রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৬
সোহানা ইসলাম
অপেক্ষার দিন পেরিয়ে আজ সেই দিন। জারার বুকের ভেতরটা সকাল থেকেই অদ্ভুত রকমের ধুকপুক করছে। এই দুইটা দিন তার কাছে যেন দুই যুগের সমান লেগেছে। কতবার যে নিজেকে সামলেছে, আরমানকে বলতে বলতে থেমে গেছে।বলতে না পারার কষ্ট টা কতবার যে কান্না গলা পর্যন্ত উঠে এসেও জোর করে চেপে রেখেছে—তার হিসাব নেই।এতো বড় কথা, আনন্দের একটা বিষয় নিজের মাঝে চাপা রাখা কষ্টের।
আজ আরমানের জন্মদিন। শুধু জন্মদিন নয়, জারার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা দিনের সূচনা বললেও ভুল হবে না। সকাল থেকেই বাড়িটা একটু অন্যরকম। জারা সেটা টের পাচ্ছে। রাশেদ, রোহান আর জাহেদ—তিনজনই আজ অদ্ভুতভাবে অফিস থেকে অর্ধেক দিন ছুটি নিয়েছে। যাওয়ার সময় এমন ভান করেছে যেন খুব জরুরি মিটিং আছে, বিকেলে ফিরবে না। জারা সব বুঝেও কিছু বলেনি। শুধু মনের ভেতর হাসিটা চেপে রেখেছে। প্রতি দিনের মতোই বর কে অফিসে পাঠায়।
অন্যদিকে আসিফ খান আর আরিফ খান পুরো দায়িত্ব নিয়েছে আরমানকে সময়মতো বাড়ি আসতে না দেওয়ার। কখনো অফিসের কাজে ব্যস্ত রাখবে, কখনো বাহানা করে বসিয়ে রাখবে। সব মিলিয়ে প্ল্যান একদম পারফেক্ট।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই বাড়িটা একেবারে বদলে যেতে শুরু করল। ড্রইং রুমে রঙিন বেলুন, লাইট, ব্যানার—সবকিছু সাজানো হচ্ছে। “হ্যাপি বার্থডে আরমান” লেখা ব্যানারটা টাঙাতে গিয়ে রোহান এক বার কাত হয়ে পড়তেই জাহেদ হেসে বলল,
__“এই তো! জন্মদিনের আগেই পড়ে গেলে চলবে?”
রাশেদ লাইটের সুইচ পরীক্ষা করতে করতে বলল,
__“সব ঠিকঠাক হওয়া চাই। আজ কোনো ভুল চলবে না।”
জারা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। কিন্তু কিছু করতে গেলেই কেউ না কেউ বলে উঠছে,
__“ভাবী, আপনি কিছু করবেন না।”
__“ভাবী, আপনি শুধু বসুন।”
__“ভাবী, আপনার কাজ আলাদা।”
শেষমেশ জারা অভিমান করে মুখ ফুলিয়ে ফেলল।
__“ভালোই তো! আমাকে একদমই দরকার নেই কারো,”
বলে সে রিয়াত আর নূরকে নিয়ে সোফার একপাশে বসে পড়ল।রিয়াত জারার কোলে মাথা রাখে ,আবার নূরের এর সাথে খেলা করে। এটা দেখে জারার চোখটা ভিজে উঠল। সে নূরের গালে আলতো করে চুমু খেল। কারণ তাদের ও এমন ছোট একটা প্রাণ আসবে। যে সবাই কে মাতিয়ে রাখবে।
কেউ খেয়াল করেনি, জারা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। সময় যেন আজ ইচ্ছে করেই ধীরে চলছে। বুকের ভেতর চাপা উত্তেজনা, আনন্দ আর একরাশ অনুভূতি জমে আছে। সে জানে, আজকের দিনটা শুধু আরমানের জন্য নয়—তার নিজের জন্যও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ড্রইং রুমে এখন সব প্রস্তুত। লাইট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কেক টেবিলের ওপর ঢেকে রাখা। সবাই ফিসফিস করে কথা বলছে। রোহান চাপা গলায় বলল, “আরমান আসতে আর বেশি দেরি নেই।”
জারা গভীর নিঃশ্বাস নিল। রিয়াত আর নূরকে নিজের কাছে টেনে নিল। তার চোখে তখন শুধু একটা অপেক্ষা—যে অপেক্ষার শেষে আজ অনেক কিছু বদলে যাবে।
