Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৮

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৮

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৮
সোহানা ইসলাম

রাত অনেক গভীর। খান বাড়ির ছাদটা এই সময়টায় অদ্ভুত রকম শান্ত থাকে। নিচে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু দূরে কোথাও কুকুরের ডাক, আর হালকা বাতাসের শব্দ। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে জাহির সিগারেট টানছে। আলো-আঁধারিতে তার মুখটা ঠিক বোঝা যায় না, শুধু লাল আগুনটা জ্বলছে–নিভছে।
হঠাৎ পেছন থেকে ভারী কিন্তু চেনা একটা কণ্ঠ ভেসে আসে—
— “সিগারেট কবে থেকে খাওয়া শুরু করলে?”
জাহির চমকে যায়। হাতের সিগারেটটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। ফিরে তাকাতেই দেখে আরমান। রাতের এই সময়ে তাকে এখানে দেখার কথা ছিল না। সিগারেটটা ঠোঁটের মাঝে আটকে থাকে। এমন সময়, এমন নিঃশব্দে—কারও আসা সে ভাবেনি। উত্তর দেয় না। নিজের মতো আরেকটা টান দেয়। ধোঁয়াটা বাতাসে মিলিয়ে যায়।
আরমান এসে পাশে দাঁড়ায়। কোনো তাড়া নেই, কোনো অভিযোগও না। শুধু নীরবতা। জাহির সিগারেটটা টান দিয়ে আরমানের দিকে বাড়িয়ে দেয়—একটা অভ্যাসের মতো। কিন্তু বিষয় টা তার কাছে খুব নতুন। আরমান হালকা হেসে বলে,

— “ছেড়ে দিয়েছি,আবার খাচ্ছি জানলে তোমার বোন জুতা-পিটা করবে।”
জাহির হেসে ওঠে, ছোট্ট একটা হাসি। কিন্তু চোখে হাসি নেই। আরমান আবার জিজ্ঞেস করে,
— “বললে না তো, কবে থেকে খাও?”
জাহির চোখ সরিয়ে নেয়।
— “অনেক দিন।”
— “অনেক দিন মানে কত?”
— “তারিখ লিখে রাখি নাকি?”
জাহির হালকা হাসে। আরমান তাকিয়ে থাকে।
— “মজা করছো?”
জাহির আর উত্তর দেয় না। চুপচাপ ধোঁয়া ছাড়ে। আরমান বুঝে যায়—এই চুপটাই অনেক কিছু বলে দেয়। জাহির আর কিছু বলে না। ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। আরমান বুঝে যায়—এই নীরবতাই উত্তর। আরমান ধীরে বলে

— “নয় দিন হলো আমাদের বাড়িতে আছো। প্রায়ই খেয়াল করি। কিন্তু ঠিক করে কথা বলা হয়নি। আজ তোমার বোনকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছি, তাই এলাম।”
জাহির ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
— “বুড়িকে একা রেখে আসা আপনার উচিত হয়নি।”
আরমান হালকা হাসে, কিন্তু গলায় দৃঢ়তা।
— “আমি আমার কলিজাকে বিনা প্রোটেকশনে রেখে আসবো—এটা ভাবলে কি করে?”
জাহির একটু থামে।
— “কি প্রোটেকশন?”
— “এসব বাদ দাও,কাজকর্ম কেমন চলছে? ব্যবসা? ওদিকে কে সামলাবে?”
জাহির সিগারেটটা শেষ করে পা দিয়ে পিষে ফেলে। আগুনটা নিভে যায়। জাহির বলে,
— “লোক রেখেছি,সমস্যা হবে না।” একটু থেমে যোগ করে, “আমি কাল চলে যাবো। আব্বু-আম্মু থাকবে বুড়ির কাছে কিছু দিন।”
— “ওহ,” আরমান বলে।
শব্দটা ছোট, কিন্তু বোঝায়—সে শুনছে। জাহির ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

— “আপনি কবে সিগারেট ছেড়েছেন ?”
— “ তোমার বোনকে দ্বিতীয় বার বিয়ে করার পর।”
— “এতো বড় ত্যাগ?”
আরমান হেসে বলে,
— “ত্যাগ না,বাঁচার কৌশল। তোমার বোন দেখলে এখনোই জুতা হাতে নিবে।এখন যা মেজাজ বাপরে বাপ। একে বারে নাকানিচুবানি খাওয়ায় আমাকে ।”
জাহির হেসে ওঠে।
— “ও তো এমনই।এই নরম এই গরম। ”
— “এমন না হলে আমি মানুষ হতাম না।
জাহির আর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে আরমানের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
— “একটা টান?”
আরমান মাথা নাড়ে,
— “না,জীবন কঠিন থেকে সহজ হয়ে গেছে। তাই আর কঠিন করতে চাই না।”
জাহির হাসে।

— “বিয়ের পর মানুষ এমন দার্শনিক হয়ে যায় নাকি?”
আরমান বলে,
— “ মিষ্টি একটা বউ পেলে হয়ে যায়।”
দু’জনেই হাসে। হাসির মধ্যে একটা হালকা স্বস্তি।
আরমান হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়।
— “প্রায়ই দেখি তুমি এখানে আসো।”
জাহির কাঁধ ঝাঁকায়।
— “ঘুম আসে না।”
— “নাকি বাড়ির ভেতর বেশি আওয়াজ?”
— “আপনাদের বাড়িতে?এই বাড়িতে তো নিঃশ্বাস নিলেও লোক জেগে যায়।”
— “সে তো ঠিক,বিশেষ করে তোমার বোন।”
জাহির চোখ উল্টায়।
— “বুড়ির জ্বালায় আপনার অবস্থা খারাপ?”
আরমান মুচকি হাসে,

