রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭২ (২)
সোহানা ইসলাম
হালকা রোদের আলো মিশে আছে চারপাশে । উপরের বড় কনফারেন্স রুমে আরমান, রোহান, রাশেদ, আসিফ খান এবং আরিফ খান গম্ভীর মুখে বসে আছেন। আলোচনার টেবিলের মাঝখানে বড় নকশার ফাইল, ল্যাপটপ খোলা, আর পাশে নোটপ্যাড।
ইসলামপুর গ্রামের নতুন কোম্পানির ওপেনিং হয়েছে প্রায় দুই মাস আগে। ওপেনিং–এ সবাই গিয়েছিল, জাঁকজমক আয়োজন ছিল। কিন্তু পরের সমস্যা হলো—ওপেনিং-এর পর আর কেউ ঠিকমতো যায়নি। কোনোরকম তদারকি না থাকায় অভ্যন্তরীণ মেশিনারিগুলো ঠিকমতো চলছে না, কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ, বড় একটা ডিল চোখের সামনে হারানোর উপক্রম।
রাশেদ আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বললো
—“স্যার! কাল না গেলে হবে না। কর্মচারী আস্থাই হারিয়ে ফেলবে।”
আরমান চুপচাপ মাথা নেড়ে বললো
—“হ্যাঁ। কাল সকালে আমরা দু’জনই বের হবো। সমস্যা বড় হওয়ার আগেই ঠিক করতে হবে।”
রোহান কপাল কুঁচকে বললো
—“একা যবি কেনো? প্রয়োজন পরলে আমিও যাবো।
__“ তোকে যেতে হবে না। আমি আর রাশেদ সামলে নিবো।তুই জিনিয়ার খেয়াল রাখিস!”বললো আরমান
__“ আচ্ছা সে না হয় রাখব!আমি আজকে বাসায় একটু আগেই ফিরব। জিনিয়ার জন্য অস্থির লাগছে। ”
রোহানের এই কথায় কনফারেন্স রুমের ভেতর সামান্য নীরবতা নেমে আসে। বাবা চলে যাওয়ার পর ছেলেটার কাঁধে যেনো এক পাহাড় নেমে এসেছে। কিন্তু সে তবুও হাসি মুখে দায়িত্ব পালন করছে।
আসিফ খান গলা চড়িয়ে বললেন
—“ব্যবসার পাশাপাশি নিজের জীবনকেও গুছিয়ে রাখো। তবে এখন যেটা জরুরি, সেটা হলো প্রকল্পটা সামলানো।”
সবাই গম্ভীর হয়ে আবার আলোচনায় ডুবে গেল।
ঠিক তখনই—ধাম! ঝড়ের মতো দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে জাহেদ।মুখে তার বিরাট হাসি, চোখে উচ্ছ্বাস। সে রোহানের দিকে ছুটে গিয়ে তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠলো
—“রোহান ভাই! আমি মামা হচ্ছি!”
সবাই প্রথমে হতবাক!তারপর ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে রইল, যেনো কথাটা ঠিকভাবে বোঝার চেষ্টা করছে।
জাহেদ উচ্ছ্বাস থামাতে না পেরে, সোজা আরমানের দিকে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে আবার বলে—
__“ভাইয়া ! শুনছো ? আমি.. তুমি মামা হচ্ছি !”
আরমানের মুখে ধীরে ধীরে বিশাল হাসি ফুটে ওঠলো।
রাশেদ চেয়ার থেকে উঠে চশমা ঠিক করে দাঁড়াল।
আরিফ খান একে অন্যের দিকে তাকালো। রোহানের মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে খুব খুসি। আর খুসি না হওয়ার মতোও কথা নয়। তার চোখের ঝলকানি দেখে মনে হয় রোহান পাগল হয়ে যাবে… এই খবর শুনে”
আর সত্যিই হলো তাই।রোহান কিছুক্ষণ জাহেদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই থাকল—তারপর হঠাৎ করেই—ধাম! সোজা কনফারেন্স রুমের বড় টেবিলের উপর উঠে দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করলো!
__“দোস্ত রেরর..! আমরা মামা হচ্ছি!”
এমন নাচ—কাঁধ ঝাঁকানো, হাত দোলানো, গলা ফাটানো—যেনো কেউ টিকটক নাচ শুট করছে!
রুমে সবাই মুহূর্তেই বাকরুদ্ধ।আরিফ খান আর আসিফ খান মুখে হাত দিয়ে ফেলেন কি বলছে এই পাগল ছেলে?!রাশেদ জাহেদের কানে কানে ফিসফিস করে বললো
—“এই ছেলে পাগল হয়ে গেছে নাকি?”
আরিফ খান মুখে হাত রেখে বললেন
—“এই অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আরমান, বাবার হওয়ার খুশিতে পাগল হয়ে গেছে। আমরা বরং যাই। ওকে তোমরা সামলাও। মিষ্টি কিনতে হবে। ”
আসিফ খান সহ দু’জনই দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
এখন রুমে কেবল চারজন—আরমান, রোহান, রাশেদ, জাহেদ। রোহান নাচ করছে,
__“ওই ডিংকা চিকা.. ডিংকা চিকা..! আমি মামা হচ্ছি..! আ’হা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে..!
রোহানের কান্ড দেখে আরমান জাহেদ বোকার মতো তাকিয়ে আছে। রাশেদ হেসে বললো
—“স্যার, আপনি কি বাবা হওয়ার খুশিতে নাচতেছেন, নাকি মামা হওয়ার?”
রোহান থেমে যায়।মুখ হা করে রাশেদের দিকে তাকায়।চোখ পিটপিট করে।অবাক দৃষ্টিতে তাকায় আরমানের দিকে।আরমান চিৎকার করে বললো
—“এই গরু! নিচে নাম! আজকে তোর ক্লাস নিবো।”
রোহান ভয় পেয়ে বলে
—“কেন? আমি কি করেছি?”
আরমান গর্জে উঠলো—
__“তুই মামা হবি বলে নাচিস? তোর মামা হওয়া আমি বের করব আজকে গরু কোথাকার.! ”
রোহান আশ্চর্য হয় বলে
__“ বোঝলাম না! তোরা কি মামা হবি বলে খুশি হসনি?”
রাশেদ মুখ টিপে হেসে বলে
__“ সে তো আমরা সবাই হচ্ছি। কিন্তু আমি কোন খুশিতে নাচ করছেন?”
রোহান কপাল ভাজ করে বলে
__“ কেনো? জাহেদ যে খুশিতে নাচছে?”
আরমান এসে রোহানের মাথায় আরেক টা চাটা মে’রে বলে
__“ আমরা তোর বাচ্চার মামা হওয়ার খুশিতে নাচছি। আর এতোই যখন মামা হওয়ার শখ, তাহলে আমার বোনকে বিয়ে করতে গেলি কেন?”
হঠাৎ রোহানের চোখ বড় হয়ে গেল।তার বাচ্চা? তার গলায় শব্দ আটকে গেল! জাহেদ, আরমান মামা হচ্ছে মানে, সে..সে তাহলে?
—“ম মানে… আমি… বাবা ?”
সে দাঁড়িয়ে থাকে সম্পূর্ণ স্থির হয়ে।একদম হ্যাং হয়ে যাওয়া কম্পিউটারের মতো।জাহেদ ধাক্কা দিয়ে বললো
—“রোহান ভাই? রোহান ভাই? ঠিক আছো?”
কোনো শব্দ নেই।কোনো নড়াচড়া নেই।ঠিক তখনই—
এক প্রচণ্ড ধাপ্পড়!
__“এই গরু! দুনিয়ায় ফিরে আয় গরু!!”
আরমান রোহানের গালে চড় মারলো।
হঠাৎ রোহানের চোখে পানি এসে গেল।গলা কেঁপে উঠলো।ঠোঁটে কম্পন।তারপর—সে হঠাৎ আরমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
__“ভাই… আমার বউ… আমার জিনিয়া…আমার চাঁদ সুন্দরী.. সে আমার সন্তানকে জন্ম দেবে? আমি বাবা হবো?? ভাই… ধন্যবাদ! তোর বোনের জন্যই আজ আমি অসম্পূর্ণ মানুষটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলাম… বিশ্বাস কর ভাই, আমার কি যে আনন্দ লাগছে!”
