসাথে হাসতে হাসতে রুমের মাঝে আনন্দের বাতাবরণ সৃষ্টি করে। আরমান আরহামের ছোট্ট আনন্দ দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকে। জারা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে নরম গালে অগুনিত চুমু দিতে থাকে । আরহাম বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

__“আম্মু, চুমু আর দিও না?”
জারা হাত দিয়ে মাথায় আঙ্গুল ধরে বলে,
__“ঠিক আছে, আর দিবো না, বাবা।”
আরমান আর জারা একসাথে হেসে উঠে। ছোট্ট আরহামের কথা এবং ভঙ্গিতে তাদের মন ভরে ওঠে আনন্দে। আরহাম মাকে আর একটা চুমু দিয়ে মাথা দুলাতে দুলাতে রুম থেকে বের হয়ে যায়,
__“পাপা, আমি খেলতে দাই।”
আরমান আর জারা একসাথে ছেলের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু পাকা কথা বলে সারাদিন। কতো দুষ্টু করে। এই ছোট প্রাণ টা তাদের দুজনের জীবন।

জারা আরহামের ছোট ছোট জামাকাপড় গুছিয়ে রাখছিল। রঙিন জামাগুলো হাতে নিলেই তার ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি এসে বসছিল। এই জামা গুলোর প্রতিটায় কত স্মৃতি—প্রথম হাঁটা, প্রথম ডাক, প্রথম “আম্মু” বলা। মায়ের মন এমনই হয়, সন্তানের জিনিসপত্রেই হৃদয় ভরে যায়।
ঠিক তখনই হঠাৎ করে কেউ তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। জারা চমকে উঠল। বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে কেঁপে উঠল।

__“ইয়া আল্লাহ!”
বলে প্রায় হাত থেকে কাপড় ফেলে দিতেই শক্ত এক জোড়া বাহু তাকে আরও কাছে টেনে নিল। আরমান।
তার নিঃশ্বাস জারার ঘাড়ে এসে পড়ল। পরিচিত উষ্ণতা, পরিচিত গন্ধ। জারা চোখ বন্ধ করে ফেলল অজান্তেই। আরমান ধীরে ধীরে তার মাথা থেকে ওড়নাটা সরিয়ে দিল। তারপর পিঠে ছোট ছোট, নরম চুমু এঁকে দিতে লাগল—যেন কোনো শব্দহীন ভাষায় কিছু বলতে চাইছে। জারা কেঁপে উঠল। এই মানুষটার স্পর্শ আজও তার শরীরকে এমনভাবে নাড়িয়ে দেয় যে সে নিজেই অবাক হয়। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
__“এমন করছেন কেন, স্বামীজান?”
আরমানের কণ্ঠটা ভারী, আবেশে ভরা।
__“আমার খুব… বউ বউ পাচ্ছে।”
জারা হঠাৎ ঘুরে তাকাল।
__“আপনার মাথায় সবসময় এসবই ঘোরে, তাই না?”
আরমান হেসে ফেলল। সেই হাসিতে দুষ্টুমি আছে, আবার অদ্ভুত এক ভালোবাসাও।
__“লক্ষ্মী বউ, একবার… প্লিজ, একবার।”
জারা তাকে ঠেলে সরাতে সরাতে বলল,
__“একবারও না। সকালে যে ব্যথা দিয়েছেন, তা এখনো শরীর থেকে যায়নি। আর আপনি এখন আবার শুরু করেছেন!”

আরমান এবার জারাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তার চোখে কোনো জেদ নেই, আছে অদ্ভুত এক আকুলতা।বলেই সে একটু দুষ্টু হাসল,
__“তখন তো কিছুই ঠিক মতো হলো না, আরহাম জেগে গিয়েছিল।”
জারা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
__“ওহ! তাই নাকি! তাই বুঝি এখন ছেলেকে খেলতে পাঠিয়ে দিলেন?”
আরমান মুচকি হেসে জারার ঠোঁটে আলতো করে আঙুল রাখল।
__“এই তো… আমার বউ এখন সব বুঝে ফেলে।”
জারা রাগী ভঙ্গিতে বলল,
__“বাজে কথা বাদ দিন। আমাকে ছাড়ুন।”
আরমান আশ্চর্যভাবে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছেড়ে দিল।
এই আচরণটাই জারাকে অবাক করল। এত সহজে ছেড়ে দিল? সে কিছু বলার আগেই আরমান ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। জারার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। মানুষটা কি অভিমান করল? সে কি কষ্ট পেল? আরমান দরজার কাছে পৌঁছাতেই জারা পিছন থেকে ডেকে উঠল,