রাত প্রায় বারোটা পেরিয়ে গেছে। ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিয়ে আরমান যখন বাড়ির ভেতরে ঢোকে, তখন তার মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা—আজ আর কিছুই সহ্য করার শক্তি নেই। দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই সে থমকে যায়। পুরো বাড়ি অন্ধকার। একদম নিস্তব্ধ। আরমান বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে ফেলে।
__“ এ আবার কী কাণ্ড বা*ল !” মনে মনে বিরবির করে।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে সে। সাধারণত এই সময়
ফারিয়া বেগম বা জারা , কেউ না কেউ জেগে থাকে। কিন্তু আজ… বাড়িটা অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ।
হঠাৎ তার কানে আসে খুব হালকা একটা নিশ্বাসের শব্দ। যেন কেউ আছে, কিন্তু চোখে পড়ছে না। আরমান অন্ধকারের মাঝেই এদিক–ওদিক তাকায়।ক্লান্তিতে মোবাইল ও বের করে না পকেট থেকে। বুকের ভেতর একটু অস্বস্তি হয়। তারপর নিজেকেই বোঝায়
—“ধুর, সারাদিনের ক্লান্তি। কি সব ভাবনা মাথায় ঢুকছে।”
সে রুমের দিকে পা বাড়ায়। ঠিক তখনই— একসাথে বাড়ির সব আলো জ্বলে ওঠে। হঠাৎ আলোয় আরমানের চোখ ঝলসে যায়। সে চোখ ছোট করে ফেলে। কানের ভেতর একসাথে ভেসে আসে—
“🎶 হ্যাপি বার্থডে টু ইউ… 🎶”
আরমান পুরোপুরি থমকে যায়। এক মুহূর্তের জন্য কিছুই বুঝতে পারে না। তারপর চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দৃশ্যটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। ড্রইং রুমটা রঙিন বেলুন, আলো আর সাজে ভরে গেছে। ব্যানার ঝুলছে— Happy Birthday Arman। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সবাই—ফারিয়া বেগম, রাশেদ, রোহান, জাহেদ, আসিফ খান, আরিফ খান, জিনিয়া, মিম, ফিহা… কেউ বাদ নেই। আর একপাশে— ডিপ রেড শাড়ি পরা জারা।
আরমানের চোখ এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। তারপর তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে ওঠে। সব ক্লান্তি, বিরক্তি যেন এক নিমেষে উবে যায়।
__“এইসব কী?” অবাক হয়ে বলে আরমান।
রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
__“আজ তোর সাঙ্গা—ওহ সরি সরি, ডাউনলোড ডে!”
ড্রইং রুমে একসাথে হাসির রোল পড়ে যায়। আরমান হেসে রাশেদের দিকে তাকায়।
__“এইসব করার জন্যই তোরা তিনজন বিকেলে অফিস থেকে পালিয়েছিলি?”
রাশেদ, রোহান আর জাহেদ—তিনজনই মাথা নিচু করে হেসে ফেলে। জাহেদ বলে,
__“আরে ভাইয়া, জন্মদিনে একটু সারপ্রাইজ তো পাওয়াই উচিত তোমার? তাই সারপ্রাইজ দিতে চলে এসেছি ।”
ফারিয়া বেগম সামনে এসে মমতাভরা গলায় বলেন,
__“কোনো রাগ নয় এখন। আয় বাবা, আগে একটু মিষ্টি মুখ কর।”
মিষ্টির কথা শুনে আরমান মুখ কুঁচকে ফেলে।
__“আর মিষ্টি খাব না আমি। এই দুই দিন ধরে কথা নেই, বার্তা নেই—সবাই মিলে শুধু মিষ্টি খাইয়ে যাচ্ছে। আর না।”
সবাই আবার হেসে ওঠে। জিনিয়া হাসতে হাসতে বলে,
__“আনন্দের সময় মিষ্টি মুখ করতেই হয় ভাইয়া।”
আরমান কিছু বলার আগেই ফারিয়া বেগম নিজ হাতে মিষ্টি তুলে দেয়। বাধ্য ছেলের মতো আরমান এক কামড় খায়। এই ফাঁকে আরমানের চোখ বারবার চলে যাচ্ছে জারার দিকে। সে আজ একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। শাড়িটা খুব সুন্দর, কিন্তু মুখটা নিচু। চোখ তুলছে না। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—ও লজ্জা পাচ্ছে।
আরমানের কপাল আবার কুঁচকে যায়। “এখানে লজ্জা পাওয়ার কী আছে?” মনে মনে ভাবে সে।