তার কণ্ঠে কাঁপন, চোখে অশ্রু, ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি।জাহেদ সামনে এসে বললো
—“আ’হা! খবর দিলাম আমি আর জড়িয়ে ধরছো ভাইয়া কে!”
রোহান তখনই জাহেদকেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
__“তোকে-ও ভালোবাসি রে আর ধন্যবাদ।”
রোহান রাশেদ কে ও জড়িয়ে ধরে। অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বলে
__“বাবার হও্য়া টা কতো আনন্দের তা তুমি বোঝ তাই না রাশেদ?”
রাশেদ বললো
—“বাবা হওয়ার দুনিয়ার প্রথম সুখ। আর দ্বিতীয় সুখ তখন… যখন সন্তান ‘বাবা’ বলে ডাকবে।”
রোহান কান্না আর হাসির মাঝেই বলে
—“রাশেদ… ঠিকই বলছিস রে…”
আরমান চারপাশ দেখে বললো
—“চল, এখন সবাই বের হই। আব্বু-ছোট আব্বু’রা কখন চলে গেছে বুঝতেই পারি নাই।”
রোহান পকেট থেকে ফোন বের করে বললো
—“তোরা যা, আমি আমার চাঁদ সুন্দরীর জন্য শপিং করে তার পর যাবো।”
জাহেদ পাশ থেকে বলে উঠলো
—“ তুমি একা কেন? আমিও তো মামা হবো—আমারও কিনবি!”
সবাই হেসে দেয়।রোহান বললো
—“হ্যাঁ হ্যাঁ, তোরা সবাই আয় তাহলে। আজকে আমার বেবি আর বেবির মায়ের জন্য সব কেনাকাটা করব।”
আরমান হাতে গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে বললো
—“চলো, লেট না শপিং এ যাই।”
রাশেদ ফাইল বন্ধ করে বললো
—“ডিল–টিল পরে হবে। আগে মামা হওয়ার আনন্দ উপভোগ করি।”
চারজন গম্ভীর মানুষ থেকে পরিণত হলো উত্তেজিত কিশোরে।উল্লাস, হাসি, ঠাট্টা, মজা—সব মিলিয়ে তারা কনফারেন্স রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
চারজন মিলে দুই হাত ভর্তি শপিং করে যখন বাড়ির গেটে ঢোকে, তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছো। সন্ধ্যার আলো ধরণী লালছে হয়ে আছে। রোহানের হাতে সবচেয়ে বেশি ব্যাগ—কাপড়, খেলনা, ছোট ছোট প্যাকেট, আর আলাদা করে রাখা একটা ব্যাগে মিষ্টি আর ফল। জাহেদ আর রাশেদ হাসতে হাসতে বলে,
__ “ রোহান ভাই, তুমি তো পুরো শপিংটাই তুলে এনেছো।”
রোহান শুধু হেসে বলে,
__ “তারপরও কম লাগছে। মন চাচ্ছে পুরো বাংলাদেশের শপিং আমি আমার চাঁদ সুন্দরীর পায়ের কাছে এনে রাখি।”
বাড়িতে ঢুকেই রোহান প্রথমে জিনিয়ার রুমে যায় না। সে সোজা রান্নাঘরের দিকে যায়। ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম তখনো ব্যস্ত।তারা যানে মেয়ে জামাই আসবে বাড়িতে। আর আজ কতো খুশির দিন। ভালো মন্দ না রান্না করলে হয়? রোহান মিষ্টি আর ফল দুটো হাতেই এগিয়ে দিয়ে বলে,
__ “আম্মু, এইটা আপনার হাতে না দিলে মনটা শান্ত হতো না।” সঙ্গে সঙ্গে গিফটের ব্যাগটাও এগিয়ে দেয়। ফারিয়া বেগম চোখে-মুখে মায়া নিয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। জেসমিন বেগম হেসে বলে,
__ “আল্লাহ তোকে সুখে রাখুক বাবা। যা জিনিয়া ওর রুমে আছে।”
তারপর সবাই একে একে জিনিয়ার রুমে ঢোকে। রুমটা আজ একটু আলাদা—ভেতরে যেন আলোর সাথে সাথে আনন্দও ভরে আছে। বেডের গোল হয়ে বসে আছে পাঁচজন রমণী—জারা, মিম, ফিহা,ছায়মা আর জেরিন। পাশে দু’জন বাবা—আসিফ খান আর আরিফ খান। আসিফ খান জিনিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, চোখে একধরনের শান্ত তৃপ্তি।
রোহান দরজায় দাঁড়াতেই আসিফ খান রোহানের দিকে তাকিয়ে বলেন,
__“রোহান, এসো বাবা, ভেতরে এসো।”
রোহান ভ্রু নাচিয়ে, ঠোঁটে দুষ্টু হাসি নিয়ে বলে,
__“ বা’ব্বা! শশুর আব্বা, হঠাৎ আগলা পিরিত? আগলা পিরিত ভালো না কিন্তু,আপনার এই পিরিত দেখে আমার পেটের ভিতর কেমন যেনো করছে। এখন একটু সরে দাঁড়ান—আমি আমার বউয়ের কাছে যাবো।”
রুমে হেসে ওঠে সবাই। জারা আর ফিহা হেসে বেড থেকে নেমে জায়গা করে দেয়।আসিফ খান মাথা নেড়ে বলেন,
__“এই ছেলে কোনো দিন ভালো হবে না।”
রোহান গম্ভীর ভান করে বলে,
__“আমি তো ভালো না , ভালো লাইয়াই থাইকো।”
আরিফ খান হেসে ফেলেন। আসিফ খান শয়তানি হাসি দিয়ে বলেন,
__“তাহলে আমার মেয়েকে ভালো একটা ছেলে দেখে আবার বিয়ে দিয়ে দেব।”
রোহান সঙ্গে সঙ্গে হাতের ব্যাগগুলো বেডের পাশে রেখে শশুরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। গলা একটু নরম, কিন্তু চোখে দুষ্টুমি
—“আজ প্রথম বলছেন শশুর আব্বা, তাই মাফ করলাম। দ্বিতীয় বার কইলে কিন্তু সানডে–মান্ডে ক্লোজ করে দেব।”
এই কথায় রুম ভরে যায় হাসিতে। দুই বাবা হাসতে হাসতে বের হয়ে যান। তাঁদের চোখেমুখে তৃপ্তি—মেয়েটা ভালো আছে, তার পাশে আছে এমন একজন যে তাকে সবটা দিয়ে আগলে রাখে।
আরমান, রাশেদ আর জাহেদও তখন রোহানের পিছন পিছন ভেতরে ঢোকে। আরমান বোনের পাশে বসে কপালে হাত রাখে, কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর গিফট এগিয়ে দেয়। জাহেদ তো একেবারে ঝড়—মজা, হাসি, খুনসুটি।
__“এই পেত্নী , আমাকে মামা বানিয়েছিস বলে ভাবনিস না। আমি শুধু আমার ভবিষৎ মামার জন্য এগুলো এনেছি। আর দয়া মায়া করে তোর জন্যেও এসেছি।”
বলে জিনিয়ার হাতে গিফট এর প্যাকেট গুলো এগিয়ে দেয়। জিনিয়া হাসে ভাইয়ের কথায়। কতো মজা করতে পারে তার ভাই।
ফিহা এসে জাহেদের পাশে দাড়িয়ে বলে
__“ আজ যদি আপনি আপুর জন্য কিছু না আনতেন তাহলে আমি আপনাকে খবর করে ছাড়তাম। ”
জাহেদ ভ্রু কুঁচকে বলে
__“ কেনো? ”
__“ আমি প্রথম মামি হচ্ছি তাই আমারও একটা দায়িত্ব আছে। হুম! ”
জিনিয়া হেসে বলে,
__“সেটা তো এমনিতেই আছে।”
রাশেদ ও জিনিয়ার জন্য গিফট কিনেছে। সেগুলো মিমের হাতে দিয়ে বলে
__“ এগুলো তুমি জিনিয়া কে দাও! ”
মিমের মুখে এমনিতেই হাসি চলে আসে। গিফট গুলো নিয়ে জিনিয়াকে দেয়। ছায়মা আর জেরিন মন খারাপ করে বলে
__“ আমরাই আপুকে কিছু দেই নি.! ”
ছায়মা জেরিন কে বলে