— “খারাপ না,চর্চা হয়ে গেছে।আর বউয়ের অত্যাচার সহ্য করা স্বামীদের অধিকার, আমি মনে করি, অন্যদেরটা বলতে পারবো না ভাই।”
— “ তাই তো দেখছি। এতো বড় কোম্পানির মালিক অফিস বন্ধ করে বসে আছেন।বউয়ের জন্য শুধুু। ”
আরমান বলে,
— “হুমমম..!এক মাস,এই নিয়েই ঝগড়া।”
জাহির হেসে বলে,
— “অফিসে গেলে কান্না, বাড়িতে থাকলে ঝগড়া এটাই কি বিয়ে?”
আরমান গম্ভীর মুখে বলে,
— “হ্যাঁ,এটাই ভালোবাসা ।”
দু’জন আবার হাসে। আরমান এবার স্বর নামিয়ে আনে। কিছুক্ষণ চুপচাপ। বাতাসে সিগারেটের গন্ধ ভাসে। আরমান বলে,
— “তুমি খুব কম কথা বলো।”
— “সব কথা বলার মতো হয় না।তাই বলি না। ”
— “কিন্তু কখনো কখনো বললে হালকা লাগে। ”
জাহির তাকায়।
— “আপনি থেরাপিস্ট নাকি?”
আরমান হাসে,
— “না,শুধু বউওয়ালা।”
জাহির আবার হাসে।
— “আপনি ভয়ানক লোক মশাই ।”
— “জানি।”
আরমান হঠাৎ থেমে যায়। একটু সময় নেয়। তারপর বলে—

— “ছায়মার কথা মনে আছে তোমার?”
এই নামটা বাতাসে ঝুলে থাকে। জাহিরের হাত কেঁপে ওঠে। সিগারেটটা ঠোঁট থেকে সরিয়ে নেয়। আগের হাসি মিলিয়ে যায়। চোখ দু’টো এক জায়গায় স্থির হয়ে যায়—কোথাও না, যেন অনেক দূরে। সে কিছু বলে না। আরমান আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। জাহিরের বুকের ভেতর যেন হঠাৎ চাপ পড়ে। শ্বাসটা ভারী হয়ে আসে। চোখের পাতা একবার বন্ধ হয়, আবার খুলে। গলায় কথা আটকে যায়। সে সিগারেটটা ধীরে ধীরে পা দিয়ে নিভিয়ে দেয়।আগুনটা নিভে যায়, কিন্তু ভেতরের আলোটা নিভে না। আরমান নরম গলায় বলে,
— “থাক মনে নেই মনে হয় । ”
জাহির মাথা নোয়ায়।
— “এই নামটা…” সে কথা শেষ করতে পারে না।
আরমান কাঁধে হাত রাখে।
— “ মনে নেই তাই তো? ”
জাহির গভীর নিশ্বাস ছাড়ে।
— “অনেক দিন পর শুনলাম..তাই আর কি ।”

মুখে তো বলে দিয়েছে । কিন্তু মন? তা তো অন্য কথা বলে। সে কি সত্যি ভুলে গেছে?নাকি ভুলে যাওয়ার অভিনয় করছে। যদি ভুলেই যায় তাহলে নিজের শেষ ঠিকানায় ওর নাম কেনো লিখে রেখেছে। যদিও জানে সে পাবে না। তাই আশা ও করে না। কিন্তু বেহায়া মনরে কি করে বুঝায়। নিজের জন্য এতো কাজ জুগিয়ে রাখে, যেনো কাজের মধ্যে থাকলে হয়তো ভুলে যাবে। কই না তো আজও ভুলতে পারে নি তাকে। এতো ভয়ংকর অনুভূতি লুকিয়ে রেখে কি বাঁচা যায়? না বাঁচা যায় না! সে তো সেদিনই মেরে গেছে যেদিন ওই নরম গালে তার শক্ত হাত দিয়ে থাপ্পড় মেরে ছিলো সে। মেয়েটাকে কতো কটু কথা শুনালো। মেয়েটার পবিএ অনুভূতি কে, ভালোবাসাকে নিজ ইচ্ছে পায়ে ঠেলে দিয়েছে। অপছন্দ করে বলে। কই এই অপছন্দ টা তো তার মন করে না। শুধু পাষান মুখ টা বলেছে। এই মুখের বলা কথা কি ফিরিয়ে নেওয়া যায়? আজ এতো বছর পর নাম শুনেছে বুক টা হু হু করে উঠে। জিজ্ঞেস করে ও করতে পারছে না অনেক কিছু। কতো প্রশ্ন তার মনে। মেয়েটা কেমন আছে? কি করে ? আগের মতো শুকনাই আছে না কি পরিবর্তন হয়েছে? আবার মনে হয় নিশ্চয় বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু বিয়ে হয়ে গেলে তো সে জানতে পারতো। এসব ভেবেই একটা গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে। আরমান ধীরে সরে আসে।

— “ওহ আচ্ছা। ঘুমাও। কাল অনেক পথ।”
জাহির কিছু বলে না। শুধু মাথা নাড়ে। আরমান সিঁড়ির দিকে হাঁটে। যাওয়ার সময় বলে,
— “সিগারেটটা কমাও। অন্তত আজ থেকে, ভবিষ্যতে কাজে আসবে আমার কথা, কারণ কোনো নারী স্বামীর সিগারেট খাওয়া সহ্য করতে পারে না ।”
জাহির মুচকি হাসে,
— “ নারী..? সেটা আর আমার জীবনে আসবে না। কারণ আমি আনবো না। তাই সিগারেট খাওয়া কমানোর প্রশ্নই আসে না।”
ওর কথা শুনে আরমান থেমে যায়। ঘুরে আবার জাহিরের কাছে এসে দাঁড়ায়। জাহির বলে,
__“ আবার আসলেন যে? ”
আরমান বলে,
__“ অনেক দিন হয়ে গেলো ভালো করে আড্ডা দেওয়া হয় না। তাই আজকে মাখন লাগিয়ে আড্ডা দিব। ”
__“ আমি আর আপনি শুধু? ”
আরমান কিছু না বলে পকেট থেকে মোবাইল বের করে রোহান করে কল করে। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই রোহান বলে,