এত মানুষ, এত আনন্দ—এমন সময় জারার চোখে সাধারণত দুষ্টুমি থাকার কথা। অথচ আজ সে একে বারেই চুপচাপ।
কেকটা সামনে আনা হয়। রোহান বলে,
__“চল আরমান, কেক কাট।”
আরমান কেক কাটতে গিয়েও একবার জারার দিকে তাকায়। জারা তখনও চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ফারিয়া বেগম জারা বলেন এসে আরমানের পাশে দাড়াতে। কিন্তু জারা এক জায়গা থেকে নড়ছে না। ফিহা তাকে কনুই দিয়ে হালকা খোঁচা দেয়। জারা একটু চমকে ওঠে, তারপর হালকা করে হাসে। কেক কাটার সময় সবাই আবার গান ধরে। কেক কাটার পর একে একে সবাই আরমানকে খাওয়ায়। হাসি, ঠাট্টা, কথা—সব মিলিয়ে ঘরটা ভরে ওঠে।
কিন্তু আরমানের মনটা কোথাও আটকে আছে। জারা আজ অন্যরকম। খুব শান্ত। খুব নরম। সবাই যখন ব্যস্ত কথা বলায়, তখন আরমান ধীরে ধীরে জারার কাছে যায়। খুব নিচু গলায় বলে,
__“এই যে, আপনি এমন লুকিয়ে আছেন কেন ম্যাডাম ?”
জারা চমকে তাকায়। চোখে একরাশ অনুভূতি।আস্তে বলে সে,
__“ক..কই.. কিছু না তো ।”
আরমান ভ্রু কুঁচকে বলে,
__“কিছু না হলে তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন? আমি কি কিছু ভুল করেছি? মনে তো হয় না, তবুও সরি সোনা। কি হইছে বলো? আমি সব ঠিক করে দিব বউ।”
জারা ঠোঁট কামড়ায়।
__“এখানে সবাই আছে…”
আরমান হালকা হাসে।
__“তা কী হয়েছে? তুমি তো আমার বউ।”
এই কথায় জারার চোখ ভিজে ওঠে। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ফারিয়া বেগম দূর থেকে সব লক্ষ্য করছিলেন।জারা লজ্জায় আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারে না। চোখ নামানো, ঠোঁট কামড়ানো—সব মিলিয়ে বুকের ভেতরটা অদ্ভুত কাঁপছে তার। হঠাৎই সে ঘুরে দাঁড়ায়, কোনো কথা না বলে সিঁড়ির দিকে দৌড় দেয়। শাড়ির আঁচলটা সামলে নিয়ে দ্রুত উপরে উঠে যায়।
ড্রইং রুমে উপস্থিত সবাই মুহূর্তেই বিষয়টা বুঝে ফেলে। জারার লাজুক দৌড়, মুখের লালচে আভা—সবকিছুই তাদের চোখ এড়ায় না। ফিহা মিমের দিকে তাকিয়ে হালকা করে হাসে, জিনিয়া চোখে চোখ রেখে মাথা নাড়ে। ফারিয়া বেগম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন, ঠোঁটের কোণে মমতার হাসি। এই লজ্জা তারা সবাই চেনে।
কিন্তু একজনই বোঝে না—আরমান।আরমান এক পা এগোয় সিঁড়ির দিকে। বউটা আজ অস্বাভাবিক রকম শান্ত, অস্বাভাবিক রকম লাজুক। তার ভেতরে কেমন যেন একটা টান লাগে। ঠিক তখনই রোহান সামনে এসে দাঁড়ায়।
__“আরে ভাই, বার্থডে গিফট তো নিয়ে যা!”
আরমান বিরক্ত হয়ে বলে,
__“লাগবে না আমার। তুই চিবিয়ে খা।”
এই কথা শুনে ড্রইং রুমে সবাই একসাথে বলে ওঠে,
__“এটা বললে হবে না! গিফট দেখে তারপর যাবে!”
হইচই আর হাসিতে ঘরটা আবার ভরে ওঠে। আরমান একবার উপরের সিঁড়ির দিকে তাকায়, তারপর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,
__“আচ্ছা ঠিক আছে।”
সে গিয়ে সোফায় বসে। শরীর এখানে থাকলেও মনটা নেই। মনটা উপরে, জারার পাশে। তবুও সে কিছু না বলে সামনে রাখা গিফটগুলোর দিকে তাকায়।একটার পর একটা গিফট তার সামনে রাখা হয়। আরমান প্রথমটা খুলে দেখে—একটা ছোট্ট বেবি ফিডার।
ভ্রু কুঁচকে যায় তার। দ্বিতীয়টা খুলে দেখে—নরম কাপড়ের বেবি জামা। তৃতীয়টা—ছোট্ট জুতো। চতুর্থটা—বেবি লোশন, পাউডার। আরমানের মুখে বিরক্তি জমে ওঠে। একটু রেগে গিয়েই বলে,