__“ জেরি মন খারাপ করিস না। আমরা কাল শপিং করতে যাবো। তারপর ওদের থেকেও সন্দর গিফট কিনে আনবো।”
শপিং করতে যাবে শুনে জেরিন খুব খুশি। জিনিয়া বসে বসে সবার হাসি মুখ গুলো দেখছে। সবাই কতো খুশি।জারার মন খারাপ হয়ে যায়। ফিহা আর মিম ওদের গিফট দিয়ে দিয়েছে।আর সে? জারা আরমানের দিকে আড় চোখে তাকায়। আরমান জিনিয়ার পাশে বসে আছে। তার দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। বুকটা কেমন হু হু করে উঠে । চুপ করে এক কোনে দাড়িয়ে সবার আনন্দ দেখে জারা।
রোহান যেহেতু সবার জন্য গিফট এনেছে তাই জেরিন আর ছায়মা কে ওদের গিফট গুলো দিয়ে বলে
__“ শালিকা!তোমরা পরে তোমাদের বোনকে গিফট দিও, আগে ভাইয়ার টা নাও। ”
ছায়মা আর জেরিন খুশিতে গদগদ হয়ে যায়। রোহানকে ধন্যবাদ দিয়ে ছায়মা জেরিন কে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে নিচে চলে যায়। রোহান ফিহা, মিম আর জারা’র জন্য আনা গিফট ও তাদের দিয়ে দেয়।
আরমান খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিনিয়ার পাশে বসে আছে। সে বরাবরের মতো বেশি কথা বলে না। চোখে মুখে একটা দায়িত্বশীল বড় ভাইয়ের ছাপ। জিনিয়ার কপালে হালকা করে হাত রেখে দেখে নেয় সে ঠিক আছে কিনা। তারপর নিজের কোটের পকেট থেকে ছোট্ট কিন্তু ভারী একটা বাক্স বের করে।
জিনিয়া একটু অবাক হয়।আরমান শান্ত গলায় বলে, __এইটা তোমার জন্য, আমার দোয়া।”
বাক্স খুলতেই ভেতরে দেখা যায় একটা সোনার ব্রেসলেট, খুব সিম্পল কিন্তু সুন্দর। পাশে ছোট্ট একটা লকেট—ভেতরে জায়গা করা আছে ভবিষ্যতে একটা ছবি রাখার জন্য। জিনিয়ার চোখ ভিজে ওঠে। সে বুঝে যায়, এই মানুষটা কতটা ভেবেচিন্তে এনেছে।
আরমান নিজেই ব্রেসলেটটা জিনিয়ার হাতে পরিয়ে দেয়। তারপর নিচু গলায় বলে,
__“তুমি সব সময় এই বাড়ির রানী হয়ে থাকবে।এখন তুমি একা নও।তোমার মাঝে আরও একজন বড় হচ্ছে । নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখবে। কষ্ট হলে কাউকে বলতে না পারলে আগে আমাকে বলবে।ভাইয়া সব সময় আছি।”
জিনিয়া চোখ নামিয়ে মাথা নাড়ে।
__“ভাইয়া…”
আরমান হালকা হাসে।
__“সুখে থাকো সুস্থ থাকো ।”
জাহেদ তখন পাশে দাঁড়িয়ে মজা করে বলে,
__“ভাইয়া, ওকে আর ভালোবাসা দেখিও না, পরে মাথায় উঠে নাচবে?”
আরমান তাকিয়ে বলে,
__“সমস্যা নাই!একজন তো আছে চব্বিশ ঘণ্টা আমি মাথায় উঠে নাচার জন্য। আরেক জন এড হলেও আপত্তি নেই ।”
সবাই হেসে ওঠে।জারা’র মুখ গুমড়া হয়ে যায়। তাকে সবার সামনে অপমান করছে। জিনিয়ার চোখের কোণে তখনো জল, কিন্তু সেটা আজ আনন্দের। এরপর আরমান উঠে দাঁড়ায়। যাওয়ার আগে একবার জিনিয়ার মাথায় হাত রেখে বলে,
__“আল্লাহ তোমাকে আর তোমার বেবিকে ভালো রাখুক।আর চিন্তা করবে না ভাইয়া আছি।”
জাহেদ জিনিয়াকে আরও হাসিয়ে তুলে। তারপর আরমান আর জাহেদ বেরিয়ে যায়। যাওয়ার সময় আরমান চোখের কোণ দিয়ে জারার দিকে তাকায়। জারা দেখে—আরমানের হাত খালি।আর কোনো গিফট নেই। মুহূর্তেই জারার মাথায় যেন আগুন ধরে যায়। “ তার মানে এই লোকটা আজও তার জন্য কিছু আনেনি! আজ দুদিন ধরে ওর জন্য লোকটা কিছু আনছে না আর কথাও বলছে না। সেসব বাদ দিলো কিন্তু জাহেদ ভাইয়া, রাশেদ ভাইয়া তো ফিহা আর মিমের হয়ে গিফট কিনে এসেছে, তাহলে তার হয়ে একটা ছোট গিফগ কিনে আনলে কি হতো?” মনে মনে রাগে গাল ফুলিয়ে সে হনহন করে বেরিয়ে যায়।
আরমান শুধু মুচকি হাসে। সে বুঝে গেছে—বউ রেগে আছে। কিন্তু সে হার মানবে না। আগে এই হাফ ইঞ্চি মেয়ে ওর সাথে কথা বলবে তারপর সে বলবে। খুব জ্বালিয়েছে তাকে দুদিন আগে। এখন একটু শাস্তি পাক।
ফিহা জারার পেছন পেছন বেরিয়ে যায়।কিন্তু জাহেদ আবার ফিহাকে ডেকে নিজের সাথে রুমে নিয়ে যায়। মিমকে নিয়ে রাশেদ তাদের রুমে চলে যায়। আজ মিমকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়নি—জিনিয়ার খবরেই সবার মন আটকে ছিল।ফিহাও জাহেদের সঙ্গে রুমে চলে যায়। ছায়মা আর জেরিন নিচে নামে অনেক আগে।
এখন রুমে শুধু রোহান আর জিনিয়া। রোহান এসে জিনিয়ার পাশে বসে। কোনো কথা বলে না। শুধু মাথা নিচু করে বসে থাকে। সে শক্ত করে ধরে রাখে জিনিয়ার হাত।জিনিয়া আলতো করে রোহানের চুলে হাত বুলিয়ে বলে,
__“আপনি খুশি তো, রোহান?”
এই প্রশ্নটা যেন বাঁধ ভেঙে দেয়। রোহান ধীরে ধীরে জিনিয়ার আরও কাছে এসে বসে। ঘরটা নরম আলোয় ভরা, অথচ দু’জনের বুকের ভেতর আলো আঁধারির মিশ্র অনুভূতি। রোহান আর কিছু না বলে হঠাৎ জিনিয়াকে বুকে টেনে নেয়। এমনভাবে জড়িয়ে ধরে, যেনো ছেড়ে দিলে সব হারিয়ে যাবে।
__“তুমি জানো চাঁদ সুন্দরী ,” সে কাঁপা গলায় বলে,
__“এই প্রথমবার আমার বুক ভরে শ্বাস নিতে ইচ্ছে করছে।তোমার আর আমাদের বেবির হাত ধরে আরও হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছে করছে ।”
জিনিয়া তার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে হাসে। চোখ ভিজে যায়।
__“ বেবি কে পেয়ে আমাকে কম ভালোবাসবেন না তো আবার? ” সে ফিসফিস করে।
রোহান জিনিয়ার কপালে একটা চুমু দেয়। তারপর গালে, তারপর চোখের পাতায়। আনন্দে, আবেগে থামতে পারে না।
__“বেবি কে যে ডাউনলোড দিবে তাকেই বেশি ভালোবাসব। আমি এতে স্বার্থপর নই যে আমি আমার চাদঁ সুন্দরীকে ভুলে যাবো।আমার ভেতরে আমার চাঁদ সুন্দরীর জন্য ভরপুর ভালোবাসা আছে তার থেকে বেবিকে একটু দিব।” বলেই আবার জিনিয়ার ঠোঁটে চুমু খায়। জিনিয়া একটু নড়াচড়া করে উঠে।
__“আমি কি বেশি করছি?” সে হেসে বলে।
__“না,” জিনিয়া মাথা নেড়ে বলে,
রোহান এবার তার ঠোঁটে আলতো করে চুমু দেয়—খুব নরম, খুব যত্নে। তারপর কপাল ঠেকিয়ে বলে,
__“তুমি জানো, আজ বারবার মনে হচ্ছে—আমার ভেতরের সব শূন্যতা ভরে যাচ্ছে।মনে হচ্ছিল তুমি ঠিক নেই। কিন্তু জাহেদ যখন খবর টা দেয় তখন তো আমার বিশ্বাসই হচ্ছিলো না। আমাদের বেবি আসতে চলেছে।”
এই কথাটা বলেই রোহান ধীরে ধীরে জিনিয়ার পেটে হাত রাখে। খুব সাবধানে। যেনো ভেতরে থাকা ছোট্ট অস্তিত্বটা বুঝে ফেলবে।
__“এইখানে,” সে চাপা স্বরে বলে,
_ “আমার অংশ আছে,তাই না?”
