Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৭

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৭

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৭
সোহানা ইসলাম

সকালের আলোটা আজও ঘরের ভেতরে ঢুকেছে ঠিকই, কিন্তু জারার মুডের সাথে সেই আলোর কোনো মিল নেই।
__“বা*ল পাকনামি করে কালি। আরে বলদ বেডা, ওটা এখানে কেন রেখেছেন?”
জারা দাঁত চেপে কথাটা বলল। আরমান অসহায় ফেইস নিয়ে তাকিয়ে রইল বউয়ের দিকে। কিছু বলার ভাষা নেই তার। ছয়টা মাস ধরে এই দৃশ্য তার জীবনের নিত্যদিনের অংশ হয়ে গেছে। একদিন হাসি, একদিন কান্না, একদিন রাগ, আবার একদিন অকারণ অভিমান—জারার মুড সুইং যেন আরমানের ধৈর্য পরীক্ষা নেওয়ার জন্যই বসে আছে।
জারা এখন আট মাসের প্রেগন্যান্ট। ছোটখাটো শরীরটা বড় পেটের ভারে যেন আরও গুলো-মুলো হয়ে গেছে। হাঁটলে হাঁপায়, বসলে উঠতে কষ্ট হয়। হাত-পায়ে পানি এসেছে, আঙুলগুলো ফুলে আছে। আয়নায় তাকালে নিজেরই নিজেকে অচেনা লাগে তার। ডাক্তার বলেছে, প্রেগন্যান্সির সময় এসব নরমাল। কিন্তু জারার কাছে কিছুই নরমাল লাগছে না। শরীর খারাপ, মন খারাপ, ভয়—সব মিলিয়ে জারা যেন নিজেকেই আর চিনতে পারছে না।

আট মাসের গর্ভে জারা’র শরীরের গঠন আগের চেয়ে অনেকটাই বদলে গেছে। ছোটখাটো, নরম শরীরটার ওপর এখন মাতৃত্বের ছাপ স্পষ্ট। পেটটা গোল হয়ে সামনে বেরিয়ে এসেছে, যেন সে তার ভেতরের ছোট্ট প্রাণটাকে আগলে ধরে আছে। হাঁটার সময় ভারসাম্য রাখতে তাকে একটু ধীরে চলতে হয়, কোমরটা সামান্য দুলে ওঠে। আগে যে শরীরটা হালকা আর চঞ্চল ছিল, এখন সেখানে এক ধরনের স্থিরতা এসেছে—মায়ের স্থিরতা।
হাত-পা আগের তুলনায় ভরাট দেখায়। আঙুল গুলোতে হালকা ফোলা ভাব, কবজির কাছে টান টান অনুভূতি। পায়ের পাতা দুটো সন্ধ্যার দিকে ভারী লাগে, তবুও সে দাঁড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করে, নিজেকে দুর্বল ভাবতে চায় না। মুখের গড়নেও পরিবর্তন এসেছে—গাল দুটো আগের চেয়ে ভরাট, ত্বকে এক ধরনের নরম উজ্জ্বলতা। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছায়া থাকলেও দৃষ্টিতে আছে গভীরতা, যেন ভেতরে জমে থাকা হাজার অনুভূতির প্রতিফলন।
এই শরীরটা আর শুধু জারা’র নয়—এটা এখন একজন মায়ের শরীর। কষ্ট, পরিবর্তন আর দায়িত্ব মিলিয়ে গড়া এক নতুন গঠন, যেটা আরমানের চোখে আরও বেশি আপন, আরও বেশি মূল্যবান। আরমান কিন্তু সব দেখেও একটুও বিরক্ত দেখায় না। জারার খাওয়া-দাওয়া, গোসল করানো, চুল শুকানো, ওষুধ খাওয়ানো—সব কিছু নিজের হাতে করে। অবশ্য বাড়ির সবাই আছে, ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম—সবাই পাশে। তবুও আরমান যেন দায়িত্বটা কাউকে দিতে চায় না।
এক মাস হলো সে অফিস পুরো দমে অফ দিয়েছে। জারা কতবার বলেছে, কাজের কথা। অফিসে যেতে শুধু শুধু বাড়িতে বসে ফেকে কী করবে। কিন্তু আরমান এক কথায় বলেছে

—“এখন আমার সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট আমার বউ।”
এই নিয়েই জারা আবার ঝগড়া করে।
__“সব ছেড়ে ঘরে বসে থাকবেন কেন? অফিসে যান!”
আরমান যদি অফিসে যাওয়ার কথা বলে, তখনই শুরু হয় কান্না। জারা নিজেই বলে অফিসে যেতে, আবার আরমান যেতে চাইলে কান্না করে,
__“আপনি চলে গেলে আমার ভালো লাগে না।
আমার বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে।”
আর আবার যদি সারাক্ষণ কাছে থাকে
—“এই আপনি একটু দূরে যান তো! নিশ্বাস নিতে পারছি না!”
আরমান মাঝে মাঝে মনে মনে হাসে। আবার মাঝে মাঝে অসহায় লাগে। এই মেয়েটাকে সে ঠিক কোন নিয়মে সামলাবে, সেটা সে নিজেও জানে না। জারার যখন তখন মুড বদলে যায়—এই এক সমস্যা। কখনো খুব আদুরে, আবার পরের মুহূর্তেই আগুন। মাঝে মাঝে তো আরমানকে ধরে মারেও। হাত দিয়ে নয়, কথায়। কখনো আবার হাতও চলে যায়। আরমান চুপ করে সহ্য করে। বাচ্চা যখন নড়াচড়া করে, তখন ব্যথায় জারা আরমানকে বকতে থাকে।

