রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৯
সোহানা ইসলাম
জারা আর ফারিয়া বেগম এর বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার রোদ নরম হয়ে আসে।সকালটা কেমন তাড়াহুড়োয় কেটে গেলেও এখন সময়টা ধীরে হাঁটছে। জারা গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে, চোখে ক্লান্তি নেই, বরং এক ধরনের শান্ত ভাব। ফারিয়া বেগম পাশে বসে আছেন, মুখে অদ্ভুত উচ্ছ্বাস—যেন বহুদিন পর নিজের মেয়েকে নিয়ে একান্ত সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন। নিজের মেয়ে নেই তো কি হইছে? ছেলের একটা মিষ্টি দেখতে বৌ তো আছে। ওটাই তার মেয়ে।
ডাক্তার দেখানো শেষ হতেই তিনি জারাকে নিয়ে শহরের ভিড়ে ঢুকে পড়েন। শপিংয়ের নাম শুনলেই জারার মুখে যে হালকা হাসিটা ফুটে ওঠে, সেটাই ফারিয়া বেগমের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এক দোকান থেকে আরেক দোকান, কখনো কাপড় ছোঁয়া, কখনো রঙ মিলিয়ে দেখা—সবকিছুতেই জারার পছন্দকে গুরুত্ব দেন তিনি। কোথাও জারা থামে, কোথাও ফারিয়া বেগম নিজেই জোর করে কিছু ধরিয়ে দেন। দু’জনের হাঁটার তালে যেন বয়সের কোনো ব্যবধান নেই। তিনি খুব সাবধানে জারাকে নিয়ে ঘুরাঘুরি করছেন। জারা সাথে যেনো কারো ধাক্কা না গালে তাই তিনি জারাকে নিজের বাহুবন্ধনী করে রেখে হাঁটছেন। এক হাতে পানির বোতল আর ব্যাগ । জারা’র একটু পর পর গলা শুকিয়ে যায়।
হঠাৎ রাস্তার পাশে বসা ছোট্ট স্টলের দিকে জারার চোখ আটকে যায়। পরিচিত সেই ফুচকার গন্ধে তার মুখে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। ফারিয়া বেগম এক মুহূর্তও দেরি না করে ওখানেই নিয়ে যান তাকে। ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে, সাধারণ প্লেটে পরিবেশিত ফুচকা খাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ—তা দামি রেস্টুরেন্টও দিতে পারে না। জারা খেতে খেতে হাসে, আর ফারিয়া বেগম সেই হাসি দেখে আরও বেশি খুশি হন। চারপাশের কোলাহল, মানুষের চলাচল—সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটা হয়ে ওঠে জীবন্ত।
এরপর তারা পার্কে যায়। বিকেলের আলো তখন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে ছায়া আঁকছে। বেঞ্চে বসে একটু বিশ্রাম, একটু হালকা হাঁটা। ফারিয়া বেগম কখনো জারার হাত ধরে, কখনো তার কাঁধে হাত রাখেন। জারার ভেতরের জমে থাকা চাপ যেন ধীরে ধীরে গলে যায়। পাখির ডাক, শিশুর হাসি, বাতাসের মৃদু ছোঁয়া—সবকিছু মিলিয়ে মনটা হালকা হয়ে আসে।
পার্ক থেকে বেরিয়ে দু’জনে একসাথে খাওয়া দাওয়া সেরে নেয়। সাধারণ খাবার, কিন্তু মন ভরা। সন্ধ্যার আলো নামতে নামতে তারা বাড়ির পথে রওনা হয়। গাড়ির ভেতর নীরবতা, তবে সেটা ভারী নয়—আরামদায়ক। বাড়িতে ফিরতেই দিনের ক্লান্তি টের পাওয়া যায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি থাকে তৃপ্তি।
জারা ফারিয়া বেগমের বাহু ধরে হাসিমুখে বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ড্রইংরুমটা যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে। সোফায় বসে থাকা আরমান ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। সেই হাসিটা দেখেই জারার বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। সকালবেলায় যে পোশাকে দেখেছিল, এখনো ঠিক সেটাই গায়ে। চুল এলোমেলো, চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ, মুখটা শুকনো শুকনো। দেখলেই বোঝা যায়—লোকটা ফ্রেশ তো দূরের কথা, ঠিকমতো খায়ও নি।
আরমান বসা থেকে উঠে এসে জারার সামনে দাঁড়ায়। কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে ওর মাথার হিজাবটা খুলে দেয়। এই নিঃশব্দ স্পর্শে জারা চোখ নামিয়ে নেয়। তারপর আরমান মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
__“ এতো সময় লাগলো যে তোমাদের, আম্মু?
ফারিয়া বেগম ইচ্ছে করেই একটু গম্ভীর মুখ করে বলেন,
__“ তোকে সেই কৈফিয়ত দিতে হবে। আমি আর আমার মেয়ে আজ খুব ঘুরাঘুরি করেছি। শপিং এ গেছি, ফুচকা খেয়েছি, পার্কে গেছি—খুব আনন্দ করেছি।”
বলেই মুখ বাঁকান। আরমান মায়ের এই নাটুকে ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলে, সাথে জারাও। সেই হাসিতে দুপুরের ক্লান্তি, সন্ধ্যার শান্তি সব একসাথে মিশে যায়।