জিনিয়া হেসে ফেলে।
__“আছে তো। পুরোটা আপনারই।”
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। চোখ নামিয়ে শুধু অনুভব করার চেষ্টা করে।
__“ বেবি নড়াচড়া করছো না কেনো? পাপা আসতে লেট করেছি বলে রাগ করেছো? পাপা কান দরছি। সরি সোনা! ”
বাচ্চার কোনো নড়ানড়া করতে না দেখে রোহান আবার বলে
__“নড়াচড়া করলে বোঝা যায় বেবি সুস্থ আছে? কিন্তু সে তো নড়ছে না। ”
সে হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে বলে।
__“ চলো, এখনই ডাক্তারের কাছে যাই।”
জিনিয়া এবার হেসে ওঠে।
__“আপনি পাগল নাকি? বেবির বয়স মাত্র তিন সপ্তাহ। এখনই কি নড়াচড়া করবে?”
রোহান মাথা চুলকে বলে,
__“ওহ… আচ্ছা। নড়বে না?”
তারপর লজ্জা লজ্জা মুখ করে যোগ করে,
__“আমি তো এসব বুঝি না। কিন্তু ভয় হয়, যদি তোমার আর বেবির…?”
জিনিয়া তার হাতটা শক্ত করে ধরে।
__“সব ঠিক আছে রোহান। আপনি পাশে আছেন তো এটাই সবচেয়ে বড় ঠিক।”
রোহান জিনিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। একদৃষ্টে। যেনো এই মুখটা সে মনে গেঁথে নিতে চায়।
__“তুমি জানো,” সে ধীরে বলে, “আমি আমাদের ভবিষ্যৎ কল্পনা করছি। সকালে তুমি আর ঘুমিয়ে থাকবো আর আমাদের পারসোনার এলার্ম আমাদের ঘুম ডেকে থেকে তুলবে। বলবে.. পাপা আম্মাম উঠো সকাল হয়ে গেছে। আমাদের ঘরটা ওর শব্দে ভরা থাকবে।”
জিনিয়া চোখ বন্ধ করে সেই কল্পনাটা অনুভব করে।
__“আর বেবি বলবে পাপা মাম্মাম পচা। ” সে মজা করে বলে।
রোহান ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
__“কেন?”
__“ কারণ বেবি বলবে, পাপা আর মাম্মাম অলস! আমাকে দিয়ে এলার্মের কাজ করায়।,” জিনিয়া হাসে।
রোহান হেসে আবার জিনিয়াকে জড়িয়ে ধরে।সে আবার কপালে চুমু দেয়।জিনিয়া চুপচাপ তার বুকে মাথা রাখে। বাইরে পৃথিবী যেমনই হোক, এই মুহূর্তে তাদের ছোট্ট সংসারে শুধু ভালোবাসা আর নতুন জীবনের স্বপ্ন।
__“তুমি জানো না,” কাঁপা গলায় রোহান বলে, “আমি ভেতরে ভেতরে কতটা ভয় পেয়ে ছিলাম। আব্বু চলে যাওয়ার পর মনে হতো—সব শেষ। আর আজ… আজ মনে হচ্ছে আমি আবার পূর্ণ।”
জিনিয়া তাকে আরও শক্ত করে ধরে।রোহান মাথা তুলে জিনিয়ার মুখের দিকে তাকায়। চোখ ভেজা, কিন্তু ঠোঁটে হাসি। সে একের পর এক ছোট ছোট চুমু দেয়—কপালে, গালে, চোখের কোণে।
__“তুমি জানো, তুমি আমাকে কী দিয়েছ?”
জিনিয়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ে।সে জানে না। রোহান হেসে বলে
__“তুমি আমাকে ভবিষ্যৎ দিয়েছ।”
রোহান ব্যাগগুলো টেনে আনে। একে একে গিফট বের করে।একটা ডায়মন্ডের নেকলেস। আলোয় ঝিলমিল করে। সে নিজের হাতে পরিয়ে দেয়।
__“এইটা তোমার জন্য। কারণ তুমি শুধু আমার স্ত্রী না, তুমি আমার সাহস।আর স্পেশাল হচ্ছে তুমি এখন থেকে আমার সন্তানের মা!”
তারপর আরেকটা ব্যাগ। ছোট ছোট জামা, রঙিন মোজা, নরম খেলনা।জিনিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
__ “এত তাড়াতাড়ি?”
রোহান হাসে,
__“আমি পাগল, জানো তো।তাই কিনে রাখছি। দুনিয়াতে বেবিকে নেংটা আসতে দিব না!”
জিনিয়া হেসে বলে,
__“আপনি সত্যিই পাগল।”
__“তোমার জন্য পাগল হওয়া সবচেয়ে সুন্দর পাগলামি!আমি যেনো সারাজীবন এমন পাগল হয়ে থাকি,” রোহান শান্ত গলায় বলে।
কিছুক্ষণ তারা চুপচাপ বসে থাকে। বাইরে বাড়ির শব্দ, হাসি, চলাচল—সব মিলেমিশে এক ধরনের শান্তি তৈরি করে।রোহান ধীরে বলে,
__ “আমি জানি সামনে অনেক দায়িত্ব। কিন্তু আমি ভয় পাই না। কারণ তুমি আছো।”
জিনিয়া মাথা ঠেকায় তার কাঁধে।
__ “আমি সব সময় থাকবো।”
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকারে বদলে যায়। ঘরের বাতিটা জ্বলে ওঠে। আলোয় তাদের মুখ আরও শান্ত দেখায়।রোহান হাত শক্ত করে ধরে বলে, __“আমাদের ছোট্ট পরিবারটা—এটাই আমার পৃথিবী।”
বাইরে থেকে কারও হাসির শব্দ ভেসে আসে। জীবন আবার স্বাভাবিক গতিতে চলছে। কিন্তু এই ঘরের ভেতরে—এই মুহূর্তে—সময় যেন থমকে আছে।
ভালোবাসা, অপেক্ষা আর নতুন স্বপ্ন নিয়ে।
জিনিয়ার রুমের দরজাটা পেছনে ফেলে জারা যখন হনহন করে বেরিয়ে আসে, তখন তার চোখের কোণে জমে থাকা জল আর ধরে রাখা যায় না। বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে, রাগ আর দুঃখ মিলেমিশে এক অদ্ভুত ব্যথা তৈরি করেছে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সে একবারও পেছনে তাকায় না। মনে হচ্ছে, তাকালেই চোখের জল গড়িয়ে পড়বে—আর সেটা সে কাউকে দেখাতে চায় না।
নিচে ড্রইংরুমে আসিফ খান আর আরিফ খান চা হাতে বসে গল্প করছিলেন। টিভির সামনে ছায়মা আর জেরিন বসে বসে চিকু বান্টি দেখছে, হাসির শব্দে ঘরটা হালকা আনন্দে ভরা। কিন্তু সেই আনন্দে জারার কোনো অংশ নেই।মন খারাপ না থাকলে সেও এসে তাদের সাথে বসে কার্টুন দেখতো।
জারা হনহন করে আসতেই আরিফ খানের চোখে পড়ে তার মুখের অবস্থা। ভ্রু কুঁচকে যায় তাঁর।
—“জারা মা, মুখটা এমন কেন? মন খারাপ?”