__“এইসব কী? বাচ্চাদের মতো করছো কেন সবাই? আর এসব ফিডার, বাচ্চাদের কাপড়, জুতো, লোশন—এসব দিয়ে আমি কী করব?”
ড্রইং রুমে হালকা হাসির রেশ। কেউ কিছু বলছে না।
ঠিক তখন জেসমিন বেগম শান্ত গলায় বলেন,
__“আর একটা আছে। ওটা খুলে তারপর যা।”
আরমান বিরক্ত মুখেই শেষ বাক্সটা হাতে নেয়। ঢাকনা খুলে ভেতরে দেখে কিছু কাগজ। সে ভাবছে হয়তো আবার কোনো মজা। একটাকে তুলে নিয়ে চোখ বুলাতেই হঠাৎ তার চোখ-মুখ বদলে যায়।সে কাগজটা ভালো করে খুলে দেখে। একটা রিপোর্ট। আরমানের হাত কাঁপতে থাকে। সে দ্রুত বক্স থেকে আরেকটা কাগজ বের করে। সেটাও রিপোর্ট। দুটো রিপোর্ট মিলিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায় তার কাছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ঠোঁটে কাঁপা কাঁপা হাসি। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ভরে যায় অদ্ভুত এক অনুভূতিতে—ভয়, আনন্দ, বিস্ময়, ভালোবাসা… সব একসাথে।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হঠাৎই ছোট বাচ্চার মতো খুশিতে লাফাতে লাফাতে মায়ের কাছে চলে যায়। কাঁপা গলায় বলে ওঠে আরমান,
__“আ..আম্মু! আমি বাবা হচ্ছি? আমি বাবা হচ্ছি আম্মু?”
ফারিয়া বেগম আর কিছু বলতে পারেন না। চোখ ভিজে আসে তার। তিনি শুধু ছেলেকে বুকে টেনে নেন। আরমান আবার বাবার দিকে দৌড়ে যায়।
__“আব্বু! আমি বাবা হচ্ছি!”
সে হাসে, আবার কাঁদে।
__“আমার নামে কেউ ডাকবে, ‘বাবা’ বলে। আমার রক্ত, আমার অস্তিত্ব।”
গলা ভেঙে আসে তার।
__“আম্মু তুমি শুনতে পাচ্ছো আমি বাবা হবো? আ..আমাকেও বাবা বলে ডাকার জন্য একটা ছোট্ট প্রাণ আসছে। আমার অংশ… আমার আর মানজারার অংশ আম্মু ।”
ছেলের এই উচ্ছ্বাস দেখে বাবার চোখেও জল চিকচিক করে ওঠে। তিনি শক্ত করে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। আরমান তখন আর নিজেকে থামাতে পারে না। ড্রইং রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়েই আবেগে কথা বলতে থাকে।
__“ তোমরা সবাই আগে থেকেই জানতে তাই না? আমাকে আগে বলোনি কেন? ”
জেসমিন বেগম বলেন,
__“ বলে দিলে সারপ্রাইজ কই থাকলো। আর তোর আমাদের বারন করছে। বলেছে তোর জন্মদিনে বেস্ট গিফট দিবে।”
আরমান কাগজ গুলো বুকে চেপে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বলে,
__“আ..আমি আমার জীবনের বেস্ট গিফট টা আজকে পেয়েছি। আমার এতো খুশি লাগছে, এতো খুশি লাগছে কি বলবো তোমাদের? ”
ফারিয়া বেগম চোখ মুছতে মুছতে বলেন,
___“আল্লাহ তোকে অনেক বড় উপহার দিল বাবা।”
আরমান মাথা নাড়ে।
__“হ্যাঁ আম্মু। কিন্তু এই উপহারের পেছনে যে মানুষটা সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেছে…”
তার গলা ভারী হয়ে আসে।
__“সে আমার মানজারা।আমার লক্ষী বউ ।”
ফারিয়া বেগম ছেলেকে বুকে টেনে নেন। আরমান কাঁদতে কাঁদতে বলে,
__“আম্মু, আমি তো ভাবতেই পারিনি… আল্লাহ আমাকে এতো বড় সুখ দেবে। আমি ভয় পাচ্ছি আম্মু। আমি কি পারব? আমি কি ঠিক মতো একজন ভালো বাবা হতে পারব?”