আরমান হালকা গলায় বলে,
__“ ভালো করেছো আম্মু, তোমার মেয়ে কে নিয়ে ঘুরাঘুরি করেছো । ”
তারপর জারাকে বলে,
__“ এখন মন ভালো হয়েছে?”
জারা মাথা নাড়ে, “মন ভালো হয়েছে।”
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে বের হন জেসমিন বেগম। ওদের দেখে বলেন,
__“ ও তোরা এসেছিস? আমি তো ভাবলাম আজ বুঝি দুই শাশুড়ি–বউমা বাড়ি ফিরবিই না। আর ছেলে টা না খেয়ে বসে থাকবে।”
এই কথা শুনে জারা আর ফারিয়া বেগম এক সাথে আরমানের দিকে কপাল কুঁচকে তাকায়। জারা সঙ্গে সঙ্গে আরমানের দিকে ঘুরে বলে,
__“ স্বামীজান, আপনি খান নি সারাদিন?”
আরমান কিছু বলার আগেই রিয়াতকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ফিহা বলে ওঠে,
__“ কি করে খাবে? একজন যে সকালে হুকুম দিয়ে গেছে—বাড়িতে এসে সবার আগে সে তার স্বামীজানের মুখ দেখতে চায়। তাই সে সারাদিন সদর দরজার সামনে বসে ছিল। ফ্রেশও হয়নি, খায়ওনি। যদি বউ এসে তাকে না দেখে—এই ভয়!”
ফিহার কথা শেষ হতেই জারার বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দেয়। সে সারাদিন খেয়ে, ঘুরে, হেসে এসেছে আর লোকটা শুধু তার অপেক্ষায় বসে ছিল! আর সে পাষান নারী একবারও কল দেয়নি তার স্বামীজান কে—এই ভাবনাটাই ওকে ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে খেতে থাকে। ফারিয়া বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
__“ এ কেমন পাগলামি আরমান? খাসনি কেন? দেখ তো মুখটা কেমন শুকনো!”
আরমান আর কিছু শোনে না। জারা দাড়িয়ে থেকেই কোমড়ে হাত দেয়। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ক্লান্ত খুব। আরমান হঠাৎ এক ঝটকায় জারাকে কোলে তুলে নেয়।
__“ বউ এসেছে, এখন খাবো। মন, পেট, কলিজা, লিভার—সব একসাথে ভরে খাবো।’’
এই কাণ্ড দেখে সবাই হেসে ফেলে। ঠিক তখনই ফিহার কোলে থাকা রিয়াত লাফিয়ে ওঠে, দুহাত উঁচু করে বলে,
__“ তাত্তু! তাত্তু তুলে নাও!”
আরমান ভ্রু কুঁচকে বলে,
__“ এই! তুই আমার বউয়ের জায়গা দখল করতে চাস?”
রিয়াত তৎক্ষণাৎ হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বলে,
__“ তাত্তু পুচা! তুলে নেয় না!”
রিয়াতের এই আধো কথা শুনে পুরো ড্রইংরুম আবার হাসিতে ভরে যায়। আরমান জারাকে কোলে নিয়েই সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। জারা লজ্জায় আর অপরাধবোধে একসাথে গলা নামিয়ে বলে,
__“ আম্মু, খাবারটা…!”
জারা কিছু বলার আগেই মিম বলে ওঠে,
__“বুঝেছি ম্যাডাম। খাবার ঘরে পাঠিয়ে দিব। আগে গিয়ে দুজন ফ্রেশ হও।”
আরমান বলে,
__“রুমে পাঠানোর দরকার নেই। আমরা নিচে আসবো! ”
রুমে ঢুকেই আরমান ধীরে জারাকে নামিয়ে দেয়। দরজা বন্ধ হতেই তার হাসিটা মিলিয়ে যায়। সে দুহাত দিয়ে জারার মুখটা ধরে কপাল কপালে ঠেকায়।
__“ ফোন করোনি কেনো? আমার উপর এখনো রাগ, অভিমান, অভিযোগ আছে? থাকলে বলো নিজের ভুল ঠিক করে নেই।”
জারা চোখ নামিয়ে ফেলে,
__“ ভুল হয়ে গেছে। আর..আর আপনার উপর আমার কোনো রাগ নেই..! ”
আরমান গভীর নিশ্বাস নেয়,
__“ তুমি ভালো থাকলেই আমার সব ঠিক থাকে। কিন্তু এমনটা কোরো না। ”
জারা আর কিছু বলে না। শুধু শক্ত করে আরমানকে জড়িয়ে ধরে। অনেকক্ষণ পর ফিসফিস করে বলে,
__“ আপনি না খেয়ে ছিলেন জেনে খুব খারাপ লাগছে। আর আমি বলেছি এসে যদি না দেখি তাহলে রাগ করব। তাই বলে সারাদিন না খেয়ে বসে থাকতে হবে আমার জন্য ? ”
আরমান হালকা হেসে বলে,
__“ তুমি না থাকলে খিদে লাগে না। আর তোমার জন্য বসে না থেকে কার জন্য বসে থাকব বলো?”
এই কথায় জারার চোখ ভিজে ওঠে। সে আরমানের বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলে। আরমান চুপচাপ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ফ্রেশ হয়ে দুজন নিচে নামতেই দেখে ড্রাই নিং টেবিলে খাবার সাজানো। সবাই বসে আছে। আরমান আজ একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে খায়, যেন জারাকে বোঝাতে চায়—সব ঠিক আছে। খাওয়ার শেষে রিয়াত এসে আরমানের কোলে বসে পড়ে। জারা তাকিয়ে থাকে—এই মানুষটা, এই সংসারটা, এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই তো তার পৃথিবী।