জারা মাথা দু’পাশে ঝাঁকিয়ে ছোট্ট করে বলে,
—“না।”
আসিফ খান চায়ের কাপ নামিয়ে রাখেন। মেয়েটার কণ্ঠে যে ঝাঁঝটা আছে, সেটা তাঁর অচেনা নয়।আরিফ খান আবার প্রশ্ন করেন,
—“তাহলে কী হয়েছে? এমন করে ছুটছ কেন?”
জারা একটু তেজি হয়ে বলে ওঠে,
—“আব্বু, তোমার বউ কই?”
এই ভঙ্গিতে ডাকটা শোনামাত্রই দু’জনেই হেসে ফেলেন। এই বাড়িতে জারার মুখে “তোমার বউ”—এই সম্বোধনটা একেবারেই স্বাভাবিক। আরিফ খান হাসতে হাসতে বলেন,
—“তোমার শাশুড়ি আম্মা কিচেনে আছে।”
আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না জারা। সোজা রান্নাঘরের দিকে ছুটে যায়। পেছনে ছায়মা ফিসফিস করে জেরিনকে বলে,
—“জারা বেশ রেগে আছে মনে হয়। একটু আগেও না ঠিক ছিল!”
জেরিন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে জারা’র যাওয়ার দিকে।
রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়েই জারা ডাকে,
—“শাশুড়ী আম্মা…ওও শাশুড়ী আম্মা…”
এই ডাকটা শুনেই ফারিয়া বেগম বুঝে যান—এটা সাধারণ ডাক না। জারা যখন মন খারাপ করে বা রেগে যায়, তখনই এমন করে ডাকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জেসমিন বেগম হালকা হাসি চেপে রাখেন।
জারা ভেতরে ঢুকেই ফারিয়া বেগমের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখ ছলছল, ঠোঁট কাঁপছে।
ফারিয়া বেগম তরকারি কসাতে কসাতে শান্ত গলায় বলেন,
—“কি হইছে আপনার? এমন করে ডাকছেন যে!”
জারা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ফারিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে,
—“শাশুড়ী আম্মা… তোমার ছেলে আমাকে আর ভালোবাসে না।”
এই কথা বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে।
ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম দু’জনেই থমকে যান। এমন কথা তারা কোনোদিন ভাবেননি। জারা তো তাদের চোখের মণি, আর আরমান—সে তো জারাকে চোখে হারায়।তাহলে হঠাৎ এমন কথা কেনো?
ফারিয়া বেগম চুলোর দিক থেকে ফিরে জারার দিকে তাকান। জারা তখন তাকে জড়িয়ে ধরে ফুপাতে ফুপাতে কাঁদছে।
জেসমিন বেগম অবাক হয়ে বলেন,
—“কি বলছিস জারা? কান্না করছিস কেন?”
জারা কাঁদতে কাঁদতেই বলে,
—“তোমাদের ছেলে আমাকে আগের মতো ভালোবাসে না ছোট শাশুড়ী আম্মা…”
ফারিয়া বেগম তার চোখের পানি মুছে দিয়ে গম্ভীর হয়ে বলেন,
—“কি হয়েছে, না বললে আমি বুঝবো কীভাবে?”
জারা নাক টেনে, ভাঙা গলায় বলতে থাকে,
—“আজ দুই দিন ধরে তোমার ছেলে আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলে না। আমার দিকে তাকায় না। অফিস থেকে আসার সময় চকলেট আনে না। এইসব বাদ দিলাম… আজ জাহেদ ভাইয়া, রাশেদ ভাইয়া ফিহা আর মিমের হয়ে জিনিয়া আপুর জন্য গিফট কিনে এনেছে। কিন্তু… আমার জন্য কিছুই আনেনি তোমার ছেলে।আমি আপুকে কিছু দিতে পারি নি। ত তুমি বলো আমি তো বড় বউ এই বাড়ির। আ আমার একটা দায়িত্ব আছে না বলো?আ আবার তোমার ছেলে সবার সামনে আমাকে অপমান করছে। আমি নাকি তার মাথায় উঠে নাচি।”
এই কথাগুলো বলেই সে আবার কেঁদে ওঠে। কান্নার চাপে চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে গেছে।
ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম একে অপরের দিকে তাকান। দু’জনের মুখই গম্ভীর। তারা ভেবেছিলেন হয়তো ছোটখাটো মান–অভিমান হবে, কিন্তু এমন দু’দিন ধরে—এটা তারা ভাবেননি।এটা অবিশ্বাস্য। আরমান জারা’র সাথে এক মিনিট কথা না হলে ঠিক থাকে না আর সেই ছেলে আকজ দুদিন ধরে জারা’র সাথে কথা বলে না?
ফারিয়া বেগমের বুকের ভেতর রাগ চেপে বসে। নিজের ছেলের ওপর।
—“এই ছেলে কি মাথা খারাপ করলো নাকি?” তিনি চাপা গলায় বলেন।
জেসমিন বেগম ধীরে বলেন,
—“ওরা তো একে অপর ছাড়া থাকতে পারে না। তাহলে এমন কি হলো যে দুদিন ধরে কথা বলে না? ”
ফারিয়া বেগম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।
—“তুই এখানে দাঁড়া, জেসমিন। রান্নাটা দেখিস।”
তারপর জারার হাত ধরে বলেন,
—“চল, আমার সাথে।”
জারা ভেজা চোখে তাকিয়ে থাকে।
—“কই যাবো শাশুড়ী আম্মা?”
—“ওর রুমে। আজ এই ব্যাপারটা এখানেই শেষ করতে হবে।”
ফারিয়া বেগম জারাকে নিয়ে সোজা আরমানের রুমের দিকে হাঁটেন। তার হাঁটায় দৃঢ়তা। মায়ের রাগ। ছেলের ওপর অভিমান। আর বউমার চোখের জল—এই তিনটে মিলেই তিনি এখন শক্ত।
পথে জারা ফিসফিস করে বলে,
— “শাশুড়ি আম্মা, তোমার ছেলেকে বেশি বোকা না কিন্তু ।আমার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু ওনার অবহেলা আমাকে পোরায়। আমি চাই না তুমি ওকে বেশি বকো। শুধু বলবে আমার সাথে যেনো ভালো করে একটু কথা বলে। ”
ফারিয়া বেগম বিরক্ত হয়ে বলেন,
— “কষ্ট যদি এতই হয়, তাহলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে বিচার দিতে গেলি কেন? এতো স্বামী ভক্ত ভালো না ।”
ফারিয়া বেগমের কথায় জারা আর কিছু বলে না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারে না। ফারিয়া বেগম মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে যান—এটা অভিমান না, গভীর ভালোবাসার কষ্ট। তিনি জারার মাথায় হাত রাখেন। জারা ধীরে বলে,
__“ ভক্ত হলে আমি আমার স্বামীজানের হয়েছি! তুমি আমার স্বামীজানকে বকবে না ব্যাস। তুমি শুধু বলবে আগের মতো একটু সময়, একটু আদর যেনো করে তাহলেই হবে । ”
ফারিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।“কাদের বিচার করবেন তিনি? ”ছেলের ঘরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ঠিক করেন—আজ আরমানের সাথে কথা হবেই। জারার চোখের জল বৃথা যেতে দেবেন না।
ফারিয়া বেগম জারার মুখটা দু’হাতে ধরে বলেন,
—“শোন মা, ভালোবাসায় কষ্ট হলে সেটা চেপে রাখলে হয় না।আমি কিছু বলবো না, তুই বলবি। সমস্যা সমাধানের প্রয়োজন।আমি আছি।”
রুমের দরজার সামনে এসে ফারিয়া বেগম একবার গভীর শ্বাস নেন। জারা বুকের ভেতর ধুকপুক অনুভব করে। ভেতরে আরমান কী করছে—সে জানে না। শুধু জানে, আজ যদি সে না বলে, তার বুকের ভেতরের কষ্টটা আরও বড় হবে।
ফারিয়া বেগম দরজায় হাত তুলতেই বলেন,
—“আরমান, দরজা খোল।”
এই ডাকের ভেতরেই ছিল মায়ের আদেশ। আর জারা দাঁড়িয়ে থাকে, চোখ ভেজা, বুক ভরা আশা আর ভয় নিয়ে—এই আশায় যে, হয়তো আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে।
ঘরে ঢুকেই আরমানের চোখ প্রথমেই বিছানার দিকে যায়। ফাঁকা। জারা নেই।এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায় সে। ভ্রু কুঁচকে চারপাশটা আরেকবার দেখে নেয়। না, কোথাও নেই।
মনে মনে ভাবে,“তাহলে নিচেই গেছে হয়তো। রাগ করে বসে আছে।”
অদ্ভুত একটা অস্বস্তি বুকের ভেতর খচখচ করে ওঠে। তবুও সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে।হাতে থাকা ব্লেজার টা চেয়ারের উপর ছুঁড়ে ফেলে বাথরুমে ঢুকে যায়। ঠান্ডা পানি মুখে দিলে কিছুটা শান্ত লাগে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকায়। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, কপালের ভাঁজটা আজ একটু বেশি গভীর।
ফ্রেশ হয়ে এসে সে বিছানার পাশে বসে। মোবাইল হাতে নেয়। জাহিরকে কল দেবে ভাবছিল। আঙুল স্ক্রিনে ছোঁয়ানোর ঠিক আগমুহূর্তেই দরজার বাইরে থেকে মায়ের গলা ভেসে আসে—
— “আরমান! দরজা খুল!”