__“বল..!”
__“রাশেদ আর জাহেদ কে নিয়ে সাদে আয়। আড্ডা দিব আজকে! ”
রোহান একথা শুনে লাফিয়ে উঠে বিছানা থেকে। খুশিতে গদগদ হয়ে বলে
__“ আসচ্ছি.. আসচ্ছি! এক্ষুনি আসচ্ছি। তুই শুধু দেখ আমি ঝড়ের বেগে আসবো ওদের নিয়ে। ”
__“হুমম আয়.! ”
বলে আরমান কল কেটে দিতে যাচ্ছিলো। তখন রোহান বলে,
__“ শুন.! ”
__“ আবার কি..? ”
__“একটু হবে না কি ওসব..! ”
আরমান ভ্রু কুঁচকে বলে,
__“ ওসব কী..? ”
__“ ওই লা*ল পানি আর কি? ”
__“ এখন এগুলো কোথায় পাবি..!”
__“ ওই আমরা তিন জন মিলে আজকে কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম সবাই মিলে আড্ডা দিব। কিন্তু তোর ভয়ে বলতে পারি নাই।
__“আচ্ছা তাড়াতাড়ি আয়! ”
বলে কল কেটে দেয়। রোহান আরমানের সম্মতি পেয়ে লাফাতে লাফাতে রুম থেকে বের হয়। গাড়ি থেকে বোতল গুলো এনে রাশেদ আর জাহেদ কে নিয়ে সাদে চলে যায়।

জারা গভীর ঘুমে ছিল। ফারিয়া বেগমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছিল সে, ঠিক ছোটবেলার মতো। হঠাৎ একটা অস্বস্তি বুকে কাঁটা হয়ে বিঁধে যায়। জারা চোখ খুলে দেখে—পাশে আরমান নেই। আছে শুধু শাশুড়ী। কপাল কুঁচকে যায় তার। হাতে ভর দিয়ে ধীরে উঠে বসে জারা।
—“আম্মু এখানে … তোমার ছেলে কোথায়?”
কণ্ঠে ঘুম ভাঙা ভারী ভাব, কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত খটকা।
ফারিয়া বেগম একটু চমকে উঠে তাকান।
—“আরে ঘুম ভেঙে গেল তোর? কিছু লাগবে ?”
__“তোমার ছেলে কোথায় আম্মু..?”
তিনি নরম গলায় বলেন,
—“আরমান তো বলে গেল সাদে যাবে। বলেছিল একটু পরেই আসবে।”
জারা থমকে যায়।
—“এখন কয়টা বাজে?”
—“দুইটা… প্রায়।”

দুইটা!জারার বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। লোকটা সাদে কী করে এত রাতে? সে জানে, “একটু” মানে আরমানের ভাষায় অনেক কিছুই হতে পারে। ঠিক তখনই দরজা খুলে ফিহা, মিম আর জিনিয়া ঢুকে পড়ে। তিনজনের চোখে ঘুম নেই, মুখে চাপা রাগ।
ফারিয়া বেগম অবাক হয়ে বলেন,
—“কিরে, তোরা এখনো ঘুমাসনি?”
জিনিয়া এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বলে,
—“বড় আম্মু, তুমি এই শরীর নিয়ে এখানে বসে আছো কেন? যাও গিয়ে ঘুমাও। আমরা আছি জারার কাছে।”
জারার খটকা আরও বেড়ে যায়। এত রাতে তিনজন একসাথে, তাও এমন মুখ করে—কিছু একটা হয়েছে।
জারা নিজেই বলে ওঠে,
—“আম্মু, তুমি যাও,”
—“আমি ঠিক আছি। তোরা গিয়ে ঘুমা ।”
ফারিয়া বেগম যেতে না চাইলে জারা জোর করে তাকে উঠিয়ে দেয়। শেষে মায়ের মতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে ফারিয়া বেগম বেরিয়ে যান। দরজা বন্ধ হতেই চারজন বিছানায় গোল হয়ে বসে পড়ে।
জারা তাকিয়ে থাকে।

—“এবার বলো। কী হয়েছে?”
ফিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
—“জানু, রাগ করবি না… কিন্তু বলে দিচ্ছি ।”
__“আচ্ছা রাগ করব না। বল কি হইছে? ”
মিম বলে,
—“পাঁচজন মিলে সাদে আড্ডা দিচ্ছে। রোহান, জাহেদ, রাশেদ—সবাই।”
জিনিয়া দাঁত চেপে যোগ করে,
—“আর তোমার স্বামীজান তো আছেই।”
তিন জন মিলে এক এক করে সব ঘটনা খুলে বলে। ঘুম ভেঙে গেলে তারা তিনজন সাদে যায় নিজের বরদের খুঁজতে। সাদে গিয়ে দেখে পাঁচ জন টাল হয়ে পরে আছে। কখনো হাসছে, কখনো কান্না করছে। তাদের সামনে চারটা বোতল। সাথে কিন্তু শুকনো খাবার। একটা পানির বোতল।এসব শুনে এক মুহূর্তে জারার মাথায় যেন আগুন ধরে যায়। বুকের ভেতর চাপা রাগ, কষ্ট, হরমোন—সব একসাথে ফেটে পড়তে চায়। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামে। পেটটা ভারী, শরীরটা ফোলা, কিন্তু চোখে আগুন। তারপর হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলে,

—“জিনিয়া আপু, ঝাড়ু নিয়ে আসো।”
তিনজন একসাথে তাকায়।ফিহা অবাক হয়ে বলে,
—“ঝাড়ু কেন.? ”
জারা চোয়াল শক্ত করে বলে,
—“ আজ সবগুলোর গার থেকে ভূত নামাবো।”
জিনিয়া উঠে দাঁড়ায়।
—“ঠিক আছে। ঝাড়ু ই আনবো।কিন্তু তোমার যেতে হবে না ।”
__“ আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি ঠিক আছি আর একজন কে ঠিক করতে হবে। ”
জিনিয়া চলে যায় ঝাড়ু আনতে। জারা আবার বিছানায় বসে পড়ে। হাত দিয়ে পেটটা আলতো করে ছুঁয়ে বলে,
—“দেখছিস? তোর পাপার কী করছে। রাত দুইটায় আড্ডা।”
ফিহা নরম গলায় বলে,