খাবার শেষ করে ঘরে ফিরলে আরমান জারাকে নিজের বুকে টেনে নেয়।
__“ আর রাগ করবে স্বামীজানের উপর ?”
জারা মাথা নাড়ে,
__“ না।”
আরমান হালকা হাসে। বাইরে হালকা বাতাস বইছে। ভেতরে নিঃশব্দে তৈরি হচ্ছে আরেকটা শান্ত রাত—যেখানে অভিমান নেই, আছে শুধু ভালোবাসা আর একে অন্যকে আঁকড়ে থাকার অদ্ভুত ক্ষমতা।
রাত তখন অনেক। ঘরের বাতিটা নিভে আছে, শুধু বারান্দার দিক থেকে আসা হালকা আলোয় ঘরটা আধো আধো দেখা যায়। চারপাশ নিস্তব্ধ, মাঝেমধ্যে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ। জারা গভীর ঘুমে ছিল। হঠাৎই কেমন একটা অচেনা শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। প্রথমে সে বুঝতে পারে না—স্বপ্ন না বাস্তব। তারপর আবার স্পষ্ট করে শোনে, নাক টানার মৃদু শব্দ। কারো চাপা কান্নার মতো।
জারা ধীরে চোখ মেলে। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। আরমান নেই। বুকের ভেতরটা কেমন যেন শিরশির করে ওঠে। বড় পেটটা নিয়ে কষ্ট করে উঠে বসে সে। ঘর আধো আলোয় ভরা, সবকিছু ঝাপসা হলেও দেখা যায়। জারা দেখে আরমান ঘরের এক পাশে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু একটা করছে, বারবার ঝুঁকছে, আবার সোজা হচ্ছে। আর মাঝে মাঝেই নাক টানার শব্দটা আসছে।
জারার বুকটা হঠাৎ মুচড়ে ওঠে। ভয়, দুশ্চিন্তা আর অজানা আশঙ্কা একসাথে ভর করে। নরম, ভাঙা গলায় বলে ওঠে,
—“ স্বামীজান… না ঘুমিয়ে আপনি কী করছেন?”
কোনো উত্তর আসে না। আরমান নড়ে না, শুধু তার হাত দুটো ব্যস্ত। জারা আরও অস্থির হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে বড় পেটের ভারে একটু কষ্ট হয়। এক হাতে বিছানার কিনারা ধরে, অন্য হাতে দেয়ালে ভর দিয়ে সে আরমানের দিকে এগোয়।
আরমান বুঝতে পারে—তার লক্ষ্মী বউ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তবুও সে ফিরে তাকায় না। জারা কাছে গিয়ে দেখে—বিছানার পাশে একটা ব্যাগ খোলা। তার নিজের কাপড়, বাচ্চার ছোট ছোট জামা, মোজা, টুপি… সব গুছানো হচ্ছে। কাপড়গুলো নতুন, পরিষ্কার, কিছুতে এখনো ট্যাগ ঝুলছে। এই কাপড়গুলো আরমান নিজেই শখ করে কিনেছে বেবির জন্য । অনলাইনে যা যা দেখে ভালো লেগেছে—সব অর্ডার করেছে। অথচ এখন… জারা লক্ষ করে, আরমানের কাঁধ কাঁপছে। সে কাঁদছে। জারার চোখে পানি চলে আসে। আলতো করে আরমানের বাহু ধরে বলে,
—“ স্বামীজান… আপনি কাঁদছেন কেন?”
আরমান আর কিছুক্ষণ কাপড় গুছায়। তারপর ধীরে ব্যাগটা বন্ধ করে। গভীর নিশ্বাস নিয়ে জারার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। আলোতে তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়। চোখ দুটো লাল, গাল ভেজা। মুখটা শক্ত করে রাখা, যেন কান্নাটা আর বের হতে না পারে। জারার বুক ধক করে ওঠে। সে ব্যাকুল হয়ে বলে,
—“ একি… আপনি কাঁদছেন কেন? কী হয়েছে? আমাকে বলুন।”
আরমান আর নিজেকে সামলাতে পারে না। এক ঝটকায় জারাকে শক্ত করে বুকে টেনে নেয়। বুকের ভেতর থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
—“ আমি তোমার রিপোর্টগুলো দেখেছি… ডাক্তার বলেছে সিজার করতে হবে, তাই না?”
জারা কিছু বলার আগেই আরমানের কথা গড়িয়ে গড়িয়ে বের হয়,
—“ ওই পাষাণ ডাক্তারগুলো তোমার পেট কেটে ফেলবে। তুমি কতো কষ্ট পাবে জানো? শুধু ভাবলেই আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। বুকে ব্যথা করে। আমি সহ্য করতে পারছি না, জারা… আমি পারছি না।’’
সে একটু থামে, তারপর আরও ভাঙা গলায় বলে,
—“ তোমার কেমন লাগবে বলো? তুমি ভয় পাচ্ছো না তো বউ ? যদি… যদি তোমার কিছু হয়ে যায়…আ..আমি.. ম..!”
এই কথা বলেই আরমানের গলা ধরে আসে। সে আর কথা বলতে পারে না। জারা মুহূর্তের মধ্যে সব ভয় ভুলে যায়। নিজের কষ্ট, নিজের ভয়—সব পেছনে চলে যায়। সে দুহাতে আরমানের মুখটা ধরে, কপালটা নিজের কপালে ঠেকায়। শান্ত, দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
—“ আমার কিছু হবে না।”
আরমান অবাক হয়ে তাকায়। জারা মৃদু হাসে, চোখে পানি জমে ওঠে।
—“ আপনার মুখে হাসি ফুটাতে হলেও আমি মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ফিরে আসবো। এতো চিন্তা করবেন না।”
আর একটু থেমে নরম স্বরে যোগ করে,
—“ আর ব্যাগ গুছাচ্ছেন কেন?”