সে চমকে ওঠে। দ্রুত উঠে দরজার দিকে যায়। দরজা খুলতেই ফারিয়া বেগম সামনে দাঁড়িয়ে। আর তার ঠিক পিছনে—জারা।মাথা নিচু। চোখের পাতা নামানো। মুখটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরে চাপা কান্নার ছাপ লুকানো।
আরমানের বুকটা ধক করে ওঠে। তার লক্ষী বউ কাঁদছে?কিন্তু কেন?
ফারিয়া বেগম ভেতরে ঢুকে পড়েন। জারাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে ছেলের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকান।
— “এই পাঁজি ছেলে.. এই সমস্যা কি তোর? দুই দিন ধরে ওর সাথে কথা বলছিস না কেন?”
আরমান হতভম্ব হয়ে যায়।
— “আম্মু, আমি?”
সে অবাক গলায় বলে,
— “আমি তো কিছু করিনি। তোমার পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করো—ও কী করছে!”
জারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা আরও নিচু হয়ে যায়। চোখের কোণে পানি জমে ওঠে। ফারিয়া বেগম রেগে যান।
— “আমি এসব জানি না। ঝগড়া হলে স্বামী হয়ে বউয়ের সাথে কথা বলবি,সরি বলবি বউ হাজার টা দোষ করলেও। বোঝেছি?ওকে আর অবহেলা করিস কেন?”
আরমান বিরক্ত হয়।
— “আম্মু, অবহেলা না। ও আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আর নিজেই বলেছে আমি যেনো ওর সাথে কথা না বলি।”
ফারিয়া বেগম এক পা এগিয়ে এসে ছেলের নাকের গোড়ায় আঙুল চেপে ধরেন।
— “ও ছোট, ওর কথা তোর শুনতে হবে? আর শোন, দ্বিতীয়বার যদি জারার চোখে পানি দেখি, তাহলে আরম দোলাই দিব। বুঝেছিস?”
আরমান কানে হাত দিয়ে কুঁকড়ে যায়।
— “আহ্ আম্মু! ছাড়ো, লাগছে!”
ফারিয়া বেগম হাত ছাড়েন, কিন্তু চোখের রাগ কমে না।
— “যা, ওকে সরি বল। এখনই।”
আরমান জেদ ধরে।
— “আমি কেন সরি বলব? ভুলটা তো ও করেছে। আমি সরি বলতান যদি আমার ভুল টা হতো।”
এই কথায় জারার চোখ আর ধরে রাখতে পারে না। পানি গড়িয়ে পড়ে। সে দ্রুত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নেয়। কিন্তু কাঁপুনি থামে না।
ফারিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
— “আমি এসব জানি না। নিজেদের মাঝে সব ঠিক করে দুজন নিচে আয়, খাবি।”
বলেই তিনি বেরিয়ে যান। দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। ঘরে হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। আরমান ঘুরে তাকায়। জারা এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। মাথা নিচু। ঠোঁট কামড়ানো। দুই হাত একসাথে ঘষছে।
আরমান ইচ্ছে করেই কিছু না বলে তাকে না দেখার মতো করে বিছানায় গিয়ে বসে পড়ে। মোবাইল তুলে নেয় । স্ক্রল করতে থাকে। যেনো সে জারা কে ইগনোর করছে মনে প্রাণে।কিন্তু চোখ বারবার আড়চোখে জারার দিকে চলে যাচ্ছে।
কেমন কাচুমাচু করছে…তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।এই অভিমানটা কতটা আপন…তবুও সে কথা বলে না।
জারার বুকের ভেতর তখন যেন সূচ ফোটানো হচ্ছে। এই অবহেলা সে সহ্য করতে পারছে না। নাক টানছে বারবার। গলা ভারী হয়ে আসে। সে ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। না সামনে আসে, না পেছনে যায়।
শেষ পর্যন্ত আর ধরে রাখতে পারে না।ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে জারা। হাউমাউ করে। আরমান চমকে ওঠে। মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়।
— “এই! কী হয়েছে? এমন করে কাঁদছো কেন?”
জারা কোনো উত্তর দিতে পারে না। কান্নায় দম আটকে আসে। সে হঠাৎ এগিয়ে এসে আরমানকে জড়িয়ে ধরে। শক্ত করে। যেন ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে।
আরমান এক সেকেন্ড থমকে থাকে। তারপর তার ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক শান্তি নামে।
তবুও মুখে রাগের ভান রেখে বলে—
— “কে যেন বলেছিল, আমার মতো বুড়ো খচ্চোরের সাথে থাকবে না? কথা বলবে না? আমার দেওয়া কিছু নেবে না? ব্রেকআপ করেছে নাকি আমার সাথে? আমাকে কথা বলতে নিষেধ করেছে, আমাকে ছুঁতে নিষেধ করেছে? তাহলে এখন কেনো সে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে ?”
জারা তার হাত সরিয়ে দেয়। আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। কান্নার মাঝেই ফিসফিস করে—
— “আর বলবো না… আর বলবো না… সত্যি বলছি আর বলব না! ”
আরমান তখন আর রাগ ধরে রাখতে পারে না। এক হাত দিয়ে জারার মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে। অন্য হাতে তার পিঠে আলতো চাপড় দেয়।
— “পাগলী…”
~~দু’দিন আগের ঘটনা ~~
সময়টা ছিল বৃহস্পতিবার। ঘড়িতে তখন সকাল নয়টা ছুঁইছুঁই। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে অদ্ভুত একটা চাপা ভাব। জারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিজাব ঠিক করলো। কলেজ ইউনিফর্মে তাকে আজ একটু বেশি সুন্দর লাগছিল নিজের কাছেই। চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে মৃদু হাসি। কারণ আজ আরমান তাকে কলেজ ছুটির পর নিতে আসবে—আর কোথাও একটা নিয়ে যাবে। কোথায়, সেটা বলেনি। শুধু বলেছিল, “তোমাকে সারপ্রাইজ দেব।”
আরমান অফিসে যাওয়ার সময় যথারীতি জারাকে কলেজে ড্রপ করে দেয়। গাড়ি থেকে নামার আগে জারা একটু ঝুঁকে এসে বলে,