__“স্বামীজান… যাবেন না। আমার ভুল হয়ে গেছে।”
আরমান থেমে গেল। ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল। ঠোঁটের কোণে বাঁকা এক হাসি।শান্ত গলায় বলল সে,
__“আমি তো দরজা লাগাতে যাচ্ছিলাম, আরহাম এসে যেন ডিস্টার্ব না করে।”
জারা পুরোপুরি থমকে গেল। লোকটার কথা শুনে নিজের ওপরই রাগ হলো। কী ভেবেছিল সে আর কী হলো! আরমান দরজা লাগিয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। এক মুহূর্তেই তাকে খপ করে জড়িয়ে ধরল। জারা মৃদু চিৎকার করে উঠল,
__“আপনি খুব খারাপ! ছাড়ুন!”
আরমানের কণ্ঠে হাসি, ভালোবাসা আর আবেগ একসাথে মিশে গেল।
__“চলো তাহলে… এই খারাপ লোকটার সাথে একটু খারাপ কাজই করো, সোনা। এই খারাপ লোকের সাথে খারাপ কাজ করলে ফল ভালো পাবে।এটা ১০০% গ্যারান্টি বউ ।”
জারা আর কিছু বলল না। মাথাটা স্বামীর বুকে এলিয়ে দিল। এই বুকটাই তো তার নিরাপত্তা, তার আশ্রয়। বাইরে যত রাগ, যত না বলা অভিমান—সব গলে যায় এই এক জায়গায় এসে। আরমান তার কপালে আলতো চুমু দিল।
__“ এত দুষ্টুমি করেন কেন আপনি?”
আরমান ধীরে বলল,
__“কারণ তুমি আমার। শুধু আমার।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাইরে জীবনের কোলাহল থাকলেও এই মুহূর্তটা শুধুই তাদের। কোনো তাড়া নেই, কোনো ভয় নেই। আছে শুধু একে অপরকে অনুভব করার শান্ত সুখ।

বিকেলের রোদটা তখন একটু নরম হয়ে এসেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকে ঘরের ভেতরটা শান্ত করে তুলেছে। জারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরহামকে খাওয়ানো শেষ করল। ছোট্ট ছেলেটা খাওয়ার সময়ও স্থির থাকতে পারে না—কখনো পা নাড়ে, কখনো হাত দিয়ে চামচ ধরতে চায়, আবার কখনো নিজের মুখে খাবার মেখে ফেলে। জারা মৃদু হেসে ছেলের মুখ মুছিয়ে দেয়।
— “এই দুষ্টু! খাওয়া শেষ না হলে কিন্তু ঘুরতে যাবো না।”
আরহাম চোখ বড় বড় করে তাকায়, মাথা নেড়ে যেনো সম্মতি দেয়। ঘুরতে যাবে শুনলেই ওর ক্লান্তি কোথায় যেনো উধাও হয়ে যায়। আরমান আগেই রেডি হয়ে নিচে নেমে গেছে। কালো শার্ট আর ডার্ক জিন্সে লোকটাকে আজ বেশ স্মার্ট লাগছে—এটা জারা লক্ষ্য না করে পারেই না। আজ তার স্বামীজান কে সেই লাগছে। আয়নার দিকে তাকিয়ে সে একটু ভেবে নেয়, তারপর আলমারি খুলে আরহামের জন্য কালো রঙের একটা ছোট্ট মাজার সেট বের করে।