ফারিয়া বেগম মাথায় হাত রেখে বলেন,
__“তুই পারবি বাবা। যার মনে এতো ভয় আর ভালোবাসা আছে, সে কখনো খারাপ বাবা হতে পারে না।”
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। হঠাৎ বলে ওঠে,
__“আমি আমার বউয়ের কাছে যাচ্ছি আম্মু ।”
কেউ কিছু বলার আগেই সে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে চলে যায়। পা দুটো কাঁপছে, বুক ধড়ফড় করছে। উপরে উঠে সে জারার রুমের দরজার সামনে থামে। ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। সে একবার গভীর শ্বাস নেয়, তারপর দরজায় হালকা টোকা দেয়।
__“লক্ষী বউ …”
ভেতর থেকে কোনো উত্তর আসে না। আরমান দরজাটা ধীরে খুলে ভেতরে ঢোকে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, দুই হাত বুকের কাছে জড়ো করা। বুকের ভেতরটা এমন অদ্ভুতভাবে ধুকধুক করছিল যে মনে হচ্ছিল শব্দটা বাইরে বেরিয়ে যাবে। সে জানত—এখন আর লুকোনোর কিছু নেই। আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা আরমান জেনে গেছে।
হঠাৎ দরজার সামনে পায়ের শব্দ। জারা কিছু বোঝার আগেই আরমান ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। কোনো কথা নেই, কোনো প্রশ্ন নেই। শুধু এক ঝলক তাকানো—আর তাতেই সব বলা হয়ে যায়। পরের মুহূর্তেই আরমান জারার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ে। জারা আঁতকে ওঠে।
__“স্বামীজান…!”
কিন্তু আরমান তখন তার নিজের জগতে। সে জারার পা দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, যেন এই মুহূর্তটা ছুটে পালাতে না পারে। কাঁপা গলায় সে বলে ওঠে,
—“আমার ক্ষুদ্র জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় তুমি, লক্ষী বউ। আমার এই অসম্পূর্ণ জীবনের সম্পূর্ণ অধ্যায় তুমি।”
জারার চোখ মুহূর্তেই ছলছল করে ওঠে। আরমান থামে না। বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসে।
—“আমার রানী সাহেবা তুমি। আমার সব স্বপ্নের শেষ ঠিকানা তুমি। আর… আর আজ থেকে তুমি আমার বাচ্চার আম্মু।”
এই কথাটুকু বলেই আরমানের গলা ভেঙে যায়। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। একদম বাচ্চাদের মতো কেঁদে ওঠে। কোনো লজ্জা নেই, কোনো সংকোচ নেই। শুধু নিখাদ আবেগ, নিখাদ কৃতজ্ঞতা। জারা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না আর। তার বুকের ভেতরটা যেন ভরে উঠছে এক অদ্ভুত অনুভূতিতে—ভালোবাসা, দায়িত্ব, ভয়, আনন্দ—সব একসাথে। এতো ভালোবাসা সে রাখবে কোথায়?
যে মানুষটা তাকে ধীরে ধীরে ভেঙে ভেঙে আবার নতুন করে গড়ে তুলেছে, যে মানুষটা তাকে অসম্পূর্ণ থেকে পূর্ণ করেছে—তার এই কান্না জারা কীভাবে সহ্য করবে? সে ঝুঁকে পড়ে আরমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
—“আমি মা হওয়ার চেয়ে,আপনাকে বাবা ডাক শুনানোর এক আকাশ পরিমাণ ইচ্ছে ছিল আমার, স্বামীজান।”
আরমানের কান্না একটু থামে। সে মাথা তুলে তাকায়।
জারা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে,
—“আর সেই ইচ্ছে আমি পূর্ণ করতে পেরেছি।”
এই কথাটা যেন আরমানের বুকের ভেতর সোজা আঘাত করে। সে উঠে জারাকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নেয়। এমনভাবে জড়িয়ে ধরে, যেন ছেড়ে দিলে সব হারিয়ে যাবে।
—“আমাকে এতো এতো পূর্ণতা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ তোমায়, বউ,”
আরমান ফিসফিস করে বলে।
—“আমার হাফ ইঞ্চি বউ… আজ আমার বাচ্চার মা?”
সে হালকা হাসে, আবার কেঁদে ওঠে।
—“আল্লাহ… আমি এই সুখ কোথায় রাখবো?”