__“এই দেখেন! আপনার বাচ্চা আবার লাথি মারছে!
আপনি কিছু বলেন না কেন? এই দুষ্টুকে আমার পেটে নিয়ে যায়। পাজি কোথাকার? শুধু আমাকে কষ্ট দেয়, একে বারে বাবার মতো হয়েছে এখনই। ”
আরমান তখন হাসে।
__“ওরে বাবা, আমার বাচ্চা তো একদম আমার মতো হবে।”
আজ সকালেও জারা রাগের মাথায় আরমানকে কামড়ে দাগ বসিয়ে দিয়েছে। দাগটা এখনো লাল হয়ে আছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরমান দাগটার দিকে তাকিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। কষ্ট পায়নি, কিন্তু বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠেছে। এই সবের মাঝেই আজকের ঝগড়ার কারণ—একজোড়া জুতো। আরমান ভুল করে জুতোগুলো এমন জায়গায় রেখে দিয়েছে, যেটা জারার চোখে পড়েছে। ব্যস, ঝড় শুরু।
__“এই তুই যা আমার চোখের সামনে থেকে। সহ্য হচ্ছে না আমার।”
জারা প্রায় চিৎকার করেই বলল। আরমান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবল—এখন কী করবে? যাবে? গেলে আবার কান্না করবে। না গেলে আবার ঝগড়া।

__“তুমিই বলো, কোথায় রাখব?” আরমান শান্ত গলায় বলল।
__“যেখানে খুশি রাখুন! আমার সামনে না!”
জারা গজগজ করতে লাগল। আরমান আর কিছু বলল না। জুতো তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় রেখে দিল। হাত ধুয়ে ফিরে এসে দেখল, জারা বিছানার এক পাশে বসে আছে। মুখটা অন্যদিকে ঘোরানো, চোখ লাল।
__“এসব রেখে আমাকে একটু জড়িয়ে ধরুন। তাড়াতাড়ি। ভালো লাগছে না।”
হঠাৎ করেই গলা নরম হয়ে গেল জারার। আরমান মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। এতক্ষণ অপমান, চেঁচামেচি—সব মিলিয়ে মাথা ভার হয়ে ছিল। তবুও কিছু না বলে এগিয়ে এসে জারাকে বুকের মধ্যে টেনে নিল।
কিন্তু ঠিক তখনই, জারা ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। এই কান্নাটা আরমান সহ্য করতে পারে না। রাগ, বকা, মার—সব সে নিতে পারে। কিন্তু কান্না না। বুক থেকে জারার মুখটা তুলে নিজের মুখের সামনে আনল।
__“কান্না করছো কেন বউ? আমি কি ভুল করেছি? বলো। আমাকে মারো, বকো, কাটো—তবুও কান্না কোরো না। কষ্ট হয় আমার।তোমার কান্না আমার সহ্য হয় না সোনা ।”
জারা কাঁদতে কাঁদতে আরমানের শার্টে নাক মুছল।

__“আমি আপনাকে অনেক জ্বালাই তাই না? মারি, বকি, কামড় দেই, কাজ করাই… তবুও আপনি সব মুখ বুঝে সহ্য করেন কেন? আমাকে ধমক দিতে পারেন না?”
আরমান হালকা হেসে ফেলল। সে জানে, এই সময় মেয়েদের মাথার ভেতর ঝড় চলে। ভয়, দুশ্চিন্তা, হরমোন—সব একসাথে।আরমান আস্তে করে বলল
__“বউকে ধমক দিয়ে কী পাব? তোমার অত্যাচার সইচ্ছায় আমি মাথা পেতে নিয়েছি, লক্ষী বউ। তাহলে কেন ধমক দেব?”
জারা নাক টানতে টানতে বলল,
__“আম্মু বলে, আমি আপনার সাথে যেরকম করি, অন্য কেউ হলে আমাকে এক দরজা দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক দরজা দিয়ে বের করে দিত। আজকে নাকি এসেছে আমাকে ইচ্ছে মতো দিবে।”
আরমান হু হু করে হেসে উঠল। জারার নাক টেনে দিয়ে বলল,
__“আমার হাফ ইঞ্চি বউয়ের এখনো বুদ্ধি হয়নি। আবাল মেয়ে। আমি তোমাকে সহ্য করছি না বরং তুমি আমাকে সহ্য করছো।”
তারপর একটু চোখ বড় করে নাটকীয় গলায়—

__“আর শাশুড়ি আম্মা তোমাকে মারবে? আমি আছি না? দেখে নেব শাশুড়ির বাড়ি কোথায়!”
জারা আর থাকতে পারল না। আরমানকে জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। কিছুক্ষণ আগেও যে মুখে ঝড় ছিল, এখন সেখানে শান্তি। আরমান জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মনে মনে ভাবে— এই মেয়েটা কতটা নরম, আবার কতটা অস্থির। কতটা শক্ত, আবার কতটা অসহায়। এই হাসি থাকুক। এই কান্না থাকুক। এই রাগ থাকুক। সব মিলিয়েই তো মানজারা। আর সব মিলিয়েই তো তার জীবন।
আরমান জারাকে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে আদর করতে থাকে। আট মাসের গর্ভ নিয়ে জারার শরীরটা এখন ভারী, তবুও আরমানের বাহুর ভেতর সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে। আরমানের হাত জারার পিঠে, চুলে—কখনো মাথায়, কখনো কাঁধে—নরম ছোঁয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই আদর কোনো শব্দ চায় না, তবুও ভেতরের সব কথা যেন ছোঁয়ার মধ্যেই বলা হয়ে যায়।ঘরটা তখন বেশ শান্ত। জানালার বাইরে রাত নেমেছে, বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া। আরমান বিছানার পাশে বসে জারাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। এক হাত দিয়ে জারার চুলে বিলি কাটছে, আরেক হাত আলতো করে ওর কাঁধে। জারা আধশোয়া, চোখ বন্ধ করে আছে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। এতক্ষণে ওর মুডটা একটু ভালো হয়েছে।
হঠাৎ দরজার কাছে হালকা একটা শব্দ হয়—টুপ…টুপ… আরমান প্রথমে খেয়াল করে না। জারা চোখ খুলে দরজার দিকে তাকায়।