— “স্বামীজান কালো পরেছে, আমার ছেলেও কালো পরবে,”
জারা হাসতে হাসতে বলে। আরহাম জামা পরানোর সময় একটু নড়াচড়া করলেও শেষ পর্যন্ত ঠিকই রেডি হয়ে যায়। ছোট্ট কালো পাঞ্জাবি আর ট্রাউজারে ওকে একেবারে বাবার ছোট সংস্করণ মনে হচ্ছে।
জারা নিজেও কালো বোরকা পরে নেয়, হিজাব ঠিক করে নেয় আয়নার সামনে। শরীরটা আজ একটু ক্লান্ত লাগছে, কিন্তু ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাবতেই যেনো ক্লান্তি মিলিয়ে যায়। সে নিজেকে বোঝায়—এমন সময়গুলোই তো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত।
মা আর ছেলে একসাথে নিচে নামে। ড্রইংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা আরমান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার সামনে যেনো ধীরে ধীরে তার পুরো পৃথিবী হেঁটে আসছে—তার বউ আর তার ছেলে। এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরাতে পারে না। জারা কাছে এসে হালকা গলায় বলে,
— “আমরা রেডি। চলুন এখন।”
আরমান হেসে মাথা নেড়ে বলে,
— “হ্যাঁ, চলো।”
আরহাম পাপার কোলে উঠার জন্য দু’হাত উচু করে রাখে। আরমান ছেলেকে কোলে নিয়ে চুমু দেয়। আরহামও বাবা লাগে চুমু দিয়ে বলে,

__“ তি তিউট তুমি পাপা..?”
আরমান ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
__“ একেবারে মার মতো পাকনা হয়েছেন আপনি?”
আরহাম খিলখিল করে হেসে আরও ভালো করে পাপার গলা জরিয়ে ধরে। বাড়ির অন্যরা তখনও আড্ডায় ব্যস্ত। জারা নূর আর রিয়াতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— “তোমাদের জন্য কী আনবো সোনা?”
নূর শান্ত স্বরে বলে,
— “চকলেট আনবে আমার জন্য মামনি।”
রিয়াত সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— “আমার লাগবে না! নূরের জন্য বেশি করে আনবে।”
জারা হেসে মাথা নেড়ে দেয়।
— “আচ্ছা, বেশি করেই আনবো।”
ফিহা হালকা অভিমান করে বলে,
— “আমাদের জন্য তো কেউ জিজ্ঞেস করলো না!”
মিম আর জিনিয়াও মুচকি হেসে তাকায়। জারা হাসতে হাসতে বলে,
— “তোমাদের ভাইয়া নিশ্চয়ই তার বোনদের জন্য আনবে, তাই আলাদা করে জিজ্ঞেস করলাম না।”
সবাই হেসে ওঠে। আরমান আরহামকে কোলে নিয়ে গাড়ির দিকে যায়। ড্রাইভিং সিটে বসে ছেলেকে কোলে বসিয়ে নেয়। পাশে এসে বসে জারা। গাড়ি স্টার্ট হতেই আরহাম স্টিয়ারিংয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

— “পাপা, আমি চানাই? তুমি বতে তাকো ?”
আরমান হেসে বলে,
— “মায়ের মতো পাকামি করতে হবে না। চুপ করে বসে থাকো।”
জারা গাল ফুলিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে।
— “আমার পাকামি খারাপ নাকি? আর আমার ছেলে আমার মতো হয়েছে বেশ করেছে ? আরও পাকা হবে আপনার কি ?”
আরমান ইচ্ছে করেই তাকে রাগাতে বলে,
— “সবাই বলে আরহাম আমার মতো হয়েছে। আমিও তাই মানি। কিন্তু স্বভাবটা পুরোপুরি মায়ের মতো।”
জারা সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— “বেশ হয়েছে। আমার ছেলে আমার স্বভাব পেয়েছে। আপনার কী? ”
আরমান হাসতে হাসতে গাড়ি চালাতে থাকে। কিছুক্ষণ পর তারা একটা বড় সেলুনে পৌঁছায়। আরহামের চুল কাটার সময় হয়ে গেছে। ছেলেটা চুল নিয়ে খুব সেনসিটিভ। ভেতরে ঢুকেই সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যায়।সে ছোট্ট আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়,