—“জানু, বেশি রাগ করবি না। তোর শরীর—”
জারা তাকিয়ে বলে,
—“আমি রাগ করব না। আমি শোধ নিবো একটু ।”
মিম মুখ টিপে হাসে।
—“ভূত নামানো কিন্তু আমার জানুর স্পেশালিটি।”
জারা হালকা হাসে, কিন্তু চোখে এখনও ঝড়।
—“এই বাড়িতে ভূত ঢুকতে পারলে, বেরোতেও পারবে। আজকে ওদের গার থেকে সব নামাবো—আড্ডা ভূত, রাত জাগা ভূত, বউকে একা রেখে যাওয়া ভূত।”
ঠিক তখনই জিনিয়া ঝাড়ু নিয়ে ফিরে আসে। জারা ঝাড়ু টা হাতে নেয়। গভীর শ্বাস নেয়। চারজনের চোখে একসাথে রাগ আর হাসি। রাতটা যে শান্ত না, সেটা এখন সবাই বুঝে গেছে। তিন মিলে সাবধানে জারাকে সাদে উঠে । চারজন সাদে উঠে যে দৃশ্যটা দেখে, সেটা কোনো স্বাভাবিক আড্ডা না—একেবারে সার্কাস। তাদের চারজনের হাতেই ঝাড়ু। সাউন্ড বক্স থেকে ভেসে আসছে বেসুরো গান

~~ একটু হালকা মেরেছি ভাই…লাল পানি ”
একটু হালকা মেরেছি ভাই.. লাল পানি..!”
আমার মনটা যে আজ এলোমেলো কি করি বলোনা
চারি পাশে দেখি কত রূপসী ললনা
ওদের মাঝে পাইনা খুঁজে
আমার প্রিয়ার মুখ খানি..
একটু হালকা মেরেছি ভাই লাল পানি
একটু হালকা মেরেছি ভাই লাল পানি~~~
কিন্তু সেই “হালকা” যে কতটা ভারী হয়ে গেছে, সেটা দেখলেই বোঝা যায়। জাহির এক কোণে টাল খেয়ে পড়ে আছে। এক হাত সাদ-এর মেঝেতে, আরেক হাত বুকের উপর। চোখ আধখোলা, মুখে আজব একটা হাসি। মাঝে মাঝে কী যেন বিড়বিড় করে—চুংচাং, চুংচাং—কথা না আওয়াজ, বোঝার উপায় নেই। রাশেদ রোহানের পা জড়িয়ে ধরে বসে আছে, যেন লাইফবোট ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে।

—“ভাই… আমাকে ফেলে যাস না…”
নিজেই কাঁদছে, আবার নিজেই হাসছে। রোহান আর জাহেদ দু’জনেই আরমানের পা ধরে আছে।ওরা সব-কয়টা মিলে পাগলা ড্রাস দিচ্ছে।একটার গায়েও কাপড় নেই। রোহান বলে,
—“ভাই… বয়স আছে… বয়স আছে…”
জাহেদ চিৎকার করে বলে,
__“ ভালোবাসা আর না, ছ্যাকা খেলে তুমি খেয়েছো আমি না…! ”
কিসের ভালোবাসা? কার বয়স আছে, কীসে বয়স আছে—তা নিজেরাও জানে না। আর আরমান?
আরমান মাঝখানে । হাতে গ্লাস। চোখ লাল না, কিন্তু ঝাপসা। শরীর একটু দুলছে, তবুও বাকিদের তুলনায় অনেকটা সচেতন। মুখে সেই চিরচেনা আধা-হাসি, আধা-বোকা ভাব। এই দৃশ্য দেখে জারার মাথার ভেতর যেন রক্ত ফুটে ওঠে। পেটের ভেতর বাচ্চা, শরীর ভারী, পা ফুলে আছে—কিন্তু রাগের সামনে এসব কিছুই না।এর মদের বাজে গন্ধ নাকে যেতেই যেনো বমি আসচ্ছে ।সাউন্ড বক্স তখনো চলছে। পুরুষগুলো বুঝতেই পারেনি যে বিচার সভা বসে গেছে।

হঠাৎ করেই জিনিয়া সামনে এগিয়ে যায়। তার হাতে ঝাড়ু। সে এক ঝটকায় সাউন্ড বক্সের সুইচ বন্ধ করে দেয়। মুহূর্তে নাচ থেমে যায়। সবাই থমকে তাকায়—কি হলো? তারপর শুরু হয় ঝাড়ুর নৃত্য। রােহান প্রথম আঘাতটা পায়। সে নেশার ঘোরে বুঝে ওঠার আগেই ঝাড়ু তার পিঠে এসে পড়ে। সে লাফিয়ে ওঠে, এবার আর নাচের তালে না—ভয়ের তালে। রোহান দৌড়াতে গিয়ে নিজের পায়ের সাথে জড়িয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগে জিনিয়া তাকে ধরে নেয়। ঝাড়ুর বাড়ি পড়ছে, আর সে দুই হাত দিয়ে মাথা ঢেকে এদিক-ওদিক ছুটছে। জিনিয়া এক সেকেন্ডও দেরি করে না। সোজা গিয়ে রোহানের শার্ট টা তুলে গায়ে জড়িয়ে, শার্টের কলার ধরে এক টানে তুলে ধরে।

—“আজ তোর লাল পানি আমি বের করব!”
রোহান চমকে ওঠে। চোখ ঠিকমতো ফোকাস করে না। জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
—“চাঁদ সুন্দরী… তুমি আজ খুব আলো দিচ্ছো গো…”
এই কথা শুনে জিনিয়ার মাথায় যেন আগুন ঢেলে দেয় কেউ।
—“আলো দেখাচ্ছি? আয় আজকে !”
গজগজ করতে করতে রোহানকে টেনে হিচড়ে সাদ থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় সে। রোহান কোনো প্রতিরোধই করে না। উল্টো গুনগুন করতে থাকে।
মিম আর ফিহাও পিছিয়ে থাকে না। নিজ নিজ বরদের কানে ধরে, হাত ধরে, ধমক দিতে দিতে নিয়ে যেতে থাকে। ফিহা রাগে জাহেদের গাল চেপে ধরে বলে,
—“এইসব কী করছিস!”
জাহেদ কেবলাকান্তের মতো হাসে।ফিহা সুযোগ লুফে নিয়ে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দেয় জাহেদের গাল।জাহেদ বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে বলে,
__“ পঁচা বউ। আমারে মারে। আদর করে না! ”
ফিহা রাগে দাঁত চেপে বলে,