__“আপনি কিছু শুনলেন?” সে ফিসফিস করে বলে।
আরমান তাকায়। দরজার ফাঁকে ছোট্ট একটা ছায়া নড়াচড়া করছে। একটু পরেই দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় রিয়াত। ছোট্ট শরীর, পা দুটো একটু কাঁপছে। এখন হাঁটতে পারে ঠিকই, কিন্তু ভারসাম্য ঠিক রাখতে এখনো একটু সমস্যা হয়। তবুও সে বেশ গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। রিয়াত দরজার ফ্রেম ধরে আদো আদো করে বলে,
__“তাত্তু… তাতিয়া…”
কথাগুলো পরিষ্কার নয়, জড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আরমান আর জারা দুজনেই বুঝে যায়। জারা হেসে উঠে বলে,
__“দেখুন, আপনার তাত্তু এসেছে।”
আরমান মুচকি হেসে রিয়াতের দিকে হাত বাড়ায়।
__“এই যে, আমার তাত্তু এখানে ?”
রিয়াত চোখ বড় বড় করে তাকায়। তারপর খুব সিরিয়াস মুখ করে আবার বলে,
__“তাত্তু… তাতিয়া… কিচু… কিচু বনছো!”
এইবার জারা আর আরমান দুজনেই হেসে ফেলে।
রিয়াত একটু এগিয়ে আসে। এক পা সামনে দিতেই হোঁচট খায়। সঙ্গে সঙ্গে আরমান উঠে গিয়ে ওকে ধরে ফেলে।

__“এই যে, আস্তে বাবা,” বলে কোলে তুলে নেয়।
রিয়াত কোলে বসেই আরমানের গালে হাত বুলিয়ে দেয়।
__“তাত্তু… ভালা,”
বলে আবার জারার দিকে তাকিয়ে,
__“তাতিয়া… হাসো!”
জারা নিজের অজান্তেই হাসে। চোখ ভিজে আসে।
__“এই বাচ্চাটার কথা শুনলে মনটাই ভালো হয়ে যায়,” বলে সে।
আরমান রিয়াতকে একটু নাচিয়ে বলে,
__“তুমি এখানে কেন এসেছো বলো তো?”
রিয়াত ভ্রু কুঁচকে ভাবে। তারপর খুব পাকা ভঙ্গিতে বলে,
__“তাতিয়া… বড় পেট!”
এই কথায় আরমান হেসে উঠতে গিয়ে কাশি দেয়। জারা লজ্জায় হাত দিয়ে মুখ ঢাকে।
__“এই দেখুন! কে এসব শেখাচ্ছে ওকে?”
আরমান হেসে বলে,

__“নিজেই বুঝে গেছে মনে হয়।”
রিয়াত আবার খুব সিরিয়াস হয়ে জারার পেটের দিকে তাকায়। ছোট্ট হাত দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেয়।
__“বেবি?”
সে প্রশ্নের মতো বলে। জারা থমকে যায়। ধীরে মাথা নাড়ে।
__“হ্যাঁ বাবা, বেবি আছে!তোমার ভাই ।”
রিয়াত চোখ বড় করে তাকায়।
__“আমাল বাই ?”
বলে নিজের বুকের দিকে আঙুল দেখায়। আরমান বলে,
__“হ্যাঁ, তোমারই ভাই ।”
এই কথা শুনে রিয়াত খুশিতে হাততালি দিতে থাকে।
__“আমাল বাই! আমাল বাই।”
জারা আরমানের দিকে তাকায়। রিয়াতের হাসিতে ঘরের সব ভার যেন হালকা হয়ে যায়। বাইরে থেকে কিছুই শোনা যাচ্ছে না—শুধু একটা পরিবারের ছোট্ট মুহূর্ত, যেখানে ভালোবাসা কোনো বড় শব্দে নয়, ছোট ছোট হাসিতে প্রকাশ পাচ্ছে।
আরমান ধীরে ধীরে রিয়াতকে নামিয়ে দেয়।
—“চল, চাচ্চু তোর হাঁটা দেখি।”
রিয়াত আবার দুই পা বাড়িয়ে দেয়। এক পা, দুই পা… তৃতীয় পায়েই হোঁচট খায়। আরমান সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলে।

—“এই তো, ধরে নিলাম।”
রিয়াত হেসে বলে,
—“তাত্তু আছে…”
জারা পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে। তার মনে হয়—এই মানুষগুলোই তার পৃথিবী। মুড সুইং, কষ্ট, ক্লান্তি—সব কিছুর মাঝেও এই মুহূর্তগুলোই তাকে শক্ত করে।
রিয়াত আবার জারার দিকে তাকিয়ে বলে,
—“তাতিয়া… হাসো…”
জারা চোখ মুছে হেসে ওঠে।
—“এই তো হাসছি।”
তিনজনের হাসি মিলে ঘরটা ভরে যায়। নূর আজকে আসবে। মেয়ে টা মাএ হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। ওর মায়ের মতো সুন্দরী। রোহানের ভাষায় একেবারে চাঁদ সুন্দরী। জারা রিয়াতের গাল টেনে দিয়ে বলে,
__“ রিয়াত বাবু! তোমার আম্মু কোথায়? ”
রিয়াত কথা না বুঝে উল্টো প্রশ্ন করে,
__“ তোতায়? ”
আরমান রিয়াত কোলে তুলে নেয়।
__“তোর জানতে হবে না। তুই আমার সাথে আয়। ”
বলে রিয়াত কে নিয়ে নিচে চলে যায়। যাওয়ার আগে জারাকে পই পই করে বারন করে যায়। নিচে যেনো না নামে একা একা। জারা হেসে সম্মতি দেয়।