— “এইভাবে কাটবে তিন্তু? ”
সবাই অবাক। এত ছোট বয়সে এমন স্পষ্ট করে বোঝাচ্ছে! নাপিত হাসি চেপে বলে,
— “আচ্ছা বাবু, ঠিক আছে এইভাবেই কাটবো।”
চুল কাটার সময় আরহাম আয়নায় নিজেকে দেখে পাকা গলায় বলে,
— “বেশি কাটবেন না কিন্তু । আমাকে চুন্দর নাগবে না তাহলে! ”
জারা আর আরমান দু’জনেই হেসে ওঠে। আশ পাশের লোকজনও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে এই কুটু ছেলে টার দিকে। চুল কাটা শেষ হলে আয়নায় নিজেকে দেখে আরহাম গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ে।
— “তিক আছে। চুন্দর হয়েছে! ”
আরমান বিল মিটিয়ে দিয়ে সেলুন থেকে বের হয়। এরপর তারা শপিং মলে যায়। ভেতরে ঢুকতেই আলো, মানুষ আর রঙিন দোকানে আরহামের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। কখনো বাবার কাঁধে বসে চারপাশ দেখে, কখনো মায়ের হাত শক্ত করে ধরে।
আরমান এক হাতে ছেলেকে ধরে রাখে, আরেক হাতে জারার হাত। মাঝখানে আরহাম—তাদের দু’জনের ভালোবাসার সেতু। জারা হঠাৎ ভাবে—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তো একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে। আজকের এই বিকেল, কালো পোশাক, ছেলের পাকামি, স্বামীর হাসি—সবকিছু একসাথে মিলে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
শপিং শেষ করে যখন তারা মল থেকে বের হওয়ার জন্য লিফটের দিকে এগোচ্ছে, তখন আরহাম হঠাৎ বাবার কোল থেকে সামনের দিক দেখিয়ে বলে ওঠে,

— “পাপা আইতকিম কাবো।”
আরমান থমকে যায়। ছেলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
— “আইসক্রিম না পাপা। আইসক্রিম খেলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
আরহাম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ভ্রু কুঁচকে চোখ বড় বড় করে বলে,
— “না, আমি তাবই।”
এই “তাবই” শব্দটার মানে পুরো খান পরিবার ভালো করেই জানে—এটা মানে হলো, আজ ছাড় নেই। জেদ চেপেছে। জারা পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছিল। কিন্তু ছেলের মুখটা দেখে তারও মন নরম হয়ে গেল। সে ইচ্ছে করেই আরমানের দিকে তাকিয়ে নিরীহ গলায় বলে,
— “আমিও আইসক্রিম খাবো স্বামীজান।”
আরমান একদম থেমে যায়। বউয়ের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাসের চোখে বলে,
— “তুমিও শুরু করছো?”
জারা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
— “মন চাইছে।”
আরমান এবার একটু শক্ত গলায় বলে,
— “কেউ আইসক্রিম পাবে না। চুপ করে বাড়ি চলো।”
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আরহাম বাবার কোল থেকে নেমে পড়ে। ছোট্ট পা দুটো শক্ত করে মেঝেতে ঠেসে বসে পড়ে। তারপর দুই হাত বুকের কাছে এনে বলে,

— “আমি দাবো না।”
জারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আরমান তো আরও বেশি অবাক। চারপাশে লোকজন হেঁটে যাচ্ছে, কেউ কেউ থেমে তাকাচ্ছে। খান পরিবারের ছোট সাহেব মলের মাঝখানে বসে পড়েছে—এই দৃশ্য বেশ আকর্ষণীয়। আরমান নিচু হয়ে বলে,
— “উঠো পাপা, সবাই দেখছে।”
আরহাম মাথা নাড়ে।
— “না।”
জারা এবার আরমানের দিকে তাকিয়ে বলে,
— “ওকে জোর করবেন না। ছোট বাচ্চা। দিয়ে দিলেই তো হয়। ”
আরমান হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানে, এখন জোর করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। সে আরহামের সামনে বসে নরম গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে,
— “দেখো পাপা, আইসক্রিম খেলে গলা ব্যথা করবে। তখন ডাক্তার দেখাতে হবে।”
আরহাম চোখ বড় করে বলে,

— “ডাকতাল ভালো।”
জারা হেসে ফেলে।
— “ এখন ডাক্তার ভালো হলে হয়ে গেছে ।”
আরহাম একটু ভেবে বলে,
— “ইনজেকশন দিবে কিন্তু ।”
তারপর আবার বলে,
— “ দিক! আইতকিম চাই। ”
আরমান চোখ বন্ধ করে একবার দীর্ঘশ্বাস নেয়। ঠিক তখনই জারা হঠাৎ ছেলের পাশে বসে পড়ে। মলের চকচকে মেঝেতে কালো বোরকা পরে বসে পড়া জারাকে দেখে আশেপাশের কয়েকজন থমকে যায়।
জারা গম্ভীর মুখে বলে,
— “ও না পেলে আমিও যাবো না।”
আরমান হতভম্ব।
— “এইটা কী করছো তুমি?”
জারা নির্লিপ্ত গলায় বলে,
— “আমারও আইসক্রিম চাই।”
এই মা–ছেলে জুটি আজ যেনো আলাদা কোনো মিশনে নেমেছে। আরমান মাথা চুলকায়। তার সামনে দুইটা অপশন—এক, এখানেই দাঁড়িয়ে সবার সামনে নাটক দেখা; দুই, আইসক্রিম কিনে শান্ত করা।আরহাম মেঝেতে বসে চারপাশে তাকিয়ে আছে।একজন মহিলা হেসে পাশের জনকে বলে, “বাচ্চাটা কত কিউট!” আরমান বুঝে যায়, সে হেরে গেছে। সে হাত তুলে বলে,