__“ আদর লাগবে তোমার? আসো সোনা … রুমে আসো..! এতো মানুষের সামনে তো আর জামাই আদর দেওয়া যায় না বলো?”
বলেই জাহেদ কে লাথি মারতে মারতে সাদ থেকে নিয়ে যায়। মিম রাশেদের চুল টেনে ধরে বলে,
—“লজ্জা নেই? মাথায় কি ঘিলু আছে? তোর যে একটা ছেলে আছে ভুলে গেছিস?”
মিম রাশেদের চুলে ধরে নিয়ে যায়। রাশেদ নেশার ঘোরে মিমের গায়ে ঢলে পড়ে। সাদ মুহূর্তেই ফাঁকা হতে থাকে। জারা তখন এগোয়।সে একেবারে চুপচাপ। ভয়ংকর চুপচাপ। এই চুপ থাকাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। সে পাশের বালতিটা তুলে নেয়। একটুও না ভেবে— ছপাস!পানি গিয়ে পড়ে জাহির আর আরমানের উপর। জাহির হুড়মুড় করে উঠে বসে।
—“আরে… কে?কে ?”
চোখ কচলাতে কচলাতে বুঝতে পারে পরিস্থিতি। বোনের চোখে যে আগুন, সেটা দেখেই সব নেশা উবে যায়। জারা দাঁত চেপে বলে,

—“রুমে যাও ভাইয়া । এখনই।”
এক মুহূর্তও দেরি না করে জাহির টলতে টলতে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দেয়। আজ বোনের সাথে তর্ক করার সাহস তার নেই। এবার জারা তাকায় আরমানের দিকে। আরমান ভেজা শার্ট, ভেজা চুল, হাতে এখনও আধখালি গ্লাস। চোখ কচলাতে কচলাতে জারার দিকে তাকায়। দুই হাত জোড় করে দাঁড়াল, কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। ঝাড়ুর বাড়ি পড়ছে, আর সে পিছাতে পিছাতে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে। তার মুখের ভাবটা এমন, যেন ছোটবেলায় দুষ্টুমি করে ধরা পড়া কোনো ছেলে। জারা ঠাস করে একটা ধমক দেয় আরমানকে। আরমান ঠোঁট উল্টে বউয়ের কথা তাকাতেই বউকে তার কাছে খুব সিক্সি লাগছে। এমনিতেই নেশা করে আছে তারউপর গুলোমুলো বউ সামনে। মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার।নিজের মাথায় দুটু থাপ্পড় মেরে বলে,
—“বউ…? আরহাম কে কোথায় রেখে এসেছো? ”
এই কথা শুনে জারা’র রাগ দ্বিগুণ হয়,
__“ আরহামের কথা তোর চিন্তা করতে হবে না। আর কেমন নেশা করেছিস যে চোখেও ঠিক মতো দেখতে পারছিস না। ”
আরমান নেশায় টলতে টলতে বলে,

__“ দেখছি.. তো! একটা হট.. নাদুসনুদুস.. রসগোল্লার মতো বউ সামনে দাঁড়িয়ে আছে। গালদুটো আমার দিকে তাকিয়ে বলছে আরমান আয়… আরমান আয়!আমাকে টুপ কইরা কয়টা চুম্মা খা!”
ওই এক শব্দেই জারার বুকটা কেঁপে ওঠে। রাগ, কষ্ট, ভয়—সব একসাথে। এই নেশা ঘোরে যদি আরমান ওর কাছে আসার চেষ্টা করছে? পুরুষ মানুষের শক্তির সাথে সে কি পেরে উঠবে? আবার মনে হয়, নেশা করেছে তো কি হয়েছে? ওর স্বামীজান তাকে কখনো কষ্ট দিবে না। সে ঝাঁরুটা তুলে নেয়। ঝাঁরু দিয়ে মারছে না। কিন্তু ভয় দেখাচ্ছে। আরমান দুহাত উচু করে জারা’র দিকে এগিয়ে এসে বলে,
__“ বউ…তুমি আমার লাল চমচম..!
দেখতে তেতু… খেতে মিষ্টি…!
আমি তোমায় ভালোবাসি..!
আমি তোমার খালি থালা, তুমি না থাকলে আমার প্রেমটা হয় একেবারে ঝালা পালা ।”
নেশার ঘোরে আমি বুঝি কোনো তা*ল বা*ল..!
পায়ে নেই জুতা, মাথায় নেই ঘিলু..!
বউ তোমায় আই লাভ ইউ..! ”
আরমানের এমন উল্টা পাল্টা গান শুনে জারা হতভম্ব। রাগে ঝাড়ুটা উচু করে আরমানের পায়ে একটা বারি মেরে চিৎকার করে বলে,

—“এখানে কী করছিস এত রাতে? তুই নেশা করেছিস তাই না?আবার ওই সিগারেট? তার উপর মদ?!”
সাদে চারদিকে আধপোড়া সিগারেট ছড়িয়ে আছে।
কিছু নিভে গেছে, কিছু এখনও ধোঁয়া ছাড়ছে।
আরমান ঢোক গিলে। সে জানে, আজ তার অবস্থা ভালো না। আরমান দুহাত বুকে বাজ করে দাঁড়িয়ে আছে। এখন সে মস্ত বড় আসামি। আরমান কে কথা বলতে না দেখে জারা’ আবার চিৎকার করে বলে,
__“ কি হলো? কথা বলছি না কেনো?”
নেশার ঘোরে আরমান একটু কেঁপে ওঠে,
—“একটু… একটু খেয়েছি বউ…বেশি না… বিশ্বাস করো…তুমি তো জানো আমি ভালো মানুষ? এসব খাই না। ”
তারপর গালে থাপ্পড় দিয়ে চলে,
__“ এ..এসব খেলে আল্লাহ পাপ দেয়। আমি জানি! আমি মদ সিগারেট খাইনি..! আমি ভালো মানুষ আল্লাহ স্বাক্ষী..! ”