__“ঠিক সময় আসবেন কিন্তু?”
আরমান হেসে তার কপালে হালকা টোকা দিয়ে বলে,
__“ আমার লক্ষী বউ কে দেওয়া কথা আমি কি কখনো এ-র ফের করি ?”
জারার মনটা তখনই ফুরফুরে হয়ে যায়। গাড়ি কলেজ গেট ছাড়তেই সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে, আজ দিনটা বুঝি সত্যিই বিশেষ।
ক্লাসে মন বসে না জারার। বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে আরমানের মুখ, তার হাসি, তার চোখ। দেড়টার দিকে কলেজ ছুটি হয়ে যায়। স্টুডেন্টরা একে একে বের হয়ে যায়, কেউ বাড়ির পথে, কেউ কোচিংয়ে। জারা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কলেজ গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়।
সে নিশ্চিত ছিল, আরমান আসবে। প্রথম পনেরো মিনিট কেটে যায়। জারা ফোনটা হাতে নেয়, সময় দেখে। মুখে তখনও হাসি। ভাবছিল, হয়তো ট্রাফিকে আটকে আছে। আরও কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। আধা ঘণ্টা। এরপর এক ঘণ্টা। কলেজ মাঠ ফাঁকা হয়ে গেছে। গেটের আশপাশে ছাত্রছাত্রী প্রায় নেই বললেই চলে।
দারোয়ান লোকটা বারবার তার দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছিল। সেই দৃষ্টি জারার বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তি তৈরি করে। সে একটু সরে দাঁড়ায়। ব্যাগটা শক্ত করে ধরে। ফোন বের করে আরমানকে কল দেয়—ফোন বন্ধ।
একবার, দু’বার, তিনবার। একই উত্তর—সুইচড অফ।
হঠাৎ ভয়টা জমে ওঠে। চারপাশটা অচেনা লাগতে শুরু করে। কলেজ গেট, যে জায়গাটা এত পরিচিত, সেটাও যেন হুমকির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। দারোয়ানের দৃষ্টি আবার পড়ে তার ওপর। এবার আর সহ্য হয় না।
জারা সিদ্ধান্ত নেয়, এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না।
সে দ্রুত গেট ছেড়ে রাস্তায় চলে আসে। হাঁটতে হাঁটতে বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, অভিমান, অপেক্ষার কষ্ট—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত ভার তৈরি করে। একসময় সে একটা ফুচকার স্টলের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ক্ষুধা লাগেনি, তবুও ফুচকা অর্ডার দেয়। হয়তো মনটা অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য।
স্টলের পাশের বেঞ্চে বসে সে ফুচকা খেতে থাকে। চোখেমুখে ফুচকার ঝাল-টক লেগে থাকলেও মনটা দূরে কোথাও আটকে আছে। পাশে রাখা একটা হলুদ গোলাপের তোড়া—কিছুক্ষণ আগে একটা ছেলে দিয়েছিল । সঙ্গে ফোন নাম্বারও। জারা নেয়নি, ফিরিয়েও দেয়নি। শুধু চুপ করে বসেছিল। ছেলেটা নিজের মতো করে একা একা কথা ফুল আর ফোন নাম্বার দিয়ে চলে যায়।
এদিকে আরমান অফিস থেকে ঠিক সময়েই বের হয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে ব্যাংক থেকে কল আসে। জরুরি। খুব জরুরি। সে ভেবেছিল, আধা ঘণ্টার বেশি লাগবে না। তাই কলেজে না গিয়ে সোজা ব্যাংকে ঢোকে।
কিন্তু সময় কাউকে ছাড় দেয় না। কাগজ, সই, হিসাব—একটার পর একটা। দুই ঘণ্টা কেটে যায় অজান্তেই। আরমানের মাথার ভেতর শুধু একটাই নাম ঘুরতে থাকে—মানজারা।
সব কাজ শেষ হতেই সে গাড়িতে উঠে পড়ে। বুকের ভেতর অজানা অস্থিরতা। কলেজের গেটে পৌঁছে চারপাশে তাকিয়ে তার বুকটা হঠাৎ মুচড়ে ওঠে।
জারা নেই। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারে না। আবার তাকায়। না, নেই। ফোন বের করে কল করার জন্য কিন্তু দেখে মোবাইল বন্ধ। বিরক্ত হয়ে ফোন চালে করেতেই একের পর এক নোটিফিকেশন আসতে থাকে। জারা কল করেছে মেসেজ দিয়েছে। এতো কল মেসেজ দেখে এবার সত্যি মনের মধ্যে ভয় বসা বাদে। জারা কে কল করে মোবাইল বন্ধ । বাড়িতে কল করে জানতে পারে, জারা বাড়িতেও যায়নি।
মাথার ভেতর হাজারটা চিন্তা একসাথে আছড়ে পড়ে। দারোয়ানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে। লোকটার উত্তর কেমন যেন অস্পষ্ট। চোখের ভাষা ভালো লাগে না আরমানের।
সে পাগলের মতো কলেজের ভেতরে ঢুকে পড়ে। একবার, দু’বার, দশবার চক্কর দেয় এতো বড় কলেজ । কোথাও নেই। বুকের ভেতর ভয়টা এখন রীতিমতো চিৎকার করছে।
শেষমেশ রাস্তায় বের হয়। আশপাশে খুঁজতে থাকে। তখনই চোখে পড়ে—ফুচকার স্টল। আর তার পাশে বসে থাকা পরিচিত একটা মুখ। জারা।
এক মুহূর্তে আরমানের বুক থেকে যেন পাহাড় নেমে যায়। গভীর নিশ্বাস নেয়। আল্লাহর নাম নেয় মনে মনে। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।
জারা ফুচকা খাচ্ছে মন দিয়ে। পাশে হলুদ গোলাপের তোড়া। তার দৃষ্টি কিছু দূরে বসে থাকা তিনটা ছেলের দিকে।এটা দেখে আরমানের কপালে বাজ পড়ে।
আরমান বসে পড়ে জারার পাশে। ঠান্ডা গলায় বলে,
__“আপনাকে কলেজে কেন পাঠাই, ম্যাডাম?”
জারা অন্যমনস্কভাবে বলে,
__“হ্যান্ডু হ্যান্ডু পোলা দেখতে।”
এই একটা বাক্যই যথেষ্ট ছিল।আরমানের রক্ত মাথায় উঠে যায়। চোখ লাল হয়ে ওঠে। মুষ্টি শক্ত হয়। সে দেখে, ছেলেগুলোও তাকিয়ে আছে।
জারা বুঝতেই পারে না পাশে কে বসে আছে। কথা শেষ করেই ঘুরে তাকায়। দেখে আরমান। তার মুখ দেখে জারার মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে যায়। কথাটা শেষ হতেই আরমানের মুখের রঙ পাল্টে যায়। গলার শিরা ফুলে ওঠে। চোখ লাল হয়ে যায় মুহূর্তে। সে লক্ষ্য করে—কিছু দূরে বসে থাকা তিনটা ছেলে জারার দিকে তাকিয়ে আছে, হাসাহাসি করছে।
আরমান দাঁত চেপে ধরে।
__“ কি বললেন আবার বলুন তো ম্যাডাম একটু শুনি?
জারা ঘাবড়ে যায়। কন্ঠ বলে দিচ্ছে কে এসেছে?
__“ ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছিলে কেন?”
জারা এবার পুরোপুরি ঘুরে তাকায়। আরমানকে দেখে প্রথমে একটু থমকে যায়, তারপর মুখে একরকম বেপরোয়া ভাব আসে।
__“আ আপনি কখন এসেছন?”
–“অনেক আগেই। বসে বসে দেখছিলাম আমার বউ কত সুন্দর করে অন্যদের এন্টারটেইন করছে।”
এই কথায় জারার বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট হুড়মুড়িয়ে বের হয়ে আসে।
__“আপনি জানেন আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম?
আড়ায় ঘণ্টা! কলেজ ফাঁকা হয়ে গেছে! দারোয়ান আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যে আমার গা শিউরে উঠছিল! এখানে বসে আপনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে এগারো প্লেট ফুচকা খেয়েছি আপনার নাম করে। বলেছি আমার স্বামীজান এসে টাকা দিবে।এখন ওনার টাকা দিন। আমি আর খেতে পারবো না!”