সন্ধ্যার আকাশটা ধীরে ধীরে গাঢ় হতে শুরু করেছে। খান বাড়ির সামনে এসে থামে একটা গাড়ি। গাড়ির শব্দ শুনেই ঘরের ভেতরে একটা আলাদা নড়াচড়া শুরু হয়ে যায়। জারা তখন সোফার পাশে বসে ছিল। দরজার ফাঁক দিয়ে গাড়িটা দেখতেই বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে তার। চোখ দুটো এক মুহূর্তে ভিজে যায়। গাড়ি থেকে নামেন জারা’র মা–বাবা। সঙ্গে তার দুই ভাই—জাহির আর জোহান। এতদিন পরে পরিচিত মুখগুলো চোখের সামনে আসতেই জারা বহু কষ্টে নিজেকে সামলে দাঁড়ায়। আট মাসের গর্ভ নিয়ে শরীরটা ভারী হয়ে গেছে, হাঁটতেও এখন সাবধান হতে হয়। তবু মনটা আর মানে না। পিছন থেকে ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম প্রায় একসাথেই বলে ওঠেন,
—“আরে আস্তে যা মা, হুঁচট খাবি তো! তোর বাবা-মা তো বাড়ির ভেতরেই আসছে।”
কিন্তু জারা সে কথা শুনে না। দরজার দিকেই এগিয়ে যায়। এতদিন পরে বাবা-মাকে দেখার অপেক্ষা আর ধরে না তার মন। দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে পড়ে সে।
দরজা পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই মারজিয়া বেগম চোখে পড়ে মেয়েকে। এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি জারাকে জড়িয়ে ধরেন।

—“আমার মা… কেমন আছিস তুই ?”
কণ্ঠটা কেঁপে ওঠে তার। জারা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দেয়।
—“ভালো আছি আম্মু… কিন্তু তোমাদের খুব মিস করেছি।”
জারা’র বাবা ধীরে ধীরে কাছে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখেন। চোখে তারও জল চিকচিক করে।
—“দেখো তো আমাদের মেয়ে কত বড় হয়ে গেছে। মা হতে চলেছে এখন ।”
জারা মাথা নিচু করে লাজুক হাসে। বাবা-মায়ের ভালোবাসা যেন একসাথে বুকের ভেতর ঢেউ তোলে।
মারজিয়া বেগম সঙ্গে করে আনা ব্যাগ খুলে মেয়ের দিকে এগিয়ে দেন।
—“তোর পছন্দের কিছু জিনিস এনেছি। জানি না এখন আর পছন্দ হয় কি না।”
জারা ব্যাগটা ছুঁয়ে দেখে।
—“তুমি যান আনবে আমার সব পছন্দ হয় আম্মু।”
এই সময় জাহির এগিয়ে আসে। বোনের মাথায় হাত রেখে হালকা হাসি দিয়ে বলে,
—“বুড়ি, কেমন আছিস?”
জারা ভাইয়ের দিকে তাকায় ছলছল চোখে।

—“আমাকে ভুলে গেছো তুমি। তোমার বুড়িকে ভুলে গেছো।”
জাহির এক মুহূর্ত দেরি না করে বোনকে বুকে টেনে নেয়।
—“পাগলি! আমি তোকে ভুলে যাইনি রে। একটু ব্যস্ত ছিলাম, তাই আসতে দেরি হলো।”
জারা ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে ফোঁপাতে থাকে।অনেক দিন জমে থাকা অভিমান যেন এই মুহূর্তে বেরিয়ে আসে। পাশ থেকে জোহান মুখ ভার করে বলে ওঠে,
—“আমাকেও একজন ভুলে গেছে।”
সবাই ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে। জারা চোখ মুছে হেসে ছোট ভাইয়ের দিকে হাত বাড়ায়।
—“আয় এখানে। তোকে আমি কী করে ভুলবো মীরজাফর ?”
জোহান এসে জারাকে জড়িয়ে ধরে।
—“বনু, তোমার পেটটা এখন অনেক বড়।”
জারা হেসে বলে,
—“ভেতরে যে তোর ভাগ্নে বা ভাগ্নি আছে।”
ঠিক তখনই আরমান সামনে এসে দাঁড়ায়। সে শশুর–শাশুড়ির দিকে সম্মান করে সালাম দেয়।
—“আসসালামু আলাইকুম আব্বু, আম্মু। ভালো আছেন?”
জারা’র বাবা হাসিমুখে উত্তর দেন।

—“আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছ বাবা?”
আরমান বিনয়ের সাথে বলে,
—“আপনাদের দোয়ায় ভালো আছি।”
এরপর আরমান মজা করে জোহানের দিকে তাকায়।
—“এই যে পটল শালাবাবু , তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস।”
জোহান গম্ভীর মুখ করে বলে,
—“আমি ছোট ছিলাম কবে।”
আরমান হেসে ওকে কোলে তুলে নেয়।
—“তা হলে কোলে ওঠা বন্ধ?”
জোহান হেসে পড়ে।
—“না, এইটা চলবে না ।”
এই দৃশ্য দেখে জারা’র মনটা ভরে যায়। তার দুই পরিবার যেন একসাথে মিশে গেছে। মিম আর ফিহাও এগিয়ে এসে জারা’র মা–বাবার সাথে কুশল বিনিময় করে। এরপর ফারিয়া বেগম নিজে এগিয়ে এসে মারজিয়া বেগমের হাত ধরে বলেন,
—“চলুন আপা, ভেতরে চলুন। অনেক কথা জমে আছে।”
মারজিয়া বেগম হাসিমুখে সম্মতি জানান।
—“হ্যাঁ, এতদিন পর এলাম। কথা তো হবেই।”
সবাই ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে এগোয়। ঘরটা ভরে যায় মানুষের কোলাহলে, হাসিতে আর আপনজনের উষ্ণতায়। জারা পেছন ফিরে একবার তাকায়। মনে হয়, এই মুহূর্তটার জন্যই সে এতদিন অপেক্ষা করছিল। বাবা-মা, ভাই, শ্বশুরবাড়ির মানুষ—সবাই মিলে যেন তার পৃথিবীটা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।