জারা চুপচাপ আরমানের বুকে মাথা রেখে থাকে। তার কান্না এখন নীরব, গভীর। এই কান্না কষ্টের না—এই কান্না অর্জনের, প্রাপ্তির। জারা ধীরে বলে,
—“আমি ভয় পেয়েছিলাম,ভাবছিলাম আপনি কেমন রিঅ্যাক্ট করবেন। ভাবছিলাম হয়তো রাগ করবেন, হয়তো চিন্তায় পড়ে যাবেন।”
আরমান মাথা নাড়ায়।
—“আমি শুধু ভাবছি… তুমি এতো কষ্ট একা একা কীভাবে সহ্য করলে বউ?”
জারা মুচকি হাসে, চোখ ভেজা।
—“আপনাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। আপনার জন্মদিনে আপনাকে বাবা হওয়ার খবরটা দিতে চেয়েছিলাম।”
আরমান আর কিছু বলতে পারে না। সে শুধু জারার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। খুব সাবধানে, খুব যত্নে। যেন এই মুহূর্তটাও তার ভবিষ্যৎ সন্তানের স্মৃতির অংশ। আরমান বলে,
—“আজ থেকে সবকিছু বদলে যাবে,তোমার ক্লান্তি, তোমার বিরক্তি, তোমার মুড—সবকিছুর দায়িত্ব এখন আমার।”
জারা হালকা হেসে বলে,
—“আপনি তো আগেও নিয়েছেন।”
আরমান মাথা নেড়ে বলে,
—“না! আগে শুধু বউয়ের দায়িত্ব ছিল। এখন বউ আর বাচ্চা—দুজনের।”
সে জারার হাত নিজের বুকে রেখে দেয়।
—“এই হৃদয়টা এখন তিনজনের।”
জারা চোখ বন্ধ করে সেই স্পন্দন অনুভব করে। তার ভেতরে, তার শরীরের ভেতরে, তাদের দুজনের ভালোবাসা থেকে জন্ম নেওয়া এক ছোট্ট প্রাণ—এই ভাবনাটুকুই তাকে কাঁপিয়ে দেয়।জারা ধীরে বলে,
—“আমি ভয় পাচ্ছি স্বামীজান! ”
আরমান তার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
—“ভয় পেও না। আমি আছি। সবসময়।”
ঘরটা তখন নীরব। বাইরে হয়তো সবাই অপেক্ষা করছে, কিন্তু এই মুহূর্তটা শুধু তাদের। স্বামী-স্ত্রী থেকে বাবা-মা হওয়ার পথে প্রথম ধাপ। জারা হালকা করে আরমানকে জড়িয়ে ধরে।
—“আপনাকে আমার সন্তানের বাবা হিসেবে দেখতে চাই আমি, সেই ছোট্ট প্রাণ টা আপনার কোলে। ”
আরমান চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়। আরমান কাঁপা হাতে জারার পেটের দিকে তাকায়।
__“এই ছোট্ট জায়গাটার ভেতর আমার একটা অংশ বড় হচ্ছে ভাবতেই বুকটা ভরে যায়। আমি জানি না আমি কেমন বাবা হবো, পারফেক্ট হবো কিনা—কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, এই শিশুর জন্য আমি আমার সবটা উজাড় করে দেব।”
জারা আরমানের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে। আরমান জারার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে,
__ “আমার রানী সাহেবা… আমার লক্ষী বউ… তুমি জানো না, তোমার এই নীরব হাসির ভেতর আমি কতটা শান্তি পাই। তুমি আমাকে শুধু ভালোবাসোনি—তুমি আমাকে পূর্ণ করেছো।”
সে গভীর শ্বাস নেয়।
__“এই বাচ্চাটা শুধু আমাদের সন্তান না, মানজারা। এটা আমাদের ভালোবাসার প্রমাণ। আমাদের সব না-বলা কথা, সব অপেক্ষা, সব ধৈর্যের ফল।”
আরমান চোখ বন্ধ করে বলে
—“আল্লাহ যদি আমাকে হাজারটা জীবন দিতো, আমি প্রতিটা জীবনেই তোমাকেই চাইতাম। কারণ তুমি আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছো… আর আজ আমাকে বাবা হতে শিখাচ্ছো।”
শেষে ফিসফিস করে বলে,
—“আমি খুব ভাগ্যবান, মানজারা। খুব… খুব ভাগ্যবান।”