জারা একদমে কথাগুলো বলে থামে। আরমান গর্জে ওঠে,
__“ খাচ্ছো ভালো কথা! এখানে বসে ছেলেদের দিকে তাকিয়ে ছিলে কেনো?”
জারার পাশের টুলে থাকা হলুদ গোলাপের তোড়াটা তুলে নেয় সে।
__“এইটা কে দিয়েছে?”
আরমানের দমকে ভয় পেয়ে যায় জারা।ঝাঁকি দিয়ে উঠে সে। মুখে ফুচকা টা আর চিবতে পারে না। এমনিতেই সে কতো ভয় পেয়ে আছে।কতো দেরি করে এসেছে। সময়ের কোনো জ্ঞান নেই। আর এই লোকটা এখন এসে তাকে দমকাচ্ছে। জারা গোলগোল আঁখিদুটি দিয়ে তাকিয়ে আছে। জারাকে কথা বলতে না দেখা আরমান আবার ধমকে বলে
__“ কী সমস্যা তোর? কানে কথা যাচ্ছে না? কে দিয়েছে এই ফুল?”
জারা আবার ভয়ে ঝাঁকি দিয়ে উঠে।রাগে,ভয়ে আর দুঃখে জারা তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
__“যারা দিয়েছে, তারাই দিয়েছে। আপনার কী?”
এই ‘আপনার কী’ শব্দটাই আরমানকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় রাগের চূড়ায়। সে দাঁড়িয়ে যায়। চারপাশের মানুষ তাকিয়ে আছে—কিন্তু তার মাথায় কিছু নেই।
__“তুই আমার বউ হয়ে অন্য ছেলের দেওয়া ফুল হাতে রাখিস—আর বলিস আমার কী?”
বলেই তোড়াটা মাটিতে আছড়ে ফেলে, পা দিয়ে পিষে ফেলে।
__“এইভাবে তাকিয়েছিলি কেন? এখন চোখ দুটু খোলে নেয়?”
জারা এবার আর চুপ থাকে না। সে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে,
__“চোখ আছে বলেই তাকিয়েছি! আমাকে অপেক্ষা করতে বলে লাপাত্তা হয়ে গেছেন? ফোন বন্ধ কেন ছিল?”
আরমানও চেঁচায়,
__“ব্যাংকে ছিলাম! কাজ ছিল!”
__“কাজ থাকলে জানাতে পারতে না?আমি কি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবো এতো সময়। আর এমন করছেন কেনো? আমি তো আপনার বউ—কোনো অচেনা মেয়ে নই?”
আরমান এক পা এগিয়ে আসে।
__“অচেনা মেয়ের মতোই ব্যবহার করছিস! ফুল নিচ্ছিস, কথা বলছিস, হাসছিস!”
জারা হাত কাঁপিয়ে বলে,
__“হাসিনি! ভয় পেয়েছি! কিন্তু সেটা আপনি বুঝবেন না। বোঝার মতো বয়স আপনার হয়নি!”
এই কথা শুনে আরমানের মাথা পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
__“ভয় পেয়েছিস? ভয় পেলে ফুল নিয়েছিস কেনো ?”
__“আমি নিতে চাইনি!ওরা রেখে গেছে !”
__“তাহলে রেখে দিলি কেন? ফেলে দিলি না কেনো?”
__“মন চেয়েছে তাই রেখেছি আপনার সমস্যা ?”
এই কথায় আরমান আরও ক্ষিপ্ত হয়।
__“তোর সাহস কিভাবে হয় আমার সামনে এভাবে কথা বলার?”
হঠাৎ ঠাস করে একটা চড়।চারপাশে কয়েকজন মানুষ থমকে তাকায়।জারা গালে হাত দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে পানি, কিন্তু কণ্ঠে আগুন।
__“মারলেন? বেশ!মারুন,আরও মারুন?”
আরমান গর্জে ওঠে,
__“চুপ কর! বেশি বাড়াবাড়ি করিস না!”
জারা কাঁপা কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠে,
__“আমি বাড়াবাড়ি করছি? আমাকে দুই ঘণ্টা ফেলে রেখে আপনি সাধু? আর আমি বললেই মারবেন?”
__“তুই আমাকে জ্বালাচ্ছিস! হাফ ইঞ্চির বাচ্চা!”
__“জ্বলবো!১০০ বার জ্বালাবো! কারণ আমাকে অপমান করেছন!”
তারপর আরমানের দিকে জারা আঙুল তুলে বলে,
__“আমি আপনার সাথে থাকবো না! ব্রেকআপ আপনার সাথে। আমাকে ছুঁবে না।আপনার সাথে কথাও বলবেন না!”
আরমানের চোখ অন্ধকার হয়ে যায়।
__“আচ্ছা, থাকিস না? ভাবছিস না আমি তোকে ধরে রাখবো?”
আরমানের কণ্ঠ আরও নিচু, আরও বিষাক্ত।
__“তোর মতো বেয়াদব মেয়ে আর হাফ ইঞ্চি আমার দরকার নেই।”
এই কথায় জারার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে যায়। তবুও সে শক্ত থাকে।
__“ঠিক আছে।তাহলে আপনার মতো একটা আইফেল টাওয়ার দেখে বিয়ে করে নিন। আমি নিজের মতো থাকবো।”
দু’জনের মাঝখানে তখন শুধু রাগ না—অহংকার, অপমান, ভাঙা বিশ্বাস।আর এই তর্কটাই ছিল সেই আগুন,যার ছাই আজও দু’জনের মাঝখানে জমে আছে।
~~ বর্তমান ~~
আরমানের কণ্ঠ নরম হয়ে আসে।জারা কাঁদতে কাঁদতে বলে
— “আমি কষ্ট পাই আপনি বুঝেন না… দুই দিন ধরে আমাকে লক্ষী বউ বলে ডাকেন না।আমার কি যে কষ্ট হয়েছিলো।রাতে ঘুমের ভান করে আপনার উপর হাত দিলে সরিয়ে দিতেন। ”বলেই আবার কান্না। এই কান্না যেনো শেষ হয় না।
আরমান চোখ বন্ধ করে গভীর নিশ্বাস নেয়।
— “আমাকেও তো কেউ একজন স্বামীজান বলে ডাকে নি। আমি কি কম কষ্ট হয়েছিলো। কিন্তু ভুলটা তোমার ছিলো, তর্ক তুমি করেছো।”
__“তো কি হইছে। আপনিও তো আমাকে চড় মেরেছেন! ”
__“এটা বেয়াদবির শাস্তি! ”
জারা আরমানের বুকে নাক ঘষে ফুপাতে ফুপাতে থাকে। আরমান জারা’র গালে হাত ধরে বলে
__“আবার কান্না করছো কেন? ”
জারা নাক টানতে টানতে বলে
__“সরি না বললে কান্না থামবে না? ”
আরমান কপাল কুঁচকে তাকায়।
__“আমি কেনো সরি বলবো? দোষ তো তোমার? ”
__“তো কি হইছে? আপনি সরি বলুন! না হলে শাশুড়ী আম্মা কে ডেকে আনবো!”
__“আমাকে ভয় দেখাচ্ছো?”
জারা এবার জোরে কান্না করে বলে
__“ একশো বার সরি বলে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরুন তাড়াতাড়ি! ”
আরমান হাসে জারা’র পাগলামি দেখে। মুচকি হেসে জারা’র কপালে চুমু দিয়ে সরি বলে।গুনে গুনে একশোবার সরি বলে আরমান। জারা ধীরে ধীরে শান্ত হয়। বুকের ভেতরকার কান্না কমে আসে। সে মাথা তোলে। চোখ দুটো লাল। নাক ফোলা।
আরমান তার গাল ছুঁয়ে দেয়।
— “এই চোখে আর পানি দেখতে চাই না।”
জারা মাথা নেড়ে ফেলে।
— “একটু আদর।”
আরমান হেসে ফেলে।
— “এইটুকুর জন্য এত কান্না?”
সে জারার কপালে আবার আলতো চুমু দেয়।জারা আরমানের শার্ট খামছে ধরে বলে
— “ এইটুকু না। অনেক টুকু আদর দিতে হবে। দুই দিন আদর করেন নি। আমার কিন্তু মনে আছে..হুমমম।”
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭২
আরমান হেসে ফেলে। এই মেয়ের সাথে কীভাবে রাগ করবে সে। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ঘরের বাতাসটা আবার উষ্ণ হয়ে ওঠে।দরজার বাইরে থেকে ফারিয়া বেগমের গলা ভেসে আসে
— “নিচে আসবি তোরা?”
আরমান হেসে উত্তর দেয়
— “আসছি আম্মু।”
জারা আরমানের বুকের সাথে লেগে থাকে। এই ছোট ছোট অভিমান, কান্না, ভালোবাসা—এই নিয়েই তো তাদের সংসার।