গলার স্বরটা কাঁপছে। নেশার চেয়ে ভয়টাই বেশি, জারা আর ধরে রাখতে পারে না। চোখ দুটো ভিজে যায়।
—“তুই ভালো মানুষ? হ্যাঁ তুই ভালো মানুষ.? আমি কী ভাবে একা রুমে থাকব ?এই শরীর নিয়ে? এই পেট নিয়ে? তুই জানিস না আমি একা থাকতে ভয় পাই এখন ? তারপরও কেন একা রেখে চলে এলি। আবার দাবি করছিস তুই ভালো মানুষ..! ভন্ডের বাচ্চা..!”
কথাগুলো বেরোবার সাথে সাথেই গলা ভেঙে যায়।
—“ একা রেখে চলে এসেছিস.. যদি আমরা কিছু…?”
কথা শেষ করতে পারে না। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। আরমান হতভম্ব হয়ে যায়। এক ঝটকায় সব নেশা উধাও। সে এক পা এগোতে চায়। জারা হাত তোলে।
—“না! আমার কাছে আসবি না!”
সে কান্না করতে করতে সাদ থেকে নেমে যেতে চায়।
একাই। কোনো সাপোর্ট না নিয়ে। আরমান তখন সত্যিই ভয় পেয়ে যায়।
—“বউ… দাঁড়াও…প্লিজ…”
কিন্তু জারা শুনছে না। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই কথা ঘুরছে— এই মানুষটা কীভাবে এতটা দায়িত্বহীন হতে পারে? ছাদে পড়ে থাকে ঝাঁরু, ভেজা গ্লাস, নিভে যাওয়া সিগারেট। আরমান দাঁড়িয়ে থাকে মাঝখানে—
কাচুমাচু, ভেজা, অপরাধী। আজ তার সত্যিই রক্ষা নেই— সে সেটা খুব ভালো করেই জানে।

মাঝখানে কেটে গেল কিছু দিন। সময়টা খুব বেশি না, কিন্তু সম্পর্কের ভেতর সেই ক’টা দিন যেন অনেক লম্বা হয়ে ঝুলে ছিল। সেদিন সকাল হতেই জাহির চলে গেছে। কাউকে কিছু না বলে। বিশেষ করে বোনের চোখে চোখ রাখার সাহস তার হয়নি। আগের রাতের ঘটনার লজ্জা, অপরাধবোধ—সব মিলিয়ে সে বুঝে গেছে, কিছু সময় দূরে থাকাই ভালো। জিনিয়াও নূরকে নিয়ে চলে যায় সেদিন। রোহানকে বলেছে আর কিছু দিন থেকে যেতে কিন্তু জিনিয়া থাকে না। রোহানের কথা শুনেও না শুনার মতো করে চলে যায়। রোহানও সেদিন বউয়ের পিছনে পিছনে চলে যায় । আর জারা সেদিন থেকেই আরমানের সাথে কথা বলছে না। না রাগ করে চেঁচাচ্ছে, না কাঁদছে,না কোনো অভিযোগ করছে—এই নীরবতাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। আরমান কত চেষ্টা করেছে।

—“একটু কথা বলো বউ…আমি ভুল করেছি, মানছি…”
তুমি চাইলে আমি ছাদে আর কখনো উঠব না…আর রোহানদের সাথে আড্ডা দিবো না। ”
কিন্তু জারা শুধু মুখ ফিরিয়ে থাকে। চোখে ক্লান্তি, মুখে অভিমান—একটা কথাও না। আজকের দিনটা আরও ভারী। আজ জারার বাবা-মা আর জোহান চলে যাবে।
সকাল থেকেই বাড়ির ভেতর অদ্ভুত একটা ব্যস্ততা। ব্যাগ গুছানো, টুকটাক কথা, কিন্তু কোথাও একটা চাপা টেনশন। জারা একটা কালো বোরকা পরে রেডি হয় চোখ খুলা, মুখ ঢাকা—শুধু কণ্ঠটা চেনা। বারী পেট টা বড় হিজাব দিয়ে সুন্দর করে ঢাকা। আরমান ওকে দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
—“এই বোরকা পরে কোথায় যাচ্ছো? আমি নিয়ে যাবো।”

কোনো উত্তর নেই। আরমান আরেকবার জিজ্ঞেস করে। এবারও জারা চুপ। সে নিজের মতো করে নিচে নেমে আসে। আরমান হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভার বসে আছে, ইঞ্জিন চালু। আনিছুর রহমান জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মায়ের চোখ ভেজা, জোহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে। আরমান সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। আনিছুর রহমান হঠাৎ বলে ওঠেন,
—“দেখলে, আটকাতে পারলে না তো আমার মেয়েকে। এই তো আমি নিয়েই যাচ্ছি আমার মেয়েকে।”
এই কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো লাগে। এক সেকেন্ডে আরমানের মাথার ভেতর হাজারটা চিন্তা ঢুকে পড়ে। তার বউ চলে যাচ্ছে? এতটাই অভিমান করেছে যে আর তার সাথে থাকতে চায় না? বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। দৌড়ে এসে জারাকে শক্ত করে নিজের বুকে আঘলে নেয়।
—“আমার বউ আমার কাছ থেকে কোথাও যাবে না। কোথাও না! ”
কণ্ঠটা কাঁপছে, কিন্তু চোখে জেদ। আনিছুর রহমান গম্ভীর হয়ে বলেন,