আরমানের কথাগুলো জারার কানে ঢোকার আগেই যেন সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করছিল। প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস—সব মিলিয়ে জারা বুঝতে পারছিল, এই মানুষটার ভেতরটা আজ পুরোপুরি উন্মুক্ত। কোনো শক্ত পুরুষ নয়, কোনো দায়িত্বশীল স্বামী নয়—এই মুহূর্তে আরমান শুধু একজন আবেগে ভরা মানুষ, যে নিজের সব ভালোবাসা তার সামনে খুলে ধরে বসে আছে। জারার বুকটা হঠাৎ খুব ভারী হয়ে আসে। গলায় দলা পাকানো কান্না আটকে রাখতে পারছিল না সে। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে যায়, আর ভেজা চোখ দিয়েই আরমানকে দেখতে থাকে। এতো ভালোবাসা… এতো স্বীকৃতি… এতো সম্মান—সে কখনো চায়নি, ভাবেনি, কল্পনাও করেনি। অথচ সব একসাথে এসে তার বুক ভরিয়ে দিচ্ছে।
তার মনে হচ্ছিল, সে যেন খুব ছোট। অথচ এই ছোট্ট মানুষটাকেই আরমান তার পুরো পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছে। নিজের অসম্পূর্ণতা, ভয়, দুর্বলতা—সব কিছু তার সামনে রেখে দিয়েছে বিশ্বাসের সাথে। জারার হাত দুটো কেঁপে উঠছিল। সে বুঝতে পারছিল না, এই অনুভূতির নাম কী—গর্ব, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, না কি নিখাদ সুখ “আমি কি সত্যিই এতো কিছুর যগ্য?” এই প্রশ্নটা জারার মাথার ভেতর ঘুরছিল।
আরমান যখন বলছিল “তুমি আমাকে পূর্ণ করেছো”, জারার মনে হচ্ছিল—না, সে একা কিছু করেনি। তারা দুজন মিলেই একে অপরকে পূর্ণ করেছে। কিন্তু আজ আরমান যেভাবে তাকে মা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে, জীবনসঙ্গী হিসেবে দেখছে—তা জারাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। জারার এক হাত অজান্তেই নিজের পেটের উপর চলে যায়। এই ছোট্ট প্রাণটার কথা ভাবতেই তার চোখ দিয়ে নতুন করে পানি গড়িয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারছিল, এই বাচ্চাটা শুধু তার শরীরের অংশ না—এটা তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে পবিত্র রূপ। তার মনে হচ্ছিল, সে এখন শুধু জারা না। সে কারো আশ্রয়, কারো ভবিষ্যৎ, কারো জীবনের নতুন নাম—“মা”। আরমানের চোখের জল, কাঁপা কণ্ঠ, শিশুর মতো আবেগ—সবকিছু জারার মনে গভীরভাবে গেঁথে যাচ্ছিল। সে অনুভব করছিল, এই মানুষটার সুখ, ভয়, স্বপ্ন—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এখন সে। জারার মনে হলো, এই মুহূর্তে যদি সময় থেমে যেত—তবুও তার কোনো আফসোস থাকতো না। কারণ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে পূর্ণ অনুভূতিটা সে এখনই অনুভব করছে।
আরমান হঠাৎই আর কিছু না ভেবে জারাকে পাঁজা কোলে তুলে নেয়। মুহূর্তটুকুতে জারা প্রথমে অবাক হলেও পরের সেকেন্ডেই খিলখিল করে হেসে ওঠে। তার হাসির শব্দে ঘরটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আরমান তাকে ঘুরাতে থাকে, নিজের আনন্দটা আর লুকোতে পারে না। জারার হাত দুটো স্বাভাবিকভাবেই আরমানের গলায় চলে আসে।
—“এই নামান স্বামীজান ! পড়ে যাবো তো !”
ভয় মেশানো হাসিতে সে বলে।আরমান হেসে বলে,
—“পড়তে দেবো না বউ !”