রাতে খান বাড়ির ডাইনিং টেবিলটা আজ একটু বেশি ভরপুর। বড় টেবিল জুড়ে সবাই বসেছে—পরিচিত মুখ, আত্মীয়তার উষ্ণতা, আর খাবারের গন্ধে ভরা ঘর। রোহান অফিস শেষ করে সোজা জিনিয়াকে নিয়ে এসেছে, দুজনেই ক্লান্ত কিন্তু মুখে প্রশান্তির হাসি। জিনিয়া বসতেই রোহান তার প্লেটে ভাত তুলে দেয়, অভ্যাসবশত।
আরমান জারার পাশে বসে। জারার সামনে প্লেটটা একটু এগিয়ে এনে সে ধীরে ধীরে মাছের কাঁটা বেছে দেয়। একেবারে যত্ন করে। বড় কাঁটা, ছোট কাঁটা—কোনোটাই বাদ যায় না। তারপর নিজে হাতে এক লোকমা তুলে জারার মুখে দেয়।নরম গলায় বলে আরমান,
__“আস্তে খাও,”
জারা চোখ তুলে তাকায়। বিরক্তি আর ভালোবাসা মিশ্রিত দৃষ্টি।ফিসফিস করে বলে,
__ “সবাই দেখছে,”
আরমান হালকা হেসে বলে,
__“দেখুক। আমার বউ, আমি খাওয়াবো। কার বাবার কী?”

ডাইনিং টেবিলে তখন সবাই। ফারিয়া বেগম জারার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন। মারজিয়া বেগমও চোখে মুখে আদর নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। আনিছুর রহমান খানিকক্ষণ চুপ করে খাবার নেড়ে দেখেন। তারপর হঠাৎ গলা খাঁকারি দেন। তিনি গম্ভীর স্বরে বলেন,
__“আপনাদের কারো আপত্তি না থাকলে,একটা কথা বলতাম।”
টেবিলের কথাবার্তা থেমে যায়। চামচ থামে, চোখ গুলো উঠে যায় আনিছুর রহমানের দিকে।
আরিফ খান ভদ্রভাবে বলেন,
__“এতো অনুমতি নিতে হবে না বেয়াই। আপনি বলুন।”
আনিছুর রহমান একটু গলা সোজা করে বলেন, __“আমি চাই… জারাকে কিছুদিনের জন্য আমাদের সাথে নিয়ে যেতে।”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে যেন বাতাস ভারী হয়ে আসে। তিনি আবার বলেন,
__“ওর মা বলছিল, মেয়েদের প্রথম বাচ্চা নাকি বাবার বাড়িতে হলে ভালো হয়।”
এই কথাটা পড়তেই ডাইনিং টেবিলের পরিবেশ বদলে যায়। যেন এক মুহূর্তে রঙ ফিকে হয়ে গেল। কারও মুখে কথা নেই। সবচেয়ে বেশি বদলে যায় আরমানের মুখ। তার হাতটা থেমে যায় মাঝপথে। চোখ দুটো কুঁচকে যায়। সে ধীরে শশুড়ের দিকে তাকায়, কিন্তু কিছু বলে না। আরিফ খান প্রথমে নীরবতা ভাঙেন। কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু দৃঢ়। তিনি বলেন,
__“দেখুন বেয়াই,কিছু মনে করবেন না। আমরা চাই না জারা মা আমাদের থেকে দূরে যাক। এই বাড়িতে ও নিরাপদ, যত্নে আছে।”
আনিছুর রহমান তৎক্ষণাৎ বলেন,

__“আমি সেটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু বাবার বাড়ির আদরটা আলাদা। ওখানে মায়ের ছায়া—”
আরমানের চোখে তখন আগুন। সে আর চুপ থাকতে পারে না। চামচটা টেবিলে রেখে বলে ওঠে,
__“আদর কি এখানে কম দিচ্ছি আমি বা আমার পরিবার?”
সবাই চমকে তাকায়। আরমান শশুড়ের দিকে ঝুঁকে বলে,
__“আমার বউকে আমার কাছ থেকে দূরে নেওয়ার কথা কীভাবে ভাবলেন আপনি?”
আনিছুর রহমানও কম যান না। গলায় শক্তি নিয়ে বলেন,
__“আমি ওর বাবা। আমার মেয়ের ব্যাপারে আমার কথা বলার অধিকার আছে।”
আরমান গলা চড়িয়ে বলে,
__“অধিকার আছে,কিন্তু আমার বউকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার অধিকার কারোর নেই!”
পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।আনিছুর রহমান বলেন,
__“এই সময় বাবার বাড়িতে থাকলে মেয়েদের ভালো হয়।
আরমান তির্যক হাসে,
–“ভালো হয় মানে?আমি কি খারাপ রাখছি ওকে?”
আনিছুর রহমান আঙুল তুলে বলেন,
__“মেয়েদের প্রথম বাচ্চা বাবার বাড়িতে হয়, এইটা রেওয়াজ!”
আরমান ভ্রু কুঁচকে বলে,
__“রেওয়াজ মানে কি? এটা কি বিদ্যুৎ বিলের নিয়ম নাকি?যে সব সময় এক নিয়মে দিতে হবে। আমি আমার বউকে ছাড়ছি না ব্যাস! ”