—“যাবে।”
এই এক শব্দেই আরমান পুরোপুরি পাগল হয়ে যায়।
সে এক ঝটকায় শশুড়কে ধরে গাড়ির ভেতর বসিয়ে দেয়। একদম নাটকীয় ভঙ্গিতে।
—“আমার বউকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে আর আসবেন না আামদের বাড়িতে। এখানেই আল্লাহ হাফেজ!”
বলে নিজেই গাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। চারপাশে এক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর— হাসি। ফারিয়া বেগম মুখ টিপে হাসছেন। জেসমিন বেগম চোখে পানি আসা পর্যন্ত হেসে ফেলছেন। জোহান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে হাসছে। জারা বোরকার ভেতর থেকেও কাঁধ কাঁপিয়ে হাসতে শুরু করে।
তাদের হাসি গুলো আরমানের চোখে পরে না। সে তো চিন্তায় শেষ। তার বউকে নিয়ে যাওয়ার জন্য শশুড় উঠে পরে গেলেছে। তারপরে বউ কদিন ধরে রাগ করে আছে। এখনো রাগ ভাঙ্গাতে পারনে নি সে। কথাও বলছে না তার সাথে। এসব ভাবনার মাঝে কি আর অন্য দিকে চোখ যায়।
আনিছুর রহমান গাড়িতে বসেই গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

—“জারা মা, তুই গাড়িতে উঠে আয়। আমাদেরই দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু জারার কানে সেটা যেন আলাদা করে বাজে। সে এক মুহূর্ত থেমে থাকে। তারপর বাধ্য মেয়ের মতো ধীরে ধীরে পা বাড়ায় গাড়ির দিকে। মাথা নিচু, চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। ঠিক তখনই—খপ করে কেউ তার হাত ধরে ফেলে। জারা চমকে ওঠে।আরমান। তার চোখ লাল, মুখ বিবর্ণ। হাতটা এত শক্ত করে ধরা যে জারা টের পায়—এই মানুষটা ভয় পেয়েছে, ভয়টা একদম ভেতর থেকে।আরমানের গলা ভেঙে আসে,
—“বউ…আমি খুব করে সরি…”
তারপর হঠাৎই— এই বাড়ির উঠোনে, এত মানুষের সামনে— আরমান বাচ্চাদের মতো কেঁদে ফেলে।
—“আমি আর কখনো তোমার বলা নিষিদ্ধ জিনিস গুলো ছুঁয়েও দেখব না।খোদার কসম। প্লিজ… যেও না।”
জারার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আরমান কাঁপা হাতে তাকে নিজের বুকে টেনে নেয়।চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে।

—“আমার সাথে কথা বলতে হবে না। রাগ করো, বকো, মারো—সব মেনে নেবো। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেও না। মরে যাবো আমি..! তোমার বাবাকে বলো না তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। বউ… ও বউ.. কিছু বলো? তোমার স্বামীজানে কষ্ট হয় তোমাকে আর আরহাম কে ছাড়া। ”
জারা একদম নির্বাক। সে বুঝতেই পারছে না— এই মানুষটার সাথে সে রাগ করবে কীভাবে? এই মানুষটা যে রাগ করার আগেই নিজেকে ভেঙে ফেলে। বাড়ির সবাই আরমানের এতো উওেজনা বুঝে উঠতে পারছে না। মিম আর ফিহা ওদের বরদের শাস্তি দিয়ে ক্ষমাও করে দিয়েছে। তারা মনে করে জারাও তাই। জারা তো খুব স্বাভাবিক ভাবে ছিলো। তাদের মাঝে কোনো ঝামেলা হয়েছে বুঝাও যায় নি। কিন্তু আজ আরমানকে এমন করতে বুঝে এখনো তাদের মাঝে কিছু ঠিক হয় নি। মিম আর ফিহা নিজেদের মাঝে চাওয়া চায়ি করে।
হঠাৎ আরমান নিচে বসে পড়ে। একদম জারার পায়ের কাছে। চারপাশে মানুষ আছে, আত্মসম্মান আছে, মর্যাদা আছে— কিন্তু এই মুহূর্তে আরমানের কাছে কিছুই নেই। শুধু ভয়। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
—“ও বউ…আমাকে একা রেখে যেও না। আমিও তোমার সাথে যাবো। দরকার পরলে শশুড় বাড়িতে ঘর জামাই থাকবো তবুও তোমাকে ছাড়া আমি থাকবো না। মরে যাবো আমি। খোদার কসম, আমি পারব না তোমাকে ছাড়া থাকতে। ”

তারপর আলতো হাতে জারা’র পেটে স্পর্শ করে, নরম একটা চুমু দিয়ে বলে,
__“ আরহাম.. আব্বু..!আম্মু কে বলো না পাপার কষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। আম্মুকে বলো না পাপাকে ছেড়ে যেনো না যায়। পাপা প্রমিজ করছি তোমাকে আর তোমার আম্মু কে এক মুহূর্তের জন্য একটা ছাড়ব না। তোমার আম্মু কে বলো আমার সাথে কথা বলতে?”
জারা তবুও চুপ। সে তো শুধু বাবার সাথে একটু অভিনয়ে তাল মিলচ্ছিলো। আর এই লোকটা তা সত্যি বলে মেনে নিয়েছে? জারা কিছু বলতে নিবে তার আগেই আরমান আবার বলে,
__“ আরহামের আম্মু প্লিজ আরহামের পাপার সাথে কথা বলো! সে যে খুব কষ্ট পাচ্ছে । তুমি তো তোমার স্বামীজানের সাথে রাগ করেছে, অভিমান করছো? ঠিক আছে কিন্তু আরহাম.. আরহামের পাপার সাথে কথা বলো? ও..ও আরহামের আম্মু..! ”
এই কথাগুলো সরাসরি গিয়ে জারার বুকে বিঁধে।চারপাশের সবাই থমকে যায়। বিশেষ করে আনিছুর রহমান। তিনি তো একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন।
একটু শাসন, একটু কর্তৃত্ব। কিন্তু এই ছেলে—এই জামাই— এভাবে ভেঙে পড়বে, তিনি ভাবেননি।
মারজিয়া বেগম এগিয়ে এসে আরমানের কাঁধে হাত রাখেন।