— “আচ্ছা, আচ্ছা। উঠো। আইসক্রিম কিনবো।”
আরহাম সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়।
— “তত্যি?”
জারা চোখ টিপে বলে,
— “দেখেছো, পাপা রাজি হয়ে গেছে ।”
আরমান দাঁত চেপে বলে,
— “তোমরা দু’জন মিলে আমাকে শেষ করে দেবে একদিন।”
আইসক্রিম শপে ঢুকতেই আরহাম আবার নেতা হয়ে যায়। কাউন্টারের দিকে আঙুল তুলে বলে,
— “এইটা নিব আমি ।”
জারা বলে,
— “আমার জন্য চকলেট।”
আরমান ক্লান্ত গলায় বলে,
— “একটা ছোট কাপ, দু’জন ভাগ করে খাবে।”
জারা চোখ বড় করে তাকায়।
— “ আপনি কিপ্টেমি করছেন কেনো স্বামীজান? আমি আর আমার ছেলে ভাগ করবো? ”
আরহাম তৎক্ষণাৎ বলে,

— “না। আমার আলাদা নাগবে ।”
আরমান হাল ছেড়ে দেয়।
— “আচ্ছা, দুইটা নাও।”
আইসক্রিম হাতে পেয়ে মা আর ছেলে যেনো অন্য জগতে চলে যায়। আরহাম দুই হাতে কাপ ধরে চামচ না পেয়ে সরাসরি মুখ লাগিয়ে দেয়। ঠান্ডায় কুঁকড়ে গিয়ে বলে,
— “উহ্ ঠান্ডা!”
তারপর আবার খায়। জারা ছোট ছোট কামড়ে আইসক্রিম খেতে খেতে বলে,
— “আহা, কত মজা !”
আরমান পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে থাকে। কেউ তাকে আইসক্রিম অফারও করে না। মা আর ছেলে একই। ছেলেটা না হয় অবুঝ। কিন্তু বউ। বউ তো তাকে একবার সাদতে পারতো। আরমান এবার পুরাই হতাশ। কিছুক্ষণ পর আইসক্রিম শেষ। আরহাম খুশিতে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
— “পাপা, ভালো।”
জারা হাসিমুখে বলে,
— “ধন্যবাদ স্বামীজান।”
তারপর মা আর ছেলে হাত ধরে মলের বাইরে হাঁটতে শুরু করে। তারা এতটাই খুশি যে পিছনে তাকিয়েও দেখে না। আরমান একটু পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে। তার সামনে কালো বোরকা পরা বউ আর ছোট্ট কালো পোশাকের ছেলে—হাসতে হাসতে এগিয়ে যাচ্ছে।
মল থেকে বের হয়ে আরমান সরাসরি গাড়ি নদীর ঘাটের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। বিকেলের রোদটা তখন নরম হয়ে এসেছে। নদীর পাড়ে বাতাস বইছে হালকা, পানির ওপর রোদের ঝিলিক খেলছে। গাড়ি থেকে নামতেই আরহাম দৌড়ে সামনে চলে যায়।