আরমান চোখ নামিয়ে নেয়।
—“ তোমার আর বেবির কাপড় গুছিয়ে রাখছি। যদি পরে সময় না পাই…”
জারা হেসে ফেলে। সেই হাসিতে ভালোবাসা আর মায়া একসাথে মিশে যায়। সে আরমানের গাল ছুঁয়ে চোখের পানি মুছে দেয়।
—“ আমার পাগল স্বামীজান। এতো কেন ভালোবাসেন আমায়?”
আরমান কোনো উত্তর দেয় না। শুধু তাকিয়ে থাকে—এই তাকিয়ে থাকায় হাজারটা কথা লুকানো। সে জারার হাত ধরে বিছানার দিকে নিয়ে যায়।
—“ এসো, শুয়ে পড়ো। তেল গরম করে এনেছি। পায়ে মালিশ করে দেই।”
জারা অবাক হয়ে বলে,
—“ তেল কখন গরম করলেন?”
আরমান হালকা স্বরে বলে,
—‘‘একটু আগেই। অনেক গরম ছিল, তাই ঠান্ডা হওয়ার জন্য রেখে দিয়েছিলাম।”
জারা আর কিছু বলে না। ধীরে বিছানায় শুয়ে পড়ে। আরমান চুপচাপ পায়ের কাছে বসে। গরম তেলে হাত ডুবিয়ে আলতো করে জারার পায়ে মালিশ শুরু করে। বড় পেটের ভারে ফুলে থাকা পা, হালকা ফোলা আঙুল—সবকিছু সে খুব যত্নে ছুঁয়ে দেয়। যেন একটু ব্যথাও না লাগে।
জারা চুপচাপ আরমানের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মানুষটা—তার স্বামী—কত নিঃশব্দে ভালোবাসে তাকে। মুখে কম বলে, কিন্তু কাজে কাজে সব উজাড় করে দেয়। মালিশ করতে করতে আরমান বলে,
—” ব্যথা লাগছে?”
জারা মাথা নাড়ে।
—“ না… ভালো লাগছে।”
আরমান হালকা করে হাসে। সেই হাসির ভেতরেও ভয় লুকানো। কিছুক্ষণ পর জারার চোখ ভারী হয়ে আসে। দিনের ক্লান্তি, রাতের আবেগ—সব মিলিয়ে সে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে। শ্বাসটা সমান হয়ে আসে। আরমান মালিশ শেষ করে তেল সরিয়ে রাখে। তারপর ধীরে জারার পায়ের ওপর কম্বল ঠিক করে দেয়। পাশে বসে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার ঘুমন্ত মুখের দিকে। তারপর আলতো করে হাত রাখে জারার পেটে।
নরম স্বরে কথা বলে,
—“ পাপা… তুমি হলে আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন। তুমি জানো না, তোমার আসার জন্য আমরা কত অপেক্ষা করছি। তোমার আম্মু কতো কান্না করেছে তোনাকে পেতে? তুমি তোমার আম্মুকে কষ্ট দিও না, ঠিক আছে?”
সে একটু থামে, গলা ভারী হয়ে আসে।
—” আমার সব শক্তি তোমরা দুজন। তোমরা ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকবো সোনা। ”
আরমান ধীরে জারাকে নিজের বুকে টেনে নেয়। খুব সাবধানে, যেন তার ঘুম না ভেঙে যায়। নিজের কপালটা জারার চুলে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে।
বাইরে গভীর রাত। ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই দুইটা হৃদয় একে অন্যকে আগলে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে—ভয়, দুশ্চিন্তা আর ভালোবাসা একসাথে নিয়ে, নতুন জীবনের অপেক্ষায়।
মাঝে আরও বেশ কিছু দিন কেটে গেছে। সময় যেন হঠাৎ করেই ছোট হয়ে এসেছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল দাগ দেওয়া তারিখটা এখন আর দূরে নেই। জারার ডেলিভারি ডেট এগিয়ে এসেছে—আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। পুরো খান বাড়িটা অদ্ভুত এক উত্তেজনা আর অজানা আশঙ্কায় ভরে আছে। কেউ মুখে না বললেও সবার চোখে চোখে একটা চিন্তা—সব ঠিকঠাক হোক।
জারার শরীর এখন বেশ ভারী। পা দুটো ফুলে গেছে, হাঁটলেই হাঁপিয়ে যায়।ওর গায়ে সুতি কাপড়ের একটা ডিলেডালা জামা। হাটতে গেলে একটু কষ্ট হয়।তাই আরমান এখন প্রায়ই জারাকে কোলে করেই এক ঘর থেকে আরেক ঘরে নিয়ে যায়। সেই দিনও ব্যতিক্রম নয়। আরমান খুব সাবধানে জারাকে কোলে তুলে ড্রইংরুমে নিয়ে আসে। যেন একটুও ধাক্কা না লাগে। ড্রইংরুমের সোফায় বসিয়ে দিয়ে নিজেও পাশে বসে পড়ে।
সোফার সামনে মেঝেতে রিয়াত আর জেরিন বসে খেলছে। রঙিন ব্লক, ছোট গাড়ি, খেলনা বল—সব ছড়িয়ে আছে। রিয়াত এখন বেশ পাকা। হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে, আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজেকে খুব বড় মানুষ মনে করে। জারা মুচকি হেসে রিয়াতের দিকে তাকায়।
—“ রিয়াত বাবু কী করে?”