এই কথায় মিম আর ফিহা একসাথে হেসে কুঁকড়ে যায়। ফারিয়া বেগম মাথা নেড়ে বলেন,
__“এই দুইজন আজ কী নাটক শুরু করলো আল্লাহ জানে।”
আনিছুর রহমান থামছেন না।
__“আমি যখন বলছি নিয়ে যাব, তখন নিয়ে যাব!”
আরমান টেবিল চাপড়ে বলে,
__“আমি থাকতে দেব না!”
জোহান চোখ বড় বড় করে বলে,
__“আব্বু, দুলাভাইয়ের সাথে কি তুমি কুস্তি লাগাতে চাও নাকি?”
এই কথা শুনে সবাই আবার হেসে ওঠে। আনিছুর রহমান জোহানের দিকে তাকিয়ে বলেন,
__“তুই চুপ কর। ছোট মানুষ বড় কথায় নাক গলাস না।”
আরমান সঙ্গে সঙ্গে বলে,
__“ছোট মানুষ? এই ছেলেটা আপনার থেকেও বেশি সেন্সিবল!”
জারা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। কখনো বাবার দিকে, কখনো স্বামীর দিকে। মুখটা হাঁ হয়ে আছে। সে এমন ঝগড়া আশা করেনি। জাহির তখন হঠাৎ বলে ওঠে,
__“আব্বু, আরমান ভাই ঠিকই বলছে।”
সবাই তাকায় জাহিরের দিকে। সে গলা পরিষ্কার করে বলে,
__“বুড়ি এখানে খুশি আছে । আরমান ভাই যেভাবে বুড়িকে দেখে—এটা তো সবাই দেখছে। শুধু নিয়মের কথা ভেবে বুড়িকে কষ্ট দেওয়ার মানে হয় না।”
রোহান মুখ টিপে হাসে। জিনিয়া তার কনুইয়ে খোঁচা দেয়, চুপ থাকার ইশারা করে। ফারিয়া বেগম মারজিয়া বেগমকে কানে কানে বলেন,

__“দেখছেন? আপনার মেয়েকে নিয়ে কী যুদ্ধ!”
মার জিয়া বেগম হাসতে হাসতে বলেন,
__“মেয়েটা ভাগ্যবতী। দুই পক্ষই টানাটানি করছে।”
ফারিয়া বেগম ধীরে বলেন,
__ “ঝগড়া করবেন না কেউ । মেয়েটার দিকে তাকান।”
কিন্তু ততক্ষণে আরমান আর আনিছুর রহমান কুমড় বেঁধে ঝগড়ায় নেমে পড়েছেন।আরমান বলে,
__“আপনি আমার বউকে নিয়ে যাবেন না!
__“আমি নিয়ে যাব,” আনিছুর রহমানও গর্জে ওঠেন।
__“আমি থাকতে হতে দেব না!”
__“দেখি কে আটকায়!”
আনিছুর রহমান এবার গম্ভীর মুখে বলেন,
__“আরমান, তুমি ছোট ছেলে। বুঝো না।”
আরমান সঙ্গে সঙ্গে বলে,
__“ছোট ছেলে? আমি তো আপনার নাতির বাবা হতে যাচ্ছি!”
এই কথায় এক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর— বুম!
সবাই একসাথে হেসে ফেটে পড়ে। মিম পেটে হাত দিয়ে বলে,
__“এই ডায়লগটা ছিল মারাত্মক!”
এই কথোপকথনে টেবিলের অর্ধেক মানুষ মুখ টিপে হাসছে। পরিস্থিতি সিরিয়াস হলেও দৃশ্যটা যেন অদ্ভুত রকমের নাটকীয়। জারা শেষমেশ ভাঙা গলায় বলে ওঠে,

__“থামুন দুজনে। কী বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করছেন !”
দুজনেই থেমে যায়। জারা চোখ ভেজা অবস্থায় বলে, __“আমি কোনো জিনিস নই যে টানাটানি করবেন। আমি কারও কাছ থেকে পালাচ্ছি না।”
আরমানের রাগ মুহূর্তে গলে যায়। সে জারার দিকে তাকায়। আনিছুর রহমানও চুপ করে যান।জারা ধীরে বলে,
__“আমি এখানেই থাকব। আর যদি কখনো বাবার বাড়ি যাই, সেটা আমার ইচ্ছেতেই যাব।”
কথাগুলো শুনে টেবিলের টান টান ভাবটা একটু ঢিলে হয়। আরিফ খান দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আনিছুর রহমান মাথা নিচু করে বলেন,
__“জারা আমি ভাবলাম তুই কতো দিন হলো আমাদের সাথে থাকিস নি, একটু ঘুরে আসলে ভালো লাগবে।আমি তো তোর খারাপ চাই নি।”
আরমান ধীরে বলেন,
__“আমিও তাই। পার্থক্য শুধু, আমি ওকে ছাড়তে পারি না।”
এই কথা শুনে ফিহা হেসে বলে,
__“ভালো চাইতে চাইতে আজকে তো যুদ্ধ লাগিয়ে দিলেন!”
শেষমেশ আরিফ খান হাত তুলে বলেন,
__“ব্যাস। এখন সবাই চুপ। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
কিন্তু ততক্ষণে হাসির রোল থামানো দায়। ডাইনিং টেবিল যেন হাসির স্টেজ। আনিছুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,