__“আম্মু, পানি নাচে!”
আরহামের উচ্ছ্বাসে জারা হেসে ওঠে। সে ছেলের পেছনে ছুটে গিয়ে বলে,
__“দেখো দেখো, পানির সাথে হাততালি দাও।”
আরহাম ছোট ছোট হাত দিয়ে পানি ছুঁয়ে খিলখিল করে হাসে। জারা সুযোগ পেয়ে পানিতে হাত ভিজিয়ে ছেলের গালে ছিটা দেয়।
__“এই আম্মু!”
আরহাম ভুরু কুঁচকে তাকায়, তারপর নিজেও মায়ের দিকে পানি ছিটাতে থাকে। দুইজনের দুষ্টুমিতে আরমান দূরে দাঁড়িয়ে শুধু হাসে। মনে হয়, এই হাসিটাই তার সব ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আরহাম ছোট ছোট পায়ে ঘাটের মাটিতে ছুটে বেড়ায়, কখনো পানি ছুঁতে চায়, কখনো আবার বাবার দিকে তাকিয়ে হাসে। আরমান ছেলেকে কোলে তুলে ধরে, নদীর দিকে দেখিয়ে কিছু একটা বোঝায়। আরহাম হাত নেড়ে নেড়ে আনন্দে চিৎকার করে। জারা পাশে দাঁড়িয়ে দু’জনকে দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকে। তার ক্লান্ত শরীরেও যেনো হালকা আরাম নেমে আসে।
ঘাটে কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা কাছের পার্কে চলে যায়। পার্কে ঢুকেই আরহাম যেনো আরও দুষ্টু হয়ে ওঠে। পার্কে ঢুকতেই আরহাম দোলনা দেখে লাফিয়ে ওঠে।
__“পাপা, দুল!”
আরমান ছেলেকে দোলনায় বসিয়ে দেয়। জারা পাশে দাঁড়িয়ে দোলনা ঠেলে দেয়, কিন্তু ইচ্ছে করেই একটু বেশি জোরে।আরমান হেসে বলে,

__“এই! আস্তে সোনা ব্যথা পাবে তো!”
জারা চোখ টিপে বলে,
__“বাচ্চারা শক্ত দোলনা পছন্দ করে।”
আরহাম ভয়ে নয়, আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। আরমান মাথা নেড়ে সব মেনে নেয়, কারণ এই দুইজনের হাসির কাছে তার কোনো অভিযোগই টেকে না। এরপর ঘাসের ওপর বসে তারা খেলতে থাকে। জারা হঠাৎ করে আরহামের নাকের ডগায় আঙুল ছুঁইয়ে বলে,
__“তুমি কি আমার ছেলে?”
আরহাম মাথা নেড়ে বলে,
__ “না, আমি পাপার চেলে।”
জারা ভান করে রাগ করে উঠে দাঁড়ায়,
__ “তাহলে আমি চলে যাবো।”
আরহাম দৌড়ে গিয়ে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে,
__“না না আম্মু, তুমি থাকো।”
এই দৃশ্য দেখে আরমানের বুকটা ভরে যায়। সে বুঝতে পারে, তার সামনে যা চলছে তা কোনো সাধারণ মুহূর্ত নয়—এগুলোই জীবনের আসল সুখ।
আরহান আর জারা কখনো দোলনায় ওঠে, কখনো স্লাইডে চড়তে চায়। আরমান এক হাতে ছেলেকে সামলায়, অন্য হাতে জারাকে আগলে রাখে। জারা বেঞ্চে বসে ওদের খেলা দেখে, মাঝে মাঝে হাততালি দিয়ে হাসে। আরহাম দোলনায় উঠেই খিলখিল করে হাসে, পা দুটো ছুড়ে দেয় শূন্যে। তার হাসির শব্দে আশেপাশের মানুষও তাকিয়ে থাকে।

কিছুক্ষণ পর তারা পার্কের ঘাসে বসে বিশ্রাম নেয়। আকাশে তখন সন্ধ্যার রঙ ছড়িয়ে পড়ছে। আরহাম বাবার কোলে মাথা রেখে বসে, জারা পাশে এসে ওদের দু’জনকে ঘিরে ধরে। তারা দিন জন ঘাসের উপর বসে ডোবে যাওয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে। আরমান একহাত জারাকে নিজের বাহুবন্দি করে। ছোট্ট এই সময়টুকুতে শহরের সব কোলাহল দূরে সরে যায়। ঘুরাঘুরি, হাসি আর শান্তির মধ্যে দিয়ে দিনটা ধীরে ধীরে শেষের দিকে গড়িয়ে যায়।
ঘুরাঘুরি শেষে সন্ধ্যার আলো পুরোপুরি ম্লান হয়ে এসেছে। পার্ক আর নদীর পাড়ের কোলাহল পেছনে ফেলে গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির পথে এগিয়ে চলে। স্টিয়ারিংয়ে দু’হাত রেখে আরমান মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করছে। শহরের রাস্তায় তখন ভিড় কম, বাতাসটা শান্ত। গাড়ির ভেতরে নরম আলো, আর সেই আলোতেই তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দুই মানুষ ধীরে ধীরে ঘুমের দেশে চলে গেছে।
আরহাম কখন যে বাবার কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে, আরমান নিজেও টের পায়নি। ছোট্ট মাথাটা বাবার বুকের সঙ্গে ঠেসে আছে। নিঃশ্বাসটা হালকা, নিয়মিত। মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে ঠোঁট কেঁপে ওঠে, যেনো কোনো অদৃশ্য স্বপ্নে হাসছে। আরমান চোখের কোণ দিয়ে ছেলের দিকে তাকায়। এই ছোট্ট শরীর, এই নির্ভরতার ভঙ্গি—সবকিছু মিলিয়ে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয়, এই ছেলেটাই তার শক্তি, তার দুর্বলতা, তার সব কিছু।