রিয়াত মাথা তুলে গম্ভীর মুখে বলে,
—“ পুপির সাথে কেলি।”
জারা হেসে ওঠে।
—“ তাই নাকি?”
রিয়াত গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।
—“ হ্যাঁ।”
আরমান পাশে বসে এই দৃশ্যটা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। ছোট্ট সংসারের এই মুহূর্তগুলো তার কাছে এখন অমূল্য। এই ক’দিনে বাড়ির দায়িত্ব অনেকটাই ভাগ হয়ে গেছে। রাশেদ আর জাহেদ অফিসে ব্যস্ত। আসিফ খান আর আরিফ খান দুই ভাই কোম্পানির কাজে লন্ডন গেছেন। আপাতত অফিসটা রোহান, রাশেদ আর জাহেদ মিলে সামলাচ্ছে। আরমান অফিসে যায় না, কিন্তু বাড়িতে বসেই কাজ করে। ল্যাপটপটা প্রায়ই পাশে থাকে, তবু চোখ থাকে জারার দিকেই।
এমন সময় মিম খাবারের বাটি হাতে করে ড্রইংরুমে আসে রিয়াতকে খাওয়ানো।
—“ রিয়াত আয় বাবা খাইয়ে দিই। কিছু খাস নি এখনো।”
কিন্তু রিয়াত কি আর এত সহজে রাজি হয়? সে বাটি দেখেই মুখ বাঁকায়।
—“ আমি খাবো না!”
বলেই দৌড়। একবার সোফার দিকে, একবার জেরিনের কাছে। মিম তার পেছনে পেছনে দৌড়ায়। কিছুক্ষণ পর হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
—“ এই ছেলে আমাকে মেরে ফেলবে আজ!”
জারা আরমানের দিকে তাকিয়ে হাসে। আরমান ঠোঁট চেপে হাসি আটকায়। এদিকে জেসমিন বেগম রান্নাঘর থেকে কাটা ফলের প্লেট হাতে নিয়ে আসেন। প্লেটটা জারার হাতে দিয়ে আদুরে গলায় বলেন,
—“ এই নে, সব শেষ করবি। একটাও যেনো না থাকে!”
জারা ফলের দিকে তাকায়। এতক্ষণে তার খাওয়ার ইচ্ছে নেই। কিন্তু পাশে আরমান বসে আছে। এখন “খাবো না” বললে ধমক খাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। সে চুপচাপ প্লেটটা হাতে নেয়।
ঠিক তখন ফিহা এসে রিয়াতকে ধরার ভান করে বলে,
—“ আমি রিয়াত বাবুকে ধরে ফেলেছি!”
রিয়াত খিলখিল করে হেসে ওঠে। সেই সুযোগে মিম এক চামচ খাবার তার মুখে ঢুকিয়ে দেয়। রিয়াত খাবার মুখে নিয়ে আবার ছুট দেয়। একবার জেরিনের কাছে, আবার জারার কাছে। জারা পেটের ভারে নড়তে পারে না, শুধু হাসে। আরমান এবার গলা চড়িয়ে বলে,
—“ এই যে, পাকা ছেলে! চুপ করে বসে খা। না হলে তোকে বিক্রি করে দেব পাগলের কাছে !”
রিয়াত ভয় পেয়ে থমকে যায়। চোখ বড় বড় করে আরমানের দিকে তাকায়। ঠিক সেই মুহূর্তে জারা ঠাস করে আরমানের বাহুতে একটা কিল বসিয়ে দেয়।
—“ ভয় দেখাচ্ছেন কেন ওকে? ও বাচ্চা, এত কিছু বোঝে!”
আরমান কিল খেয়ে একটু অবাক হয়, তারপর বাহুতে হাত বুলাতে বুলাতে হেসে বলে,
—“ ও বাচ্চা? বাচ্চা হলেও তো বউটা খুব ভালো বুঝে।”
সবাই একটু থমকে যায়। জারা চোখ বড় করে তাকায়।
—“ কী বললেন?”
আরমান নির্লজ্জ ভঙ্গিতে বলে,
—“ নূর আসলেই বউ বউ করে।”
এই কথা শুনে ড্রইংরুমে হাসির রোল পড়ে যায়। মিম হেসে বলে,
—“ এসব তো রোহান ভাইয়া আর জাহেদ ভাইয়া শিখিয়েছে ওকে।”
রিয়াত হঠাৎ বলে ওঠে,
—“ আম্মু বউ আতবে না আলার কাছে?”
আরমান জয়ের হাসি হেসে বলে,
—“ দেখেছো! কেমন পাকা ছেলে! এ নাকি বাচ্চা?”
আবারও সবাই হেসে ওঠে। জারা মুখে হাসি রাখলেও ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। এই হাসি, এই কোলাহল—সবকিছু তার খুব আপন। কিছুক্ষণ পর ফারিয়া বেগম তেলের বোতল হাতে নিয়ে আসেন।
—“ জারা, আয় মা। চুলে তেল দিয়ে দিই।”
জারা একটু আদুরে গলায় বলে,
—“ একটু দিও আম্মু। বেশি না।”
—“আচ্ছা, ”—ফারিয়া বেগম বলেন।
ঠিক তখনই আরমান বলে ওঠে,
—“ আম্মু, আমার কাছে দাও। আমি দিয়ে দিই।”
জারা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়। লোকটা দিন দিন আরও বেশি শয়তান হচ্ছে। প্রকাশ্যে এসব বলে দেয়!