__“ঠিক আছে। দেখি কী হয়।”
আরমান সঙ্গে সঙ্গে বলে,
__“দেখবেন না। আমি দেখিয়ে দেব!”
এই লাইনেই আবার সবাই হেসে ওঠে। এক মুহূর্তের নীরবতার পর হঠাৎ কেউ একজন হেসে ওঠে—জিনিয়া। তার হাসি দেখে সবাই হালকা হয়। মিম আর ফিহা হাসে। জোহান সেই কখন খাওয়া শেষ করে রিয়াত আর নূর কে নিয়ে খেলা করছে।
জারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে—ঝগড়ার মাঝেও এই মানুষগুলো তাকে নিয়ে কতটা চিন্তিত, সেটা আজ নতুন করে বুঝতে পারে। ডাইনিং টেবিল আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। খাবার এগোয়। আরমান আবার জারার প্লেটে মাছ তুলে দেয়—এবার আরও যত্ন করে।
খাওয়া–দাওয়া শেষ হলে ধীরে ধীরে ড্রইংরুমটা ফাঁকা হয়ে আসে। একে একে সবাই নিজের নিজের রুমের দিকে চলে যায়। যাওয়ার আগে আরমান শশুড়ের দিকে তাকিয়ে এমন একটা মুখ বাঁকায়—যেন বলে দিচ্ছে,
__“আজকে যুদ্ধ এখানেই শেষ, কিন্তু শুধু বিরতি।”
আনিছুর রহমানও মুখ চেপে হাসি লুকোনোর চেষ্টা করেন। জারা তখনো বসে আছে মায়ের পাশে। মা–মেয়ের কত কথা—কখনো ছোটবেলার স্মৃতি, কখনো আসন্ন দিনের ভয়–উত্তেজনা, কখনো আবার একেবারে তুচ্ছ, অথচ আদরের গল্প। জেসমিন বেগম মেয়ের গাল ছুঁয়ে বলেন,
__“মুখটা কেমন গোল হয়ে গেছে রে… আমার জারাটা এখন একেবারে মা–মা লাগছে। আমার ছোট্ট মেয়েটা আজ কতো বড় হয়ে গেছে। ”
জারা লাজুক হেসে বলে,

__“আম্মু, আর বলো না। ওনি শুনলে আবার খেপাবে।”
ফারিয়া বেগম পাশে এসে বলেন,
__ তুই গল্প কর, আমি নিজ দায়িত্বে তোকে রুমে দিয়ে আসব। আগে দুধটা নিয়ে আসি।”
জারা মাথা নাড়ে। কিন্তু দুধের কথা শুনেই মুখটা একটু বেঁকে যায়। দুধ খেতে এখন আর ভালো লাগে না—গন্ধটাও সহ্য হয় না। এই সুযোগে, কেউ খেয়াল করার আগেই, সে আস্তে আস্তে উঠে নিজের রুমের দিকে চলে যায়। রুমে ঢুকেই দেখে—আরমান ল্যাপটপে বসে কাজ করছে। চোখে ক্লান্তি, কাঁধে দিনের ভার। জারা নিঃশব্দে গিয়ে বিছানায় বসে। নরম বালিশে হেলান দিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়।
আরমান চোখ তুলে তাকিয়েই তাকে দেখে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে আসে। মুখটা গম্ভীর, চোখে অদ্ভুত এক চিন্তা। জারার সামনে দাঁড়িয়ে ধীর গলায় বলে,
__“তুমি কি বাপের বাড়ি যেতে চাও?”
প্রশ্নটা হঠাৎ হলেও কণ্ঠে অভিযোগের চেয়ে ভয় বেশি। জারা অবাক হয় না। সে জানে—এই মানুষটার ভেতরে কী চলছে। জারা হেসে, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
__“আমি আমার স্বামীজানকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। কারণ ওনাকে বিরক্ত করতে আমার খুব ভালো লাগে।আমি যদি চলে যাই তাহলে তাকে কে বিরক্ত করবে।”
এই কথা বলেই সে বিছানায় শুয়ে পড়ে, পাশ ফিরে। যেন বিষয়টা এখানেই শেষ। আরমান একটা লম্বা নিশ্বাস ছাড়ে। ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটে ওঠে।

__“ওরে পাজি মেয়ে…” বলে সে মাথা নাড়ে।
জারা কম্বলের নিচে মুখ লুকিয়ে ফেলে। হাসি চাপতে পারে না।
__“পাজি হলে কী হয়েছে, আপনারই তো,”
ভোঁতা স্বরে বলে। আরমান আর কিছু বলে না। বাতিটা অফ করে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই জারাকে নিজের বুকের দিকে টেনে নেয়। তার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বিলি কেটে দেয়। এই নীরব আদরটাই এখন তাদের ভাষা।
হঠাৎ জারা ছোট্ট একটা শব্দ করে ওঠে—“আহ্…”
আরমান সঙ্গে সঙ্গে সজাগ।
__“কি হয়েছে বউ?”
জারা ভ্রু কুঁচকে বলে,
__“আপনার আন্ডা বাচ্চাটা পেটের ভেতর ফুটবল খেলছে।খালি লাথি মারে?”
আরমানের বুকটা কেমন করে ওঠে। হাসি আসে, আবার খারাপও লাগে। এই ছোট্ট মানুষটার ভেতরে সে কী অদ্ভুত শক্তি নিয়ে খেলছে—আর তার বউ কত কষ্ট সহ্য করছে! সে আলতো করে জারার পেটে হাত রাখে। খুব নরম গলায় বলে,

__“এই যে আমার মানিক…আমার পাপা আম্মুকে কষ্ট দিও না। ঘুমিয়ে পড়ো। তুমি এমন করলে আম্মু ব্যথা পায়। আর তোমার আম্মু ব্যথা পেলে যে পাপার কত কষ্ট হয় জানো?”
জারা চুপ করে শুয়ে থাকে। মন দিয়ে শোনে।আরমানের কণ্ঠে এমন এক মায়া, যে কোনো অস্থিরতাই যেন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে।
কিছুক্ষণ পর সত্যিই ভেতরের নড়াচড়া থেমে যায়। একেবারে শান্ত। জারা গাল ফুলিয়ে বলে,
__“আপনার বাচ্চা শুধু আপনার কথাই শোনে। আমাকে পাত্তাই দেয় না।”
আরমান হেসে ওঠে। বুকটা হালকা হয়ে যায়।
__“কারণ ও জানে—আমি ওকে আর ওর আম্মুকে খুব ভালোবাসি ” বলে মুচকি হাসে।
জারা তার দিকে ঘুরে তাকায়। চোখে শিশুসুলভ অভিমান।
__“আমি কি ভালোবাসি না?”
আরমান জারার কপালে আলতো একটা চুমু খায়।
__“ তুমি আদর করো না, ভয় দেখাও। ”
জারা নাক সিটকায়।