তাদের দুজনের হাসি মিলেমিশে পুরো রুম ভরে যায়। বাইরে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রোহান, জিনিয়া, রাশেদ, ফিহা আর মিম একসাথে সেই দৃশ্যটা দেখে থমকে যায়। কারো মুখে শব্দ নেই, শুধু নরম হাসি। এই হাসিতে কোনো কৌতুক নেই—এটা পরিপূর্ণতার হাসি। রোহান ফিসফিস করে বলে,
—“দেখেছিস? বেপা কতো খুশি ।”
জিনিয়া মাথা নাড়ে।
—“এটা বাবা হওয়ার আনন্দ ।”
মিম আর ফিহা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে। এই মুহূর্তে কেউ ভেতরে ঢুকে কিছু বলতে চায় না। এটা শুধু আরমান আর জারার সময়। কিছুক্ষণ পর রাতের নীরবতা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসে। সবাই বুঝে যায়—আজকের দিনটা এখানেই শেষ করা উচিত। একে একে সবাই নিজেদের রুমের দিকে চলে যায়। রোহান আর জিনিয়া নিচের দিকে নামে।
রাশেদ মৃদু স্বরে বলে,
—“চল, সবাই।”
বলে মিম কে নিয়ে চলে যায়। রিয়াত ঘরে একা আছে। ফিহা আর জাহেদ শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ। জাহেদ বলে,
—“চল?”
ফিহা মাথা নাড়ে।
—“হুম।”
তারা নিজেদের রুমে ঢোকে। দরজা বন্ধ হতেই চারপাশের শব্দগুলো হঠাৎ থেমে যায়। ঘরের ভেতর শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। হঠাৎ করেই জাহেদ ফিহার কোমর জড়িয়ে ধরে।হালকা দুষ্টু গলায় বলে,
—“কটকটি,চলো না… আমাদের গল্পটাও এক ধাপ এগিয়ে নিই। দুজন থেকে তিন জন হয়ে যাই। ”
ফিহা চমকে ওঠে। তার গাল দুটো মুহূর্তেই লাল হয়ে যায়।
—“আপনি এসব হঠাৎ…” কথাটা গলায় আটকে যায়।
জাহেদ তার প্রতিক্রিয়াটা লক্ষ্য করে। সে মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে ফিহার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকায়।
—“কিছু বলছো না কেন?”
ফিহা অস্বস্তিতে নড়ে।লাজুক গলায় বলে,
—“আমি… আমি এসব জানি না,আপনার ইচ্ছে।”
এই কথাটা শুনে জাহেদ একটু থমকে যায়। তার চোখে হালকা বিস্ময়, তারপর এক ধরনের দায়িত্ব – বোধ। সে বুঝে যায়—এটা কোনো তাড়াহুড়ার মুহূর্ত না। সে ধীরে ফিহার হাত দুটো ধরে।শান্ত কণ্ঠে বলে,
—“ইচ্ছে মানে জোর না,ইচ্ছে মানে দুজনের সম্মতি।”
ফিহা চোখ তুলে তাকায়। সেই তাকানোয় ভয় কম, লজ্জা বেশি। জাহেদ হালকা করে তার ঠোঁটের কাছাকাছি আসে—কোনো তাড়া নেই, কোনো দাবি নেই। খুব আলতো একটা চুমুর ইঙ্গিত মাত্র। তারপর ফিসফিস করে বলে,
—“যদি না চাও, বলবে।”
ফিহার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সে চোখ বন্ধ করে খুব ছোট করে মাথা নাড়ে।
—“আমি… ভয় পাই একটু,” স্বীকার করে।
জাহেদ হাসে না, কৌতুকও করে না। বরং আরও ধীরে বলে,
—“ভয় পাওয়া ঠিক আছে।”
সে ফিহার কপালে আলতো একটা চুমু দেয়—নিশ্চিত করার মতো, দাবি করার মতো নয়।
—“আমরা সময় নেবো।”
ফিহার চোখ ভিজে ওঠে। এই মানুষটার এই সংযম, এই বোঝাপড়া—তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি এনে দেয়।
—“আপনি খুব ভালো,” সে ফিসফিস করে বলে।
জাহেদ হালকা হেসে তার কপালে আবার কপাল ঠেকায়।
—“আমি শুধু চাই তুমি স্বস্তিতে থাকো।”
ফিহার হাতটা শক্ত হয়ে আসে তার হাতের ভেতর। এই প্রথম সে নিজেকে ছোট মনে করে না, দুর্বলও না। বরং নিরাপদ। জাহেদ ধীরে তার কপালে একটা হালকা চুমুর ইঙ্গিত দেয়—ছোঁয়া মাত্র।
—“আজ এতটুকুই যথেষ্ট,”জাহেদ বলে।
ফিহা চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নেয়।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৫ (২)
—“হ্যাঁ,”
একটা শান্ত সম্মতি। ঘরের বাতাসটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। বাইরে রাত আরও গভীর হয়, কিন্তু এই ঘরের ভেতরে কোনো অস্থিরতা নেই। আছে শুধু ধৈর্য, বোঝাপড়া আর ভবিষ্যতের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার শান্ত অনুভূতি।