মিম আর ফিহা একসাথে বলে ওঠে,
—“ আহা! কী ভালোবাসা!”
ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম মুচকি হেসে একে অপরের দিকে তাকান। আরমানও এবার একটু লজ্জা পায়। জেসমিন বেগম মজা করে বলেন,
—“ এই মেয়েরা, ওদের লজ্জা দিস না।”
সবাই আবার হাসে। ফারিয়া বেগম চুলে তেল দিতে বসেন। আরমান পাশে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে দেখে। কখনো তেল এগিয়ে দেয়, কখনো জারার চুল ঠিক করে দেয়। জারা চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। এই স্পর্শ, এই যত্ন—সবকিছু তাকে শান্ত করে। তেল দেওয়া শেষ হলে জারা সোফায় হেলান দেয়। হঠাৎ একটু ক্লান্ত লাগে। আরমান সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে এসে বসে।
—” ব্যথা লাগছে? ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো?”
জারা মাথা নাড়ে।
—“ না, একটু ক্লান্ত লাগছে।”
আরমান তার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আলতো করে চেপে ধরে। কিছু না বলেও যেন অনেক কথা বলে দেয়। ড্রইংরুমে তখন আবার স্বাভাবিক কোলাহল। রিয়াত জেরিনকে নিয়ে খেলছে, মিম আর ফিহা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে, আর এই সব কিছুর মাঝখানে জারা বসে আছে—ভারী পেট, ক্লান্ত শরীর, কিন্তু ভরা মন নিয়ে। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সামনের দিনগুলো।
সন্ধ্যার নরম আলোটা ধীরে ধীরে আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছিল। ড্রইংরুমে বাতির হলুদ আলো জ্বলছে। আরমান সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে, কোলে জারা। জারার মাথাটা আরমানের বুকের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখা। সামনে ল্যাপটপ খোলা, স্ক্রিনে নানা ফাইল আর গ্রাফ। আরমান মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে, আর জারা কৌতূহলী চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে—যেন কিছুই বুঝছে না, তবু বুঝতে চাইছে।
মাঝে মাঝে জারা দুষ্টুমি করে আরমানের শার্টের বোতামে আঙুল বুলিয়ে দেয়, কখনো হালকা করে কানে ফুঁ দেয়। আরমান একটুও বিরক্ত হয় না। বরং হেসে বলে,
— “এই মানজারা, কাজ করতে দেবে নাকি। দুষ্টু করবে?”
জারা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— “আমি তো শুধু দেখছি। আপনি কাজ করুন।”
আরমান মাথা নেড়ে আবার স্ক্রিনে মন দেয়। ঠিক তখনই ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে নাম—রোহান। আরমান ফোনটা ধরে। জারা লক্ষ্য করে, প্রথম কয়েক সেকেন্ডেই আরমানের মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায়। চোখ দুটো গম্ভীর হয়ে ওঠে। সে সোজা হয়ে বসে, জারাকে একটু আলাদা করে বসায়। ফোনের ওপাশে কী কথা হচ্ছে, জারা শুনতে পায় না, কিন্তু আরমানের গলার টোন থেকেই বুঝে যায়—খুব সিরিয়াস কিছু।
— “কি বলছিস?”
— “ফায়ার সার্ভিসকে জানানো হয়েছে?”
— “সবাই বের হয়েছে তো?”
জারার বুকটা অজানা আশঙ্কায় ধক করে ওঠে। কিছু একটা খুব খারাপ হয়েছে—সে নিশ্চিত। কল কেটে যায়। আরমান এক মুহূর্ত ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর সেটা বন্ধ করে। জারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— “শুনো মানজারা, আমাকে একটু ইমারজেন্সি বের হতে হবে।”
জারা উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করে,
— “কি হয়েছে?”
— “ইসলামপুর গ্রামের ব্রাঞ্চে আগুন লেগেছে। ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। আমাকে যেতে হবে।”
জারার হাত ঠান্ডা হয়ে আসে।
— “কারো কিছু হয়নি তো?”
— “রিপোর্ট অনুযায়ী সবাইকে বের করা হয়েছে।এখনো বড় কোনো ক্ষতির খবর নেই।”
কিছুটা থেমে যোগ করে,
— “রোহানরা রওনা হয়েছে। আমিও এখন বের হবো।”
জারা আরমানের শার্টের হাতা চেপে ধরে। গলায় ভয় লুকোনো কাঁপুনি,
— “আপনি একাই যাবেন?”
— “না, বাকিরাও যাচ্ছে।”
— “আমার খুব ভয় করছে স্বামীজান,” জারা প্রায় ফিসফিস করে বলে, — “আপনি না গেলে হয় না?”