—“আরে বোকা ছেলে…এভাবে কান্না করছে কেন?তোমার শশুড় আব্বা তো মজা করছিলেন। জারা তো ডাক্তার দেখাতে যাবে।”
এই কথাটা শুনে— আরমান যেন জমে যায়। কান্না থেমে যায় এক সেকেন্ডে। সে ধীরে ধীরে মাথা তোলে।
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু চোখে এখন অবিশ্বাস।
—“ডা… ডাক্তার?”
সে উঠে দাঁড়ায়। চারপাশে তাকায়। ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম—সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে। জারার চোখ ছলছল করছে। আরমান যেন হঠাৎ বুঝে ফেলে— এই পুরো সময়টা সে কত বড় ভুল বুঝেছে। ফারিয়া বেগম গম্ভীর অথচ মায়াভরা কণ্ঠে বলেন,
—“এখন আর সময় নষ্ট করবেন না আপা। রওনা দিন.. না হলে দেখা যাবে বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে।”
মারজিয়া বেগম কথায় সম্মতি জানায়। তিনি জোহান কে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। আনিছুর রহমান গাড়ির ভেতর থেকেই বলেন,

—“এই ছেলে…আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো। আর মেয়েদের মতো কান্না করো না কথায় কথায়। তোমার বউ তোমারই থাকবে। আমরা চাইলেও নিতে পারবো না এখন। ”
এই কথাটার মধ্যে কোনো হুমকি নেই। আছে ভরসা।
গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যায়। একটা অধ্যায় যেন বন্ধ হয়ে যায়। এক এক করে সবাই বাড়ির ভেতরে চলে যায়। শেষে দাঁড়িয়ে থাকে তিনজন—
আরমান, জারা, আর ফারিয়া বেগম। জারা এখনো একটাও কথা বলেনি। ফারিয়া বেগম তাকে তাড়া দিয়ে গাড়িতে উঠে বলেন,
—“জারা আয় মা। দেরি হয়ে যাচ্ছে আয় তাড়াতাড়ি।”
এই বলে তিনি গাড়িতে উঠে বসেন। আরমান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। সে ভাবে— হয়তো জারা কিছু বলবে না। হয়তো আবার সেই নীরবতা। সে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। ঠিক তখন—
—“স্বামীজান…”

একটা শব্দ। একটা ডাক। আরমান যেন পাথর হয়ে যায়। এই ডাকটা সে কতদিন শোনেনি? সে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। জারা এগিয়ে আসছে। চোখ ভেজা, মুখ কাঁপছে। সে কাছে এসে আরমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। একদম শক্ত করে। আর ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। এই কান্না আর রাগের না। এই কান্না জমে থাকা ভালোবাসার। আরমান যেন নড়তেই পারে না। তার বুক ভিজে যাচ্ছে জারার কান্নায়। জারা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
—“সরি…খুব সরি…আমি আর আপনার সাথে রাগ করবো না। আপনি হাজারটা অপরাধ করলেও…আমি আর রাগ করবো না আরহামের পাপা ।”
আরমানের চোখ আবার ভিজে ওঠে। সে জারার মাথায় হাত রাখে। একদম আলতো করে। আজ কতো দিন পর এই ভাবে বউ তাকে জড়িয়ে দরছে।মন টা যেনো নদীর মতো শান্ত হয়ে গেছে।
—“বোকা মেয়ে…রাগ না করলে ভালোবাসা বোঝা যায় নাকি?”
জারা আরমানের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদে। গলা দিয়ে আর কথা আসচ্ছে না তার। আরমান তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। ফারিয়া বেগম গাড়ির ভেতর থেকে তাকিয়ে দেখেন। চোখের কোণে পানি চলে আসে।
তিনি জানেন— এই দুইজন একে অন্যের জন্য বানানো। জারা ধীরে ধীরে নিজেকে সামলায়। চোখ মুছে নেয়।আরমান মাথা নেড়ে বলে,

—“আম্মু অপেক্ষা করছে। যাও।আমি এখানেই আছি।”
জারা আরাম হাত দুই ধরে আবার ফুপিয়ে কেঁদে উঠে,
__“ আমার কথায় বা আচরণে রাগ করবেন না আরহামের পাপা। আপনি একমাত্র ব্যক্তি যার উপর আমি পুরো অধিকার খাটিয়ে রাগ, ভালোবাসা দুটোই প্রকাশ করি। আর দুনিয়া উল্টে গেলেও আমি মানজারা তার স্বামীজানকে ছেড়ে কখনো কোথাও যাবো না। ”
আরমান জারার কপালে ঠোঁট ছুয়েছি দিয়ে বলে,
__“হুমমম জানি..! এখন যাও! ”
জারা গাড়িতে ওঠার আগে আবার একবার পেছনে তাকায়।
__“ শুনুন..! ”
__“ বলুন..!”
__“ আমি মিসেস আরমান এবং আরহামের আম্মু আপনাকে আদেশ করছি। আমি বাড়িতে এসে যেনো সবার আগে আপনার মুখটা দেখতে পারি। আর যদি তা না হয় আরহামের আম্মু আবার আরহামের পাপার সাথে রাগ করবে..বলে দিলাম…হুমমম!”
আরমানের মুখে প্রাণখোলা হাসি ফুটে বলে,

__“আপনাদের আদেশ মাথা পেতে নিলাম আরহামের আম্মু..!”
জারা একটা হাসি দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। আরমান দাঁড়িয়ে আছে। হাত বুকের উপর। চোখে ভয় নেই এখন। আছে বিশ্বাস। গাড়িটা সামনে এগিয়ে যায়। আরমান দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। এই উঠোনে সে আজ বুঝেছে— ভালোবাসা মানে শুধু হাসি না। ভালোবাসা মানে কখনো কখনো নিজেকে ভেঙে ফেলেও কাউকে ধরে রাখা। সে গভীর শ্বাস নেয়।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৭

—“আল্লাহ…আমার লক্ষ্মী বউটা কে ভালো রাখিও।সে বড্ড নরম। আমাকে শাস্তি দিতে গিয়ে নিজেই ভেঙে পরে।”
এই বলে ধীরে ধীরে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে।
একটা ঝড় থেমেছে। কিন্তু ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here