পাশের সিটে জারা জানালার দিকে হেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। সারাদিনের ঘোরাঘুরিতে শরীর ক্লান্ত হয়ে এসেছে, সেটা আরমান বুঝেছিল। হিজাবটা সামান্য সরে গেছে, মুখের একপাশে চুলের গোছা এসে পড়েছে। শান্ত ঘুমে তার মুখটা আরও কোমল লাগছে। আরমান এক মুহূর্তের জন্য চোখ ফিরিয়ে নেয় রাস্তা থেকে, শুধু এই দৃশ্যটা মনে গেঁথে রাখার জন্য। ভাবতে থাকে, এই মেয়েটা কত সহজে তার পুরো জীবন বদলে দিয়েছে। এক সময় যে জীবনটা ছিল দায়িত্ব আর হিসাবের খাতায় বন্দি, আজ তা ভরে গেছে অনুভূতিতে।
গাড়ির ইঞ্জিনের মৃদু শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আরমানের ভেতরে কথাগুলো জেগে ওঠে। সে মনে মনে বলে,
__“ এই গাড়ির ভেতরেই যেনো আমার পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে। বাইরে যত ঝড়, যত আগুন, যত লড়াই থাকুক না কেন, এই দুই মুখের শান্ত ঘুম সব কিছুকে তুচ্ছ করে দেয়। মনে হয়, যদি কোনো দিন সবকিছু হারিয়েও যায়, তবু এই দু’জন থাকলে আবার সব শুরু করা যাবে।”

আজ এই মুহূর্তে, এই নিঃশব্দ গাড়ির ভেতরে, তার সব সংশয় মিলিয়ে যায়। ছেলের নিঃশ্বাস আর স্ত্রীর ঘুমন্ত মুখ তাকে মনে করিয়ে দেয়, সে একা নয়। তার পাশে আছে ভালোবাসা, যা কোনো শর্ত মানে না।
স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সে আরও ধীরে গাড়ি চালায়, যেনো কোনো ঝাঁকুনিতে ওদের ঘুম ভেঙে না যায়। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে—এই শান্তি সে আগলে রাখবে। জীবনের প্রতিটি ঝামেলা, প্রতিটি কষ্ট সে নিজে বয়ে নেবে, তবু এই দুই মানুষকে কষ্ট পেতে দেবে না। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভবিষ্যতের ছবি—আরহাম বড় হবে, স্কুলে যাবে, দুষ্টুমি করবে; জারা হয়তো তখনো এইভাবেই একটু রাগ করবে, একটু হাসবে।আর তাদের আগলে রাখবে। আর সে? সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে, ঠিক আজকের মতোই।

গাড়ি যখন বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন আকাশে তারা ফুটে উঠেছে। আরমান একবার আকাশের দিকে তাকায়, তারপর আবার নিজের পৃথিবীর দিকে। মনে হয়, আল্লাহ তাকে যা দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই। এই অনুভূতি গুলো সে কাউকে বলতে পারে না, শব্দে ধরা যায় না। শুধু নিজের ভেতরে যত্ন করে জমা করে রাখে।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৯

শেষ পর্যন্ত গাড়ি বাড়ির গেটের সামনে থামে। আরমান ইঞ্জিন বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। ছেলেটা এখনো গভীর ঘুমে, জারাও। সে একবার গভীর শ্বাস নেয়। মনে মনে বলে—এই মুহূর্তটাই আমার সুখ। তারপর ধীরে ধীরে, খুব যত্নে, সে তার পৃথিবীকে কোলে নিয়ে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নেয়।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৮১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here