এই কথাটাই যেন আরমানের ভেতরের চাপা উত্তেজনাকে ছাপিয়ে দেয়। সে হঠাৎ গলা শক্ত করে ফেলে,
— “এমন জ্ঞানহীন কথা বলো না। এটা আমার দায়িত্ব। আমাকে যেতেই হবে।”
জারা চমকে ওঠে। আরমান আবার বলে,
— “ভয় পাওয়ার কি আছে? আম্মু, ছোট আম্মু সবাই তো আছেই।”
জারার চোখে পানি চলে আসে। সে আর কিছু বলে না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। আরমান তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। গাড়ির চাবি নিতে নিতে বলে,
— “আমি আসছি। ভয় পেলে আম্মুর কাছে থেকো।”
জারা অভিমান চাপা দিয়ে বলে,
— “আমি একাই থাকতে পারবো।”
আরমান কথাটা হয়তো পুরোটা শোনে না। সে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সবার কাছে বলে যায় যেন জারার খেয়াল রাখা হয়। দরজা বন্ধ হয়ে গেলে ড্রইংরুমটা হঠাৎ করে খুব বড় আর ফাঁকা মনে হয়। কিছুক্ষণ পর টিভি চালু হয়। হেডলাইনে ভেসে ওঠে
—“খান ইন্ডাস্ট্রির নতুন ব্রাঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড”
এই একটা লাইনেই ঘরের সবার মুখের রং বদলে যায়। ফারিয়া বেগম কপালে হাত দেন। জেসমিন বেগম দোয়া পড়তে শুরু করেন। মিম ফিসফিস করে বলে,
— “আল্লাহ ভরসা।”
জারা সোফায় বসে আছে, কিন্তু মনটা সেখানে নেই। বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা চাপ। হাত দিয়ে নিজের পেটটা ছুঁয়ে দেখে—বেবিটা নড়ছে কি না।
হালকা একটা নড়াচড়া টের পেয়ে একটু স্বস্তি পায়।
— “সব ঠিক হবে,” নিজেকে নিজেই বলে।
সময় যেন কাটতেই চায় না। মিনিটগুলো ঘন্টার মতো লাগছে। বাইরে মাঝে মাঝে গাড়ির শব্দ, কিন্তু আরমানের গাড়ির শব্দ নয়। হঠাৎ জারার মাথা ঘুরে ওঠে। বুকের ভেতর কেমন মোচড় দেয়। সে সোফার হাতলটা শক্ত করে ধরে। মিম সেটা লক্ষ্য করে ছুটে আসে।
— “জানু, তুই ঠিক আছিস ?”
— “হ্যাঁ… একটু মাথা ঘুরছে আর একটু পেটে ব্যাথা করছে ।”
ফারিয়া বেগম তাড়াতাড়ি এসে জারার কপালে হাত রাখেন।
— “এই মেয়ের শরীরটা ভালো না। ওকে শুইয়ে দাও।”
জেসমিন বেগম পানি আর গ্লুকোজ নিয়ে আসেন। জারাকে ধরে ধরে রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সবাই জায়রা রুমে জারা’র পাশে বসে আছে। শুইয়ে দেওয়ার পরও জারার মন শান্ত হয় না। চোখ বন্ধ করলেই আরমানের রাগী মুখটা ভেসে ওঠে। কথা কাটাকাটির শেষটা ঠিক ভালো হয়নি—এই ভাবনাটা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
— “আমি কি ভুল বলেছি? আমার জন্য তো সবাই আছে। কিন্তু ওখানে তো কতো মানুষ কাজ করে। তাদের কিছু হয়ে গেলে কে দেখবে? আমি সত্যিই জ্ঞানহীনের মতো কথা বলেছি তখন ?”
চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।রাত তখন দুটার ঘরে। হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। সবাই চমকে যায়। জারা কাঁপা হাতে ফোন ধরে। স্ক্রিনে নাম ভেসে ওঠে—আরমান।
— “স্বামীজান…?” গলা ভেঙে আসে।
ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ, একটু ক্লান্ত কিন্তু নিরাপদ,
— “আমি ঠিক আছি মানজারা। ভয় পেয়ো না। আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে।”
জারার বুকটা হালকা হয়ে আসে।
— “আপনি ঠিক আছেন?”
— “হ্যাঁ। আর তুমি?”
— “আমি… আমি ভালো আছি। আর সরি। ”
আরমান একটু নরম গলায় বলে,
— “আমি ও সরি। তখন তোমাকে রাগ দেখাতে চাইনি।”
জারার চোখ ভিজে যায়। আরমান বলে
— “ আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো। আমার জন্য অপেক্ষা করো।”
কল কেটে গেলে জারা ফোনটা বুকে চেপে ধরে। বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছে। কিন্তু এই গভীর রাতের মধ্যেই কোথাও একটা ভরসার আলো জ্বলছে—আরমান ঠিক আছে, ফিরে আসবে। আর সেই অপেক্ষাতেই জারা চোখ বন্ধ করে, হাত রেখে নিজের পেটে, মনে মনে বলে,
— “তোমার আব্বু আসে পরবে বাবা… আমরা সবাই একসাথে থাকবো।”
রাত তখন প্রায় চারটা। ঘরজুড়ে গভীর নীরবতা, শুধু দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দ। হঠাৎ করেই জারার ঘুম ভেঙে যায়। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে, পেটের নিচে তীব্র ব্যথা। সে কষ্ট চেপে উঠে বসে। বুঝতে আর বাকি থাকে না—লেবার পেইন শুরু হয়ে গেছে। পাশে শুয়ে থাকা ফারিয়া বেগম কে ডাক দেয়
— “আম্মু…” কাঁপা গলায় ডাকে জারা।