__“মিথ্যে কথা!আমি আমার আরহাম কে খুব ভালোবাসি ।”
কথাটা শোনামাত্রই আরমান যেন চমকে ওঠে। হাতটা থেমে যায়। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। সে একটু সোজা হয়ে জারার দিকে তাকায়, চোখ বড় বড়।
__“এই… তুমি নামও ভেবে রেখেছো? আর আমাকে বলোনি?”
কণ্ঠে অবাক ভাব, তার সঙ্গে অল্প একটু অভিমানও লুকিয়ে থাকে। জারা সেটা সঙ্গে সঙ্গেই টের পেয়ে যায়। ওর চোখ দুটো নরম হয়ে আসে। লাজুক হেসে বলে,
__“বলিনি ঠিকই… কিন্তু ভেবে রেখেছি।”
আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
__“কবে থেকে?”
জারা আঙুল দিয়ে কম্বলের কিনারা গুটাতে গুটাতে বলে,
__“জিনিয়া আপুরা একদিন নাম ঠিক করছিলো।আর ডাক্তার তো বলেছে ছেলে হবে। তাই তখন অনেক নাম বলছিলো সবাই। কিন্তু ‘আরহাম’ নামটা শুনেই আমার বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো। আপনার নামের সাথে মিলে যায়… আপনার মতোই শান্ত, আবার শক্ত।”
আরমান চুপ করে থাকে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে রাগ করেছে। ঠোঁটটা সামান্য বাঁকানো, চোখ অন্য দিকে।

__“ভালো ” শুধু এতটুকু বলে।
জারা বুঝে যায়—এই ‘হুম’-এর মানে অনেক কিছু। সে ধীরে ধীরে উঠে এসে আরমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। নিজের মুখটা ওর বুকে লুকিয়ে ফেলে।
__“রাগ করছো গো আরহামের আব্বু?”
__“না,” আরমান বলে, কিন্তু কণ্ঠে ঠিক বিশ্বাসযোগ্য হয় না। জারা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
__“আপনাকে না বলেই নাম ঠিক করেছি বলে রাগ করছেন, তাই না?”
আরমান একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
__“আমি শুধু ভাবছিলাম… এই খুশির কথাটা তুমি আগে আমাকে বলোনি কেন।”
জারা মাথা তুলে তাকায়। চোখে জল চিকচিক করে।
__“কারণ আমি চেয়েছিলাম… আপনি যখন প্রথম শুনবেন, তখন আমি আপনার বুকের কাছে থাকবো। ঠিক এখনকার মতো।”
এই কথায় আরমান আর কিছু বলতে পারে না। বুকের ভেতরের অভিমানটা গলে যায়। সে জারার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।
___“তুমি জানো… বাবা হওয়ার ভাবনাটাই আমাকে কেমন করে দেয়,আর নামটা যখন শুনলাম… মনে হলো সত্যিই আমাদের কেউ আসছে।”
জারা মুচকি হাসে।

__“আমাদের আরহাম।”
এইবার আরমানও হাসে। নরম, গভীর হাসি।
__“আমাদের।”
জারা আবার লজ্জা পায়। মুখটা লাল হয়ে যায়। হঠাৎ খুব নরম গলায় বলে,
__“শুনোন..!”
__“ বলো শুনছি.!”
__“ আমার না খুব আদর আদর পাচ্ছে স্বামীজান।”
এই কথা বলেই সে মুখটা নামিয়ে ফেলে। লজ্জায় চোখে চোখ রাখতে পারে না। আঙুল দিয়ে আরমানের শার্ট চেপে ধরে।আরমান হেসে ওঠে।
__“এই সময়েও তোমার আদর আদর পায়?”
জারা মাথা নেড়ে বলে,
__“এই সময়ই আরও বেশি পায়। আপনি বুঝেন না।”
আরমান ওকে আরও কাছে টেনে নেয়। কপালে আলতো চুমু দেয়।
__“এই নাও আদর,”
আর বলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
__“এইটুকুতে চলবে?”
জারা নাক সিটকায়।
__“না।”
__“আর কী চাই?”
জারা একটু ভেবে বলে,

__“আপনি আমাকে আরহামের আম্মু বলে ডাকবেন।”
আরমান থমকে যায়। কথাটা শুনে বুকটা কেঁপে ওঠে।
“আরহামের আম্মু…” শব্দগুলো যেন সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর খুব নরম গলায় বলে,
__“ এসো… আমার আরহামের আম্মু।”
জারা চোখ বন্ধ করে দেয়। বুকের ভেতরটা ভরে ওঠে। এত ভালোবাসা সে কোথায় রাখবে বুঝতে পারে না।সে ফিসফিস করে বলে,

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৬

__“আপনি জানেন,আমি মা হওয়ার চেয়ে বেশি খুশি হচ্ছি আপনাকে বাবা বানাতে পারছি বলে।”
আরমানের চোখ ভিজে আসে। সে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারে না। শুধু জারাকে জড়িয়ে ধরে রাখে।
__“তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্ত,আর আরহাম… আমাদের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।”
জারা হালকা করে হাসে। জারা শান্ত হয়ে আসে। আরমানের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে। বাইরে রাত আরও গভীর হয়, আর ঘরের ভেতরে—একটা নাম, একটা স্বপ্ন, আর অগাধ ভালোবাসা ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here