ফারিয়া বেগম ধরফরিয়ে উঠে । জারার কপালে হাত রেখেই বুঝে যান পরিস্থিতি ভালো না। নির্ধারিত ডেটের এখনও এক সপ্তাহ বাকি। জেসমিন বেগমও চলে আসেন। দু’জনের মুখেই উদ্বেগের ছাপ।
— “ব্যথা কতক্ষণ পর পর হচ্ছে মা?” ফারিয়া বেগম জিজ্ঞেস করেন।
— “খুব… খুব ব্যথা করছে আম্মু,” জারা চোখ বন্ধ করে কাঁদতে থাকে। জারা’র গলার স্বর শুনে সবাই ওর ঘরে এসে উপস্থিত হয়।
আর দেরি না করে সবাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়—ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে এখনই। বাড়ির লোকজন তাড়াহুড়ো করে প্রস্তুতি নেয়। গাড়ি বের করা হয়। মিম দ্রুত জারার ব্যাগটা নিয়ে নেয়, যেখানে আগেই কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস গুছানো ছিল।ফিহা রিয়াতকে কোলে নেয়। সেজমিন আর ফারিয়া বেগম জারাকে ধরে ধরে গাড়িতে তোলা হয়। সে বারবার আরমানের কথা বলে উঠছে,
— “স্বামীজান… আ..আসেনি আম্মু? আমার খুব ভয় করছে…”
মিম শক্ত করে জারার হাত ধরে বলে,
— “জানু, কিছু হবে না। ভাইয়া চলে আসবে ।”
গাড়ি ছুটে চলে হাসপাতালের দিকে। জেসমিন বেগম জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া পড়তে থাকেন। ফারিয়া বেগম চোখ বন্ধ করে আল্লাহর কাছে সন্তানের সুস্থতা কামনা করেন। এই ফাঁকে মিম কাঁপা হাতে ফোন বের করে আরমানকে কল দেয়। কয়েক রিংয়ের পর ফোন ধরে আরমান।
— “ভাইয়া…” মিমের গলা ভেঙে আসে,“ জানুর লেবার পেইন উঠেছে। আমরা হাসপাতালে যাচ্ছি।”
ওপাশ থেকে মুহূর্তের নীরবতা। তারপর আরমানের কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে,
— “কি বলছো? ডেটের আগেই?”
— “জি ভাইয়া।”
আরমান গভীর শ্বাস নেয়।
— “আমার লক্ষ্মী বউয়ের খেয়াল রেখো। আমি আসছি। এখনই রওনা হচ্ছি। আমি না আসা পর্যন্তু আমার লক্ষ্মী বউয়ের খেয়াল রেখো। ”
কল কেটে দিয়ে আরমান সিদ্ধান্ত নেয় সে ফিরে যাবে। রোহানদের সবাই বলে এদিকে সামলে দিতে । চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
— “হে আল্লাহ, আমার বউ আর সন্তানকে সুস্থ রাখো। ওরা আমার সবকিছু।”
হাসপাতালে পৌঁছাতেই নার্সরা জারাকে দ্রুত ভেতরে নিয়ে যায়। হুইলচেয়ারে বসানো জারা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়, কিন্তু তবু মুখে চেষ্টা করে শক্ত থাকার। ডাক্তার এসে পরীক্ষা শুরু করেন। ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম বাইরে বসে দোয়া পড়েন। মিম দরজার সামনে অস্থির হয়ে হাঁটাহাঁটি করে। জেরিন কেবিন থেকে একটু দূরে বসে আছে। রিয়াতকে নিয়ে তাদের সাথে ফিহাও।
রাতের ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি ছুটে চলছে। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে আরমান, চোখ দুটো লাল, কপাল ভেজা ঘামে। সামনে তাকিয়ে আছে, কিন্তু মনে হচ্ছে সে কিছুই দেখছে না। তার সব মন, সব চিন্তা আটকে আছে এক জায়গায়—হাসপাতালের ওই ঘরে, যেখানে তার বউ কষ্টে আছে। গাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেই আরমান ফিসফিস করে আল্লাহর কাছে কথা বলতে থাকে।
__“ হে আল্লাহ… তুমি তো সব জানো। আমি তো কিছুই চাই না, শুধু আমার বউটাকে সুস্থ রাখু। ও খুব নরম, খুব ভালো। ওর শরীরে একটুও কষ্ট যেন বেশি না লাগে। আমি কষ্ট নেব, তুমি চাইলে হাজারটা নেব, কিন্তু ওকে আর আমার বেবিটাকে নিরাপদ রাখো।
আল্লাহ… যদি কোনো শাস্তি দেওয়ার থাকে, আমাকে দাও। আমার ভুল, আমার রাগ, আমার জেদ—সব কিছুর দায় আমার। আমার বউটা নিষ্পাপ। ও তো শুধু ভালোবাসতে জানে। ওর চোখের পানি আমি সহ্য করতে পারি না, আল্লাহ।
স্টিয়ারিংয়ে কপাল ঠেকিয়ে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে সে আবার বলে ওঠে,
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৮
—“ আজ আমাকে শক্ত রাখো আল্লাহ । আমি ওদের পাশে থাকতে চাই। আমার সন্তানের প্রথম কান্নাটা আমি শুনতে চাই। আর আমার মানজারার মুখে আবার হাসি দেখতে চাই।
গাড়ির গতি বাড়ে। চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। আরমান মুছে নেয় না। সে জানে—এই অশ্রুগুলো দুর্বলতার না, ভালোবাসার। সময়ের প্রতিটি সেকেন্ড যেন ভারী হয়ে আসে। সবার চোখে একটাই প্রার্থনা—জারা আর তার অনাগত সন্তান যেন সুস্থ থাকে। আর দূরে কোথাও আরমান গাড়ি চালাতে চালাতে শুধু একটাই কথা ভাবছে—
— “আমি আসছি মানজারা… শক্ত থেকো। আমি আসছি।”
